📄 আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রকারভেদ
আত্মনিয়ন্ত্রণ দুভাগে বিভক্ত। এক প্রকারের আত্মনিয়ন্ত্রণ কামনা-বাসনাতে নিপতিত হতে বাধা প্রদান করে। দ্বিতীয় প্রকারের আত্মনিয়ন্ত্রণ সন্দেহ-সংশয় প্রতিরোধক। বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নে পেশ করছি :
প্রথম প্রকার : প্রবৃত্তি প্রতিরোধক আত্মনিয়ন্ত্রণ
প্রবৃত্তির কামনা-বাসনায় পতিত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা প্রত্যেক এমন মুসলিমের মৌলিক ও প্রাথমিক উদ্দেশ্য, যে মুসলিম সিরাতে মুসতাকিমের এ পথে চলতে চায়, চলতে চায় দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে হিদায়াত ও কল্যাণের পথে। বর্তমান বিশ্বে ফিতনা ও মন্দ কাজের প্ররোচক অতি তীব্র মাত্রায় বিদ্যমান। এতে সহজেই অনেকে পতিত হয়ে যায়। ফিতনা-ফাসাদের এ চোরাবালি থেকে বাঁচার জন্য একজন মুসলিমের প্রয়োজন হয় আত্মনিয়ন্ত্রণ-শক্তির। তাকে আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তিতে শক্তিশালী হতে হয়। প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে বাঁচার জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অনেক ধরন ও প্রকরণ রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধরন ও প্রকরণ উল্লেখ করছি :
আল্লাহভীতি
আল্লাহভীতি হারামে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। তিন গুহাওয়ালার ঘটনায় আমরা এমনই দেখেছি। এ তিন ব্যক্তি যখন প্রচণ্ড বৃষ্টির মুখে পড়ে একটি গুহায় আশ্রয় নেয়—হঠাৎ একটি পাথর পড়ে গুহামুখ বন্ধ হয়ে যায়। তারা নিজেদের উত্তম আমলগুলো দিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করেন। তাদের মধ্যকার একজন বলেন:
‘হে আল্লাহ, তুমি জানো, আমার এক চাচাতো বোন ছিল। আমি তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম। তাকে কাছে পাওয়ার আবেদন করলে সে আমাকে নিষেধ করল। এমনকি একদিন তার দুর্দশার দিনটি এল। তাই সে আমার কাছে আসলে তাকে আমি একশত বিশ দিনার দিলাম এ শর্তে যে, সে আমার ও তার মাঝে বাধা সরিয়ে দেবে। সে এমনটাই করল। যখন আমি তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলাম, তার একেবারে ঘনিষ্ঠ হলাম।
তখন সে বলল, "তোমার এ আংটি তার উচিত জায়গা ব্যতীত অন্য কোথ াও খোলা তোমার জন্য হালাল নয়।" এরপর আমি তার ওপর ঢলে পড়া থেকে সরে আসলাম। অথচ সে-ই ছিল মানুষের মাঝে আমার সবচেয়ে প্রিয়। (তাকে এত কাছে পেয়েও আমি কামনাকে নির্বাপণ করলাম।) তাকে ছেড়ে এলাম। এবং ছেড়ে এলাম তাকে দেওয়া আমার স্বর্ণমুদ্রাগুলোও। হে আল্লাহ, যদি তোমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই আমি এমনটা করে থাকি, তবে আমাদের এখন যে অবস্থায় আছি, তা থেকে মুক্তি দিন। তারপর প্রবেশদ্বারের পাথর আরেকটু খুলে গেল।'⁸⁵
হাসান বসরি বলেন:
'এক সময় একজন দুশ্চরিত্রা নারী ছিল। নিজের সময়ের সবচেয়ে সুন্দরী ছিল সে। ১০০ দিনার দেওয়া ব্যতীত তাকে কেউ আপন করে পেত না। এক লোক তাকে একবার এক ঝলক দেখল। এ দেখাতেই সে মোহিত হয়ে পড়ে। লোকটি অনেক পরিশ্রম ও কষ্ট করে একশ দিনার জমা করল। এরপর মহিলাটিকে নিজের করে পেতে সেখানে এল। এসে বলল, “তুমি আমাকে মোহিত করে দিয়েছিলে। তোমাকে দেখার পর আমি অনেক কষ্ট- পরিশ্রমের পর একশ দিনার জমা করেছি।” মহিলাটি বলল, “এগুলো খানাসামাকে দিয়ে দাও, সে গুনে যাচাই করে নেবে।” লোকটি এমনই করল। এরপর মহিলাটি বলল, “আসো।” মহিলাটির একটি সজ্জিত ঘর ছিল। সেখানে একটি স্বর্ণের খাট ছিল। ঘরে আসলে মহিলাটি বলল, “আসো।” এভাবে লোকটি যখন বিশ্বাসঘাতকদের মতো করে মহিলার সাথে বসল, তখনই তার আল্লাহর পর্যবেক্ষণের কথা স্মরণ হলো। সাথে সাথে সে ভীত-আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তার কামনা-বাসনা নির্বাপিত হয়ে যায়। সে বলল, “আমাকে ছেড়ে দাও। আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। এ একশ দিনার তোমার।” মহিলাটি বলল, “তোমার কী হলো! তুমি আমাকে দেখলে। যেমন তুমি দাবি করেছ যে, আমার রূপে তুমি মোহিত হয়েছ। তারপর কষ্ট-পরিশ্রম করে এ একশ দিনার জমা করেছ। আর এখন যখন আমি তোমার হচ্ছি, তখন তুমি এমন করছ।”
সে বলল, “আমার অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়েছে। আমি আল্লাহর পর্যবেক্ষণের কথা স্মরণ করছি।”
মহিলাটি বলল, “যদি তুমি সত্য বলে থাকো, তবে আমি তোমাকে ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে বিয়ে করব না।”
সে বলল, “আমাকে ছেড়ে দাও। আমি বের হয়ে যাচ্ছি।” - না। যতক্ষণ না তুমি আমার কাছে একটি প্রতিজ্ঞা করো—তুমি আমাকে বিয়ে করবে। - না। যাবৎ না আমি বেরিয়ে যাই, আমি কোনো প্রতিজ্ঞা করছি না। - তোমাকে আল্লাহর কসম করে বলছি। আমি যদি তোমার কাছে আসি, তুমি আমাকে বিয়ে করে নেবে।
সম্ভবত এ বলে লোকটি নিজের কাপড়ে ছদ্মবেশ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে এবং নিজ শহরে চলে যায়।
ওদিকে মহিলাটি তার এ লজ্জার দুনিয়া ছেড়ে লজ্জিত অবস্থায় লোকটির শহরে এসে উপস্থিত হয়। তার নাম ও ঠিকানা বলে তার খোঁজ করতে থাকে। অবশেষে তার ঠিকানা পেয়ে যায়। লোকেরা মহিলাকে সে পুরুষটিকে দেখিয়ে দেয়। তাকে বলে, “সে মহারানি তোমার খোঁজে স্বয়ং এসেছে।” এ লোকটি মহিলাকে দেখেই অঝোরে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে সে মৃত্যুবরণ করে। মহিলার সামনেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মহিলাটি তখন বলল, “হায়, একে তো আমি পেলাম না, তার কি কোনো নিকটাত্মীয় আছে?” বলা হলো, “হ্যাঁ, তার একজন ভাই আছে। সে দরিদ্র।” মহিলা বলল, “তার ভাইয়ের ভালোবাসায় আমি তাকে বিয়ে করব। এরপর তাদের বিয়ে হলো। তাদের ঘরে সাতটি সন্তান হলো।'⁸⁶
এক বেদুইন নিজের ঘটনা বলেন। 'এক নিকষকালো অন্ধকার রাতে আমি বের হলাম। হঠাৎ আমার সামনে দেখলাম এক তরুণী। এ কোনো সাধারণ তরুণী নয়, এ যে অনিন্দ্যা সুন্দরী। আমি তাকে নিজের করে পেতে চাইলাম।
সে আমাকে বলল, “তোমার ধ্বংস হোক। তোমার কি বুদ্ধি-সুদ্ধি কিচ্ছু নেই। তোমার বিবেক কি তোমাকে বাধা দেয় না? তোমার দ্বীনদারিতা কি এতই তলানিতে ঠেকেছে যে, দ্বীনদারিতা তোমাকে নিষেধ করে না?”
আমি তাকে বললাম, “আরে রাখো তো! আমাদের কেবল তারকাই দেখতে পাচ্ছে। কেউ আমাদের ব্যাপারে জানবে না।”
সে বলল, “তাহলে তারকার সৃষ্টিকর্তা কোথায়? তিনি কি আমাদের দেখছেন না?”⁸⁷
সাওম পালন করা
জিনার মতো অশ্লীল ও ধ্বংসাত্মক পাপে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করে সিয়াম সাধনা। তাই তো নবিজি এটিকেই জিনার বিপরীতে চিকিৎসা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা নবিজি-এর সাথে ছিলাম, তখন তিনি বললেন :
مَنِ اسْتَطَاعَ البَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ، فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءُ
“যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে নেয়। কেননা, এটি দৃষ্টিকে অধিক অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন সাওম পালন করে। কেননা, সাওম প্রবৃত্তিকে দমন করে।””⁸⁸
ইবনুল কাইয়িম বলেন :
‘রাসুল এখানে জিনা থেকে বাঁচার উপায় বলেছেন, এ রোগের প্রতিষেধক বাতলে দিয়েছেন। আর সেটা হলো, বিয়ে করে নেওয়া। কিন্তু কেউ যদি বিবাহের সামর্থ্য না রাখে, তবে পূর্বে বর্ণিত প্রতিষেধকের বদলা হিসেবে বাতলে দিয়েছেন আরেকটি প্রতিষেধক। আর সেটা হলো, সাওম পালন করা। আর কেউ যদি বিবাহ করতে অসমর্থ হয়, তবে সে সাওম পালন করবে।
কেননা, সাওম যৌন-উন্মাদনা দমন করে। সাওম কামনার গতিপথ সংকীর্ণ করে দেয়। আর কামনা ও যৌন-উন্মাদনা বেশি খাওয়া ও খাবারের ধরনের কারণে বৃদ্ধি পায়। খাবারের পরিমাণ ও ধরন-প্রকরণ কামভাব উৎপন্ন করে। অন্যদিকে সাওম এ কামভাবকে সংকীর্ণ ও সীমিত করে দেয়। এভাবে সাওমের মাধ্যমে যৌনউদ্যমতায় লাগام থাকে। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই যারা সাওম পালনে অভ্যস্ত হন, তারা যৌন-উন্মাদনা থেকে মুক্ত থাকেন এবং তাদের কামভাব নিয়ন্ত্রিত থাকে।⁸⁹
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন : الصِّيَامُ جُنَّةٌ 'সাওম ঢালস্বরূপ। '⁹⁰ তথা সাওম মন্দ থেকে রক্ষাকারী । গুনাহ থেকে মুক্তকারী। সাওম কামনা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত উত্তেজনা থেকে রক্ষা করে। রক্ষা করে হারামে লিপ্ত হওয়া থেকে, পাপের চোরাবালিতে নিমজ্জিত হওয়া থেকে।
কুরতুবি বলেন: ‘যখনই খাবারদাবার কমে আসবে, তখন কামভাবও দুর্বল হয়ে যাবে। আর যখনই কামভাব দুর্বল হয়ে যাবে, তখন গুনাহ ও পাপ কমে যাবে। '⁹¹
আত্মসম্মান ও পুরুষত্ব
অনেকে অনেক সময় গুনাহকে এ কারণে ত্যাগ করে যে, গুনাহর মাঝে কেবল হীনতা ও নিকৃষ্টতা বিদ্যমান। তাদের পুরুষত্ব ও আত্মসম্মান গুনাহ থেকে তাদের বাঁচিয়ে দেয়।
مَا أَنْ دَعَانِي الْهَوَى لِفَاحِشَةٍ * إِلَّا نَهَانِي الحَيَاءُ وَالكَرَمُ فَلَا عَلى فَاحِشٍ مَدَدْتُ يَدِي * وَلَا مَشَتْ بِي لِرِيبَةٍ قَدَمُ
'যদিও প্রবৃত্তি আমায় অশ্লীলতায় লিপ্ত করতে চায়, কিন্তু লজ্জা ও মহত্ত্ব বাধা দিয়ে রাখে আমায়।
তাই না কোনো অশ্লীলতার প্রতি হাত বাড়াই আমি, না কোনো সংশয়-পথে এক কদম চলি।'⁹²
উম্মে সালামাহ। স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন। যখন তিনি স্বামী আবু সালামাহ এক-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন, তিনি মদিনা পানে সফর শুরু করলেন। তিনি নিজেই বলছেন, “স্বামীর উদ্দেশ্যে আমি বের হলাম। আমার সাথে আল্লাহর সৃষ্টি হতে একজন বান্দাও ছিল না। কিন্তু যখন আমি তানইম পৌঁছলাম। সেখানে উসমান বিন তালহাকে দেখলাম। তিনি আমাকে বললেন, “হে আবু উমাইয়ার কন্যা, কোথায় যাচ্ছেন?”
আমি বললাম, “মদিনায়। আমার স্বামীর কাছে।”
তিনি বললেন, “আপনার সাথে কেউ নেই?”
- “না, আল্লাহর কসম! আমার সাথে কেবল আমার এ সন্তানটি আছে।”
- আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে এভাবে একাকী ছেড়ে দেওয়ার নই।
তিনি আমার উটের লাগাম ধরলেন। আমার সাথে আমার গন্তব্যের উদ্দেশে চললেন। আল্লাহর শপথ! আমি কখনো তার মতো মহত্ত্ববান পুরুষ দ্বিতীয়টি দেখিনি। যখনই কোনো মনজিলে আমরা পৌঁছতাম। তিনি উটকে বসাতেন। তারপর দূরে গিয়ে দাঁড়াতেন। যখন আমি নামতাম, তিনি আমার উট নিয়ে দূরে যেতেন। উটের ওপর থেকে সামান নামাতেন। তারপর তাকে একটি গাছের সাথে বেঁধে রাখতেন। এরপর দূরে সরে অন্য গাছের দিকে যেতেন। আমি সেখানে শুয়ে পড়তাম। যখন যাওয়ার সময় হতো, তিনি আমার উটের পাশে আসতেন। উটকে সফরের জন্য প্রস্তুত করতেন। এরপর দূরে সরে যেতেন। এবং বলতেন, “চড়ন।” যখন আমি উটে সওয়ার হতাম, তিনি এসে উটের লাগাম ধরতেন। উটকে নিয়ে সামনে চলতেন। এভাবে আমার সফর শেষ হওয়া পর্যন্ত। মদিনায় পৌঁছলে তিনি মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন।’
নিষ্কলুষতা, আত্মমর্যাদাবোধ, আত্মসম্মান, পুরুষত্ব—এ সবই ছিল উসমান বিন তালহার মাঝে। তিনি একজন নারীর তত্ত্বাবধান করলেন। এমনকি তাকে তার স্বামীর নিকট পৌঁছে দিলেন। পৌঁছে দিলেন সে নারীর কোনো প্রকার ক্ষতি বা সামান্য খিয়ানত করা ব্যতীতই। স্থান ছিল নীরব-নিস্তব্ধ। কোনো মানুষের নেই কোনো অস্তিত্ব। ছিল আকর্ষণ। ছিল শত প্ররোচনা।...তবুও তাকে কোন বিষয়টি বিরত রেখেছে?
তখনকার সময়ে উসমান ও অন্য আরবরা এমনই ছিলেন। তারা নারীদের যথাযথ সম্মান করতেন। তাদের পবিত্রতা রক্ষা করতেন। এটা করতেন তারা নিজেদের আত্মসম্মান থেকে, নিজেদের পুরুষত্ব-বলে। এ নিয়ে গর্বও করতেন তারা। এটা তাদের মাঝে গর্ব করার একটি বিষয় ছিল।⁹³
আবু উমামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক যুবক নবিজি -এর কাছে এসে বললেন:
- হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে জিনা করার অনুমতি দিন।
লোকেরা তার অভিমুখী হলেন। তাকে আচ্ছামতো ধমকালেন। থামো। থামো।
রাসুল বললেন, “তাকে আমার নিকটবর্তী করো।”
যুবকটি রাসুলের নিকটবর্তী হলো। তাঁর সামনে বসল। তিনি বললেন :
- কেউ তোমার মায়ের সাথে এমন করবে—তুমি কি তা পছন্দ করো?
- না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন।
মানুষও তাদের মায়েদের ক্ষেত্রে এমনটা পছন্দ করে না। তুমি কি তোমার মেয়ের ক্ষেত্রে এমনটা পছন্দ করো?
না, আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে আল্লাহ আপনার জন্য উৎসর্গ করুন।
মানুষও তাদের মেয়েদের ক্ষেত্রে এমনটা পছন্দ করবে না। তুমি কি নিজের বোনের ক্ষেত্রে এমনটা পছন্দ করো?
না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন।
মানুষও তাদের বোনদের ব্যাপারে এমনটা পছন্দ করে না। তুমি কি তোমার ফুফুর ব্যাপারে এমনটা পছন্দ করো?
না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন।
অন্য মানুষও তাদের ফুফুদের ব্যাপারে এমনটা পছন্দ করে না। তুমি তোমার খালার ব্যাপারে এমনটা পছন্দ করো?
না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন।
মানুষও তাদের খালাদের ব্যাপারে এমনটা পছন্দ করে না।
এ কথা বলে রাসুল যুবকের ওপর হাত রাখলেন। বললেন, “হে আল্লাহ, তার গুনাহ ক্ষমা করে দিন। তার অন্তর পবিত্র করে দিন। তার যৌবনের সংরক্ষণ করুন।"
এরপর থেকে সে যুবক কোনো কিছুর দিকে ভ্রূক্ষেপ করতেন না। '⁹⁴
একজন মুমিন হারাম কাজ পরিত্যাগ করবে। নিজেকে কামনা-বাসনা থেকে নিয়ন্ত্রণ করবে। লজ্জা ও বদনামের ভয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সে মনে মনে বলবে, যদি আমি এমনটা করি, তবে মানুষ আমার দোষ রটাবে। আমার ত্রুটি সবার মুখে মুখে থাকবে। তাদের মাঝে আমি হবো খারাপ লোকদের উদাহরণ। তাদের মাঝে আমার আর কোনো মর্যাদা-সম্মান থাকবে না। এরপর আমি মরে পার পেলেও, তারা আমার সন্তানের মর্যাদাও হানি করবে।
এভাবে তার মাঝে আত্মসম্মান হারানোর চিন্তা থাকে। তাই সে পুরুষত্বে বলীয়ান হয়ে আত্মসম্মানের খাতিরে পাপকর্ম বর্জন করে।
যে অপমানজনক এ সকল কর্মের ফলাফল নিয়ে ভাববে—দুনিয়াতে এ পাপকর্ম তার লাঞ্ছনা ত্বরান্বিত করবে, তাকে অপমানিত করবে—এমন যথাযথ ভাবনা তাকে পাপ কর্ম থেকে পিছিয়ে দেবে।
নিজের আত্মা তাকে বলবে :
প্রতিদান কাজের ফলে আসে। যেমন কর্ম তেমনই ফল। সাবধান! জিনা দারিদ্র্যের কারণ। জিনা অন্তরের আলো দূর করে দেয়। অন্ধকারের প্রতি ধাবিত করে। মানুষ ছি ছি করবে। হত্যার চেয়ে নিকৃষ্ট এর কুফল। তাই তো জিনার সবচেয়ে কঠিন স্তরে উপনীত হলে হত্যার বিধান।
যখন সে নিজের বিবেকের এমন কথা শুনবে, তখন পাপকর্মের কুফল নিয়ে সে ভাববে। ভয় করবে। এভাবে তার মনের মাঝে থাকা পাপের প্ররোচনা বিদায় নেবে। কারণ কেউই তো দুনিয়ার লাঞ্ছনা চায় না। আশা করা যায়, এভাবে একসময় আল্লাহকে সে ভয় করতে শিখবে।
রোগভীতি
অনেক মানুষ রোগাক্রান্ত হওয়ার ভয়ে গুনাহ থেকে বিরত থাকেন। কারণ, অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়ার অর্থ রোগ ডেকে আনা। পশ্চিমা দেশের যারা জিনা থেকে দূরে আছে, তারা তাদের শরীর-স্বাস্থ্যকে রোগাক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে জিনা থেকে দূরে থাকছে।
একটা ঘটনা বলছি, এক নারী দেখল, তাদের ঘরের পরিচারিকা অবাধ্য হচ্ছে। তার সামনে উচ্চ আওয়াজে কথা বলছে। কোনো কাজ করতে বললে ঠিকমতো করছে না। স্বামীকে এ বিষয়ে বললে স্বামী এ বলে পাশ কাটিয়ে যায় যে, সে তো এক দরিদ্র মেয়ে। তার ওপর নিজ দেশ ছেড়ে এখানে আছে। খামোখা, কেন তার ওপর এত চটছ!
একসময় সে নারীর কাছে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হলো। তার স্বামী ও সে পরিচারিকার মাঝে একটা হারাম সম্পর্ক চলছে। জেনেও সে চুপ থাকল। কিছুদিন সে সহ্য করে গেল। বেশি সময় তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। একদিন তার স্বামী কাজের জন্য শহরের বাইরে গেল। সে নারী সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরিচারিকাকে বিদায় করল। তার দেশে তাকে পাঠিয়ে দিল।
সাহেব যখন ঘরে ফিরে পরিচারিকাকে দেখল না, তখন জানতে চাইল যে, সে কোথায়? স্ত্রী তাকে জানাল যে, পরিচারিকার এইডস হয়েছিল। রোগ ধরা পড়ার পর সে তার দেশে চলে গেছে।
এ কথা শুনে তো লোকটি বড় চিন্তায় পড়ে গেল। প্রচণ্ড উদ্বেগ পেয়ে বসল তাকে। এমনকি এ চিন্তা-উদ্বেগে তার ওজন ২০ কেজি কমে গেল। সে ছেলে-মেয়েদের জড়িয়ে ধরছে। কান্নাকাটি করে চলছে। কারণ মৃত্যু তো তার সন্নিকটে। নিজ স্ত্রী থেকেও দূরে সরে গেল-যেন রোগটা আবার তাকে না পেয়ে বসে।
একসময় মহিলা নিজের প্রতিশোধস্পৃহার নির্বাপণ বুঝতে পেল। এবার স্বামীকে পুরো ঘটনাটি বলল। স্বামী তার ভুল স্বীকার করে নিল। স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইল। তাকে নিশ্চয়তা দিল-এমন আর কখনো হবে না। বরং আগের চেয়ে এখন থেকে তাদের দাম্পত্য জীবন আরও উন্নত হবে। এরপর তারা নিজেদের এ অবস্থার ওপর অটল থাকল।
লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়
পাপ বর্জনের মৌলিকত্ব হচ্ছে-মুমিন আল্লাহর ভয়ে, আল্লাহর শাস্তির ভয়ে পাপ বর্জন করে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কখনো কখনো গুনাহ হয়ে যায়। কোনো কোনো সময় আল্লাহভীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন লাঞ্ছিত হওয়ার ভয় তাকে পাপ থেকে বাঁচাতে পারে।
অনেক যুবক ইন্টারনেটে অভ্যস্ত। বিভিন্ন উপকারী ইলমের জন্য তারা বিভিন্ন দাওয়া ফোরামে প্রবেশ করে। কিন্তু কখনো কখনো শয়তান বা নফসের প্ররোচনায় তার পদস্খলন ঘটে। তাহলে এ ক্ষেত্রে কী করা?
উত্তর হলো, কম্পিউটারটি ব্যক্তিগত কক্ষ থেকে সরিয়ে এমন রুমে নিয়ে আসতে হবে—যেখানে সবার সামনে থাকবে সে। সেখানে পিতা-মাতা, ভাই-বোনদের যাতায়াত থাকবে। ফলে হঠাৎ করে প্ররোচনা এলেও লজ্জা ও লাঞ্ছনার ভয়ে সহজে সে প্ররোচনা দমাতে পারবে।
হতে পারে এ কথাটিও তাদের আতত্মনিয়ন্ত্রণ শক্তি বৃদ্ধি করবে যে, তার জানা উচিত—সে যা কিছুই কম্পিউটার বা মোবাইলে সেভ করে। তা আবার সহজেই ফিরিয়ে আনা যায়। এমনকি যদি সে পরিপূর্ণরূপে এগুলো ডিলিট করেও দেয়, তবুও এমন সফটওয়ার আছে, যা মোছা এ জিনিসগুলোকে পুনর্বার ফিরিয়ে আনতে পারে।
পশ্চিমা এক টেকনিশিয়ান বলে, মানুষ জানেও না যে, আজ তারা নিজেদের কতটা অন্যের কাছে প্রকাশ করে দিচ্ছে এ সকল মোবাইল-ফোনের মাধ্যমে। এ বিপদটা তখন আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যখন মোবাইল বা কম্পিউটারের ডাটাগুলো বিশেষ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা যায় এবং এ প্রোগ্রামগুলো ইন্টারনেটের পাতায় সহজে পাওয়া যায়।
তাই কেউ একজন বলেছিলেন, বিক্রির চিন্তা বাদ দিয়ে হাতের ফোনটিকে পায়ের তলায় ফেলে মাটি চাপা দেওয়া বা এসিডে ডুবিয়ে একেবারে অকেজো করা ফেলা উত্তম। ⁹⁵
এ সকল বিষয়ই তো একজন মুসলিম যুবকের মনে লজ্জা ও লাঞ্ছনার ভয় আনতে যথেষ্ট। লজ্জা-লাঞ্ছনার ভয়ে সে তার মোবাইল বা কম্পিউটারে নোংরা-অশ্লীল ছবি-ভিডিও দেখা ও রাখা থেকে বিরত থাকবে।
পাপের ক্ষতি নিয়ে চিন্তা করা
ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন:
'যে ব্যক্তি কামনা-বাসনা চরিতার্থ করে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সুখ দেয়, সে যেন নিজের আত্মার মাঝে লজ্জার শিকড় প্রোথিত করেছে। '⁹⁶
আব্দুস সামাদ আজ-জাহিদ বলেন:
'যে ব্যক্তি এ কথা মানে না যে, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা এক চোরাবালি— সে তো কেবল আমুদে লোকই। '⁹⁷
হারামে লিপ্ত হলে অনেক ক্ষতি ও কষ্ট ত্বরান্বিত হয়। এটা জানাই একজন মানুষের সামনে হারামে লিপ্ত হওয়ার পথে বাধা ও প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষতি ও কষ্টের স্বরূপ বোঝার জন্য গুনাহের ফলে অন্যের যে ক্ষতি ও কষ্ট আপতিত হয়েছে, তা নিয়ে চিন্তা করে দেখাই যথেষ্ট। গুনাহের ফলে অতীত সম্প্রদায়গুলোর ওপর কী ক্ষতি ও বিপদাপদ আপতিত হয়েছে, সেটা দেখাই যথার্থ।
আমাদের আদি পিতা-মাতাকে নিয়ামত, স্বাদ-উপভোগ, আনন্দের সে অনুপম স্থান জান্নাত থেকে কষ্ট ও চিন্তার এ দুনিয়ায় কোন জিনিসটি বের করে এনেছে? হ্যাঁ, সেটা গুনাহই বের করে এনেছে।
ইবলিসকে কোন জিনিসটি আসমানের সে রাজ্য থেকে বের করে দিয়েছে? কোন জিনিসটির কারণে সে বিতাড়িত, লাঞ্ছিত, অভিশপ্ত হয়েছে? কোন কারণে তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সবকিছুই বিকৃত করে দিয়েছে? তাকে করেছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট? যে ইবলিস একসময় ছিল নিকটের, আজ সে রহমতের ছায়া থেকে কত দূরে, রহমত পাওয়ার পরিবর্তে বঞ্চিত হয়েছে রহমত থেকে। উপযুক্ত হয়েছে জ্বলন্ত অগ্নির। আল্লাহর কাছে হয়েছে সর্বনিকৃষ্ট, সবচেয়ে তুচ্ছ। হয়েছে পাপী, অপরাধী। হয়েছে এমন পাপী, যে সমস্ত মানবের অনিষ্ট ও অকল্যাণের পাপের পথের নেতৃত্বদানকারী। এসব কোন কারণে হয়েছে সে? হ্যাঁ, এমনটা হয়েছে গুনাহের কারণেই।
কোন কারণে পৃথিবীবাসী পানিতে নিমজ্জিত হয়েছিল? কোন কারণে সে আজাবের পৃথিবীর পানি পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল?
কীসের কারণে আদ জাতির ওপর অকল্যাণকর বায়ু চেপে বসেছিল, ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠে আছড়ে মারা হয়েছিল তাদের?
কেন সামুদ জাতির ওপর বজ্র আঘাত করেছিল এবং তাদের হৃদয়গুলো তাদের পেটে সিঁধিয়ে গিয়েছিল?
কীসের কারণে লুত আ.-এর গ্রাম সাদুমকে আকাশ ঊর্ধ্বে তোলা হয়েছিল যে, ফেরেশতারা পর্যন্ত সে গ্রামের কুকুরগুলোর নিনাদ শুনছিল? অতঃপর তাদের উল্টো করে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের ওপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করা হচ্ছিল এবং সে গ্রামে এভাবে পচন ধরে যে, সেখানে কোনো প্রাণী পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে?
কীসের কারণে শুআইব আ.-এর কওমের ওপর মেঘের ছায়ার মাঝে আজাব এসেছিল, যখন তাদের মাথার ওপর সে মেঘ এসে পড়ল, তখন সে মেঘ তাদের ওপর প্রজ্বলিত অগ্নি বর্ষণ করতে থাকল?
কোন কারণে ফিরাউন ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোগুলো সাগরের পানিতে ডুবে মরল, অতঃপর তাদের রুহগুলো (সিজ্জিন) জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হলো এবং যেখানে তাদের ওপর সকাল-সন্ধ্যা জাহান্নামের শাস্তি আপতিত হচ্ছে? তাদের দেহগুলো তো নিমজ্জিত হওয়ার শাস্তি পেয়েছে। আর রুহগুলো পাচ্ছে দগ্ধ হওয়ার শাস্তি। আর কিয়ামত দিবসে তাদের জাহান্নামে প্রবেশের ওয়াদা বাস্তবায়িত হবে।⁹⁸
এ সকল আজাব, এ সকল শাস্তি, সবই রবের অবাধ্যতা করার কারণে ও তাকওয়া পরিত্যাগ করার কারণে। এসব ক্ষতি নিয়ে চিন্তা করা তাকওয়ার পথে আমাদের এগিয়ে দেবে। যদিও এ সকল গুনাহের মাঝে সাময়িক কিছু স্বাদ-উপভোগ রয়েছে।
চিন্তা করে দেখুন, পাপকর্মে আনন্দ কতটুকু আর শাস্তি ও কষ্ট কতটুকু? চিন্তা করে দেখুন, পাপকর্মে সুখ কতটুকু আর বিপদ কতটুকু? আপনার এ চিন্তা আপনাকে তাকওয়ার পথে ফিরে আসতে সাহায্য করবে, আপনাকে তাকওয়ার সৌভাগ্যময় পথে পরিচালিত করবে। মিসআর বিন কিদাম বলেন :
تَفْنَى اللَّذَاذَةُ مِمَّنْ نَالَ صَفْوَتَهَا * مِنَ الْحَرَامِ وَيَبْقَى الْإِثْمُ وَالْعَارُ
تَبْقَى عَوَاقِبُ سُوءٍ فِي مَغَبَتِهَا " لَا خَيْرَ فِي لَذَّةٍ مِنْ بَعْدَهَا النَّارُ
'হারামে লিপ্ত হয়েছি, মজা পেয়েছি, স্বাদ আস্বাদন করেছি, কিন্তু তার স্বাদ বাকি থাকে কি? স্বাদ তো উবে যায়, রেখে যায় পেছনে পাপ ও লজ্জা।
থেকে যায় হারাম কর্ম, হারাম ভোগের শাস্তি। যে স্বাদ আস্বাদনের পরে দোজখের আগুন অপরিহার্য, সে স্বাদে কোনো কল্যাণ নেই, জেনে নিও। '⁹⁹
এক ব্যক্তি কোনো নারীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিল। মহিলাটি গর্ভধারণ করলে সে পেরেশান হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল না, এখন কী করবে—সে কি মহিলাকে বিবাহ করবে এবং তার গোত্রের লাঞ্ছনার সম্মুখীন হবে, না সে সন্তানকে তার গর্ভে থাকতেই হত্যা করবে? কিন্তু এটা তো আরেকটি ভীষণ পাপকর্ম। এক পাপ করেছিল জিনা করে, এখন গর্ভের সন্তানকে হত্যা করে দ্বিতীয় পাপ করবে! নাকি সে মহিলাকে ও তার সন্তানকে এভাবে রেখে চলে যাবে এবং মা ও সন্তানকে গৃহহীন করে রাখবে? প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তো বিপদ ও কষ্ট অবধারিত! এ তো কেবল পাপের পরে আপতিত হওয়া ক্ষতির এক ধারাবাহিকতা।
যদি এ ব্যক্তিটি হারাম কর্মে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে তার শান্তি ও অবধারিত বিপদের কথা চিন্তা করত, তবে এ চিন্তা তাকে প্রথমেই হারাম ত্যাগের প্রতি পরিচালিত করত।
আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রকারভেদ আলোচনায় প্রথম প্রকারের আলোচনা এখানেই সমাপ্ত করছি। এখন আমরা দ্বিতীয় প্রকারের আলোচনা শুরু করছি।
দ্বিতীয় প্রকার: সন্দেহ-সংশয় প্রতিরোধক আত্মনিয়ন্ত্রণ
সন্দেহ-সংশয় একজন মুমিনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এ সন্দেহ- সংশয় মুমিনের জন্য অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়। কয়েকভাবে আমরা সন্দেহ-সংশয় থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। সন্দেহ-সংশয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রতিরোধক হলো :
প্রবৃত্তি ও মন্দ চিন্তাধারার প্রাধান্য বিস্তার প্রতিরোধ করা
প্রতিটি মানুষকে প্রথমেই জানতে হবে, কীভাবে তার প্রবৃত্তি তার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। প্রবৃত্তির প্রাধান্য বিস্তার ঠেকানো যায় মন্দ চিন্তার ও মন্দ ঝোঁকের চিকিৎসা করার মাধ্যমে। যখনই কোনো পাপের চিন্তা বা কোনো মন্দ কাজের চিন্তা মনের মাঝে উদয় হবে, তখনই তাকে প্রতিহত করতে হবে। কারণ কাজের শুরুই হয় চিন্তা-ভাবনা থেকে। চিন্তা-ভাবনাই কাজের প্রথম ভিত্তি।
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষের অন্তরকেই শয়তানের সৈন্যরা পরাজিত করে রেখেছে, পদানত করে রেখেছে, রেখেছে দখল করে। শয়তানের এ দুষ্ট সৈন্যরা সে পরাজিত অন্তরকে ওয়াসওয়াসা ও কুমন্ত্রণায় ভরে দিয়েছে। এ কুমন্ত্রণাই তাদের হারাম কর্মে প্ররোচিত করে।
জারির বিন উবাইদা বলেন, 'আমি আলা বিন জিয়াদ-এর নিকট অভিযোগ করলাম—আমি নিজের অন্তরে কোনো ওয়াসওয়াসা খুঁজে পাই না কেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'তোমার অন্তরের এ অবস্থা এমন ঘরের মতো, যার পাশ দিয়ে ডাকাত গমন করেছে। যদি সে ঘরে কিছু থেকে থাকে, তবে তারা হরণ করে নিয়ে যায়। আর যদি কিছু না থাকে, তবে ঘরকে রেখে চলে যায়। '¹⁰⁰
কেবল আল্লাহর জিকির ও আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা শয়তানের এ ওয়াসওয়াসাকে মুছে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
'যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, শয়তান যখন তাদের কুমন্ত্রণা দেয়, সাথে সাথে তারা আত্মসচেতন হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাদের জ্ঞানচক্ষু ফিরে পায়। '¹⁰¹
مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ [আমি আশ্রয় প্রার্থনাকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।] আয়াতের তাফসিরে মুজাহিদ বলেন, 'শয়তানের এ কুমন্ত্রণা অন্তরের মাঝে বিস্তৃত হয়ে যায়। যখন কোনো মুমিন আল্লাহর স্মরণ করে তখন লুকিয়ে যায়, গুটিয়ে যায়। কিন্তু যখনই মুমিন আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্যমনস্ক হয়ে যায়, সে কুমন্ত্রণাও অন্তরের মাঝে প্রসারিত হতে থাকে। '¹⁰²
মন্দ চিন্তাকে প্রশ্রয় না দেওয়া
মন্দ চিন্তার প্রতি প্ররোচিত না হলে মন্দ চিন্তার উদয় হওয়া ক্ষতিকর হয় না। মন্দ চিন্তা তখনই ক্ষতিকর হবে, যখন তার প্রতি সাড়া দেওয়া হবে। তার সাথে কথোপকথন করা হবে। মন্দ চিন্তার উদাহরণ হচ্ছে, একজন চলন্ত পথিকের মতো। যে পথিক রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে। যদি তাকে কেউ না ডাকে, তবে সে পথিক নিজের রাস্তায় নিজেই চলে যায়। রাস্তার আশপাশের মানুষকে ছেড়ে নিজের মতো চলে যায়। আর যদি আপনি তাকে ডাকেন, তবে সে আপনার সাথে কথা বলে আপনাকে জাদুগ্রস্ত করে দেবে, ধোঁকা ও প্রবঞ্চনায় আঁটকে দেবে।
এক ব্যক্তি নবিজি-এর নিকট এসে বললেন :
إِنِّي أُحَدِّثُ نَفْسِي بِالْحَدِيثِ، لَأَنْ أُخِرَّ مِنَ السَّمَاءِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَتَكَلَّمَ بِهِ، قَالَ: ذَلِكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ
'নিশ্চয় আমি নিজে নিজে এমন কথা চিন্তা করি, সে কথা বলার চেয়ে, আকাশ থেকে পড়ে গিয়ে মরে যাওয়া আমার কাছে শ্রেয় মনে হয়।' রাসুল বললেন, 'সেটাই স্পষ্ট ইমান।'¹⁰³
রাসুল বলেন:
يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا، مَنْ خَلَقَ كَذَا، حَتَّى يَقُولُ : مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ
'শয়তান তোমাদের কারও কাছে এসে বলে, “এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে?” এমনকি শেষ পর্যন্ত সে বলে, “তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে?” তাই যখনই সে এ পর্যন্ত কাউকে নিয়ে যায়, তখন সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং বিরত থাকে। ¹⁰⁴
ইবনুল কাইয়িম বলেন :
'আল্লাহ তাআলা নফসের সৃষ্টির সাথে পেষণযন্ত্রের মিল রেখেছেন। পেষণযন্ত্র সব সময় ঘুরতে থাকে। কখনো তার সুস্থির থাকা হয় না। কখনো তা অকর্মা পড়ে থাকে না। যদি তাতে একটি দানা রাখা হয়, তবে তা পিষে দেয়। যদি তাতে মাটি বা কঙ্কর দেওয়া হয়, তাও پেষণযন্ত্র পিষে দেয়। অন্যদিকে মনের মাঝে যে চিন্তাধারা ঘুরপাক খায়, সে চিন্তাধারা পেষণযন্ত্রের সে দানার মতো। মানুষ পেষণ যন্ত্রে শস্যদানা রাখলে তা থেকে শস্যচূর্ণ বের হয়। এ থেকে পেষণকারী নিজেও উপকৃত হয়, অন্য দশজনও উপকার পায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এমন উপকারী শস্যের স্থলে বালি, কঙ্কর, ঘাসের মতো প্রভৃতি অনর্থক বস্তু দিয়ে পেষণযন্ত্র ভরে ফেলে। তাই যখন রুটি তৈরির জন্য ময়দার তাল বানানোর সময় হয়, তখন তার সামনে চূর্ণিত বস্তুর প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায়।
মনের মাঝে উদিত চিন্তার সামনে আরও কয়েকটি স্তর থাকে স্বাভাবিকভাবে। মনের মাঝে উদিত চিন্তার প্রতিরোধ করলে, সে সকল স্তরও প্রতিহত হয়ে যায়। আর যদি প্রতিরোধ না করা হয়, তবে বুদবুদ-সম সে চিন্তাধারা দৃঢ় চিন্তায় রূপ নেয়। আর আমরা সকলেই জানি বুদবুদ-সম চিন্তাকে দৃঢ় চিন্তার চেয়ে অধিক সহজেই সংশোধন করা যায়। তেমনই ইচ্ছা- আকাঙ্ক্ষার চেয়ে এ চিন্তাকে সহজে সংশোধন করা যায়। এভাবে কোনো কিছু করে বিশৃঙ্খল করার চেয়ে ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে সংশোধন করা অধিক সহজ। বিশৃঙ্খল কিছু করার কারণে আসা ফলাফলকে দূর করার চেয়ে বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডকে দমন করা অধিক সহজ। তাই যার মনের মাঝে এমন বুদবুদ-সম মন্দ চিন্তা ও হীন চিন্তা থাকবে, তার পুরো চিন্তাধারা ও কাজকর্ম এ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকবে।
শয়তান আপনার চিন্তারাজ্যের ওপর কর্তৃত্ব করার আগেই সচেতন হোন। কারণ শয়তান আপনার চিন্তারাজ্যকে তছনছ করে দেবে, ধ্বংস করে দেবে। যার পরে আপনার চিন্তারাজ্যকে পুনরায় মেরামত করা, সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়বে। সে আপনার মনে বিভিন্ন ধরনের ওয়াসওয়াসা দেওয়ার চেষ্টা করে, ক্ষতিকর চিন্তাধারা ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। আর আপনি নিজেই তাকে এ কাজে সাহায্য করেন। ফলে সে অনায়াসে আপনার অন্তর ও চিন্তারাজ্যকে নিজের কর্তৃত্বে নিয়ে নেয়।
এ ক্ষেত্রে শয়তানের সাথে আপনার উদাহরণ কিছুটা এমন। এক পেষণযন্ত্রের মালিক, যে নিজের যন্ত্রে ভালো শস্যগুলো পিষে থাকে। তার কাছে একজন ব্যক্তি মাটি, গোবর, কয়লা, জঞ্জাল নিয়ে আসলো পিষে দেওয়ার জন্য। যদি পেষণযন্ত্রের অধিকারী সে লোককে বারণ করে দেয়, তার পেষণযন্ত্রে এসব আবর্জনা না রাখে, তবে সে ব্যক্তিটি পেষণযন্ত্রের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবে না। অন্যদিকে পেষণযন্ত্রের অধিকারী নিজের যন্ত্রে ভালো ও উপকারী বস্তুগুলোই পিষতে থাকবে। আর যদি আবর্জনা নিয়ে আসা ব্যক্তিকে তার ময়লা-জঞ্জালের লাদাটা পেষণযন্ত্রে ফেলতে দেয়, তাহলে পেষণযন্ত্রে ভালো যে সকল শস্য ছিল, সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। আর যন্ত্র থেকে কেবল মন্দ কিছুই বেরোবে।'¹⁰⁵
বিদআতিদের সাথে না বসা
আবু কিলাবাহ বলতেন: 'তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে তর্ক কোরো না। কারণ, আমি তোমাদের পথভ্রষ্টতায় ডুবে না যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। তোমাদের জন্য তাদের সাথে বসা নিরাপদ মনে করছি না। অথবা তোমরা যা সঠিক জানো, তার ক্ষেত্রে তোমাদের মনে সংশয় ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নিরাপদ মনে করছি না।'¹⁰⁶
হাসান বসরি বলেন: 'তোমরা প্রবৃত্তির গোলামদের সাথে বোসো না। তাদের সাথে তর্ক কোরো না। তাদের কোনো কথা শুনবে না। '¹⁰⁷
মুহাম্মাদ বিন সিরিন বলেন: 'একবার প্রবৃত্তির গোলামি করা দুজন লোক তার কাছে আসলো। তারা বলল, "হে আবু বকর, আমরা আপনার কাছে একটি হাদিস বর্ণনা করি।" তিনি বললেন, “না।” - তাহলে একটি আয়াত পড়ি আপনার সামনে। - না, তোমরা দুজন আমার কাছ থেকে চলে যাও। অথবা আমিই এখান থেকে চলে যাচ্ছি। '¹⁰⁸
ইসা বিন ইউনুস তাঁর কিছু সাথির কাছে এ বলে চিঠি লিখলেন: 'তোমরা জাহমিয়াদের সাথে বসবে না। মানুষের কাছে তাদের কাণ্ডকারখানা প্রকাশ করে দাও, যেন মানুষ তাদের চিনে রাখে, তাদের থেকে সাবধানতা অবলম্বন করে।'¹⁰⁹
আবু ইদরিস আল-খাওলানি হতে বর্ণিত-
তিনি এক লোককে তাকদিরের ব্যাপারে কথা বলতে দেখলেন। তিনি উঠে গিয়ে সে লোকের কাছে গেলেন। বললেন, 'নিশ্চয় অমুক তাকদিরে বিশ্বাস রাখে না। তাই তোমরা তার কাছে বোসো না।' তখন লোকটি দিমাশক থেকে বের হয়ে হিমসে চলে গেল। ¹¹⁰
অজ্ঞতাপ্রসূত ফতোয়া না দেওয়া
ইবনুল কাইয়িম বলেন:
'ইলম ছাড়া ফতোয়া ও সিদ্ধান্ত দেওয়া আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন। এ ঘৃণ্য কাজটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন সবচেয়ে নিকৃষ্ট হারামগুলোর মধ্যে। বরং বলা ভালো, এ কাজটি হারামের মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্তরের হারামগুলোর একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন :
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّي الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا bَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الحقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
“বলুন, আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপ, অন্যায় বিরোধিতা, আল্লাহর অংশীদার স্থির করা— যে ব্যাপারে তিনি কোনো প্রমাণ নাজিল করেননি আর আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের অজ্ঞতাপ্রসূত কথাবার্তা বলা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।””¹¹¹ [¹¹²]
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
مَنْ أُفْتِي بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ
'অজ্ঞতাপ্রসূত যাকে ফতোয়া দেওয়া হবে, তার পাপ ফতোয়াদানকারীর ঘাড়ে চাপবে।'¹¹³
এ কারণ ও অন্য সকল কারণে আলিমগণ ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়াকে অপছন্দ করতেন। তারা ফতোয়া দেওয়ার চেয়ে নিবৃত্ত থাকাকে শ্রেয় মনে করতেন। নিবৃত্ত থাকার মূল কারণ হলো, আল্লাহর ওপর কোনো কিছু আরোপ হয়ে যায় কি না, অজ্ঞতাপ্রসূত আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোনো কিছু বলা হয়ে যায় কি না—এ নিয়ে ভয় করা।
আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি :
إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا، يَنْتَزِعُهُ مِنَ الْعِبَادِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ، حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا، اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَالاً فَسُئِلُوا، فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ، فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا
“আল্লাহ তাআলা জোর করে বান্দার কাছ থেকে ইলম ছিনিয়ে নেবেন না; বরং আলিমদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেবেন। এমনকি যখন কোনো আলিম থাকবে না, তখন মানুষ জাহিলদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে। তাদের কাছে জিজ্ঞেস করা হবে, তারাও অজ্ঞতাপ্রসূত ফতোয়া দেবে। ফলে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে।”¹¹⁴
আব্দুর রহমান বিন আবু লাইলা সাহাবায়ে কিরাম সম্পর্কে বর্ণনা করেন : 'যখন তাঁদের কারও কাছে কোনো মাসআলা জানতে চাওয়া হতো, তখন তাঁরা একজন আরেকজনের কাছে যেতে বলতেন। এভাবে একজন আরেকজনের নিকট যেতে বলতে বলতে প্রশ্নকারী প্রথম জনের কাছে ফিরে আসতেন।'¹¹⁵
সম্মানিত তাবিয়ি আবু হাসিন উসমান বিন আসিম বলেন: 'তাদের কোনো একজন মাসআলাতে ফতোয়া দিতেন। যদি উমর-এর নিকট কোনো মাসআলা পেশ করা হতো, এ ক্ষেত্রে তিনি আহলে বদরকে একত্র করতেন। '¹¹⁶
আব্দুর রাজ্জাক মা'মার থেকে বর্ণনা করে বলেন।
'এক ব্যক্তি আমর বিন দিনার -কে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু তিনি জবাব দেননি। তখন লোকটি বলল, "আমার মনে এ বিষয় নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। আমাকে এর জবাব দিন।" তিনি এবার বললেন, "যদি তোমার মনে আবু কুবাইসের মতো কিছু থেকে থাকে, তবে তা আমার মনের মাঝে এক চুল পরিমাণ সমস্যা থাকার চেয়ে আমার কাছে অধিক উত্তম। "¹¹⁷
ইবনে মাহদি বলেন:
'এক ব্যক্তি মালিক বিন আনাস -কে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি প্রশ্নটি বারবার করছিল। মালিক -কে পীড়াপীড়ি করেই চলছিল। অবশেষে তিনি বললেন, "মাশাআল্লাহ। আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন। হে তুমি, আমি যেটাতে বলে কল্যাণ লাভের আশা করি, কেবল সে ব্যাপারেই বলে থাকি। কিন্তু আমি তোমার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নকে ভালো মনে করছি না।"¹¹⁸
ইবনে ওহাব বলেন:
'আমি মালিক -কে বলতে শুনেছি, "ফতোয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতা। বলা হতো, ধীরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে। "'¹¹⁹
মুহাম্মাদ বিন মুনকাদির বলেন:
'একজন আলিম আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির মধ্যকার একটি কড়ি। তাই লক্ষ রাখো, উভয়ের মাঝে সে কীভাবে প্রবেশ করে।'¹²⁰
ইয়াহইয়া বিন সাইদ বলেন:
'সাইদ বিন মুসাইয়িব কোনো ফতোয়া দিতেন না বললেই চলে। তিনি কেবল এ কথা বলতেন : اللَّهُمَّ سَلِّمْنِي وَسَلِّمْ مِنِّي [আল্লাহ আমাকে নিরাপদে রাখুন। আমার থেকে অন্যদের নিরাপদে রাখুন। ¹²¹
একটা বিশেষ কথা বলে রাখা প্রয়োজন। যাকে ফতোয়া জিজ্ঞেস করা হয়েছে, সে যদি নিজেই জানে যে, সে ফতোয়া দেওয়ার উপযুক্ত নয়। কারণ, তার মাঝে ফতোয়া দেওয়ার শর্তাবলি নেই বা তার মাঝে ফতোয়া দেওয়ার প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। কিন্তু মানুষ তো তার মাঝে শর্তাবলি না থাকা বা তার মাঝে থাকা প্রতিবন্ধকতার কথা জানে না, তাহলে নিঃসন্দেহে সে ব্যক্তির জন্য এ অবস্থায় মানুষকে ফতোয়া দেওয়া হারাম। বুদ্ধিমান তো সে, যে দেখল-এ বিষয়ে ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে তার চেয়ে অধিক যোগ্য লোক আছে, তাহলে সে ব্যক্তির কাছেই এ ব্যক্তিটি ফতোয়া দেওয়ার দায়িত্ব স্থানান্তর করে দেয়।
ইবনে মাইন বলেন:
'কোনো লোকালয়ে কোনো ব্যক্তি হাদিসের দরস দিচ্ছেন। কিন্তু তার চেয়ে অধিক উপযুক্ত ব্যক্তি রয়েছেন হাদিসের দরস দেওয়ার জন্য। তবে আমি বলব প্রথম ব্যক্তিটি বোকা।'¹²²
মালিক বলেন:
'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ফতোয়া দিইনি, যতক্ষণ না সত্তরজন লোক আমাকে ফতোয়া দেওয়ার যোগ্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। '¹²³
ইবনে উয়াইনা ও সাহনুন বলেন:
'ফতোয়া প্রদানের ব্যাপারে অধিক সাহসী ও উৎসাহী ব্যক্তিরা সীমিত জ্ঞানের অধিকারী হন।'¹²⁴
সাহনুন বলেন: 'সবচেয়ে হতভাগ্য সে ব্যক্তি, যে নিজের আখিরাত বিক্রি করে দুনিয়া ক্রয় করে।' তিনি আরও বলেন, 'সঠিক উত্তর দেওয়ার ফিতনা অর্থ-সম্পদের ফিতনার চেয়ে বেশি কঠিন।' ¹²⁵
সুফইয়ান বলেন: 'আমি এমন ফকিহদের সঙ্গ পেয়ে ধন্য হয়েছি, যাঁরা মাসআলার জবাব দিতে ও ফতোয়া দিতে অপছন্দ করতেন। সকল ফকিহই চুপ থাকতেন, ফলে মানুষজন ফতোয়া দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পেতেন না।'
তিনি আরও বলেন: 'ফতোয়ার ব্যাপারে তারাই অধিক জ্ঞানী আলিম, যারা ফতোয়া না দিয়ে চুপ থাকেন। আর যারা ফতোয়া বেশি দিয়ে থাকেন, তারাই অধিক মূর্খ আলিম।' ¹²⁶
একদিন রবিআ কাঁদছিলেন। জানতে চাওয়া হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'যার ইলম নেই, তার কাছে ফতোয়া জানতে চাওয়া হচ্ছে। এটা যে ইসলামের জন্য এক চরম বিষয়।' তিনি আরও বলেন, 'এখানে ফতোয়া দেয় এমন একজন লোক আছে—চোরদেরকে জেলে দেওয়ার চেয়ে সে-ই জেলে যাওয়ার অধিক উপযুক্ত।' ¹²⁷
আবু মুসা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: 'যাকে আল্লাহ একটি জ্ঞান শিখিয়েছেন, সে যেন মানুষকে তা শেখায়। কিন্তু তার কাছে যে জ্ঞান নেই, তার ব্যাপারে সে যেন না বলে। অন্যথায় সে লৌকিকতা-প্রদর্শনকারীদের একজন হয়ে যাবে, দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে।' ¹²⁸
ইবনুল কাইয়িম বলেন:
'সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিয়িগণ ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা অপছন্দ করতেন। তাঁরা প্রত্যেকেই আশা করতেন, অন্যজন এ বিষয়ে ফতোয়া দিয়ে তাঁকে ভারমুক্ত করবেন। কিন্তু যখন দেখতেন, এ ফতোয়া দেওয়ার জন্য তিনি নির্দিষ্ট হয়ে আছেন, তখন এ বিষয়ে হুকুম জানার জন্য কিতাবুল্লাহতে, রাসুল-এর সুন্নাহতে ও খুলাফায়ে রাশিদিনের অভিমত জানার জন্য ইজতিহাদ করতেন। তারপর ফতোয়া দিতেন।'¹²⁹
টিকাঃ
৮৫. সহিহুল বুখারি: ২১১১, সহিহু মুসলিম : ৪৯২৬
৮৬. রওজাতুল মুহিব্বিন: ৪৪৭-৪৪৮
৮৭. সিফাতুস সফওয়াহ : ৪/৩৯৫
৮৮. সহিহুল বুখারি : ১৯০৫, সহিহু মুসলিম : ১৪০০
৮৯. রওজাতুল মুহিব্বিন: ২১৯
৯০. সহিহুল বুখারি: ১৮৯৪, সহিহু মুসলিম: ১১৫১
৯১. তাফসিরুল কুরতুবি: ২/২৭৫
৯২. রওজাতুল মুহিব্বিন: ১/৩২৬
৯৩. ইবনু হিশাম কৃত আস-সিরাতুন নববি : ২/৩১৬
৯৪. মুসনাদু আহমাদ: ২১১৮৫
৯৫. আল-ইকতিসাদিয়্যু আল-ইলিকত্রানিয়া নামক জার্নাল। সংখ্যা: ৪৮৮১।
৯৬. জাম্মুল হাওয়া: ২৭
৯৭. জাম্মল হাওয়া: ৩১
৯৮. অনুবাদক
৯৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/২২১ (উল্লেখ্য, এখানে কবিতার ভাবানুবাদ করা হয়েছে।)
১০০. আল-মুনতাকা মিন আখবারিল আসাময়ি: ৬৬
১০১. সুরা আল-আরাফ: ২০১
১০২. তাফসিরুত তবারি: ২৪/৭১০, তাফসিরু ইবনি কাসির: ৮/৫৪০
১০৩. মুসনাদু আহমাদ: ৯১৫৬
১০৪. সহিহুল বুখারি: ৩২৭৬, সহিহু মুসলিম: ১৩৪
১০৫. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৭৪-১৭৫
১০৬. সুনানুদ দারিমি: ৩৯১
১০৭. শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ৯৪৬৭
১০৮. সুনানুদ দারিমি: ৩৯৭
১০৯, নাকজুদ দারিমি: ১/১৪৬
১১০. ইবনু বাত্তাহ कृत আল-ইবানাহ: ২/৩৯১
১১১. সুরা আল-আরাফ: ৩৩
১১২. ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন: ১/৩৮
১১৩. সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৫৭
১১৪. সহিহুল বুখারি: ১০০, সহিহু মুসলিম: ৪৮২৮
১১৫. তারিখু বাগদাদ: ১৩/৪১২
১১৬. তারিখু দিমাশক: ৩৮/৪১১
১১৭. আত-তাবাকাতুল কুবরা: ৫/৪৮০
১১৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩২৩
১১৯. আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ : ২/৬৫; শেষ বাক্যটি আনাস থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন: التأني من الله والعجلة من الشيطان হাদিসটি বাইহাকি তাঁর সুনান গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সনদ হাসান。
১২০. আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ : ২/৬৬
১২১. প্রাগুক্ত
১২২. প্রাগুক্ত
১২৩. প্রাগুক্ত
১২৪, প্রাগুক্ত
১২৫. প্রাগুক্ত
১২৬. প্রাগুক্ত
১২৭. আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ: ২/৬৭
১২৮. সুনামুদ দারিমি: ১৭৪
১২৯. ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন: ১/৩৩
📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালী করার উপায়
মন্দ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা, মন্দ থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা, ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়-ইবাদতের ক্ষতি করে প্রত্যেক এমন কর্ম থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা ব্যক্তির দ্বীনের মূলভিত্তি। তাই অবশ্যই অবশ্যই আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তা মজবুত ও শক্তিশালী করতে হবে। এটি এভাবে হতে পারে-
১. কুরআনের তাদাব্বুর করা
কুরআনের তাদাব্বুর-তাফাহহুম, কুরআনের আয়াতে চিন্তা-ভাবনা করা, বুঝে বুঝে কুরআন তিলাওয়াত করা আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةً لِلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا
'আমি কুরআন হতে অবতীর্ণ করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত, কিন্তু তা জালিমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।'¹³⁰
২. আল্লাহর বড়ত্ব অনুধাবন করা
আল্লাহর নামসমূহ ও তাঁর গুণাবলি জানা। এগুলোর অর্থ বোঝা ও এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। এ অনুভূতি অন্তরের মাঝে চিরস্থায়ী করে রাখা। আমলে তার প্রভাব পড়া। যেন অন্তরে বিরাজমান উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ হয় বাহ্যিক আমল। এ অনুভূতি ও উপলব্ধিই হয়ে পড়ে তার চিন্তারাজ্যের অধিপতি। তাই যখন অন্তর ও চিন্তার রাজ্য এমন উপলব্ধির অনুসারী হয়, তখন তা শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ হয়। আর আমরা জানি, যখন অন্তর শুদ্ধ হয়, তখন পুরো দেহ পরিশুদ্ধ হয়। যখন অন্তরে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তখন পুরো দেহ বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে।
৩. শরয়ি ইলম অন্বেষণ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورُ
'আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই ভয় করে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল।'¹³¹
৪. আল্লাহর স্মরণে মজলিস করা
জিকির ইমান বৃদ্ধি করে। রাসুলুল্লাহ বলেন :
لَا يَقْعُدُ قَوْمٌ يَذْكُرُونَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ إِلَّا حَقَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ، وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَنَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ
'কোনো একটি দল যখনই আল্লাহর স্মরণ করে, তখন ফেরেশতাগণ চারদিক থেকে তাদের ঘিরে রাখে। রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে রাখে। তাদের ওপর অবতারিত হতে থাকে প্রশান্তি। আর আল্লাহ তাদের কথা তাঁর নিকটের লোকদের মাঝে স্মরণ করেন।'¹³²
৫. বেশি বেশি নেক আমল করা এবং পুরো সময়টাকে ইবাদতে ব্যয় করা
নেক আমল করার ক্ষেত্রে একজন মুসলিমকে কয়েকটি দিক লক্ষ রেখে আমল করতে হবে। যেমন:
দ্রুত আমলে মগ্ন হওয়া
কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন : وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
'আর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগারদের জন্য। '¹³³
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْضِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ 'তোমরা এগিয়ে যাও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাত লাভের জন্য, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান। '¹³⁴
অবিরত আমল করে যাওয়া
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন :
ومَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُ عِيذَنَّهُ وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِي عَنْ نَفْسِ الْمُؤْمِنِ يَكْرَهُ الْمَوْتَ وَأَنَا أَكْرَهُ مَسَاءَتَهُ
“আমার বান্দা নফল কাজের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হয়, এমনকি এক সময় আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনতে পায়। আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখতে পায়। আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে হাঁটে। সে আমার কাছে চাইলে আমি তাকে দিই। সে আশ্রয় চাইলে আমি আশ্রয় দিই। আমি কোনো কাজ করার ইচ্ছা করলে তা বাস্তবায়ন করতে ততটা ইতস্তত করি না, যতটা ইতস্তত করি মুমিন বান্দার রুহ কবজ করতে। সে যে মৃত্যুযন্ত্রণা অপছন্দ করে, আর এদিকে আমিও তাকে কষ্ট দিতে চাই না।””¹³⁵
ইবাদতে সাধনা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন: كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ * وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ * وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
'রাতের বেলা তারা খুব কমই শয়ন করত। আর তারা রাতের শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনা করত। এবং তাদের ধনসম্পদে আছে যাচনাকারী ও বঞ্চিতদের অধিকার (যা তারা আদায় করত)।'¹³⁶
৬. বিভিন্ন ধরনের ইবাদত করা
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন :
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ صَائِمًا؟ قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: فَمَنْ تَبِعَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ جَنَازَةً؟ قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: فَمَنْ أَطْعَمَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مِسْكِينًا؟ قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: فَمَنْ عَادَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مَرِيضًا؟ قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ: أَنَا، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ : مَا اجْتَمَعْنَ فِي امْرِئٍ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ
'আজ তোমাদের মধ্যে কে রোজা রেখেছ?' আবু বকর বললেন, 'আমি।' তিনি বললেন, 'আজ তোমাদের মধ্যে কে জানাজায় শামিল হয়েছ?' আবু বকর বললেন, 'আমি।' তিনি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কে আজ মিসকিনকে খাবার খাইয়েছ?' আবু বকর বললেন, 'আমি।' তিনি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কে আজ রোগীর শুশ্রুষা করেছ?' আবু বকর বললেন, 'আমি।' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'যার মধ্যে এ সকল বিষয় একত্রিত হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'¹³⁷
বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَادِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ 'তোমরা উপভোগের স্বাদ ধ্বংসকারী অর্থাৎ মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।'¹³⁸
৮. আল্লাহর সাথে চুপি চুপি কথা বলা, তার সামনে নিজের ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে হাজির হওয়া
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ، وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ 'বান্দা তার রবের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয় সিজদাবনত অবস্থায়। তাই তোমরা (সিজদা অবস্থায়) বেশি বেশি দুআ করো।'¹³⁹
৯. কম আশা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন : لَّمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةً مِّنَ النَّهَارِ 'সেদিন তাদের মনে হবে যেন তারা দিনের এক মুহূর্তের বেশি পৃথিবীতে অবস্থান করেনি।'¹⁴⁰
১০. দুনিয়ার তুচ্ছতা নিয়ে চিন্তা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
'আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়।' ¹⁴¹
১১. আল্লাহর নির্ধারিত সম্মানিত বিষয়াবলিকে সম্মান করা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يُعَظِمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ
'আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে পালনকর্তার নিকট তা তার জন্য উত্তম।' ¹⁴²
১২. আত্মসমালোচনা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেকেই যেন লক্ষ রাখে, আগামীকালের জন্য সে কী (পুণ্য কাজ) অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি খবর রাখেন।' ¹⁴³
১৩. দুআ করা
এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম, যা একজন বান্দার অবশ্যই ধারণ করা উচিত, গ্রহণ করা উচিত। নুমান বিন বাশির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি নবিজি-কে বলতে শুনেছি :
الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ "দুআই ইবাদত।”
এরপর তিনি তিলাওয়াত করেন :
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
“আর তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত করে না, নিশ্চিতই তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” ¹⁴⁴ [¹⁴⁵]
এ ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালীকরণের কয়েকটি সহায়ক মাধ্যম। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এ আলোচনা দ্বারা উপকৃত করেন।
টিকাঃ
১৩০. সুরা আল-ইসরা: ৮২
১৩১. সুরা ফাতির: ২৮
১৩২. সহিহু মুসলিম: ২৭০০
১৩৩. সুরা আলি ইমরান: ১৩৩
১৩৪. সুরা আল-হাদিদ: ২১
১৩৫. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২
১৩৬. সুরা আজ-জারিয়াত: ১৭-১৯
১৩৭. সহিহু মুসলিম: ১০২৮
১৩৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৪৬০
১৩৯. সহিহু মুসলিম: ৪৮২
১৪০. সুরা আল-আহকাফ: ৩৫
১৪১. সুরা আলি ইমরান : ১৮৫
১৪২. সুরা আল-হাজ: ৩০
১৪৩. সুরা আল-হাশর: ১৮
১৪৪. সুরা গাফির: ৬০
১৪৫. সুনানুত তিরমিজি: ৩২৪৭
📄 পরিশিষ্ট
এ ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর সামান্য আলোকপাত। আমরা এখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের অর্থ, কারণ, তার কিছু ধরন, প্রকারভেদ, আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালীকরণের কিছু মাধ্যম আলোচনা করেছি।
এ আলোচনা থেকে আমাদের নিকট প্রকাশিত হয়েছে যে, আত্মনিয়ন্ত্রণের পুরোটাই নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করার ওপর নির্ভরশীল। মন্দের ওপর অটল থাকার বিরোধে গিয়ে নিজেকে সামাল দেওয়া আত্মনিয়ন্ত্রণ। আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন প্রতিটি বিষয়কে প্রতিহত করা আত্মনিয়ন্ত্রণ। যতক্ষণ পর্যন্ত নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করে যাওয়া হবে, আদেশ যথাযথ পালন করা হবে, নিষেধ থেকে বিরত থাকা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাইরের কোনো শত্রুর শত প্রচেষ্টাও মনের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে না। তাই তো রাসুলুল্লাহ বলেন:
الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ
'মুজাহিদ সে, যে নিজের নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করে।' ¹⁴⁶
হাসান বসরি বলেন:
'মুমিন সর্বদা নিজেকে দুষতে থাকে। আমার এ কথার উদ্দেশ্য কী ছিল, হায়, আর আমি কী করলাম! আমার এ খাবারের উদ্দেশ্য কী ছিল, আমার এ ভাবার উদ্দেশ্য কী ছিল, হায়, আর আমি কী করলাম! আপনি তাকে সব সময়ই নিজেকে দোষারোপ করতে দেখবেন। কিন্তু গুনাহগার সব সময় নিজের মতো করে গুনাহ করে যায়। অথচ নিজেকে কখনো দোষারোপ করে না।'¹⁴⁷
একজন মুসলিম সর্বদা নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেবে—যখন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হবে, তখন চিরস্থায়ী কষ্টে পড়ার চেয়ে এখন ক্ষণস্থায়ী কষ্ট সহ্য করে নেওয়াই অধিক উত্তম।
আল্লাহর নিকট আমাদের কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের মাঝে ও হারামের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে দেন, দুর্লঙ্ঘ বাধা প্রতিস্থাপন করেন।
আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত বানিয়ে নেন, যারা কিছু মন্দ করলেই সাথে সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যখন কোনো উত্তম কিছু করে, তখন প্রফুল্ল হয়।
তিনি যে কথা ও কাজকে পছন্দ করেন, যে কথা ও কাজে তাঁর সন্তুষ্টি—তিনি যেন সে কথা ও কাজকেই আমাদের মনোবৃত্তি বানিয়ে দেন (আমিন)।
টিকাঃ
১৪৬. সুনানুত তিরমিজি: ১৬২১
১৪৭. ইমাম আহমাদ - কৃত আজ-জুহদ: ২২৮