📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ পরিচিতি
আরবদের কথন كَبَحَ الدابة يَكْبَحُها كبحاً -এর অর্থ হলো, আরোহী লাগাম দিয়ে বাহনকে নিজের দিকে টান দিল, যেন বাহন না চলে থেমে যায়। হাদিসের মাঝেও এ শব্দটি এসেছে। উসামা বিন জাইদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أَفَاضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ عَرَفَةَ وَأَنَا رَدِيفُهُ، فَجَعَلَ يَكْبَحُ رَاحِلَتَهُ حَتَّى أَنَّ ذِفْرَاهَا لَيَكَادُ يُصِيبُ قَادِمَةَ الرَّحْلِ
'রাসুলুল্লাহ আরাফা থেকে ফিরে আসলেন। তখন বাহনে আমি তাঁর পেছনেই বসা ছিলাম। (এক সময়) তিনি বাহনের লাগাম ধরে এমনভাবে টেনে ধরলেন যে, বাহনটির দুকান হাওদার সামনের অংশের সাথে লেগে যাচ্ছিল-প্রায়।'²
আরবদের কথায় আরও প্রচলিত আছে যে, যখন কাউকে তার চাহিদা মেটানো থেকে বাধা দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি كَبَحَهُ عَنْ حَاجَتِهِ বাক্যে বর্ণনা করা হয়।³
আল্লাহ তাআলা মানুষের মাঝে দুটি শক্তি দান করেছেন। একটি শক্তি কোনো কাজে অগ্রসর হওয়ার। অন্যটি কোনো কাজ থেকে বিরত থাকার। অগ্রসর হওয়ার এ শক্তিটি দ্বীনি ও দুনিয়াবি উপকার হয়—এমন কাজে ব্যয় করা উচিত। অন্যদিকে বিরত থাকার শক্তিটি ক্ষতিকর কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকার জন্য ব্যয় করা উচিত। প্রতিটি মুসলিমের ওপর ভালো কাজে অগ্রসর হওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত হওয়া ফরজ করা হয়েছে। নিবৃত্ত থাকার এ বিষয়টিই হচ্ছে আত্মনিয়ন্ত্রণ। একজন মুসলিম নিজেকে মন্দে পতিত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করবে—এটা তার ওপর ফরজ।
অতএব একজন মুসলিম নিজেকে মন্দ, গুনাহ ও অনর্থক কর্ম থেকে নিবৃত্ত রাখাই হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ।
টিকাঃ
২. সুনানুন নাসায়ি: ৩০১৮
৩. তাহজিবুল লুগাহ: ৪/৬৮, লিসানুল আরব: ২/৫৬৮, তাজুল আরুস ৭/৭৬, মাদ্দাহ: কেব।
📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ কঠিন কর্ম
অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা সুকঠিন এক কর্ম। হারাম থেকে বেঁচে থেকে ধৈর্যধারণ করা বেশ কষ্টকর। মোট কথা, আত্মনিয়ন্ত্রণ সহজ কোনো কাজ নয়। আনাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ، وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ
'জান্নাতকে বেষ্টন করা হয়েছে কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা, আর জাহান্নামকে বেষ্টন করা হয়েছে কামনা-বাসনা দ্বারা।'⁶
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন:
'مگر দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, একজন মুসলিমকে যে আমল করতে আদেশ করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে করা; যে কর্ম ছাড়তে বলা হয়েছে, তা পরিত্যাগ করার জন্য নিজের নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করা। যেমন : ইবাদতগুলোকে সঠিকভাবে আদায় করা, ইবাদতগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা, নিষিদ্ধ কথা ও কাজ পরিত্যাগ করা—এ সকল কিছুকেই হাদিসে مُكْرَه বা কষ্টকর বিষয়বস্তু বলা হয়েছে। কারণ এ সকল কাজ করা একজন আমলকারীর জন্য কষ্টকর ও কঠিন হয়ে থাকে।
আর شَهَوَات দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শরিয়ত-নিষিদ্ধ দুনিয়াবি উপভোগ্য কর্মসমূহ। শরিয়তের এ নিষেধের কারণ হলো, হয়তো এ সকল কর্ম আদতেই মন্দ হয় অথবা এ কাজগুলোর কারণে আদেশকৃত আমলগুলো ছুটে যায়।
যেন রাসুল বলতে চাইছেন, জান্নাতে কেবল তখনই পৌঁছা সম্ভব হবে, যখন শরিয়ত-আদিষ্ট আমলগুলো কষ্ট স্বীকার করেও সম্পাদন করা হবে। অন্যদিকে যখন কামনা-বাসনা চরিতার্থ করা হবে, তখন জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। কষ্টকর কাজগুলো ও কামনা-বাসনা হলো পর্যায়ক্রমে জান্নাত ও জাহান্নামের সামনে থাকা দুটি অন্তরায়। যখন কেউ কোনোটার অন্তরায় মাড়িয়ে সামনে যাবে, সে সেখানে প্রবেশ করবে।⁷
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
لَمَّا خَلَقَ اللهُ الْجَنَّةَ قَالَ الجِبْرِيلَ: اذْهَبْ فَانْظُرُ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ، فَقَالَ: أَي رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعْ بِهَا أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا، ثُمَّ حَفَهَا بِالْمَكَارِهِ، ثُمَّ قَالَ : يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرُ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَدْخُلَهَا أَحَدٌ ، قَالَ : فَلَمَّا خَلَقَ اللهُ النَّارَ قَالَ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ فَيَدْخُلُهَا، فَحَفَهَا بِالشَّهَوَاتِ ثُمَّ قَالَ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا ، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا ، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَبْقَى أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَ
'আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করে জিবরিল আ.-কে বললেন, “যাও, গিয়ে দেখে আসো।" জিবরিল আ. গিয়ে দেখলেন। এসে আল্লাহকে বললেন, “হে আমার রব, আপনার মর্যাদার কসম! যে-ই জান্নাত সম্পর্কে শুনবে, সে-ই তাতে প্রবেশ না করে ছাড়বে না।" এরপর আল্লাহ জান্নাতকে কষ্টকর বিষয়বস্তু দিয়ে আচ্ছাদিত করলেন। এবার তিনি জিবরিলকে বললেন, “হে জিবরিল, যাও, জান্নাত দেখে আসো।" জিবরিল আ. গেলেন। জান্নাত দেখে এসে বললেন, “হে আমার রব, আপনার মর্যাদার কসম! আমার ভয় হচ্ছে, এবার সেখানে কেউই প্রবেশ করতে পারবে না।"" রাসুল বলেন, 'এরপর আল্লাহ জাহান্নাম সৃষ্টি করে জিবরিল আ.-কে বললেন, “হে জিবরিল, যাও, এটি দেখে আসো।" জিবরিল আ. গেলেন। দেখে এসে বললেন, “হে আমার রব, আপনার মর্যাদার কসম! যে-ই এ সম্পর্কে শুনবে, সে-ই তাতে প্রবেশ করতে চাইবে না। এরপর আল্লাহ জাহান্নামকে কামনা-বাসনা দিয়ে বেষ্টিত করে বললেন, “হে জিবরিল, যাও, গিয়ে দেখে আসো।” জিবরিল আ. গিয়ে দেখে আসলেন। এসে বললেন, “হে আমার রব, আপনার মর্যাদার কসম!
আমার ভয় হচ্ছে এবার তো কেউই জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারবে না; সবাই তাতে প্রবেশ করবে।"⁸
অর্থাৎ জান্নাত যেহেতু কষ্টকর বিষয়বস্তু দিয়ে আচ্ছাদিত, তাই কেউই নিজ নফসের বিরোধিতা করে সেখানে যাওয়ার মতো হবে না। আর নিজের নফসের বিরোধিতার জায়গায় সবাই নফসের গোলামি করবে, আত্মনিয়ন্ত্রণের ধার ধারবে না; ফলে কেউই জাহান্নাম থেকে বাঁচবে না।⁹
মূলত তাকওয়ার লাগাম পরিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে, নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে সবর ও সাধনার প্রয়োজন। আবু দারদা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا الْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ، وَإِنَّمَا الْحِلْمُ بِالتَّحَلُّمِ، وَمَنْ يَتَحَرَّى الْخَيْرَ يُعْطَهُ، وَمَنْ يَتَّقِ الشَّرَّ يُوقَهُ،
'জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়। ধৈর্যধারণের মাধ্যমে সহনশীলতা অর্জিত হয়। যে ভালো কিছুর জন্য প্রয়াস করে, তাকে তা দেওয়া হয়। যে মন্দ থেকে বেঁচে থাকতে চায়, তাকে মন্দ থেকে রক্ষা করা হয়। '¹⁰
আবু সাইদ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرُهُ اللهُ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدُ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
'যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণে প্রচেষ্টা চালায়, আল্লাহ তাকে ধৈর্যধারণের তাওফিক দেন। আর সবরের চেয়ে উত্তম ও অধিক ব্যাপক দান কাউকে দেওয়া হয়নি।'¹¹
হাদিসাংশ وَمن يتصبر يصبره الله এর মর্মার্থ হলো, যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণের প্রয়াস করে, আল্লাহ তাকে শক্তিশালী করেন, তাকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করেন। ফলে একজন ব্যক্তি ধৈর্যধারণের প্রতি চালিত হয়, কষ্ট স্বীকারে সক্ষম হয়। ধৈর্যধারণের সময় আল্লাহ তার পাশে থাকেন। ফলে সহজেই সে উদ্দিষ্ট বিষয়টি লাভ করে নেয়, সহজেই সে বিজয়ী হয়।
ইবনুল জাওজি বলেন : 'আল্লাহ সবরকে সর্বোত্তম দান বানিয়েছেন। যে কাজগুলো করলে অথবা যে আমলগুলো পরিত্যাগ করলে আখিরাতে শাস্তি পেতে হবে, দুনিয়াতে এমন মোহময় কাজ থেকে আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কষ্টকর হলেও আদিষ্ট কাজগুলো অবশ্যই করার নাম সবর।'¹²
প্রতিটি মানুষকে একটা কথা যথাযথভাবে বুঝতে হবে। হারাম কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে সবর করা যদিও সুকঠিন একটি কাজ। কিন্তু এ সবরের পরে অচিরেই তার জন্য বিচার দিনে অনুপম স্বাদ ও আরাম আসবে। অন্যরা যখন শাস্তিতে দগ্ধ থাকবে, সে থাকবে পরম সুখে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ 'আর যারা আমার পথে সাধনা করে, তাদের আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন। '¹³
আমরা অস্থায়ী এক ভুবনে আছি। সময় থাকতেই আমাদের ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিতে হবে। সে জন্য দুনিয়ার প্রতিটি দিন যেন হয় কামনা-বাসনা থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের। আপনার স্বভাব যেন আল্লাহর সাথে সততার স্বভাব হয়। আপনার স্বভাব যেন এমন স্বচ্ছ-শুভ্র হয় যেমন কোনো মানুষ জানে যে, আজ তার মৃত্যু হবে, তাই সে সকল পঙ্কিলতা ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে দূরে রেখে ইবাদত-আনুগত্যে উৎসর্গ করেছে।
হারাম থেকে বিরত থেকে ধৈর্যধারণ করা যদিও প্রথম প্রথম যন্ত্রণাদায়ক ও কষ্টকর হবে। কিন্তু এ কষ্ট স্বীকার করা কিয়ামতের দিনের ঘামের সাগরে ডুবে যাওয়া, ভয়ংকর এক কষ্টের সম্মুখীন হওয়া থেকে অধিক উত্তম।
'তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই, যে ভয় করে না তার রবের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণকে। বরং প্রবৃত্তিকে সে চরিতার্থ করে, রবকে কখনো সখনো ভয় করে চলে। অন্যদিকে তাকওয়া প্রবৃত্তির কামনাকে বন্দী করে রাখে। কারণ পুনরুত্থানের সময় তাকে লাঞ্ছিত হতে হবে। তাই প্রবৃত্তির পরিবর্তে মুত্তাকি ভয়কে সঙ্গী বানিয়ে চলে।' ¹⁴
কতক মানুষ এমন আছে, তাদেরকে প্রথমে আপনি অল্পকিছু ঘুষ দিলে নেবে না। একেবারে সাধুর বেশ ধরবে। কিন্তু যখনই আপনি মোটা অঙ্কের ঘুষ সাধবেন। মুখে হাসি ছড়িয়ে আস্তে করে তা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলবে। মোটা অঙ্কের এ লোভ সে সংবরণ করতে পারবে না। এ প্ররোচনা দমাতে সে সক্ষম হবে না।
এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য কাব বিন মালিক কর্তৃক প্ররোচনা প্রত্যাখ্যানের ঘটনা বড় উপকারদায়ক হবে। ঘটনাটি হচ্ছে :
কাব তাবুকের জিহাদে রাসুল-এর সাথে না গিয়ে পেছনে রয়ে গেলেন। ফলে রাসুল ও সাহাবায়ে কিরাম তাঁকে বয়কট করলেন।...এ সময়ের বর্ণনা কাব এভাবে দিলেন, 'মানুষ আমাদের পরিত্যাগ করল। পরিবেশ আমাদের জন্য পাল্টে গেল। পৃথিবীতে যেন আমার জন্য নতুন একটা রূপ ধারণ করল। আমি যেন একে চিনতেই পারছি না। এভাবে আমাদের পঞ্চাশ রাত কেটেছিল।...এমনই একদিন আমি মদিনার বাজারে হাঁটছিলাম। হঠাৎ মদিনায় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করতে আসা শামবাসী এক কৃষককে দেখলাম। সে বলছিল, “তোমাদের কেউ কি আমাকে কাব বিন মালিককে দেখিয়ে দেবে?” মানুষ জন আমার দিকে ইশারা করে দেখাতে লাগল। সে আমার কাছে এসে গাসসান বাদশার একটি চিঠি ধরিয়ে দিল। সেখানে ছিল, পরসমাচার, আমার কাছে সংবাদ এসেছে, আপনার সাথি আপনার প্রতি নির্দয় আচরণ করছে।
অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ রাখবেন না। আমাদের কাছে চলে আসুন। আমরা আপনাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন করব।' কাব এ চিঠি পড়ে বললেন, 'এটাও একটা পরীক্ষা।' তিনি বলে চললেন, 'এরপর আমি চুলা খুঁজতে লাগলাম। চিঠিটি চুলোয় নিক্ষেপ করলাম।'... এভাবে পুরো ঘটনাটি। এক সময় কাব ও এমন আরও দুজন সাহাবিকে নিয়ে আয়াত নাজিল হয়। আর আল্লাহ তাঁদের তাওবা কবুল করে নেন।¹⁵ প্রবল এক প্ররোচনার সামনে কাব-এর এ অটল-অবিচল অবস্থান তাঁর সাফল্য ও সমৃদ্ধির মাধ্যম।
আর মুমিনের অন্তরে এমন ইমান আছে, যার মাধ্যমে সে আল্লাহর আদিষ্ট কাজে কমতি করা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। হাসান বসরি বলেন:
'যখন মুমিন হঠাৎ কোনো কিছু দেখে পছন্দ করে ফেলে। তার পরক্ষণেই সে বলে, “আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তোমার বাসনা রাখি। তুমি আমার চাহিদা। কিন্তু তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। দূর হও। দূর হও। আমার মাঝে তোমার মাঝে বাধা রয়েছে।” আর যখন মুমিন কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ পালনে কমতি করে ফেলে। তখন নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করে এবং বলে, “আমি কেন এটা করতে গেলাম! আমার সাথে এর সম্পর্ক কী! আল্লাহর কসম! আমার যে কোনো ওজরই নেই। আল্লাহর কসম! আমি আর কখনো এ দিকে ফিরে আসব না, ইনশাআল্লাহ।”¹⁶
টিকাঃ
৬. সহিহুল বুখারি: ৬৪৭৮, সহিহু মুসলিম: ২৮২২
৭. ফাতহুল বারি: ১১/৩২০
৮. সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৪৪
৯. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৭/২৩৭
১০. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ২৬৬৩ - শাইখ আলবানি একে হাসান বলেছেন, ইমাম দারাকুতনি এ হাদিসকে স্বীয় আল-ইলাল গ্রন্থে (১০/৩২৬) ওয়াকফ বলে তালিল করেছেন।
১১. সহিহুল বুখারি: ১৪৬৯, সহিহু মুসলিম: ১০৫৩
১২. ফাতহুল বারি: ১১/৩০৪
১৩. সুরা আল-আনকাবুত : ৬৯
১৪. ইবনুল জাওজি কৃত জাম্মুল হাওয়া: ২৩৬
১৫. সহিহুল বুখারি: ৪৪১৮, সহিহু মুসলিম: ২৭৬৯
১৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৫৭
📄 আত্মনিয়ন্ত্রণে দুর্বল হওয়ার কারণ
একজন মুসলিমের সাথে অন্য আরেকজনের তুলনা করলে আমরা দেখি, আত্মনিয়ন্ত্রণে দুজনের মধ্যকার পার্থক্য অনেক। মুসলিমদের মাঝে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ খুব শক্তিশালী। পক্ষান্তরে কিছু এমন মুসলিমও আছেন, যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল। আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার অনেক কারণ আছে। তন্মধ্যে বিশেষ কিছু কারণ আমরা এখন আলোচনা করছি :
১. ইমানের দুর্বলতা
ইমান মুমিনের অস্ত্র। ইমান মুমিনের সুরক্ষিত দুর্গ। ইমান এমন একটি দুর্গ, যা মুমিনকে মন্দ কামনা-বাসনা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। যখন মানুষ ইবাদত ও আনুগত্য থেকে দূর হয়ে যায়, সমান তালে তখন তার ইমানও দুর্বল হতে থাকে। যখন কারও ইমান দুর্বল হয়, তখন সে পাপ করার দুঃসাহস দেখায়। এ জন্যই জনৈক সালাফ বলেন:
'তাকওয়ার চিহ্ন তিনটি—এক. যথেষ্ট সক্ষমতা-সহ মন্দ কামনা-বাসনাকে পরিত্যাগ করা। দুই. নফসের নিকট অপছন্দনীয় হওয়া সত্ত্বেও সৎ আমল করে যাওয়া। তিন. কোনো আমানতের প্রতি নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমানতকে তার মালিকের নিকট সোপর্দ করা। '¹⁷
এ তিনটি কাজ যিনি করবেন, প্রমাণিত হবে যে, তার অন্তরে বিরাট ইমান ও দ্বীন রয়েছে। কেননা, এমন মুমিন তার সামনে হারাম (নিষিদ্ধকর্ম) দেখে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই হারামকে সে ত্যাগ করে। নিজের জন্য কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও, ইবাদত ও আনুগত্যে মন না লাগা সত্ত্বেও নিজেকে সে ইবাদত ও আনুগত্যে বাধ্য করে। নিজের কাছে থাকা আমানতের প্রতি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও উক্ত আমানতকে তার মালিকের নিকট ফিরিয়ে দেয়।
২. শরয়ি নসের ব্যাপারে অজ্ঞতা
আল্লাহর (বড়ত্ব ও মহত্ত্ব) সম্পর্কে জানা তাঁকে ভয় করা আবশ্যক করে। যে আল্লাহকে যতটুকু জানে, সে তাঁকে ততটুক ভয় করে। যে আল্লাহকে ভয় করে, সে সতর্ক ও সাবধান থাকে। তার রব তার হিসাব নেওয়ার আগেই সে নিজের হিসাব নেয়। সর্বদা সে সজাগ থাকে; কভু অসতর্ক-গাফিল হয় না। নিজের ব্যাপারে সে এতটা জানে, যা অন্যরা জানে না। আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করছেন— এটি সদা তার মনে গেঁথে থাকে। মনের অনেক চাহিদায় প্রবৃত্ত হওয়া থেকে নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করে। মনকে শরিয়তের লাগাম পরিয়ে রাখে, যেন মনের পদস্খলন হয়ে পথভ্রষ্ট না হয়। রবের ক্রোধের ফলে ত্বরান্বিত শাস্তি সম্পর্কে জানার কারণে নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণে রাখে। নিজেকে সবরের প্রশিক্ষণ দেয়। কষ্ট স্বীকার করার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলে। কোনো কাজে রত হওয়ার আগেই তার পরিণাম সম্পর্কে ভালো করে ভেবে নেয়। বিবেচনা করে তবে সামনে অগ্রসর হয়। প্রতিটি বিষয়ে হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে কাজ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
'আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীগণই ভয় করে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।'¹⁸
ইবনে জারির বলেন:
'আলিমগণ আল্লাহকে ভয় করে তাঁর ইবাদত-আনুগত্যে প্রবৃত্ত হয়ে তাঁর শাস্তি থেকে নিজেদের আত্মরক্ষা করেন। আল্লাহ নিজ কুদরতে যা ইচ্ছা, তা-ই করতে পারেন। তিনি যা চান, তা-ই করেন। তাই যে আল্লাহর এমন ক্ষমতা ও পরাক্রমশীলতার কথা যথাযথভাবে জানবে, সে নিজের পাপের কারণে আপতিত শাস্তির ব্যাপারে অধিক নিশ্চিত হবে। এভাবে সে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহতে ভয় করবে, ভীত হবে। কারণ যিনি সবকিছু করতে পারেন, তাঁর অবাধ্য হলে তিনি শাস্তিও দিতে পারেন—এটা নিশ্চিত। "¹⁹
৩. আত্মার সুরক্ষায় ও সাধনায় ঘাটতি
মনের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে মন্দের প্রতি সৃষ্ট প্রবণতা বা আগ্রহ মন্দের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারণ হয়। এখান থেকেই অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় অন্তরের বিভিন্ন রোগ। তাই একজন মুসলিম যেন অন্তরের মাঝে বুদবুদ ওঠার মতো এ সকল মন্দ প্রবণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করে, সাবধান থাকে।
এ সকল মন্দ প্রবণতার বিরুদ্ধে সাধনা ও এ সকল মন্দকে প্রতিহত করার প্রতি যে অনাগ্রহ আসে, সেটা থেকেও যেন সাবধান থাকে। কারণ সতর্কতা ও সাবধানতার মর্যাদা অনেক উচ্চ ও উন্নত। কোনো ভালো বা মন্দ কাজের শুরুটা হয় মনের মাঝে ওঠা বুদবুদ-সম এ সকল চিন্তা থেকে। যখন আপনি মনের মন্দ বুদবুদগুলোকে ওঠার সাথে সাথে প্রতিহত করবেন, তবে আপনি নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, দমন করতে পারবেন মন্দ কামনা-বাসনাকে। আর যখন এ সকল মন্দ ও হারাম বুদবুদ চিন্তাগুলো আপনার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, আপনার ওপর বিজয় হয়ে যায়, তখন আপনার কামনা-বাসনার চোরাবালিতে আপনার পদস্খলন নিশ্চিত হয়।
মনের মাঝে যেমন রহমানের পক্ষ থেকে ভালো চিন্তার উদয় হয়। তেমনই শয়তানের পক্ষ থেকে মন্দ চিন্তারও উদয় হয়। আবার নফসের পক্ষ থেকে নফসানি চিন্তার বুদবুদও উৎপন্ন হয়। যখন মন্দ বুদবুদগুলো প্রথম স্তরে থাকে, তখন তার চিকিৎসা করা সহজ ও সহজতর হয়। মানুষ যখন দ্রুতই এর চিকিৎসা করে, তখন তার সংস্কারও দ্রুতই হয়ে যায়।
৪. আল্লাহভীতি দুর্বল হওয়া
আল্লাহর ভয় নিরাপত্তার ঢাল। আল্লাহর ভয় বান্দাকে হারামে পতিত হওয়া থেকে রক্ষাকারী। একইভাবে আল্লাহর এ ভয় মন্দ কামনা-বাসনা ও মন্দ প্রবৃত্তির পেছনে তাড়িত হওয়া থেকে রক্ষাকারী।
আল্লাহর অবাধ্যতাকে ভয় করে ইউসুফ আ. مَعَاذَ الله বলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলেন। ফলে আল্লাহও তাঁকে রক্ষা করলেন। তাঁকে রক্ষা করলেন মহিলাদের কূট-কৌশল থেকে। আর কিয়ামতের দিন-যেদিন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়াই থাকবে না, সেদিন আরশের ছায়ায় যে সাত শ্রেণির ব্যক্তি আশ্রয় পাবেন, তাদের এক শ্রেণির ব্যক্তি হলো, আল্লাহকে ভয় করে পাপ থেকে আত্মরক্ষাকারী।
আবু হুরাইরা এ থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন:
سَبْعَةُ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلَّهِ، يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ .... وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ، فَقَالَ: إِنِّي أَخَافُ اللهَ،
'যেদিন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়াই থাকবে না, সেদিন আল্লাহ সাত শ্রেণির লোককে তাঁর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন।... (তন্মধ্যে এক শ্রেণি হলো) এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো বংশ-মর্যাদাসম্পন্না রূপবতী নারী পাপ কাজের প্রতি আহ্বান করল। কিন্তু সে বলল, "আমি আল্লাহকে ভয় করি।”’²⁰
এটাই আল্লাহ তাআলার প্রতি সত্য ইমান। যে ইমান তার অধিকারীর মনে আল্লাহর ভয় ঢেলে দিয়েছে। যে ইমানের ফলে মুমিনের মনে সদা এ কথা বদ্ধমূল থাকে যে, এক আল্লাহ আমাকে সর্বদা দেখছেন। আমি গোপনে প্রকাশ্যে যা করি, তা তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন।
আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার এ কয়েকটি বিশেষ কারণের বর্ণনা এ পর্যন্ত। আমরা আল্লাহর কাছে এমন দুর্বলতা থেকে নিরাপত্তা চাই। আল্লাহ আমাদের এ প্রার্থনা কবুল করুন।
টিকাঃ
১৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৯/৩৯৩
১৮. সুরা ফাতির: ২৮
১৯. তাফসিরুত তাবারি: ২০/৪২৬
২০. সহিহুল বুখারি: ৬৬০, সহিহু মুসলিম: ১০৩১
📄 মুমিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ
বিভিন্ন স্থানে মুমিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের ধরন ও প্রকার বিভিন্ন হয়ে থাকে। অবস্থা ও সময় অনুযায়ী আত্মনিয়ন্ত্রণে বিভিন্নতা হয়ে থাকে। কোনো মুমিন যখন রাগের বশবর্তী হওয়ার উপক্রম হয়, তখন তার রাগ থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যখন কোনো পাপ কাজে প্রবৃত্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন তাকে পাপ কাজ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যখন কেউ তালাক দেওয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তখন তালাক না দিয়ে নিজেকে দমিয়ে নিজ আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এভাবে সময় ও স্থান অনুযায়ী আত্মনিয়ন্ত্রণে বিভিন্নতা হয়। আর এমন কিছু আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র, ধরন ও প্রকার নিম্নে উপস্থাপন করছি :
• ক্রোধ সংবরণ এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জিদ থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ
আল্লাহ তাআলা মুমিনের অনেক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে তার প্রশংসা করেছেন। সে সকল উন্নত বৈশিষ্ট্যের একটি হলো ক্রোধ বা রাগ সংবরণ করা, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন :
الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
'যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল (তারা-ই মুত্তাকি)। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।'²¹
এখানে তিনটি উন্নত বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যার প্রথমটি হচ্ছে, ক্রোধ সংবরণ ও প্রতিহতকরণ। দ্বিতীয়টি হলো, প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মানুষকে ক্ষমা করা। তৃতীয়টি ও সবচেয়ে উন্নত বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে, মানুষের মন্দ আচরণের বিপরীতে তাদের প্রতি সদাচরণ করা।
সাহল বিন মুআজ বিন আনাস আল-জুহানি স্বীয় পিতার সূত্রে নবিজি থেকে বর্ণনা করেন। নবিজি বলেন:
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ يَسْتَطِيعُ أَنْ يُنَفِّذَهُ دَعَاهُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ عَلَى رُءُوسِ الخَلَائِقِ حَتَّى يُخَيَّرَهُ فِي أَيِّ الحُورِ شَاءَ
'যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধের বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েও ক্রোধকে সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডেকে এনে নিজের পছন্দমতো হুর বাছাই করে নেওয়ার স্বাধীনতা দেবেন। '²²
আলি ইবনুল হুসাইন -এর একটি দাসী ছিল, যে অজুর সময় পানি ঢেলে দিত। একবার পানির পাত্রটি হাত ফসকে আলি -এর মুখে আঘাত করে। এতে তিনি বেজায় রাগ হয়ে দাসীর দিকে মুখ তুলে তাকান। সাথে সাথে দাসী বলে উঠলেন, আল্লাহ বলেছেন : وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ ]'যারা ক্রোধ সংবরণকারী']
আলি : আমি আপন ক্রোধকে সংবরণ করলাম। দাসী : وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ]'এবং যারা মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল হয়।']। আলি : আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। দাসী : وَاللهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ]'আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।'[ আলি : যাও, তুমি স্বাধীন। আমি তোমাকে স্বাধীন করে দিলাম।²³
আল্লাহ তাআলা ক্ষমার আদেশ দিয়ে তাঁর নবি -এর উদ্দেশে বলেন:
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
'আপনি ক্ষমাশীলতার নীতি অবলম্বন করুন। সৎ কাজের আদেশ দিন। আর জাহিলদের এড়িয়ে চলুন। '²⁴
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعُ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
'ভালো আর মন্দ সমান নয়। উৎকৃষ্ট দিয়ে মন্দকে প্রতিহত করুন। ফলে আপনার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো। '²⁵
ইবনে আব্বাস বলেন:
'যে আপনার সাথে মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করবে, তার সে আচরণকে আপনি আপনার সহনশীলতা দ্বারা প্রতিহত করুন।'
ইবনে আব্বাস আরও বলেন:
'কেউ অন্যকে গালি দিল। ফলে অন্যজন বললেন, "যদি তুমি সত্য বলে থাকো, তবে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। যদি তুমি মিথ্যা বলে থাকো, তবুও আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।”²⁶
নবিগণ আ. ছিলেন ক্ষমাশীলতার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম আদর্শ। ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَحْكِي نَبِيًّا مِنَ الْأَنْبِيَاءِ، ضَرَبَهُ قَوْمُهُ فَأَدْمَوْهُ، فَهُوَ يَمْسَحُ الدَّمَ عَنْ وَجْهِهِ، وَيَقُولُ: رَبِّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
'আমি যেন এমন একজন নবির প্রতি তাকিয়ে আছি, যিনি নবিদের কোনো এক নবি সম্পর্কে বর্ণনা করছেন— যাঁকে তাঁর সম্প্রদায় প্রহার করে রক্তে রঞ্জিত করেছে। আর তিনি নিজ মুখের রক্ত মুছে চলেছেন আর বলছেন, “হে আল্লাহ আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দিন। কারণ তারা অজ্ঞ।”²⁷
উরওয়া বিন জুবাইর নবিজি-এর স্ত্রী আয়িশা থেকে বর্ণনা করেন, আয়িশা তাকে হাদিস শুনিয়েছেন যে—
أَنَّهَا قَالَتْ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ أَتَى عَلَيْكَ يَوْمٌ كَانَ أَشَدَّ مِنْ يَوْمِ أُحُدٍ؟ فَقَالَ: لَقَدْ لَقِيتُ مِنْ قَوْمِكِ وَكَانَ أَشَدَّ مَا لَقِيتُ مِنْهُمْ يَوْمَ الْعَقَبَةِ، إِذْ عَرَضْتُ نَفْسِي عَلَى ابْنِ عَبْدِ يَالِيلَ بْنِ عَبْدِ كُلَالٍ فَلَمْ يُجِبْنِي إِلَى مَا أَرَدْتُ، فَانْطَلَقْتُ وَأَنَا مَهْمُومُ عَلَى وَجْهِي، فَلَمْ أَسْتَفِقْ إِلَّا بِقَرْنِ النَّعَالِبِ، فَرَفَعْتُ رَأْسِي فَإِذَا أَنَا بِسَحَابَةٍ قَدْ أَظَلَّتْنِي فَنَظَرْتُ فَإِذَا فِيهَا جِبْرِيلُ، فَنَادَانِي، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ سَمِعَ قَوْلَ قَوْمِكَ لَكَ، وَمَا رُدُّوا عَلَيْكَ، وَقَدْ بَعَثَ إِلَيْكَ مَلَكَ الْجِبَالِ لِتَأْمُرَهُ بِمَا شِئْتَ فِيهِمْ، قَالَ: فَنَادَانِي مَلَكُ الْجِبَالِ وَسَلَّمَ عَلَيَّ، ثُمَّ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ ، إِنَّ اللَّهَ قَدْ سَمِعَ قَوْلَ قَوْمِكَ لَكَ، وَأَنَا مَلَكُ الْجِبَالِ وَقَدْ بَعَثَنِي رَبُّكَ إِلَيْكَ لِتَأْمُرَنِي بِأَمْرِكَ، فَمَا شِئْتَ، إِنْ شِئْتَ أَنْ أُطْبِقَ عَلَيْهِمُ الْأَخْشَبَيْنِ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا
'আয়িশা রাসুলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, উহুদের দিনের চেয়ে কঠিন কোনো দিন আপনার জীবনে এসেছে?”
রাসুল বলেন, "আমি তোমার সম্প্রদায়ের কাছ থেকে যা কিছুর সম্মুখীন হয়েছি, তা তো হয়েছিই। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি আকাবার দিন-যেদিন আমি ইবনে আবদে ইয়ালিল বিন আবদে কুলালের নিকট আমার ব্যাপারটি উপস্থাপন করলাম। সে তখন আমার চাওয়ার প্রতি সাড়া দেয়নি। আমি চিন্তিত অবস্থায় সেখান থেকে চলে আসি। করনুস সাআলিব আসা পর্যন্ত আমার এ চিন্তা লাঘব হয়নি। আমি তখন আমার মাথাকে ওপরে উঠাই। দেখি, আমি একটি মেঘের নিচে। মেঘটি আমাকে ছায়া দিয়ে চলছে। আমি মেঘের মাঝে দেখতে পেলাম, সেখানে জিবরিল আ.। তখন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “আল্লাহ আজজা ওয়া জাল্লা আপনার প্রতি আপনার সম্প্রদায়ের কথা শুনেছেন। তাদের প্রত্যুত্তর তিনি শুনেছেন। আল্লাহ পাহাড়ের ফেরেশতাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন, যেন আপনি যা ইচ্ছা করেন (তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য) আদেশ করতে পারেন।”
রাসুল বলেন, “এবার পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাকলেন এবং সালাম করলেন। তারপর বললেন, “হে মুহাম্মাদ, আল্লাহ আপনার সম্প্রদায়ের কথা শুনেছেন। আমি পাহাড়ের ফেরেশতা। আপনার রব আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, যেন আপনি যেভাবে চান আমাকে আদেশ করেন। যদি আপনি চান, তবে আমি দুপাহাড়কে তাদের ওপর চাপিয়ে দেবো।”
রাসুল উত্তরে তাকে বললেন, “বরং আমি তো আশা করি, তাদের ঔরস থেকে আল্লাহ এমন বংশধর বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না।””²⁸
হাফিজ ইবনে হাজার বলেন:
'এ হাদিসে নবিজি-এর নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি স্নেহ ও দরদের কথা ফুটে উঠেছে। আরও বেশি ফুটে উঠেছে তাঁর ধৈর্য ও আত্মসংযমের গুণদুটি। তাঁর এ স্নেহ, দয়া, দরদ আল্লাহর বাণীর অনুপম উদাহরণ।²⁹
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنتَ لَهُمْ [آل عمرن : "আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র হয়েছেন।"*|*³⁰ আল্লাহ আরও বলেন وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إلا رحمة للعالمين "আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।"**|***|³¹
আল্লাহর নবি ইউসুফ আ. ভাইদের পক্ষ থেকে কত কষ্ট স্বীকার করলেন। এরপরও তিনি ভাইদের বলেছেন:
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’³²
ক্ষমাশীলতা উন্নত সম্মানের মাধ্যম। মর্যাদা উন্নত হওয়ার একটি উপায়। ক্ষমাশীলতায় শান্তি ও প্রশান্তি রয়েছে। ব্যক্তিত্বের মর্যাদা নিহিত এতে। ক্ষমাশীলতার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সম্মানের এতটা উচ্চতায় পৌঁছতে পারে, যা অন্যরা পারে না।
ক্রোধ প্রতিষেধক যেহেতু মানুষের ভেতর অস্থিরচিত্ততা ও লঘুচিত্ততা রয়েছে। শয়তানও এর ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। শয়তান মানুষের অস্থিরচিত্ততাকে উসকে দিয়ে তাদেরকে ক্রোধের ওপর এনে তাদের দ্বারা খারাপ কাজ করিয়ে নেয়। তাই ক্রোধ উপশমের পথ-পদ্ধতি জানতে হবে। যেন ক্রোধের খারাপ প্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচা যায়, ক্রোধের অনিষ্টতা পরিহার করা যায়। ক্রোধের কিছু প্রতিষেধক এমন :
১. ক্রোধ সংবরণের মাহাত্ম্য সম্পর্কে অবগত থাকা
কোনো কিছুর মাহাত্ম্য সম্পর্কে অবগত থাকা উক্ত কাজের প্রতি উৎসাহিত করে। আহহ্বান করে উক্ত কাজ সম্পাদনের প্রতি। সাহল বিন মুআজ বিন আনাস আল-জুহানি স্বীয় পিতার সূত্রে নবিজি থেকে বর্ণনা করেন। নবিজি বলেন:
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ يَسْتَطِيعُ أَنْ يُنَقَّذَهُ دَعَاهُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ عَلَى رُءُوسِ الخَلَائِقِ حَتَّى يُخَيَّرَهُ فِي أَيَّ الْحُورِ شَاءَ
'যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধের বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েও ক্রোধকে সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডেকে এনে তাকে নিজের পছন্দমতো হুর বাছাই করে নেওয়ার স্বাধীনতা দেবেন। ¹⁰⁰
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
مَا مِنْ جُرْعَةٍ أَعْظَمُ أَجْرًا عِنْدَ اللهِ، مِنْ جُرْعَةِ غَيْظٍ كَظَمَهَا عَبْدُ ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ
'অন্য কোনো কিছু সংবরণে এত বিরাট প্রতিদান নেই, যত প্রতিদান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ক্রোধ সংবরণ করার মাঝে রয়েছে। ¹³⁴
২. ক্রোধ উদ্রেককারী কারণগুলো এড়িয়ে চলা ও ক্রোধ দমনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত-
أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوْصِنِي، قَالَ: لَا تَغْضَبْ فَرَدَّدَ مِرَارًا، قَالَ: لَا تَغْضَبْ
'এক ব্যক্তি নবিজি -কে বললেন, "আমাকে উপদেশ দিন।" তিনি বললেন, "তুমি রাগ কোরো না।" লোকটি কয়েকবার তা বললে তিনি প্রতিবারই বললেন, "তুমি রাগ কোরো না।"³⁰
ইবনে রজব বলেন: নির্দেশনা-প্রার্থীকে রাসুল-এর لَا تَغْضَبْ বলার দ্বারা দুটি উদ্দেশ্য হতে পারে: প্রথমত, তাঁর এ নির্দেশনা মূলত উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার আদেশ। দয়া, দান, আত্মসংযম, লজ্জা, বিনয়, সহনশীলতা, অন্যের কষ্ট দূর করা, ক্ষমা, ক্রোধ সংবরণ, হাস্যোজ্জ্বল থাকার মতো ইত্যাদি উত্তম চরিত্রের গুণাবলিতে যখন কেউ নিজের চরিত্রকে সজ্জিত করবে; উত্তম চরিত্রের এ সকল একক যখন তার অভ্যাসে পরিণত হবে-তখন এ উত্তম চরিত্রই রাগ হওয়ার কারণ থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিকে রাগান্বিত হতে বাধা দেবে।
দ্বিতীয়ত, তাঁর এ নির্দেশনা দ্বারা উদ্দেশ্য হতে পারে, রাগলেও রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু করে ফেলবে না। বরং তখন আত্মনিয়ন্ত্রণ করে রাগান্বিত মনের চাহিদা পরিত্যাগ করবে, তদনুযায়ী কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। ³⁶ أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ .. শয়তানই সকল সমস্যার মূল। সকল অনিষ্টের মূল উদঘাটক শয়তান। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ 'আর যদি শয়তানের কোনো প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে তুমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী। '³⁷
সুলাইমান বিন সুরাদ বলেন :
اسْتَبَّ رَجُلَانِ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَجَعَلَ أَحَدُهُمَا تَحْمَرُ عَيْنَاهُ وَتَنْتَفِخُ أَوْدَاجُهُ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي لَأَعْرِفُ كَلِمَةً لَوْ قَالَهَا لَذَهَبَ عَنْهُ الَّذِي يَجِدُ: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، فَقَالَ الرَّجُلُ: وَهَلْ تَرَى بِي مِنْ جُنُونٍ؟
‘নবিজি-এর নিকটে থেকেও দুজন লোক পরস্পর গাল-মন্দ করছিল। একজন তার দুচোখ রাঙাতে শুরু করল, যেন রাগের চোটে তার নাক ফেটে যাবে। রাসুলুল্লাহ তখন বললেন, “আমি এমন এক বাক্য জানি, তা যদি সে বলে, তবে তাকে যা ধরেছে তা চলে যাবে। সে বাক্যটি হলো : أَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ (বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)” এরপর লোকটি বলল, “আপনি কি আমার মাঝে কোনো পাগলামি দেখছেন?””³⁸
৪. রাগান্বিত অবস্থায় চুপ থাকা, জিহ্বাকে সংযত রাখা, জিহ্বায় লাগাম দেওয়া
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
عَلَّمُوا، وَيَسِّرُوا ، وَلَا تُعَسِّرُوا، وَإِذَا غَضِبْتَ فَاسْكُتْ، وَإِذَا غَضِبْتَ فَاسْكُتْ، وَإِذَا غَضِبْتَ فَاسْكُتْ
'তোমরা শিক্ষা দাও, সহজ করো, কঠিন করো না। রাগান্বিত হলে চুপ থাকো। রাগান্বিত হলে চুপ থাকো। রাগান্বিত হলে চুপ থাকো।'³⁹
৫. দেহ-আকৃতি পরিবর্তন করা
আবু জার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ আমাদের উদ্দেশে বললেন:
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمُ فَلْيَجْلِسُ، فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعْ
'তোমাদের কারও যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগের উদ্রেক হয়, তবে সে যেন বসে পড়ে—এতে যদি তার রাগ দূর হয় তো ভালো, অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে।'⁴⁰
৬. রাগ ফলানোর পরিণাম-পরিণতি সম্পর্কে জানা
কারও মালিকানায় যা রয়েছে, রাগান্বিত হওয়ার এক মুহূর্তের ভেতরেই তার চেয়ে ঢের হারাতে পারে। এ রাগের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, সন্তানদের থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্যের অধিকার নষ্ট করা, দুর্বলের ওপর সীমালঙ্ঘন করা, ভাইয়ে ভাইয়ে শত্রু হওয়ার মতো কত অঘটন যে ঘটেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
যখন কোনো সুস্থ মস্তিষ্কধারী লোক রাগের এসব পরিণাম ও পরিণতি বুঝতে পারবে—এ বুঝই তাকে রাগ থেকে বাঁচাবে।
রাগের সময় মুআবিয়া-এর হাদিস স্মরণের ঘটনা
মুআবিয়া বিন আবু সুফইয়ান থেকে বর্ণিত, তিনি একবার মানুষের সামনে খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন তিনি দুই কি তিন মাস ধরে দানের বস্তু আটকে রেখেছিলেন। তখন তাকে উদ্দেশ্য করে আবু মুসলিম বললেন, 'হে মুআবিয়া, এ সম্পদ আপনার নয়; আপনার বাবারও নয়; আপনার মায়েরও নয়।' এ কথা শোনার পর মুআবিয়া লোকদের সেখানে থাকতে বললেন। মিম্বার থেকে নামলেন। গোসল করলেন। তারপর ফিরে এসে বললেন, 'মানুষসকল,
আবু মুসলিম আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, এ সম্পদ আমার নয়, আমার বাবার ও আমার মায়েরও নয়। আবু মুসলিম সত্য বলেছেন। আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি :
إِنَّ الْغَضَبَ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَالشَّيْطَانُ مِنَ النَّارِ، وَالْمَاءُ يُطْفِئُ النَّارَ، فَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَغْتَسِلْ
“রাগের উৎপত্তি শয়তান থেকে। শয়তানের সৃষ্টি আগুন থেকে। আর পানি আগুন নির্বাপণ করে। তাই যখন তোমাদের কেউ রাগ করে, সে যেন গোসল করে নেয়।”
মুআবিয়া বলতে থাকলেন, 'আল্লাহর নামে আগামীকাল তোমরা নিজেদের দানের বস্তুগুলো পেয়ে যাবে।'⁴¹
বাদশাহ আবু জাফরকে হাদিস শুনিয়ে দেওয়ার ঘটনা
মুবারক বিন ফুজালা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাওয়ার বিন আব্দুল্লাহ সে প্রতিনিধি দলের একজন ছিলেন, যে প্রতিনিধি দলটি বসরাবাসীর পক্ষ থেকে আবু জাফরের নিকট গিয়েছিল। সাওয়ার বলেন, 'আমি সেখানেই আবু জাফরের নিকট ছিলাম। তখন এক লোককে নিয়ে আসা হলো। আবু জাফর তাকে হত্যা করার আদেশ দিল। আমি মনে মনে বললাম, “আমি থাকতে মুসলিমদের এক লোককে সে হত্যা করে কীভাবে!” আমি তাকে বললাম, “হে আমিরুল মুমিনিন, আমি কি আপনাকে এমন একটি হাদিস শোনাব না, যা আমি হাসান -কে বলতে শুনেছি?” তিনি বললেন, “সেটা কী?” আমি বললাম, “আমি হাসান -কে বলতে শুনেছি, যখন কিয়ামতের দিন হবে। আল্লাহ তাআলা মানুষদের একটি উচ্চ ভূমিতে একত্র করবেন, যেখানে আহ্বানকারী তাদের শুনতে পাবে। তারা দৃষ্টিগোচর হবে। তখন একজন ঘোষক দাঁড়াবেন। ঘোষণা দেবেন, “তোমাদের মধ্যে কারও আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ থাকলে সে যেন দাঁড়ায়।” তখন কেবল নিষ্কলুষরাই দাঁড়াতে পারবে।” আবু জাফর বললেন, “আপনি কি হাসান থেকে শুনেছেন এটি?”
আমি বললাম, “আল্লাহর শপথ, আমি এ কথা তাঁর নিকট থেকেই শুনেছি।” আবু জাফর এরপর বললেন, “আমরা তাকে মুক্ত করলাম।”⁴²
ক্রোধান্বিত ব্যক্তির কুরআনের আয়াত স্মরণ করা, এ স্মরণ তাকে জুলম করা থেকে বিরত রাখবে
বর্ণিত আছে, জিয়াদ একবার এক খারিজিকে ধরে আনল। কিন্তু এ ব্যক্তিটি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো। এবার জিয়াদ সে খারিজির এক ভাইকে ধরে বলল, 'হয় তুমি তোমার ভাইকে নিয়ে আসবে, না হয় আমি তোমার ঘাড়ে আঘাত হানব।' লোকটি বলল, 'আমি যদি আমিরুল মুমিনিনের কাছ থেকে সুপারিশ-সংবলিত কোনো চিঠি নিয়ে আসি, তুমি আমাকে যেতে দেবে?' জিয়াদ বললেন, 'হ্যাঁ।' লোকটি বলল, 'তবে শোনো, আমি তোমার নিকট মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবানের বার্তা নিয়ে আসছি। সাথে এর ওপর ইবরাহিম ও মুসা দুই নবির সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করছি। এরপর সে তিলাওয়াত করল।
أَمْ لَمْ يُنَبَّأُ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى * وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةً وِزْرَ أُخْرَى
"নাকি মুসার কিতাবের সংবাদ তাকে জানানো হয়নি? আর ইবরাহিমের কিতাবের খবরও কি তাকে জানানো হয়নি? যে ছিল পুরোপুরি দায়িত্ব পালনকারী। সে খবর এই যে, কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না।"⁴³ তার এ কথা শুনে জিয়াদ বললেন, 'তাকে যেতে দাও। এ লোক তার প্রমাণ বুঝিয়ে দিয়েছে।'⁴⁴
• কাপুরুষ অভিহিত হওয়ার ভয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ
খুবাইব -কে নিয়ে মক্কাবাসীরা হারামের বাইরে এল তাঁকে হত্যা করবে বলে। খুবাইব তাদের বললেন, 'তোমরা আমাকে দুই রাকআত নামাজ পড়তে দাও।' তারা খুবাইব -কে ছাড়ল। তিনি দুই রাকআত নামাজ পড়ে নিলেন। এরপর বললেন, 'তোমরা যদি ধারণা না করতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি, তবে আমি নামাজকে আরও দীর্ঘ করতাম। '⁴⁵ এমনটা করা প্রশংসনীয়। কারণ, এমনটা করার মাঝেই মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহর দ্বীনের মর্যাদা উচ্চ থাকে।
মুআবিয়া বলেন, 'সিফফিনের দিন আমি বাহনের রিকাবে আমার পা রাখলাম। কিন্তু পরাজিত হওয়ার ব্যাপারে আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। কিন্তু ইতনাবার এ কথাটি আমার ভীতি দূর করে দিল যে—
أَبَتْ لِي عِفَّتِي وَأَبَى بَلَائِي * وَأَخْذِي الْحَمْدَ بِالثَّمَنِ الرَّبِيحِ وَإِكْرَاهِي عَلَى الْمَكْرُوهِ نَفْسِي * وَضَرْبِي هَامَةَ الْبَطَلِ الْمُشِيحِ وَقَوْلِي كُلَّمَا جَشَأَتْ وَجَاشَتْ * مَكَانَكِ تُحْمَدِي أَوْ تَسْتَرِيحِي
'আমার সংযম, আমার সাহসিকতা ও স্বল্প মূল্যে প্রশংসা পাওয়ার আগ্রহ আমাকে (যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে) বাধা দিয়েছে।
আর বাধা দিয়েছে আমার কষ্টকর কাজে নিজেকে বাধ্য করার মানসিকতা এবং চৌকস বীরের মাথায় আঘাত করার চিন্তা।
অনুরূপ বাধা দিয়েছে উদ্বেলিত ও শঙ্কিত হওয়ার সময় আমার এ উক্তি “স্থির থাকো, তাহলে প্রশংসিত হবে এবং স্বস্তি পাবে।”⁴⁶
* মুতানাব্বি ফারিস রাজ্য থেকে ফিরছিলেন। যাচ্ছিলেন বাগদাদের পথে। এরপরের গন্তব্য কুফা। পথিমধ্যে ফাতিক আল-আসাদি ও তার সাঙ্গোপাঙ্গো তাদের পথরোধ করল—কারণ, হয়তো মুতানাব্বি তাকে বিদ্রুপ করে কিছু বলেছিল বা তাকে আঘাত করেছিল-মুতানাব্বির সাথেও তার একদল সাথি ছিল। উভয় দলে যুদ্ধ বেধে গেল। ফলে মুতানাব্বি নিহত হলো। নিহত হলো তার ছেলে মুহাসসিদ ও গোলাম মুফলিহ।
বর্ণনাকারীরা বলেন যে, মুতানাব্বি খুব লড়েছিল সেদিন। কিন্তু যখন পরাজয় সামনে দেখল, তখন পালানোর উপক্রম করলে গোলাম তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'মানুষ যেন কখনো আপনার ব্যাপারে পালানোর কথা না বলে। আর আপনিই এ পঙ্ক্তির রচয়িতা যে—
فالخيل والليل والبيداء تعرفني والطعن والضرب والقرطاس والقلم
'এ ঘোড়া, এ ভীষণ রাত, এ বিস্তর মরু—সবাই আমাকে চেনে। চেনে আমাকে আঘাত, প্রহার, কাগজ ও কলম।'
মুতানাব্বি এবার বলল, 'তুমি তো আমাকে হত্যা করলে। আল্লাহ তোমাকে হত্যা করুন। তুমি ফেরত যাওয়ার চিন্তা করো।' এ সময় অপর দলের নেতা তার গলায় বর্শা বিঁধিয়ে দিয়েছিল। এভাবে তাকে হত্যা করে সকলে তার পাশে একত্রিত হলো। এরপর তাকে বর্শা দিয়ে খোঁচাতে লাগল। হত্যা করার পর তার সকল মালামাল নিয়ে নিল। আর এখানে তার পঙ্ক্তিই তার নিহত হওয়ার কারণ ছিল। ⁴⁹ এমনটা করা নিন্দনীয়। এমন কাজ-কর্ম জাহিলিয়াতের।
• আদব রক্ষা করে আত্মনিয়ন্ত্রণ
আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'এক রাতে আমি নবিজি -এর সাথে নামাজ পড়ছিলাম। এক সময় আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। এমনকি আমি একটি মন্দ কাজের ইচ্ছা করেছিলাম। আমরা প্রশ্ন করলাম, “আপনি কীসের ইচ্ছে করেছিলেন?” তিনি বললেন, “আমি ইচ্ছে করেছিলাম যে, নবিজি দাঁড়িয়ে পড়ুক, আর আমি বসে পড়ি।””⁵⁰
সিন্দি বলেন: 'আব্দুল্লাহ -এর কথা "একটি মন্দ কাজ"-এর অর্থ হচ্ছে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর হওয়ার কারণে আমি একটি অনুপযুক্ত কাজ করার ইচ্ছে করেছিলাম যে, আমি নামাজ বসে পড়ি অথবা নামাজ ছেড়ে দিই। আর এ নামাজটি ছিল নফল নামাজ। অন্যথায় ফরজ নামাজের ইমামতের সময় তো মুক্তাদির প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখা হয়। ¹³⁹
নববি বলেন: 'এখান থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম ও বড়দের সাথে আদব রক্ষা করে চলতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কোনো কাজ হারাম না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কথা-কাজে তাদের বিরোধী হওয়া যাবে না। আলিমগণ এ বিষয়ে একমত যে, যখন মুক্তাদির ওপর ফরজ বা নফল নামাজে দাঁড়ানো কষ্টকর হয়ে যাবে, অথবা সে দাঁড়িয়ে থাকতে অক্ষম হবে, তখন তার জন্য বসে পড়া জায়িজ হবে। কিন্তু ইবনে মাসউদ আদব রক্ষার্থে নবিজি -এর সাথে নামাজ পড়াকালীন বসে যাননি। '⁵⁰
• পদ মর্যাদার খেয়াল রেখে ও যথার্থ স্থানে নেতার অনুসরণে সংযত থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা
মুসা বিন আইয়ান বলেন, 'আমাকে আওজাই বলেন, “হে আবু সাইদ, আমরা পরস্পর কৌতুক করতাম, হাসি-ঠাট্টা করতাম। কিন্তু যখন আমাদেরকে (আমাদের কেউ) নেতৃত্ব দিতেন, তখন তিনি আমাদের মুখে সামান্য মুচকি হাসিও দেখতেন না।"'⁵¹
• আল্লাহর নির্ধারিত সীমানাগুলো ঠিক রাখার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা
মুজাহিদ বর্ণনা করেন:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَمْنَعُوا النِّسَاءَ مِنَ الْخُرُوجِ إِلَى الْمَسَاجِدِ بِاللَّيْلِ، فَقَالَ ابْنُ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ: لَا نَدَعُهُنَّ يَخْرُجْنَ فَيَتَّخِذْنَهُ دَغَلًا . قَالَ فَزَبَرَهُ ابْنُ عُمَرَ وَقَالَ: أَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. وَتَقُولُ: لَا نَدَعُهُنَّ
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেন, 'তোমরা রাতে মসজিদে যাওয়া থেকে নারীদের নিষেধ কোরো না।' তখন আব্দুল্লাহ বিন উমরের কোনো এক পুত্র বলে উঠলেন, 'আমরা তাদের বাইরে যেতে দেবো না, এতে তারা দোষযুক্ত হবে।' তখন ইবনে উমর তাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'আমি তোমাকে বললাম, রাসুল বলেছেন আর তুমি বলো—আমরা তাদের বের হতে দেবো না!'⁵²
নুআইম আল-আশজায়ি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যখন রাসুল মুসাইলামার পত্র পড়লেন, তখন তার দূতদ্বয়কে বললেন, “তোমরা তার ব্যাপারে কী বলো?” তারা বলল, “সে যেমন (নবুয়তের দাবি করে) বলে, আমরাও তাকে তেমন মানি।” তখন রাসুল বললেন, “আল্লাহর শপথ, যদি দূত হত্যা করা যেত, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের দুজনকে হত্যা করতাম।””⁵³
ফজল বিন মুসা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: 'ফুজাইল একজন ডাকাত ছিলেন। তিনি একসময় আবিওয়াব্দ, সারাসের পথে ডাকাতি করতেন। তার তাওবার ঘটনা এমন : ফুজাইল এক তরুণীর প্রেমে পড়েছিলেন। একদা তিনি দেয়াল টপকে তরুণীর কাছে যাওয়ার জন্য দেয়ালে আরোহণ করছিলেন। তখন তিনি শুনলেন, সে তরুণী তিলাওয়াত করছিল:
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ
"যারা মুমিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় এখনো আসেনি?"⁵⁴
এ আয়াত শুনে ফুজাইল বললেন, “হ্যাঁ, হে রব। এখনই সে সময়।” এরপর তিনি ফিরে গেলেন। একটি ধ্বংসস্তূপে রাত কাটালেন। তখন সে পথে একটি সফরকারী দল ছিল। তারা পরস্পর বলছিল, “আমরা কি সামনে বাড়ব?” তাদের মধ্যকার অন্য একদল বলল, “না, সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তারপর সামনে বাড়ি। কারণ, ফুজাইল যে ডাকাতি করার জন্য পথে ওঁত পেতে আছে।” এরপর ফুজাইল তাওবা করলেন। সফরকারীরাও নিরাপদ হলো। এরপর ফুজাইল মৃত্যু পর্যন্ত হারাম শরিফের প্রতিবেশিত্বে কাটালেন। ⁵⁵
• ধার্মিকতার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، بِتَمْرَةٍ مَسْقُوطَةٍ فَقَالَ: لَوْلَا أَنْ تَكُونَ مِنْ صَدَقَةٍ لَأَكَلْتُهَا
'নবিজি পড়ে থাকা একটি খেজুরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, “যদি এ খেজুর সদাকার খেজুর হওয়ার সম্ভাবনা না থাকত, তবে অবশ্যই আমি এটি খেয়ে নিতাম।””⁵⁶
যখন ইফকের ঘটনা ঘটল। মুনাফিকরা আয়িশা সম্পর্কে যা বলার বলল। মানুষ তাদের কথাগুলো ছড়িয়ে দিতে লাগল। তখন আল্লাহ মুমিনদের মাতা জাইনাব-কে এসব থেকে রক্ষা করলেন। আয়িশা সে সম্পর্কে বলেন:
‘রাসুলুল্লাহ জাইনাব-কে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বললেন, "হে জাইনাব, তুমি কী জানো? তুমি কী দেখেছ?” জাইনাব বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার কান ও চোখের হিফাজত করতে চাই। আল্লাহর কসম, আমি তার মাঝে কেবল ভালোই দেখেছি।" আয়িশা বলেন, “জাইনাব সর্বদা আমার সাথে প্রতিযোগিতায় লেগে থাকত। কিন্তু (এ ব্যাপারটিতে) তার ধার্মিকতার কারণে আল্লাহ তাকে হিফাজত করেছেন।”'⁵⁷
জাইনাব ছিলেন আয়িশা-এর সতিন। জাইনাব আয়িশা-এর সাথে নবিজি-এর বিষয়ে প্রতিযোগিতা করতেন। অনেক নারী অপর নারীর বিরুদ্ধে, অনেক সতিন তো তার অপর সতিনের ওপর জুলম করে, সীমালঙ্ঘন করে প্রতিশোধ নেয়, বিজয়ী হতে চায়। কিন্তু জাইনাব দ্বীনদারিতার কারণে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন। তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ করে আয়িশা-এর ওপর মিথ্যারোপ করে অপরাধ করা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যম দ্বীনদারিতার কারণে প্রতিশোধ গ্রহণ ও বিজয়ী হওয়ার ইচ্ছা তার ওপর প্রবল হতে পারেনি।
কোনো মুমিন ততক্ষণ পর্যন্ত সত্যিকার তাকওয়ার স্তরে পৌঁছতে পারে না, যতক্ষণ না সে ব্যক্তি সমস্যাযুক্ত বিষয় ত্বরান্বিত করে—এমন সমস্যাহীন বিষয়কে ছেড়ে দেয়। জনৈক সালাফ বলেন, 'একটি হারামে পতিত হওয়ার ভয়ে আমরা সত্তরটি বৈধ বিষয়কে ছেড়ে দিতাম। '⁵⁸
• চুপ থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلَا يُؤْذِ جَارَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ইমান রাখে, ইমান রাখে শেষ দিবসের প্রতি, সে যেন নিজের প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ইমান রাখে, ইমান রাখে শেষ দিবসের প্রতি, সে যেন নিজ মেহমানকে সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ইমান রাখে, ইমান রাখে শেষ দিবসের প্রতি, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। '⁵⁹
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন :
রাসুল -এর বাণী لِيَصْمُتْ خَيْرًا أَوْ فَلْيَقُلْ -এটি জাওয়ামিউল কালিমের একটি। কেননা, প্রতিটি কথা হয় পুরোটা ভালো হবে, না হয় মন্দ হবে। অথবা যে কথাটি দুটোর কোনো একটিতে পরিণত হবে, সেটিই উক্ত প্রকারে ধর্তব্য হবে। ভালো কথার মাঝে সে সকল কথা অন্তর্ভুক্ত, যে সকল কথা বলা ফরজ বা মুসতাহাব। আর ভালো কথার মধ্যে সে সকল কথা স্থান পাবে, যে সকল কথা ভালো কথায় পরিণত হয়। এ ছাড়া আর যে সকল কথা আছে, সে সকল কথা হয় মন্দ অথবা মন্দ কথায় পরিণত হয়। তাই নবিজি এমন মন্দ কথা বলার ইচ্ছে মনে আসলে, সে ক্ষেত্রে চুপ থাকার আদেশ করেছেন। '⁶⁰
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
مَنْ صَمَتَ نَجَا 'যে চুপ থাকল, সে নাজাত পেল।'⁶¹
রাগিব বলেন :
صَمَتَ শব্দটি سُكُوْتِ শব্দ থেকে অনেক ব্যাপক। কেননা صَمَتَ শব্দটি যার বাকশক্তি আছে এবং যার বাকশক্তি নেই—উভয়ের চুপ থাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাই যার বাকশক্তি নেই, তাকে المُصْمَتِ ও الصَامِت বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়। অন্যদিকে যার বাকশক্তি আছে এবং সে এ শক্তি ব্যবহার করেনি, তার ক্ষেত্রে سُكُوْت ব্যবহৃত হয়। صَمَتَ কথা বলা থেকে মুক্ততা বোঝায়। কিন্তু কখনো কখনো কথা বলা ওয়াজিব হয়ে পড়ে। শরিয়ত এমনটা নির্ধারণ করে দেয়। তাই হাদিসের মর্মার্থ হবে, অনর্থক কোনো কথা বলবে না। বরং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই কথাকে সীমাবদ্ধ রাখবে। আর এতেই নাজাত নিহিত। '⁶²
জবানের বিপদাপদ মানুষকে ধ্বংস ও কষ্টে ফেলে দেয়। এটা নির্ভর করে কথকের ইচ্ছার ওপর। সে যদি নীরব থাকে, তাহলে সব বিপদ থেকেই নিরাপদ। আর যদি মুখ খোলে ও কথা বলা শুরু করে তাহলে নিজেকে বিপদের সম্মুখীন করল। তবে যদি তার কথাবার্তায় সততা, (পর্যাপ্ত) ইলম, (পূর্ণ) সতর্কতা, (ভালো) পর্যবেক্ষণ থাকে এবং কথা পরিমাণে স্বল্প হয়, তাহলে বিপদে নিপতিত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকার আশা করা যায়। এতদসত্ত্বেও সে বিপদে পড়ার আশঙ্কা থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। আপনি যদি কথা না বলে থাকতে পারেন, তাহলে তো সেটা গনিমত। অতএব, আপনি নীরবতা অবলম্বন করুন, নিরাপদ থাকবেন। কেননা, নিরাপদ থাকা দুই গনিমতের মধ্যে একটি গনিমত।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বলেন:
'চার বাদশার একটি কথার ওপর ঐকমত্য দেখে আমার আশ্চর্য লাগে। কিসরা বলল, "যদি আমি বলি, তবে লজ্জা পাব। যদি না বলি, তবে লজ্জিত হই না।" কাইসার বলল, "আমি যে কথা বলেছি, তার প্রত্যুত্তর দিতে যতটা না সক্ষম; যে কথা বলিনি, তার প্রত্যুত্তরে আরও বেশি সক্ষম।" হিন্দের বাদশা বলল, “আমি এমন কথককে দেখে আশ্চর্য হই, যার কথা ধরা হলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি তার কথা না ধরা হয়, তবুও সে কোনো উপকার পেল না।” চিনের বাদশা বলল, "যদি আমি কোনো কথা বলি, তবে বাকশক্তি আমাকে তার অধীন করে নিল। আর যদি আমি কোনো কথা না বলি, তবে সে আমার অধীনে থাকল। "'⁶⁰
আমিরুল মুমিনিন উমর বলেন, 'যার কথা বেশি হবে, তার ভুলও বেশি হবে। যে বেশি ভুল করবে, তার লজ্জাও কম হবে। আর যার লজ্জা কম হবে, তার দ্বীনদারিতাও কম হবে। আর যার দ্বীনদারিতা কম তার অন্তর তো মৃত। '⁶⁴
যখন কোনো মুসলিম জানবে যে, তার বলা প্রতিটি কথার ওপর তাকে হিসাব দিতে হবে—তখন তার কথা এমনিতেই কমে আসবে; সে কেবল উপকারী কথাগুলোই বলবে। তাই সাহাবায়ে কিরাম তাদের বলা কথাগুলোর হিসাব সংরক্ষণে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। আবু বকর নিজের জিহ্বা ধরে বলতেন, 'এটিই আমাকে ধ্বংসমুখে উপস্থিত করছে। '⁶⁵
আলকামা বিলাল বিন হারিস আল-মুজান্নি-এর সূত্রে বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، مَا يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ، يَكْتُبُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ بِهَا رِضْوَانَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، مَا يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ، يَكْتُبُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ بِهَا عَلَيْهِ سَخَطَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، قَالَ: فَكَانَ عَلْقَمَةُ يَقُولُ : كَمْ مِنْ كَلَامٍ قَدْ مَنَعَنِيهِ حَدِيثُ بِلَالِ بْنِ الْحَارِثِ
'কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কথা বলে, যার সম্পর্কে সে ধারণাও করে না যে, এ কথাটি কোথায় গিয়ে পৌঁছবে। অথচ এ কথার ফলে তার জন্য কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আল্লাহ স্বীয় সন্তুষ্টি লিখে দেন। আবার কেউ আল্লাহর অসন্তুষ্টির উদ্রেক করে এমন কথা বলে, যার সম্পর্কে সে ধারণাও করে না যে, এ কথাটি কোথায় গিয়ে পৌঁছবে। অথচ এ কথার ফলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তার জন্য স্বীয় অসন্তুষ্টি লিখে রাখেন।' আলকামা প্রায়ই বলতেন, 'বিলাল বিন হারিস বর্ণিত এ হাদিস আমাকে কত কথা থেকে যে বিরত রেখেছে, তার ইয়ত্তা নেই। '⁶⁶
• ইবাদতে ঘাটতি হলে আত্মাকে শাস্তি দিয়ে পুনরায় ঘাটতি হওয়া থেকে বাঁচার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা
ইবনে উমর-এর জামাআত ছুটে গেলে সেদিন রাতের পুরোটা জাগ্রত থাকলেন।⁶⁷ ইবনে আবি রবিআহ-এর ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত ছুটে গেলে তিনি একটি দাসী আজাদ করে দিলেন। ⁶⁸
আত্মা কখনো নিয়ন্ত্রণে থাকে না-যদি সাধনা, হিসাব সংরক্ষণ, শাস্তি প্রদানের এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তবেই আত্মা নিয়ন্ত্রণে ও সঠিক পথের ওপর অটল থাকে। আত্মাকে শাস্তি প্রদান বা উত্তম কাজে বাধ্যকরণের জন্য নিজের কমতি ও ঘাটতি সম্পর্কে অবগতি সহায়ক হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মুজতাহিদগণের ঘটনাবলি, তাদের জীবনের চিত্রাবলি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা কাজে আসবে।
আখিরাতের ভয়ের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ আলি বিন জাইদ বলেন : 'কুরাইশদের কোনো এক ব্যক্তি উমর বিন আব্দুল আজিজ-কে একটি কথা বলে রাগিয়ে দিল। অনেক্ষণ ধরে উমর মাথা নিচু করে চুপ থাকলেন। এরপর বললেন, “তুমি চাইছ, শয়তান যেন আমাকে বাদশাহির দোহাই দিয়ে উত্তেজিত করে তোলে। এরপর আমি তোমার থেকে প্রতিশোধ নিই। আর তুমি কিয়ামতের দিন সেটা উসুল করে নাও।” উমর সে লোকটিকে ক্ষমা করে দিলেন। '⁶⁹
নিজের স্বার্থে প্রতিশোধ নেওয়ার ভয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ উমর বিন আব্দুল আজিজ তাকে রাগিয়ে দেওয়া এক ব্যক্তিকে বললেন : 'যদি তুমি আমাকে রাগিয়ে না দিতে, তবে অবশ্যই আমি তোমাকে শাস্তি দিতাম। '⁷⁰
রাগান্বিত হওয়ার কারণে এ শাস্তি প্রদান নিজের রাগ প্রশমনে হয়ে যায় কি না, সে ভয়ে তিনি লোকটিকে শাস্তি দেননি।
অবাঞ্ছিত কোনো অভিধায় অবহিত হওয়ার ভয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ হিরাক্লিয়াসের সাথে কথোপকথনের সময় আবু সুফইয়ান-এর হাদিসে যেমন বর্ণিত হয়েছে। তখন আবু সুফইয়ান ছিলেন অমুসলিম-মুসলিমদের বিরোধী শিবিরের একজন। ঘটনা হলো, হিরাক্লিয়াস একদল কুরাইশকে ডেকে পাঠায়। তখন তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে শামে অবস্থানরত ছিল। কুরাইশের এ দল হিরাক্লিয়াসের কাছে আসলো। হিরাক্লিয়াস তখন জেরুজালেমে ছিল। তাদেরকে সভায় ডাকা হলো। তখন হিরাক্লিয়াসের চারপাশে রোমের সব বড় বড় লোকেরা উপস্থিত। তাদেরকে ডাকা হলো, সাথে হিরাক্লিয়াসের ভাষান্তরকারীকেও ডাকা হলো। হিরাক্লিয়াস বলল, 'যে দাবি করে সে একজন নবি—তোমাদের মধ্যে বংশগতভাবে এ লোকটির সবচেয়ে নিকটবর্তী কে?' আবু সুফইয়ান বললেন, 'আমি বললাম, আমি বংশগত দিক থেকে তাঁর সবচেয়ে নিকটবর্তী।'
হিরাক্লিয়াস বলল, 'তোমরা তাকে আমার নিকটবর্তী করো। সাথে তার সাথিদেরকেও। তাদেরকে তার পেছনে দাঁড় করাও।' এরপর হিরাক্লিয়াস তার ভাষান্তরকারীকে বলল, 'তাদের বলো, আমি এ লোকটিকে সে লোকটি (মুহাম্মাদ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব। যদি সে আমাকে মিথ্যা কথা বলে, তবে তোমরা তাকে মিথ্যুক বলে প্রচার করবে।'
আবু সুফইয়ান বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করার লজ্জার ভয় যদি আমার ভেতরে না থাকত, তবে আমি অবশ্যই সেদিন তাঁর (মুহাম্মাদ) সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম।'⁷¹
• নবি কর্তৃক নিষিদ্ধ কর্মে পতিত হওয়ার ভয়ের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ
কাইস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি খাব্বাবের কাছে আসলাম। তিনি তখন সাতবার নিজের পেটে সেক খেয়ে দগ্ধ হয়েছেন। তাকে সে সময় বলতে শুনলাম, “নবিজি যদি মৃত্যুর দুআ করতে নিষেধ না করতেন, তবে অবশ্যই আমি মৃত্যুর দুআ করতাম।”'⁷²
আনাস বলেন, 'যদি আমি নবিজি-কে “তোমরা মৃত্যু কামনা কোরো না” বলতে না শুনতাম, তবে অবশ্যই আমি মৃত্যু কামনা করতাম।'⁷³
জাইনাব বিনতে আবু সালামাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
لَمَّا جَاءَ نَعْى أبي سُفْيَانَ مِنَ الشَّامِ، دَعَتْ أَمْ حَبِيبَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا بِصُفْرَةٍ فِي اليَوْمِ الثَّالِثِ، فَمَسَحَتْ عَارِضَيْهَا، وَذِرَاعَيْهَا، وَقَالَتْ: إِنِّي كُنْتُ عَنْ هَذَا لَغَنِيَّةً، لَوْلَا أَنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ، فَإِنَّهَا تُحِدُّ عَلَيْهِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا
'যখন শাম থেকে আবু সুফইয়ান-এর মৃত্যুসংবাদ আসলো। এরপর তৃতীয় দিনই উম্মে হাবিবা সফরা নামক সুগন্ধি আনতে বললেন। সুগন্ধিকে তিনি তার চিবুক হতে কানের নিচ পর্যন্ত মুছে সুগন্ধি লাগালেন। দুহাতের মধ্যে সুগন্ধি লাগিয়ে নিলেন। এরপর বললেন, “আমি এ সুগন্ধি লাগাতাম না, যদি নবি -এর এ কথা না শুনতাম, যে নারী আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস রাখে, তার জন্য কোনো ব্যক্তির মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি সাজগোজ পরিত্যাগ করা হালাল নয়। তবে তার স্বামী ব্যতীত। কারণ স্বামীর মৃত্যুতে সে চার মাস দশ দিনের বেশি সাজগোজ পরিত্যাগ করবে।””⁷⁴
আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي مَرَضِهِ الَّذِي لَمْ يَقُمْ مِنْهُ: لَعَنَ اللهُ اليَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
'রাসুল মৃত্যুপূর্বকালীন রোগাক্রান্ত অবস্থায় বলেন, “আল্লাহ তাআলা ইহুদি ও নাসারাদের অভিশাপ দিয়েছেন। তারা তাদের নবিদের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছে।”
আয়িশা বলেন, 'যদি নবিজি তাঁর কবরকে সিজদা করার ভয় না করতেন, তবে তাঁর কবরকে বড় করা হতো।'⁷⁵
রিফাআহ বিন শাদ্দাদ আল-ফিতয়ানি বলেন, 'আমি যদি আমর বিন হামিক আল-খুজায়ির একটি কথা না শুনতাম, তাহলে আমি মুখতারের ধড় থেকে মাথা আলাদা করে তার মাঝখান দিয়ে চলতাম। আমি আমরকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেন:
مَنْ أَمِنَ رَجُلًا عَلَى دَمِهِ، فَقَتَلَهُ، فَإِنَّهُ يَحْمِلُ لِوَاءَ غَدْرٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে ব্যক্তি কাউকে তার জীবনের নিরাপত্তা দিয়েছে, সে যদি এ ব্যক্তিকে হত্যা করে—তবে কিয়ামতের দিন সে বিশ্বাসঘাতকতার পতাকা বহন করে উঠবে।””⁷⁶
• প্রকাশ্য ও গোপনে তাকওয়া অবলম্বন এবং আল্লাহর পর্যবেক্ষণের ভয়ের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ
উমর বিন খাত্তাব রাতের বেলায় বের হতেন। উম্মাহর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন। একদিন এভাবে চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। একটি দেয়ালের সাথে হেলান দিলেন সামান্য আরাম করবেন বলে। হঠাৎ শুনতে পেলেন এক মহিলা তার মেয়েকে বলছেন, 'দুধকে পানির সাথে মিশিয়ে দাও, যেন বেশি হয়ে যায়—তাহলে বিক্রির সময় কিছুটা বেশি অর্থ পাওয়া যাবে।'
মেয়েটি বলল, 'উমর তাঁর ঘোষকদলকে আদেশ করেছেন—তারা যেন ঘোষণা দিয়ে দেয়, কেউ যেন দুধকে পানির সাথে না মেশায়।'
তার মা বলল, 'হে আমার মেয়ে, যাও মিশিয়ে দাও। কারণ তোমাকে না উমর দেখছে, আর না উমরের ঘোষক দেখছে।'
মেয়েটি তখন আল্লাহর পর্যবেক্ষণের অনুভূতি-জাগানিয়া সে বিখ্যাত উক্তিটি করে বলল, 'যদি উমর আমাদের নাও দেখে থাকে, তবে উমরের রব তো আমাদের দেখছেন। '⁷⁷
মুসলিমদের কল্যাণের রক্ষণাবেক্ষণ করার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ
উমর ফারুক বলেন: لَوْلَا آخِرُ المُسْلِمِينَ مَا فَتَحْتُ قَرْيَةً إِلَّا قَسَمْتُهَا بَيْنَ أَهْلِهَا كَمَا قَسَمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْبَرَ
'পরবর্তী যুগের মুসলমানদের নিয়ে আমাদের যদি চিন্তা না থাকত, তবে নতুন যে গ্রাম আমি বিজয় করতাম-তা খাইবারে নবিজি যেমন বণ্টন করেছিলেন, তেমন বণ্টন করে দিতাম। '⁷⁸
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আমি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া -কে বলতে শুনেছি, “তখন তাতারদের সময়। একবার আমি আর আমার একজন সাথি হেঁটে চলছিলাম আর পথিমধ্যে একটি দলকে দেখলাম, তারা মদ পান করছে। এটা দেখে আমার সাথি তাদের বিরোধিতা করল। কিন্তু আমি থামিয়ে বললাম, আল্লাহ মদ হারাম করার কারণ হলো, মদ আল্লাহর জিকির হতে বাধা দেয়। নামাজ থেকে বাধা দেয়। কিন্তু মদ এদেরকে মানুষ হত্যা, সন্তানাদি বন্দী করা, ধন-সম্পদ লুটে নেওয়া থেকে বাধা দিচ্ছে। তাই তাদের ছেড়ে দাও।”'⁷⁹
• তালাককে অপছন্দ করার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنُ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
'কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। কারণ যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে। '⁸⁰
ইমাম নববি বলেন।
'মুমিন নারীর (স্ত্রীর) ওপর রাগ করা তার (স্বামীর) জন্য উচিত নয়। কেননা, স্ত্রীর মধ্যে যদি সে এমন কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখতে পায়, যা তার কাছে অপছন্দনীয় লাগে তবে তার মাঝে সে এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও পাবে, যা তাকে সন্তুষ্ট করবে। হয়তো সে মুমিন নারী বাগড়াটে, কিন্তু তার অন্য গুণ যেমন দ্বীনদারিতা অথবা সৌন্দর্য বা পবিত্রতা কিংবা সে তার অর্ধাঙ্গিনীসহ অন্য কোনো গুণ তার মাঝে আছে। তাই কেউ মুমিন নারীর (স্ত্রীর) প্রতি রাগান্বিত হতে পারে না।¹
তাই যখন কেউ স্ত্রীর মাঝে এ সকল প্রশংসনীয় গুণাবলি দেখে, এসব গুণ তাকে তার রাগ উদ্রেক হতে বা তার নিকট সে নারী অপছন্দনীয় হতে বাধা দেয়। সে স্ত্রীর অবাধ্য আচরণ ক্ষমা করে দেবে। নিজেকে স্ত্রীর মোতাবেক প্রস্তুত করে নেবে, যেন তার দ্বীন, সালাত, সিয়াম ও কিয়াম সুরক্ষিত থাকে। সুরক্ষিত হয় তার সন্তানদের উত্তম প্রতিপালন ও অন্য সবকিছু।
আনাস থেকে বর্ণিত-
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ طَلَّقَ حَفْصَةً، فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ ، فَقَالَ : يَا مُحَمَّدُ ، طَلَّقْتَ حَفْصَةَ، وَهِيَ صَوَامَةً قَوَامَةٌ، وَهِيَ زَوْجَتُكَ فِي الْجَنَّةِ، فَرَاجِعُهَا
'নবিজি হাফসা -কে তালাক দিলেন। জিবরিল আ. এসে তাঁকে বললেন, “হে মুহাম্মাদ, আপনি হাফসাকে তালাক দিলেন। কিন্তু তিনি যে অধিক সিয়াম পালনকারিণী, অধিক কিয়ামুল লাইল আদায়কারিণী। তিনি আপনার জান্নাতের স্ত্রী। তাই তাকে ফিরিয়ে আনুন।""⁸²
সন্তান-সন্ততি থাকার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত-
أَنَّ مُغِينَا كَانَ عَبْدًا، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ اشْفَعْ لِي إِلَيْهَا، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا بَرِيرَةُ اتَّقِي اللَّهَ، فَإِنَّهُ زَوْجُكِ وَأَبُو وَلَدِكِ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَأْمُرُنِي بِذَلِكَ، قَالَ: لَا ، إِنَّمَا أَنَا شَافِعُ
'মুগিস একজন দাস ছিলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমার জন্য তার (বারিরা)⁸³ কাছে সুপারিশ করুন।” তাই রাসুলুল্লাহ বারিরাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “ওহে বারিরা, তুমি আল্লাহকে ভয় করো। সে তো তোমার স্বামী। তোমার সন্তানের পিতা।” বারিরা বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাকে এর আদেশ করছেন?” রাসুল উত্তর দিলেন, “না, আমি এ ব্যাপারে কেবলই সুপারিশকারী।””⁸⁴
নবিজি চাইলেন বারিরা -কে স্মরণ করে দিতে যে, তার মাঝে ও মুগিস এ-এর মাঝে এমন এমন সম্পর্ক ছিল। তিনি আশা করছিলেন এভাবে বারিরা মুগিস-এর কাছে ফিরে আসবে। নবিজি তাকে ফিরে যাওয়ার কারণ বর্ণনা করেছিলেন। তাকে দুটি জিনিস স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। প্রথমত মুগিস তার স্বামী। দ্বিতীয়ত উল্লেখ করলেন যে, তার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদের সন্তান-সন্ততি দিয়েছেন। তার জন্য ভালো হবে যদি সে এ বিষয়টির প্রতি খেয়াল করে। যদিও সে এখন নতুন এক স্তরে। এখন আর তার পূর্ব স্বামীর কোনো কর্তৃত্ব তার জীবনে নেই।
খারাপ প্রভাব পড়ার ভয়ে অনেক বুদ্ধিমান লোক তাদের স্ত্রীদের সাথে মনোমালিন্য থাকা সত্ত্বেও তাদের স্ত্রীদের তালাক নিশ্চিত করা থেকে ফিরিয়ে আনেন। আর অনেক বুদ্ধিমতী নারী স্বামীর সাথে মনোমালিন্যের ফলে সৃষ্ট জীবনের তিক্ততা থাকা সত্ত্বেও যন্ত্রণায় সবর করে দাম্পত্য জীবনযাপন করছেন।
টিকাঃ
২১. সুরা আলি ইমরান: ১৩৪
২২. সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৭৭, সুনানুত তিরমিজি: ২০২১
২৩. শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ১০/৫৪৫; ইবনু আসাকিরের সনদে তারিখু দিমাশক: ৪১/৩৮৬।
২৪. সুরা আল-আরাফ: ১৯৯
২৫. সুরা ফুসসিলাত : ৩৪
২৬. তাফসিরুত তবারি: ১৫/৩৬১
২৭. সহিহুল বুখারি : ৬৯২৯, সহিহু মুসলিম : ১৭৯৫
২৮. সহিহুল বুখারি: ৩২৩১, সহিহু মুসলিম: ১৭৯৫
২৯. ফাতহুল বারি: ৬/৩১৬
৩০. সুরা আলি ইমরান: ১৫৯
৩১. সুরা আল-আম্বিয়া: ১০৭
৩২. সুরা ইউসুফ: ৯২
৩৩. সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৭৭, সুনানুত তিরমিজি: ২০২১
৩৪. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৮৯
৩৫. সহিহুল বুখারি: ৬১১৬
৩৬. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ১৪৫
৩৭. সুরা আল-আরাফ: ২০০
৩৮. সহিহুল বুখারি : ৬০৪৮, সহিহু মুসলিম : ২৬১০
৩৯. আল-আদাবুল মুফরাদ : ১৩২০, মুসনাদু আহমাদ : ২৫৫৬
৪০. সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৮২
৪১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৩০
৪২. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ৩/১৮৩
৪৩. সুরা আন-নাজম: ৩৬-৩৮
৪৪. ইবনুল জাওজি কৃত আল-আজকিয়া: ৬৬
৪৫. সহিহুল বুখারি: ৩০৪৫
৪৬. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৩/১৪২
৪৯. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া :১১/২৫৭
৫০. সহিহুল বুখারি : ১১৩৫, সহিহু মুসলিম : ৭৭৩
৪৯. হাশিয়াতুস সিন্দি আলা ইবনি মাজাহ : ৩/২০৬
৫০. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ৬/৬৩
৫১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/১৪৩
৫২. ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেন, 'তোমরা রাতে মসজিদে যাওয়া থেকে নারীদের নিষেধ কোরো না।' তখন আব্দুল্লাহ বিন উমরের কোনো এক পুত্র বলে উঠলেন, 'আমরা তাদের বাইরে যেতে দেবো না, এতে তারা দোষযুক্ত হবে।' তখন ইবনে উমর তাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'আমি তোমাকে বললাম, রাসুল বলেছেন আর তুমি বলো—আমরা তাদের বের হতে দেবো না!'
৫৩. নুআইম আল-আশজায়ি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যখন রাসুল মুসাইলামার পত্র পড়লেন, তখন তার দূতদ্বয়কে বললেন, “তোমরা তার ব্যাপারে কী বলো?” তারা বলল, “সে যেমন (নবুয়তের দাবি করে) বলে, আমরাও তাকে তেমন মানি।” তখন রাসুল বললেন, “আল্লাহর শপথ, যদি দূত হত্যা করা যেত, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের দুজনকে হত্যা করতাম।””
৫৪. সুরা আল-হাদিদ: ১৬
৫৫. তারিখু দিমাশক: ৪৮/৩৮২
৫৬. সহিহুল বুখারি: ২০৫৫, সহিহু মুসলিম: ১০৭১
৫৭. সহিহুল বুখারি: ২৬৬১, সহিহু মুসলিম: ২৭৭০
৫৮. আবুল কাসিম আসবাহানি কৃত আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ৮১৩। তিনি এভাবে এটি উল্লেখ করেন যে, আসারে এসেছে:...এরপর এ কথাটি উল্লেখ করেন। ইবনুল কাইয়িম মাদারিজ (২/২৫) গ্রন্থে এ কথাটি কতক সাহাবি-এর বর্ণনা থেকে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমাদের জানামতে তিনি সেখানে কোনো সনদ উল্লেখ করেননি। আর আব্দুর রাজ্জাক স্বীয় মুসান্নাফের ১৪৬৮৩ তে একটি দুর্বল সনদে ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবনে উমর বলেন: تَرَكْنَا تِسْعَةً أَعْشَارِ الْحَلَالٍ مَخَافَةَ الرِّيَا ]আমরা এক-দশমাংশ সুদ হওয়ার ভয়ে নয়-দশমাংশ হালালকেও ছেড়ে দিতাম।।
৫৯. সহিহুল বুখারি: ৬০১৮, সহিহু মুসলিম: ৪৭
৬০. ফাতহুল বারি: ১০/৪৪৬
৬১. সুনানুত তিরমিজি: ২৪২৫
৬২. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৭/১৭২
৬৩. আল-আদাবুশ শারইয়াহ: ১/৬৩
৬৪. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ২২৫৯; কুজাই কৃত মুসনাদুশ শিহাব: ৩৭৩; বাইহাকি কৃত শুআবুল ইমান: ৪৬৪০; প্রায় একই শব্দে ইবনু হিব্বান কৃত আর-রওজাহ: ৪৪; এর সনদে কিছুটা দুর্বলতা আছ। তবে এটি কয়েকটি সনদে এসেছে। আর এ কথাটি উমর থেকে মাশহুর হিসেবে বর্ণিত আছে।
৬৫. ইমাম মালিক কৃত আল-মুয়াত্তা: ১৮৫৫, ইবনুল মুবারাক কৃত আজ-জুহদ: ৩৬৯, ইমাম নাসায়ি কৃত আস-সুনানুল কুবরা: ১১৮৪১, মুসনাদুল বাজজার ৮৪; এর সনদ সহিহ।
৬৬. মুসনাদু আহমাদ: ১৫৮৫২, সুনানুত তিরমিজি: ২৩১৯, হাদিসটি সহিহ।
৬৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/৩০৩
৬৮. ইবনুল মুবারাক কৃত আজ-জুহদ: ৫২৮
৬৯. শুআবুল ইমান : ৭৯৭১, তারিখু দিমাশক : ৪৫/২০৫
৭০. তালবিসু ইবলিস : ১৩৩
৭১. সহিহুল বুখারি: ৭, সহিহু মুসলিম: ১৭৭৩
৭২. সহিহুল বুখারি: ৬৩৪৯, সহিহু মুসলিম: ২৬৮১
৭৩. সহিহুল বুখারি: ৭২৩৩, সহিহু মুসলিম: ২৬৮০
৭৪. সহিহুল বুখারি: ১২৮০, সহিহু মুসলিম: ১৪৮৬
৭৫. সহিহুল বুখারি: ১৩৯০, সহিহু মুসলিম: ৫৩০
৭৬. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৬৮৮
৭৭. আল-আজুরি কৃত আখবারু উমর ইবনি আব্দিল আজিজ : ৪৮, তারিখু ইবনি আসাকির )৭০/২৫৩)-এ এ শব্দে বর্ণনা এসেছে যে, اما حكنت لأطيعه في الملأ وأعصيه في الخلاء
৭৮. সহিহুল বুখারি: ২৩৩৪
৭৯. ইলামুল মুআক্কিয়িন: ৩/৪
৮০. সহিহু মুসলিম: ১৪৬৯
৮১. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ১০/৫৮
৮২. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৬৭৫৪
৮৩. বারিরা মুগিস -এর স্ত্রী ছিলেন। তারা দুজনে দাস-দাসী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বারিরা স্বাধীনা হয়ে যান। তখন তিনি মুগিস-এর বিবাহ বন্ধন ত্যাগ করেন। এখানে মুগিস রাসুল কে সুপারিশ করতে বলেছেন, যেন বারিরা আবার মুগিস ক-এর বিবাহ বন্ধনে আসে。
৮৪. সহিহুল বুখারি: ৫২৮৩, সুনানু আবি দাউদ: ২২৩১