📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 পণ্ডিত চোর

📄 পণ্ডিত চোর


জগতে এমন কিছু লোক আছে যারা কখনো ভুলে নিপতিত হলে নিজেকে তিরস্কার করে না; উল্টো এ থেকে বাঁচতে সে বিভিন্ন বাহানা খুঁজতে থাকে; এর চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হল, সে আত্ম-তিরস্কার থেকে বাঁচতে একের পর এক অজুহাত দাঁড় করাত থাকে। যেমন কোনো লোক পিতা-মাতার অবাধ্যতা করলো তার মন তাকে যখন বলে, তুমি পিতা-মাতার নাফরমানি করছো কেনো? এটা তো হারাম; এর কারণে তুমি আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে, তখন সে মনে মনে বলে, আমার বাবা তো আমাকে কোনো সম্পদ দেননি;আমাকে গাড়ি কিনে দেননি; অমুক ব্যক্তি নিজ ছেলে-মেয়েকে যেভাবে লালনপালন করে আমার বাবা তো আমাকে সেভাবে প্রতিপালন করেননি। অমুক ব্যক্তি ছেলেকে এটা-সেটা দিয়েছে, আমাকে তো আর দেয় নি- এভাবে সে অবাধ্যতা অব্যাহত রাখতে একের পর এক কারণ খুঁজতে থাকে। অনুপ্রবেশে কোনো ব্যক্তি গতিরঙের মাল থেকে অথবা কোনো কর্মকর্তা কোম্পানির মাল চুরি করে বা কোনো ব্যবসায়ী বিপরীত পণ্য থেকে কিছু রেখে দিয়ে এ বলে নিজেকে পাপমুক্ত রাখে যে, আমি কোনো নাজায়েজ কাজ করি নি; তারা তো আমার পাওনা দিতে বিলম্ব করে; অথবা তাদের সাথে আমার এক হাজার দিনার চুক্তি হয়েছে, তারা নব্বই পঞ্চাশ দিনার দিয়ে বাকিটা দেয়নি। আর আমার প্রাপ্য পেতে আমি এমনটি করতে বাধ্য হয়েছি- এমন সব ব্যাখ্যা মানুষকে অন্যায়-অপরাধের দিকে আরো বেশি ঠেলে দেয়। আজ আমরা এক পণ্ডিত চোরের আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনব। চোর কীভাবে পতিত হল? এ এক আশ্চর্য ঘটনা। এ ঘটনাটি আল্লামা তানুখি রহিমাহুল্লাহ ‘আল ফারাজ বাদাশ শিদ্দা’ (কষ্টের পরই স্বস্তি) নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন। এক যুবক, যে তালেবুল ইলম ছিল। সে এক দেশ থেকে আরেক দেশে সফর করতো। আপনারা জানেন যে, পূর্বকার উলামায়ে কেরামের কাছে আজকের মত টেকনোলজি ছিলো না। বর্তমানে আপনি যখন কোনো ভার্সিটিতে যাবেন তখন দেখতে পাবেন, প্রফেসারের সামনে অনেক ছাত্র বসে আছে, যারা একেক দেশের একেক অঞ্চল থেকে এসেছে। আজকাল তো ইন্টারনেটের সুবাদে আমি এখানে বসে লেকচার দিচ্ছি, আর এ লেকচার হাজার হাজার মানুষ শ্রবণ করছে। এখন কেউ ইলম শিখতে চাইলে ইন্টারনেটের সাহায্যেই শিখতে পারে। তার জন্যে এটা এখন সম্ভব এবং সহজলভ্য; কিন্তু আগে এটা সম্ভব ছিলো না। ইলম শেখার জন্যে এক শহর থেকে আরেক শহরে সফর করার কষ্ট করতে হত। আবুল আলা আল মুআররিফ উল্লেখ করেন, আমি একবার আমার কিতাবাদি নিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে গেলাম। যখন ঘ্ৰ দেশে পৌঁছলাম, দেখি- শরীরের ঘ্রামের কিতাবের একটি অংশ ছিঁড়ে গেছে। এই যুবক এক কাফেলা থেকে আরেক কাফেলাতে সফর করতে চাইল। একটি বাসে কিতাবাদি ও কিছু কাপড় নিল। এরপর সে এক কাফেলার সাথে যোগ দিল। সে কাফেলা ছিলো বিভিন্ন ব্যবসায়ী, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গমনকারী এবং আরো অনেকে। কাফেলা সফর করতে হলে অনেক কাফেলা জোটবদ্ধ হয়ে সফর করত। কাফেলায় নারী ও শিশুরাও থাকত। উটের পর উট সারিভাবে চলত। এসব কাফেলা চলত মরুপথ অতিক্রম করে। তারা যাযাবর কাফেলাকে বড় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করত। তাদের সাথে প্রহরী থাকত। যে কাফেলা যত বড় হতো চোর-ডাকাত থেকে সে কাফেলা থাকত ততটা নিরাপদ। এ যুবক এক কাফেলার সাথে যুক্ত হল। সে বাহনে চড়ে তাদের সাথে রওয়ানা হল। তার সাথে ছিল কিতাবাদি ও কিছু পরিধেয় বস্ত্র। সে কিতাবগুলোকে চোখে চোখে রাখতো। কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেল। সে কাফেলার লোকজনদের নামায পড়ত এবং ওয়াজ-নসিহত করত। কাফেলাটি মরুপথে যাত্রা করছিল, এমন সময় হঠাৎ একটি ডাকাত-দল তাদের উপর হামলারোপন করল। তারা আসবাবপত্র ও যানবাহন সবকিছুর লুট করলো। তারা এতটা বেপরোয়া ছিলো যে, যাত্রীদের পরনের কাপড়টা পর্যন্ত খুলে নিল; শুধু লুথা ঢাকার মত কাপড় ছেড়ে দিল। যুবকটি ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছিলো, যেখান থেকে ডাকাতদের ছুরিকৃত সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা দেখা যাচ্ছিল। কাপড় ও সম্পদ নিয়ে তার চিন্তা হচ্ছিল না বরং সে কিতাবগুলো নিয়ে বেশ চিন্তিত, কারণ ডাকাতরা এর কোনো মূল্য জানতো না; তারা কিতাবগুলো পশুর সামনে ফেলে দিল। আর কেনই বা এমনটি করবে না। কিতাবের সম্মান ও মূল্য তো শুধু জ্ঞানীরাই জানে। উদাহরণস্বরূপ, আজ যদি আপনার কাছে ‘রিয়াদুস সালেহিন’-এর একটি কপি থাকে অথবা ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’-এর কোনো কপি থাকে, তারপর কিতাবটি কোনো ভাবে নষ্ট হয়ে যায়; তখন আপনি কী করেন? কোনো লাইব্রেরি থেকে অনুপস্থিত আরেকটি কপি কিনে নেন। অথবা ফটোকপি করে সেটা সংগ্রহ করেন; কিন্তু অতীতে কোনো ছাত্র কিতাবের মালিক হতে চাইলে প্রথমে লিপিকারের কাছে যেত, তার সাথে দরাদরি করত। এবং এক কপি লিপির চুক্তি করতে হত। অথবা তার কাছেই লিখিত কোনো কপি পেয়ে তা লিখিয়ে নিতো। তা না হলে নিজেই বসে বসে এক কপি লিপি লিখতে হত। কষ্টে ও রাতের আঁধারে মোমের নিভুনিভু ক্ষীণ আলোতে লিখতে হতো। এ ধরনের বই কষ্ট করে তারা করত। তো এ তালেবে ইলম তার কিতাবের দিকে তাকাচ্ছিল। কিতাবগুলো তার নিজস্ব ব্যাখ্যা ও টিকা-টিপ্পনীযুক্ত ছিল। এখন তা এমনি এমনি চলে যাচ্ছে। তারা এর কোনো কদরই করছে না। যুবক ডাকাত সর্দারকে কাছে গিয়ে সালাম দিল। সর্দার বলল, এখান থেকে যাও নইলে শেষ করে দিব। যুবক সালেহ করে বলল, আপনারা আমার এমন জিনিস নিয়েছেন যা আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে অথচ এতে আপনাদের কোনো উপকার হচ্ছে না। সর্দার বলল, কী সেটা? আমরা কিন্তু তোমার বাহন, কাপড় ও টাকা পয়সা কিছুই ফেরত দিব না। যুবক বলল, না না... শুধু ঐ ব্যাপারটি, ঐ ব্যাপারে আমার কিতাবাদি আছে। আমি কিতাবগুলো খুব কষ্ট করে জমা করেছি। আমি মানুষকে নামায পড়াই, মাসআলা-মাসায়েল ও দীন শিক্ষা দেই। এই কিতাবগুলো আপনাদের কোনো কাজে আসবে না। সর্দার বলল, কোন ব্যাপার? ঐ ব্যাপারটা। সর্দার দস্যুটিকে বলল, আচ্ছা, যুবক, তোমার কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব?

করে নি, তাই যাকাত পরিমাণ অর্থ তাদের অধিকার বহির্ভূত। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের সাহায্যে করে গরিবদের সে হক বের করতে আমাদের পাঠালেন।

পাঠক! স্বভাবতই এটা ভুল এবং অন্যায়। মানুষ যাকাত না দিলেও আমার জন্য তার সম্পদ চুরি করা বৈধ হবে না। এটা ঐ প্রতিভা নারীর মত, যে বেশ্যাবৃত্তি করে ইয়াতিম প্রতিপালন করে। অথচ লক্ষ করুন, এই ডাকাত অন্যায়-অবিচার করে নিজেকে দোষমুক্ত রাখতে কীভাবে বিভিন্ন অজুহাত খুঁজে বেড়াচ্ছে।

উসামায়ে কেরাম অনুরূপ আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। এক কাযির সামনে এক চোরকে হাজির করা হল, যে দেয়াল টপকিয়ে চোরা পথে এক বাড়িতে প্রবেশ করেছে। এবং মস্ত বড় এক লোহার সিন্দুক ভেঙে মালামাল লুটপাট করেছে। কাযি তাকে বলল, হে অমুকা ওলা, তুমি অপরাধী এজন্য আমি আশ্চর্য নই। মালের প্রতি তোমার লোভ বা দেয়াল টপকিয়ে বাড়িতে ঢুকেছো, এ কারণেও আমি আশ্চর্য নই। আমি তোমার একটি জিনিসের কারণে খুব আশ্চর্যাত। চোর বলল, সেটা কী? কাযিবলল, তুমি কীভাবে এত বড় লৌহ-সিন্দুক ভেঙে সম্পদ চুরি করলে? চোর তখন বলল, কাযি সাহেব! আপনি কি এ কবিতা শোনেননি?

‘শুনো! লোভের মাধ্যমেই তোমার কাঙ্ক্ষিত বস্তু হাসিল হবে আর তাকওয়ার মাধ্যমেই তোমার জন্যে লোভা নরম হবে’।

কাযি বলল, বাহ! তুমি তো দেখি দাউদ আ.-এর সমকক্ষ হয়ে গেছ! ওহে ইতর! তোমার কাছে তাকওয়া থাকলে তুমি কি আর চুরি করতে? এরপর তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হল।

এ ঘটনা উল্লেখ করার দ্বারা আমরা উদ্দেশ্য হল, আমরা কখনো ভুল করে ফেলি। যে কারণেই হোক আমরা যখন ভুলের মধ্যে পড়েই যাই তখন বিভিন্নধরনের অজুহাত ও খোঁড়া যুক্তি তালাশ করতে থাকি। যেমন ইবলিস, সে-ই সর্বপ্রথম নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্যে যুক্তি তালাশ করেছে। আল্লাহ তাআলা যখন ইবলিস সমেত ফেরেশতাদের আদম আ.-কে সেজদার আদেশ দিলেন; তখন ফেরেশতারা সেজদা করেছিলেন; কিন্তু ইবলিস সেজদা করেনি। আল্লাহ তাআলা তার কথা কুরআনে কারিমে এভাবে উল্লেখ করেছেন-

قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ

‘আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাঁকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে’

অপর আয়াতে এসেছে, সে বললো,

أَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا

‘আমি কি তাকে সেজদাহ করব, যাকে আপনি মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।’

দেখুন! ইবলিস আল্লাহর আদেশ অমান্য করল। আদম আ.কে সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানাল; কিন্তু একটি অজুহাত বা যুক্তি প্রস্তুত। যখন বলা হল, তুমি কেনো আদমকে সেজদা করলে না? সে বলল, আমি আদমকে বিনা কারণে সেজদা করি নি; আমার যুক্তি আছে। আমি তার চে’ উত্তম; তার চে’ শ্রেষ্ঠ।

সে কিন্তু মিথ্যা বলেছে, কারণ আগুনের চেয়ে মাটি উত্তম সবচে’ বড় কথা হল, মহান আল্লাহর সামনে যুক্তি পেশ করা যায় না। এভাবে ফেরাউনও যুক্তি পেশ করেছিলো, যখন নিজেকে স্রষ্টাদাবি করতে চেয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের দাবিগুলো এভাবে কোরআনে এনেছেন-

ইরশাদ হয়েছে :

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَٰهٍ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَىٰ إِلَٰهِ مُوسَىٰ وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ

‘ফেরাউন বললো, হে পরিষদবর্গ! আমি জানি না যে, অনিবার্যত তোমাদের কোনো উপাস্য আছে কিনা? হে হামান, তুমিইটা পোড়াও, অতঃপর আমার জন্যে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করো, যাতে আমি মূসার উপাস্যকে উপর মেরে দেখতে পরি। আমার ধারণা তো সে একজন মিথ্যাবাদী।’

অন্য আয়াতে এসেছে,

وَنَادَىٰ فِرْعَوْنُ فِي قَوْمِهِ قَالَ يَا قَوْمِ أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَٰذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِي أَفَلَا تُبْصِرُونَ

‘ফেরাউন তার সম্প্রদায়কে ডেকে বললো, হে আমার কওম! আমি কি মিসরের অধিপতি নই? এই নদীগুলো আমাদের নিচদেশে প্রবাহিত হয়, তোমরা কি তা দেখো না?’

অর্থাৎ সে লোকদের বলল, আমি তোমাদের প্রভু; তোমাদের বাদশাহ। তোমরা দেখতে পাচ্ছ না যে, নদীগুলো আমার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে। তোমরা কি তা দেখতে পাচ্ছ না? মোটকথা সে আল্লাহর নাফরমানি করার জন্যে অনেক অজুহাত ও যুক্তি প্রস্তুত করেছিল। যেমন মূসা আ.-এর ঘটনা। কুরআনে কারিমে মূসা আ.-এর ঘটনা এভাবে এসেছে-

وَوَكَلَ الْمَدِينَةَ عَلَىٰ حِينِ غَفْلَةٍ مِنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَٰذَا مِنْ شِيعَتِهِ وَهَٰذَا مِنْ عَدُوِّهِ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسَىٰ فَقَضَىٰ عَلَيْهِ قَالَ هَٰذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُضِلٌّ مُبِينٌ

‘তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন অধিবাসীরা ছিলো বেখবর। সেখানে তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইতে দেখলেন; এদের একজন ছিলো তাঁর নিজ-পক্ষের আর অপরজন তাঁর শত্রুপক্ষের। অতঃপর নিজ দলের লোকটি শত্রুদলের লোকটির বিরুদ্ধে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলো। তখন মূসা তাকে এক ঘুষি মারলেন এবং এতেই সে মারা পড়লো। মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয় সে চরম বিচারাচারী ও প্রকাশ্য শত্রু।’

মূসা আ. মূলত তাদের মধ্যকার সমস্যাটা মিটমাট করতে গিয়েছিলেণ। প্রথমেই তাঁর শত্রু লোকটির কাছে গিয়ে নিজে একটা ঘুষি মারলেন আর এতেই লোকটি মারা পড়লো। অথচ মূসাআ. কিছুতেই এমনটি চাননি। সুতরাং এখানে মূসাআ.-এর অজুহাত বা খুঁজার কোনো প্রয়োজনে ছিলো না; তার সামনে অজুহাত প্রস্তুতই ছিলো যে, ‘আল্লাহ! আমি তো এটা চাইনি।’ এমন একটা অজুহাত তার সামনে প্রস্তুতই ছিল; কিন্তু মূসা আ. আল্লাহ তাআলার সামনে কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে চাননি; তাই নিজের ভুল স্বীকার করে স্পষ্ট বলে দিলেন, ‘এ-তো নিশ্চিত শয়তানের কাজ, নিশ্চয় সে বিচারাচারী প্রকাশ্য শত্রু।’ মূসা বললেন,

قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي

‘তিনি বললেন, হে আমার রব! নিশ্চয় আমি নিজের উপর জুলুম করেছি। অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’

অর্থাৎ আমি ইচ্ছা করে হত্যা করি নি বটে; কিন্তু লোকটিকে ভুল হলেও তো হত্যা করেছি। আর আল্লাহ তাকে ক্ষমাও করেছেন।

فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِلْمُجْرِمِينَ

‘আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেছেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, এরপর আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না।’

মূসাআ.,-এর উক্তি এ কথাই প্রমাণ করছে যে, কেউ কখনো অনিচ্ছায় ভুল করে ফেললে তার উচিতও অতিভক্তির তাড়াও করা। সুতরাং কেউ যখন ইচ্ছা করে ভুল করে, আবার সে ভুলের অজুহাতও তালাশ করে তখন তার সে অজুহাত কীভাবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে?

আল্লাহ তাআলা জাহান্নামিদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন।

وَيُصْلَوْنَهَا فَبِئْسَ الْمِهَادُ مَا أَغْنَىٰ عَنْهُمْ مَا كَسَبُوا وَمَا خَلَفُوا

‘আমি তাদের জন্য কিছু সাথী-সঙ্গী নিয়োগিত করে দিয়েছিলাম, যারা তাদের পূর্বাপরের বিষয়গুলো সুন্দর করে দেখাতো।’

অর্থাৎ তাদের কিছু বন্ধু-বান্ধব থাকে, যারা তাদের জন্য বিভিন্ন যুক্তি ও অজুহাত তালাশ করে। যেমন, কোনো যুবক বন্ধুদের বলল, এই! আমি মদ পান করা ছেড়ে দিতেও চাচ্ছি। তখন তারা তাকে বিভিন্ন অজুহাতও দেখিয়ে বলে, আরে! তুই তো এখনো যুবক। আগে যৌনটা উপভোগ কর, এরপর যখন বৃদ্ধ হবি তখন তাকওয়া ভাবা যাবে। সামনে আরো বহু সময় আছে। এভাবেই তারা তাকে অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে বিভিন্ন যুক্তিও দেখাতো থাকে এ-ই ডাকাতেরও মত, যে বলেছিলো, আমরা এ মাল চুরি করেছি, কারণ তারা এরা যাকাত আদায় করেনি বলে। অথবা এ মহিলারও মত, যে ব্যাভিচারের মাধ্যমে উপার্জিত টাকা দ্বারা দান-খয়রাত করে অথবা মসজিদ নির্মাণ করে। অথবা চুরি-ডাকাতির মাধ্যমে টাকা কামিয়ে ইয়াতিম-বিধবাদের ভরণপোষণ করে। আর প্রত্যেকেই নিজেদের অন্যায়-অপরাধের পক্ষে কোনো না কোনো অজুহাতও দাঁড় করাতে চায়। অনুরূপভাবে কোনো যুবতী পর্দা করতে চায়। হোক তা সৌদি আরবে বা অন্য কোনো দেশে; যেমন আমি যেসব দেশে সফর করেছি। ভার্সিতির মেয়েরা উদ্যম এবং আত্মবিশ্বাস পাক। কেউ কেউ আমার মাথায় স্কার্ফ পরে বলে, আমি পর্দা করেছি! কীভাবে তুমি পর্দা করেছ? অথচ তুমি টাইট-ফিট ও চোস্ত পোশাক এবং সংকীর্ণ ট্রাউজার পরে দেহের অবয়ব ও সৌন্দর্য প্রকাশ করে দিয়েছ, তারপরও বলছো, আমি পর্দা করেছি! তুমি কোথায় আর তোমার পর্দা কোথায়? এতকিছুর পরও তাকে কোনো কোনো বান্ধবী বলে, তুমি অন্যের চে' অনেক ভাল আছে। অন্যরা তো এর চেয়েও স্যাট ট্রাউজার পরে। তোমারটা তো কমপক্ষে গোড়ালী পর্যন্ত পৌঁছে। হ্যাঁ, একটু টাইট-ফিট; কিন্তু অন্যেরটা তো হাঁটু পর্যন্ত বা তারচে' সটা। অন্যরা তো মাথা ঢাকে না, তুমি অন্তত মাথা ঢেকে রাখো। অনুরূপভাবে ধরে নিলাম কোনো যুবক বাড়িতে নামায পড়ে; মসজিদে নামায পড়ে না। যখন সে বন্ধুদের বলে, আমি তো মসজিদে নামায পড়ি না, আমি মসজিদে নামায পড়তে চাই। তখন তারা বলে, ভাই! তুমি অন্যের চেয়ে হাজার গুণে ভাল আছো। অমুক তো নামাযই পড়ে না। তুমি তোর কমপক্ষে নামাযটা পড়!

সাহাবায়ে কেরام রা. কিন্তু আমাদের মত আমল থেকে বাঁচার জন্য কোনো ছুতো তালাশ করতেন না। তাঁদের কেউই ছোট ছোট আমল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন না। বরং তাঁরা সর্বদা বড় থেকে বড় আমল খুঁজতে বেভাবতেন। তাঁদের কেউই আরাম-আয়েশে থাকতে পছন্দ করতেন না। তাঁদের কেউই চুল থেকে মুক্তি পেতে মুক্তি তালাশ করতেন না। হোক তা আল্লাহর নাকা মানি বা অন্য কারো সাথে জুলুম করার ক্ষেত্রে। তাঁরা শুধু একটি পথই তালাশ করতেন; জান্নাতের পথ। তাঁদের মনোবলও ছিলো অভিতিষ্ঠ; তাই তাঁদের প্রজন্ম ওতো উর্দ্ধে থেকে উর্ধতর। এক সাহাবি এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে সবচে' প্রিয় আমল কোনটি? তিনি প্রশ্ন করেননি কোন আমল তাঁকে জান্নাতে নিয়ে যাবে? বরং জানতে চেয়েছেন, কোন আমল আল্লাহর কাছে সবচে' প্রিয়। আরেক সাহাবি যুদ্ধের শুরুতে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর বান্দার কোন আমল দেখে হাসেন? আরেক সাহাবি প্রশ্ন করেন, কোন আমল পাণায় সবচে' ভারী হবে। আরেক সাহাবি প্রশ্ন করেন, কিয়ামতের দিন কোন ব্যক্তি আপনার সবচে' নিকট থাকবে?

প্রিয় পাঠক! নিজের মুক্তির পথ তালাশ করুন। তাদের মত হবেন না, যারা অপরাধ করে সেই অপরাধকে পুষকে কোনো মুক্তি বা ছুতো তালাশ করে বেড়ায়। অন্যায় করে ফেললে স্বীকার করুন; যেমন মূসা আ. করেছিলেন- হে আমার রব! আমাকে মাফ করে দিন। আর তিনি তাঁকে মাফ করে দিলেন। এটা না করে যদি নিজের জন্য বা অন্য কারো জন্যে মুক্তি বা মুক্তির পথ খোজেন, তাহলে তো আপনি অন্যায়-অপরাধ অব্যক্ত রাখার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে দিলেন।

আল্লাহ তাআলা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে সঠিকটা বুঝে উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
১. সূরা সা’দ: ৭৬
২. সূরা বনি ইসরাইল: ৬১
১. সূরা ক্বাসাস: ৩৫
২. সূরা যুখরুফ: ৬১
১. সূরা ক্বাসাস: ১৫
২. সূরা ক্বাসাস: ১৬
১. সূরা হা-মীম সিজদাহ: ২৫

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 যে আল্লাহর জন্যে কিছু ত্যাগ করে

📄 যে আল্লাহর জন্যে কিছু ত্যাগ করে


কথায় বলে, 'যে ব্যক্তি স্মৃতিপটে ইতিহাস সংরক্ষণ করে, তার জীবনানা বুদ্ধি পায়।' মানুষ যখনই অতীতে দৃষ্টি দিবে এবং ইতিহাস নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবে তখনই তার সামনে অনেক জ্ঞান ও শিক্ষণীয় বিষয় চলে আসবে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর চিরন্তন-শাশ্বত গ্রন্থে পূর্ববর্তীদের ইতিহাস আলোচনা করেছেন; যখন আমরা সেগুলো নিয়ে চিন্তা করি তখন তা আমাদের শিক্ষা ও উপদেশকে বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা নবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন:

لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَٰكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

'নিশ্চয়ই তাঁদের ঘটনায় বুদ্ধিমানদের জন্যে রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনো মনগড়া কথা-উক্তি নয়; বরং এটা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ এবং মুমিনদের জন্যে হেদায়াত ও রহমতের মহাউপকরণ।'

كَذَلِكَ نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ مَا قَدْ سَبَقَ وَقَدْ آتَيْنَاكَ مِنْ لَدُنَّا ذِكْرًا

'আমি এভাবে আমি অতীতো যা ঘটেছে তা কিছু সংবাদ আপনাকে অবহিত করি আর আমার পক্ষ থেকে আপনাকে দান করেছি এক উপদেশবাণী।'

আসুন! আমরা একটু হিজরি তিনশ' পঁয়ষট্টির দিকের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করি। সেখানে আমরা বাদশা মুজাফফরের একটি ঘটনা জানতে পারবো। এই বাদশা মুজাফফর ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ন শাসক। তাঁর ছিলো বিশাল সেনাবাহিনী ও অঢেল সম্পদ। তাঁর রাজত্ব, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিয়ে কথা বলতে গেলে আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। ইমাম আবুল ফরাজ ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহু রচিত 'আল মুনতাজিম ফি আখবারিল মুলুকি ওয়াল উমাম' গ্রন্থ পড়ছিলাম; সেখানে তাঁর একটি আত্মসংযমতার ঘটনা পড়ে আমি থমকে গেলাম। মুসলিম ভাই-বোনদের জন্যে এখানে তা উল্লেখ করছি।

বাদশাহ মুজাফফরের মৃত্যু তিনশ' পঁয়ষট্টি হিজরিতে। তিনি অনেক বড় বাদশাহ ছিলেন। বহু অঞ্চল তাঁর শাসনাধীন ছিল। তাঁর আজীবন এক অঞ্চলের গর্ভনর মৃত্যুবরণ করল। উত্তরাধিকার হিসাবে একটি মেয়ে রেখে যায়। পরবর্তী গর্ভনরের তাঁর সমস্ত সহায়ক-সম্পত্তি নিজের কতৃত্বে নিয়ে নেয়। ফলে মেয়েটি খুব অভাব-অনটনে পড়ে যায়। একজন বৃদ্ধা মহিলা বাদশা মুজাফফরের কাছে এসে বলল, আপনার অমুক অঞ্চলের গর্ভনরের একটি মেয়ে রেখে ইন্তেকাল করেছে। মেয়েটির কাছে কোনো ধন-সম্পদ ছিল; কিন্তু পরবর্তী গর্ভনরের তার সব সহায়ক-সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাঁকে রিক্তহস্ত করে দেয়। সে আপনার কাছে অভিযোগ করতে চায়; তার জন্যে কি এ সুযোগ আছে? বাদশাহ বলল, হ্যাঁ, তাঁকে আসতে বলেন। মেয়েটি তাঁর সামনে আসল। সে এমনিই অনিয়ম্যা সুন্দরী ও রূপবতী ছিল যে, বাদশাহ তার দেখবারুর দেখেই তাকে রূপবতী ছিল যে, বাদশাহ তার দেখবারুর দেখেই সে রূপবতী ছিল যে, বাদশাহ তার দেখবারুর দেখেই সে ফেলে। সে গর্ভনরের মেয়ে কি-না এ ব্যাপারে বাদশাহ নিশ্চিত হতে চাইল। কিন্তু লোক দেওয়ার জন্যে বললো। আগে তো কোনো পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড ছিলো না। তাই সাক্ষ্য দিয়ে চেহারা দেখা আবশ্যক ছিল। যখন সে চেয়ারার অবগুণ্ঠন সরালো; সাথে সাথে রূপ-লাবণ্যে আশপাশ যেন ঝলমল করে উঠল। আর এই অভাবনীয় রূপ- লাবণ্যে বাদশাহর শরীরের রীতিমতো কাঁপুনি ধরে গেল, কারণ তাঁর জীবনে সে এমন সুন্দরী-রূপসী ললনা কখনো দেখে নি। তাঁকে চেহারা ঢাকার নির্দেশ দিয়ে বললেন, তোমার কী প্রয়োজন? মেয়ে বলল, আমার বাবার মৃত্যুর পর অমুক গর্ভনরের সমস্ত সহায়-সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে। সে আমাকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করেছে। আমার সম্পদ ফিরিয়ে পেতে আপনার সাহায্য প্রয়োজন। বাদশাহ তৎক্ষণাৎ তার সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার ফরমান জারি করলেন। তাঁকে বললেন, তোমার বর্তমান অবস্থা কী? মেয়ে বলল, নিজ হাতে উপার্জন করে রুটি-পাণি খেয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। বাদশাহ তখনই তাকে কিছু টাকা দিলেন বললেন এবং তাঁর সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার হুকুম দিলেন।

ঐ বৃদ্ধা মহিলা লক্ষ করেছে যে, বাদশাহ এই যুবতীর রূপে কাবু হয়ে গেছে। তাই সে বলল, বাদশাহ নামদার! যদি সে আজকের রাত আপনার প্রাসাদে কাটাতো। মহিলার উদ্দেশ্য ছিল, বাদশাহ যুবতী মেয়েটির সাথে নৈশভর উপভোগ করত। বাদশাহ বললেন, আমি তো প্রায় ষাট ফেলেছিলাম; কিন্তু যখন আমার স্মরণ হল, আমারও যে কয়েকজন মেয়ে আছে। কিছুদিন পর আমিও মৃত্যুবরণ করব। হয়তো, অন্য কেউ আমার সম্পদকে হস্তক্ষেপ করবে। আর আমার মেয়েরা নিরূপায় হয়ে পরবর্তী বাদশাহর কাছে আসবে। আর সেও আমার মেয়ের উপর জুলুম করবে, আজ যেমন আমি আরেক জনের মৃত্যুর পর তার মেয়ের উপর জুলুম করছি।

একটু কল্পনা করুন। এ আলিঙ্গান রাজ্যরাজ্য, এত এত জাঁকজমক ও আড়ম্বরতা এবং এত বড় রাজত্ব আর ক্ষমতা; এ সবকিছুই মানুষের মনে আত্মামিকা ও প্রতারণার বিষ ঢুকিয়ে দেয়, কখনো অবাধ্যতার দিকেও ঠেলে দেয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'না, মানুষ তো অবাধ্যতা করবেই।' বাদশাহ মুজাফফরের প্রাচুর্য ও ক্ষমতার সবকিছুই ছিল; কিন্তু এসব তাকে আল্লাহর বিধান ভুলিয়ে দেয়নি। তাই তিনি বলেছেন, না; বরং সে পরিবারের কাছেই চলে যাক। আল্লাহ তাঁকে বরকত দান করুন। বাদশাহ বলেন, মেয়েটি আমার সামনে থেকে তো ঠিকই গেল; কিন্তু আমার মন তো তাঁর সাথে চলে গেল।

এ ঘটনা চারিত্রিক পবিত্রতা এবং আত্ম-সংযমতার পরিচয় দিচ্ছে। কখনো মানুষের জন্য পথ সহজ হয়ে যায়, তা সত্ত্বেও সে আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম আবার কখনো সে পরিণামের কথা ভেবে দুনিয়াতে পরিবর্তন আশঙ্খা করে। আর ফলে আল্লাহর দয়ায় এই ভাবনাই তাঁকে এধরনের পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে পারে।

আল্লামা তানুরি তাঁর 'অসুবিধায় পরেই খণ্ড' নামক কিতাবে এ জাতীয় চারিত্রিক পবিত্রতা ও আত্ম-সংযমতার অনেক অভাবনীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে একটি হল, এক কাণ্ডন কাপড়ের ব্যবসায়ী; যে ছিলো অস্বাভাবিক রকমের কালো। তার কাছে এক লোক মেহমান হল। একটু পরে মেহমান তার ঘরে কিছু ফুটফুটে সুন্দর বালক দেখতে পেল। মেহমান জিজ্ঞাসা করল, এরা কারা? ব্যবসায়ী বললো, আমার সন্তান। মেহমান বড় আশ্চর্য হয়ে গেল। তখন ব্যবসায়ী বলল, তাদের মা হচ্ছে এক ইউরোপীয়ান নারী। তার সঙ্গে আমার এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। মেহমান বলল, আমাকে ঘটনাটি একটু বলুন-

ব্যবসায়ী বর্ণনা করে, সে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যায়। তখন সিরিয়া ছিলো বুস্তানের শাসনাধীন। তার সাথে কিছু মুসলিম বনিকও ছিল। সে সেখানে কাণ্ডন কাপড় বিক্রি করত। একদিন তার পাশ দিয়ে এক বৃদ্ধা মহিলা গেল। তার সাথে ছিলো এক অপরূপা সুন্দরী যুবতী। তারা ছিলো বুস্তান। তারা সামনে অগ্রসর হয়ে একবার ঐ ব্যবসায়ীর দিকে তাকায় আরেকবার তার পণ্য-সামগ্রীর দিকে তাকায়। তখন মহিলা লক্ষ করল যে, যুবক এই রমণী প্রতি বেশ আকৃষ্ট হয়েছে। ব্যবসায়ী যখন সেখান থেকে অন্যত্র চলে গেলেন তখন মহিলা যুবকের কাছে ফিরে এলো। তাকে বলল, তুমি কি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছ? যুবক বলল, হ্যাঁ। মহিলা বলল, সে তো অমুক বুস্তান নেতার স্ত্রী। যুবক বলল; কিন্তু আমি তো তার প্রতি পাগল হয়ে পড়েছি। আমি তাকে কিছুক্ষণের জন্যেতো চাই। কত দিনে আপনি ব্যাপারটা সহজ করে দিবেন? মহিলা বলল, ‘একশ’ দিনার দাও। আমিই তোমাকে সুযোগ করে দেব। ব্যবসায়ী বলে, আমি তাকে একশ' দিনার দিয়ে দিলাম। যখন রাতে এসে তার ঘরে ঢুকলাম ‘সুত্বহানাল্লাহ' কী বলব, তখন আমাকে এক চিন্তা ও পেরেশানি ঘিরে বসল; ফলে আমি সেখান থেকে চলে আসলাম; কিন্তু পরের দিন আফসোস করতে লাগলাম- কীভাবে আমি এ সুযোগ হাত ছাড়া করলাম আর একশ' দিনার থেকে নিলাম।

পরদিন মহিলা এসে বলল, তোমাকে সুযোগ করে দেওয়ার পর কী করলে? আমি বললাম, জানিনা আমার কী অর্জন হল। লোকটি বললো, আচ্ছা, এবার আরো বেশি করে নিন। তাকে চারশ' দিনার দিয়ে যুবতীর কাছে গেলাম; কিন্তু আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম, আল্লাহ আমাকে দেখেছেন আর আমি এক যুবতী নারীর সাথে অপকর্মে লিপ্ত হব, এটা কীভাবে সম্ভব?। এ বলে আমি বের হয়ে এলাম। যখন বের হলাম তখন শয়তান হাজির হয়ে বললো, তুমি কীভাবে এ সুযোগ হাত ছাড়া করলে! অথচ তোমার মন তার জন্যে উত্তাল। এভাবে মহিলাকে দিনার দেই আর যুবতীর সাথে নির্জনে মিলিত হই; কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহর কথা স্মরণ করে চলে আসি। একসময় এ কাজে আমার সমুদয় দোকান বিক্রি করে ফেলি।

দোকান বিক্রি ও সম্পদ স্থগিত হওয়ার পর সে বলে, যখন দু'তিন দিন চলে গেল তখন আফসোস করতে থাকলাম, হায়! আমার কাছে এখন দোকানও নেই আবার দিনারগুলো শুধু ঐ মহিলার কাছে গেল। যা ভোগ করতে চাইলাম; কিছুই হল না। প্রত্যেক বারই বলছি, এটা হারাম, আল্লাহ আমাকে দেখেছেন। আমি এ চিন্তায়ই পড়ে ছিলাম; এরই মধ্যে এক খোয়াড়কে বলতে শুনলাম, মুসলিম ব্যবসায়ীদের প্রতি ঘোষণা-'যাদের সাথে আমাদের চুক্তি আছে, সে চুক্তি দু'দিনে শেষ হয়ে যাবে। তাই যার পণ্য আছে সে যেনো এ সময়ের মধ্যেই বিক্রি করে দেয়। অন্যথায় ডান্ডা বাজিয়ে দিয়ে মালামাল নিয়ে নিব।' এ শুনে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। তারপর দেশে ফিরে এলাম। সেখান থেকে আসলাম বটে কিন্তু আমার মন ঐ যুবতীর কাছেই রয়ে গেল।

এরপর আমি বন্দি-দাসী ব্যবসা শুরু করলাম; বন্দি ক্রয়-বিক্রয়। আগে তো যুদ্ধের সাথে বাঁদি-দাসীও প্রচলন ছিল গণিমত হিসেবে মুসলিমরা বাঁদি-দাসী পেতো। মুসলিমরা দুশমনদের বন্দি করত আবার দুশমনরা मुसलमानों বন্দি করত; কিবদ্বিরাদের সাথে মুসলিমদের আচরণ আর মুশরিকদের আচরণের মাঝে বিরাট তফাত ছিল। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যখন বদর যুদ্ধের বন্দিরা আসল তখন তাদের সাথে সস্ময় আচরণের নির্দেশ দিলেন। কারো শরীরে জীর্ণশীর্ণ কাপড় দেখে তাদেরেকে উত্তম কাপড় দিতে বললেন। এমনকি বন্দিদের প্রহরী সাহাবিরা নিজেরা নিম্নমানের খাবার খেতো আর বন্দিদের দিতো ভালো খাবার; অথচ সে তাদের হাতে বন্দি। তাদের উত্তম স্বভাব-চরিত্রের কথা কোরআনে কারিমেও বর্ণিত হয়েছে, ‘নিজের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তারা অসহায়, এতিম ও বন্দিদের খাবার দিয়ে দিতো।' অথচ বন্দি লোকটি কাফের। তারপরও তার সাথে এ আচরণ! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাযে কেরামকে বন্দিদের প্রতি ভালো আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন; তাই তাঁরা নিজেরা সাধারণ খাবার গ্রহণ করত আর বন্দিদের ভালো খাবার দিতো। উদাহরণস্বরূপ- দুধ, রুটি আর খেজুর থাকলে বন্দিকে দিতো দুধ, খেজুর আর নিজেরা পানি দিয়ে শুকনো রুটি খেতো। এটা বন্দির প্রতি নিত্যতাই অনুগ্রহ; অথচ তারা ছিলো কাফের। যারা কিছুক্ষণ আগেও তাঁদের সাথে সম্মুখসমরে যুদ্ধ করেছে। তারপরও তাদের সাথে এ সুন্দর আচরণ।

এই বন্দিদের নারী ও শিশুরা मुसलमानों দাস-দাসী হয়ে যেতো। নারীরা তাদের মালিকানায় চলে আসত। যেমন কোরআনে এসেছে, ‘অথবা তোমাদের মালিকানা-ভুক্ত দাসী।' আবার এই দাস-দাসীদের বিনিময়ওে আযাদ-মুক্তির ব্যবস্থা ছিলো। যেমন, কেউ ভুলে কাউকে হত্যা করলে জরিমানা হিসাবে একটি গোলাম বা একটি দাসী আযাদ করতে হয়। অথবা কেউ রমযানে রোযা অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করলে একটি দাস আযাদ করতে হয়। অপর দিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাস মুক্ত করার প্রতি উৎসাহও দিতেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি দাস মুক্ত করবে আল্লাহ ঐ দাসের প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে তার প্রত্যেকটি অঙ্গ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করবেন। এমনকি তার গুপ্তাঙ্গের বদলায় এর গুপ্তাঙ্গ মুক্ত করবেন।' অর্থাৎ যে আল্লাহর বন্দাকে মুক্ত করবে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন।

লক্ষ্য করুন, ইসলাম তাদেরকে বন্দি করে গোলাম বানারো অনুমতি দিয়েছে; সাথে সাথে তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন ও সুন্দর আচরণেরও নির্দেশ দিয়েছে। তারপর বলেছে, তোমরা তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে মুক্ত করে দাও। ইসলাম বন্দিদের প্রতি সদচারের কতটা গুরুত্ব দিয়েছে তা প্রমাণে জন্যে এ ঘটনাটিই যথেষ্ট- রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতা-শয্যার যা বাকাটি বারবার বলেছিলেন তা হচ্ছে, সালাত, সালাত (-এর প্রতি যত্নবান থেকো) আর তোমাদের অধীন ব্যক্তি (-দের প্রতি খেয়াল রেখো)।

কিন্তু বন্দিদের সাথে তাঁদের এ আচরণ আর বর্তমানে বন্দিদের সাথে কাফেরদের আচরণকে একটুঁতুলনা করে দেখুন। ইরাকে আবু গারিব কারাগারে আমেরিকার বন্দিদের সাথে কী পাশবিক আর নির্মম আচরণ করেছে? যদি তারা এরূপ আচরণ কোনো পশুর সাথেও করত তবুও তা বৈধ হত না; এমনকি নিকৃষ্ট প্রাণী শুকর-গাভীলের সাথে করলেও তা নিতান্তই হারাম হত। তারা এ নিকৃষ্টতম আচরণ এমন লোকের সাথে করেছে যাদের কেউ উচ্চশিক্ষিত, আইনে দীন, কেউ হাফেযে কোরআন, কেউ ভার্সিটির প্রফেসর-ডক্টর। আমেরিকা ‘গুয়ান্তামো বে' কারাগারে বন্দিদের সাথে কী আচরণ করেছিলো?বন্দিদেরকে এমন জালে আটকে রেখেছিলো, যা দিয়ে চতুষ্পদ জন্তুকেও আটকানো হয় না। এই জালে যদি তারা কুকুরকেও আটকে রাখত তাহলে পশু-অধিকার সংস্থা আন্তর্জাতিক উচ্চ আদালতেও এর মামলা করে বিচার দাবি করত। তারা তাদের সাথে অতিভজনীয় এবং নিকৃষ্টতম আচরণ করেছে। ফিলিস্তিনিবন্দিদের সাথে ইসরাইলের আচরণ লক্ষ্য করুন; এরপর বন্দিদের সাথে ইসলামের আচরণ আর এতদোভয়ের আচরণের মাঝে তুলনা করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'আমি তো আপনাকে পুরো বিশ্ববাসীর জন্যে রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।'

আচ্ছা, পূর্বের কথাই আসি। এই ব্যবসায়ী বলল, আমি গোলাম-বাদিন কেনা-বেচায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম; যাতে ঐ যুবতীর কথা মন থেকে সরে যায়; কিন্তু না, সে আর মন থেকে গেল না। একদিন শুনতে পেলাম খলিফা একটি বাঁদি খুঁজছে। তখন আমি এক সুন্দরী বাঁদি নিয়ে খলিফার সামনে পেশ করলাম। খলিফা তাকে খুব পছন্দ হল। তাই বলল, কত দিতে হবে। বললাম, দশ হাজার দিনার। খলিফা দিনার দেওয়ার নির্দেশ দিল; কিন্তু তারা শুধু পাঁচ হাজারদিনার দিল। খলিফা বলল, আগামীকাল বলো। বললাম, আমি মুনাফীর মানুষ, আমার এখন দরকার। খলিফা বলল, ইবল, তাকে ইউরোপ থেকে আগত নতুন বন্দিদের কাছে নিয়ে যাও। পাঁচ হাজারের পরিবর্তে তাকে পন্দমশতক বাঁদি নিয়ে নিতে বললো। আমি যখন সেখানে এসে বাঁদি দেখতে লাগলাম, হঠাৎ দেখি ঐ যুবতী মেয়েটি আমার সামনে উপস্থিত; যার সাথে আমি কয়েক বছর পূর্বে নির্জনে একাকী মিলিত হয়েছিলাম। সে তার স্বামীর সাথে যুদ্ধে এসছিল, তারপর বন্দি হয়ে এখানে এসেছে। তখন আমি তাকেই জিনিসপত্রসহ বাড়িতে নিয়ে আসলাম। বাড়িতে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ? বলল, না, চিনতে পারিনি। তখন তাকে বললাম, তোমার কি ঐ যুবকের কথা স্মরণ আছে, এ এত বছর আগে অমুক শহরে ব্যবসায়ী সেজে গিয়েছিলো? টাকার বিনিময়ে কয়েকবার তোমার সাথে নির্জনে মিলিত হয়েছিলাম; কিন্তু প্রতিবারই সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, 'আল্লাহর পানাহ, আল্লাহ আমাকে দেখেছেন আর আমি এক যুবতী নারীর সাথে অপকর্মে লিপ্ত হব' এ বলে সে তোমার কাছ থেকে চলে যেতো। তখন বলল, হ্যাঁ, মনে পড়েছে; সে লোক কি আপনি? বললাম, হ্যাঁ। এরপর সে ব্যাগ খুলে তিনটি মুদ্রা-খুলে দিয়ে বলল, আপনার একটি মুদ্রা ও নেই নি। আর এ মুদ্রাগুলো আমার কোনো প্রয়োজনও ছিলো না। অর্থাৎ সে হচ্ছে ঐ মুদ্রাগুলোই আমার কাছে ফিরিয়ে দিল। ঘটনা শেষ করে লোকটি বললো, সে এখন আমার কয়েত সন্তানের জননী। সে-ই আপনার জন্যে এ খাবার প্রস্তুত করেছে।

এ ঘটনা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ত্যাগ করে আল্লাহ তাঁকে এরোত’ বহু গুণ বিনিময় দান করেন। বিশেষভাবে বর্তমানে বহু ফেতনার ছড়াছড়ি। ইচ্ছা করলেই এর থেকে বেঁচে থাকা যায়। মনে করুন, আপনি বাজারে গেলেন; সেখানে চলে-চলছে বহু চালের পাশাপাশি অনেক অশ্লীলতা-নিলর্জ্জতার বিড়ি-পানাও চলছে সেখানে। কেউ সেখানে কোনো হারাম কাজ বা চোখের গোনা হুরত চাইলে, তা খুব সহজে করা সম্ভব আপনি কোনো হসপিটাল বা ভার্সিটিতে গিয়ে দেখুন, দেখবেন ছেলে-মেয়েরা কেমন অবাধ মেলামেশা আর চলাফেরা করছে, যেনো সে তার কোনো নিকটাত্মীয় বা রক্ত সম্পর্কীয়; গায়ের সাথে গা মিলিয়ে, হাত ধরাধরি করে, আবার কখনও ও তাকে চুম্বন কিংবা আদর-সোহাগও করছে। এ মরণব্যাধিটি এখন ব্যাপকভাবে ধারণ করেছে; কিন্তু মানুষের চাইলেই ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এ থেকে বাঁচা ও তা পরিহার করা সম্ভব।

পরিশেষে মহান আল্লাহ্এর কাছে প্রার্থনা করি যে, তিনি যেনো আমাদেরকে এসব ফেতনা-দুর্ব কর্ম থেকে পাক-সাফ রাখেন; আমাদের ভীর আনুগত্য লেগে রাখেন এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল ফেতনা-বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন। আমিন।

টিকাঃ
১. সুরা ইউসুফ: ১১১
২. সুরা তোয়াহা: ৯৯

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 এক সাহাবির প্রেম

📄 এক সাহাবির প্রেম


এক সম্ভ্রান্ত সাহাবি ও এক মহিলার মাঝে জাহেলি যুগে প্রেম-সম্পর্ক ছিলো। যখন ইসলামের শুভাগমন ঘটলো, তখন সে সাহাবি ইসলাম কবুল করলেন একদিন এক সঙ্কটময় মুহূর্তেকে অপরের সাথে দেখা; তা ছিলো খুবই কোমল ও স্পর্শকাতর মুহূর্ত এবং নিজ-দেহ থেকে অনেক দূরে; ফলে মহিলার সাথে তিনি যে কোনো আচরণ করতে পারতেন। কে সেই সাহাবি? ঐ মহিলার সাথে তার কী হয়েছিলো? ঐ অবস্থা থেকে আল্লাহ্ তাঁকে কীভাবে রক্ষা করলেন? তাঁর সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থান কী ছিল? এই ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ্ তাআলা কি কোরআনে কোনো আয়াত নাযিল করেছেন?

নিঃসন্দেহে সাহাবি মারসাদ ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি রা.। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন এবং ইসলামের খুঁটিনাটি বিষয়ও করে সাহাবায়ে কেরামকে ইসলামের বিধিবিধান শিক্ষা দিতে শুরু করলেন তখন একেক সাহাবি এককেক কাজে লেগে গেলেন; যেমন হাদিস মুখস্থ, হাদিস লেখা, মুকাদ্দামিয়ান বের হওয়া ইত্যাদি।

সাহাবি মারসাদ ইবনে আবু মারসাদ রা. ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ বীর-বাহাদুর বলিষ্ট একজন পুরুষ। তিনি ভালোভাবে হাদিস আয়ত্ত করতে পারতেন না, যেমন আবু হুরায়রা রা. করতে পারতেন; কিন্তু তিনি অন্যসব কাজ বেশ পারদর্শী ছিলেন; তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাফের কোরাইশদের নিকট মুসলিম বন্দিদের উদ্ধার করে পাঠাতেন। মুসলিম বন্দিদের সেখানে হাত-পা বেঁধে রাখা হত। তিনি এসে দেয়াল টপকিয়ে ঘরে ঢুকে একজন একজন পিছন বহন করে দূরে কোনো এক নিরাপদ স্থানে এনে বাঁধন খুলে দিতেন। এরপর তাঁদেরকে মদীনায় পালাতে সাহায্য করতেন। কোরাইশ ও মুসলিমদের মাঝে তখনো যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিল। কোরাইশরা মুসলিমদেরকে যদি বা অপহরণ করার চেষ্টায় থাকত। একবার কাফের কোরাইশদের একটি দল তনোদ্দেশ্যে মদিনার দিকে আসল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার পাশে সদকার উট চড়াতে দিতেন। কোরাইশদের সে দলটি আক্রমণ করতেউত্থত চুরি করে নিয়ে যায়; সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটনী কসওয়া এবং একজন মুসলিম নারীকে নিয়ে যায়, যে ঐ সময় উট চড়াচ্ছিলো; কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেন, তাই সে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। মুসলিমরা তাদের উপর যুলুম করত না, বরং তারাই প্রথম মুসলিমদের উপর যুলুম করে যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُمِ اعْبُدُوا عَلَيْكُمُ فَأَعْتَدُوا عَلَيْهِ يَجْعَلُ مَا اعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ

‘যারা তোমাদের উপর যুলুম করবে তোমরাও তাদের উপর ঐ পরিমাণ যুলুমের বদলা গ্রহণ করো যে পরিমাণ তোমাদের উপর যুলুম করেছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো যারা দীনদার- পরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে আছেন’

অপর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন,

وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا

‘আর মন্দের বদলা অনুরূপ মন্দ দ্বারাই দেওয়া হবে।’

অর্থাৎ তোমরা আমাদের সাথে যেরূপ আচরণ করবে আমরাও তোমাদের সাথে সেরূপ আচরণ করব। তো মারসাদ রা. মুসলিম বন্দিদের চুরি করে মুক্ত করতেন। একদিন মারসাদ রা. মক্কার উদ্দেশ্যে বেরুলেন। যে বাড়িতে একজন মুসলিম বন্দি ছিলো, সে-বাড়ির দিকে চুপসারে অগ্রসর হতে হতে বাড়ির কাছে এসে পড়লেন। এরপর বাড়িতে তিনি ঢুকতে যাবেন অমনি তাঁকে এক মহিলা দেখে ফেলল; তার নাম ইনাক। এই মহিলাই জাহেলি যুগে মারসাদ রা.-এর প্রেমিকা ছিলো। যখন একে অপরকে দেখে ফেললো, তখন তিনি দেয়ালের ছায়ায় লুকালেন; চাঁদের আলোতে তখন দেয়ালের ছায়ায় পড়েনি। মহিলা তাঁর কাছে এসে বলল, মারসাদ! স্বাগতম, তোমার আগমন শুভ হোক! তিনি কথা না বলে চুপ করে রইলেন। মহিলা বলল, হে মারসাদ! আসো, একসাথে রাত কাটাই। তিনি বললেন, হে ইনাক! আল্লাহ ব্যাভিচার হারাম করেছেন; অথচ তখন তিনি নিজ-ভূমি থেকে দূরে অন্য গ্রাম/শহরে উপত্যকায় ছিলেন। রাতের আঁধারে দেয়ালের ছায়ায় লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন; আল্লাহ ছাড়া তাঁকে কেউ দেখছিলোনা। তিনি আত্মগোপন করে আছেন। এক দিকে ঐ মুসলিম বন্দি মুক্তির অপেক্ষায় আছে, অপর দিকে এ মহিলা তাঁকে ডাকছে এবং তিনি তিনদেশেই আছেন। এখানে এমন কোনো মুসলিম বা অমুসলিম নেই যে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করবে তিনি আল্লাহকে পরোয়া না করে যদি তা করতে চাইতেন তবে অতি সহজেই তা হয়ে যেতো; কিন্তু তিনি বললেন, হে ইনাক! আল্লাহ ব্যাভিচার হারাম করেছেন। সে বলল, আরে এসো, এখানে আমাদের কেউ দেখবে না। তিনি বললেন, না; হে ইনাক! আল্লাহ তো ব্যাভিচার হারাম করেছেন। মহিলা বলল, এসো, নইলে চিৎকার এইতো দিলাম। তিনি মহিলার সামনে থেকে দৌড় দিবেন, অমনি সে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, হে কোরাইশের লোকেরা! হে কোরাইশের লোকেরা! এই যে এই লোক তোমাদের বন্দিদের ছিনিয়ে নিতে এসেছে, সে তোমাদের বন্দিদের নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, ডাকো ধরো...! এই আওয়াজ শুনে অনেকেই সেদিকে ছুটে গেল এবং তাঁকে খোয়াড়ীমুখে করতে লাগল; কিন্তু ততক্ষণে তিনি এক বাগানে লুকিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর যখন খোয়াড়ীমুখে বন্ধ হয়ে গেল, তখন আবারও তিনি ঐ বাড়িতে আসলেন। আপনারা এমন সাহসিকতা কি কখনো দেখেছেন না শুনেনি!? তিনি একথা বলেননি, আলহামদুলিল্লাহ, কোনো রকম প্রাণে বেঁচেছি; বরং তিনি বলেছেন, আমার একটা লক্ষ্য আছে; যে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে আমি মক্কায় এসেছি তা পূর্ণ না করে আমি মক্কায় যাব না; তাই তিনি মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এসে বলেন নি, আলহামদুলিল্লাহ, তারা তো আমাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিল। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন, আমি কোনো রকম জান নিয়ে মদিনায় ফিরতে পেরেছি। বরং তিনি আবার এসে দেয়াল টপকিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়েন এবং বন্দিকে পিঠে বহন করে দরজা খুলে বের হয়ে আসেন। তারপর দূরে এক নিরাপদ স্থানে এসে বন্দির বাঁধন খুলে দিলেন। এবার তারা মদিনা পানে হাঁটা শুরু করলেন। বেশ কয়েকদিন চলার পর তাঁরা মদিনায় এসে পৌঁছলেন। মক্কা-মদিনার মাঝে পাঁচশত কিলোমিটারের দূরত্বয় পথ। তাঁরা এ পুরো সফরে কখনো গিরিপথপথ অতিক্রম করেছেন। এখন আপনি মারসাদ রা. ও তাঁর সঙ্গী সাহাবির চিত্রটি একটু মনে ধারণ করুন, বিস্ময়ে ভরে যাবে আপনার মন। তাঁরা কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো উটের পিঠে চড়ে আরোহণ করেছেন। অপর দিকে মারসাদ রা. মক্কা মদিনার এ দীর্ঘ পথ পাড়ে দিচ্ছেন আর তাঁর মন-মগজ ইনাকের কথা ঘুরপাক খাচ্ছে এবং স্মরণ হচ্ছে রাতের ঐ নিরালামুহূর্তের কথাও। আবার পূর্বের দুঃখ-কষ্ট ও ভালোবাসার স্মৃতিগুলোও তাঁর মনে ফের জেগে উঠছে। তিনি পায়ে হাঁটছেন বা উটে আরোহণ করছেন, তাঁর মন শুধু সে মহিলাকে নিয়েই ভাবছে। এভাবে একদিন-দুইদিন করে অতিবাহিত হচ্ছিল আর মদিনা কাছে আসছিল। অবশেষে তাঁরা মদিনায় এসে পৌঁছলেন।

বন্দি পরিবারের কাছে গেল আর মারসাদ রা. মসজিদে গিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং ঘটে যাওয়া সবকিছুই বিবরণ দিলেন। তিনি ঐ মহিলাকে ভালোবাসেন এবং তাঁর সাথে পূর্ব-সম্পর্কের কথাও জানালেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি ইনাককে বিয়ে করতে পারি? তাকে স্ত্রী-রূপে গ্রহণ করতে পারি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মারসাদ! আল্লাহ ব্যাভিচার হারাম করেছেন। তিনি (মারসাদ রা.) বললেন, আমি কি তাকে কি বিয়ে করতে পারি? তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন-

الزَّانِي لَا يَنكِحُ إلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً ۖ وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ

‘ব্যাভিচারী পুরুষ কেবল ব্যাভিচারিণী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিয়ে করবে এবং ব্যাভিচারিণীকে কেবল ব্যাভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিবাহ করবে এবং এদেশের মুমিনদের জন্য হারাম করা হয়েছে।'

আল্লাহ তাআলা পূর্ণাঙ্গ সমাধান নাযিল করলেন। মারসাদ রা. প্রথমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুধু পরামর্শ করতে এসেছিলেন; কিন্তু সেখানে এসে পূর্ণাঙ্গ সমাধান পেয়ে গেলেন। এটাই শরয়ী নিয়ম। মানুষ যখন কোনো সমস্যায় পড়বে, তখন কর্তব্য হল কোনো অনর্থশীল ও কল্যাণকামী মুরুব্বি বা শায়খের কাছে তা পেশ করা। অথবা মা-বাবা বা কোনো বুঝমান বড় ভাইদের কাছে বলা, যে তাঁকে কোনো অন্যায় কাজে প্ররোচিত করবে না; যাতে সমস্যার সমাধান হয়। মারসাদ রা. যখন অনুভব করলেন, তাঁর মন পূর্বের অবস্থার দিকে ঝুঁকছে তখন তিনি মনকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেননি। বরং তিনি মনের ডাক্তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে সবকিছু খুলে বলেছেন। তিনি বলেছেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি একটি প্রেমরোগে আক্রান্ত হয়েছি। ইনাকের প্রতি আমার ভালোবাসা উঠলে উঠছে। আমি ইনাককে বিয়ে করে ফেলি? তাঁকে বিয়ে করব কি? তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উত্তরদানের সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হল, এটা কি তাঁর ও ইনাকের মধ্যকার সমস্যার সমাধান? ‘ব্যাভিচারী পুরুষ কেবল ব্যাভিচারিণী নারী বা মুশরিক নারীকেয়ই বিয়ে করবে।' এ আয়াতের কী অর্থ? এ আয়াতও কি শুধু একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে, না আমাদেরকে কোনো ফিকহি বিধান সম্পর্কে জানান দিচ্ছে? এটাও আমাদেরকে ভালোভাবে বুঝতে হবে, যাতে আমরা যথাযথভাবে সমস্যার সুরাহা করতে পারি।

الزَّانِي لَا يَنكِحُ إلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً ۖ وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ

‘ব্যাভিচারী পুরুষ কেবল ব্যাভিচারিণী নারী অথবা মুশরিক নারীকেবিবাহ করবে।'

আল্লাহ তাআলার এ বাণীর অর্থ, যে ব্যক্তি ব্যাভিচারে লিপ্ত থাকে; তা থেকে তাওবা করে না- তার সাথে যে নারী বিবাহ সম্মত হয় সে ব্যাভিচারিণী নারীর মতোই অনিষ্ট হবে। এটা কীভাবে? অবশ্য এর অর্থ এটা নয় যে, ঐ নারীর ব্যাভিচারের গোনাহ হবে; কিন্তু এ ব্যক্তি যখন সহবাস ও মেলামেশা করবে, তখন সে স্ত্রী ও বেশ্যা নারীদের মাঝে কোনো পার্থক্য করবে না। সে একবার স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে, অন্যবার অন্য নারী সাথে মিলিত হবে। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এর মাঝে আর তার মাঝে শুধু একটি শরিয়ি বন্ধন রয়েছে। সুতরাং সে তার দৃষ্টিতে অন্যান্য বেশ্যা নারীর মতোই মনে হবে; ফলে সেও বেশ্যা নারীর মত হয়ে যাবে। এর অর্থ এ নয় যে, তার ব্যাভিচারের গোনাহ হবেনা সে কোনো মুশরিকা নারীকে বিবাহ করবে- যে তার সাথে কোনো ব্যাভিচারী পুরুষ মিলিত হওয়া পছন্দ করে যেমন তার সাথে তার স্বামী মিলিত হয় এ কারণে যে ব্যক্তি ব্যাভিচারী বলে পরিচিত (আল্লাহর পানাহ) তার কাছে কাউকে বিবাহ দেওয়া ঠিক নয়। এমন হুকুম এ নারীর ব্যাপারেও প্রযোজ্য হবে, যার ব্যাভিচারী হওয়ার বিষয়টি সমাজে পরিচিত; তাকে বিবাহ করা ঠিক হবে না। অবশ্য যে তওবা করে ভাল করে গেলে এবং অবস্থার সংশোধন হয়েছে তার কথা ভিন্ন। আর যে পুনরায় তাতে ফিরে যাবে,আল্লাহ তার প্রতিশোধ নেবেন।আল্লাহ যখন তাওবার কারণে শিরিকসহ অন্যান্য সব বড় গুনাহ ক্ষমা করে দেন,তখন ব্যভিচারের গোনাহের ব্যাপারে আপনার কী ধারণা? অনুরূপ কথা ব্যভিচারিণী নারীর ক্ষেত্রেও। যখন সে তাওবা করে ভালো হয়ে যাবে এবং তার অবস্থার সংশোধন হবে তখন তাকে কোনো মুমিন বিবাহ করতে পারবে; কিন্তু তাওবার পূর্বে যে তাকে বিবাহ করবে তাকেও ব্যভিচারী হিসাবে মনে করা হবে।

তো, যখন কোনো ব্যক্তি দ্বীনি বিষয়ে সমস্যার কারণে অন্যের কাছ থেকে তখন সে ভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর মনে কোনো বিষয়ে খটকা-দ্বিধা বা সন্দেহ লাগলে সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সে সমাধান চাইতেন। পূর্বের ওলামায়ে কেরামও এভাবে তাদের শায়খদের কাছে যেতেন। ছাত্ররা ইমাম আবু হানিফা রহিআল্লাহ্র কাছে এসে সমস্যার কথা জানাতেন। বলতেন,শায়খ! আমার মনে এমন এমন কথা অনুভব করছি। এর কোনো সমাধান আছে কি? এভাবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী রহিআল্লাহুর কাছেও তাঁদের ছাত্ররা আসতো এবং সমস্যার সমস্যন খুঁজতো। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنْبِطُونَهُ مِنْهُمْ ۚ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَاتَّبَعْتُمُ الشَّيْطَانَ إِلَّا قَلِيلًا

‘আর যখন তাদের কাছে কোনো শান্তি বা ভীতিকর কোনো সংবাদ পৌঁছে, তারা তা (যাচাই না করেই) প্রচার শুরু করে দেয়।’

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

‘আর যদি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবা তাদের কর্তৃস্থানীয় লোকজনের কাছে নিয়ে যেতো, তাহলেতাদের মধ্যে যারা তথ্যঅনুসন্ধানী- তারা যা যথার্থা জানে যেন। এবং (হে মুসলিমগণ!) তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত না হতো, তাহলে তোমাদের অল্প কতিপয় লোক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ শুরু করতো!’

আল্লাহ তাআলা আদেশ করছেন যে, যখন কোনো ব্যাপারে সমস্যা দেখা দিবে তখন কর্তব্য হবে সেই ব্যাপারটি নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারস্থ হওয়া। তাঁর জীবদ্দশায় যেমনটি সাহাবায়ে কেরাম করতেন। আর তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁদের কর্তব্যবান, আলেম-উলামা বা জ্ঞানী-গুণীজনদের শরণাপন্ন হওয়া। যেনো তাঁরা ব্যাপারটির সমাধান করে দেন।

এ কারণে হানজালা রা.-এর মনে যখন কোনো বিষয়ে খটকা লাগতো তখন তিনি সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরণাপন্ন হতেন অথবা যিনি সমাধান দিতে পারবেন তাঁর কাছে বিষয়টি শেয়ার করতেন। একবার আবু বকর রা.-এর সাথে হানজালা রা. দেখা করলেন। তাঁকে বললেন, হানজালা তো মুনাফেক হয়ে গেছ! আবু বকর রা. তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তো কী হলো? তিনি বললেন, যখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকি; জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে তাঁর আলোচনায় আমার অন্তর এতটা বিগলিত হয়, যেনো জান্নাত-জাহান্নাম আমার সামনে উপস্থিত; কিন্তু যখন তাঁর কাছ থেকে চলে এসে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির সাথে হাসি-রসিকতা করি তখন এর অধিকাংশই ভুলে যাই। আবু বকর রা. বললেন, এমন অবস্থা তো আমিও অনুভব করি। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকি তখন আমার কলব এতটাই নরম হয়, যেনো আমি জান্নাত-জাহান্নাম সামনে অবস্থান করছি; কিন্তু সেখান থেকে চলে গেলে সেই নরমতা আর বাকি থাকে না।

পাঠক! এটি একটি রজবরজাবত ব্যাপার। আপনি যখন সালাত আদায় করবেন বা দোয়া-দরুদ পড়ে কাঁদবেন তখন আপনার মন স্বভাবতই নরম হবে। আর যখন সালাত বা দোয়া শেষ হবে তখন আপনার মন আগের অবস্থায় ফিরে যাবে; এ নরম অবস্থা আর থাকবে না, অথবা অভূতপূর্ব কিছুটাও হলেও কমে যাবে। তো আবু বকর রা. হানজালা রা. কে বললেন, চলো আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাই।

বর্তমানে আলেম-উলামার সাথে যোগাযোগ করা এবং তাঁদের কাছে সমস্যার কথা বলা সহজ হয়ে গেছে, কারণ বিভিন্ন মজলিসে এবং নামায পড়তে গিয়ে বা মোবাইল ও চিপিরের মাধ্যমে তাঁদের সাথে কথা আদান প্রদান করা অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে। কোনো প্রসিদ্ধ আলেম বা কোনো প্রসিদ্ধ দারির কাছে যাওয়া শর্ত নয়। যিনি বেশি ব্যস্ত থাকেন, আপনি তাঁর কাছে যাবেন না। বরং আপনি প্রত্যেক এমন ব্যক্তির কাছে যান যাঁর কাছে শরয়ি ইলম আছে, যদিও তিনি তেমন একটি প্রসিদ্ধ নন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল, যাঁর কাছে আপনি যাবেন তাঁর কাছে যেনো এই পরিমাণ শরয়ি ইলম থাকে, যা দিয়ে তিনি আপনার সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন। যেমন হানজালা রা. আবু বকর রা.-এর কাছে গিয়েছিলেন, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তাই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুপস্থিতিতে আবু বকর রা.-এর শরণাপন্ন হয়ে বলেছিলেন, হানজালা তো মুনাফেক হয়ে গেছে।

যাই হোক, এরপর তারা উভয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলেন। হানজালা রা. বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! হানজালা তো মুনাফেক হয়ে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কীভাবে? তিনি বললেন, আমরা যখন আপনার কাছে থাকি আর আপনি জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করেন, তখন আমাদের কলব এতটা নরম হয় যেনো জান্নাত-জাহান্নাম আমাদের সামনে উপস্থিত। অন্যদিকে যখন আপনার কাছ থেকে চলে আসি এবং স্ত্রী ও সন্তানদ্বয়ের সাথে হাসি-মজা করি, তখন আমরা অনেকটা ভুলে যাই। হানজালা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটি অন্তরঙ্গন সমস্যাকে খোলাখুলিভাবে পেশ করেছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তৎক্ষণাৎ এর সমাধান করেছেন। তিনি যদি ব্যাপারটিকে আমলে না নিতেন, মনের ভিতর রেখে দিতেন এবং মন থেকে এক কল্পনা-জল্পনা বের করে দিতেন, তবে হয়তো এটিই তাঁকে প্রকৃত নেফাকের দিকে নিয়ে যেতো। অথবা তিনি একসময় বলতেন, আমি তো মুনাফেক। আমি সালাত সিয়াম করব কেনো? হয়তো শয়তান তাকে এতদূর পর্যন্ত ঠেলে দিতো; কিন্তু তিনি কাল বিলম্ব না করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে চলে গেছেনএবং বলেছেন, আপনার কাছে থাকাকালীন আমাদের অন্তর নরম থাকে; আপনার কাছ থেকে চলে গেলে অন্তর পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়; তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে হানজালা! আমার কাছ থেকে যাওয়ার পরও যদি তোমাদের সে অবস্থাই থাকতো, তাহলে ঘর-বাড়ি এবং পথে-ঘাটে ফেরেশতারা তোমাদের সাথে মোসাফাহ করত; কিন্তু হে হানজালা! এটা একসময় আর ওটা ভিন্ন সময়।’ অর্থাৎ একটা সময় ভয়-ভীতি আর কান্নাকাটি হবে; আরেকটা সময় হাসি-রসিকতা আর আনন্দ-বিনোদন হবে।

এমন পরিস্থিতিতে আমাদেরও কর্তব্য হবে মারসাদ রা.-এর মত কাজ করা। সমস্যা নিয়ে সরাসরি কোনো কল্যাণকামী-হীতাকাঙ্ক্ষী আলেম বা মুরুব্বির কাছে যাওয়া। তাই কোনো যুবক বা যুবতী কোনো সমস্যায় পড়লে করণীয় হবে সত্বর কোনো অভিজ্ঞ বিশ্বস্ত আলেম বা শায়খের কাছে যাওয়া। আর এঁদের কর্তব্য হবে মনোনিবেশের সাথে তাদের সমস্যার কথা শোনা এবং সমস্যা সমাধানের যথাসাধ্য চেষ্টা করা; বিশ্বস্ততা ও কর্তব্য-পরায়ণতার পরিচয় দেওয়া। তাহলে তাদের সমস্যা আর সামনে এগোবে না এবং সব জায়গায় লাঞ্ছিতর শিকার হতেও হবে না। আর সাবধান! আপনার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ রাখুন এবং এর একান্ত বিষয়টিকে ছেড়ে ফেলুন; যাতে অন্য কেউ এ গোপন বিষয় সম্পর্কে জানতে না পারে।

পরিশেষে মহান আল্লাহ্র কাছে মিনতি! তিনি যেনো আমাদের সকলকে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও পদস্খলন থেকে রক্ষা করেন এবং আমাদের উপকৃত ও উপকারী হিসেবে মনোনীত করেন। আমিন।

টিকাঃ
১. সুরা বাকার: ১১৪
২. সুরা ত্বরা: ৪৩
১. সুরা নুর: ৩
১. সুরা নুর: ৩
১. সুরা নিসা: ৮০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00