📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 এক সাহাবির প্রেম

📄 এক সাহাবির প্রেম


এক সম্ভ্রান্ত সাহাবি ও এক মহিলার মাঝে জাহেলি যুগে প্রেম-সম্পর্ক ছিলো। যখন ইসলামের শুভাগমন ঘটলো, তখন সে সাহাবি ইসলাম কবুল করলেন একদিন এক সঙ্কটময় মুহূর্তেকে অপরের সাথে দেখা; তা ছিলো খুবই কোমল ও স্পর্শকাতর মুহূর্ত এবং নিজ-দেহ থেকে অনেক দূরে; ফলে মহিলার সাথে তিনি যে কোনো আচরণ করতে পারতেন। কে সেই সাহাবি? ঐ মহিলার সাথে তার কী হয়েছিলো? ঐ অবস্থা থেকে আল্লাহ্ তাঁকে কীভাবে রক্ষা করলেন? তাঁর সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থান কী ছিল? এই ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ্ তাআলা কি কোরআনে কোনো আয়াত নাযিল করেছেন?

নিঃসন্দেহে সাহাবি মারসাদ ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি রা.। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন এবং ইসলামের খুঁটিনাটি বিষয়ও করে সাহাবায়ে কেরামকে ইসলামের বিধিবিধান শিক্ষা দিতে শুরু করলেন তখন একেক সাহাবি এককেক কাজে লেগে গেলেন; যেমন হাদিস মুখস্থ, হাদিস লেখা, মুকাদ্দামিয়ান বের হওয়া ইত্যাদি।

সাহাবি মারসাদ ইবনে আবু মারসাদ রা. ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ বীর-বাহাদুর বলিষ্ট একজন পুরুষ। তিনি ভালোভাবে হাদিস আয়ত্ত করতে পারতেন না, যেমন আবু হুরায়রা রা. করতে পারতেন; কিন্তু তিনি অন্যসব কাজ বেশ পারদর্শী ছিলেন; তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাফের কোরাইশদের নিকট মুসলিম বন্দিদের উদ্ধার করে পাঠাতেন। মুসলিম বন্দিদের সেখানে হাত-পা বেঁধে রাখা হত। তিনি এসে দেয়াল টপকিয়ে ঘরে ঢুকে একজন একজন পিছন বহন করে দূরে কোনো এক নিরাপদ স্থানে এনে বাঁধন খুলে দিতেন। এরপর তাঁদেরকে মদীনায় পালাতে সাহায্য করতেন। কোরাইশ ও মুসলিমদের মাঝে তখনো যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিল। কোরাইশরা মুসলিমদেরকে যদি বা অপহরণ করার চেষ্টায় থাকত। একবার কাফের কোরাইশদের একটি দল তনোদ্দেশ্যে মদিনার দিকে আসল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার পাশে সদকার উট চড়াতে দিতেন। কোরাইশদের সে দলটি আক্রমণ করতেউত্থত চুরি করে নিয়ে যায়; সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটনী কসওয়া এবং একজন মুসলিম নারীকে নিয়ে যায়, যে ঐ সময় উট চড়াচ্ছিলো; কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেন, তাই সে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। মুসলিমরা তাদের উপর যুলুম করত না, বরং তারাই প্রথম মুসলিমদের উপর যুলুম করে যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُمِ اعْبُدُوا عَلَيْكُمُ فَأَعْتَدُوا عَلَيْهِ يَجْعَلُ مَا اعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ

‘যারা তোমাদের উপর যুলুম করবে তোমরাও তাদের উপর ঐ পরিমাণ যুলুমের বদলা গ্রহণ করো যে পরিমাণ তোমাদের উপর যুলুম করেছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো যারা দীনদার- পরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে আছেন’

অপর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন,

وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا

‘আর মন্দের বদলা অনুরূপ মন্দ দ্বারাই দেওয়া হবে।’

অর্থাৎ তোমরা আমাদের সাথে যেরূপ আচরণ করবে আমরাও তোমাদের সাথে সেরূপ আচরণ করব। তো মারসাদ রা. মুসলিম বন্দিদের চুরি করে মুক্ত করতেন। একদিন মারসাদ রা. মক্কার উদ্দেশ্যে বেরুলেন। যে বাড়িতে একজন মুসলিম বন্দি ছিলো, সে-বাড়ির দিকে চুপসারে অগ্রসর হতে হতে বাড়ির কাছে এসে পড়লেন। এরপর বাড়িতে তিনি ঢুকতে যাবেন অমনি তাঁকে এক মহিলা দেখে ফেলল; তার নাম ইনাক। এই মহিলাই জাহেলি যুগে মারসাদ রা.-এর প্রেমিকা ছিলো। যখন একে অপরকে দেখে ফেললো, তখন তিনি দেয়ালের ছায়ায় লুকালেন; চাঁদের আলোতে তখন দেয়ালের ছায়ায় পড়েনি। মহিলা তাঁর কাছে এসে বলল, মারসাদ! স্বাগতম, তোমার আগমন শুভ হোক! তিনি কথা না বলে চুপ করে রইলেন। মহিলা বলল, হে মারসাদ! আসো, একসাথে রাত কাটাই। তিনি বললেন, হে ইনাক! আল্লাহ ব্যাভিচার হারাম করেছেন; অথচ তখন তিনি নিজ-ভূমি থেকে দূরে অন্য গ্রাম/শহরে উপত্যকায় ছিলেন। রাতের আঁধারে দেয়ালের ছায়ায় লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন; আল্লাহ ছাড়া তাঁকে কেউ দেখছিলোনা। তিনি আত্মগোপন করে আছেন। এক দিকে ঐ মুসলিম বন্দি মুক্তির অপেক্ষায় আছে, অপর দিকে এ মহিলা তাঁকে ডাকছে এবং তিনি তিনদেশেই আছেন। এখানে এমন কোনো মুসলিম বা অমুসলিম নেই যে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করবে তিনি আল্লাহকে পরোয়া না করে যদি তা করতে চাইতেন তবে অতি সহজেই তা হয়ে যেতো; কিন্তু তিনি বললেন, হে ইনাক! আল্লাহ ব্যাভিচার হারাম করেছেন। সে বলল, আরে এসো, এখানে আমাদের কেউ দেখবে না। তিনি বললেন, না; হে ইনাক! আল্লাহ তো ব্যাভিচার হারাম করেছেন। মহিলা বলল, এসো, নইলে চিৎকার এইতো দিলাম। তিনি মহিলার সামনে থেকে দৌড় দিবেন, অমনি সে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, হে কোরাইশের লোকেরা! হে কোরাইশের লোকেরা! এই যে এই লোক তোমাদের বন্দিদের ছিনিয়ে নিতে এসেছে, সে তোমাদের বন্দিদের নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, ডাকো ধরো...! এই আওয়াজ শুনে অনেকেই সেদিকে ছুটে গেল এবং তাঁকে খোয়াড়ীমুখে করতে লাগল; কিন্তু ততক্ষণে তিনি এক বাগানে লুকিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর যখন খোয়াড়ীমুখে বন্ধ হয়ে গেল, তখন আবারও তিনি ঐ বাড়িতে আসলেন। আপনারা এমন সাহসিকতা কি কখনো দেখেছেন না শুনেনি!? তিনি একথা বলেননি, আলহামদুলিল্লাহ, কোনো রকম প্রাণে বেঁচেছি; বরং তিনি বলেছেন, আমার একটা লক্ষ্য আছে; যে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে আমি মক্কায় এসেছি তা পূর্ণ না করে আমি মক্কায় যাব না; তাই তিনি মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এসে বলেন নি, আলহামদুলিল্লাহ, তারা তো আমাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিল। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন, আমি কোনো রকম জান নিয়ে মদিনায় ফিরতে পেরেছি। বরং তিনি আবার এসে দেয়াল টপকিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়েন এবং বন্দিকে পিঠে বহন করে দরজা খুলে বের হয়ে আসেন। তারপর দূরে এক নিরাপদ স্থানে এসে বন্দির বাঁধন খুলে দিলেন। এবার তারা মদিনা পানে হাঁটা শুরু করলেন। বেশ কয়েকদিন চলার পর তাঁরা মদিনায় এসে পৌঁছলেন। মক্কা-মদিনার মাঝে পাঁচশত কিলোমিটারের দূরত্বয় পথ। তাঁরা এ পুরো সফরে কখনো গিরিপথপথ অতিক্রম করেছেন। এখন আপনি মারসাদ রা. ও তাঁর সঙ্গী সাহাবির চিত্রটি একটু মনে ধারণ করুন, বিস্ময়ে ভরে যাবে আপনার মন। তাঁরা কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো উটের পিঠে চড়ে আরোহণ করেছেন। অপর দিকে মারসাদ রা. মক্কা মদিনার এ দীর্ঘ পথ পাড়ে দিচ্ছেন আর তাঁর মন-মগজ ইনাকের কথা ঘুরপাক খাচ্ছে এবং স্মরণ হচ্ছে রাতের ঐ নিরালামুহূর্তের কথাও। আবার পূর্বের দুঃখ-কষ্ট ও ভালোবাসার স্মৃতিগুলোও তাঁর মনে ফের জেগে উঠছে। তিনি পায়ে হাঁটছেন বা উটে আরোহণ করছেন, তাঁর মন শুধু সে মহিলাকে নিয়েই ভাবছে। এভাবে একদিন-দুইদিন করে অতিবাহিত হচ্ছিল আর মদিনা কাছে আসছিল। অবশেষে তাঁরা মদিনায় এসে পৌঁছলেন।

বন্দি পরিবারের কাছে গেল আর মারসাদ রা. মসজিদে গিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং ঘটে যাওয়া সবকিছুই বিবরণ দিলেন। তিনি ঐ মহিলাকে ভালোবাসেন এবং তাঁর সাথে পূর্ব-সম্পর্কের কথাও জানালেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি ইনাককে বিয়ে করতে পারি? তাকে স্ত্রী-রূপে গ্রহণ করতে পারি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মারসাদ! আল্লাহ ব্যাভিচার হারাম করেছেন। তিনি (মারসাদ রা.) বললেন, আমি কি তাকে কি বিয়ে করতে পারি? তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন-

الزَّانِي لَا يَنكِحُ إلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً ۖ وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ

‘ব্যাভিচারী পুরুষ কেবল ব্যাভিচারিণী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিয়ে করবে এবং ব্যাভিচারিণীকে কেবল ব্যাভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিবাহ করবে এবং এদেশের মুমিনদের জন্য হারাম করা হয়েছে।'

আল্লাহ তাআলা পূর্ণাঙ্গ সমাধান নাযিল করলেন। মারসাদ রা. প্রথমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুধু পরামর্শ করতে এসেছিলেন; কিন্তু সেখানে এসে পূর্ণাঙ্গ সমাধান পেয়ে গেলেন। এটাই শরয়ী নিয়ম। মানুষ যখন কোনো সমস্যায় পড়বে, তখন কর্তব্য হল কোনো অনর্থশীল ও কল্যাণকামী মুরুব্বি বা শায়খের কাছে তা পেশ করা। অথবা মা-বাবা বা কোনো বুঝমান বড় ভাইদের কাছে বলা, যে তাঁকে কোনো অন্যায় কাজে প্ররোচিত করবে না; যাতে সমস্যার সমাধান হয়। মারসাদ রা. যখন অনুভব করলেন, তাঁর মন পূর্বের অবস্থার দিকে ঝুঁকছে তখন তিনি মনকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেননি। বরং তিনি মনের ডাক্তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে সবকিছু খুলে বলেছেন। তিনি বলেছেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি একটি প্রেমরোগে আক্রান্ত হয়েছি। ইনাকের প্রতি আমার ভালোবাসা উঠলে উঠছে। আমি ইনাককে বিয়ে করে ফেলি? তাঁকে বিয়ে করব কি? তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উত্তরদানের সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হল, এটা কি তাঁর ও ইনাকের মধ্যকার সমস্যার সমাধান? ‘ব্যাভিচারী পুরুষ কেবল ব্যাভিচারিণী নারী বা মুশরিক নারীকেয়ই বিয়ে করবে।' এ আয়াতের কী অর্থ? এ আয়াতও কি শুধু একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে, না আমাদেরকে কোনো ফিকহি বিধান সম্পর্কে জানান দিচ্ছে? এটাও আমাদেরকে ভালোভাবে বুঝতে হবে, যাতে আমরা যথাযথভাবে সমস্যার সুরাহা করতে পারি।

الزَّانِي لَا يَنكِحُ إلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً ۖ وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ

‘ব্যাভিচারী পুরুষ কেবল ব্যাভিচারিণী নারী অথবা মুশরিক নারীকেবিবাহ করবে।'

আল্লাহ তাআলার এ বাণীর অর্থ, যে ব্যক্তি ব্যাভিচারে লিপ্ত থাকে; তা থেকে তাওবা করে না- তার সাথে যে নারী বিবাহ সম্মত হয় সে ব্যাভিচারিণী নারীর মতোই অনিষ্ট হবে। এটা কীভাবে? অবশ্য এর অর্থ এটা নয় যে, ঐ নারীর ব্যাভিচারের গোনাহ হবে; কিন্তু এ ব্যক্তি যখন সহবাস ও মেলামেশা করবে, তখন সে স্ত্রী ও বেশ্যা নারীদের মাঝে কোনো পার্থক্য করবে না। সে একবার স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে, অন্যবার অন্য নারী সাথে মিলিত হবে। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এর মাঝে আর তার মাঝে শুধু একটি শরিয়ি বন্ধন রয়েছে। সুতরাং সে তার দৃষ্টিতে অন্যান্য বেশ্যা নারীর মতোই মনে হবে; ফলে সেও বেশ্যা নারীর মত হয়ে যাবে। এর অর্থ এ নয় যে, তার ব্যাভিচারের গোনাহ হবেনা সে কোনো মুশরিকা নারীকে বিবাহ করবে- যে তার সাথে কোনো ব্যাভিচারী পুরুষ মিলিত হওয়া পছন্দ করে যেমন তার সাথে তার স্বামী মিলিত হয় এ কারণে যে ব্যক্তি ব্যাভিচারী বলে পরিচিত (আল্লাহর পানাহ) তার কাছে কাউকে বিবাহ দেওয়া ঠিক নয়। এমন হুকুম এ নারীর ব্যাপারেও প্রযোজ্য হবে, যার ব্যাভিচারী হওয়ার বিষয়টি সমাজে পরিচিত; তাকে বিবাহ করা ঠিক হবে না। অবশ্য যে তওবা করে ভাল করে গেলে এবং অবস্থার সংশোধন হয়েছে তার কথা ভিন্ন। আর যে পুনরায় তাতে ফিরে যাবে,আল্লাহ তার প্রতিশোধ নেবেন।আল্লাহ যখন তাওবার কারণে শিরিকসহ অন্যান্য সব বড় গুনাহ ক্ষমা করে দেন,তখন ব্যভিচারের গোনাহের ব্যাপারে আপনার কী ধারণা? অনুরূপ কথা ব্যভিচারিণী নারীর ক্ষেত্রেও। যখন সে তাওবা করে ভালো হয়ে যাবে এবং তার অবস্থার সংশোধন হবে তখন তাকে কোনো মুমিন বিবাহ করতে পারবে; কিন্তু তাওবার পূর্বে যে তাকে বিবাহ করবে তাকেও ব্যভিচারী হিসাবে মনে করা হবে।

তো, যখন কোনো ব্যক্তি দ্বীনি বিষয়ে সমস্যার কারণে অন্যের কাছ থেকে তখন সে ভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর মনে কোনো বিষয়ে খটকা-দ্বিধা বা সন্দেহ লাগলে সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সে সমাধান চাইতেন। পূর্বের ওলামায়ে কেরামও এভাবে তাদের শায়খদের কাছে যেতেন। ছাত্ররা ইমাম আবু হানিফা রহিআল্লাহ্র কাছে এসে সমস্যার কথা জানাতেন। বলতেন,শায়খ! আমার মনে এমন এমন কথা অনুভব করছি। এর কোনো সমাধান আছে কি? এভাবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী রহিআল্লাহুর কাছেও তাঁদের ছাত্ররা আসতো এবং সমস্যার সমস্যন খুঁজতো। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنْبِطُونَهُ مِنْهُمْ ۚ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَاتَّبَعْتُمُ الشَّيْطَانَ إِلَّا قَلِيلًا

‘আর যখন তাদের কাছে কোনো শান্তি বা ভীতিকর কোনো সংবাদ পৌঁছে, তারা তা (যাচাই না করেই) প্রচার শুরু করে দেয়।’

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

‘আর যদি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবা তাদের কর্তৃস্থানীয় লোকজনের কাছে নিয়ে যেতো, তাহলেতাদের মধ্যে যারা তথ্যঅনুসন্ধানী- তারা যা যথার্থা জানে যেন। এবং (হে মুসলিমগণ!) তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত না হতো, তাহলে তোমাদের অল্প কতিপয় লোক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ শুরু করতো!’

আল্লাহ তাআলা আদেশ করছেন যে, যখন কোনো ব্যাপারে সমস্যা দেখা দিবে তখন কর্তব্য হবে সেই ব্যাপারটি নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারস্থ হওয়া। তাঁর জীবদ্দশায় যেমনটি সাহাবায়ে কেরাম করতেন। আর তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁদের কর্তব্যবান, আলেম-উলামা বা জ্ঞানী-গুণীজনদের শরণাপন্ন হওয়া। যেনো তাঁরা ব্যাপারটির সমাধান করে দেন।

এ কারণে হানজালা রা.-এর মনে যখন কোনো বিষয়ে খটকা লাগতো তখন তিনি সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরণাপন্ন হতেন অথবা যিনি সমাধান দিতে পারবেন তাঁর কাছে বিষয়টি শেয়ার করতেন। একবার আবু বকর রা.-এর সাথে হানজালা রা. দেখা করলেন। তাঁকে বললেন, হানজালা তো মুনাফেক হয়ে গেছ! আবু বকর রা. তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তো কী হলো? তিনি বললেন, যখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকি; জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে তাঁর আলোচনায় আমার অন্তর এতটা বিগলিত হয়, যেনো জান্নাত-জাহান্নাম আমার সামনে উপস্থিত; কিন্তু যখন তাঁর কাছ থেকে চলে এসে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির সাথে হাসি-রসিকতা করি তখন এর অধিকাংশই ভুলে যাই। আবু বকর রা. বললেন, এমন অবস্থা তো আমিও অনুভব করি। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকি তখন আমার কলব এতটাই নরম হয়, যেনো আমি জান্নাত-জাহান্নাম সামনে অবস্থান করছি; কিন্তু সেখান থেকে চলে গেলে সেই নরমতা আর বাকি থাকে না।

পাঠক! এটি একটি রজবরজাবত ব্যাপার। আপনি যখন সালাত আদায় করবেন বা দোয়া-দরুদ পড়ে কাঁদবেন তখন আপনার মন স্বভাবতই নরম হবে। আর যখন সালাত বা দোয়া শেষ হবে তখন আপনার মন আগের অবস্থায় ফিরে যাবে; এ নরম অবস্থা আর থাকবে না, অথবা অভূতপূর্ব কিছুটাও হলেও কমে যাবে। তো আবু বকর রা. হানজালা রা. কে বললেন, চলো আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাই।

বর্তমানে আলেম-উলামার সাথে যোগাযোগ করা এবং তাঁদের কাছে সমস্যার কথা বলা সহজ হয়ে গেছে, কারণ বিভিন্ন মজলিসে এবং নামায পড়তে গিয়ে বা মোবাইল ও চিপিরের মাধ্যমে তাঁদের সাথে কথা আদান প্রদান করা অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে। কোনো প্রসিদ্ধ আলেম বা কোনো প্রসিদ্ধ দারির কাছে যাওয়া শর্ত নয়। যিনি বেশি ব্যস্ত থাকেন, আপনি তাঁর কাছে যাবেন না। বরং আপনি প্রত্যেক এমন ব্যক্তির কাছে যান যাঁর কাছে শরয়ি ইলম আছে, যদিও তিনি তেমন একটি প্রসিদ্ধ নন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল, যাঁর কাছে আপনি যাবেন তাঁর কাছে যেনো এই পরিমাণ শরয়ি ইলম থাকে, যা দিয়ে তিনি আপনার সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন। যেমন হানজালা রা. আবু বকর রা.-এর কাছে গিয়েছিলেন, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তাই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুপস্থিতিতে আবু বকর রা.-এর শরণাপন্ন হয়ে বলেছিলেন, হানজালা তো মুনাফেক হয়ে গেছে।

যাই হোক, এরপর তারা উভয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলেন। হানজালা রা. বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! হানজালা তো মুনাফেক হয়ে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কীভাবে? তিনি বললেন, আমরা যখন আপনার কাছে থাকি আর আপনি জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করেন, তখন আমাদের কলব এতটা নরম হয় যেনো জান্নাত-জাহান্নাম আমাদের সামনে উপস্থিত। অন্যদিকে যখন আপনার কাছ থেকে চলে আসি এবং স্ত্রী ও সন্তানদ্বয়ের সাথে হাসি-মজা করি, তখন আমরা অনেকটা ভুলে যাই। হানজালা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটি অন্তরঙ্গন সমস্যাকে খোলাখুলিভাবে পেশ করেছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তৎক্ষণাৎ এর সমাধান করেছেন। তিনি যদি ব্যাপারটিকে আমলে না নিতেন, মনের ভিতর রেখে দিতেন এবং মন থেকে এক কল্পনা-জল্পনা বের করে দিতেন, তবে হয়তো এটিই তাঁকে প্রকৃত নেফাকের দিকে নিয়ে যেতো। অথবা তিনি একসময় বলতেন, আমি তো মুনাফেক। আমি সালাত সিয়াম করব কেনো? হয়তো শয়তান তাকে এতদূর পর্যন্ত ঠেলে দিতো; কিন্তু তিনি কাল বিলম্ব না করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে চলে গেছেনএবং বলেছেন, আপনার কাছে থাকাকালীন আমাদের অন্তর নরম থাকে; আপনার কাছ থেকে চলে গেলে অন্তর পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়; তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে হানজালা! আমার কাছ থেকে যাওয়ার পরও যদি তোমাদের সে অবস্থাই থাকতো, তাহলে ঘর-বাড়ি এবং পথে-ঘাটে ফেরেশতারা তোমাদের সাথে মোসাফাহ করত; কিন্তু হে হানজালা! এটা একসময় আর ওটা ভিন্ন সময়।’ অর্থাৎ একটা সময় ভয়-ভীতি আর কান্নাকাটি হবে; আরেকটা সময় হাসি-রসিকতা আর আনন্দ-বিনোদন হবে।

এমন পরিস্থিতিতে আমাদেরও কর্তব্য হবে মারসাদ রা.-এর মত কাজ করা। সমস্যা নিয়ে সরাসরি কোনো কল্যাণকামী-হীতাকাঙ্ক্ষী আলেম বা মুরুব্বির কাছে যাওয়া। তাই কোনো যুবক বা যুবতী কোনো সমস্যায় পড়লে করণীয় হবে সত্বর কোনো অভিজ্ঞ বিশ্বস্ত আলেম বা শায়খের কাছে যাওয়া। আর এঁদের কর্তব্য হবে মনোনিবেশের সাথে তাদের সমস্যার কথা শোনা এবং সমস্যা সমাধানের যথাসাধ্য চেষ্টা করা; বিশ্বস্ততা ও কর্তব্য-পরায়ণতার পরিচয় দেওয়া। তাহলে তাদের সমস্যা আর সামনে এগোবে না এবং সব জায়গায় লাঞ্ছিতর শিকার হতেও হবে না। আর সাবধান! আপনার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ রাখুন এবং এর একান্ত বিষয়টিকে ছেড়ে ফেলুন; যাতে অন্য কেউ এ গোপন বিষয় সম্পর্কে জানতে না পারে।

পরিশেষে মহান আল্লাহ্র কাছে মিনতি! তিনি যেনো আমাদের সকলকে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও পদস্খলন থেকে রক্ষা করেন এবং আমাদের উপকৃত ও উপকারী হিসেবে মনোনীত করেন। আমিন।

টিকাঃ
১. সুরা বাকার: ১১৪
২. সুরা ত্বরা: ৪৩
১. সুরা নুর: ৩
১. সুরা নুর: ৩
১. সুরা নিসা: ৮০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00