📘 আত্মনিয়ন্ত্রন > 📄 অবতরণিকা

📄 অবতরণিকা


বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি আজমাইন। আম্মা বাদ:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রাণ সৃষ্টি করলেন। তিনি স্বয়ং বলছেন:
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا * فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا
‘শপথ প্রাণের এবং যিনি তা সুবিন্যস্ত করেছেন, তাঁর। অতঃপর তিনি তাকে অবহিত করেছেন তার পাপসমূহ ও তার তাকওয়া সম্পর্কে।’¹
আল্লাহ তাআলা মানব শরীর ও প্রাণে তাঁর একত্ববাদের যথার্থ গূঢ়তত্ত্ব দিয়ে রেখেছেন। তার মাঝে দিয়েছেন ভালোবাসা, দিয়েছেন ঘৃণা ও শত্রুতা। দিয়েছেন ক্রোধ ও সন্তুষ্টি, দিয়েছেন অগ্রগমন ও পশ্চাদপসরণের শক্তি। দিয়েছেন কোনো কাজে আত্মনিয়োগ করা ও কোনো কাজে বিরত থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করার মতো এক একটি অনুভূতি ও উপলব্ধি।
একজন মুসলিম ভালো কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে আত্মনিয়ন্ত্রণ করেন। আত্মনিয়োগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের এ প্রক্রিয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ফিতনা ও শাহওয়াতের এ যুগে অনায়াসে বুঝে আসে। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে ফিতনার ছড়াছড়ি—যেখানে কামনা-বাসনার আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। সে জন্য শক্ত আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে প্রতিটি মুসলিমের। এ আত্মনিয়ন্ত্রণ তাকে ফিতনার চোরাবালিতে পড়া থেকে রক্ষা করবে। কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে অটল-অবিচল থাকতে সাহায্য করবে।
তাহলে আত্মনিয়ন্ত্রণ কী? আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বরূপ কী? আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার কারণগুলো কী কী? একজন মুসলিম কীভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করতে পারে? এ সকল প্রশ্নের উত্তর থাকছে এ পুস্তিকাটিতে।
আল্লাহর নিকট কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা-আমাদের সঠিক পথের দিশা দিন। আমাদেরকে নিজেদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন।
- মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

টিকাঃ
১. সুরা আশ-শামস: ৭-৮

📘 আত্মনিয়ন্ত্রন > 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ পরিচিতি

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ পরিচিতি


আরবদের কথন كَبَحَ الدابة يَكْبَحُها كبحاً -এর অর্থ হলো, আরোহী লাগাম দিয়ে বাহনকে নিজের দিকে টান দিল, যেন বাহন না চলে থেমে যায়। হাদিসের মাঝেও এ শব্দটি এসেছে। উসামা বিন জাইদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أَفَاضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ عَرَفَةَ وَأَنَا رَدِيفُهُ، فَجَعَلَ يَكْبَحُ رَاحِلَتَهُ حَتَّى أَنَّ ذِفْرَاهَا لَيَكَادُ يُصِيبُ قَادِمَةَ الرَّحْلِ
'রাসুলুল্লাহ আরাফা থেকে ফিরে আসলেন। তখন বাহনে আমি তাঁর পেছনেই বসা ছিলাম। (এক সময়) তিনি বাহনের লাগাম ধরে এমনভাবে টেনে ধরলেন যে, বাহনটির দুকান হাওদার সামনের অংশের সাথে লেগে যাচ্ছিল-প্রায়।'²
আরবদের কথায় আরও প্রচলিত আছে যে, যখন কাউকে তার চাহিদা মেটানো থেকে বাধা দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি كَبَحَهُ عَنْ حَاجَتِهِ বাক্যে বর্ণনা করা হয়।³
আল্লাহ তাআলা মানুষের মাঝে দুটি শক্তি দান করেছেন। একটি শক্তি কোনো কাজে অগ্রসর হওয়ার। অন্যটি কোনো কাজ থেকে বিরত থাকার। অগ্রসর হওয়ার এ শক্তিটি দ্বীনি ও দুনিয়াবি উপকার হয়—এমন কাজে ব্যয় করা উচিত। অন্যদিকে বিরত থাকার শক্তিটি ক্ষতিকর কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকার জন্য ব্যয় করা উচিত। প্রতিটি মুসলিমের ওপর ভালো কাজে অগ্রসর হওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত হওয়া ফরজ করা হয়েছে। নিবৃত্ত থাকার এ বিষয়টিই হচ্ছে আত্মনিয়ন্ত্রণ। একজন মুসলিম নিজেকে মন্দে পতিত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করবে—এটা তার ওপর ফরজ।
অতএব একজন মুসলিম নিজেকে মন্দ, গুনাহ ও অনর্থক কর্ম থেকে নিবৃত্ত রাখাই হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ।

টিকাঃ
২. সুনানুন নাসায়ি: ৩০১৮
৩. তাহজিবুল লুগাহ: ৪/৬৮, লিসানুল আরব: ২/৫৬৮, তাজুল আরুস ৭/৭৬, মাদ্দাহ: কেব।

📘 আত্মনিয়ন্ত্রন > 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ কঠিন কর্ম

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ কঠিন কর্ম


অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা সুকঠিন এক কর্ম। হারাম থেকে বেঁচে থেকে ধৈর্যধারণ করা বেশ কষ্টকর। মোট কথা, আত্মনিয়ন্ত্রণ সহজ কোনো কাজ নয়। আনাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ، وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ
'জান্নাতকে বেষ্টন করা হয়েছে কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা, আর জাহান্নামকে বেষ্টন করা হয়েছে কামনা-বাসনা দ্বারা।'⁶
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন:
'مگر দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, একজন মুসলিমকে যে আমল করতে আদেশ করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে করা; যে কর্ম ছাড়তে বলা হয়েছে, তা পরিত্যাগ করার জন্য নিজের নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করা। যেমন : ইবাদতগুলোকে সঠিকভাবে আদায় করা, ইবাদতগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা, নিষিদ্ধ কথা ও কাজ পরিত্যাগ করা—এ সকল কিছুকেই হাদিসে مُكْرَه বা কষ্টকর বিষয়বস্তু বলা হয়েছে। কারণ এ সকল কাজ করা একজন আমলকারীর জন্য কষ্টকর ও কঠিন হয়ে থাকে।
আর شَهَوَات দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শরিয়ত-নিষিদ্ধ দুনিয়াবি উপভোগ্য কর্মসমূহ। শরিয়তের এ নিষেধের কারণ হলো, হয়তো এ সকল কর্ম আদতেই মন্দ হয় অথবা এ কাজগুলোর কারণে আদেশকৃত আমলগুলো ছুটে যায়।
যেন রাসুল বলতে চাইছেন, জান্নাতে কেবল তখনই পৌঁছা সম্ভব হবে, যখন শরিয়ত-আদিষ্ট আমলগুলো কষ্ট স্বীকার করেও সম্পাদন করা হবে। অন্যদিকে যখন কামনা-বাসনা চরিতার্থ করা হবে, তখন জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। কষ্টকর কাজগুলো ও কামনা-বাসনা হলো পর্যায়ক্রমে জান্নাত ও জাহান্নামের সামনে থাকা দুটি অন্তরায়। যখন কেউ কোনোটার অন্তরায় মাড়িয়ে সামনে যাবে, সে সেখানে প্রবেশ করবে।⁷
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
لَمَّا خَلَقَ اللهُ الْجَنَّةَ قَالَ الجِبْرِيلَ: اذْهَبْ فَانْظُرُ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ، فَقَالَ: أَي رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعْ بِهَا أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا، ثُمَّ حَفَهَا بِالْمَكَارِهِ، ثُمَّ قَالَ : يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرُ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَدْخُلَهَا أَحَدٌ ، قَالَ : فَلَمَّا خَلَقَ اللهُ النَّارَ قَالَ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ فَيَدْخُلُهَا، فَحَفَهَا بِالشَّهَوَاتِ ثُمَّ قَالَ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا ، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا ، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَبْقَى أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَ
'আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করে জিবরিল আ.-কে বললেন, “যাও, গিয়ে দেখে আসো।" জিবরিল আ. গিয়ে দেখলেন। এসে আল্লাহকে বললেন, “হে আমার রব, আপনার মর্যাদার কসম! যে-ই জান্নাত সম্পর্কে শুনবে, সে-ই তাতে প্রবেশ না করে ছাড়বে না।" এরপর আল্লাহ জান্নাতকে কষ্টকর বিষয়বস্তু দিয়ে আচ্ছাদিত করলেন। এবার তিনি জিবরিলকে বললেন, “হে জিবরিল, যাও, জান্নাত দেখে আসো।" জিবরিল আ. গেলেন। জান্নাত দেখে এসে বললেন, “হে আমার রব, আপনার মর্যাদার কসম! আমার ভয় হচ্ছে, এবার সেখানে কেউই প্রবেশ করতে পারবে না।"" রাসুল বলেন, 'এরপর আল্লাহ জাহান্নাম সৃষ্টি করে জিবরিল আ.-কে বললেন, “হে জিবরিল, যাও, এটি দেখে আসো।" জিবরিল আ. গেলেন। দেখে এসে বললেন, “হে আমার রব, আপনার মর্যাদার কসম! যে-ই এ সম্পর্কে শুনবে, সে-ই তাতে প্রবেশ করতে চাইবে না। এরপর আল্লাহ জাহান্নামকে কামনা-বাসনা দিয়ে বেষ্টিত করে বললেন, “হে জিবরিল, যাও, গিয়ে দেখে আসো।” জিবরিল আ. গিয়ে দেখে আসলেন। এসে বললেন, “হে আমার রব, আপনার মর্যাদার কসম!
আমার ভয় হচ্ছে এবার তো কেউই জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারবে না; সবাই তাতে প্রবেশ করবে।"⁸
অর্থাৎ জান্নাত যেহেতু কষ্টকর বিষয়বস্তু দিয়ে আচ্ছাদিত, তাই কেউই নিজ নফসের বিরোধিতা করে সেখানে যাওয়ার মতো হবে না। আর নিজের নফসের বিরোধিতার জায়গায় সবাই নফসের গোলামি করবে, আত্মনিয়ন্ত্রণের ধার ধারবে না; ফলে কেউই জাহান্নাম থেকে বাঁচবে না।⁹
মূলত তাকওয়ার লাগাম পরিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে, নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে সবর ও সাধনার প্রয়োজন। আবু দারদা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا الْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ، وَإِنَّمَا الْحِلْمُ بِالتَّحَلُّمِ، وَمَنْ يَتَحَرَّى الْخَيْرَ يُعْطَهُ، وَمَنْ يَتَّقِ الشَّرَّ يُوقَهُ،
'জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়। ধৈর্যধারণের মাধ্যমে সহনশীলতা অর্জিত হয়। যে ভালো কিছুর জন্য প্রয়াস করে, তাকে তা দেওয়া হয়। যে মন্দ থেকে বেঁচে থাকতে চায়, তাকে মন্দ থেকে রক্ষা করা হয়। '¹⁰
আবু সাইদ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرُهُ اللهُ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدُ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
'যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণে প্রচেষ্টা চালায়, আল্লাহ তাকে ধৈর্যধারণের তাওফিক দেন। আর সবরের চেয়ে উত্তম ও অধিক ব্যাপক দান কাউকে দেওয়া হয়নি।'¹¹
হাদিসাংশ وَمن يتصبر يصبره الله এর মর্মার্থ হলো, যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণের প্রয়াস করে, আল্লাহ তাকে শক্তিশালী করেন, তাকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করেন। ফলে একজন ব্যক্তি ধৈর্যধারণের প্রতি চালিত হয়, কষ্ট স্বীকারে সক্ষম হয়। ধৈর্যধারণের সময় আল্লাহ তার পাশে থাকেন। ফলে সহজেই সে উদ্দিষ্ট বিষয়টি লাভ করে নেয়, সহজেই সে বিজয়ী হয়।
ইবনুল জাওজি বলেন : 'আল্লাহ সবরকে সর্বোত্তম দান বানিয়েছেন। যে কাজগুলো করলে অথবা যে আমলগুলো পরিত্যাগ করলে আখিরাতে শাস্তি পেতে হবে, দুনিয়াতে এমন মোহময় কাজ থেকে আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কষ্টকর হলেও আদিষ্ট কাজগুলো অবশ্যই করার নাম সবর।'¹²
প্রতিটি মানুষকে একটা কথা যথাযথভাবে বুঝতে হবে। হারাম কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে সবর করা যদিও সুকঠিন একটি কাজ। কিন্তু এ সবরের পরে অচিরেই তার জন্য বিচার দিনে অনুপম স্বাদ ও আরাম আসবে। অন্যরা যখন শাস্তিতে দগ্ধ থাকবে, সে থাকবে পরম সুখে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ 'আর যারা আমার পথে সাধনা করে, তাদের আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন। '¹³
আমরা অস্থায়ী এক ভুবনে আছি। সময় থাকতেই আমাদের ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিতে হবে। সে জন্য দুনিয়ার প্রতিটি দিন যেন হয় কামনা-বাসনা থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের। আপনার স্বভাব যেন আল্লাহর সাথে সততার স্বভাব হয়। আপনার স্বভাব যেন এমন স্বচ্ছ-শুভ্র হয় যেমন কোনো মানুষ জানে যে, আজ তার মৃত্যু হবে, তাই সে সকল পঙ্কিলতা ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে দূরে রেখে ইবাদত-আনুগত্যে উৎসর্গ করেছে।
হারাম থেকে বিরত থেকে ধৈর্যধারণ করা যদিও প্রথম প্রথম যন্ত্রণাদায়ক ও কষ্টকর হবে। কিন্তু এ কষ্ট স্বীকার করা কিয়ামতের দিনের ঘামের সাগরে ডুবে যাওয়া, ভয়ংকর এক কষ্টের সম্মুখীন হওয়া থেকে অধিক উত্তম।
'তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই, যে ভয় করে না তার রবের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণকে। বরং প্রবৃত্তিকে সে চরিতার্থ করে, রবকে কখনো সখনো ভয় করে চলে। অন্যদিকে তাকওয়া প্রবৃত্তির কামনাকে বন্দী করে রাখে। কারণ পুনরুত্থানের সময় তাকে লাঞ্ছিত হতে হবে। তাই প্রবৃত্তির পরিবর্তে মুত্তাকি ভয়কে সঙ্গী বানিয়ে চলে।' ¹⁴
কতক মানুষ এমন আছে, তাদেরকে প্রথমে আপনি অল্পকিছু ঘুষ দিলে নেবে না। একেবারে সাধুর বেশ ধরবে। কিন্তু যখনই আপনি মোটা অঙ্কের ঘুষ সাধবেন। মুখে হাসি ছড়িয়ে আস্তে করে তা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলবে। মোটা অঙ্কের এ লোভ সে সংবরণ করতে পারবে না। এ প্ররোচনা দমাতে সে সক্ষম হবে না।
এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য কাব বিন মালিক কর্তৃক প্ররোচনা প্রত্যাখ্যানের ঘটনা বড় উপকারদায়ক হবে। ঘটনাটি হচ্ছে :
কাব তাবুকের জিহাদে রাসুল-এর সাথে না গিয়ে পেছনে রয়ে গেলেন। ফলে রাসুল ও সাহাবায়ে কিরাম তাঁকে বয়কট করলেন।...এ সময়ের বর্ণনা কাব এভাবে দিলেন, 'মানুষ আমাদের পরিত্যাগ করল। পরিবেশ আমাদের জন্য পাল্টে গেল। পৃথিবীতে যেন আমার জন্য নতুন একটা রূপ ধারণ করল। আমি যেন একে চিনতেই পারছি না। এভাবে আমাদের পঞ্চাশ রাত কেটেছিল।...এমনই একদিন আমি মদিনার বাজারে হাঁটছিলাম। হঠাৎ মদিনায় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করতে আসা শামবাসী এক কৃষককে দেখলাম। সে বলছিল, “তোমাদের কেউ কি আমাকে কাব বিন মালিককে দেখিয়ে দেবে?” মানুষ জন আমার দিকে ইশারা করে দেখাতে লাগল। সে আমার কাছে এসে গাসসান বাদশার একটি চিঠি ধরিয়ে দিল। সেখানে ছিল, পরসমাচার, আমার কাছে সংবাদ এসেছে, আপনার সাথি আপনার প্রতি নির্দয় আচরণ করছে।
অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ রাখবেন না। আমাদের কাছে চলে আসুন। আমরা আপনাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন করব।' কাব এ চিঠি পড়ে বললেন, 'এটাও একটা পরীক্ষা।' তিনি বলে চললেন, 'এরপর আমি চুলা খুঁজতে লাগলাম। চিঠিটি চুলোয় নিক্ষেপ করলাম।'... এভাবে পুরো ঘটনাটি। এক সময় কাব ও এমন আরও দুজন সাহাবিকে নিয়ে আয়াত নাজিল হয়। আর আল্লাহ তাঁদের তাওবা কবুল করে নেন।¹⁵ প্রবল এক প্ররোচনার সামনে কাব-এর এ অটল-অবিচল অবস্থান তাঁর সাফল্য ও সমৃদ্ধির মাধ্যম।
আর মুমিনের অন্তরে এমন ইমান আছে, যার মাধ্যমে সে আল্লাহর আদিষ্ট কাজে কমতি করা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। হাসান বসরি বলেন:
'যখন মুমিন হঠাৎ কোনো কিছু দেখে পছন্দ করে ফেলে। তার পরক্ষণেই সে বলে, “আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তোমার বাসনা রাখি। তুমি আমার চাহিদা। কিন্তু তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। দূর হও। দূর হও। আমার মাঝে তোমার মাঝে বাধা রয়েছে।” আর যখন মুমিন কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ পালনে কমতি করে ফেলে। তখন নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করে এবং বলে, “আমি কেন এটা করতে গেলাম! আমার সাথে এর সম্পর্ক কী! আল্লাহর কসম! আমার যে কোনো ওজরই নেই। আল্লাহর কসম! আমি আর কখনো এ দিকে ফিরে আসব না, ইনশাআল্লাহ।”¹⁶

টিকাঃ
৬. সহিহুল বুখারি: ৬৪৭৮, সহিহু মুসলিম: ২৮২২
৭. ফাতহুল বারি: ১১/৩২০
৮. সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৪৪
৯. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৭/২৩৭
১০. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ২৬৬৩ - শাইখ আলবানি একে হাসান বলেছেন, ইমাম দারাকুতনি এ হাদিসকে স্বীয় আল-ইলাল গ্রন্থে (১০/৩২৬) ওয়াকফ বলে তালিল করেছেন।
১১. সহিহুল বুখারি: ১৪৬৯, সহিহু মুসলিম: ১০৫৩
১২. ফাতহুল বারি: ১১/৩০৪
১৩. সুরা আল-আনকাবুত : ৬৯
১৪. ইবনুল জাওজি কৃত জাম্মুল হাওয়া: ২৩৬
১৫. সহিহুল বুখারি: ৪৪১৮, সহিহু মুসলিম: ২৭৬৯
১৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৫৭

📘 আত্মনিয়ন্ত্রন > 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণে দুর্বল হওয়ার কারণ

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণে দুর্বল হওয়ার কারণ


একজন মুসলিমের সাথে অন্য আরেকজনের তুলনা করলে আমরা দেখি, আত্মনিয়ন্ত্রণে দুজনের মধ্যকার পার্থক্য অনেক। মুসলিমদের মাঝে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ খুব শক্তিশালী। পক্ষান্তরে কিছু এমন মুসলিমও আছেন, যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল। আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার অনেক কারণ আছে। তন্মধ্যে বিশেষ কিছু কারণ আমরা এখন আলোচনা করছি :
১. ইমানের দুর্বলতা
ইমান মুমিনের অস্ত্র। ইমান মুমিনের সুরক্ষিত দুর্গ। ইমান এমন একটি দুর্গ, যা মুমিনকে মন্দ কামনা-বাসনা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। যখন মানুষ ইবাদত ও আনুগত্য থেকে দূর হয়ে যায়, সমান তালে তখন তার ইমানও দুর্বল হতে থাকে। যখন কারও ইমান দুর্বল হয়, তখন সে পাপ করার দুঃসাহস দেখায়। এ জন্যই জনৈক সালাফ বলেন:
'তাকওয়ার চিহ্ন তিনটি—এক. যথেষ্ট সক্ষমতা-সহ মন্দ কামনা-বাসনাকে পরিত্যাগ করা। দুই. নফসের নিকট অপছন্দনীয় হওয়া সত্ত্বেও সৎ আমল করে যাওয়া। তিন. কোনো আমানতের প্রতি নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমানতকে তার মালিকের নিকট সোপর্দ করা। '¹⁷
এ তিনটি কাজ যিনি করবেন, প্রমাণিত হবে যে, তার অন্তরে বিরাট ইমান ও দ্বীন রয়েছে। কেননা, এমন মুমিন তার সামনে হারাম (নিষিদ্ধকর্ম) দেখে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই হারামকে সে ত্যাগ করে। নিজের জন্য কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও, ইবাদত ও আনুগত্যে মন না লাগা সত্ত্বেও নিজেকে সে ইবাদত ও আনুগত্যে বাধ্য করে। নিজের কাছে থাকা আমানতের প্রতি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও উক্ত আমানতকে তার মালিকের নিকট ফিরিয়ে দেয়।
২. শরয়ি নসের ব্যাপারে অজ্ঞতা
আল্লাহর (বড়ত্ব ও মহত্ত্ব) সম্পর্কে জানা তাঁকে ভয় করা আবশ্যক করে। যে আল্লাহকে যতটুকু জানে, সে তাঁকে ততটুক ভয় করে। যে আল্লাহকে ভয় করে, সে সতর্ক ও সাবধান থাকে। তার রব তার হিসাব নেওয়ার আগেই সে নিজের হিসাব নেয়। সর্বদা সে সজাগ থাকে; কভু অসতর্ক-গাফিল হয় না। নিজের ব্যাপারে সে এতটা জানে, যা অন্যরা জানে না। আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করছেন— এটি সদা তার মনে গেঁথে থাকে। মনের অনেক চাহিদায় প্রবৃত্ত হওয়া থেকে নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করে। মনকে শরিয়তের লাগাম পরিয়ে রাখে, যেন মনের পদস্খলন হয়ে পথভ্রষ্ট না হয়। রবের ক্রোধের ফলে ত্বরান্বিত শাস্তি সম্পর্কে জানার কারণে নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণে রাখে। নিজেকে সবরের প্রশিক্ষণ দেয়। কষ্ট স্বীকার করার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলে। কোনো কাজে রত হওয়ার আগেই তার পরিণাম সম্পর্কে ভালো করে ভেবে নেয়। বিবেচনা করে তবে সামনে অগ্রসর হয়। প্রতিটি বিষয়ে হিকমত ও প্রজ্ঞার সাথে কাজ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
'আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীগণই ভয় করে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।'¹⁸
ইবনে জারির বলেন:
'আলিমগণ আল্লাহকে ভয় করে তাঁর ইবাদত-আনুগত্যে প্রবৃত্ত হয়ে তাঁর শাস্তি থেকে নিজেদের আত্মরক্ষা করেন। আল্লাহ নিজ কুদরতে যা ইচ্ছা, তা-ই করতে পারেন। তিনি যা চান, তা-ই করেন। তাই যে আল্লাহর এমন ক্ষমতা ও পরাক্রমশীলতার কথা যথাযথভাবে জানবে, সে নিজের পাপের কারণে আপতিত শাস্তির ব্যাপারে অধিক নিশ্চিত হবে। এভাবে সে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহতে ভয় করবে, ভীত হবে। কারণ যিনি সবকিছু করতে পারেন, তাঁর অবাধ্য হলে তিনি শাস্তিও দিতে পারেন—এটা নিশ্চিত। "¹⁹
৩. আত্মার সুরক্ষায় ও সাধনায় ঘাটতি
মনের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে মন্দের প্রতি সৃষ্ট প্রবণতা বা আগ্রহ মন্দের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারণ হয়। এখান থেকেই অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় অন্তরের বিভিন্ন রোগ। তাই একজন মুসলিম যেন অন্তরের মাঝে বুদবুদ ওঠার মতো এ সকল মন্দ প্রবণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করে, সাবধান থাকে।
এ সকল মন্দ প্রবণতার বিরুদ্ধে সাধনা ও এ সকল মন্দকে প্রতিহত করার প্রতি যে অনাগ্রহ আসে, সেটা থেকেও যেন সাবধান থাকে। কারণ সতর্কতা ও সাবধানতার মর্যাদা অনেক উচ্চ ও উন্নত। কোনো ভালো বা মন্দ কাজের শুরুটা হয় মনের মাঝে ওঠা বুদবুদ-সম এ সকল চিন্তা থেকে। যখন আপনি মনের মন্দ বুদবুদগুলোকে ওঠার সাথে সাথে প্রতিহত করবেন, তবে আপনি নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, দমন করতে পারবেন মন্দ কামনা-বাসনাকে। আর যখন এ সকল মন্দ ও হারাম বুদবুদ চিন্তাগুলো আপনার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, আপনার ওপর বিজয় হয়ে যায়, তখন আপনার কামনা-বাসনার চোরাবালিতে আপনার পদস্খলন নিশ্চিত হয়।
মনের মাঝে যেমন রহমানের পক্ষ থেকে ভালো চিন্তার উদয় হয়। তেমনই শয়তানের পক্ষ থেকে মন্দ চিন্তারও উদয় হয়। আবার নফসের পক্ষ থেকে নফসানি চিন্তার বুদবুদও উৎপন্ন হয়। যখন মন্দ বুদবুদগুলো প্রথম স্তরে থাকে, তখন তার চিকিৎসা করা সহজ ও সহজতর হয়। মানুষ যখন দ্রুতই এর চিকিৎসা করে, তখন তার সংস্কারও দ্রুতই হয়ে যায়।
৪. আল্লাহভীতি দুর্বল হওয়া
আল্লাহর ভয় নিরাপত্তার ঢাল। আল্লাহর ভয় বান্দাকে হারামে পতিত হওয়া থেকে রক্ষাকারী। একইভাবে আল্লাহর এ ভয় মন্দ কামনা-বাসনা ও মন্দ প্রবৃত্তির পেছনে তাড়িত হওয়া থেকে রক্ষাকারী।
আল্লাহর অবাধ্যতাকে ভয় করে ইউসুফ আ. مَعَاذَ الله বলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলেন। ফলে আল্লাহও তাঁকে রক্ষা করলেন। তাঁকে রক্ষা করলেন মহিলাদের কূট-কৌশল থেকে। আর কিয়ামতের দিন-যেদিন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়াই থাকবে না, সেদিন আরশের ছায়ায় যে সাত শ্রেণির ব্যক্তি আশ্রয় পাবেন, তাদের এক শ্রেণির ব্যক্তি হলো, আল্লাহকে ভয় করে পাপ থেকে আত্মরক্ষাকারী।
আবু হুরাইরা এ থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন:
سَبْعَةُ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلَّهِ، يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ .... وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ، فَقَالَ: إِنِّي أَخَافُ اللهَ،
'যেদিন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়াই থাকবে না, সেদিন আল্লাহ সাত শ্রেণির লোককে তাঁর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন।... (তন্মধ্যে এক শ্রেণি হলো) এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো বংশ-মর্যাদাসম্পন্না রূপবতী নারী পাপ কাজের প্রতি আহ্বান করল। কিন্তু সে বলল, "আমি আল্লাহকে ভয় করি।”’²⁰
এটাই আল্লাহ তাআলার প্রতি সত্য ইমান। যে ইমান তার অধিকারীর মনে আল্লাহর ভয় ঢেলে দিয়েছে। যে ইমানের ফলে মুমিনের মনে সদা এ কথা বদ্ধমূল থাকে যে, এক আল্লাহ আমাকে সর্বদা দেখছেন। আমি গোপনে প্রকাশ্যে যা করি, তা তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন।
আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার এ কয়েকটি বিশেষ কারণের বর্ণনা এ পর্যন্ত। আমরা আল্লাহর কাছে এমন দুর্বলতা থেকে নিরাপত্তা চাই। আল্লাহ আমাদের এ প্রার্থনা কবুল করুন।

টিকাঃ
১৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৯/৩৯৩
১৮. সুরা ফাতির: ২৮
১৯. তাফসিরুত তাবারি: ২০/৪২৬
২০. সহিহুল বুখারি: ৬৬০, সহিহু মুসলিম: ১০৩১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00