📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 জান্নাতি নারীদের সর্দার

📄 জান্নাতি নারীদের সর্দার


আমরা এখন কথা বলবো জান্নাতি নারীদের সর্দার ফাতেমাতুয যাহরা রা. সম্পর্কে। ফাতেমা রা. হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও শ্রেষ্ঠতম মানবী খাদিজা রা.-এর কন্যা (খাদিজা রা. হলেন নারী ও পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারিণী এবং ইসলামের জন্য সর্বপ্রথম অর্থব্যয়কারিণী)। এখন আমরা ফাতেমা রা. সম্পর্কে কথা বলবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ফাতেমা রা. এর সাথেথে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আলোচনা করবো। এর মাধ্যমে সকলে বাবা জানতো পারবে যে, মেয়েদের সাথে তাদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত এবং মেয়েরা জানতেও পারবে যে, বাবাদের সাথে তাদের আচরণ-উচ্চারণ কেমন হওয়া উচিত।

ফাতেমা রা. হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা, জান্নাতের সর্দার হাসান ও হুসাইন রা.-এর মা, ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি হায়দার রা.-এর স্ত্রী এবং তিনি জান্নাতি নারীদের সম্রাজ্ঞী। ফাতেমা রা. নারী ও পুরুষদের মধ্যে চেহারা ও চরিত্রে নবি কারিম রা.-এর সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ দিকের ঘটনা। ফাতেমা রা. একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন। যখন আসতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসতেন এবং তাঁকে নিজের ডান পাশে অথবা বাম পাশে বসাতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও যখন ফাতেমা রা.-এর নিকট যেতেন তখন তিনি এগিয়ে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং নিজ আসনে তাঁকে বসাতেন; কিন্তু এবার যখন ফাতেমা রা. আসলেন তিনি এগিয়ে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন না, কারণ এখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ সময়, তিনি শয্যাশায়ী। ফাতেমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে বসলেন। আয়েশা রা. বলেন, ফাতেমা রা. আমাদের নিকট আসলেন, তাঁর হাঁটা ছিলো রাসূলুল্লাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইঁটার মত; কিন্তু এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন না, কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে বসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মেয়ে আমার! অভিনন্দন তোমাকে, তোমার আগমন শুভ হোক! এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর কানে কানে কী যেনো বললেন, আর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তিনি যখন কাঁদলেন তাঁর কানে আরো কিছু বললেন আর তিনি হেসে দিলেন। আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এর চেয়ে আশ্চর্যজনক আর কিছুই দেখিনি যে, প্রথমে কাঁদলেন এরপর ততক্ষণাৎ আবার হাসলেন। আমি ফাতেমা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, হে ফাতেমা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে কী বলেছেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা গোপন রেখেছেন আমি তা প্রকাশ করবো না। আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর একদিন আমি ফাতেমা রা.কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন আপনাকে কী বলেছিলেন? তখন তিনি আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন আমাকে বলেছিলেন, হে মেয়ে! জিবরাঈল আ. প্রতি বছর একবার করে আমার সাথে কুরআন দাওর তথা পুনরাবৃত্তি করতেন; কিন্তু এবছর তিনি আমার সাথে দুইবার কুরআন দাওর করেছেন, তাই আমার মনে হচ্ছে আমার অন্তিম মুহূর্ত সন্নিকট। ফাতেমা রা. বলেন, একথা শুনে আমি কেঁদে দেই। এরপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি জান্নাতি নারীদের সর্দারণী হবে? ফাতেমা রা. বলেন, একথা শুনে আমি হেসে দেই। এটাই আমার সুসংবাদ ও হাসির কারণ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর প্রতি অনেক বেশি লক্ষ রাখতেন, এমনকি আলি রা.-এর সাথে বিয়ের পরও তাঁর খোঁজ-খবর নিতেন। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক যুদ্ধ বন্দি নিয়ে আসা হল। আলি রা. তখন ফাতেমা রা. কে বললেন, একা একা বাড়ির সকল কাজ করতে কি তোমার ক্লান্তি লাগে না? বিয়ের পর থেকে বাড়ির সকল কাজ তিনি একাই করতেন এবং এতে তাঁর অনেক কষ্ট হতো, তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। আগেকার মেয়েরা বর্তমানের মেয়েদের মত এত আরাম-আয়েশে থাকত না। তাদের কূপ থেকে পানি আনতে হত, চাকি ঘুরিয়ে আটা পিষতে হত, উট-ঘোড়ার খাবার দিতে হত, এছাড়াও বাড়ির সকল কাজ নিজেদেরই করতে হত। এখনকার মত তাদের সামনে প্রস্তুতকৃত আটা আসতো না, কাপড় ধোয়ার জন্যে ওয়াশিং মেশিন ছিলো না, কল ঘুরালেই পানি বেরোতো না। বরং তারা অনেক পরিশ্রম করতেন, দূর থেকে পানি আনতেন, আটা পিশতেন, ঘোড়াকে খাবার খাওয়াতেন ইত্যাদি কঠিন ও কষ্টকর কাজগুলো তখন মেয়েরাই করতেন।

আলি রা. ফাতেমা রা.কে বললেন, ফাতেমা! বাড়ির এত কাজ করতে কি তোমার কষ্ট হয়? আটা পিশতে, ঘোড়ার খাবার দিতে, পানি আনতে, ঝাড়ু দিতে কি তোমার পক্ষে কষ্ট হয়ে যায়? ফাতেমা রা. বললেন, হ্যাঁ আমার কষ্ট হয়।

বিভিন্ন অঞ্চল বিজয় হওয়ার আগ পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটতো। তাঁদের খুব বেশি সম্পদ ছিলো না। তাঁরা সামান্য যা কিছু জমা করতেন জিহাদ ও যুদ্ধের সফরের জন্যে তা খরচ করতেন। এমনকি আলি রা. ও স্ত্রী ফাতেমা রা. একদিন অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লেন। আলি রা. তখন এক ইহুদির ক্ষেতে গেলেন এবং তাকে বললেন, আমি তোমার ক্ষেতে কাজ করতে চাই। সে বললো, কূপ থেকে পানি উঠাও। কূপের পাশে একটি খাউজ ছিলো, আলি রা. কূপ থেকে পানি উঠিয়ে খাউজে রাখতেন। তিনি তার সাথে প্রতি বালতি পানির বিনিময়ে একটি করে খেজুরের চুক্তি করলেন। ভাই! একবার চিন্তা কর, এক মুঠা শস্যের জন্যে তাদের কত কষ্ট করতে হয়েছে, বালতি দিয়ে গভীর কূপ থেকে পানি উঠিয়ে খাউজে রাখা। বিশেষ করে একজন ক্ষুধার্ত মানুষের জন্যে কতটা কষ্টের!! তা সত্ত্বেও তিনি পানি উঠিয়ে খাউজে রাখলেন। বারটি খেজুর নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং পরিবারকে বললেন, এই নাও তোমাদের খাবার।

আলি রা. ফাতেমা রা.কে বললেন, তোমার কি একজন খাদেমের প্রয়োজন? ফাতেমা রা. বললেন, হ্যাঁ। আলি রা. বললেন, তোমার বাবার কাছে আজ একজন বন্দি এসেছে, সুতরাং তুমি তাঁর কাছে গিয়ে একজন খাদেম চাও। তখন ফাতেমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন; কিন্তু তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তাই তিনি আয়েশা রা.-এর নিকট গেলেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে আয়েশা রা. তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, বাড়ির সকল কাজ একা করতে আমার কষ্ট হয়, আমি এতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তাই আমার একজন খাদেম প্রয়োজন। আয়েশা রা.-এর মনে ছিলো সদ্ব-পরিবার, তাতে ছিলো কোনো হিংসা বা বিদ্বেষের লেশ। তিনি ফাতেমা রা.কে ভালবাসতেন, ফাতেমা রা.ও তাঁকে মুগ্ধকরত করতেন। কিছুক্ষণ পর ফাতেমা রা. চলে গেলেন। অতঃপর রাতের শেষ প্রহরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরলেন আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ফাতেমা রা. এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেনো এসেছিল? আয়েশা রা.-এর অন্তর ছিলো স্বচ্ছ, তাঁর অন্তরে কোনো ধরনের হিংসা ছিলো না, তিনি বিদ্বেষবশত এই সংবাদ লুকিয়ে রাখেননি বা বলেননি যে, আমিও তো বাড়ি কাজ করি, আমিও তো ক্লান্ত হই, আমারও একজন খাদেম প্রয়োজন। না তিনি এমনটি বলেননি বরং তিনি ফাতেমা রা.-এর জন্যে সুপারিশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ফাতেমা রা. বাড়ির সকল কাজ একা করে, বাড়ির কাজ করতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাঁর কষ্ট হয়, তাঁর একজন খাদেম প্রয়োজন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনই ফাতেমা রা.-এর বাড়িতে আসলেন এবং দরজায় আঘাত করে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি কীভাবে প্রবেশ করলেন? তিনি কি এসে নিজে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলেন? তিনি কি ফাতেমা রা.কে খাদেম দিয়েছিলেন?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর বাড়িতে এসে দরজায় আঘাত করে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ভিতরে ফাতেমা রা.-এর সাথে আলিও রা. ছিলেন। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি সামান্য অপেক্ষা করুন, আমরা যন্নটা একটু গুছিয়ে নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন; বরং তোমরা তোমাদের আপন অবস্থাতেই থাক, কারণ ভিতরে যারা আছেন একজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে আর অন্যজন মেয়ের জামাই, তাঁর চাচাত ভাই, তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, ছোটকাল থেকেই যাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তানদের মতই ছিলেন, আলি রা. বলেন, আমি এই ফাতেমা ও খাদিজা রা. নিজ বাড়িতে তাঁকে লালন-পালন করে বড় করেছেন তিনি তো তাঁর ছেলের মতই। তাই তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের আপন অবস্থাতেই থাক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর পাশে বসলেন এবং তাঁকে বললেন, তুমি কি আমার কাছে গিয়েছিলে? ফাতেমা রা. বললেন, হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেনো গিয়েছিলে? তিনি বললেন, আমার একজন খাদেম প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি তোমাকে খাদেমের চেয়ে উত্তম কিছুর সন্ধান দিবো না? তিনি বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই দিবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা যখন ঘুমোতে যাবে তখন তেত্রিশবার তাসবিহ তথা 'সুবহানাল্লাহ' বলবে। তেত্রিশবার হামদ তথা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলবে এবং তেত্রিশবার তাকবির তথা 'আল্লাহু আকবার' বলবে। তিনি বলেন, এটা তোমাদের জন্যে একজন খাদেম থেকেও উত্তম। তখন আলি রা. ও ফাতেমা রা. চোখে-চোখে তাকালেন, অতঃপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! খাদেম? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খাদেমকে আমি আসহাবে সুফ্ফার জন্য দিয়েছি, ক্ষুধায় যাদের পেট আর পিঠ একাকার হয়ে আছে।

আসহাবে সুফ্ফা হল ঐসকল দরিদ্র সাহাবি যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করে নিজ পরিবার-পরিজন ছেড়ে চলে এসেছে; তাঁদের নিকট আর ফিরে যেতে পারেনি, কারণপরিবারের লোকেরা ছিলো কাফের এবং তাঁদেরকে আবারাও কুফরির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁদের উপর চাপাতো চরম নির্যাতন। অন্যদিকে মদিনাতেও এমন কোনো স্থান ছিলো না যেখানে তাঁরা থাকবে। মুসলিমরা তখন ছিলো অনেক দরিদ্র অবস্থায়। তাই তাঁরা মসজিদে থাকতেন এবং এই কাট কেটে বিক্রি করতেন অথবা ঐ ধরনের সাধারণ কাজ করে নিজের ক্ষুধা নিবারণ করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অথবা ছাতা বা শামিয়ানা টানিয়ে দিয়েছিলেন; তাঁরা যার নিচে থাকত। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি এই খাদেমদেরকে আসহাবে সুফ্ফার জন্য বিক্রি করবো এবং এর মূল্য আসহাবে সুফ্ফাকে দিবো। আলি রা. বলেন, আমি এই কথা জীবনে আর কখনও ভুলিনি।

ফাতেমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক প্রিয় ছিলেন। আর একারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রা.ও তাঁকে অত্যন্ত মুহব্বত করতেন, কারণ তিনি তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আবু বকর রা. নিজ সন্তানদের চেয়েও ফাতেমা রা.কে বেশি ভালবাসতেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নিশ্চয় নবি-রাসূলগণ মিরাস হিসেবে কোনো সম্পদ রেখে যান না আমরা যে সম্পদ রেখে যাই তা হল সাদকা।

নবি-রাসূলগণ যেনো সাধারণ মানুষের মত দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত না পড়ে এবং সম্পদ সমানয়াবীয় গুণ যেনো তাঁদের মধ্যে প্রবেশ না করে তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁদের জন্যে শরয়ী বিধান হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তাঁরা যে সম্পদ রেখে যাবে তা मुसलमानों জনসদকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কোনো সম্পদ রেখে যাননি এবং তাঁর পূর্বের কোনো নবি-রাসূলও মিরাস হিসেবে কোনো সম্পদ রেখে যাননি। এমনকি দাউদ আ. যিনি ছিলেন বাদশাহ, তিনিও সুলাইমান আ.-এর জন্যে মিরাস হিসেবে কোনো সম্পদ রেখে যাননি, তিনি তাঁর জন্যে মিরাস হিসেবে নবুয়ত রেখে গেছেন। অনুরূপভাবে যাকারিয়া আ.ও কোনো সম্পদ মিরাস হিসেবে রেখে যাননি, ইরশাদ হয়েছে:

وَاِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَّرَائِي وَكَانَتِ امْرَاَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَّدُنْكَ وَلِيًّا ۙ يَّرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ اٰلِ يَعْقُوْبَ ۠ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا

‘আমি ভয় করি আমার পর আমার স্বগোত্রকে আর আমার স্ত্রী তো বন্যা; কাজেই আপনি নিজ-পক্ষ থেকে আমাকে একজন কর্তব্য পালনকারী দান করুন। সে ইয়াকুব বংশের আমার স্থলাভিষিক্ত হবে। হে আমার পালনকর্তা! তাঁকে সজাগকারী করুন।’

যাকারিয়া আ. ধনী ছিলেন না, তাঁর নিকট অনেক সম্পদ ছিলো না। তা সত্ত্বেও তিনি বলেছেন, হে আল্লাহ! আমি একজন পুত্রসন্তান চাই, যে আমার ওয়ারিস হবে। তাঁর যেহেতু সম্পদ ছিলো না, তাহলে তিনি কিসের ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে যেতে চান? তিনি ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হিসেবে নবুওয়ত রেখে যেতে চান, কারণ আম্বিয়া আ. যে সম্পদ রেখে যান তা সদকা। আর তাঁরা পরবর্তী্দের জন্য ইলম ও নবুওয়ত মীরাস হিসেবে রেখে যান।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রা. ফাতেমা রা.-এর নিকট এসে বললেন, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে! আল্লাহ শপথ করে বলছি, নিশ্চয় তোমার সাথে সুসম্পর্ক রাখাকে আমি নিজ সন্তানদের সাথে সম্পর্ক রাখার চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করি। নিশ্চয় তুমি আমার কাছে আমার সন্তানদের চেয়েও বেশি প্রিয়। তুমি আমার সম্পদ থেকে যা খুশি নিয়ে নাও। তুমি কি আমার বাড়ি নিতে চাও, তাহলে নিয়ে নাও। আমার যদি উট, ভেড়া বা অন্য কোনো সম্পদ থাকে তাহলে তুমি তা নিতে চাইলেও নিয়ে নাও। তুমি আমার সম্পদ থেকে যা খুশি নিয়ে নাও। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারা এবং তোমাকে সম্পদ দিতে পারাকে আমি আমার সন্তানদের সম্পদ দেওয়ার চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করি; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ভূমি সদকা হিসেবে রেখে গেছেন। আমি এখন খলিফা, मुसलमानों তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছে। আল্লাহর শপথ, এই সম্পদ আমি আমার নিজের জন্যেও নিচ্ছি না বরং এটা মুসলমানের বাইতুল মালসম্পদ হিসেবে থাকবে। অতঃপর ফাতেমা রা. খুশিমনে তা দিয়ে দিলেন। কেনো-ই বা খুশি খুশি হয়ে তা দিবেন না? তিনি যে রাসূল-কন্যা জান্নাতি নারীদের সরদার।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের ছয় মাস পর ফাতেমা রা.-এর ইন্তেকাল হয়। তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে অসুস্থতার সময় আবু বকর ও উমর রা. তাঁকে দেখতে ও অবস্থার খোঁজখবর নিতে আসেন। আলী রা. তাঁদের আগমনের কথা তাঁকে বললেন এবং তাঁদেরকে আসার অনুমতি দিতে বললে তিনি তাঁদের আসার অনুমতি দেন। আবু বকর ও উমর রা. ঘরে প্রবেশ করেন এবং ফাতেমা রা.-এর পাশে বসেন, ফাতেমা রা. তখন পূর্ব পর্দার সাথে ঘরে অবস্থান করছিলেন। অতঃপর তাঁরা ফাতেমা রা.-এর জন্যে দোয়া করেন এবং ফাতেমা রা.ও তাঁদের জন্য দোয়া করেন। তাঁরা সেখান থেকে চলে আসেন। ফাতেমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মায়ায় বড় হয়েছেন। তিনি ছিলেন স্বচ্ছ হৃদয় ও নিরাপদ অন্তরের অধিকারিণী। তিনি সর্বদা मुसलमानों কল্যাণ কামনা করতেন। কোনো সাহাবির প্রতি তাঁর মনে বিন্দু পরিমাণও হিংসা বা বিদ্বেষ ছিলো না।

বংশ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর উম্মাহাতুল মুমিনিন সাথে ফাতেমা রা.-এর সম্পর্ক ছিলো খুব সুন্দর ও নির্মল। আয়িশা রা.-এর সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিলো খুবই প্রশংসনীয়। হাফসা, সাওদা, যায়নাব রা.সহ উম্মুল মুমিনিন সকলের সাথেই তাঁর সম্পর্ক ছিলো অত্যন্ত সুন্দর ও চমৎকার। তিনি উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রা.-এর কন্যা ফাতেমা রা., যাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লালন-পালন করে বড় করেছেন। এরপর আলীর বরের বয়সে আলী রা.-এর সাথে বিয়ে হয়ে আলী রা.-এর দায়িত্ব চলে যান। তিনি হাসান ও হুসাইন রা.-এর মা। তিনি তাঁদেরকে পূর্ণ কল্যাণের উপর বড় করেছেন। এমনকি তিনি তো হাসান ও হুসাইন রা.কে সেদে নিয়ে বেশিরভাগ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কাটাতেন। ফাতেমা রা. বর্ণনা করেন কীভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন রা.-এর সাথে খেলা করতেন, তাদের আদর করতেন। ফাতেমা রা. যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উঠে এসে ফাতেমা রা.কে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং তাঁকে নিজের জান অথবা বাম পাশে বসাতেন। আর প্রকারান্তরে ফাতেমা রা. তাঁর সাথে ও তাঁর সন্তানদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিহার বিভিন্ন হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি খুবই আগ্রহ নিয়ে আনন্দচিত্তে এই হাদিসগুলো বর্ণনা করতেন। আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করি যে, যিনি যেন ফাতেমা রা.-এর প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং জান্নাতে তাঁর মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে দেন, এবং উম্মাহাতুল মুমিনিনসহ সকল সাহাবিদের প্রতিও সন্তুষ্ট হন এবং জান্নাতে তাঁদের মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে দেন এবং আমাদেরকেও তাঁদের সাথে জান্নাতে যাওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।

টিকাঃ
১. সূরা মারইয়াম, আয়াত : ৫-৬

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 এক গুপ্তচরের গল্প

📄 এক গুপ্তচরের গল্প


অন্যের গোপন বিষয় তালাশ করা বা গুপ্তচরবৃত্তি করা অনেক পুরনো রীতি। এক্ষেত্রে আরব-অনারব মুসলিম-অমুসলিম সকলেই সমান। বিভিন্ন জন বিভিন্ন অর্থবর্জনক পন্থা অবলম্বন করে অন্যের বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করে বা অন্যের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। কখনো কখনো এই গুপ্তচরবৃত্তিটা হয়ে থাকে অন্যের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য, কখনো শুধুমাত্র মজা বা ঠাট্টা করার জন্য, অন্য কী করে তা জানার জন্য। আবার কখনো কখনো গুপ্তচরবৃত্তি হয়ে থাকে অন্যের ক্ষতি করার জন্য। এখন আমরা খলিফা মু’তাদিদের এক গুপ্তচরের কাহিনী বলবো। এই ঘটনা বলার দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্যটা এটা জানানো যে, মানুষ কখনো কখনো অন্যের বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করে- শুধুমাত্র মজা করার জন্য। অথচ কোনো কারণ ছাড়া অন্যের বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা জায়েজ নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করতে নিষেধ করেছেন। কুরআনেও এ বিষয়ে সতর্কবাণী এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘তোমরা কারো ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করবে না এবং কারো গোপন বিষয়ে জানতেও চাইবে না।’

কারো অনুমতি ব্যতীত তার গোপন বিষয় জানতে চাওয়া হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘যে ব্যক্তি অনুমতি ব্যতীত কারো লেখা চিঠি দেখে তার জন্য এমন এমন শাস্তি রয়েছে।’ অথবা হাদিসে এভাবে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘অনুমতি ব্যতীত অন্যের লেখা চিঠি দেখা তোমাদের কারো জন্য জায়েয নেই।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘তোমরা কারো ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করবে না এবং কারো গোপন বিষয়ে জানতেও চাইবে না।’

খলিফা মুতাদিদের কাসেম বিন আবদুল্লাহ নামক খুবই আস্থাভাজন একজন মন্ত্রী ছিল। সে দরবারের প্রতিটি কাজ খুবই বিশ্বস্ততার সাথে করতো, খলিফা এতে তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট ছিল, খলিফা তার বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয়েও এই উজিরের সাথে কথা বলতো। প্রতিটি মানুষেরই ব্যক্তিগত কিছু বিষয় থাকে যা সে অন্য কাউকে জানাতে চায় না। সে তার পরিবারের সাথে একান্তে অনেক সময় কাটায়, তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করে। এই বিষয়গুলো সে বাইরের কাউকেই জানাতে চায় না। মন্ত্রী কাসেমও নিজ পরিবারের সাথে একান্তে অনেক সময় কাটাতেন, তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করতেন, যা সে খলিফাকে জানাতেন না। এবং এটা জানানো তারও দায়িত্বের মধ্যেও ছিল না।

একদিন সকালে কাসেম যখন খলিফার দরবারে উপস্থিত হয়েছে, খলিফা তখন তাঁকে ডেকে বললো, কাসেম! গতকাল তুমি অমুক অমুকের সাথে বাড়িতে গিয়েছিলে, তখন আমাকে ডাকো নি কেন? একথা শুনে মন্ত্রী কাসেম অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে, খলিফা কীভাবে আমার ব্যক্তিগত বিষয় জানলেন। এটা তো একান্ত আমার পারিবারিক বিষয়। এটা তো খলিফার জানার কথা নয়। এসকল বিষয় ভেবে তার মন অনেক খারাপ হয়ে গেল; কিন্তু তিনি খলিফার সামনে মুচকি হেসে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন। অতঃপর বিষয়টি নিয়ে তাঁর একজন সচিবের সাথে পরামর্শ করলেন। সচিব তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করলো যে, সে বিষয়টি দেখবে।

পরদিন ভোরে এই সচিব কাসেম ইবন আবদুল্লাহর প্রাসাদের সামনে এসে অবস্থান করলো। সে এতটাই ভাবে এসে দেখেছে যে, তখন কাসেম বাড়ি থেকে বের হয়নি। সে বাড়ির সামনে এসে প্রহরীদের প্রতি লক্ষ্য করতে শুরু করলো। সে বলল, আমি প্রহরীদের প্রতি লক্ষ্য করছিলাম, এমন সময় এক পণ্ডিত শিক্ষক সেখানে উপস্থিত। আমি লক্ষ্য করলাম প্রহরীরা সকলে তাকে চিনে এবং সেও তাদের সাথে কথা বলছে ও হাসি-ঠাট্টা করছে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে পণ্ডিত লোকটি বললো, তোমরা কেমন আছ? তোমাদের মনিব কাসেম কেমন আছে? সে গতকাল কখন বাড়িতে ফিরেছে? এভাবে খুব চাতুরতার সাথে কাসেম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে নিচ্ছে; কিন্তু কেউ বুঝতে পারছে না। তখন প্রহরীরা তাকে বললো, আমরা ভাল আছি, আমাদের মনিব কাসেমও ভাল আছেন, সে গতকাল অমুক অমুক সময়ে বাড়িতে ফিরেছেন। অন্যান্য দিনের চেয়ে সে কালকে একটু দেরিতেই ফিরেছেন, ফেরার সময় তার সাথে অমুক লোক ছিল। এরপর ভিক্ষুকটি ঢুকে তার কান জুড়ে ঘুরিয়ে বাড়ির আরো ভিতরে গেল; কিন্তু কেউ কিছুই মনে করল না, কারণ সে ভিক্ষুক, মানুষের কাছে চাওয়া ও ভিক্ষা করাই তার পেশা। সে বাড়ির ভিতরে গিয়ে কাসেমের প্রাসাদের নিকটবর্তী কর্মচারীদের কাছে গেলএবং পূর্বের ন্যায় এখানেও তাদের সাথে খুব কৌশলে কথা চালিয়ে গেল; সে তাদেরকে বললো, তোমাদের খবর কী? তোমাদের মনিবের খবর কী? তোমাদের মনিব গতকাল রাতে কার সাথে ছিল? তারা বললো, আমরা ভাল আছি, আমাদের মনিবও ভাল আছেন, সে গতকাল রাতে তার অমুক স্ত্রীর সাথে ছিলেন। তারপর সে বললো, সে কি আগে আগে-ই তাকে গাঁথালে তাহলে তো মনে হয় তার এই স্ত্রী অনেক সুন্দরী। সে খুব কৌশলে তাদের কাছ থেকে কাসেম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে নিল, তাদের কাছে হাত পাতার কারণে তারাও তাকে কিছু দান করলো। এরপর সে ভিক্ষার ভান করে আরো ভিতরে যেতে লাগল এবং পথে ছোট বড় দেখা হওয়া প্রত্যেকের কাছ থেকে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুকৌশলে কাসেম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে নিচ্ছিল। এরপর সে রান্নাঘরে প্রবেশ করলো, খোঁড়া ও দরিদ্র হওয়ার কারণে সকলেই তার প্রতি দয়াশীল হল এবং যে যার মত দান-সদকা করলো এবং ভিতরে প্রবেশ করতেও তাকে কেউ বাধা দিল না। সে রান্নাঘর থেকে দলিতে কিছু খাবারও ভরে নিল। এরপর সে বাটিতে প্রশ্ন করল, তুমি গতকাল রাতে কী রান্না করেছিলে? তোমার মনিব কাসেম কী পরিমাণ খাবার খায়? গতকাল সে কতটুকু খেয়েছে? কথাগুলো বাটুচিদের সাথে কথার ফাঁকে ফাঁকে কৌশলে জেনে নিল। এভাবে সে প্রসাদের ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি লোকের সাথে কথা বলে সেখান থেকে ঘরে আমাদের পিছনের এলাকায় চলে গেল।

সচিব বলে, সেখান থেকে বের হওয়ার পর আমি তাকে অনুসরণ করলাম। আমি দেখলাম সে একটি নির্জন রাস্তায় এসে নিজ আকৃতি পরিবর্তন করে ফেলল। এখন তাকে দেখে একজন সুন্দর সুঠামদেহী লোক মনে হচ্ছে। আমি এটা দেখে খুবই আশ্চর্য হলাম। এরপর সে তার ভিন্নরূপ ব্যাপারটা নিয়ে কয়েকজন ফকিরকে দিয়ে বললো, নাও এগুলো তোমাদের জন্য। অতঃপর সে একটি বাড়িতে প্রবেশ করল। আমি বাড়িটি চিহ্নিত করে সেখান থেকে চলে এলাম এবং রাতে আবার সেই বাড়ির কাছে গিয়ে তার উপর নম্বর রাখছিলাম, এমন সময় দেখলাম খলিফার দরবারের এক কাজের লোক সেই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। আমি তাকে চিনে ফেললাম। সে বাড়িতে এসে দরজায় আঘাত করল আর তখন ভিতর থেকে দরজার নিচ দিয়ে একটা কাগজ বেরিয়ে এলো, সেটি নিয়ে লোকটি চলে গেল। আমি জানি না আসলে কাগজে কী লেখা ছিল। এরপর আমি কয়েকজন প্রহরীকে নিয়ে এসে সেই বাড়িতে প্রবেশ করলাম এবং লোকটিকে ধরে বেঁধে কাসেমের কাছে নিয়ে গেলাম। কাসেম তাকে বলল, সত্য ঘটনা খুলে বল। সে বললো, আমি কিছুই করিনি। আমি একজন অসহায় লোক। তারপর যখন আমি তাকে প্রহার করা শুরু করলাম তখন সে বলল, হ্যাঁ, আমি খলিফা মুতাদিদের গুপ্তচর, সে আপনার সংবাদ সংগ্রহের বিনিময়ে প্রতি মাসে আমাকে এক হাজার দেরহাম বেতন দেন। আমি প্রচুর ডান করি এবং আপনার বাড়ির পাশে এই বাড়িটি ভাড়া নিয়েছি, যাতে করে কেউ আমাকে চিনতে না পারে এবং বুঝতে না পারে যে, আমি পশু ও ফকিরের ডান করছি। আমি ফকিরের বেশভূষা ধারণ করি এবং আমার এই বাড়ির উপরে কুড়িম দাড়ি লাগাই, অতঃপর আপনার প্রাসাদে প্রবেশ করে মানুষের কাছে ভিক্ষা চাই এবং কৌশলে ছোট-বড় সবার কাছ থেকে আপনার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করি। এরপর আমি আমার দ্বারা করা সেই বাড়িতে গিয়ে সকল তথ্য নিয়ে রাখি। রাতে খলিফার কাছ থেকে এক লোক এসে সেই কাগজ নিয়ে যায় এবং তা খলিফার নিকট হস্তান্তর করে। এর মাধ্যমে খলিফা মুতাদিদ জানতে পারে যে, আপনি প্রতিদিন কী করেন?

কাসেম লোকটিকে ধরে বন্দি করে রাখল। পরদিন রাতে মুতাদিদের প্রহরী এসে যখন লোকটির দরজায় আঘাত করল, তার স্ত্রী দরজা খুলে তাকে বললো, গতকাল কয়েকজন লোক এসে তাকে ধরে নিয়ে গেছে। আমি তাদের চিনিনা, আসলে তারা কারছিল? এরপর থেকে সে এখনও ফিরে আসেনি। সে এখন কোথায় আছে, কার কাছে আছে আমি জানি না। এর পরের রাতেও তার স্ত্রী ঘর থেকে বের হয়ে বললো, আমার স্বামী এখনও ফিরেনি, সে এখন জীবিত না মৃত আমি এর কিছুই জানি না।

এদিকে কাসেম প্রতিদিনের মত খলিফার দরবারে যাওয়া আসা করছে। কয়েক দিন পর খলিফা মুতাদিদ তাকে বলল, পশু লোকটি এখন কোথায়, আরে তার খবর কী? তাকে কী করেছ? কাসেম বলল, আমিরুল মুমিনিন আমি তো তাকে চিনি না। খলিফা বললো, না; তুমি তাকে চিনো। আল্লাহ্র শপথ করে বলছি, তুমি যদি তাকে হত্যা করে থাক অথবা তাকে কিছু করে থাক তাহলে আমি কিন্তু তোমার এই এই... করবো। আমি তোমাকে ওয়াদা দিছি এরপর থেকে তোমার ব্যক্তিগত বিষয় জানার চেষ্টা করবো না। এখন বলো, তুমি তাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছো? তাড়াতাড়ি তাকে বের করেদাও। কাসেম বলল, আমি তার সাথে ভাল ব্যবহার করেছি এবং হাদিয়ার দিয়ে তাকে আমার কাছ থেকে মুক্ত করে দিছি।

আমি যখন ইবনুল জাওযি রাহ.-এর লিখিত ‘আল মুনতাজিম ফি আখবারিল মুলুক ওয়াল উমাম’ নামক কিতাবে এই ঘটনা পড়লাম, তখন এটা ভেবে আমি অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিতহলাম যে, একজনের বিরুদ্ধে অন্যজনের গুপ্তচরবৃত্তি কাজটা সকল যুগে, সকল দেশে,সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান ছিলো এবং আছে। তুমি কখনো কখনো লক্ষ্য করে দেখবে যে, একজনকে বিশ্বাস করে তার কাছে তোমার গোপন বিষয় শেয়ার করেছো, আর কিছু দিন পরেই সে তোমার গোপন বিষয়টি অন্যজনের কাছে প্রকাশ করে দিয়েছে।। এর মাধ্যমে মানুষের উচিত যত বিশ্বাসতই হোক না কেনও কাউকে তার গোপন বিষয় সম্পর্কে অবগত না করা, কারণ মানুষের হৃদয় তো নিজের গোপন বিষয় লুকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেই অনেক সংকীর্ণ। তাহলে অন্যের বিষয় সে কীভাবে ধারণ করবে? তখন তো সে আরো সংকীর্ণরূপ পড়বে।

দ্বিতীয় বিষয় হল, কোনো কল্যাণ নিহিত না থাকলে কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে অনুসন্ধান বা গোচরবৃত্তি করা জায়েজ নেই। উদাহরণস্বরূপ, যেমন কারো ব্যাপারে নেশা করার সন্দেহ হল, আমরা তার ব্যাপারে গোপনে অনুসন্ধান করবো, তারপর বিষয়টা সত্য প্রমাণিত হলে এর জন্যে তার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

অনুরূপভাবে যদি কারো ব্যাপারে সন্দেহ হয় যে, সে অসৎ নারীর কাছে যাওয়া-আসা করে, তাহলে আমরা তার ব্যাপারে গোপনে অনুসন্ধান করবো, তারপর বিষয়টা সত্য প্রমাণিত হলে এর জন্যে তার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তবে এই কাজটা সবাই করবে না বরং পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার কেউ করবে অথবা এর দায়িত্বে থাকা অন কেউ এই কাজটা করবে। তবে কোনো কারণ ছাড়া অথবা শুধু শুধু মানুষের একান্ত বিষয়ে অনুসন্ধান করা বা গুপ্তচরবৃত্তি করা জায়েজ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতে নিষেধ করেছেন; বরং তিনি তো অন্যের ঘরে অনুমতি ব্যতীত উঁকি দিলে তার চোখ উপরে ফেলারও অনুমতি দিয়েছেন।

অনুমতি ব্যতীত কারো ঘরের দরজা বা জানালার ফাঁক দিয়ে কেউ তাকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চোখ উপড়ে ফেলার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কেউ এমনটি করলে তার কোনো দুন বা দিয়াত নেই। এটা তো জানা কথাই যে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কারো চোখ উপড়ে ফেলে, তাহলে এর হৃদপিণ্ডে তার চোখও তুলে ফেলা হবে। আল্লাহ্ তাআলা বলেন:

‘চোখের বিনিময় চোখ উপড়ে ফেলা হবে।’

অর্থাৎ কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের চোখ তুলে ফেলে তাহলে তার চোখও অনুরূপভাবে তুলে ফেলতে হবে। এর যদি কেউ ইচ্ছাকৃত নয় বরং ভুলে কারো চোখ তুলে ফেলে তাহলে তাকে অর্ধেক দিয়াত-রক্তপণ দিতে হবে। আর এটা মানুষের যে অঙ্গগুলো জোড়ায় আছে এর একটা যদি কেউ নষ্ট করে যেমন কেউ তুলে কারো হাতও কেটে ফেললো বা কারো পা কেটে ফেললো তাহলে তাকেঅর্ধেক দিয়াত দিতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হারিণের সিঁ দিয়ে মাথা চুলকাচ্ছিলেন। এমন সময় এক লোক ঘরের ফাঁকা দিয়ে ভিতরের লোকদের দুষ্টমি দেখাচ্ছিল। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক রাগন্বিত হলেন। লোকটি যদি চলে না যেতো তাহলে তিনি তার চোখ উপড়ে দিতেন। তিনি বলেন, এটা বৈধ। এটা করলে কারো দিয়াত-রক্তপণ দিতে হবে না। এর মাধ্যমে তিনি কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে অনুসন্ধানের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। মানুষ যখন অন্যের গোপন বিষয়ে অনুসন্ধান করলো তখন সে নিজেও ধ্বংস হল, অনেককেও ধ্বংস করল। আর একারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘মানুষের মিথ্যাওনাহ করার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বর্ণনা করবে।’

এবং তিনি আরো বলেন:

‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ ছেড়ে দেওয়া।’

হে ভাই! কারো সাথে ও তার স্ত্রীর সাথে সমস্যা থাক বা না থাক তাতে তোমার কী? কে কত বেতন পেল না পেল তাতে তুমি কী করবে? এক লোক ও তার স্ত্রীর বা তার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সামান্য ঝামেলা থাকতেই পারে, তুমি কেনো অযথা তাদের গোপন খবর তালাশ করতে যাবে? অনর্থক বিষয়ে তুমি কেনো তাদের জিজ্ঞেস করতে যাবে? তুমি কেনো অনর্থক বিষয়ের পিছনে ছুটবে?

মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ ছেড়ে দেওয়া। ইস্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ে অনুসন্ধান করাটা খলিফা মুতাদিদেরমতোও ঠিক হয়নি। সাহাবায়ে কেরাম রা. কারো কোনো বিষয়ে অনর্থক নাক গলাতে যেতেন না। তাহলে তোমার কি হল যে, তুমি অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাতে যাবে? এমনিভাবে মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল কুরআন তিলাওয়াত করা; মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল নফল সালাত আদায় করা; মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল বেশি বেশি আল্লাহ্ তাআলার যিকির করা; অনুরূপভাবে মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ ছেড়ে দেওয়া।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো অনর্থক কাজ করতেন না। তিনি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত প্রতিটি ছোট ও বড় বিষয়ে প্রতি দৃষ্টি দিতেন না। সাহাবায়ে কেরাম রা.ও কখনো অনর্থক কাজ করেননি। আমরা ইতিহাস পড়ে দেখতে পাই যে, সাহাবায়ে কেরাম রা. অন্যের কোনো বিষয় নিয়ে অযথা মাথা ঘামাতেন না। অনুরূপভাবে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত পড়ে জানতে পারি যে, তিনি কখনো কোনো সাহাবীর দোষ তালাশ করেননি। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কারো প্রতি ইহসান-অনুগ্রহ করতে চাইতেন তখন তার বিষয়ে জিজ্ঞাস করতেন। যেমন নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসছিলেন, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ্ রা.ও সেই যুদ্ধে তাঁদের সাথে ছিলেন। তাঁরা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে উটের উপর চড়ে বিশাল উপত্যকা পাড়ি দিচ্ছিলেন। শুধুমাত্র আল্লাহ্ তাআলার নিকট প্রতিদানের আশায় এই তৃষ্ণার্ত রোদে কষ্ট সহ্য করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর সাথে তাঁদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছিল। মদীনায় পৌঁছতে অল্প পথ বাকি ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেয়াল করলেন যে, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ্ রা. সকলের থেকে পিছিয়ে পড়েছেন। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এলেন এবং তাঁকে বললেন, জাবের! চলো; জাবের রা. বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার উট অসুস্থ হয়ে পড়েছে, সে যাঁতেতে পারছে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার উটকে বসাও। তখন তিনি তার উটটাকে বসালেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার লাঠিটা আমাকে দাও। জাবের রা. লাঠি দিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তখন লাঠি দিয়ে উটের উপর আঘাত করলেন এবং এর জন্য দোয়া করলেন, তখন উট দাঁড়িয়ে গেল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পথ চলতে শুরু করল।

অতঃপর জাবের রা. তাঁর উটের উপর চড়লেন, এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজ উটের উপর উঠলেন। অতঃপর তিনি জাবের রা.-এর সাথে সাথে চলতে লাগলেন। জাবের রা.-এর বয়স তখন ছিলো একুশ বছর। তিনি জাবের রা.কে জিজ্ঞেস করলেন, জাবের! বিয়ে করেছ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.কে অনর্থক এমন প্রশ্ন করেননি। যেরকম আমরা একে অপরকে করে থাকি, ভাই কেমন আছেন? দিন কাল তো মনে হয় ভালোই কাটছে? শুনলাম, স্ত্রীর সাথে ঝামেলা হয়েছে? কারণ কী? এধরনের বিভিন্ন প্রশ্ন। আর তাই এমন প্রশ্ন করার তোমার প্রয়োজন কী। তুমি কেনো তার বিষয়ে জানতে চাইবে? তুমি কি মেয়ের বাবা না তার বড় ভাই? না-কি তুমি ছেলের বাবা? তুমি কি সমাজের মতবরক যে, এবিষয়ে মীমাংসা করবে? এমন অযথা প্রশ্ন ছেড়ে দাও। আবার কেউ কেউ এসে তোমাকে প্রশ্ন করবে, কী ভাই! শুনলাম অমুককে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছো, সত্য না-কি? এগুলো অনর্থক প্রশ্ন, কী দরকার অন্যের বিষয়ে এসব প্রশ্ন করার। মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা। যেমন সালাত আদায় করা, সিয়াম পালন করা ইসলামের সৌন্দর্য, তেমনিভাবে অনর্থক বিষয়ে জড়িত না হওয়াও ইসলামের সৌন্দর্য; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.কে অযথা প্রশ্ন করেননি; বরং তিনি তার প্রতি ইহসান করতে চেয়েছেন। যেমন তুমি কোনো দরিদ্র লোককে সাহায্যের উদ্দেশ্যে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তুমি তাকে বল, তোমার অবস্থা কী? বাড়ি ভাড়া কত? তুমি তাকে সাহায্য করার জন্যে এধরনের প্রশ্ন করো। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেও বুঝতে পারে যে, তুমি তাকে সাহায্য করার জন্যে এধরনের প্রশ্ন করেছ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.কে বললেন, হে জাবের! তুমি কি বিবাহ করেছ? জাবের রা. বলেন, জি ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি বিবাহ করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হলেন এবং বললেন, কুমারী না-কি বিবাহিতা নারী বিষয়ে করেছ? সে বললেন, বিবাহিতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কুমারী মেয়ে কেনা বিয়ে করলে না? তাহলে তুমি তার সাথে সোহাগ করতে পারতে আর সেও তোমার সাথে আনন্দ করতে পারতো। তখন জাবের রা. বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার বাবা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, আর তিনি আমার দায়িত্বে সাতজন বোন রেখে গেছেন। আমি বাড়িতে তাঁদের মতই আরেকজন মেয়ে আনতে চেয়েছি যাতো বাড়িতে আমার বোনের সাথে তার ঝগড়া-বিবাদ লেগে না যায়। তাই আমি একজন বয়স্কা মহিলা বিয়ে করেছি, যাতে সে বাড়িতে তাঁদের সাথে মায়ের মত হয়ে থাকতে পারে।

হে ভাই! বোনদের প্রতি এমন মায়াার কি কোনো দৃষ্টান্ত হতে পারে যে, নিজের আনন্দ-ফুর্তিকে, নিজের চাহিদাকে বোনদের জন্যে কুরবানি করে দিয়েছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত খুশি হলেন এবং তিনি জাবের রা.কে আর্থিক সাহায্য করতে চাইলেন। তাই তিনি তাঁকে বললেন, জাবের! তুমি কি তোমার উটটা আমার কাছে বিক্রি করবে? একথা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.-এর উটটির দিকে তাকালেন, যা ছিলো খুবই দুর্বল এবং কিছু পূর্বেও বসে পড়েছিলো। এখন তা সবল হয়ে উদ্যমতার সাথে হাঁটা শুরু করলো। হঠাৎ একথা শুনে জাবের রা. কী করবেন বুঝতে পারলেন না। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যে উটটি কিছুকাল পূর্বেও অসুস্থ ছিলো এবং এখন সুস্থ হয়ে উদ্যমতার সাথে চলছে, আপনি কি সেটার কথা বলছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ; তুমি আমার কাছে তা বিক্রি করো। জাবের রা. বললেন, আপনি এটা নিয়ে নিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না বরং তুমি আমার কাছে তা বিক্রি করো। জাবের রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কত টাকা দিয়ে ক্রয় করবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এক দিরহাম। জাবের রা. বললেন, কম হয়ে যায়। একটি উট মাত্র এক দিরহাম? অনেক কম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দুই দিরহাম। জাবের রা. বললেন, কম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিন দিরহাম। জাবির বলেন, কম হয়ে যায়। এভাবে রাসূলুল্লাহ বাড়াতে বাড়াতে চল্লিশ দিরহাম ও সাথে এক উকিয়া স্বর্ণমুদ্রা পর্যন্ত বললেন। জাবির রা. তখন বললেন, ঠিক আছে তবে একটা শর্ত আছে আর তাহল, আমি মদিনা পর্যন্ত এর উপর আরোহণ করে যাব।

মদিনায় পৌঁছে জাবের রা. বাড়িতে গিয়ে পরিবারের নিকট মালপত্র নামিয়ে রেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে এলো এবং তাঁর নিকট উট হস্তান্তর করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বেলাল রা.কে বললেন, বেলাল! উটটি নিয়ে রেখে যাও এবং জাবেরের চল্লিশ দিরহামের সাথে কিছু বেশি দিয়ে দাও। বেলাল রা. তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেওয়া পরিমাণ মাল দিয়ে দিলেন। জাবের রা. উটের মূল্য গ্রহণ করে ভাবতে লাগলেন, আমি এই টাকা দিয়ে কী করবো! আমি এর মাধ্যমে অন্য একটি উট ক্রয় করবো না-কি এর মাধ্যমে আমার বোনদের বিয়ের ব্যবস্থা করবো? অথবা পরিবারের লোকদের জন্যে খাবার ক্রয় করবো? অর্থাৎ আমি তো এই উটের উপর সফর করতাম, এর মাধ্যমে পানি আনতাম, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বহন করতাম; কিন্তু এখন এর মূল্য দিয়ে আমি কী করবো? এটা ভাবতে ভাবতে জাবের রা. নিজ গৃহের দিকে ফিরে যাচ্ছেন, তখন রাসূলুল্লাহ সা. বেলাল রা.কে বললেন, বেলাল! যাও জাবেরকে উটটিও দিয়ে দাও এবং বলে বল, উট এবং উটের মূল্য উভয়টিই তাঁর জন্য। বেলাল রা. জাবের রা.-এর নিকট গেলেন এবং তাঁকে বললেন, জাবের! তোমার উট নিয়ে যাও। জাবের রা. বললেন কেনো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এটা নিবেন না? তখন তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উট এবং উটের মূল্য উভয়টিই তোমার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আচরণ দেখে জাবের রা. অত্যন্ত খুশি হলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.কে সাহায্য করার জন্য তাঁর গোপন বিষয় জানতে চেয়েছেন ‘তোমরা কারো ব্যাপারে গোচরীভূত করবে না এবং কারো গোপন বিষয়ে জানতেও চাইবে না।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে একথা বলার, আবার নিজেই তাঁর খেলাফ করেননি।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদের গোপন বিষয়ের হেফাজত করুন এবং আমাদেরকে অন্যের গোপন বিষয় সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন! আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের সকল অনিষ্টতা থেকে হেফাজত করুন। আমিন。

টিকাঃ
১. সূরা মায়িদা: ৪৫

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 যুলুম করো না

📄 যুলুম করো না


বিভিন্ন ঘটনা আর দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাস এগিয়ে চলেছে; কিন্তু পৃথিবীতে যারা ক্ষমতাবান, যাদের অধীনে অন্যরা চলে, তাদের থেকে আমরা এমন অনেক বিষয় বা সিদ্ধান্ত দেখতে পাই। আসলে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না যে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল কারণ বা উদ্দেশ্য কী ছিলো? এসকল সিদ্ধান্ত বা দুর্ঘটনার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা হল, বারমাকি গোত্রের দুর্যোগের ঘটনা। যদিও আমরা এখানে বারমাকি গোত্রের দুর্যোগের পূর্ব ঘটনা আলোচনা করবো না, কারণ এ বিষয়ের আলোচনা অনেক দীর্ঘ। যদি খলিফা হারুনুর রশিদকে প্রশ্ন করা হয়, (বারমাকি গোত্রের সাথে হারুনুর রশিদের অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ইয়াহইয়া আল-বারমাকি ছিলেন হারুনুর রশিদের দুধ বাবা। হারুনুর রশিদের নিকট তাঁর অনেক মর্যাদা ছিল। তিনি ছিলেন অনেক বৃদ্ধ। তা সত্ত্বেও হারুনুর রশিদ তাঁকে মৃত্যু পর্যস্ত জেলে আটকে রেখেছেন। বারমাকি গোত্রের দুর্যোগের ঘটনাটা একটা ইতিহাসের এক রহস্যজনক ঘটনা।) আপনি কেনো বারমাকি গোত্রের সাথে এমন করলেন? আপনি একদিন সকালে হঠাৎ করে তাদের কতককে হত্যার আদেশ দিলেন আর কতককে জেলে বন্দি রাখার আদেশ দিলেন, এবং তাদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলেন? এমন প্রশ্ন হারুনুর রশিদকে করলে হয়তো সে বলবে, আল্লাহ্‌র শপথ করে বলছি আমার এই হাতও যদি এর কারণ জানতো তাহলেও আমি তা কেটে ফেলতাম।

পূর্বে বলেছ ইয়াহইয়া আল-বারমাকি হারুনুর রশিদের দুধ পিতা ছিল, তা সত্ত্বেও তাঁকে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। হারুনুর রশিদের বংশের অনেককে হত্যা করেছে এবং অনেককে জেলে বন্দি করে রেখেছে। ইয়াহইয়া আল-বারমাকি ছিলো অনেক বৃদ্ধ; তার বয়স ছিলো আশির উর্ধ্বে। তাঁর সাথে নিজ ছেলে খালেদকেও বন্দি করা হয়েছিল। তাঁদের সাথে জেলে অনেক কঠিন ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন ছিলো শীতকাল; প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছিল, বয়সের কারণে বৃদ্ধ ইয়াহইয়া অনেক কষ্ট হচ্ছিলো; কিন্তু জেলার তাঁদেরকে আরো বেশি কষ্ট দেওয়ার জন্য জেলের ভিতর থেকে সব ধরনের কাঠ সরিয়ে নিয়ে ছিলো, যাতে করে তাঁরা জেলের ভিতর আগুন জ্বালিয়ে শীত কমাতে বা ঠান্ডা পানি গরম করতে না পারে।

খালেদের বৃদ্ধ পিতা ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করতেও অনেক কষ্ট হত। বিশেষ করে সকালে ফজরের সময়। এদিকে জেল কর্তৃপক্ষও সকল কাঠ-খড়ি সরিয়ে নিয়েছে। তাই ইয়াহইয়া যখন ঘুমিয়ে যেতো, খালেদ তখন পানির পাত্র নিয়ে জানালাায় রাখা কামরা আলোকিত কারার বাতির নিভুনিভু আলোতে সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে পানি যে সামান্য গরম হতো, সকালে ফজরের আযানের সময় পিতার ঘুম ভাঙলে সেই পানি দিয়ে ওযু করতো- যাতো ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করতে পিতার কষ্ট না হয়। অতঃপর জেল কর্তৃপক্ষ যখন এই পদ্ধতি জানতে পারলো, তখন তাঁদের আরো কষ্ট দেওয়ার জন্যে বাতি জানালা থেকে আরো দূরে সরিয়ে রাখতো- যাতো সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে কষ্ট করেও পানি সামান্য গরম করতে না পারে। এরপর পিতা ইয়াহইয়া আল-বারমাকি যখন ঘুমিয়ে যেতো, খালেদ তখন পিতার মুহাব্বত ও ভালোবাসার কারণে পানির পাত্র পেট ও রানের মধ্যে রেখে দেওয়াতে হেলান দিয়ে ফজর পর্যন্ত বসে থাকত, অতঃপর ফজরের আজান হলে পিতার খেদমতে সেই পানি পেশ করতো।

ইয়াহইয়া ও তার পুত্র খালেদের উপর শুধুমাত্র এই বিপদই নেমে আসেনি; বরং তাঁরা তাঁদের সকল সম্পদও হারিয়েছিল। বর্ণিত আছে, একবার ইয়াহইয়ার নিকট ইবনুল মুগিসি আসলো। ইবনুল মুগিসি ছিলো খলিফার এক কর্মকর্তা। সে ইয়াহইয়ার নিকট এসে বলল, খলিফা আমাকে বলেছে আমি যদি দশ মিলিয়ন দিরহাম না দেই তাহলে তিনি আমাকে হত্যা করবে। ইবনুল মুসায়িব বিরুদ্ধ দশ মিলিয়ন দেরহাম চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। তাই সে ইয়াহইয়া নিকিট এসে কান্নাকাটি শুরু করল। ইয়াহইয়া তখন তার গোলামকে বলল, দেখো কোবাগারে কত দেরহাম জমা আছে। সে বলল, পাঁচ মিলিয়ন দেরহাম আছে। সে তাকে বলল, এগুলো তাকে দিয়ে দাও। তারপর ছেলে খালেদের নিকট লোক পাঠিয়ে বলো, আমি শুনেছি তুমি একটা বাগান কিনতে যাচ্ছো, তো তোমার কাছে কত দেরহাম আছে? সে বলল, দুই মিলিয়ন। তিনি বললেন, এটা তাকে দিয়ে দাও। অতঃপর ছেলে ফযলের নিকট লোক পাঠিয়ে বলো, তুমি আমাকে এক মিলিয়ন দাও, এরপর মেয়েকে বলো, তোমার যে অলঙ্কারগুলো আছে সেগুলো দাও। এভাবে সে দশ মিলিয়ন দেরহাম জমা করে ইবনে মুসায়িবকে দিল।

ইবনে মুসায়িব এই সম্পদ নিয়ে যখন বেরুলো তখন সে তার সাথীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি মনে কর যে, সে আমার প্রতি ইহসান করে আমাকে এই সম্পদ দিয়েছে? না; বরং সে আমার ভয়ে আমাকে এই সম্পদ দিয়েছে। সুবহানাল্লাহ! সে তোমাকে কেন ভয় করবে? আচ্ছা বুঝলাম সে তোমাকে ভয় করতো; কিন্তু সে যদি তোমাকে এই সম্পদ না দিত তাহলে তুমি কি খলিফার হাত থেকে বাঁচতে পারতে? আর তুমি-ই বা এই সম্পদের জন্য ইয়াহইয়া এর পায়ে পড়তে গেলে কেন? অতঃপর ইবনে মুসায়িব যখন খলিফার নিকট এই সম্পদ দিয়ে নিজেকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করল তখন তার সেই সাথী যে ইয়াহইয়াকে সম্পদ দেওয়ার সময় তার সাথে ছিলো, সে ইয়াহইয়ার নিকট গিয়ে বলল, ইবনে মুসায়িব বলেছে, আপনারা না-কি তার ভয়ে তাকে এই সম্পদ দিয়েছেন? অর্থাৎ এটা স্পষ্ট নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা। ইয়াহইয়া তখন বলল, হয়তো সে না বুঝে কথাটা বলেছে। সে তখন হতাশ ও বিমর্ষ অবস্থায় ছিল; সে কীভাবে নিজেকে মৃত্যু থেকে বাঁচাবে সে চিন্তাতেব্যস্ত ছিল।

ইয়াহইয়া আল-বারমাকি একজন সম্পদশালী ও সম্মানিত লোক ছিলেন; কিন্তু ছেলে তার এই করুণ অবস্থা দেখে, একদিন ছেলে খালেদ তাঁকে বলল, বাবা! এত কিছুর পরও আমরা কীভাবে ধৈর্যধারণ করবো। আমাদের এখনো কিছু কি আর বাকি আছে যার কারণে আমরা ধৈর্য ধারণ করবো? কেনো আমাদের এই অবস্থা হল? কী কারণে আমাদের এখানে আনা হল? ইয়াহইয়া তখন ছেলেকে বলল, হে আমার ছেলে! শোনো! আমরা যখন গাফেল হয়ে রাতে ঘুমাই, মাযলুমের দোয়া তখন রাতের অন্ধকারে আসমানের দিকে উঠে যায়। আর আল্লাহ তাআলা তো ঘুমান না, তিনি কখনো তা থেকে গাফেল থাকেন না।

বর্ণিত আছে যে, জেলের ভিতর ইয়াহইয়া আল-বারমাকির যখন মৃত্যুর সময় হল, তখন সে একটি কাগজ আনতে বললো, এবং তাতে কিছু কথা লিখে তা পকেটে রেখে দিয়ে বলল, আমার যখন মৃত্যু হবে তখন এই কাগজটা খলিফা হারুনুর রশিদের নিকট পৌঁছে দিও। তাঁর মৃত্যুর পর জামা-কাপড় খুলে পকেট থেকে কাগজটা বের করে খলিফার নিকট পৌঁছে দেওয়া হল। খলিফা কাগজটা খুলে পড়লো। তাতে লেখা ছিল, ‘দুই প্রতিপক্ষের একজন বিচারালয়ের দিকে চলে গেছে আর অপরজন তার পরে আসছে। তারা দুইজন এমন এক বিচারালয়ে উপস্থিত হবে, যার বিচারক হবেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আর সাক্ষী হবেন ফেরেস্তারা।’ এবং তাতে আরো লেখাছিল, হে হারুনুর রশিদ! তুমি আমার প্রতি যুলুম করেছো, আমাকে বন্দি করে রেখেছো, আমার প্রতি ও আমার সন্তানদের প্রতি অবিচার করেছো; কিন্তু মনে রেখো, আমি এবং তুমি একদিন আল্লাহর সামনে অবশ্যই দাঁড়াবো।

নিশ্চয় যুলুমের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুআয ইবনে জাবাল রা.কে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তিনি তাঁকে যুলুম থেকে বাঁচার ওসিয়ত করেছেন। মুআয রা. বলেন, আমি আমার উটের উপর ছিলাম আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পায়ে হাঁটিছিলেন তখন তিনি আমাকে বলেন, হে মুআয! এই সাফল্যের পর হয়তো আমার সাথে তোমার আর সাক্ষাৎ হবে না। একথা বলার পর তিনি তাকে একটা ওসিয়ত করেন কী ছিলো সেই ওসিয়ত?

মুআয রা. হলেন একজন বিখ্যাত সাহাবী। তিনি উম্মতের মধ্যে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সবচে' বড় আলেম ছিলেন। তিনি ছিলেন হিফযুল কুরআন ও ইলমের পর্বত-চূড়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ইয়ামানে মুআল্লিম হিসেবে প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন, হে মুআয! এটাই তোমার সাথে আমার মদিনায় শেষ ইটা। এই সাফল্যের পর হয়তো আমার সাথে তোমার আর সাক্ষাৎ হবে না। এরপর হয়তো তুমি আমার মসজিদ ও আমার কবরের পাশ দিয়ে হাঁটবে। সত্যিই মুআয রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতে আর মদিনায় আসেননি। এরপর তিনি তাকে কয়েকটি ওসিয়ত করেন, তার একটা হল, হে মুআয! তুমি মাযলুমের বদ দোয়া থেকে সাবধান থাকবে, কারণ মাযলুমের দোয়া আর আল্লাহ তায়ালার মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।

জ্ঞানীগণ বলেন, এমন লোকের বদ দোয়া থেকে সাবধান থাকবে, তুমি ঘুমিয়ে গেলেও যারা না ঘুমিয়ে তোমার বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করে।

কত মানুষ যেঅন্যায়ের প্রতি অন্যায় করার কারণে দুনিয়ারেও শাস্তি ভোগ করে, তার কোনো হিসেব কি আমাদের কাছে আছে? মাযলুম ব্যক্তি রাতের আঁধারে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তায়ালার নিকট যালেমের বিরুদ্ধে দোয়া করে- ফলে মৃত্যুর পূর্বেই দুনিয়াতে তার আরেক মর্মন্তুদ মৃত্যু ঘটে যায়। সহিহ হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘দুই ব্যক্তির শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত হয়, ১. যালেম; ২. মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান।’

যালেমের শাস্তি দুনিয়াতেই বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। যেমন হয়তো সে আর্থিকভাবে অভাবীতে ভোগে; কখনো ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; তার অংশীদারা তাকে ধোঁকায়; কখনো কখনো তোমার কাজ বন্ধ হয়ে যাবে; তোমার সন্তানদের তোমার সমস্যা সৃষ্টি হবে; তুমি সড়ক দুর্ঘটনায় পড়বে; তোমার স্ত্রীর সাথে সমস্যা সৃষ্টি হবে; তুমি শারীরিক অনেক সমস্যায় পতিত হবে; কোনো কারণ ছাড়াই একদিন তোমার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হবে; একদিন সর্দি লাগবে; একদিন জ্বর হবে; একদিন রক্তচাপ বেড়ে যাবে কিন্তু তুমি এর কোনো কারণ খুঁজে পাবে না। হয়তো অকালর রাতে কোনো মাযলুমের দোয়ার কারণে তুমি এই বিপদের সম্মুখীন হয়েছো। আর তুমি এর থেকে গাফেল-অসতর্ক ছিলে; কিন্তু তোমার এবং তার রব আল্লাহ কখনোই গাফেল নন।

আবু যার রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘নিজেরাও ভালোবেসে, হে আমার বান্দারা! আমি যুলুমকে আমার নিজের উপর হারাম করেছি, এবং এক তোমাদের মাঝেও হারাম হিসেবেই রেখেছি, সুতরাং তোমরা যুলুম করো না।’

অর্থাৎ মালিকাধীণ শ্রমিকদের প্রতি যুলুম করবে না। স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি যুলুম করবে না। ভাই তার বোনদের ও ছোট ভাইদের প্রতি যুলুম করবে না। শিক্ষক ছাত্রছাত্রদের অন্যায্যভাবে প্রহার করবে না। ইমাম মসজিদ ও মুয়াজ্জিনদের প্রতি যুলুম করবে না। বিচারক তার কাছে আসা বিচার প্রার্থীদের প্রতি যুলুম করবে না। নেতা অধীন লোকদের প্রতি যুলুম করবে না। রাজা প্রজাদের প্রতি যুলুম করবে না; এক কথায় কেউই অন্যের প্রতি যুলুম করবে না, কারণআল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে আমার বান্দারা! আমি যুলুমকে আমার নিজের উপর হারাম করেছি, এবং এক তোমাদের মাঝেও হারাম হিসেবেই রেখেছি, সুতরাং তোমরা যুলুম করো না। তুমি কারো গিবত করে তার প্রতি যুলুম করো না, কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে তার প্রতি যুলুম করো না। কারো বেতন আটকে দিয়ে তার প্রতি যুলুম করো না, গাড়িওয়ালার ভাড়া আটকে দিয়ে তার প্রতি যুলুম করো না। কারো বদনাম করে তার প্রতি যুলুম করো না। অর্থাৎ কোনোভাবেই কারো প্রতি যুলুম করো না।

অফিসের কোনো কর্মচারী চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অন্যত্র যেতে চায়, তখন অফিসের প্রধান তাকে বলে, তুমি আমাদের এখানে থেকে যাও; কিন্তু লোকটি বলে, না আমি বরং অন্য কোথাও যাওয়াকে ভাল মনে করছি, সুতরাং আপনি আমাকে এখান থেকে একটি অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট দিন। তখন তার বস বলে, না আমরা তোমাকে কোনো সার্টিফিকেট দেবো না, তুমি যাও; এখান থেকে তোমাকে কোনো সার্টিফিকেট দেওয়া হবে না।

আরে এইটা তো আমার হক, তোমাদের সাথে আমার চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। আমি অন্য জায়গায় যেতে চাচ্ছি। আমি তোমাদের সাথে নতুন চুক্তি করতে বাধ্য নই। আমি তোমাদের সাথে থাকা অবস্থায় তোমাদের সাথে কোনো ধরণের খেয়ানত করিনি, আমি তোমাদের সাথে কোনো ধরণের যুলুম করিনি। তোমরা আমাকে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট দিবে, এটা তোমাদের নিকট আমার প্রাপ্য-হক। তখন অফিসের বস বলে, যাও নাও আমাদের কাছে কোনো সার্টিফিকেট নেই, আমরা তোমাকে কোনো সার্টিফিকেট দেবো না। এটা সম্পূর্ণ যুলুম, এটা প্রকাশ্য অন্যায়।

যারা হাসপাতাল, অফিস বা সরকারি কোনো দফতরে চাকরি করে, তাদের কাছে যখন কেউ সেবা গ্রহণ করতে আসে তখন অযথা তাদের হয়রানি করা হারাম; এটা যুলুম। কেউ কেউ শুধু মাত্র একটি সাইনের প্রয়োজনে কোনো অফিসে আসে; কিন্তু অফিসার তাকে বলে, অপেক্ষা করুন। তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখে, কখনো শুধু মাত্র একটি সাইনের জন্য কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত বসিয়ে রাখে। তাকে বার বার ঘুরিয়ে পেরেশানিতে ফেলে। এটা অন্যায়, এটা যুলুম। আপনি কেনে তাকে বসিয়ে রাখবেন? আপনি কেনো তাকে কষ্ট দিবেন? একটি সাইন দিতে কি এক ঘণ্টা লাগে? একা সাইন দিতে কি মাস, সপ্তাহ বা দিন লাগে? আপনি কেনো অযথা ও সময় নষ্ট করছেন? তাকে পেরেশানিতে ফেলে কষ্ট দিচ্ছেন? এটা হারাম এটা যুলুম-অন্যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘কেউ যদি তার কোনো ভাইয়ের প্রতি যুলুম করে থাকে, তাহলে সে যেনো ঐদিন আসার পূর্বেই তার সমাধান করে নেয়, যে দিন দিনার ও দিরহাম কোনো কাজে আসবে না।’ (পরকালে)

সহিহ হাদিসে এসেছে, ইওকালের পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মসজিদে এসে মিবারে দাঁড়িয়ে এবং সাহাবায়ে কেরام রা.কে উদ্দেশ্য করে খুৎবা দেন, তখন মসজিদ ছিল সাহাবায়ে কেরাম রা.কে পরিপূর্ণ, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে একদৃষ্টিতে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন, যেনো নিজ কলিজা ও আত্মার দিকেই তাকিয়ে আছেন, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের নিকট নিজ সত্তার চেয়েও প্রিয় ও মূল্যবান ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, হে মানুষ! তোমাদের মধ্যে থেকে আমার প্রতিনিধিদের সমর নিকটবর্তী (অর্থাৎ আমার মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী!) সুতরাং আমি যদি তোমাদের কারো পিঠে আঘাত করে থাকি, তাহলে এই তো আমার পিঠ, সে যেনো আমার থেকে এর কিসাস চুকিয়ে নেয়। আমি যার কাছ থেকে সম্পদ নিয়েছি, এই তো আমার সম্পদ, সে যেনো এখান থেকে যা খুশি নিয়ে নেয়। আমি যাকে গালি দিয়ে সম্মানে আঘাত করেছি, এই-যে আমার সম্মান, সে যেনো তা শোধ নিয়ে নেয়। অতঃপর তিনি বলেন, কেউ যেনো আমার পক্ষ থেকে শাক্ততার ভয় না করে, কারণ এটা আমার রুচি-প্রকৃতি নয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন সাহাবায়ে কেরামের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, এবং তিনি বুঝতে পারলেন যে, তাঁদের আত্মা কষ্ট ভুগছে এবং তাঁদের মধ্যে থেকে একজনও দাঁড়াচ্ছে না, তখন তিনি বললেন, তাহলে সে যেনো আমাকে ক্ষমা করে দেয়, সে যেনো আমাকে ক্ষমা করে দেয়- যাতে আমি আমার রবের সাথে একটি পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে সাক্ষাৎ করতে পারো পারি। অথবা তিনি বলেছেন, আমি আমার রবের সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে পারি যে, আমার উপর কারো কোনো হক বাকি নেই।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহু বলেন, আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রকে সাহায্য করেন, যদিও সেটা কাফের রাষ্ট্র হয়। আর তিনি জালেম রাষ্ট্র ধ্বংস করে দেন, যদিও তা হয় কোনো মুসলিম রাষ্ট্র। হে ভাই! তুমি জুলুমের ভয়াবহতা নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখো। জুলুমের পরিণাম খুবই অশুভ ও ভয়ংকর। সুতরাং আমাদেরকে শুধুমাত্র জুলুম থেকে বেঁচে থাকলেই চলবে না বরং অন্যকে জুলুম থেকে উত্তম পন্থায় বাধা দিতে হবে। যেমন কেউ তার কর্মচারীদের উপর জুলুম করল, কোনো স্ত্রী তার সন্তানদের উপর জুলুম করল বা তার স্বামী সন্তানদের উপর জুলুম করল, (অর্থাৎ তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কারণে বা মৃত্যুবরণ করার কারণে সন্তানরা মা হারা হয়েছে এবং তার তত্ত্বাবধানে এসেছে।) কোনো ভাই তার ভাই বা বোনদের প্রতি জুলুম করল, কোনো বোন তার ভাই বা বোনদের প্রতি জুলুম করল, অথবা কোনো মেয়ে তার মায়ের প্রতি জুলুম করল বা কোনো সন্তান তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি জুলুম করল, অথবা কোনো প্রতিবেশী তার অপর প্রতিবেশীর প্রতি জুলুম করল, তাহলে আমাদের উচিত হবে আমরা সাধ্যমত উত্তম পন্থায় তাকে সেই জুলুম থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবো।

আল্লাহ তায়ালার নিকট এই প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেনো আমাদের সকলকে এর উপর আমল করার তাওফিক দান করেন। এবং আমরা যেখানেই থাকি না কেনো তিনি যেনো আমাদেরকে কল্যাণের সাথে রাখেন। আমিন。

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 অনিষ্টের কারণ হয়ো না

📄 অনিষ্টের কারণ হয়ো না


আ'শা বিন কায়েস ছিলেন ইয়ামামার মওজদ এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ লোক। সে সময় মদন থেকে মদিনায় গম, ভুট্টা ও এ জাতীয় খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি হত। সেখানকার লোকেরা ব্যবসায়ী ছিল। এ কারণে লোকেরা তাদের প্রতি কিছুটা মুখাপেক্ষী ছিল। তারা মক্কাও খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি করত। মক্কা তো ইসলামের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আরবদের কাছে হজ্জের মৌসুমে পণ্যসামগ্রী আদান-প্রদানের উৎস বলে গণ্য হত। আ'শা বিন কায়েস ছিল নিজ জাতির অন্যতম সরদার। সে ছিলো একজন অভিজ্ঞ ও প্রতিভাধর কবি। তার কবিতা সর্বাগ্রে আলোচিত হত।

যখন তার বয়স বেড়ে নব্বই ছাড়িয়ে গেল তখন সে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনতে পেল। সে জানতে পারল, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে পথপ্রদর্শক হয়ে এক ঐশী কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন। তারা তখন মূর্তিও অন্যান্য বস্তুর উপাসনাও নিত। সে নিজ জাতির দৃষ্টিতে ফেরালে দেখত, মূর্তির কাছে আসা-যাওয়া করছে, মূর্তির চতুষ্পার্শ্বে প্রদক্ষিণ করছে, মূর্তিকে সিজদা করছে এবং মূর্তির সামনে পশু উৎসর্গ করছে। তারা পাথরের পূজা-আর্চনা করে, যা তাদের কোনো ক্ষতি বা উপকার কিছুই করতে পারে না- তখন সে মনে মনে ইসলামে নিয়ে ধাবিত হল। এরপর সে এই বৃদ্ধ বয়সে উটের পিঠে বসে রাসূলের শানে এ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে মদিনার পথে রওয়ানা হল-

‘তোমার চক্ষু অন্ধকার রাতেও বুঝে থাকেনি। তবে তুমি অসুস্থ ব্যক্তির মত রাতযাপন করেছো।’

‘হে প্রাজ্ঞ! তুমি কোথায় যাচ্ছো? ইচ্ছা করছো? কারণ মদিনা ভূমিতে তোমার একটা প্রতিষ্ঠিত সময় রয়েছে।’

এভাবে দীর্ঘ এক কবিতা আবৃত্তি করলেন। মদিনায় পৌঁছার আগেই রাসূলের শানে কবিতা আবৃত্তি করতে থাকেন; কিন্তু পথিমধ্যে কুরাইশ কাফেরদের একটি দলের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটলো। তারা বলল, আপনি কি? সে বলল, আমি আ'শা বিন কায়েস। তারা বলল, আশ্চর্য! আপনি কি ইয়ামামার সরদার আ'শা বিন কায়েস?

জাহেলি যুগে উকাজ ও যুলমাজাযের মত আরবদের কিছু বড় বড় বাজার ছিল যেখানে তারা সকলে সমবেত হত। সেখানে কেউ কেউ মানুষের সামনে নিজের কবিতা আবৃত্তি করত। সেখানে আবার কবিতা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। বলা হত, কে আছে, হাসসানের কবিতা আবৃত্তি করবে। কে আছে, আ'শা বিন কায়েসের কবিতা আবৃত্তি করবে? এভাবে বিখ্যাত কবিদের কবিতা-আবৃত্তিও আসর জমাতো।

তারা বলল, আপনিই আ'শা বিন কায়েস? বলল, হ্যাঁ। কোথায় যেতে ইচ্ছা করেছেন? আমি মদিনায় যাচ্ছি, নবির সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলামে দীক্ষিত হবো। তারা এবার তার দিকে ভাল করে তাকাল। এবং বলল, হে আ'শা! তাহলে আপনার ধর্ম, আপনার বাপ-দাদার ধর্মের কী হবে? তাদের এ কথোপকথন মক্কামুখে উটের পিঠে চলেছিল। তার সাথে ছিল তার পরিবার-পরিজন ও নিজ কওমের কিছু লোক। কুরাইশ কাফেররা চাইল না যে, আ'শা মদিনায় পৌঁছে ইসলাম কবুল করুক। আর সে চাইল মদিনায় পৌঁছে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাৎ লাভ করবে। কুরাইশ কাফেরদের আশঙ্কার কারণ হল, যদি আ'শা ইসলাম কবুল করে, তবে তো নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঝুলিতে আরো একজন শক্তিশালী কবি যুক্ত হবে- যা হবে মহাবিপর্যয়ের কারণ। আর এ হাসসানের সাথে মিলে অন্য কবিদের প্রতিষ্ঠিত করবে।

নিন্দা জ্ঞাপন করে কবিতা বানিয়েছে। কবিতায় আমাকে মন্দ বলেছে।

তখন উমার রা. বললেন, সে তোমার ব্যাপারে কী বলেছে? সে বলল, অর্থাৎ ‘তুমি নিজেকেই কষ্ট দিও না, এখানে তোমার দেখভাল, খানাপিনা করানোর লোক আছে।’

উমার রা. বললেন, আমি মনে করি সে তোমার প্রশংসা-ই করেছে। তখন সে বলল, আপনি হাসসানকে জিজ্ঞাসা করুন, সে কবিতা সম্পর্কে ভালো জানে। উমার রা. বললেন, হাসসান! এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন? সে কি তার নিন্দা করেছে? হাসসান রা. বললেন, নিন্দা করেনি বটে; কিন্তু তাকে আক্রমণাত্মক করেছে। তখন উমার রা. জারিরকে শাসন করেছিলেন। বলা হয়, ঐ আমিরকে তিনি কিছু দিরহাম দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, মুসলমানদের প্রয়োজনে জিনিসপত্র আমি তোমার কাছ থেকে কিনে নিব। আলেমগণ আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন- জনৈক কবি শহরের আমির কুশা গিয়ে একটি কবিতা বানিয়েছিল। এতে আমিরটি চটে গিয়ে তাকে শাস্তির নির্দেশ দিয়েছিল। তার সারা শরীরে মানুষের মল মাখিয়ে শহরের অলি-গলিতে ঘোরানো হয়েছিল। তাকে যখন ছেড়ে দেওয়া হল, তখন সে বাড়িতে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হল। এরপর আরেকটি কবিতা আবৃত্তি করল,

‘তুমি আমার সাথে যা করলে তা পানিতে মুখে মুখে পরিষ্কার হয়ে যাবে; কিন্তু তোমার সম্পর্কে আমার এ কবিতা ফয়ে যাওয়া অহিতেও অবশিষ্ট থাকবে।’

তাতে সে বলেছে, তুমি এখন আমাকে ময়লা মাখিয়ে শহরের অলি-গলিতে ঘুরিয়েছ, আর শিশু ও অন্যরা পিছন থেকে আমাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করেছে। আমি তাদের কাছে একধরনের অপমান অনুভব করছিলাম, কারণ সব জায়গায় লোকেরা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এটা সত্য যে তুমি আমাকে অপমান করেছ; কিন্তু এ অপমান কিছুদিন পর শেষ হয়ে যাবে। তুমি যা করেছ, পানি তা ধুয়ে ফেলবে; কিন্তু তোমার সম্পর্কে আমার এ কবিতা মহাকাল পর্যন্ত বাকি থাকবে। তোমার সম্পর্কে আমার কবিতা আবৃত্তি হতে থাকবে- যখন তুমি থাকবে আবার কবরে। তোমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে লোকজন বলবে, এটা অমুকের কবর, যার সম্পর্কে কবি এমন এমন কথা বলেছেন।

এ কবির প্রভাব বর্তমানও রয়েছে। কত কবিও যে, কবিকে হত্যা করেছে কত কবিতা যে, কবিকে পদচ্যুত করেছে? কত কবিতা যে, জাতির রক্ত ঝাড়িয়েছে আর মস্তক বিদীর্ণ করেছে এবং এর কারণে কত নারী যে, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে?! এখনো আরবদের কাছেই ডায়েরি ও নথিপত্র হিসেবে গণ্য হয়।

যাইহোক, কুরাইশ কাফেররা আ'শা বিন কায়েসকে দেখে বলল, এই আ'শা বিন কায়েস যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে ইসলাম কবুল করে তবে তার কাছে শক্তিশালী দু'জন হয়ে যাবে; তাই তার ইসলাম কবুলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করো। তারা তার কাছে অগ্রসর হয়ে বলল, হে আ'শা! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো ব্যভিচার হারাম করে। এখন ইসলাম কবুল করবে তখন আর ব্যভিচারের সুযোগ পাবে না। তুমি এখন যা ইচ্ছা তা করতে পার। লাভ-উওয়া তোমাকে এ-কাজ করতে নিষেধ করছে না; কিন্তু তুমি ইসলাম কবুল করলে তখন-তখন ব্যভিচার করতে পারবে না। আ'শা বলল, আমি অভিশপ্ত বৃদ্ধ, আমার ব্যভিচারের কোনো ইচ্ছে নেই। আমার সামনে থেকে চলে যাও। সে অগ্রসর হতে চাইল; কিন্তু তারা তার কাছ থেকে সরন না। তারা বলল, দেখো আ'শা! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ নিষিদ্ধ করে। ইসলামে দাখিল হলে তোমার জন্য দেবতা থাকবে না। বরং তুমি মদ পান করলে তোমার উপর দণ্ডবিধি কার্যকর করা হবে। আ'শা বলল, আমি অভিশপ্ত বৃদ্ধ, আর মদ বিবেক-বুদ্ধিকে খেয়ে ফেলে। যে তা পান করে সে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। আর এখন আমার মদের প্রতি কোনো আসক্তি নেই।

তখনও সেই জাহেলি যুগেও কিছু লোক ছিল যারা মদ পান করত না। সেসময়ে এক কুরাইশ লোককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- যে মূর্তি পূজা করত এবং কন্যাশিশুকে জীবন্ত দাফন করত, তুমি মদ পান করো না কেন? সে বলেছিল, ‘আমি দেখেছি, যে ব্যক্তি মদ পান করে সে আপন মায়ের উপর অপবাদ আরোপ করে। এবং আপন বোনের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়।’ সে বলতো, মানুষ কীভাবে নিজেই নিজের বিবেক- বুদ্ধিকে নষ্ট করতে পারে? অর্থাত্‍ এখন পর্যন্ত আমার মস্তিষ্ক ঠিকঠাক আছে। আর মদ সে বিবেক নষ্ট করে দেয়। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেন,

'যে দুনিয়াতে মদ পান করবে সে পরকালে (জান্নাতে) মদপান থেকে বঞ্চিত থাকবে।'

তিনি আরো বলেন,

'যে মদপানে অভ্যস্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহর সাথে সে মূর্তিপূজারীর ন্যায় সাক্ষাত্‍ করবে।'

এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদকে সকল পাপের মা বলেছেন। আর ওলামায়ে কেরামও মদকে সকল পাপের মা বলেছেন। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বড় বড় গুনাহের কথা আলোচনা করতেন তখন বলতেন, 'আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহের কথা বলব না, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহের কথা বলব না, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহের কথা বলব না?' সাহাবায়ে কেরام বলতেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, যাদু করা এবং শিরক করা। এবং তিনি মদ পানের কথাটিও উল্লেখ করতেন। আর মদ এ কারণেই বড় গোনাহ যে, মদ মানুষের আকলকে নষ্ট করে দেয়। তার দ্বীন-ধর্মকেও নষ্ট করে দেয়। এবং কখনো কখনো তাব্যক্তিককে অনেক অন্যায়-অপকর্মের দিকে নিয়ে যায়। কখনো তাকে নিয়ে মানুষ ঠাট্টা- উপহাস আবার কখনো সে পাগলের প্রলাপ করে; ফলে মানুষ তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করে। এসবকিছুই ঘটে তার মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণে।

যখন সেই জাহেলি যুগেও কিছু কিছু মানুষ কুফর-শিরক করেও মদ থেকে দূরে থাকত; তখন কীভাবে সে একজন মুসলিম হয়ে মদ পান করতে পারে? এ কারণে আল্লাহ তাআলা মদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

'হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীর- এসৰ শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো; যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'

আল্লাহ তাআলা এখানে মদের আলোচনা মূর্তির আলোচনার সাথে ই উল্লেখ করেছেন। যে মদ পান করে সে সফল হতে পারে না।

তো, তারা তাকে বলল, হে আ'শা! দেখ, তুমি যদি ইসলাম কবুল করো তবে তোমার জন্য মদ হারাম হয়ে যাবে। সে বলল, আল্লাহর শপথ! আমার এ বয়সে মদপানে কোনোই ইচ্ছা নেই; সেটা তো মানুষের বিবেককে নষ্ট করে আর ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করে। আর আমি এমনিতেও মদ পান করি না; তোমরা আমাকে ছাড়ো। এ বলে রওয়ানা হতে চাইল; কিন্তু তারা তাঁর পথ আগলে ধরে বলল, হে আ'শা! জি, বলেন; এবার তারা তার সামনে সর্বশেষ টোপটি ফেলল- যার থেকে আ'শা বাঁচতে পারেনি। সর্বশেষ টোপ; যার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

'বনি আদম এক দিক দিয়ে বৃদ্ধ হয় আর অপর দিকে তার হৃদয় দুটি জিনিসের ভালবাসায় নবযুবক হয়।'

সে জিনিস দুটি হচ্ছে- যার কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বনি আদম এক দিক দিয়ে বৃদ্ধ হতে থাকে আর অপর দিক দিয়ে তার হৃদয় দুটি জিনিসের ভালবাসায় যুবক হয়ে যায়। এক. দুনিয়ার ভালবাসা; দুই. দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা।'অথবা বলেছেন, 'সম্পদের ভালবাসা আর দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা।'

দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে দীর্ঘ জীবন লাভের আশা করা। আর এটা কেউ তোমাকে দিতে পারবে না। আর সম্পদ, এটা মানুষ তোমাকে দিতে পারবে। তারা বলল, হে আ'শা! তুমি তোমার নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে যাও। নিজের ধর্ম ও রীতিনীতির উপর স্থির থাক। আমরা তোমাকে একশ' উট উপঢৌকন দিচ্ছি। এ কথা শুনে আ'শার মনে একটা ধাক্কা খেলো। সে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল এবং দেখতে পেল, একশ' উট তার সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা করছে। আর পূর্ব থেকেই তাদের কাছে উটের একটা বিশেষ মূল্য ছিল। বর্ণনার অবস্থান্তরও সত্য নয়। মানুষ তো তখন সফর, কূপ থেকে পানি উত্তোলন, চাষাবাদ ও মহর আদায়ের বিভিন্ন কাজে এই উটকে ব্যবহার করত। তাদের কেউ স্ত্রীকে মহর দিতে চাইলে এই উট দিয়ে মহর আদায় করত; একটি, দুটি, দশটি বা একশটি যার যেমন সামর্থ্য হতো। কেউ সফর করতে চাইলে উট ব্যবহার করত; কেউ জমি চাষাবাদ করতে চাইলে উটের দ্বারস্থ হত; কূপ থেকে পানি উত্তোলন করতে এই উটকেই ব্যবহার করত- উটের পিঠ বা বাঁশ বেঁধে দিত, অতঃপর তার সাথে রশি বেঁধে রশির অপর প্রান্ত বালতি দিয়ে দিত, উট একবার সামনে, আরেকবার পিছনে যেতো; এভাবেই তারা তা দিয়ে পানি ওঠাতো। তারা রক্তপাতে রক্তপণ বা অন্য যে কোনো জরিমানা আদায়ে এই উটই প্রদান করত। উট জবাই করে মেহমানদারী করত। উটের এই বহুবিধ উপকারের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ

'তারা কি উটের দিকে তাকায় না, তাকে কেমন (উপকারী) করে সৃষ্টি করা হয়েছে?'

অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ

'তিনি চতুষ্পদ জন্তুও সৃষ্টি করেছেন; এতে তোমাদের জন্য রয়েছে শীত-বস্ত্রের উপকরণ। আর এতে রয়েছে বহুবিধ উপকার এবং কিছু তোমরা আহার করে থাকো।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো যুদ্ধাভিযানে যেতে চাইলে সাহাবায়ে কেরামকে উট অনুদান করতে বলতেন। যেমন আত্মবিশ্বাস ● ২৮২

উসমান রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাবুক অভিযানের অভাবী বাহিনীকে প্রস্তুত করতে চাইলো তখন লোকদের বললেন, তোমরা দান করো। তখন উসমান রা. দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আসবাব-পত্রসহ একশটি উট দান করলাম। এরপর আরেকজন দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আসবাব-পত্রসহ একশটি উট দান করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার দান করতে বললেন, উসমান রা. আবার বললেন, সন্মাত্র ও বস্ত্রাদি সহ একশটি উট তার দান করলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উসমান আজকে যে আমল করল, এরপর সে কোনো ভুলত্রুটি করলেও তার কোনো ক্ষতি হবে না।

মোটকথা তারা আ'শা বিন কায়সকে এ জাতীয় বস্তুর মাধ্যমে প্ররোচিত করল। আর সে ছিলো অতিশয় বৃদ্ধ; কিন্তু তার সম্পদের প্রতি খুব মহব্বত ছিলো। তারা তাকে বলল, আমরা তোমাকে একশ' উট দিচ্ছি, তুমি তোমার কওমে ফিরে যাও। সে বলল, একশ' উট, তোমরা কি এখনি আমার সামনে এনে দেবে? হ্যাঁ, এখনি এনে দেব। দাও তাহলে; তখন তারা একশ' উট তার সামনে হাজির করল। আর আল্লাহ তাআলা তো সত্যই বলেছেন,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ

'নিঃসন্দেহে কাফেরদের সম্প্রদায় আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার জন্য নিজ ধন- সম্পদ ব্যয় করে। বস্তুত এখন তারা আরো ব্যয় করবে। আর তা হবে তাদের জন্য আক্ষেপ ও হতাশার কারণ। শেষবধি তাদের পরাজয় নিশ্চিত, আর কাফের সম্প্রদায়কে তো জাহান্নামের তাড়িয়ে নেওয়া হবে।'

লোকটি উটগুলো নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হল। সে সামনে চলছিল আর উটগুলো চলছিল তার পিছন পিছন। সে উটগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছিল আর এ কল্পনা করছিল যে, যখন নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে যাবে তখন এত সম্পদ দিয়ে সে কী কী করবে? এক পর্যায়ে যখন সে নিজবসবাসের কাছাকাছি এলো তখন তার উটনীটি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল আর সেও প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে সাথে সাথে মারা পড়ল। ..........সে দুনিয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কারণ তার কাছে এখন কোনো উট নেই; .......... এবং পরকালেও ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কারণ সে ইসলাম কবুল করেনি। এটাই প্রকাশ্য প্রকৃত মত।

এ ঘটনা বলে দিচ্ছে, কিছু মানুষ ভাল হতে চায়; কিন্তু প্রকৃত বন্ধু তার ভাল হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কিছু মেয়ে পর্দা করতে চায় এবং হারাম সম্পর্ক ছাড়তে চায় কিছু লোক তওবা করতে চায় মহাপাপ ছড়তে চায়, নামায শুরু করতে চায়, অন্যায় গোনাহের কাজ পরিহার করতে চায়। এবং অশ্লীল ও বেহায়াপনার দেশ ভ্রমণ করা থেকে তওবা করতে চায়; কিন্তু না; তার কিছু বন্ধু-বান্ধব যারা ঐ অন্যায় কাজগুলোকে তার সামনে স্বাভাবিক ও সুন্দর করে পেশ করে। তারা ভালো এবং সৎতার ব্যাপারে তাকে তীব্র-সন্ত্রস্ত করে তোলে। তারা তাকে বলে, দেখো! তুমি যদি পর্দা করো তাহলে তোমাকে ভাল দেখাবে না; কখনো দেখাবে, তোমাকে আকর্ষণীয় ও চিত্তগ্রাহী মনে হবে না। তোমার বিয়ে হবে না; কুমারী থেকে যাবে। আর যুবককে বলে, দেখো! দাড়ি রাখলে তোমাকে স্মার্ট দেখাবে না; বিদঘুটে দেখাবে; মানুষ হাসবে। তাই আপনি দাড়ি ছাড়াই নামায রোযা করুন এবং এ জাতীয় আরো নানা কথা বলে তাকে ভালো কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। কখনও সুদ ছেড়ে দিতে চায়, সুদী কারবার থেকে বিরত থাকতে চায়; তখন তারা অভাবের ভয় দেখায়। কোনো যুবতী যখন নিজেকে পাক-পবিত্র রাখতে চায় তখন তারা দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং বলে, তুমি এটা না করলে দুঃখ-কষ্টে পড়বে; অনাহারে কাটাবে; সাবলম্বী হতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَقَيَّضْنَا لَهُمْ قُرَنَاءَ فَزَيَّنُوا لَهُمْ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خَاسِرِينَ

'আমি তোমাদের পিছনে সঙ্গী লাগিয়ে দিয়েছিলাম, অতঃপর সঙ্গীরা তাদের অগ্র-পশ্চাতের (খারাপ) আমল তাদের প্রতি শোভনীয় করে দিয়েছিলো। তাদের ব্যাপারেও শান্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তী জিন ও মানুষের উপর। নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত।' আজ আল্লাহ তাআলা এখানে বর্ণনা করছেন, তাদের কিছু সাথী-সঙ্গী আছে যারা পথভ্রষ্টতার দিকে ঠেলে দেয়। সুতরাং আমরা যেনো এমন সাথী-সঙ্গী থেকে সতর্ক থাকি যারা অন্যায় ও অনিষ্টতার হোতা। যেমন ছিলো আবু জাহেল, উমাইয়া ইবনে খালফ। মুসলিম নিজে অনিষ্টতার কারণ হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে, এবং এ ব্যাপারেও খুব সজাগ থাকবে যে, শয়তান যেনো তাকে তার মত শয়তান বানাতে না পারে। ফলে সে একজন মানুষ শয়তানে পরিণত হবে। আর শয়তান যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে তাকে নিয়ে খেলা করবে। যেমন জনৈক কবি বলেছেন, অর্থ : ‘আমি তো ইবলিসের একজন সৈনিক ছিলাম,এরপর সে আমাকে এ অবস্থায় পৌছিয়েছে। ফলে ইবলিস এখন আমার সৈন্য হয়ে গেছে’। কিছু মানুষের সাথে তো ইবলিস লেনদেন করে। নিজের বিষয়বস্তু তার কাছে শেয়ার করে। সে বলে, আমার কোনো কাজ আসলে আমরা মিলেমিশে তা সমাধান করে দেবো। পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেনো আমাদের সকলকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও অনিষ্ট-শক্তি থেকে রক্ষা করেন এবং তাঁর ইবাদত, আনুগত্য ও হেদায়েতের উপর রাখেন; আমিন।

টিকাঃ
১. সূরা গাশিয়া: ১৭
২. সূরা নাহল: ৫
১. সূরা আনফাল: ৩৬
১. সুরা ফুসসিলাত ২৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00