📘 আত্মসমালোচনা > 📄 প্রকাশকের নিবেদন

📄 প্রকাশকের নিবেদন


'মুহাসাবা' বা আত্মসমালোচনা মুসলিম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। এর মাধ্যমে একজন মুমিন নিজেই নিজের প্রাত্যহিক কর্মসমূহের হিসাব গ্রহণ করে। অতঃপর যে কাজটি উত্তম ও কল্যাণকর বিবেচিত হয়, তা আগামীতে অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং যে কাজগুলি তার নিজের ও সমাজের জন্য মন্দ ও অকল্যাণকর প্রমাণিত হয়, সে কাজটি পরিত্যাগ করতঃ সাধ্যমত তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের সংকল্প গ্রহণ করে।
আত্মসমালোচনা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে যেমন দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি করে, তেমনিভাবে এটি পরকালীন জওয়াবদিহিতার অনুভূতিকে জাগ্রত করে। এর মাধ্যমে নিজের ত্রুটিগুলো ধরা পড়ে। ফলে আত্মসংশোধনের মাধ্যমে নিজেকে ভবিষ্যতে আরো উন্নত ও তাক্বওয়াশীলরূপে গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
সউদী আরবের প্রখ্যাত ইসলামী বিদ্বান মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ (জন্ম : রিয়ায, ১৯৬০ খ্রিঃ) আত্মসমালোচনা বিষয়ে অত্যন্ত সংক্ষেপে ও সাবলীল ভাষায় সারগর্ভ একটি রচনা উপহার দিয়েছেন। যা তাঁর রচিত 'অন্তরের আমল সমূহ (سلسلة أعمال القلوب) সিরিজের ১২নং ও সর্বশেষ পুস্তিকা হিসাবে المحاسبة শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। রচনাটির বঙ্গানুবাদ মাসিক 'আত-তাহরীক'-এ ধারাবাহিকভাবে (আগস্ট-নভেম্বর ২০১৯ খ্রিঃ) প্রকাশিত হয়েছে। এক্ষণে আল্লাহ্র অশেষ রহমতে তা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করতে পেরে আমরা আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করছি। ফালিল্লাহিল হামদ।
জনাব আব্দুল মালেক (ঝিনাইদহ) বইটি সুন্দরভাবে অনুবাদ করে আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। বইটি 'হাদীছ ফাউণ্ডেশন' গবেষণা বিভাগ কর্তৃক সম্পাদিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। বরাবরের মত এটিও পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আমাদের একান্ত বিশ্বাস।
বইটি পাঠের মাধ্যমে একজন পাঠকও যদি অন্তরের পরিশুদ্ধতা অর্জনে অগ্রসর হন, তাহলে আমাদের শ্রম সার্থক হবে বলে মনে করি। আল্লাহ আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাটুকু কবুল করুন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম জাযা প্রদান করুন- আমীন!
-প্রকাশক

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 লেখকের আরয

📄 লেখকের আরয


সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের পালনকর্তা মহান রাব্বুল 'আলামীনের জন্য। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হৌক নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর, যিনি নবী ও রাসূলকুলের শ্রেষ্ঠ। সেই সঙ্গে ছালাত ও সালাম বর্ষিত হৌক তাঁর পরিবারবর্গ ও ছাহাবীগণের সকলের উপর ।
মনের হিসাব গ্রহণ মুমিনদের জীবন চলার পথ; তাওহীদপন্থীদের চিহ্ন বা প্রতীক এবং আল্লাহ্র প্রতি বিনীত ব্যক্তিদের পরিচয়। ফলে যে মুমিন তার রবকে সমীহ করে চলে, নিজের কথা ও কাজের হিসাব নেয় এবং তার পাপের জন্য স্বীয় রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে সে জানে মনের বিপদ ভয়ানক, তার রোগ-ব্যাধি মারাত্মক, তার চক্রান্ত ভয়াবহ এবং তার অনিষ্টতা ব্যাপক বিস্তৃত।
মন প্রতিনিয়ত মন্দের আদেশ দেয়, কুপ্রবৃত্তির দিকে ধাবিত করে, অজ্ঞতার দিকে ডাকে, ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে চলে এবং অসার ক্রীড়া-কৌতুকে মত্ত করে। তবে আল্লাহ যার উপর দয়া করেন সে তার খপ্পর থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে। সুতরাং মনকে তার প্রবৃত্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তাহ'লে সে তাকে আল্লাহ্ অবাধ্যতার পথে ঠেলে দিবে। যে প্রবৃত্তির দাসত্ব করে প্রবৃত্তি তাকে কুপথে নিয়ে যায়, কুরুচিপূর্ণ কাজের দিকে তাকে আহ্বান জানায় এবং নানা নিন্দনীয় কাজে তাকে লিপ্ত করে।
এজন্য মানুষের উচিত, আল্লাহ্র দরবারে ওযন হওয়ার আগে নিজেই নিজের ওযন করা, তার নিকট হিসাব দেওয়ার আগে নিজেই নিজের হিসাব নেওয়া এবং আল্লাহ্র সামনে নিজেকে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা। মানুষের নিজের হিসাব নিজে গ্রহণ সম্পর্কে যত কথা বলা হয়েছে আমরা এই পুস্তিকায় তার সামান্য কিছু তুলে ধরতে চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
পুস্তিকাটি 'অন্তরের আমল' সম্পর্কে আমার রচিত বারটি ছোট পুস্তিকার শেষ রচনা। মহান আল্লাহ একটি আলোচনা মাহফিলে আমাকে এগুলো আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আলোচনাগুলো তৈরিতে যাদ গ্রুপের (مجموعة زاد) একদল চৌকস জ্ঞানীজন আমাকে সহায়তা করেছিলেন। আল্লাহ্র রহমতে আজ তা ছাপার হরফে বের হ'তে যাচ্ছে। ফালিল্লাহিল হাম্দ।
পরিশেষে আমরা আল্লাহ্র নিকট সদাচার, তাক্বওয়া এবং যা তিনি ভালোবাসেন ও যাতে রাযী-খুশী হন তার যোগ্যতা লাভের আবেদন জানাই- আমীন।
-মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 আত্মসমালোচনার মূল ভিত্তি

📄 আত্মসমালোচনার মূল ভিত্তি


আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তার বান্দাদেরকে নিজের হিসাব নিজে গ্রহণের আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهُ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُوْنَ، وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِيْنَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ، 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেক ব্যক্তির উচিৎ এ বিষয়ে ভেবে দেখা যে, সে আগামী দিনের জন্য কি অগ্রিম প্রেরণ করছে? আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে আত্মভোলা করে দিয়েছেন। ওরা হ'ল অবাধ্য' (হাশর ৫৯/১৮-১৯)।
এই আয়াতের তাফসীরে ইবনু সা'দী (রহঃ) বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তারা যেন ঈমানের দাবী অনুযায়ী কি গোপনে কি প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় তাক্বওয়া অবলম্বন করে, তিনি তাদেরকে শরী'আহ, হুদূদ ও অন্যান্য যেসব বিষয়ে আদেশ-নিষেধ করেছেন তা যেন তারা খুব খেয়াল করে মেনে চলে, কোনটা তাদের পক্ষে আর কোনটা বিপক্ষে যাবে এবং তাদের অর্জিত আমল ক্বিয়ামতের দিন তাদের জন্য কতটা লাভজনক হবে ও কতটা ক্ষতিকর হবে তা যেন তারা ভেবে দেখে। কেননা তারা যখন আখিরাতকে তাদের জীবনের লক্ষ্য ও মনের কিবলা বানাবে এবং আখিরাতের অবস্থানের প্রতি গুরুত্ব দিবে, তখন যেসব আমলের দরুন তারা আখিরাতে একটি ভাল অবস্থান লাভ করতে পারবে তা করতে উঠেপড়ে লাগবে, আর যে সকল বাধা-বিপত্তি তাদের আখিরাতমুখী আমলের গতি রুদ্ধ করবে কিংবা গতিপথ পাল্টে দিবে তা থেকে তাদের আমল পরিচ্ছন্ন রাখতে তারা সচেষ্ট থাকবে। তদুপরি যখন তারা মনে রাখবে যে, আল্লাহ তাদের সব কাজের খবর রাখেন, তাদের কোন কাজই তার নিকট গোপন থাকে না, কোন কাজই তার কাছ থেকে নষ্ট হয়ে যায় না এবং কোন কাজকেই তিনি নগণ্য বা তুচ্ছ ভাবেন না তখন তারা আবশ্যিকভাবে তাদের কাজের গতি বাড়িয়ে দিবে।
এই পবিত্র আয়াত বান্দার নিজের হিসাব নিজে গ্রহণের মূল ভিত্তি। বান্দার কর্তব্য নিজের কাজের খোঁজ-খবর রাখা। কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখতে পেলে তার প্রতিকার হিসাবে সে ভবিষ্যতে কাজটি থেকে পুরোপুরি বিরত থাকবে, ঐ কাজে প্ররোচিত হওয়ার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে তা এড়িয়ে চলবে এবং খালেছ অন্তরে তওবা করবে। যদি সে নিজের মধ্যে আল্লাহ্ কোন আদেশ পালনে অমনোযোগ লক্ষ্য করে তাহ'লে সেই অমনোযোগ কাটাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে এবং আদেশটি যাতে অমনোযোগ কাটিয়ে দৃঢ়তার সাথে যথার্থরূপে সম্পন্ন করা যায় সেজন্য স্বীয় রবের কাছে ব্যাকুল চিত্তে দো'আ করবে। আল্লাহ্র আদেশ পালনে তার অমনোযোগিতা ও অবহেলা সত্ত্বেও তার উপর আল্লাহ পাক কত বেশী অনুগ্রহ ও দয়া করে যাচ্ছেন তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে। এতে তার মধ্যে অবশ্যই নিজের আমলের ঘাটতি দেখে লজ্জা অনুভূত হবে।
বান্দা যদি নিজের আমলের এভাবে হিসাব-নিকাশ ও যাচাই-বাছাই করা থেকে গাফিল ও উদাসীন হয়ে বসে থাকে তাহ'লে তার থেকে বদনছীব ও হতভাগা আর কেউ হয় না। সে তখন ঐ লোকদের শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাবে যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাকে স্মরণ করা ও তার হক আদায়ে গাফলতি করেছে এবং নিজেদের মন ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে তৎপর হয়েছে। ফলশ্রুতিতে তারা সফলতা লাভ করতে পারেনি এবং কোন সুবিধাও অর্জন করতে পারেনি। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাদের নিজেদের যা করা উচিৎ ছিল তা ভুলিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের জন্য যা উপকার ও মঙ্গল বয়ে আনত তার সম্পর্কে তাদেরকে বে-খবর ও উদাসীন করে দিয়েছেন। ফলে তাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মঘাতী ও বাড়াবাড়িমূলক। দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিই এখন তাদের বিধিলিপি। তারা এতটাই প্রতারিত যে তার প্রতিকারের কোন উপায় তাদের হাতে নেই এবং তাদের ভগ্নদশা নিরাময়েরও কোন ব্যবস্থা নেই। কারণ তারা তো ফাসিক বা পাপাচারী'।
আল্লাহ তা'আলা তার প্রিয় কিতাবে বলেছেন, إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُوْنَ 'যারা আল্লাহকে ভয় করে, শয়তানের কুমন্ত্রণা স্পর্শ করার সাথে সাথে তারা সচেতন হয়ে যায় এবং তাদের জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়' (আ'রাফ ৭/২০১)।
মুত্তাকীদের বিষয়ে আল্লাহ বলছেন যে, তারা যখন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কোন পাপ কাজ করে বসে তখন আল্লাহকে মনে করে তার দিকে ফিরে আসে এবং তওবা করে। মুত্তাক্বীরা যত কাজ করে মনে মনে তার হিসাব ব্যতীত এ তওবা ও আল্লাহকে মনে করা আদৌ সম্ভব নয়।

টিকাঃ
৫. তায়সীরুল কারীমির রহমান, পৃ. ৮৫৩।

📘 আত্মসমালোচনা > 📄 মুহাসাবা সম্পর্কে হাদীছের ভাষ্য

📄 মুহাসাবা সম্পর্কে হাদীছের ভাষ্য


শাদ্দাদ বিন আওস (রাঃ) কর্তৃক নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ- 'বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ সেই ব্যক্তি যে নিজের মনকে তার কামনা-বাসনার অনুগামী বানিয়ে দেয় এবং আল্লাহ্র কাছে অহেতুক আশা করে'। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, دَانَ نَفْسَهُ : حَاسَبَ نَفْسَهُ فِي الدُّنْيَا قَبْلَ أَنْ يُحَاسَبَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ 'কিয়ামত দিবসে হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোন ব্যক্তি দুনিয়াতে নিজ মনের হিসাব নেয়'।

টিকাঃ
৬. তিরমিযী হা/২৪৫৯, তিরমিযী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন; ইবনু মাজাহ হা/৪২৬০; মিশকাত হা/৫২৮৯।
৭. ঐ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00