📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 যুলুম করো না

📄 যুলুম করো না


বিভিন্ন ঘটনা আর দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাস এগিয়ে চলেছে; কিন্তু পৃথিবীতে যারা ক্ষমতাবান, যাদের অধীনে অন্যরা চলে, তাদের থেকে আমরা এমন অনেক বিষয় বা সিদ্ধান্ত দেখতে পাই। আসলে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না যে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল কারণ বা উদ্দেশ্য কী ছিলো? এসকল সিদ্ধান্ত বা দুর্ঘটনার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা হল, বারমাকি গোত্রের দুর্যোগের ঘটনা। যদিও আমরা এখানে বারমাকি গোত্রের দুর্যোগের পূর্ব ঘটনা আলোচনা করবো না, কারণ এ বিষয়ের আলোচনা অনেক দীর্ঘ। যদি খলিফা হারুনুর রশিদকে প্রশ্ন করা হয়, (বারমাকি গোত্রের সাথে হারুনুর রশিদের অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ইয়াহইয়া আল-বারমাকি ছিলেন হারুনুর রশিদের দুধ বাবা। হারুনুর রশিদের নিকট তাঁর অনেক মর্যাদা ছিল। তিনি ছিলেন অনেক বৃদ্ধ। তা সত্ত্বেও হারুনুর রশিদ তাঁকে মৃত্যু পর্যস্ত জেলে আটকে রেখেছেন। বারমাকি গোত্রের দুর্যোগের ঘটনাটা একটা ইতিহাসের এক রহস্যজনক ঘটনা।) আপনি কেনো বারমাকি গোত্রের সাথে এমন করলেন? আপনি একদিন সকালে হঠাৎ করে তাদের কতককে হত্যার আদেশ দিলেন আর কতককে জেলে বন্দি রাখার আদেশ দিলেন, এবং তাদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলেন? এমন প্রশ্ন হারুনুর রশিদকে করলে হয়তো সে বলবে, আল্লাহ্‌র শপথ করে বলছি আমার এই হাতও যদি এর কারণ জানতো তাহলেও আমি তা কেটে ফেলতাম।

পূর্বে বলেছ ইয়াহইয়া আল-বারমাকি হারুনুর রশিদের দুধ পিতা ছিল, তা সত্ত্বেও তাঁকে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। হারুনুর রশিদের বংশের অনেককে হত্যা করেছে এবং অনেককে জেলে বন্দি করে রেখেছে। ইয়াহইয়া আল-বারমাকি ছিলো অনেক বৃদ্ধ; তার বয়স ছিলো আশির উর্ধ্বে। তাঁর সাথে নিজ ছেলে খালেদকেও বন্দি করা হয়েছিল। তাঁদের সাথে জেলে অনেক কঠিন ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন ছিলো শীতকাল; প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছিল, বয়সের কারণে বৃদ্ধ ইয়াহইয়া অনেক কষ্ট হচ্ছিলো; কিন্তু জেলার তাঁদেরকে আরো বেশি কষ্ট দেওয়ার জন্য জেলের ভিতর থেকে সব ধরনের কাঠ সরিয়ে নিয়ে ছিলো, যাতে করে তাঁরা জেলের ভিতর আগুন জ্বালিয়ে শীত কমাতে বা ঠান্ডা পানি গরম করতে না পারে।

খালেদের বৃদ্ধ পিতা ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করতেও অনেক কষ্ট হত। বিশেষ করে সকালে ফজরের সময়। এদিকে জেল কর্তৃপক্ষও সকল কাঠ-খড়ি সরিয়ে নিয়েছে। তাই ইয়াহইয়া যখন ঘুমিয়ে যেতো, খালেদ তখন পানির পাত্র নিয়ে জানালাায় রাখা কামরা আলোকিত কারার বাতির নিভুনিভু আলোতে সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে পানি যে সামান্য গরম হতো, সকালে ফজরের আযানের সময় পিতার ঘুম ভাঙলে সেই পানি দিয়ে ওযু করতো- যাতো ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করতে পিতার কষ্ট না হয়। অতঃপর জেল কর্তৃপক্ষ যখন এই পদ্ধতি জানতে পারলো, তখন তাঁদের আরো কষ্ট দেওয়ার জন্যে বাতি জানালা থেকে আরো দূরে সরিয়ে রাখতো- যাতো সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে কষ্ট করেও পানি সামান্য গরম করতে না পারে। এরপর পিতা ইয়াহইয়া আল-বারমাকি যখন ঘুমিয়ে যেতো, খালেদ তখন পিতার মুহাব্বত ও ভালোবাসার কারণে পানির পাত্র পেট ও রানের মধ্যে রেখে দেওয়াতে হেলান দিয়ে ফজর পর্যন্ত বসে থাকত, অতঃপর ফজরের আজান হলে পিতার খেদমতে সেই পানি পেশ করতো।

ইয়াহইয়া ও তার পুত্র খালেদের উপর শুধুমাত্র এই বিপদই নেমে আসেনি; বরং তাঁরা তাঁদের সকল সম্পদও হারিয়েছিল। বর্ণিত আছে, একবার ইয়াহইয়ার নিকট ইবনুল মুগিসি আসলো। ইবনুল মুগিসি ছিলো খলিফার এক কর্মকর্তা। সে ইয়াহইয়ার নিকট এসে বলল, খলিফা আমাকে বলেছে আমি যদি দশ মিলিয়ন দিরহাম না দেই তাহলে তিনি আমাকে হত্যা করবে। ইবনুল মুসায়িব বিরুদ্ধ দশ মিলিয়ন দেরহাম চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। তাই সে ইয়াহইয়া নিকিট এসে কান্নাকাটি শুরু করল। ইয়াহইয়া তখন তার গোলামকে বলল, দেখো কোবাগারে কত দেরহাম জমা আছে। সে বলল, পাঁচ মিলিয়ন দেরহাম আছে। সে তাকে বলল, এগুলো তাকে দিয়ে দাও। তারপর ছেলে খালেদের নিকট লোক পাঠিয়ে বলো, আমি শুনেছি তুমি একটা বাগান কিনতে যাচ্ছো, তো তোমার কাছে কত দেরহাম আছে? সে বলল, দুই মিলিয়ন। তিনি বললেন, এটা তাকে দিয়ে দাও। অতঃপর ছেলে ফযলের নিকট লোক পাঠিয়ে বলো, তুমি আমাকে এক মিলিয়ন দাও, এরপর মেয়েকে বলো, তোমার যে অলঙ্কারগুলো আছে সেগুলো দাও। এভাবে সে দশ মিলিয়ন দেরহাম জমা করে ইবনে মুসায়িবকে দিল।

ইবনে মুসায়িব এই সম্পদ নিয়ে যখন বেরুলো তখন সে তার সাথীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি মনে কর যে, সে আমার প্রতি ইহসান করে আমাকে এই সম্পদ দিয়েছে? না; বরং সে আমার ভয়ে আমাকে এই সম্পদ দিয়েছে। সুবহানাল্লাহ! সে তোমাকে কেন ভয় করবে? আচ্ছা বুঝলাম সে তোমাকে ভয় করতো; কিন্তু সে যদি তোমাকে এই সম্পদ না দিত তাহলে তুমি কি খলিফার হাত থেকে বাঁচতে পারতে? আর তুমি-ই বা এই সম্পদের জন্য ইয়াহইয়া এর পায়ে পড়তে গেলে কেন? অতঃপর ইবনে মুসায়িব যখন খলিফার নিকট এই সম্পদ দিয়ে নিজেকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করল তখন তার সেই সাথী যে ইয়াহইয়াকে সম্পদ দেওয়ার সময় তার সাথে ছিলো, সে ইয়াহইয়ার নিকট গিয়ে বলল, ইবনে মুসায়িব বলেছে, আপনারা না-কি তার ভয়ে তাকে এই সম্পদ দিয়েছেন? অর্থাৎ এটা স্পষ্ট নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা। ইয়াহইয়া তখন বলল, হয়তো সে না বুঝে কথাটা বলেছে। সে তখন হতাশ ও বিমর্ষ অবস্থায় ছিল; সে কীভাবে নিজেকে মৃত্যু থেকে বাঁচাবে সে চিন্তাতেব্যস্ত ছিল।

ইয়াহইয়া আল-বারমাকি একজন সম্পদশালী ও সম্মানিত লোক ছিলেন; কিন্তু ছেলে তার এই করুণ অবস্থা দেখে, একদিন ছেলে খালেদ তাঁকে বলল, বাবা! এত কিছুর পরও আমরা কীভাবে ধৈর্যধারণ করবো। আমাদের এখনো কিছু কি আর বাকি আছে যার কারণে আমরা ধৈর্য ধারণ করবো? কেনো আমাদের এই অবস্থা হল? কী কারণে আমাদের এখানে আনা হল? ইয়াহইয়া তখন ছেলেকে বলল, হে আমার ছেলে! শোনো! আমরা যখন গাফেল হয়ে রাতে ঘুমাই, মাযলুমের দোয়া তখন রাতের অন্ধকারে আসমানের দিকে উঠে যায়। আর আল্লাহ তাআলা তো ঘুমান না, তিনি কখনো তা থেকে গাফেল থাকেন না।

বর্ণিত আছে যে, জেলের ভিতর ইয়াহইয়া আল-বারমাকির যখন মৃত্যুর সময় হল, তখন সে একটি কাগজ আনতে বললো, এবং তাতে কিছু কথা লিখে তা পকেটে রেখে দিয়ে বলল, আমার যখন মৃত্যু হবে তখন এই কাগজটা খলিফা হারুনুর রশিদের নিকট পৌঁছে দিও। তাঁর মৃত্যুর পর জামা-কাপড় খুলে পকেট থেকে কাগজটা বের করে খলিফার নিকট পৌঁছে দেওয়া হল। খলিফা কাগজটা খুলে পড়লো। তাতে লেখা ছিল, ‘দুই প্রতিপক্ষের একজন বিচারালয়ের দিকে চলে গেছে আর অপরজন তার পরে আসছে। তারা দুইজন এমন এক বিচারালয়ে উপস্থিত হবে, যার বিচারক হবেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আর সাক্ষী হবেন ফেরেস্তারা।’ এবং তাতে আরো লেখাছিল, হে হারুনুর রশিদ! তুমি আমার প্রতি যুলুম করেছো, আমাকে বন্দি করে রেখেছো, আমার প্রতি ও আমার সন্তানদের প্রতি অবিচার করেছো; কিন্তু মনে রেখো, আমি এবং তুমি একদিন আল্লাহর সামনে অবশ্যই দাঁড়াবো।

নিশ্চয় যুলুমের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুআয ইবনে জাবাল রা.কে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তিনি তাঁকে যুলুম থেকে বাঁচার ওসিয়ত করেছেন। মুআয রা. বলেন, আমি আমার উটের উপর ছিলাম আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পায়ে হাঁটিছিলেন তখন তিনি আমাকে বলেন, হে মুআয! এই সাফল্যের পর হয়তো আমার সাথে তোমার আর সাক্ষাৎ হবে না। একথা বলার পর তিনি তাকে একটা ওসিয়ত করেন কী ছিলো সেই ওসিয়ত?

মুআয রা. হলেন একজন বিখ্যাত সাহাবী। তিনি উম্মতের মধ্যে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সবচে' বড় আলেম ছিলেন। তিনি ছিলেন হিফযুল কুরআন ও ইলমের পর্বত-চূড়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ইয়ামানে মুআল্লিম হিসেবে প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন, হে মুআয! এটাই তোমার সাথে আমার মদিনায় শেষ ইটা। এই সাফল্যের পর হয়তো আমার সাথে তোমার আর সাক্ষাৎ হবে না। এরপর হয়তো তুমি আমার মসজিদ ও আমার কবরের পাশ দিয়ে হাঁটবে। সত্যিই মুআয রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতে আর মদিনায় আসেননি। এরপর তিনি তাকে কয়েকটি ওসিয়ত করেন, তার একটা হল, হে মুআয! তুমি মাযলুমের বদ দোয়া থেকে সাবধান থাকবে, কারণ মাযলুমের দোয়া আর আল্লাহ তায়ালার মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।

জ্ঞানীগণ বলেন, এমন লোকের বদ দোয়া থেকে সাবধান থাকবে, তুমি ঘুমিয়ে গেলেও যারা না ঘুমিয়ে তোমার বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করে।

কত মানুষ যেঅন্যায়ের প্রতি অন্যায় করার কারণে দুনিয়ারেও শাস্তি ভোগ করে, তার কোনো হিসেব কি আমাদের কাছে আছে? মাযলুম ব্যক্তি রাতের আঁধারে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তায়ালার নিকট যালেমের বিরুদ্ধে দোয়া করে- ফলে মৃত্যুর পূর্বেই দুনিয়াতে তার আরেক মর্মন্তুদ মৃত্যু ঘটে যায়। সহিহ হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘দুই ব্যক্তির শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত হয়, ১. যালেম; ২. মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান।’

যালেমের শাস্তি দুনিয়াতেই বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। যেমন হয়তো সে আর্থিকভাবে অভাবীতে ভোগে; কখনো ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; তার অংশীদারা তাকে ধোঁকায়; কখনো কখনো তোমার কাজ বন্ধ হয়ে যাবে; তোমার সন্তানদের তোমার সমস্যা সৃষ্টি হবে; তুমি সড়ক দুর্ঘটনায় পড়বে; তোমার স্ত্রীর সাথে সমস্যা সৃষ্টি হবে; তুমি শারীরিক অনেক সমস্যায় পতিত হবে; কোনো কারণ ছাড়াই একদিন তোমার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হবে; একদিন সর্দি লাগবে; একদিন জ্বর হবে; একদিন রক্তচাপ বেড়ে যাবে কিন্তু তুমি এর কোনো কারণ খুঁজে পাবে না। হয়তো অকালর রাতে কোনো মাযলুমের দোয়ার কারণে তুমি এই বিপদের সম্মুখীন হয়েছো। আর তুমি এর থেকে গাফেল-অসতর্ক ছিলে; কিন্তু তোমার এবং তার রব আল্লাহ কখনোই গাফেল নন।

আবু যার রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘নিজেরাও ভালোবেসে, হে আমার বান্দারা! আমি যুলুমকে আমার নিজের উপর হারাম করেছি, এবং এক তোমাদের মাঝেও হারাম হিসেবেই রেখেছি, সুতরাং তোমরা যুলুম করো না।’

অর্থাৎ মালিকাধীণ শ্রমিকদের প্রতি যুলুম করবে না। স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি যুলুম করবে না। ভাই তার বোনদের ও ছোট ভাইদের প্রতি যুলুম করবে না। শিক্ষক ছাত্রছাত্রদের অন্যায্যভাবে প্রহার করবে না। ইমাম মসজিদ ও মুয়াজ্জিনদের প্রতি যুলুম করবে না। বিচারক তার কাছে আসা বিচার প্রার্থীদের প্রতি যুলুম করবে না। নেতা অধীন লোকদের প্রতি যুলুম করবে না। রাজা প্রজাদের প্রতি যুলুম করবে না; এক কথায় কেউই অন্যের প্রতি যুলুম করবে না, কারণআল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে আমার বান্দারা! আমি যুলুমকে আমার নিজের উপর হারাম করেছি, এবং এক তোমাদের মাঝেও হারাম হিসেবেই রেখেছি, সুতরাং তোমরা যুলুম করো না। তুমি কারো গিবত করে তার প্রতি যুলুম করো না, কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে তার প্রতি যুলুম করো না। কারো বেতন আটকে দিয়ে তার প্রতি যুলুম করো না, গাড়িওয়ালার ভাড়া আটকে দিয়ে তার প্রতি যুলুম করো না। কারো বদনাম করে তার প্রতি যুলুম করো না। অর্থাৎ কোনোভাবেই কারো প্রতি যুলুম করো না।

অফিসের কোনো কর্মচারী চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অন্যত্র যেতে চায়, তখন অফিসের প্রধান তাকে বলে, তুমি আমাদের এখানে থেকে যাও; কিন্তু লোকটি বলে, না আমি বরং অন্য কোথাও যাওয়াকে ভাল মনে করছি, সুতরাং আপনি আমাকে এখান থেকে একটি অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট দিন। তখন তার বস বলে, না আমরা তোমাকে কোনো সার্টিফিকেট দেবো না, তুমি যাও; এখান থেকে তোমাকে কোনো সার্টিফিকেট দেওয়া হবে না।

আরে এইটা তো আমার হক, তোমাদের সাথে আমার চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। আমি অন্য জায়গায় যেতে চাচ্ছি। আমি তোমাদের সাথে নতুন চুক্তি করতে বাধ্য নই। আমি তোমাদের সাথে থাকা অবস্থায় তোমাদের সাথে কোনো ধরণের খেয়ানত করিনি, আমি তোমাদের সাথে কোনো ধরণের যুলুম করিনি। তোমরা আমাকে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট দিবে, এটা তোমাদের নিকট আমার প্রাপ্য-হক। তখন অফিসের বস বলে, যাও নাও আমাদের কাছে কোনো সার্টিফিকেট নেই, আমরা তোমাকে কোনো সার্টিফিকেট দেবো না। এটা সম্পূর্ণ যুলুম, এটা প্রকাশ্য অন্যায়।

যারা হাসপাতাল, অফিস বা সরকারি কোনো দফতরে চাকরি করে, তাদের কাছে যখন কেউ সেবা গ্রহণ করতে আসে তখন অযথা তাদের হয়রানি করা হারাম; এটা যুলুম। কেউ কেউ শুধু মাত্র একটি সাইনের প্রয়োজনে কোনো অফিসে আসে; কিন্তু অফিসার তাকে বলে, অপেক্ষা করুন। তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখে, কখনো শুধু মাত্র একটি সাইনের জন্য কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত বসিয়ে রাখে। তাকে বার বার ঘুরিয়ে পেরেশানিতে ফেলে। এটা অন্যায়, এটা যুলুম। আপনি কেনে তাকে বসিয়ে রাখবেন? আপনি কেনো তাকে কষ্ট দিবেন? একটি সাইন দিতে কি এক ঘণ্টা লাগে? একা সাইন দিতে কি মাস, সপ্তাহ বা দিন লাগে? আপনি কেনো অযথা ও সময় নষ্ট করছেন? তাকে পেরেশানিতে ফেলে কষ্ট দিচ্ছেন? এটা হারাম এটা যুলুম-অন্যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘কেউ যদি তার কোনো ভাইয়ের প্রতি যুলুম করে থাকে, তাহলে সে যেনো ঐদিন আসার পূর্বেই তার সমাধান করে নেয়, যে দিন দিনার ও দিরহাম কোনো কাজে আসবে না।’ (পরকালে)

সহিহ হাদিসে এসেছে, ইওকালের পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মসজিদে এসে মিবারে দাঁড়িয়ে এবং সাহাবায়ে কেরام রা.কে উদ্দেশ্য করে খুৎবা দেন, তখন মসজিদ ছিল সাহাবায়ে কেরাম রা.কে পরিপূর্ণ, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে একদৃষ্টিতে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন, যেনো নিজ কলিজা ও আত্মার দিকেই তাকিয়ে আছেন, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের নিকট নিজ সত্তার চেয়েও প্রিয় ও মূল্যবান ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, হে মানুষ! তোমাদের মধ্যে থেকে আমার প্রতিনিধিদের সমর নিকটবর্তী (অর্থাৎ আমার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী!) সুতরাং আমি যদি তোমাদের কারো পিঠে আঘাত করে থাকি, তাহলে এই তো আমার পিঠ, সে যেনো আমার থেকে এর কিসাস চুকিয়ে নেয়। আমি যার কাছ থেকে সম্পদ নিয়েছি, এই তো আমার সম্পদ, সে যেনো এখান থেকে যা খুশি নিয়ে নেয়। আমি যাকে গালি দিয়ে সম্মানে আঘাত করেছি, এই-যে আমার সম্মান, সে যেনো তা শোধ নিয়ে নেয়। অতঃপর তিনি বলেন, কেউ যেনো আমার পক্ষ থেকে শাক্ততার ভয় না করে, কারণ এটা আমার রুচি-প্রকৃতি নয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন সাহাবায়ে কেরামের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, এবং তিনি বুঝতে পারলেন যে, তাঁদের আত্মা কষ্ট ভুগছে এবং তাঁদের মধ্যে থেকে একজনও দাঁড়াচ্ছে না, তখন তিনি বললেন, তাহলে সে যেনো আমাকে ক্ষমা করে দেয়, সে যেনো আমাকে ক্ষমা করে দেয়- যাতে আমি আমার রবের সাথে একটি পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে সাক্ষাৎ করতে পারো পারি। অথবা তিনি বলেছেন, আমি আমার রবের সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে পারি যে, আমার উপর কারো কোনো হক বাকি নেই।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহু বলেন, আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রকে সাহায্য করেন, যদিও সেটা কাফের রাষ্ট্র হয়। আর তিনি জালেম রাষ্ট্র ধ্বংস করে দেন, যদিও তা হয় কোনো মুসলিম রাষ্ট্র। হে ভাই! তুমি জুলুমের ভয়াবহতা নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখো। জুলুমের পরিণাম খুবই অশুভ ও ভয়ংকর। সুতরাং আমাদেরকে শুধুমাত্র জুলুম থেকে বেঁচে থাকলেই চলবে না বরং অন্যকে জুলুম থেকে উত্তম পন্থায় বাধা দিতে হবে। যেমন কেউ তার কর্মচারীদের উপর জুলুম করল, কোনো স্ত্রী তার সন্তানদের উপর জুলুম করল বা তার স্বামী সন্তানদের উপর জুলুম করল, (অর্থাৎ তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কারণে বা মৃত্যুবরণ করার কারণে সন্তানরা মা হারা হয়েছে এবং তার তত্ত্বাবধানে এসেছে।) কোনো ভাই তার ভাই বা বোনদের প্রতি জুলুম করল, কোনো বোন তার ভাই বা বোনদের প্রতি জুলুম করল, অথবা কোনো মেয়ে তার মায়ের প্রতি জুলুম করল বা কোনো সন্তান তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি জুলুম করল, অথবা কোনো প্রতিবেশী তার অপর প্রতিবেশীর প্রতি জুলুম করল, তাহলে আমাদের উচিত হবে আমরা সাধ্যমত উত্তম পন্থায় তাকে সেই জুলুম থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবো।

আল্লাহ তায়ালার নিকট এই প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেনো আমাদের সকলকে এর উপর আমল করার তাওফিক দান করেন। এবং আমরা যেখানেই থাকি না কেনো তিনি যেনো আমাদেরকে কল্যাণের সাথে রাখেন। আমিন。

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 অনিষ্টের কারণ হয়ো না

📄 অনিষ্টের কারণ হয়ো না


আ'শা বিন কায়েস ছিলেন ইয়ামামার মওজদ এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ লোক। সে সময় মদন থেকে মদিনায় গম, ভুট্টা ও এ জাতীয় খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি হত। সেখানকার লোকেরা ব্যবসায়ী ছিল। এ কারণে লোকেরা তাদের প্রতি কিছুটা মুখাপেক্ষী ছিল। তারা মক্কাও খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি করত। মক্কা তো ইসলামের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আরবদের কাছে হজ্জের মৌসুমে পণ্যসামগ্রী আদান-প্রদানের উৎস বলে গণ্য হত। আ'শা বিন কায়েস ছিল নিজ জাতির অন্যতম সরদার। সে ছিলো একজন অভিজ্ঞ ও প্রতিভাধর কবি। তার কবিতা সর্বাগ্রে আলোচিত হত।

যখন তার বয়স বেড়ে নব্বই ছাড়িয়ে গেল তখন সে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনতে পেল। সে জানতে পারল, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে পথপ্রদর্শক হয়ে এক ঐশী কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন। তারা তখন মূর্তিও অন্যান্য বস্তুর উপাসনাও নিত। সে নিজ জাতির দৃষ্টিতে ফেরালে দেখত, মূর্তির কাছে আসা-যাওয়া করছে, মূর্তির চতুষ্পার্শ্বে প্রদক্ষিণ করছে, মূর্তিকে সিজদা করছে এবং মূর্তির সামনে পশু উৎসর্গ করছে। তারা পাথরের পূজা-আর্চনা করে, যা তাদের কোনো ক্ষতি বা উপকার কিছুই করতে পারে না- তখন সে মনে মনে ইসলামে নিয়ে ধাবিত হল। এরপর সে এই বৃদ্ধ বয়সে উটের পিঠে বসে রাসূলের শানে এ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে মদিনার পথে রওয়ানা হল-

‘তোমার চক্ষু অন্ধকার রাতেও বুঝে থাকেনি। তবে তুমি অসুস্থ ব্যক্তির মত রাতযাপন করেছো।’

‘হে প্রাজ্ঞ! তুমি কোথায় যাচ্ছো? ইচ্ছা করছো? কারণ মদিনা ভূমিতে তোমার একটা প্রতিষ্ঠিত সময় রয়েছে।’

এভাবে দীর্ঘ এক কবিতা আবৃত্তি করলেন। মদিনায় পৌঁছার আগেই রাসূলের শানে কবিতা আবৃত্তি করতে থাকেন; কিন্তু পথিমধ্যে কুরাইশ কাফেরদের একটি দলের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটলো। তারা বলল, আপনি কি? সে বলল, আমি আ'শা বিন কায়েস। তারা বলল, আশ্চর্য! আপনি কি ইয়ামামার সরদার আ'শা বিন কায়েস?

জাহেলি যুগে উকাজ ও যুলমাজাযের মত আরবদের কিছু বড় বড় বাজার ছিল যেখানে তারা সকলে সমবেত হত। সেখানে কেউ কেউ মানুষের সামনে নিজের কবিতা আবৃত্তি করত। সেখানে আবার কবিতা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। বলা হত, কে আছে, হাসসানের কবিতা আবৃত্তি করবে। কে আছে, আ'শা বিন কায়েসের কবিতা আবৃত্তি করবে? এভাবে বিখ্যাত কবিদের কবিতা-আবৃত্তিও আসর জমাতো।

তারা বলল, আপনিই আ'শা বিন কায়েস? বলল, হ্যাঁ। কোথায় যেতে ইচ্ছা করেছেন? আমি মদিনায় যাচ্ছি, নবির সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলামে দীক্ষিত হবো। তারা এবার তার দিকে ভাল করে তাকাল। এবং বলল, হে আ'শা! তাহলে আপনার ধর্ম, আপনার বাপ-দাদার ধর্মের কী হবে? তাদের এ কথোপকথন মক্কামুখে উটের পিঠে চলেছিল। তার সাথে ছিল তার পরিবার-পরিজন ও নিজ কওমের কিছু লোক। কুরাইশ কাফেররা চাইল না যে, আ'শা মদিনায় পৌঁছে ইসলাম কবুল করুক। আর সে চাইল মদিনায় পৌঁছে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাৎ লাভ করবে। কুরাইশ কাফেরদের আশঙ্কার কারণ হল, যদি আ'শা ইসলাম কবুল করে, তবে তো নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঝুলিতে আরো একজন শক্তিশালী কবি যুক্ত হবে- যা হবে মহাবিপর্যয়ের কারণ। আর এ হাসসানের সাথে মিলে অন্য কবিদের প্রতিষ্ঠিত করবে।

নিন্দা জ্ঞাপন করে কবিতা বানিয়েছে। কবিতায় আমাকে মন্দ বলেছে।

তখন উমার রা. বললেন, সে তোমার ব্যাপারে কী বলেছে? সে বলল, অর্থাৎ ‘তুমি নিজেকেই কষ্ট দিও না, এখানে তোমার দেখভাল, খানাপিনা করানোর লোক আছে।’

উমার রা. বললেন, আমি মনে করি সে তোমার প্রশংসা-ই করেছে। তখন সে বলল, আপনি হাসসানকে জিজ্ঞাসা করুন, সে কবিতা সম্পর্কে ভালো জানে। উমার রা. বললেন, হাসসান! এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন? সে কি তার নিন্দা করেছে? হাসসান রা. বললেন, নিন্দা করেনি বটে; কিন্তু তাকে আক্রমণাত্মক করেছে। তখন উমার রা. জারিরকে শাসন করেছিলেন। বলা হয়, ঐ আমিরকে তিনি কিছু দিরহাম দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, মুসলমানদের প্রয়োজনে জিনিসপত্র আমি তোমার কাছ থেকে কিনে নিব। আলেমগণ আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন- জনৈক কবি শহরের আমির কুশা গিয়ে একটি কবিতা বানিয়েছিল। এতে আমিরটি চটে গিয়ে তাকে শাস্তির নির্দেশ দিয়েছিল। তার সারা শরীরে মানুষের মল মাখিয়ে শহরের অলি-গলিতে ঘোরানো হয়েছিল। তাকে যখন ছেড়ে দেওয়া হল, তখন সে বাড়িতে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হল। এরপর আরেকটি কবিতা আবৃত্তি করল,

‘তুমি আমার সাথে যা করলে তা পানিতে মুখে মুখে পরিষ্কার হয়ে যাবে; কিন্তু তোমার সম্পর্কে আমার এ কবিতা ফয়ে যাওয়া অহিতেও অবশিষ্ট থাকবে।’

তাতে সে বলেছে, তুমি এখন আমাকে ময়লা মাখিয়ে শহরের অলি-গলিতে ঘুরিয়েছ, আর শিশু ও অন্যরা পিছন থেকে আমাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করেছে। আমি তাদের কাছে একধরনের অপমান অনুভব করছিলাম, কারণ সব জায়গায় লোকেরা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এটা সত্য যে তুমি আমাকে অপমান করেছ; কিন্তু এ অপমান কিছুদিন পর শেষ হয়ে যাবে। তুমি যা করেছ, পানি তা ধুয়ে ফেলবে; কিন্তু তোমার সম্পর্কে আমার এ কবিতা মহাকাল পর্যন্ত বাকি থাকবে। তোমার সম্পর্কে আমার কবিতা আবৃত্তি হতে থাকবে- যখন তুমি থাকবে আবার কবরে। তোমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে লোকজন বলবে, এটা অমুকের কবর, যার সম্পর্কে কবি এমন এমন কথা বলেছেন।

এ কবির প্রভাব বর্তমানও রয়েছে। কত কবিও যে, কবিকে হত্যা করেছে কত কবিতা যে, কবিকে পদচ্যুত করেছে? কত কবিতা যে, জাতির রক্ত ঝাড়িয়েছে আর মস্তক বিদীর্ণ করেছে এবং এর কারণে কত নারী যে, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে?! এখনো আরবদের কাছেই ডায়েরি ও নথিপত্র হিসেবে গণ্য হয়।

যাইহোক, কুরাইশ কাফেররা আ'শা বিন কায়েসকে দেখে বলল, এই আ'শা বিন কায়েস যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে ইসলাম কবুল করে তবে তার কাছে শক্তিশালী দু'জন হয়ে যাবে; তাই তার ইসলাম কবুলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করো। তারা তার কাছে অগ্রসর হয়ে বলল, হে আ'শা! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো ব্যভিচার হারাম করে। এখন ইসলাম কবুল করবে তখন আর ব্যভিচারের সুযোগ পাবে না। তুমি এখন যা ইচ্ছা তা করতে পার। লাভ-উওয়া তোমাকে এ-কাজ করতে নিষেধ করছে না; কিন্তু তুমি ইসলাম কবুল করলে তখন-তখন ব্যভিচার করতে পারবে না। আ'শা বলল, আমি অভিশপ্ত বৃদ্ধ, আমার ব্যভিচারের কোনো ইচ্ছে নেই। আমার সামনে থেকে চলে যাও। সে অগ্রসর হতে চাইল; কিন্তু তারা তার কাছ থেকে সরন না। তারা বলল, দেখো আ'শা! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ নিষিদ্ধ করে। ইসলামে দাখিল হলে তোমার জন্য দেবতা থাকবে না। বরং তুমি মদ পান করলে তোমার উপর দণ্ডবিধি কার্যকর করা হবে। আ'শা বলল, আমি অভিশপ্ত বৃদ্ধ, আর মদ বিবেক-বুদ্ধিকে খেয়ে ফেলে। যে তা পান করে সে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। আর এখন আমার মদের প্রতি কোনো আসক্তি নেই।

তখনও সেই জাহেলি যুগেও কিছু লোক ছিল যারা মদ পান করত না। সেসময়ে এক কুরাইশ লোককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- যে মূর্তি পূজা করত এবং কন্যাশিশুকে জীবন্ত দাফন করত, তুমি মদ পান করো না কেন? সে বলেছিল, ‘আমি দেখেছি, যে ব্যক্তি মদ পান করে সে আপন মায়ের উপর অপবাদ আরোপ করে। এবং আপন বোনের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়।’ সে বলতো, মানুষ কীভাবে নিজেই নিজের বিবেক- বুদ্ধিকে নষ্ট করতে পারে? অর্থাত্‍ এখন পর্যন্ত আমার মস্তিষ্ক ঠিকঠাক আছে। আর মদ সে বিবেক নষ্ট করে দেয়। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেন,

'যে দুনিয়াতে মদ পান করবে সে পরকালে (জান্নাতে) মদপান থেকে বঞ্চিত থাকবে।'

তিনি আরো বলেন,

'যে মদপানে অভ্যস্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহর সাথে সে মূর্তিপূজারীর ন্যায় সাক্ষাত্‍ করবে।'

এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদকে সকল পাপের মা বলেছেন। আর ওলামায়ে কেরামও মদকে সকল পাপের মা বলেছেন। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বড় বড় গুনাহের কথা আলোচনা করতেন তখন বলতেন, 'আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহের কথা বলব না, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহের কথা বলব না, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহের কথা বলব না?' সাহাবায়ে কেরام বলতেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, যাদু করা এবং শিরক করা। এবং তিনি মদ পানের কথাটিও উল্লেখ করতেন। আর মদ এ কারণেই বড় গোনাহ যে, মদ মানুষের আকলকে নষ্ট করে দেয়। তার দ্বীন-ধর্মকেও নষ্ট করে দেয়। এবং কখনো কখনো তাব্যক্তিককে অনেক অন্যায়-অপকর্মের দিকে নিয়ে যায়। কখনো তাকে নিয়ে মানুষ ঠাট্টা- উপহাস আবার কখনো সে পাগলের প্রলাপ করে; ফলে মানুষ তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করে। এসবকিছুই ঘটে তার মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণে।

যখন সেই জাহেলি যুগেও কিছু কিছু মানুষ কুফর-শিরক করেও মদ থেকে দূরে থাকত; তখন কীভাবে সে একজন মুসলিম হয়ে মদ পান করতে পারে? এ কারণে আল্লাহ তাআলা মদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

'হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীর- এসৰ শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো; যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'

আল্লাহ তাআলা এখানে মদের আলোচনা মূর্তির আলোচনার সাথে ই উল্লেখ করেছেন। যে মদ পান করে সে সফল হতে পারে না।

তো, তারা তাকে বলল, হে আ'শা! দেখ, তুমি যদি ইসলাম কবুল করো তবে তোমার জন্য মদ হারাম হয়ে যাবে। সে বলল, আল্লাহর শপথ! আমার এ বয়সে মদপানে কোনোই ইচ্ছা নেই; সেটা তো মানুষের বিবেককে নষ্ট করে আর ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করে। আর আমি এমনিতেও মদ পান করি না; তোমরা আমাকে ছাড়ো। এ বলে রওয়ানা হতে চাইল; কিন্তু তারা তাঁর পথ আগলে ধরে বলল, হে আ'শা! জি, বলেন; এবার তারা তার সামনে সর্বশেষ টোপটি ফেলল- যার থেকে আ'শা বাঁচতে পারেনি। সর্বশেষ টোপ; যার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

'বনি আদম এক দিক দিয়ে বৃদ্ধ হয় আর অপর দিকে তার হৃদয় দুটি জিনিসের ভালবাসায় নবযুবক হয়।'

সে জিনিস দুটি হচ্ছে- যার কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বনি আদম এক দিক দিয়ে বৃদ্ধ হতে থাকে আর অপর দিক দিয়ে তার হৃদয় দুটি জিনিসের ভালবাসায় যুবক হয়ে যায়। এক. দুনিয়ার ভালবাসা; দুই. দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা।'অথবা বলেছেন, 'সম্পদের ভালবাসা আর দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা।'

দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে দীর্ঘ জীবন লাভের আশা করা। আর এটা কেউ তোমাকে দিতে পারবে না। আর সম্পদ, এটা মানুষ তোমাকে দিতে পারবে। তারা বলল, হে আ'শা! তুমি তোমার নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে যাও। নিজের ধর্ম ও রীতিনীতির উপর স্থির থাক। আমরা তোমাকে একশ' উট উপঢৌকন দিচ্ছি। এ কথা শুনে আ'শার মনে একটা ধাক্কা খেলো। সে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল এবং দেখতে পেল, একশ' উট তার সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা করছে। আর পূর্ব থেকেই তাদের কাছে উটের একটা বিশেষ মূল্য ছিল। বর্ণনার অবস্থান্তরও সত্য নয়। মানুষ তো তখন সফর, কূপ থেকে পানি উত্তোলন, চাষাবাদ ও মহর আদায়ের বিভিন্ন কাজে এই উটকে ব্যবহার করত। তাদের কেউ স্ত্রীকে মহর দিতে চাইলে এই উট দিয়ে মহর আদায় করত; একটি, দুটি, দশটি বা একশটি যার যেমন সামর্থ্য হতো। কেউ সফর করতে চাইলে উট ব্যবহার করত; কেউ জমি চাষাবাদ করতে চাইলে উটের দ্বারস্থ হত; কূপ থেকে পানি উত্তোলন করতে এই উটকেই ব্যবহার করত- উটের পিঠ বা বাঁশ বেঁধে দিত, অতঃপর তার সাথে রশি বেঁধে রশির অপর প্রান্ত বালতি দিয়ে দিত, উট একবার সামনে, আরেকবার পিছনে যেতো; এভাবেই তারা তা দিয়ে পানি ওঠাতো। তারা রক্তপাতে রক্তপণ বা অন্য যে কোনো জরিমানা আদায়ে এই উটই প্রদান করত। উট জবাই করে মেহমানদারী করত। উটের এই বহুবিধ উপকারের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ

'তারা কি উটের দিকে তাকায় না, তাকে কেমন (উপকারী) করে সৃষ্টি করা হয়েছে?'

অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ

'তিনি চতুষ্পদ জন্তুও সৃষ্টি করেছেন; এতে তোমাদের জন্য রয়েছে শীত-বস্ত্রের উপকরণ। আর এতে রয়েছে বহুবিধ উপকার এবং কিছু তোমরা আহার করে থাকো।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো যুদ্ধাভিযানে যেতে চাইলে সাহাবায়ে কেরামকে উট অনুদান করতে বলতেন। যেমন আত্মবিশ্বাস ● ২৮২

উসমান রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাবুক অভিযানের অভাবী বাহিনীকে প্রস্তুত করতে চাইলো তখন লোকদের বললেন, তোমরা দান করো। তখন উসমান রা. দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আসবাব-পত্রসহ একশটি উট দান করলাম। এরপর আরেকজন দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আসবাব-পত্রসহ একশটি উট দান করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার দান করতে বললেন, উসমান রা. আবার বললেন, সন্মাত্র ও বস্ত্রাদি সহ একশটি উট তার দান করলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উসমান আজকে যে আমল করল, এরপর সে কোনো ভুলত্রুটি করলেও তার কোনো ক্ষতি হবে না।

মোটকথা তারা আ'শা বিন কায়সকে এ জাতীয় বস্তুর মাধ্যমে প্ররোচিত করল। আর সে ছিলো অতিশয় বৃদ্ধ; কিন্তু তার সম্পদের প্রতি খুব মহব্বত ছিলো। তারা তাকে বলল, আমরা তোমাকে একশ' উট দিচ্ছি, তুমি তোমার কওমে ফিরে যাও। সে বলল, একশ' উট, তোমরা কি এখনি আমার সামনে এনে দেবে? হ্যাঁ, এখনি এনে দেব। দাও তাহলে; তখন তারা একশ' উট তার সামনে হাজির করল। আর আল্লাহ তাআলা তো সত্যই বলেছেন,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ

'নিঃসন্দেহে কাফেরদের সম্প্রদায় আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার জন্য নিজ ধন- সম্পদ ব্যয় করে। বস্তুত এখন তারা আরো ব্যয় করবে। আর তা হবে তাদের জন্য আক্ষেপ ও হতাশার কারণ। শেষবধি তাদের পরাজয় নিশ্চিত, আর কাফের সম্প্রদায়কে তো জাহান্নামের তাড়িয়ে নেওয়া হবে।'

লোকটি উটগুলো নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হল। সে সামনে চলছিল আর উটগুলো চলছিল তার পিছন পিছন। সে উটগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছিল আর এ কল্পনা করছিল যে, যখন নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে যাবে তখন এত সম্পদ দিয়ে সে কী কী করবে? এক পর্যায়ে যখন সে নিজবসবাসের কাছাকাছি এলো তখন তার উটনীটি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল আর সেও প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে সাথে সাথে মারা পড়ল। ..........সে দুনিয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কারণ তার কাছে এখন কোনো উট নেই; .......... এবং পরকালেও ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কারণ সে ইসলাম কবুল করেনি। এটাই প্রকাশ্য প্রকৃত মত।

এ ঘটনা বলে দিচ্ছে, কিছু মানুষ ভাল হতে চায়; কিন্তু প্রকৃত বন্ধু তার ভাল হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কিছু মেয়ে পর্দা করতে চায় এবং হারাম সম্পর্ক ছাড়তে চায় কিছু লোক তওবা করতে চায় মহাপাপ ছড়তে চায়, নামায শুরু করতে চায়, অন্যায় গোনাহের কাজ পরিহার করতে চায়। এবং অশ্লীল ও বেহায়াপনার দেশ ভ্রমণ করা থেকে তওবা করতে চায়; কিন্তু না; তার কিছু বন্ধু-বান্ধব যারা ঐ অন্যায় কাজগুলোকে তার সামনে স্বাভাবিক ও সুন্দর করে পেশ করে। তারা ভালো এবং সৎতার ব্যাপারে তাকে তীব্র-সন্ত্রস্ত করে তোলে। তারা তাকে বলে, দেখো! তুমি যদি পর্দা করো তাহলে তোমাকে ভাল দেখাবে না; কখনো দেখাবে, তোমাকে আকর্ষণীয় ও চিত্তগ্রাহী মনে হবে না। তোমার বিয়ে হবে না; কুমারী থেকে যাবে। আর যুবককে বলে, দেখো! দাড়ি রাখলে তোমাকে স্মার্ট দেখাবে না; বিদঘুটে দেখাবে; মানুষ হাসবে। তাই আপনি দাড়ি ছাড়াই নামায রোযা করুন এবং এ জাতীয় আরো নানা কথা বলে তাকে ভালো কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। কখনও সুদ ছেড়ে দিতে চায়, সুদী কারবার থেকে বিরত থাকতে চায়; তখন তারা অভাবের ভয় দেখায়। কোনো যুবতী যখন নিজেকে পাক-পবিত্র রাখতে চায় তখন তারা দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং বলে, তুমি এটা না করলে দুঃখ-কষ্টে পড়বে; অনাহারে কাটাবে; সাবলম্বী হতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَقَيَّضْنَا لَهُمْ قُرَنَاءَ فَزَيَّنُوا لَهُمْ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خَاسِرِينَ

'আমি তোমাদের পিছনে সঙ্গী লাগিয়ে দিয়েছিলাম, অতঃপর সঙ্গীরা তাদের অগ্র-পশ্চাতের (খারাপ) আমল তাদের প্রতি শোভনীয় করে দিয়েছিলো। তাদের ব্যাপারেও শান্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তী জিন ও মানুষের উপর। নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত।' আজ আল্লাহ তাআলা এখানে বর্ণনা করছেন, তাদের কিছু সাথী-সঙ্গী আছে যারা পথভ্রষ্টতার দিকে ঠেলে দেয়। সুতরাং আমরা যেনো এমন সাথী-সঙ্গী থেকে সতর্ক থাকি যারা অন্যায় ও অনিষ্টতার হোতা। যেমন ছিলো আবু জাহেল, উমাইয়া ইবনে খালফ। মুসলিম নিজে অনিষ্টতার কারণ হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে, এবং এ ব্যাপারেও খুব সজাগ থাকবে যে, শয়তান যেনো তাকে তার মত শয়তান বানাতে না পারে। ফলে সে একজন মানুষ শয়তানে পরিণত হবে। আর শয়তান যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে তাকে নিয়ে খেলা করবে। যেমন জনৈক কবি বলেছেন, অর্থ : ‘আমি তো ইবলিসের একজন সৈনিক ছিলাম,এরপর সে আমাকে এ অবস্থায় পৌছিয়েছে। ফলে ইবলিস এখন আমার সৈন্য হয়ে গেছে’। কিছু মানুষের সাথে তো ইবলিস লেনদেন করে। নিজের বিষয়বস্তু তার কাছে শেয়ার করে। সে বলে, আমার কোনো কাজ আসলে আমরা মিলেমিশে তা সমাধান করে দেবো। পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেনো আমাদের সকলকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও অনিষ্ট-শক্তি থেকে রক্ষা করেন এবং তাঁর ইবাদত, আনুগত্য ও হেদায়েতের উপর রাখেন; আমিন।

টিকাঃ
১. সূরা গাশিয়া: ১৭
২. সূরা নাহল: ৫
১. সূরা আনফাল: ৩৬
১. সুরা ফুসসিলাত ২৯

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 পণ্ডিত চোর

📄 পণ্ডিত চোর


জগতে এমন কিছু লোক আছে যারা কখনো ভুলে নিপতিত হলে নিজেকে তিরস্কার করে না; উল্টো এ থেকে বাঁচতে সে বিভিন্ন বাহানা খুঁজতে থাকে; এর চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হল, সে আত্ম-তিরস্কার থেকে বাঁচতে একের পর এক অজুহাত দাঁড় করাত থাকে। যেমন কোনো লোক পিতা-মাতার অবাধ্যতা করলো তার মন তাকে যখন বলে, তুমি পিতা-মাতার নাফরমানি করছো কেনো? এটা তো হারাম; এর কারণে তুমি আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে, তখন সে মনে মনে বলে, আমার বাবা তো আমাকে কোনো সম্পদ দেননি;আমাকে গাড়ি কিনে দেননি; অমুক ব্যক্তি নিজ ছেলে-মেয়েকে যেভাবে লালনপালন করে আমার বাবা তো আমাকে সেভাবে প্রতিপালন করেননি। অমুক ব্যক্তি ছেলেকে এটা-সেটা দিয়েছে, আমাকে তো আর দেয় নি- এভাবে সে অবাধ্যতা অব্যাহত রাখতে একের পর এক কারণ খুঁজতে থাকে। অনুপ্রবেশে কোনো ব্যক্তি গতিরঙের মাল থেকে অথবা কোনো কর্মকর্তা কোম্পানির মাল চুরি করে বা কোনো ব্যবসায়ী বিপরীত পণ্য থেকে কিছু রেখে দিয়ে এ বলে নিজেকে পাপমুক্ত রাখে যে, আমি কোনো নাজায়েজ কাজ করি নি; তারা তো আমার পাওনা দিতে বিলম্ব করে; অথবা তাদের সাথে আমার এক হাজার দিনার চুক্তি হয়েছে, তারা নব্বই পঞ্চাশ দিনার দিয়ে বাকিটা দেয়নি। আর আমার প্রাপ্য পেতে আমি এমনটি করতে বাধ্য হয়েছি- এমন সব ব্যাখ্যা মানুষকে অন্যায়-অপরাধের দিকে আরো বেশি ঠেলে দেয়। আজ আমরা এক পণ্ডিত চোরের আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনব। চোর কীভাবে পতিত হল? এ এক আশ্চর্য ঘটনা। এ ঘটনাটি আল্লামা তানুখি রহিমাহুল্লাহ ‘আল ফারাজ বাদাশ শিদ্দা’ (কষ্টের পরই স্বস্তি) নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন। এক যুবক, যে তালেবুল ইলম ছিল। সে এক দেশ থেকে আরেক দেশে সফর করতো। আপনারা জানেন যে, পূর্বকার উলামায়ে কেরামের কাছে আজকের মত টেকনোলজি ছিলো না। বর্তমানে আপনি যখন কোনো ভার্সিটিতে যাবেন তখন দেখতে পাবেন, প্রফেসারের সামনে অনেক ছাত্র বসে আছে, যারা একেক দেশের একেক অঞ্চল থেকে এসেছে। আজকাল তো ইন্টারনেটের সুবাদে আমি এখানে বসে লেকচার দিচ্ছি, আর এ লেকচার হাজার হাজার মানুষ শ্রবণ করছে। এখন কেউ ইলম শিখতে চাইলে ইন্টারনেটের সাহায্যেই শিখতে পারে। তার জন্যে এটা এখন সম্ভব এবং সহজলভ্য; কিন্তু আগে এটা সম্ভব ছিলো না। ইলম শেখার জন্যে এক শহর থেকে আরেক শহরে সফর করার কষ্ট করতে হত। আবুল আলা আল মুআররিফ উল্লেখ করেন, আমি একবার আমার কিতাবাদি নিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে গেলাম। যখন ঘ্ৰ দেশে পৌঁছলাম, দেখি- শরীরের ঘ্রামের কিতাবের একটি অংশ ছিঁড়ে গেছে। এই যুবক এক কাফেলা থেকে আরেক কাফেলাতে সফর করতে চাইল। একটি বাসে কিতাবাদি ও কিছু কাপড় নিল। এরপর সে এক কাফেলার সাথে যোগ দিল। সে কাফেলা ছিলো বিভিন্ন ব্যবসায়ী, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গমনকারী এবং আরো অনেকে। কাফেলা সফর করতে হলে অনেক কাফেলা জোটবদ্ধ হয়ে সফর করত। কাফেলায় নারী ও শিশুরাও থাকত। উটের পর উট সারিভাবে চলত। এসব কাফেলা চলত মরুপথ অতিক্রম করে। তারা যাযাবর কাফেলাকে বড় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করত। তাদের সাথে প্রহরী থাকত। যে কাফেলা যত বড় হতো চোর-ডাকাত থেকে সে কাফেলা থাকত ততটা নিরাপদ। এ যুবক এক কাফেলার সাথে যুক্ত হল। সে বাহনে চড়ে তাদের সাথে রওয়ানা হল। তার সাথে ছিল কিতাবাদি ও কিছু পরিধেয় বস্ত্র। সে কিতাবগুলোকে চোখে চোখে রাখতো। কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেল। সে কাফেলার লোকজনদের নামায পড়ত এবং ওয়াজ-নসিহত করত। কাফেলাটি মরুপথে যাত্রা করছিল, এমন সময় হঠাৎ একটি ডাকাত-দল তাদের উপর হামলারোপন করল। তারা আসবাবপত্র ও যানবাহন সবকিছুর লুট করলো। তারা এতটা বেপরোয়া ছিলো যে, যাত্রীদের পরনের কাপড়টা পর্যন্ত খুলে নিল; শুধু লুথা ঢাকার মত কাপড় ছেড়ে দিল। যুবকটি ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছিলো, যেখান থেকে ডাকাতদের ছুরিকৃত সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা দেখা যাচ্ছিল। কাপড় ও সম্পদ নিয়ে তার চিন্তা হচ্ছিল না বরং সে কিতাবগুলো নিয়ে বেশ চিন্তিত, কারণ ডাকাতরা এর কোনো মূল্য জানতো না; তারা কিতাবগুলো পশুর সামনে ফেলে দিল। আর কেনই বা এমনটি করবে না। কিতাবের সম্মান ও মূল্য তো শুধু জ্ঞানীরাই জানে। উদাহরণস্বরূপ, আজ যদি আপনার কাছে ‘রিয়াদুস সালেহিন’-এর একটি কপি থাকে অথবা ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’-এর কোনো কপি থাকে, তারপর কিতাবটি কোনো ভাবে নষ্ট হয়ে যায়; তখন আপনি কী করেন? কোনো লাইব্রেরি থেকে অনুপস্থিত আরেকটি কপি কিনে নেন। অথবা ফটোকপি করে সেটা সংগ্রহ করেন; কিন্তু অতীতে কোনো ছাত্র কিতাবের মালিক হতে চাইলে প্রথমে লিপিকারের কাছে যেত, তার সাথে দরাদরি করত। এবং এক কপি লিপির চুক্তি করতে হত। অথবা তার কাছেই লিখিত কোনো কপি পেয়ে তা লিখিয়ে নিতো। তা না হলে নিজেই বসে বসে এক কপি লিপি লিখতে হত। কষ্টে ও রাতের আঁধারে মোমের নিভুনিভু ক্ষীণ আলোতে লিখতে হতো। এ ধরনের বই কষ্ট করে তারা করত। তো এ তালেবে ইলম তার কিতাবের দিকে তাকাচ্ছিল। কিতাবগুলো তার নিজস্ব ব্যাখ্যা ও টিকা-টিপ্পনীযুক্ত ছিল। এখন তা এমনি এমনি চলে যাচ্ছে। তারা এর কোনো কদরই করছে না। যুবক ডাকাত সর্দারকে কাছে গিয়ে সালাম দিল। সর্দার বলল, এখান থেকে যাও নইলে শেষ করে দিব। যুবক সালেহ করে বলল, আপনারা আমার এমন জিনিস নিয়েছেন যা আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে অথচ এতে আপনাদের কোনো উপকার হচ্ছে না। সর্দার বলল, কী সেটা? আমরা কিন্তু তোমার বাহন, কাপড় ও টাকা পয়সা কিছুই ফেরত দিব না। যুবক বলল, না না... শুধু ঐ ব্যাপারটি, ঐ ব্যাপারে আমার কিতাবাদি আছে। আমি কিতাবগুলো খুব কষ্ট করে জমা করেছি। আমি মানুষকে নামায পড়াই, মাসআলা-মাসায়েল ও দীন শিক্ষা দেই। এই কিতাবগুলো আপনাদের কোনো কাজে আসবে না। সর্দার বলল, কোন ব্যাপার? ঐ ব্যাপারটা। সর্দার দস্যুটিকে বলল, আচ্ছা, যুবক, তোমার কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব? ঐ সর্দার এই ধরনের কি সব?

করে নি, তাই যাকাত পরিমাণ অর্থ তাদের অধিকার বহির্ভূত। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের সাহায্যে করে গরিবদের সে হক বের করতে আমাদের পাঠালেন।

পাঠক! স্বভাবতই এটা ভুল এবং অন্যায়। মানুষ যাকাত না দিলেও আমার জন্য তার সম্পদ চুরি করা বৈধ হবে না। এটা ঐ প্রতিভা নারীর মত, যে বেশ্যাবৃত্তি করে ইয়াতিম প্রতিপালন করে। অথচ লক্ষ করুন, এই ডাকাত অন্যায়-অবিচার করে নিজেকে দোষমুক্ত রাখতে কীভাবে বিভিন্ন অজুহাত খুঁজে বেড়াচ্ছে।

উসামায়ে কেরাম অনুরূপ আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। এক কাযির সামনে এক চোরকে হাজির করা হল, যে দেয়াল টপকিয়ে চোরা পথে এক বাড়িতে প্রবেশ করেছে। এবং মস্ত বড় এক লোহার সিন্দুক ভেঙে মালামাল লুটপাট করেছে। কাযি তাকে বলল, হে অমুকা ওলা, তুমি অপরাধী এজন্য আমি আশ্চর্য নই। মালের প্রতি তোমার লোভ বা দেয়াল টপকিয়ে বাড়িতে ঢুকেছো, এ কারণেও আমি আশ্চর্য নই। আমি তোমার একটি জিনিসের কারণে খুব আশ্চর্যাত। চোর বলল, সেটা কী? কাযিবলল, তুমি কীভাবে এত বড় লৌহ-সিন্দুক ভেঙে সম্পদ চুরি করলে? চোর তখন বলল, কাযি সাহেব! আপনি কি এ কবিতা শোনেননি?

‘শুনো! লোভের মাধ্যমেই তোমার কাঙ্ক্ষিত বস্তু হাসিল হবে আর তাকওয়ার মাধ্যমেই তোমার জন্যে লোভা নরম হবে’।

কাযি বলল, বাহ! তুমি তো দেখি দাউদ আ.-এর সমকক্ষ হয়ে গেছ! ওহে ইতর! তোমার কাছে তাকওয়া থাকলে তুমি কি আর চুরি করতে? এরপর তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হল।

এ ঘটনা উল্লেখ করার দ্বারা আমরা উদ্দেশ্য হল, আমরা কখনো ভুল করে ফেলি। যে কারণেই হোক আমরা যখন ভুলের মধ্যে পড়েই যাই তখন বিভিন্নধরনের অজুহাত ও খোঁড়া যুক্তি তালাশ করতে থাকি। যেমন ইবলিস, সে-ই সর্বপ্রথম নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্যে যুক্তি তালাশ করেছে। আল্লাহ তাআলা যখন ইবলিস সমেত ফেরেশতাদের আদম আ.-কে সেজদার আদেশ দিলেন; তখন ফেরেশতারা সেজদা করেছিলেন; কিন্তু ইবলিস সেজদা করেনি। আল্লাহ তাআলা তার কথা কুরআনে কারিমে এভাবে উল্লেখ করেছেন-

قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ

‘আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাঁকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে’

অপর আয়াতে এসেছে, সে বললো,

أَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا

‘আমি কি তাকে সেজদাহ করব, যাকে আপনি মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।’

দেখুন! ইবলিস আল্লাহর আদেশ অমান্য করল। আদম আ.কে সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানাল; কিন্তু একটি অজুহাত বা যুক্তি প্রস্তুত। যখন বলা হল, তুমি কেনো আদমকে সেজদা করলে না? সে বলল, আমি আদমকে বিনা কারণে সেজদা করি নি; আমার যুক্তি আছে। আমি তার চে’ উত্তম; তার চে’ শ্রেষ্ঠ।

সে কিন্তু মিথ্যা বলেছে, কারণ আগুনের চেয়ে মাটি উত্তম সবচে’ বড় কথা হল, মহান আল্লাহর সামনে যুক্তি পেশ করা যায় না। এভাবে ফেরাউনও যুক্তি পেশ করেছিলো, যখন নিজেকে স্রষ্টাদাবি করতে চেয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের দাবিগুলো এভাবে কোরআনে এনেছেন-

ইরশাদ হয়েছে :

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَٰهٍ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَىٰ إِلَٰهِ مُوسَىٰ وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ

‘ফেরাউন বললো, হে পরিষদবর্গ! আমি জানি না যে, অনিবার্যত তোমাদের কোনো উপাস্য আছে কিনা? হে হামান, তুমিইটা পোড়াও, অতঃপর আমার জন্যে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করো, যাতে আমি মূসার উপাস্যকে উপর মেরে দেখতে পরি। আমার ধারণা তো সে একজন মিথ্যাবাদী।’

অন্য আয়াতে এসেছে,

وَنَادَىٰ فِرْعَوْنُ فِي قَوْمِهِ قَالَ يَا قَوْمِ أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَٰذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِي أَفَلَا تُبْصِرُونَ

‘ফেরাউন তার সম্প্রদায়কে ডেকে বললো, হে আমার কওম! আমি কি মিসরের অধিপতি নই? এই নদীগুলো আমাদের নিচদেশে প্রবাহিত হয়, তোমরা কি তা দেখো না?’

অর্থাৎ সে লোকদের বলল, আমি তোমাদের প্রভু; তোমাদের বাদশাহ। তোমরা দেখতে পাচ্ছ না যে, নদীগুলো আমার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে। তোমরা কি তা দেখতে পাচ্ছ না? মোটকথা সে আল্লাহর নাফরমানি করার জন্যে অনেক অজুহাত ও যুক্তি প্রস্তুত করেছিল। যেমন মূসা আ.-এর ঘটনা। কুরআনে কারিমে মূসা আ.-এর ঘটনা এভাবে এসেছে-

وَوَكَلَ الْمَدِينَةَ عَلَىٰ حِينِ غَفْلَةٍ مِنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَٰذَا مِنْ شِيعَتِهِ وَهَٰذَا مِنْ عَدُوِّهِ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسَىٰ فَقَضَىٰ عَلَيْهِ قَالَ هَٰذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُضِلٌّ مُبِينٌ

‘তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন অধিবাসীরা ছিলো বেখবর। সেখানে তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইতে দেখলেন; এদের একজন ছিলো তাঁর নিজ-পক্ষের আর অপরজন তাঁর শত্রুপক্ষের। অতঃপর নিজ দলের লোকটি শত্রুদলের লোকটির বিরুদ্ধে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলো। তখন মূসা তাকে এক ঘুষি মারলেন এবং এতেই সে মারা পড়লো। মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয় সে চরম বিচারাচারী ও প্রকাশ্য শত্রু।’

মূসা আ. মূলত তাদের মধ্যকার সমস্যাটা মিটমাট করতে গিয়েছিলেণ। প্রথমেই তাঁর শত্রু লোকটির কাছে গিয়ে নিজে একটা ঘুষি মারলেন আর এতেই লোকটি মারা পড়লো। অথচ মূসাআ. কিছুতেই এমনটি চাননি। সুতরাং এখানে মূসাআ.-এর অজুহাত বা খুঁজার কোনো প্রয়োজনে ছিলো না; তার সামনে অজুহাত প্রস্তুতই ছিলো যে, ‘আল্লাহ! আমি তো এটা চাইনি।’ এমন একটা অজুহাত তার সামনে প্রস্তুতই ছিল; কিন্তু মূসা আ. আল্লাহ তাআলার সামনে কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে চাননি; তাই নিজের ভুল স্বীকার করে স্পষ্ট বলে দিলেন, ‘এ-তো নিশ্চিত শয়তানের কাজ, নিশ্চয় সে বিচারাচারী প্রকাশ্য শত্রু।’ মূসা বললেন,

قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي

‘তিনি বললেন, হে আমার রব! নিশ্চয় আমি নিজের উপর জুলুম করেছি। অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’

অর্থাৎ আমি ইচ্ছা করে হত্যা করি নি বটে; কিন্তু লোকটিকে ভুল হলেও তো হত্যা করেছি। আর আল্লাহ তাকে ক্ষমাও করেছেন।

فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِلْمُجْرِمِينَ

‘আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেছেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, এরপর আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না।’

মূসাআ.,-এর উক্তি এ কথাই প্রমাণ করছে যে, কেউ কখনো অনিচ্ছায় ভুল করে ফেললে তার উচিতও অতিভক্তির তাড়াও করা। সুতরাং কেউ যখন ইচ্ছা করে ভুল করে, আবার সে ভুলের অজুহাতও তালাশ করে তখন তার সে অজুহাত কীভাবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে?

আল্লাহ তাআলা জাহান্নামিদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন।

وَيُصْلَوْنَهَا فَبِئْسَ الْمِهَادُ مَا أَغْنَىٰ عَنْهُمْ مَا كَسَبُوا وَمَا خَلَفُوا

‘আমি তাদের জন্য কিছু সাথী-সঙ্গী নিয়োগিত করে দিয়েছিলাম, যারা তাদের পূর্বাপরের বিষয়গুলো সুন্দর করে দেখাতো।’

অর্থাৎ তাদের কিছু বন্ধু-বান্ধব থাকে, যারা তাদের জন্য বিভিন্ন যুক্তি ও অজুহাত তালাশ করে। যেমন, কোনো যুবক বন্ধুদের বলল, এই! আমি মদ পান করা ছেড়ে দিতেও চাচ্ছি। তখন তারা তাকে বিভিন্ন অজুহাতও দেখিয়ে বলে, আরে! তুই তো এখনো যুবক। আগে যৌনটা উপভোগ কর, এরপর যখন বৃদ্ধ হবি তখন তাকওয়া ভাবা যাবে। সামনে আরো বহু সময় আছে। এভাবেই তারা তাকে অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে বিভিন্ন যুক্তিও দেখাতো থাকে এ-ই ডাকাতেরও মত, যে বলেছিলো, আমরা এ মাল চুরি করেছি, কারণ তারা এরা যাকাত আদায় করেনি বলে। অথবা এ মহিলারও মত, যে ব্যাভিচারের মাধ্যমে উপার্জিত টাকা দ্বারা দান-খয়রাত করে অথবা মসজিদ নির্মাণ করে। অথবা চুরি-ডাকাতির মাধ্যমে টাকা কামিয়ে ইয়াতিম-বিধবাদের ভরণপোষণ করে। আর প্রত্যেকেই নিজেদের অন্যায়-অপরাধের পক্ষে কোনো না কোনো অজুহাতও দাঁড় করাতে চায়। অনুরূপভাবে কোনো যুবতী পর্দা করতে চায়। হোক তা সৌদি আরবে বা অন্য কোনো দেশে; যেমন আমি যেসব দেশে সফর করেছি। ভার্সিতির মেয়েরা উদ্যম এবং আত্মবিশ্বাস পাক। কেউ কেউ আমার মাথায় স্কার্ফ পরে বলে, আমি পর্দা করেছি! কীভাবে তুমি পর্দা করেছ? অথচ তুমি টাইট-ফিট ও চোস্ত পোশাক এবং সংকীর্ণ ট্রাউজার পরে দেহের অবয়ব ও সৌন্দর্য প্রকাশ করে দিয়েছ, তারপরও বলছো, আমি পর্দা করেছি! তুমি কোথায় আর তোমার পর্দা কোথায়? এতকিছুর পরও তাকে কোনো কোনো বান্ধবী বলে, তুমি অন্যের চে' অনেক ভাল আছে। অন্যরা তো এর চেয়েও স্যাট ট্রাউজার পরে। তোমারটা তো কমপক্ষে গোড়ালী পর্যন্ত পৌঁছে। হ্যাঁ, একটু টাইট-ফিট; কিন্তু অন্যেরটা তো হাঁটু পর্যন্ত বা তারচে' সটা। অন্যরা তো মাথা ঢাকে না, তুমি অন্তত মাথা ঢেকে রাখো। অনুরূপভাবে ধরে নিলাম কোনো যুবক বাড়িতে নামায পড়ে; মসজিদে নামায পড়ে না। যখন সে বন্ধুদের বলে, আমি তো মসজিদে নামায পড়ি না, আমি মসজিদে নামায পড়তে চাই। তখন তারা বলে, ভাই! তুমি অন্যের চেয়ে হাজার গুণে ভাল আছো। অমুক তো নামাযই পড়ে না। তুমি তোর কমপক্ষে নামাযটা পড়!

সাহাবায়ে কেরام রা. কিন্তু আমাদের মত আমল থেকে বাঁচার জন্য কোনো ছুতো তালাশ করতেন না। তাঁদের কেউই ছোট ছোট আমল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন না। বরং তাঁরা সর্বদা বড় থেকে বড় আমল খুঁজতে বেভাবতেন। তাঁদের কেউই আরাম-আয়েশে থাকতে পছন্দ করতেন না। তাঁদের কেউই চুল থেকে মুক্তি পেতে মুক্তি তালাশ করতেন না। হোক তা আল্লাহর নাকা মানি বা অন্য কারো সাথে জুলুম করার ক্ষেত্রে। তাঁরা শুধু একটি পথই তালাশ করতেন; জান্নাতের পথ। তাঁদের মনোবলও ছিলো অভিতিষ্ঠ; তাই তাঁদের প্রজন্ম ওতো উর্দ্ধে থেকে উর্ধতর। এক সাহাবি এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে সবচে' প্রিয় আমল কোনটি? তিনি প্রশ্ন করেননি কোন আমল তাঁকে জান্নাতে নিয়ে যাবে? বরং জানতে চেয়েছেন, কোন আমল আল্লাহর কাছে সবচে' প্রিয়। আরেক সাহাবি যুদ্ধের শুরুতে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর বান্দার কোন আমল দেখে হাসেন? আরেক সাহাবি প্রশ্ন করেন, কোন আমল পাণায় সবচে' ভারী হবে। আরেক সাহাবি প্রশ্ন করেন, কিয়ামতের দিন কোন ব্যক্তি আপনার সবচে' নিকট থাকবে?

প্রিয় পাঠক! নিজের মুক্তির পথ তালাশ করুন। তাদের মত হবেন না, যারা অপরাধ করে সেই অপরাধকে পুষকে কোনো মুক্তি বা ছুতো তালাশ করে বেড়ায়। অন্যায় করে ফেললে স্বীকার করুন; যেমন মূসা আ. করেছিলেন- হে আমার রব! আমাকে মাফ করে দিন। আর তিনি তাঁকে মাফ করে দিলেন। এটা না করে যদি নিজের জন্য বা অন্য কারো জন্যে মুক্তি বা মুক্তির পথ খোজেন, তাহলে তো আপনি অন্যায়-অপরাধ অব্যক্ত রাখার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে দিলেন।

আল্লাহ তাআলা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে সঠিকটা বুঝে উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
১. সূরা সা’দ: ৭৬
২. সূরা বনি ইসরাইল: ৬১
১. সূরা ক্বাসাস: ৩৫
২. সূরা যুখরুফ: ৬১
১. সূরা ক্বাসাস: ১৫
২. সূরা ক্বাসাস: ১৬
১. সূরা হা-মীম সিজদাহ: ২৫

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 যে আল্লাহর জন্যে কিছু ত্যাগ করে

📄 যে আল্লাহর জন্যে কিছু ত্যাগ করে


কথায় বলে, 'যে ব্যক্তি স্মৃতিপটে ইতিহাস সংরক্ষণ করে, তার জীবনানা বুদ্ধি পায়।' মানুষ যখনই অতীতে দৃষ্টি দিবে এবং ইতিহাস নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবে তখনই তার সামনে অনেক জ্ঞান ও শিক্ষণীয় বিষয় চলে আসবে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর চিরন্তন-শাশ্বত গ্রন্থে পূর্ববর্তীদের ইতিহাস আলোচনা করেছেন; যখন আমরা সেগুলো নিয়ে চিন্তা করি তখন তা আমাদের শিক্ষা ও উপদেশকে বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা নবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন:

لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَٰكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

'নিশ্চয়ই তাঁদের ঘটনায় বুদ্ধিমানদের জন্যে রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনো মনগড়া কথা-উক্তি নয়; বরং এটা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ এবং মুমিনদের জন্যে হেদায়াত ও রহমতের মহাউপকরণ।'

كَذَلِكَ نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ مَا قَدْ سَبَقَ وَقَدْ آتَيْنَاكَ مِنْ لَدُنَّا ذِكْرًا

'আমি এভাবে আমি অতীতো যা ঘটেছে তা কিছু সংবাদ আপনাকে অবহিত করি আর আমার পক্ষ থেকে আপনাকে দান করেছি এক উপদেশবাণী।'

আসুন! আমরা একটু হিজরি তিনশ' পঁয়ষট্টির দিকের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করি। সেখানে আমরা বাদশা মুজাফফরের একটি ঘটনা জানতে পারবো। এই বাদশা মুজাফফর ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ন শাসক। তাঁর ছিলো বিশাল সেনাবাহিনী ও অঢেল সম্পদ। তাঁর রাজত্ব, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিয়ে কথা বলতে গেলে আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। ইমাম আবুল ফরাজ ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহু রচিত 'আল মুনতাজিম ফি আখবারিল মুলুকি ওয়াল উমাম' গ্রন্থ পড়ছিলাম; সেখানে তাঁর একটি আত্মসংযমতার ঘটনা পড়ে আমি থমকে গেলাম। মুসলিম ভাই-বোনদের জন্যে এখানে তা উল্লেখ করছি।

বাদশাহ মুজাফফরের মৃত্যু তিনশ' পঁয়ষট্টি হিজরিতে। তিনি অনেক বড় বাদশাহ ছিলেন। বহু অঞ্চল তাঁর শাসনাধীন ছিল। তাঁর আজীবন এক অঞ্চলের গর্ভনর মৃত্যুবরণ করল। উত্তরাধিকার হিসাবে একটি মেয়ে রেখে যায়। পরবর্তী গর্ভনরের তাঁর সমস্ত সহায়ক-সম্পত্তি নিজের কতৃত্বে নিয়ে নেয়। ফলে মেয়েটি খুব অভাব-অনটনে পড়ে যায়। একজন বৃদ্ধা মহিলা বাদশা মুজাফফরের কাছে এসে বলল, আপনার অমুক অঞ্চলের গর্ভনরের একটি মেয়ে রেখে ইন্তেকাল করেছে। মেয়েটির কাছে কোনো ধন-সম্পদ ছিল; কিন্তু পরবর্তী গর্ভনরের তার সব সহায়ক-সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাঁকে রিক্তহস্ত করে দেয়। সে আপনার কাছে অভিযোগ করতে চায়; তার জন্যে কি এ সুযোগ আছে? বাদশাহ বলল, হ্যাঁ, তাঁকে আসতে বলেন। মেয়েটি তাঁর সামনে আসল। সে এমনিই অনিয়ম্যা সুন্দরী ও রূপবতী ছিল যে, বাদশাহ তার দেখবারুর দেখেই তাকে রূপবতী ছিল যে, বাদশাহ তার দেখবারুর দেখেই সে রূপবতী ছিল যে, বাদশাহ তার দেখবারুর দেখেই সে ফেলে। সে গর্ভনরের মেয়ে কি-না এ ব্যাপারে বাদশাহ নিশ্চিত হতে চাইল। কিন্তু লোক দেওয়ার জন্যে বললো। আগে তো কোনো পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড ছিলো না। তাই সাক্ষ্য দিয়ে চেহারা দেখা আবশ্যক ছিল। যখন সে চেয়ারার অবগুণ্ঠন সরালো; সাথে সাথে রূপ-লাবণ্যে আশপাশ যেন ঝলমল করে উঠল। আর এই অভাবনীয় রূপ- লাবণ্যে বাদশাহর শরীরের রীতিমতো কাঁপুনি ধরে গেল, কারণ তাঁর জীবনে সে এমন সুন্দরী-রূপসী ললনা কখনো দেখে নি। তাঁকে চেহারা ঢাকার নির্দেশ দিয়ে বললেন, তোমার কী প্রয়োজন? মেয়ে বলল, আমার বাবার মৃত্যুর পর অমুক গর্ভনরের সমস্ত সহায়-সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে। সে আমাকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করেছে। আমার সম্পদ ফিরিয়ে পেতে আপনার সাহায্য প্রয়োজন। বাদশাহ তৎক্ষণাৎ তার সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার ফরমান জারি করলেন। তাঁকে বললেন, তোমার বর্তমান অবস্থা কী? মেয়ে বলল, নিজ হাতে উপার্জন করে রুটি-পাণি খেয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। বাদশাহ তখনই তাকে কিছু টাকা দিলেন বললেন এবং তাঁর সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার হুকুম দিলেন।

ঐ বৃদ্ধা মহিলা লক্ষ করেছে যে, বাদশাহ এই যুবতীর রূপে কাবু হয়ে গেছে। তাই সে বলল, বাদশাহ নামদার! যদি সে আজকের রাত আপনার প্রাসাদে কাটাতো। মহিলার উদ্দেশ্য ছিল, বাদশাহ যুবতী মেয়েটির সাথে নৈশভর উপভোগ করত। বাদশাহ বললেন, আমি তো প্রায় ষাট ফেলেছিলাম; কিন্তু যখন আমার স্মরণ হল, আমারও যে কয়েকজন মেয়ে আছে। কিছুদিন পর আমিও মৃত্যুবরণ করব। হয়তো, অন্য কেউ আমার সম্পদকে হস্তক্ষেপ করবে। আর আমার মেয়েরা নিরূপায় হয়ে পরবর্তী বাদশাহর কাছে আসবে। আর সেও আমার মেয়ের উপর জুলুম করবে, আজ যেমন আমি আরেক জনের মৃত্যুর পর তার মেয়ের উপর জুলুম করছি।

একটু কল্পনা করুন। এ আলিঙ্গান রাজ্যরাজ্য, এত এত জাঁকজমক ও আড়ম্বরতা এবং এত বড় রাজত্ব আর ক্ষমতা; এ সবকিছুই মানুষের মনে আত্মামিকা ও প্রতারণার বিষ ঢুকিয়ে দেয়, কখনো অবাধ্যতার দিকেও ঠেলে দেয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'না, মানুষ তো অবাধ্যতা করবেই।' বাদশাহ মুজাফফরের প্রাচুর্য ও ক্ষমতার সবকিছুই ছিল; কিন্তু এসব তাকে আল্লাহর বিধান ভুলিয়ে দেয়নি। তাই তিনি বলেছেন, না; বরং সে পরিবারের কাছেই চলে যাক। আল্লাহ তাঁকে বরকত দান করুন। বাদশাহ বলেন, মেয়েটি আমার সামনে থেকে তো ঠিকই গেল; কিন্তু আমার মন তো তাঁর সাথে চলে গেল।

এ ঘটনা চারিত্রিক পবিত্রতা এবং আত্ম-সংযমতার পরিচয় দিচ্ছে। কখনো মানুষের জন্য পথ সহজ হয়ে যায়, তা সত্ত্বেও সে আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম আবার কখনো সে পরিণামের কথা ভেবে দুনিয়াতে পরিবর্তন আশঙ্খা করে। আর ফলে আল্লাহর দয়ায় এই ভাবনাই তাঁকে এধরনের পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে পারে।

আল্লামা তানুরি তাঁর 'অসুবিধায় পরেই খণ্ড' নামক কিতাবে এ জাতীয় চারিত্রিক পবিত্রতা ও আত্ম-সংযমতার অনেক অভাবনীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে একটি হল, এক কাণ্ডন কাপড়ের ব্যবসায়ী; যে ছিলো অস্বাভাবিক রকমের কালো। তার কাছে এক লোক মেহমান হল। একটু পরে মেহমান তার ঘরে কিছু ফুটফুটে সুন্দর বালক দেখতে পেল। মেহমান জিজ্ঞাসা করল, এরা কারা? ব্যবসায়ী বললো, আমার সন্তান। মেহমান বড় আশ্চর্য হয়ে গেল। তখন ব্যবসায়ী বলল, তাদের মা হচ্ছে এক ইউরোপীয়ান নারী। তার সঙ্গে আমার এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। মেহমান বলল, আমাকে ঘটনাটি একটু বলুন-

ব্যবসায়ী বর্ণনা করে, সে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যায়। তখন সিরিয়া ছিলো বুস্তানের শাসনাধীন। তার সাথে কিছু মুসলিম বনিকও ছিল। সে সেখানে কাণ্ডন কাপড় বিক্রি করত। একদিন তার পাশ দিয়ে এক বৃদ্ধা মহিলা গেল। তার সাথে ছিলো এক অপরূপা সুন্দরী যুবতী। তারা ছিলো বুস্তান। তারা সামনে অগ্রসর হয়ে একবার ঐ ব্যবসায়ীর দিকে তাকায় আরেকবার তার পণ্য-সামগ্রীর দিকে তাকায়। তখন মহিলা লক্ষ করল যে, যুবক এই রমণী প্রতি বেশ আকৃষ্ট হয়েছে। ব্যবসায়ী যখন সেখান থেকে অন্যত্র চলে গেলেন তখন মহিলা যুবকের কাছে ফিরে এলো। তাকে বলল, তুমি কি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছ? যুবক বলল, হ্যাঁ। মহিলা বলল, সে তো অমুক বুস্তান নেতার স্ত্রী। যুবক বলল; কিন্তু আমি তো তার প্রতি পাগল হয়ে পড়েছি। আমি তাকে কিছুক্ষণের জন্যেতো চাই। কত দিনে আপনি ব্যাপারটা সহজ করে দিবেন? মহিলা বলল, ‘একশ’ দিনার দাও। আমিই তোমাকে সুযোগ করে দেব। ব্যবসায়ী বলে, আমি তাকে একশ' দিনার দিয়ে দিলাম। যখন রাতে এসে তার ঘরে ঢুকলাম ‘সুত্বহানাল্লাহ' কী বলব, তখন আমাকে এক চিন্তা ও পেরেশানি ঘিরে বসল; ফলে আমি সেখান থেকে চলে আসলাম; কিন্তু পরের দিন আফসোস করতে লাগলাম- কীভাবে আমি এ সুযোগ হাত ছাড়া করলাম আর একশ' দিনার থেকে নিলাম।

পরদিন মহিলা এসে বলল, তোমাকে সুযোগ করে দেওয়ার পর কী করলে? আমি বললাম, জানিনা আমার কী অর্জন হল। লোকটি বললো, আচ্ছা, এবার আরো বেশি করে নিন। তাকে চারশ' দিনার দিয়ে যুবতীর কাছে গেলাম; কিন্তু আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম, আল্লাহ আমাকে দেখেছেন আর আমি এক যুবতী নারীর সাথে অপকর্মে লিপ্ত হব, এটা কীভাবে সম্ভব?। এ বলে আমি বের হয়ে এলাম। যখন বের হলাম তখন শয়তান হাজির হয়ে বললো, তুমি কীভাবে এ সুযোগ হাত ছাড়া করলে! অথচ তোমার মন তার জন্যে উত্তাল। এভাবে মহিলাকে দিনার দেই আর যুবতীর সাথে নির্জনে মিলিত হই; কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহর কথা স্মরণ করে চলে আসি। একসময় এ কাজে আমার সমুদয় দোকান বিক্রি করে ফেলি।

দোকান বিক্রি ও সম্পদ স্থগিত হওয়ার পর সে বলে, যখন দু'তিন দিন চলে গেল তখন আফসোস করতে থাকলাম, হায়! আমার কাছে এখন দোকানও নেই আবার দিনারগুলো শুধু ঐ মহিলার কাছে গেল। যা ভোগ করতে চাইলাম; কিছুই হল না। প্রত্যেক বারই বলছি, এটা হারাম, আল্লাহ আমাকে দেখেছেন। আমি এ চিন্তায়ই পড়ে ছিলাম; এরই মধ্যে এক খোয়াড়কে বলতে শুনলাম, মুসলিম ব্যবসায়ীদের প্রতি ঘোষণা-'যাদের সাথে আমাদের চুক্তি আছে, সে চুক্তি দু'দিনে শেষ হয়ে যাবে। তাই যার পণ্য আছে সে যেনো এ সময়ের মধ্যেই বিক্রি করে দেয়। অন্যথায় ডান্ডা বাজিয়ে দিয়ে মালামাল নিয়ে নিব।' এ শুনে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। তারপর দেশে ফিরে এলাম। সেখান থেকে আসলাম বটে কিন্তু আমার মন ঐ যুবতীর কাছেই রয়ে গেল।

এরপর আমি বন্দি-দাসী ব্যবসা শুরু করলাম; বন্দি ক্রয়-বিক্রয়। আগে তো যুদ্ধের সাথে বাঁদি-দাসীও প্রচলন ছিল গণিমত হিসেবে মুসলিমরা বাঁদি-দাসী পেতো। মুসলিমরা দুশমনদের বন্দি করত আবার দুশমনরা मुसलमानों বন্দি করত; কিবদ্বিরাদের সাথে মুসলিমদের আচরণ আর মুশরিকদের আচরণের মাঝে বিরাট তফাত ছিল। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যখন বদর যুদ্ধের বন্দিরা আসল তখন তাদের সাথে সস্ময় আচরণের নির্দেশ দিলেন। কারো শরীরে জীর্ণশীর্ণ কাপড় দেখে তাদেরেকে উত্তম কাপড় দিতে বললেন। এমনকি বন্দিদের প্রহরী সাহাবিরা নিজেরা নিম্নমানের খাবার খেতো আর বন্দিদের দিতো ভালো খাবার; অথচ সে তাদের হাতে বন্দি। তাদের উত্তম স্বভাব-চরিত্রের কথা কোরআনে কারিমেও বর্ণিত হয়েছে, ‘নিজের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তারা অসহায়, এতিম ও বন্দিদের খাবার দিয়ে দিতো।' অথচ বন্দি লোকটি কাফের। তারপরও তার সাথে এ আচরণ! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাযে কেরামকে বন্দিদের প্রতি ভালো আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন; তাই তাঁরা নিজেরা সাধারণ খাবার গ্রহণ করত আর বন্দিদের ভালো খাবার দিতো। উদাহরণস্বরূপ- দুধ, রুটি আর খেজুর থাকলে বন্দিকে দিতো দুধ, খেজুর আর নিজেরা পানি দিয়ে শুকনো রুটি খেতো। এটা বন্দির প্রতি নিত্যতাই অনুগ্রহ; অথচ তারা ছিলো কাফের। যারা কিছুক্ষণ আগেও তাঁদের সাথে সম্মুখসমরে যুদ্ধ করেছে। তারপরও তাদের সাথে এ সুন্দর আচরণ।

এই বন্দিদের নারী ও শিশুরা मुसलमानों দাস-দাসী হয়ে যেতো। নারীরা তাদের মালিকানায় চলে আসত। যেমন কোরআনে এসেছে, ‘অথবা তোমাদের মালিকানা-ভুক্ত দাসী।' আবার এই দাস-দাসীদের বিনিময়ওে আযাদ-মুক্তির ব্যবস্থা ছিলো। যেমন, কেউ ভুলে কাউকে হত্যা করলে জরিমানা হিসাবে একটি গোলাম বা একটি দাসী আযাদ করতে হয়। অথবা কেউ রমযানে রোযা অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করলে একটি দাস আযাদ করতে হয়। অপর দিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাস মুক্ত করার প্রতি উৎসাহও দিতেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি দাস মুক্ত করবে আল্লাহ ঐ দাসের প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে তার প্রত্যেকটি অঙ্গ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করবেন। এমনকি তার গুপ্তাঙ্গের বদলায় এর গুপ্তাঙ্গ মুক্ত করবেন।' অর্থাৎ যে আল্লাহর বন্দাকে মুক্ত করবে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন।

লক্ষ্য করুন, ইসলাম তাদেরকে বন্দি করে গোলাম বানারো অনুমতি দিয়েছে; সাথে সাথে তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন ও সুন্দর আচরণেরও নির্দেশ দিয়েছে। তারপর বলেছে, তোমরা তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে মুক্ত করে দাও। ইসলাম বন্দিদের প্রতি সদচারের কতটা গুরুত্ব দিয়েছে তা প্রমাণে জন্যে এ ঘটনাটিই যথেষ্ট- রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতা-শয্যার যা বাকাটি বারবার বলেছিলেন তা হচ্ছে, সালাত, সালাত (-এর প্রতি যত্নবান থেকো) আর তোমাদের অধীন ব্যক্তি (-দের প্রতি খেয়াল রেখো)।

কিন্তু বন্দিদের সাথে তাঁদের এ আচরণ আর বর্তমানে বন্দিদের সাথে কাফেরদের আচরণকে একটুঁতুলনা করে দেখুন। ইরাকে আবু গারিব কারাগারে আমেরিকার বন্দিদের সাথে কী পাশবিক আর নির্মম আচরণ করেছে? যদি তারা এরূপ আচরণ কোনো পশুর সাথেও করত তবুও তা বৈধ হত না; এমনকি নিকৃষ্ট প্রাণী শুকর-গাভীলের সাথে করলেও তা নিতান্তই হারাম হত। তারা এ নিকৃষ্টতম আচরণ এমন লোকের সাথে করেছে যাদের কেউ উচ্চশিক্ষিত, আইনে দীন, কেউ হাফেযে কোরআন, কেউ ভার্সিটির প্রফেসর-ডক্টর। আমেরিকা ‘গুয়ান্তামো বে' কারাগারে বন্দিদের সাথে কী আচরণ করেছিলো?বন্দিদেরকে এমন জালে আটকে রেখেছিলো, যা দিয়ে চতুষ্পদ জন্তুকেও আটকানো হয় না। এই জালে যদি তারা কুকুরকেও আটকে রাখত তাহলে পশু-অধিকার সংস্থা আন্তর্জাতিক উচ্চ আদালতেও এর মামলা করে বিচার দাবি করত। তারা তাদের সাথে অতিভজনীয় এবং নিকৃষ্টতম আচরণ করেছে। ফিলিস্তিনিবন্দিদের সাথে ইসরাইলের আচরণ লক্ষ্য করুন; এরপর বন্দিদের সাথে ইসলামের আচরণ আর এতদোভয়ের আচরণের মাঝে তুলনা করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'আমি তো আপনাকে পুরো বিশ্ববাসীর জন্যে রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।'

আচ্ছা, পূর্বের কথাই আসি। এই ব্যবসায়ী বলল, আমি গোলাম-বাদিন কেনা-বেচায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম; যাতে ঐ যুবতীর কথা মন থেকে সরে যায়; কিন্তু না, সে আর মন থেকে গেল না। একদিন শুনতে পেলাম খলিফা একটি বাঁদি খুঁজছে। তখন আমি এক সুন্দরী বাঁদি নিয়ে খলিফার সামনে পেশ করলাম। খলিফা তাকে খুব পছন্দ হল। তাই বলল, কত দিতে হবে। বললাম, দশ হাজার দিনার। খলিফা দিনার দেওয়ার নির্দেশ দিল; কিন্তু তারা শুধু পাঁচ হাজারদিনার দিল। খলিফা বলল, আগামীকাল বলো। বললাম, আমি মুনাফীর মানুষ, আমার এখন দরকার। খলিফা বলল, ইবল, তাকে ইউরোপ থেকে আগত নতুন বন্দিদের কাছে নিয়ে যাও। পাঁচ হাজারের পরিবর্তে তাকে পন্দমশতক বাঁদি নিয়ে নিতে বললো। আমি যখন সেখানে এসে বাঁদি দেখতে লাগলাম, হঠাৎ দেখি ঐ যুবতী মেয়েটি আমার সামনে উপস্থিত; যার সাথে আমি কয়েক বছর পূর্বে নির্জনে একাকী মিলিত হয়েছিলাম। সে তার স্বামীর সাথে যুদ্ধে এসছিল, তারপর বন্দি হয়ে এখানে এসেছে। তখন আমি তাকেই জিনিসপত্রসহ বাড়িতে নিয়ে আসলাম। বাড়িতে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ? বলল, না, চিনতে পারিনি। তখন তাকে বললাম, তোমার কি ঐ যুবকের কথা স্মরণ আছে, এ এত বছর আগে অমুক শহরে ব্যবসায়ী সেজে গিয়েছিলো? টাকার বিনিময়ে কয়েকবার তোমার সাথে নির্জনে মিলিত হয়েছিলাম; কিন্তু প্রতিবারই সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, 'আল্লাহর পানাহ, আল্লাহ আমাকে দেখেছেন আর আমি এক যুবতী নারীর সাথে অপকর্মে লিপ্ত হব' এ বলে সে তোমার কাছ থেকে চলে যেতো। তখন বলল, হ্যাঁ, মনে পড়েছে; সে লোক কি আপনি? বললাম, হ্যাঁ। এরপর সে ব্যাগ খুলে তিনটি মুদ্রা-খুলে দিয়ে বলল, আপনার একটি মুদ্রা ও নেই নি। আর এ মুদ্রাগুলো আমার কোনো প্রয়োজনও ছিলো না। অর্থাৎ সে হচ্ছে ঐ মুদ্রাগুলোই আমার কাছে ফিরিয়ে দিল। ঘটনা শেষ করে লোকটি বললো, সে এখন আমার কয়েত সন্তানের জননী। সে-ই আপনার জন্যে এ খাবার প্রস্তুত করেছে।

এ ঘটনা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ত্যাগ করে আল্লাহ তাঁকে এরোত’ বহু গুণ বিনিময় দান করেন। বিশেষভাবে বর্তমানে বহু ফেতনার ছড়াছড়ি। ইচ্ছা করলেই এর থেকে বেঁচে থাকা যায়। মনে করুন, আপনি বাজারে গেলেন; সেখানে চলে-চলছে বহু চালের পাশাপাশি অনেক অশ্লীলতা-নিলর্জ্জতার বিড়ি-পানাও চলছে সেখানে। কেউ সেখানে কোনো হারাম কাজ বা চোখের গোনা হুরত চাইলে, তা খুব সহজে করা সম্ভব আপনি কোনো হসপিটাল বা ভার্সিটিতে গিয়ে দেখুন, দেখবেন ছেলে-মেয়েরা কেমন অবাধ মেলামেশা আর চলাফেরা করছে, যেনো সে তার কোনো নিকটাত্মীয় বা রক্ত সম্পর্কীয়; গায়ের সাথে গা মিলিয়ে, হাত ধরাধরি করে, আবার কখনও ও তাকে চুম্বন কিংবা আদর-সোহাগও করছে। এ মরণব্যাধিটি এখন ব্যাপকভাবে ধারণ করেছে; কিন্তু মানুষের চাইলেই ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এ থেকে বাঁচা ও তা পরিহার করা সম্ভব।

পরিশেষে মহান আল্লাহ্এর কাছে প্রার্থনা করি যে, তিনি যেনো আমাদেরকে এসব ফেতনা-দুর্ব কর্ম থেকে পাক-সাফ রাখেন; আমাদের ভীর আনুগত্য লেগে রাখেন এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল ফেতনা-বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন। আমিন।

টিকাঃ
১. সুরা ইউসুফ: ১১১
২. সুরা তোয়াহা: ৯৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00