📘 আত্মসমালোচনা > 📄 আত্মসমালোচনার মূল ভিত্তি

📄 আত্মসমালোচনার মূল ভিত্তি


আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তার বান্দাদেরকে নিজের হিসাব নিজে গ্রহণের আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهُ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُوْنَ، وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِيْنَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ، 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেক ব্যক্তির উচিৎ এ বিষয়ে ভেবে দেখা যে, সে আগামী দিনের জন্য কি অগ্রিম প্রেরণ করছে? আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে আত্মভোলা করে দিয়েছেন। ওরা হ'ল অবাধ্য' (হাশর ৫৯/১৮-১৯)।
এই আয়াতের তাফসীরে ইবনু সা'দী (রহঃ) বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তারা যেন ঈমানের দাবী অনুযায়ী কি গোপনে কি প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় তাক্বওয়া অবলম্বন করে, তিনি তাদেরকে শরী'আহ, হুদূদ ও অন্যান্য যেসব বিষয়ে আদেশ-নিষেধ করেছেন তা যেন তারা খুব খেয়াল করে মেনে চলে, কোনটা তাদের পক্ষে আর কোনটা বিপক্ষে যাবে এবং তাদের অর্জিত আমল ক্বিয়ামতের দিন তাদের জন্য কতটা লাভজনক হবে ও কতটা ক্ষতিকর হবে তা যেন তারা ভেবে দেখে। কেননা তারা যখন আখিরাতকে তাদের জীবনের লক্ষ্য ও মনের কিবলা বানাবে এবং আখিরাতের অবস্থানের প্রতি গুরুত্ব দিবে, তখন যেসব আমলের দরুন তারা আখিরাতে একটি ভাল অবস্থান লাভ করতে পারবে তা করতে উঠেপড়ে লাগবে, আর যে সকল বাধা-বিপত্তি তাদের আখিরাতমুখী আমলের গতি রুদ্ধ করবে কিংবা গতিপথ পাল্টে দিবে তা থেকে তাদের আমল পরিচ্ছন্ন রাখতে তারা সচেষ্ট থাকবে। তদুপরি যখন তারা মনে রাখবে যে, আল্লাহ তাদের সব কাজের খবর রাখেন, তাদের কোন কাজই তার নিকট গোপন থাকে না, কোন কাজই তার কাছ থেকে নষ্ট হয়ে যায় না এবং কোন কাজকেই তিনি নগণ্য বা তুচ্ছ ভাবেন না তখন তারা আবশ্যিকভাবে তাদের কাজের গতি বাড়িয়ে দিবে।
এই পবিত্র আয়াত বান্দার নিজের হিসাব নিজে গ্রহণের মূল ভিত্তি। বান্দার কর্তব্য নিজের কাজের খোঁজ-খবর রাখা। কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখতে পেলে তার প্রতিকার হিসাবে সে ভবিষ্যতে কাজটি থেকে পুরোপুরি বিরত থাকবে, ঐ কাজে প্ররোচিত হওয়ার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে তা এড়িয়ে চলবে এবং খালেছ অন্তরে তওবা করবে। যদি সে নিজের মধ্যে আল্লাহ্ কোন আদেশ পালনে অমনোযোগ লক্ষ্য করে তাহ'লে সেই অমনোযোগ কাটাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে এবং আদেশটি যাতে অমনোযোগ কাটিয়ে দৃঢ়তার সাথে যথার্থরূপে সম্পন্ন করা যায় সেজন্য স্বীয় রবের কাছে ব্যাকুল চিত্তে দো'আ করবে। আল্লাহ্র আদেশ পালনে তার অমনোযোগিতা ও অবহেলা সত্ত্বেও তার উপর আল্লাহ পাক কত বেশী অনুগ্রহ ও দয়া করে যাচ্ছেন তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে। এতে তার মধ্যে অবশ্যই নিজের আমলের ঘাটতি দেখে লজ্জা অনুভূত হবে।
বান্দা যদি নিজের আমলের এভাবে হিসাব-নিকাশ ও যাচাই-বাছাই করা থেকে গাফিল ও উদাসীন হয়ে বসে থাকে তাহ'লে তার থেকে বদনছীব ও হতভাগা আর কেউ হয় না। সে তখন ঐ লোকদের শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাবে যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাকে স্মরণ করা ও তার হক আদায়ে গাফলতি করেছে এবং নিজেদের মন ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে তৎপর হয়েছে। ফলশ্রুতিতে তারা সফলতা লাভ করতে পারেনি এবং কোন সুবিধাও অর্জন করতে পারেনি। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাদের নিজেদের যা করা উচিৎ ছিল তা ভুলিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের জন্য যা উপকার ও মঙ্গল বয়ে আনত তার সম্পর্কে তাদেরকে বে-খবর ও উদাসীন করে দিয়েছেন। ফলে তাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মঘাতী ও বাড়াবাড়িমূলক। দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিই এখন তাদের বিধিলিপি। তারা এতটাই প্রতারিত যে তার প্রতিকারের কোন উপায় তাদের হাতে নেই এবং তাদের ভগ্নদশা নিরাময়েরও কোন ব্যবস্থা নেই। কারণ তারা তো ফাসিক বা পাপাচারী'।
আল্লাহ তা'আলা তার প্রিয় কিতাবে বলেছেন, إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُوْنَ 'যারা আল্লাহকে ভয় করে, শয়তানের কুমন্ত্রণা স্পর্শ করার সাথে সাথে তারা সচেতন হয়ে যায় এবং তাদের জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়' (আ'রাফ ৭/২০১)।
মুত্তাকীদের বিষয়ে আল্লাহ বলছেন যে, তারা যখন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কোন পাপ কাজ করে বসে তখন আল্লাহকে মনে করে তার দিকে ফিরে আসে এবং তওবা করে। মুত্তাক্বীরা যত কাজ করে মনে মনে তার হিসাব ব্যতীত এ তওবা ও আল্লাহকে মনে করা আদৌ সম্ভব নয়।

টিকাঃ
৫. তায়সীরুল কারীমির রহমান, পৃ. ৮৫৩।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 মুহাসাবা সম্পর্কে হাদীছের ভাষ্য

📄 মুহাসাবা সম্পর্কে হাদীছের ভাষ্য


শাদ্দাদ বিন আওস (রাঃ) কর্তৃক নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ- 'বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ সেই ব্যক্তি যে নিজের মনকে তার কামনা-বাসনার অনুগামী বানিয়ে দেয় এবং আল্লাহ্র কাছে অহেতুক আশা করে'। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, دَانَ نَفْسَهُ : حَاسَبَ نَفْسَهُ فِي الدُّنْيَا قَبْلَ أَنْ يُحَاسَبَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ 'কিয়ামত দিবসে হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোন ব্যক্তি দুনিয়াতে নিজ মনের হিসাব নেয়'।

টিকাঃ
৬. তিরমিযী হা/২৪৫৯, তিরমিযী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন; ইবনু মাজাহ হা/৪২৬০; মিশকাত হা/৫২৮৯।
৭. ঐ।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 মুহাসাবার ব্যাপারে বিদ্বানগণের ইজমা

📄 মুহাসাবার ব্যাপারে বিদ্বানগণের ইজমা


আলেমদের সর্বসম্মত মতে, নিজ মনের হিসাব নেওয়া একটি যরূরী বা আবশ্যকীয় কাজ । ইয বিন আব্দুস সালাম (রহঃ) বলেন, أجمع العلماء على وجوب محاسبة النفس فيما سَلَفَ من الأعمال وفيما يُسْتَقْبَلُ منها 'মনের উপর অতীত ও ভবিষ্যতের আমলের যাচাই-বাছাই বা মুহাসাবা আবশ্যিক হওয়ার বিষয়ে আলেমগণ ইজমা করেছেন'।

টিকাঃ
৮. তাফসীরুছ ছা'আলিবী, সূরা ইনশিক্বাক্ব ৬ আয়াতের আলোচনা, ৪/৩৯৯।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 কে নিজের মনের হিসাব করবে?

📄 কে নিজের মনের হিসাব করবে?


মুহাসাবা এমন নয় যে সমাজের একদল মানুষ তা করবে এবং অন্যেরা তা করবে না। বরং ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, নেককার-বদকার, আলেম-জাহেল ইত্যাদি সকল মুমিন আমভাবে তার অন্তর্ভুক্ত। যিনি জাহেল-অজ্ঞ তিনি এভাবে নিজের হিসাব করবেন যে, অজ্ঞ অবস্থায় কীভাবে তিনি আল্লাহ্র ইবাদত করছেন? কখন তার এ অজ্ঞতা দূর হবে? কীভাবে দূর হবে? কীভাবে সে শিখবে? কী দিয়ে শুরু করবে?
এভাবে আলেম বা বিদ্বান ব্যক্তিও নিজের হিসাব করবে। কথিত আছে যে, শুরুতে করা মুহাসাবা থেকে শেষে করা মুহাসাবা হবে আরও নিবিড়। অর্থাৎ জীবনের প্রথম বেলায় লোকেরা যখন আল্লাহ্র পথ সম্পর্কে অজ্ঞ ও গাফেল থাকে তখন নিজেদের মনের যেভাবে হিসাব নেয়, সেই অজ্ঞতা ও গাফলতি কেটে গিয়ে তাদের জীবন যখন উঁচু পর্যায়ে উন্নীত হয় এবং তারা বিদ্যাচর্চা, সৎকাজ সম্পাদন, ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের নিষেধ ইত্যাদি আমল করতে থাকে তখন তাদের মনের হিসাব আরও কঠোরভাবে করতে হবে। আমরা কত তালেবুল ইলম বা দ্বীনী জ্ঞান অর্জনকারীকে দেখেছি যারা মনের হিসাব রাখে না এবং আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধী পথ থেকে আত্মরক্ষা করে না। ফলে নানান জায়গায় তাদের পদস্খলন ঘটেছে এবং মানবতা বিনষ্টকারী আচরণ থেকে তারা নিজেদের হেফাযত করতে পারেনি। মাকরূহ বা অপসন্দনীয় কাজ পরহেয করাতো দূরের কথা, সময়বিশেষে তারা বরং হারামের সাথেও জড়িয়ে পড়ে।
এ ধরনের দ্বীনী জ্ঞান অর্জনকারীরা নিজেদের বিদ্যার উপর নির্ভর করে মনের হিসাব রাখে না। তারা তাদের বিদ্যার বড়াই করে এবং অহংকার বশত কাউকে গ্রাহ্য করে না। হিংসা-বিদ্বেষ, গীবত ও পরনিন্দা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। তারা কুৎসিত কথা ছড়িয়ে বেড়ায় এবং গোপনীয় বিষয় ফাঁস করে দেয়। তারা নিজেদের জন্য এমন এমন মর্যাদার কথা ভাবে যা তাদের ছাড়া অন্যদের জন্য তারা ভাবতেই পারে না। হয়তো এক পর্যায়ে তাদের ভাবনা সঠিক হ'তেও পারে, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তো সকল শ্রেণীর মানুষেরই পাপ-পঙ্কিলতার হিসাব নিবেন। সেক্ষেত্রে বরং তাদের হিসাব হবে আরও কঠোর। তাদের মতো শিক্ষার্থীদের বিদ্যা তাদের কোন উপকারে আসে না। কেননা মুজাহিদের জন্য যেমন তলোয়ার, আমলের জন্য তেমনি বিদ্যা। তলোয়ার ব্যবহার না করলে তা দ্বারা মুজাহিদ কিভাবে উপকৃত হবে? আবার ক্ষুধার্তকে দেখুন, সে ক্ষুধা থেকে বাঁচার জন্য খাদ্য জমা করে। কিন্তু ক্ষুধার সময় যদি সে নাই খেল, তবে আর খাদ্য জমিয়ে কি লাভ! কবি বলেন,
يُحَاوِلُ نَيْلَ الْمَجْدِ وَالسَّيْفُ مُعْمَدٌ * وَيَأْمَلُ إِدْرَاكَ الْعُلَاَ وَهُوَ نَائِمُ
'সে মুজাহিদের সম্মান লাভে প্রয়াসী, অথচ তার তলোয়ার কোষবদ্ধ, সে উচ্চমার্গের নাগাল পেতে আশাবাদী, অথচ ঘুমিয়ে আছে বিছানায়'।
জাহিল-মূর্খদের অবস্থা অনেক সময় এ ধরনের শিক্ষার্থীদের থেকে ভাল হয়ে থাকে। কেননা কিছু কিছু জাহিল-মূর্খ নিজেদের মনের হিসাব করে মন্দ আমলগুলো বের করে ফেলে এবং খেয়াল-খুশীতে মজে গিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনার আগে নিজেদের সংশোধনে সচেষ্ট হয়। অনেক শিক্ষার্থী তাদের শেখা বিদ্যার প্রচার-প্রসার করে না এবং পঠন-পাঠনেও অংশ নেয় না। এটি তাদের একটা বড় ভুল। অথচ এ ভুল যাতে না হয়, সেজন্য তাদের নিজেদের দায়িত্বের হিসাব রাখা আবশ্যক ছিল। আর যারা বিদ্বান বা আলেম তারা নিজেদের মনের হিসাব রাখতে অন্যান্যদের তুলনায় বেশী সমর্থ। আজকাল আমরা ইন্টারনেট, ইউটিউব, টিভি ইত্যাদি মিডিয়াতে প্রচারিত যেসব ভুলে ভরা দ্বীন বিনষ্টকারী ফৎওয়া দেখতে পাই তার কারণ আলেমদের মুহাসাবা বিমুখতা। তারা যদি নিজেদের মনে একবারের জন্যও ভেবে দেখতেন তাহ'লে ফৎওয়া জিজ্ঞাসাকারীদের খেয়াল-খুশী অনুযায়ী তাদের মর্যী মাফিক ঐসব বাজে ফৎওয়া দিতেন না। কাজেই আলেম ও তালেবুল এলেম বা দ্বীন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্য যে কারও তুলনায় নিজেদের মনের হিসাব কঠিনভাবে রাখা উচিত। কেননা তারা যদি নিজেদের মনের হিসাব রাখে তবে নিজেরা উপকৃত হবে এবং জনগণেরও উপকার করতে পারবে। আর যদি নিজেদের মনের হিসাব রাখা ছেড়ে দেয় তবে নিজেরা পথহারা হবে এবং অন্যদেরও পথহারা করবে।

টিকাঃ
৩৪. ইবনুল জাওযী, আল-মুদহিশ, পৃ. ৪৭০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00