📄 মুহাসাবা সম্পর্কে হাদীছের ভাষ্য
শাদ্দাদ বিন আওস (রাঃ) কর্তৃক নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ- 'বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ সেই ব্যক্তি যে নিজের মনকে তার কামনা-বাসনার অনুগামী বানিয়ে দেয় এবং আল্লাহ্র কাছে অহেতুক আশা করে'। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, دَانَ نَفْسَهُ : حَاسَبَ نَفْسَهُ فِي الدُّنْيَا قَبْلَ أَنْ يُحَاسَبَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ 'কিয়ামত দিবসে হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোন ব্যক্তি দুনিয়াতে নিজ মনের হিসাব নেয়'।
টিকাঃ
৬. তিরমিযী হা/২৪৫৯, তিরমিযী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন; ইবনু মাজাহ হা/৪২৬০; মিশকাত হা/৫২৮৯।
৭. ঐ।
📄 মুহাসাবার ব্যাপারে বিদ্বানগণের ইজমা
আলেমদের সর্বসম্মত মতে, নিজ মনের হিসাব নেওয়া একটি যরূরী বা আবশ্যকীয় কাজ । ইয বিন আব্দুস সালাম (রহঃ) বলেন, أجمع العلماء على وجوب محاسبة النفس فيما سَلَفَ من الأعمال وفيما يُسْتَقْبَلُ منها 'মনের উপর অতীত ও ভবিষ্যতের আমলের যাচাই-বাছাই বা মুহাসাবা আবশ্যিক হওয়ার বিষয়ে আলেমগণ ইজমা করেছেন'।
টিকাঃ
৮. তাফসীরুছ ছা'আলিবী, সূরা ইনশিক্বাক্ব ৬ আয়াতের আলোচনা, ৪/৩৯৯।
📄 কে নিজের মনের হিসাব করবে?
মুহাসাবা এমন নয় যে সমাজের একদল মানুষ তা করবে এবং অন্যেরা তা করবে না। বরং ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, নেককার-বদকার, আলেম-জাহেল ইত্যাদি সকল মুমিন আমভাবে তার অন্তর্ভুক্ত। যিনি জাহেল-অজ্ঞ তিনি এভাবে নিজের হিসাব করবেন যে, অজ্ঞ অবস্থায় কীভাবে তিনি আল্লাহ্র ইবাদত করছেন? কখন তার এ অজ্ঞতা দূর হবে? কীভাবে দূর হবে? কীভাবে সে শিখবে? কী দিয়ে শুরু করবে?
এভাবে আলেম বা বিদ্বান ব্যক্তিও নিজের হিসাব করবে। কথিত আছে যে, শুরুতে করা মুহাসাবা থেকে শেষে করা মুহাসাবা হবে আরও নিবিড়। অর্থাৎ জীবনের প্রথম বেলায় লোকেরা যখন আল্লাহ্র পথ সম্পর্কে অজ্ঞ ও গাফেল থাকে তখন নিজেদের মনের যেভাবে হিসাব নেয়, সেই অজ্ঞতা ও গাফলতি কেটে গিয়ে তাদের জীবন যখন উঁচু পর্যায়ে উন্নীত হয় এবং তারা বিদ্যাচর্চা, সৎকাজ সম্পাদন, ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের নিষেধ ইত্যাদি আমল করতে থাকে তখন তাদের মনের হিসাব আরও কঠোরভাবে করতে হবে। আমরা কত তালেবুল ইলম বা দ্বীনী জ্ঞান অর্জনকারীকে দেখেছি যারা মনের হিসাব রাখে না এবং আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধী পথ থেকে আত্মরক্ষা করে না। ফলে নানান জায়গায় তাদের পদস্খলন ঘটেছে এবং মানবতা বিনষ্টকারী আচরণ থেকে তারা নিজেদের হেফাযত করতে পারেনি। মাকরূহ বা অপসন্দনীয় কাজ পরহেয করাতো দূরের কথা, সময়বিশেষে তারা বরং হারামের সাথেও জড়িয়ে পড়ে।
এ ধরনের দ্বীনী জ্ঞান অর্জনকারীরা নিজেদের বিদ্যার উপর নির্ভর করে মনের হিসাব রাখে না। তারা তাদের বিদ্যার বড়াই করে এবং অহংকার বশত কাউকে গ্রাহ্য করে না। হিংসা-বিদ্বেষ, গীবত ও পরনিন্দা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। তারা কুৎসিত কথা ছড়িয়ে বেড়ায় এবং গোপনীয় বিষয় ফাঁস করে দেয়। তারা নিজেদের জন্য এমন এমন মর্যাদার কথা ভাবে যা তাদের ছাড়া অন্যদের জন্য তারা ভাবতেই পারে না। হয়তো এক পর্যায়ে তাদের ভাবনা সঠিক হ'তেও পারে, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তো সকল শ্রেণীর মানুষেরই পাপ-পঙ্কিলতার হিসাব নিবেন। সেক্ষেত্রে বরং তাদের হিসাব হবে আরও কঠোর। তাদের মতো শিক্ষার্থীদের বিদ্যা তাদের কোন উপকারে আসে না। কেননা মুজাহিদের জন্য যেমন তলোয়ার, আমলের জন্য তেমনি বিদ্যা। তলোয়ার ব্যবহার না করলে তা দ্বারা মুজাহিদ কিভাবে উপকৃত হবে? আবার ক্ষুধার্তকে দেখুন, সে ক্ষুধা থেকে বাঁচার জন্য খাদ্য জমা করে। কিন্তু ক্ষুধার সময় যদি সে নাই খেল, তবে আর খাদ্য জমিয়ে কি লাভ! কবি বলেন,
يُحَاوِلُ نَيْلَ الْمَجْدِ وَالسَّيْفُ مُعْمَدٌ * وَيَأْمَلُ إِدْرَاكَ الْعُلَاَ وَهُوَ نَائِمُ
'সে মুজাহিদের সম্মান লাভে প্রয়াসী, অথচ তার তলোয়ার কোষবদ্ধ, সে উচ্চমার্গের নাগাল পেতে আশাবাদী, অথচ ঘুমিয়ে আছে বিছানায়'।
জাহিল-মূর্খদের অবস্থা অনেক সময় এ ধরনের শিক্ষার্থীদের থেকে ভাল হয়ে থাকে। কেননা কিছু কিছু জাহিল-মূর্খ নিজেদের মনের হিসাব করে মন্দ আমলগুলো বের করে ফেলে এবং খেয়াল-খুশীতে মজে গিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনার আগে নিজেদের সংশোধনে সচেষ্ট হয়। অনেক শিক্ষার্থী তাদের শেখা বিদ্যার প্রচার-প্রসার করে না এবং পঠন-পাঠনেও অংশ নেয় না। এটি তাদের একটা বড় ভুল। অথচ এ ভুল যাতে না হয়, সেজন্য তাদের নিজেদের দায়িত্বের হিসাব রাখা আবশ্যক ছিল। আর যারা বিদ্বান বা আলেম তারা নিজেদের মনের হিসাব রাখতে অন্যান্যদের তুলনায় বেশী সমর্থ। আজকাল আমরা ইন্টারনেট, ইউটিউব, টিভি ইত্যাদি মিডিয়াতে প্রচারিত যেসব ভুলে ভরা দ্বীন বিনষ্টকারী ফৎওয়া দেখতে পাই তার কারণ আলেমদের মুহাসাবা বিমুখতা। তারা যদি নিজেদের মনে একবারের জন্যও ভেবে দেখতেন তাহ'লে ফৎওয়া জিজ্ঞাসাকারীদের খেয়াল-খুশী অনুযায়ী তাদের মর্যী মাফিক ঐসব বাজে ফৎওয়া দিতেন না। কাজেই আলেম ও তালেবুল এলেম বা দ্বীন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্য যে কারও তুলনায় নিজেদের মনের হিসাব কঠিনভাবে রাখা উচিত। কেননা তারা যদি নিজেদের মনের হিসাব রাখে তবে নিজেরা উপকৃত হবে এবং জনগণেরও উপকার করতে পারবে। আর যদি নিজেদের মনের হিসাব রাখা ছেড়ে দেয় তবে নিজেরা পথহারা হবে এবং অন্যদেরও পথহারা করবে।
টিকাঃ
৩৪. ইবনুল জাওযী, আল-মুদহিশ, পৃ. ৪৭০।
📄 কোত্থেকে আমরা আত্মসমালোচনা শুরু করব?
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, প্রথমেই ফরয আমল দিয়ে নিজের হিসাব শুরু করবে। তাতে কোন ত্রুটি বুঝতে পারলে কাযা অথবা সংশোধনের মাধ্যমে তার প্রতিবিধান করবে। তারপর নিষিদ্ধ বিষয়ের হিসাব নেবে। যখন সে বুঝতে পারবে যে, সে কোন একটা নিষিদ্ধ কাজ করে ফেলেছে তখন তওবা, ইস্তিগফার ও পাপ বিমোচক কোন পুণ্য কাজ করে তার প্রতিবিধান করবে। তারপর গাফলতির হিসাব নিবে। নিজের সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে যদি সে গাফেল থাকে তাহ'লে আল্লাহ্র দিকে ফিরে আসা এবং যিকির করার মাধ্যমে সে গাফলতির প্রতিবিধান করবে।
তারপর সে কী কথা বলেছে, কোথায় দু'পায়ে হেঁটে গেছে, দু'হাত দিয়ে কী ধরেছে, দু'কান দিয়ে কী শুনেছে তার হিসাব নিবে। সে ভাববে এ কাজ দ্বারা আমার কী নিয়ত ছিল? কার জন্য আমি এ কাজ করেছি? কোন পদ্ধতিতে কাজটি করেছি? জেনে রাখা দরকার যে, প্রত্যেক হরকত (কাজ) ও কথার জন্য দু'টো খাতা (রেজিস্টার) তৈরি করতে হবে। এক খাতায় থাকবে, কার জন্য কাজ করছি তার তালিকা; আরেক খাতায় থাকবে, কীভাবে কাজ করছি তার তালিকা। প্রথমটা ইখলাছ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা এবং দ্বিতীয়টা অনুসরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা।
ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) নফস বা মনের হিসাব গ্রহণের একটি কার্যকরী পদ্ধতি তুলে ধরেছেন। তিনি কোত্থেকে মুহাসাবা শুরু করতে হবে এবং কোনটার পর কোনটা করতে হবে ধারাবাহিকভাবে তা বর্ণনা করেছেন। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হ'ল।-