📄 আন্দালুসের ছাত্র
আমরা এখন আন্দালুসে ভ্রমণ করবো, বর্তমানের স্পেন নয়, হাজার বছর পূর্বের আন্দালুসে ভ্রমণ করবো, যখন সেখানে অনেক মসজিদ ছিলো এবং ছিলো অনেক মাদরাসা। মসজিদে মাসজিদে আলেমগণ দরস দিতেন এবং দূরদূরান্ত থেকে এসে অসংখ্য ইলম-পিপাসু ছাত্র সেখানে ভীড় জমাতো।
এখন আমরা আন্দালুসের এক আলিমের ঘটনা বর্ণনা করবো। তিনি কীভাবে ইলম অর্জন করেছেন? ইলমের জন্যে কোথায় কোথায় সফর করেছেন? এজন্যে কতটা কষ্ট ভোগ করেছেন? কী জন্য তিনি ইলম অর্জনের জন্যে ভিক্ষুকের পোশাক পরির্বতন করেছেন? কেনো আলেম- তালেবে ইলমের পোশাক পরিধান করেননি? কী জন্য তিনি সকাল-সন্ধ্যা দরজার সামনে এসে বলতো আল্লাহর জন্যে আমাকে কিছু সাহায্য করুন, আমাকে কিছু ভিক্ষা দিন, সে কি সত্যিই ভিক্ষুক ছিল? না লোকটি দরিদ্র বা ফকির ছিলো না; কিন্তু সে যার কাছে ইলম শিক্ষা করতো সে তাঁকে একটা শর্ত দিয়েছিলো যে, যদি তাঁর কাছ থেকে ইলম অর্জন করতে হয় তাহলে তাকে ভিক্ষুকের পোশাক পরিধান করতে হবে এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁর দরজায় এসে ভিক্ষা চাইতে হবে, আশ্চর্য ব্যাপার!! কেনো তিনি এমনটা করলেন? এখন আমি আপনাদের সামনে বিষয়্যাটি বিস্তারিত বর্ণনা করবো।
নাকি ইবনে যুযায়াদ রহিমাহুল্লাহ আন্দালুস থেকে সমুদ্রে ভ্রমণ করে আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছলেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে মক্কায় আসলেন, মক্কায় কিছু দিন কাটিয়ে সেখান থেকে বাগদাদের দিকে পথ ধরলেন। অবশেষে অনেক কষ্ট বাগেদাদে পৌঁছলেন। তার মনইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহকে দেখা ও তাঁর দরসে বসার জন্য অস্থির হয়ে ছিল; কিন্তু আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ তখন ফেতনার পরীক্ষায় কটু দিন কাটাচ্ছিলেন। অর্থাৎ খলকে কুরআনের ফেতনা। তিনি ফাতওয়া দিলেন- কুরআনকে মাখলুক বলা জায়েয নেই। কুরআন হল আল্লাহর কালাম আর আল্লাহর কালাম তাঁর সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারিমে বলেন:
إِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ
'আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দিবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে নিরাপদে স্থানে পৌঁছে দেবে। এর কারণ হল, এরা জ্ঞান রাখে না'।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরো স্পষ্ট করে বলেছেন:
وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَىٰ تَكْلِيمًا
'আর আল্লাহ মুসার সাথে সরাসরি কথোপকথন করেছেন।'
আর আল্লাহ তায়ালা নিজ সত্তার শানানুযায়ী কথা বলেন। আর কুরআন হল আল্লাহর কালাম যা তিনি আমাদের নিকট নাযিল করেছেন। সেখানে কিছু মানুষ ছিল যারা এটা অস্বীকার করতো। তারা বলত- কুরআন হল আল্লাহ তায়ালার মাখলুকের অন্তর্ভুক্ত (যা স্বয়ংসম্পূর্ণ)। অর্থাৎ কুরআন মাখলুক। আর সেই যুগটা ছিলো আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর যুগ। তিনি বলেন, কুরআনকে মাখলুক বলা জায়েয নেই। কুরআন আল্লাহর কালাম। তারা বলে না কুরআন মাখলুক (আর মাখলুক তথ্যসূচির সবকিছুই নশ্বর)। তিনি বলেন, না কুরআন আল্লাহর কালাম আর আল্লাহর কালাম কখনো মাখলুক হতে পারে না। এভাবে তাদের মাঝে বিশাল মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। তৎকালীন খলিফা ছিলো আল- মুতাসিম। তার একজন উজির ছিলো, নাম আহমাদ ইবনে আবু দাউদ; যে কুরআনকে মাখলুক বলার পক্ষ ছিলো। সে খলিফাকে নিজ ভ্রান্ত মতবাদ বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল। খলিফা মুতাসিম ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহকে নিজ মত পরিবর্তন করতে চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন; কিন্তু ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ ছিলেন অনড়, তিনি মরতেও রাজি আছেন কিন্তু তাঁর মতবাদ-বিশ্বাস থেকে সামান্যও সরতে রাজি নন। এরপর তাঁকে প্রহার করা হল, তারপর চল্লিশ মাস জেলে বন্দি করে রাখা হল। এসময় প্রতিদিন তাঁকে প্রহার করা হত। মুতাসিম একদিন জহ্লাদকে ডাকল এবং বললো, আমাকে তোমার দেবতা দেখাও, সেটা মজবুত না-কিছুদূর্ব আমি দেখবো। মুতাসিম বললো, তাকে আমার সামনে প্রহার করো, আমি দেখবো। তুমি কি তাকে প্রহার করো না জোরে? এরপর জহ্লাদ তাকে মুতাসিম ও মন্ত্রীদের সম্মুখে প্রহার করত।
তাঁকে প্রহার করাবার জেলের বন্দি করে রাখা হত। তখনকার জেল ছিলো খুবই সংকীর্ণ, আয়তনে ছোট, অন্ধকার; আলো বাতাস প্রবেশনোর কোনো ব্যবস্থা থাকত না। শুধু গোসলের জন্য কোনোরকমের পানির ব্যবস্থা থাকত না। আর তারা ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর অবস্থাকে আরো খারাপ ও শোচনীয় করে রেখেছিল, যাতে করে তিনি তাঁর মত থেকে সরে আসেন; কিন্তু ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ নিজ সিদ্ধান্তে পাহাড়ের মত অটল রইলেন। তিনি আপন মত থেকে চুল পরিমাণও নড়লেন না। এরপর যখন ওয়াসিক বিল্লাহ খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করল তখন তিনি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর উপর কিছুটা শিথিলতা করলেন। তিনি তাঁকে জেল থেকে বের করে গৃহবন্দি করে রাখলেন। মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করা, দরস প্রদান করা ও কোনো ইলমি মজলিসে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ করলেন; এমনকি কারো সাথে কথা বলাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো। কারো সাথে সাক্ষাতকারেও অনুমতি ছিলো না। তাঁর সাথে যে দেখা করতে আসতো বা কথা বলতে আসতো তাকে জেলে বন্দি করে রাখা হত।
আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ যখন গৃহবন্দি অবস্থায় তখন শায়খ নাকিব ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহ আন্দালুস থেকে মক্কা হয়ে বাগদাদ পৌঁছলেন। তিনি ছিলেন দরিদ্র; তাঁর কোনো বাহন ছিলো না, তিনি এই দীর্ঘ সফর পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন। তিনি বাগদাদে এসে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে মানুষদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। তারা তাকে বললো, তুমি এখন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ থেকে ইলম শিখতে পারবে না, এমনকি তাঁর সাথেও দেখতে পারবে না, কারণ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ এখন গৃহবন্দি, সেখান থেকে বের হওয়া বা কারো সাথে দেখা করা তাঁর জন্যে নিষিদ্ধ। অতঃপর নাকিব ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহ কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে মসজিদে প্রবেশ করলেন। মসজিদে তখন ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহিমাহুল্লাহ দরস প্রদান করছিলেন। ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহিমাহুল্লাহ নিজ যুগের একজন বড় ইমাম ও মুহাদ্দিস। নাকিব রহিমাহুল্লাহ তাঁর মজলিসে গেলেন এবং তাকে সালাম দিয়ে বললেন, শায়খ আমি আন্দালুস থেকে এসেছি। সুতরাং আপনাকে কিছু প্রশ্ন করার অনুমতি হয়তো আমার থাকবে। তিনি বললেন, ঠিক আছে আপনার প্রশ্ন করুন। ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. তখন দরস প্রদান করছিলেন, আশেপাশে অনেক ছাত্র। নাকিব রহিমাহুল্লাহ বললেন, আপনি অমুক রাবির ব্যাপারে কি বলেন? তিনি বললেন, সে সতাবাদী; কিন্তু অনেক বিষয়েই ভুলে যান; সুতরাং তুমি তার হাদিসের উপর ভরসা করতে পার না। এরপর অপর আরেকরজনের ব্যাপারে বললো, অমুক কেমন? তিনি বললেন সেও তাঁর মতই। এরপর বললো, হিশাম ইবনে আম্মার কেমন? তিনি বললেন, সে সিকা-নির্ভরযোগ্য, সতাবাদী এবং আস-সিকাফাতওকাফ সিকা অর্থাত্ তিনিও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। তখন তাঁর আশেপাশে ছাত্ররা বললো, আপনি তারাতারি করেন, এখানে আরো অনেক ছাত্র আছে এবং তাদের বেশ কিছু প্রশ্ন করার আছে। নাকিব ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম এবং বললাম, আমার আরেকরজন সম্পর্কে প্রশ্ন করার আছে।
হে ভাই! একবার করুণায় সেই মজলিসে দেখাও সেখানে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করো। নাকিব ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহ ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহিমাহুল্লাহর দরসের উপস্থিত। তাঁর সামনে অসংখ্য ছাত্র উপবিষ্ট। নাকিব ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহ তাঁর সামনে এসে স্পষ্ট করে বলেছে যে, সে অনেক দূর দেশ থেকে এসেছে। নাকিব রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি যখন দাঁড়ালাম এবং তাকে বললাম, আমার আরেকরজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার আছে। তিনি বললেন, কে সে?আমি বললাম আহমাদ ইবনে হাম্বল। তখন সে বললো, তুমি আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. সম্পর্কে আমার কাছে প্রশ্ন করছো?!! আরে আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর নিকট তো আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আমার কি সেই অধিকার আছে যে, আমি আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে বলবো সে সতাবাদী, তার হাদিস গ্রহণ করা যাবে!! বরং আমার সম্পর্কে আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ কে প্রশ্ন করা হবে! আমি একজন দুর্বল লোক। আমার ব্যাপারে যদি আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেন সে সতাবাদী, তার হাদিস গ্রহণ করা যায় তাহলে এটা তো আমার সৌভাগ্য ও খুশির বিষয়।
নাকিব রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি তখন সেখান থেকে উঠে সোজা আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর দরজায় এসে কড়া নাড়তে লাগলাম, তিনি ভিতর থেকে দরজা খুলে দিলেন। আমি তখন বললাম, আমি ইলম হাসিল করার জন্য এসেছি। তিনি বললেন, ঠিক আছে কিন্তু আমার অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চয় তোমার কাছে এরই মধ্যে সংবাদ পৌঁছেছে? আমি বললাম হ্যাঁ, পৌঁছেছে; কিন্তু আল্লাহর শপথ করে বলছি আমি অনেক দূর থেকে আপনার কাছে ইলম শিখার জন্য এসেছি। তিনি বললেন, কোথা থেকে এসেছো? আমি বললাম পশ্চিমা দেশ থেকে। তিনি বললেন আফ্রিকা? আমি বললাম, আরো দূর থেকে সমুদ্রের ওপারে আন্দালুস থেকে, সমুদ্র পার হয়ে আফ্রিকায় এসেছি, আফ্রিকা থেকে মক্কায়, অতঃপর মক্কা থেকে আপনার নিকট ইলম অর্জন করতে এসেছি। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই তোমার ইলম অর্জনের অধিকার রয়েছে; কিন্তু তুমি তো আমার অবস্থা দেখতে পাচ্ছো। সুতরাং আমি তোমাকে ইলম শেখাতে ও হাদিস বর্ণনা করতে পারছি না। আমি বললাম, আমি আপনার কাছ থেকে ইলম শিখবো, আমাকে আপনার ইলম শেখাতেই হবে। তিনি বললেন, ঠিক আছে আমি তোমাকে ইলম শিখাবো কিন্তু একটা শর্ত আছে আর তাহল তুমি প্রতিদিন আমার কাছে ফকির-বেশে আসবে। অতঃপর আমার দরজায় এসে ভিক্ষা চাওয়ায় ভান করে চিৎকার করতে থাকবে এবং বলবে আমাকে কিছু সাহায্য দান করুন, আমাকে কিছু খাবার দিন, অতঃপর আমি তোমাকে খাবার দিব এবং তোমার নিকট হাদিস বর্ণনা করবো আর তুমি তখন তা মুখস্থ করে নিবে।
আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ জানতেন যে, তাকে যেহেতু কথা বলতে ও হাদিস বর্ণনা করতে নিষেধ করা হয়েছে সুতরাং তাঁর আশেপাশে গোয়েন্দাও নিয়োগ করা হবে, যারা লক্ষ্য করবে যে, সে কারো সাথে কথা বলে কি-না, কারো নিকট হাদিস বর্ণনা করে কি-না? এবং সে ঘর থেকে বাইরে বের হয় কি-না? তিনি জানতেন যে, তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সুতরাং তিনি বললেন, তুমি প্রতিদিন ফকিরের বেশে আসবে। তোমার কাঁধে ফকিরের মত ব্যাগ ঝুলানো থাকবে, পোশাক থাকবে তাদের মত জীর্ণশীর্ণ এবং তুমি তাদের মতই সাহায্য চাইবে আর আমি তোমাকে খাবার দেওয়ার ও যখন অনুগ্রহ করে কখনো পাঁচটা শুকনো দশটা এভাবে সুযোগমত হাদিস শুনাবো; কিন্তু সাবধান! কেউ যেনো বুঝতে না পারে। আর একটি কথা তুমি অন্য কোনো ইলমের মজলিসে বসবে না। যাতে গোয়েন্দারা এই সন্দেহ পোষণ করতে না পারে যে, লোকটি দিনে ইয়াহইয়া ইবনে মাঈনের দরসে বসে আর মাগরিবের পর ফকিরের বেশে ঘুরে, নিশ্চয় এর মধ্যে কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। সুতরাং তুমি কোনো ইলমের মজলিসে বসবে না এবং তোমার থেকে যেনো কোনোভাবেই তাহলে ইলমের অবস্থা প্রকাশ না পায়। আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ ইলম হাসিলের জন্য তাঁকে এই পরিকল্পনা দিলেন। নাকিব ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহ কি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন? তিনি কি এই পরিকল্পনাটি আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর নিকট আসতে পেরেছেন? নাকিব তিনি গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়েছেন, অতঃপর তাঁর পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে?
নাকিব ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহ দেখলেন আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ থেকে ইলম হাসিলের অন্য এটা ব্যতীত অন্য কোনো পথ নেই। তাই তিনি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, হাতে লাঠি ও থালা নিয়ে জীর্ণশীর্ণ পোশাকে ফকিরের বেশে প্রতিদিন আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর নিকট আসতেন এবং বাড়ির বাড়িতে দাঁড়িয়ে ডাকতেন- আমাকে কিছু সাহায্য করুন, আমাকে কিছু খাবার দিন, উপর রহম করতেন। আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ তখন দরজা খুলে তাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে খাবার দিতেন এবং হাদিস বর্ণনা করতেন। তিনি চার-পাঁচটা হাদিস বর্ণনা করতেন আর নাকি রহিমাহুল্লাহ তখনই তা মুখস্থ করে নিতেন। লেখার মত কোনো সুযোগ ছিলো না। হাদিস মুখস্থ শেষ হলে সেখান থেকে বের হয়ে যেতেন। এই অবস্থায় অনেক দিন কেটে গেল। অতঃপর খলিফা ওয়াসিক আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহকে গৃহবন্দি থেকে মুক্তি দিল এবং তাঁর কাছে হাফিয়া পাঠাল। আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ তার হাদিয়া গ্রহণ করলেন না। বন্দি জীবন থেকে মুক্তির পর আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ আবারও দরস শুরু করলেন। নাকি ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহও তার দরসে উপস্থিত হতেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ তাঁকে চিনতেন এবং তাঁর কদর জানতেন। তিনি তো জানতেন এই ছেলেটি ইলম-পাগল, ইলমের জন্য প্রাণোৎসর্গকারী, তাই তিনি দরসে তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব ও বিশেষ মর্যাদা দিতেন।
একদিন ইমাম আহমদ রহিমাহুল্লাহ দেখলেন তাঁর প্রিয় ছাত্র নাকি দরসে উপস্থিত নেই। তখন তিনি অন্যান্য ছাত্রদেরকে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারা বললো, সে অসুস্থ। নাকি ইবনে মিখলাদ রহ. সত্যি অনেক অসুস্থ ছিলেন, তাই তিনি হোটেলের একটি কামরা ভাড়া করে সেখানে অবস্থান করছিলেন। নাকি রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি যখন অসুস্থ অবস্থায় হোটেলে অবস্থান করছিলাম তখন হঠাৎ একদিন হোটেলের ভিতর অনেক শোরগোল আওয়াজ শুনতে পেলাম। কেউ বলছে, হাঁ ইনি এসেছেন, তিনি এখানে আছেন, এই দিকে আছেন, এই তোমরা এমন কর ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের আওয়াজ। আমি কামরার ভিতর থেকে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না যে, বাহিরে কী হচ্ছে? তারা কাকে নিয়ে কথা বলছে, আর কে এসেছে? একটু পর দেখি আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ আমাকে দেখতে এসেছেন।
তিনি বলেন, আহমদ রহিমাহুল্লাহ আমাকে দেখতে এসেছেন এবং তাঁর সাথে অনেক ছাত্র এসেছে। তিনি কামরায় প্রবেশ করে আমার কাছে আসলেন এবং আমার মাথায় হাত রাখলেন আর ছাত্ররা এই দৃশ্য দেখছে এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহকে দেখে রোগী দেখবার সুন্নত ও আদব শিখে নিচ্ছে। ইবনে জাওযি রহিমাহুল্লাহ বলেন, আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর দরসে পনের হাজার ছাত্র উপস্থিত হত। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজার হাদিস লিখতো আর দশ হাজার তাঁর নিকট থেকে উসুল-পদ্ধতি শিখত। অর্থাৎ কীভাবে হাদিস বর্ণনা করতে হয়, কীভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, তারা তাঁর আখলাক, চলাফেরা দেখতো ও অনুসরণ করার চেষ্টা করতো। তারা তাঁর হাদিসের হাফিজ ছিল। নাকি ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আহমদ রহিমাহুল্লাহ আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, তুমি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ কর এবং সাওয়াবের আশা কর, হয়তো আল্লাহ তাআলা তোমাকে অনেক সাওয়াব দান করবেন। তিনি আমার সাথে কথা বললেন আর ছাত্ররা সবকিছু লিখে রাখল। তিনি চলে যাওয়ার পর হোটেলের মালিক আমার কাছে আসল এবং আমাকে বললো, আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক কী? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ তাঁর সাথে আমার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই; কিন্তু আমি তাঁর একজন ছাত্র। তিনি আমাকে অনেক মুহাব্বত করেন। হোটেলের মালিক বললো, তাহলে আপনি আজ থেকে আমার হোটেলে ফ্রি থাকবেন। এরপর একজন আমার নিকট বিছানা নিয়ে এলো, একজন খাবার নিয়ে এলো, একজন পানি নিয়ে আসলো। আল্লাহর শপথ, এরপর থেকে তারা আমার পরিবারের চেয়েবেশি সেবা-যত্ন করতে লাগল। আমি যদি আমার পরিবারের নিকটও থাকতাম তারা আমাকে নিয়ে এতটা ব্যস্ত হতো না। হ্যাঁ এটাই হল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর মর্যাদা আর এই হল তাঁর কাছে ইলম অর্জনকারী ইবনে মাখলাদ রহিমাহুল্লাহর মর্যাদা।
আমাদের সালাফগণ ইলম অর্জনের পথে সব ধরনের কষ্ট ও ক্লান্তি হাসিমুখে মেনে নিতেন। আর মানুষও তালেবে ইলমের যথাযথ মর্যাদা ও কদর করতো; কিন্তু বর্তমানে সমস্যা হল অনেক মানুষ তালেবে ইলমের ইলম অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং শরয়ি ইলম অর্জন করার ব্যাপারে তাদের নিরুৎসাহিত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলেছেন বিষয়টি যেনো ঠিক তেমনই হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'নিশ্চয় কিয়ামতের পূর্বে এমন দিন আসবে যখন ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে এবং জাহালত (মূর্খতা) নামিয়ে দেওয়া হবে।'
বুখারীতে হাদিসটি এভাবে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'নিশ্চয় কিয়ামতের পূর্বে এমন দিন আসবে যখন ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে এবং জাহালত (মূর্খতা) ছাড়িয়ে দেওয়া হবে।'
অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে মানুষের মধ্যে জাহালত ছড়িয়ে যাবে। এখন তো মানুষও মনুষ্যমন বিষয়ে প্রশ্ন করে যা শুনে আশ্চর্য হতে হয় যে, এমন বিষয়ও কারো অজানা থাকতে পারে? তুমি দেখবে যে, তোমাকে তাহীরাত বা ওযুর মাসআলা জিজ্ঞেস করছে অথচ সে একজন বয়স্ক লোক, এই মাসআলাগুলো তার অনেকেই জানা থাকা দরকার ছিল। তোমাকে সালাতের এমন একটা মাসআলা জিজ্ঞেস করবে যে, তুমি আশ্চর্য হয়ে তাকে বলবে, আরে ভাই আপনার চল্লিশ বছর হয়ে গেল এখনো এই মাসআলাটা জানেন না, এটা জানেন না যে, সালাতে এই বিষয়টা ভুল, এটা সুন্নত আর এটা সঠিক!!
আর আফসোসের সাথে বলতে হয়, বর্তমানে মানুষ ইলমে শরয়ি থেকে সম্পূর্ণভাবে বিমুখ থাকছে। বর্তমানে দীনের ইলম ব্যতীত মানুষকে তুমি অনাবশ্যক বিষয়ে দক্ষ দেখতে পাবে। তারা কম্পিউটার শিখবে এবং তার খুঁটিনাটি সব বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করবে। তারা গাড়ি চালানো শিখবে ও তার অন্যান্য সব বিষয়ে সম্পর্কে জানে। মোবাইল সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা তোমার পাশের কাউকে জিজ্ঞেস করলে সে তোমাকে এর সমাধান দিবে। অতঃপর তুমি যদি তাকে বল মা-শা-আল্লাহ! তোমার তো দেখছি অনেক জ্ঞান। তুমি কম্পিউটারের সব বিষয় সম্পর্কে জান, মোবাইলের সব বিষয় সম্পর্কে জান। আচ্ছা তুমি কি 'আহালুস সামাদ'-এর অর্থ জান? তুমি কি 'ফাসিকিন ইয়া ওয়াফার'-এর অর্থ জান? তুমি কি জানো চার রাকাত বিশিষ্ট সালাতে কেউ যদি শেষ রাকাতে না বসে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে সে কী করবে? সাহু সিজদা কখন দিতে হয়? সালামের আগে না পরে? তুমি দেখবে সে বলছে আমি জানি না!!
আমাদের সালাফদের নিকট ইলম অর্জন এত সহজ ছিল না, ইলম অর্জন ছিল অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তা সত্ত্বেও তারা ইলম অর্জন করেছেন। তারা ইলমের জন্য সারা দুনিয়া সফর করেছেন। অতঃপর ইলমের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হয়েছেন। তাঁরা ইলম অর্জনের জন্য দীর্ঘপথ সফর করতেন, অনেক মরুভূমি ও উপত্যকা পাড়ি দিতেন। কখনো কখনো মরুভূমিতে পথ হারিয়ে এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করতেন। কখনো ঝাণ্ডাবিরে যমিনের উপর পড়ে যেতেন। কেউ কেউ তো ইলম অর্জনের জন্য বের হয়ে পথিমধ্যেই মৃত্যুবরণ করতেন। এ বিষয়ে তো একটি কিতাবই রচিত হয়েছে, “আর রিহলাতু ফি তালালিবিল হাদিস ও ফি তালালিবিল ইলম” তাঁরা এটাকে কোনো সমস্যাই মনে করেননি বরং তাঁরা ইলম অর্জনের জন্য নিজের সবকিছুই বিলিয়ে দিতেন।
বর্তমানে আমাদের জন্য ইলম অর্জন করা অনেক সহজ। ইলমে শরয়ি অর্জন করা আরো বেশি সহজ। বর্তমানে অনেক কম দামে কিতাব পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো এগুলো ফ্রি বিতরণ করা হয়। ইন্টারনেটে খুব সহজে দীনী বই পাওয়া যায়। অনেক লাইব্রেরি রয়েছে। অনেক এলাকার পাবলিক পাঠাগার আছে। মানুষ চাইলে খুব সহজেই ইলম অর্জন করতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে ইলম শিক্ষার মজলিস হয়, ইলম শিক্ষার কোর্স হয়। এর মাধ্যমে মানুষ খুব সহজে ইলম অর্জন করতে পারে। মোটকথা বর্তমানে ইলম অর্জন না করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা নেই, কোনো প্রতিবন্ধকতা বা ওজর নেই। হ্যাঁ এটা পূর্বে ছিলো; কিন্তু এখন নেই, কারণ পূর্বে তারা অনেকেই লিখতে জানতো না, তাদের কাছে ইলম অর্জনের জন্য কিতাবও ছিলো না; কিন্তু বর্তমানে বিষয়টি অনেক সহজ হয়েছে, এর চেয়ে আর সহজ হয় না; কিন্তু মানুষ এখন ইলম থেকে বিমুখ থাকছে। বাবারা মায়েদেরকে শরয়ি ইলম শিখাচ্ছে না, মায়েরা ছেলে-মেয়েদেরকে ইলম দীন শিখার উপর উদ্বুদ্ধ করছে না।
একটি মজার ঘটনা বলে আজকের আলোচনা শেষ করছি। ঘটনাটি ঘটেছিলো আ'মাশ রহিমাহুল্লাহ ও তাঁর এক ছাত্রের মধ্যে। আ'মাশ রহিমাহুল্লাহর নিকট দূর দেশ থেকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এক ছাত্র হাদিস শিখার জন্য আসলো। সে আ'মাশ রহিমাহুল্লাহর সাথে মসজিদে মাগরিবের সালাত আদায় করল, অতঃপর দরসে বসার ইচ্ছা করল। তখন আ'মাশ রহিমাহুল্লাহর ছাত্র তাঁকে বললো, আজ দরস হবে না। সে বললো, কেনো? আমি আমার পরিবার পরিজন ছেড়ে এত দূর দেশ থেকে এসেছি অথচ তিনি হাদিস বর্ণনা করবে না, আজ তাঁর দরস হবে না এর কারণ কী? তাঁরা বললো, আজ শায়েখ অত্যন্ত রাগান্বিত, আমরা তাঁকে এক অনুচিত প্রশ্ন করেছিলাম। ফলে সে কসম করেছে যে, আমাদেরকে এক মাস পর্যন্ত হাদিস বর্ণনা করবেন না। তখন সে বললো, এক মাস হাদিস ছড়া ছড়া এমনি এমনি কাটিয়ে দিতে হবে? তাঁরা বললো হাঁ, আর এই সময়ে হাদিস লিখে বাড়িতে গিয়ে নিজ নিজ পরিবারের সাথে দেখা করে আসতে চাচ্ছি। তিনি তো এক মাস পর্যন্ত হাদিস বর্ণনা করা বন্ধ রাখবেন। এই সুযোগে আমরা আমাদের পরিবারের নিকট যাব।
তখন ছেলেটি আ'মাশ রহ.-এর নিকট গেল। আ'মাশ রহিমাহুল্লাহ চোখে কম দেখতেন, বিশেষ করে রাতে চোখে দেখতেন না। ছেলেটি তাঁর নিকট গিয়ে বললো, শায়েখ! আমি অনেক দূর থেকে সফর করে এসেছি, সুতরাং আপনি আমার প্রতি একটু লক্ষ করুন। তখন তিনি বললেন, না এক মাস কোনো হাদিস বর্ণনা করা হবে না, আমি কসম করেছি। অতঃপর আ'মাশ রা. লাঠি ধরে তাঁর দিকে দাঁড়ালেন। ছেলেটি তখন তাঁকে বললো, শায়েখ আমি আপনাকে বাড়িতে পৌছে দিয়ে আসি। তিনি বললেন, ঠিক আছে আল, আল্লাহ তাআলা তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। ছেলেটি তাঁর হাত ধরে মসজিদে বের হল এবং তাঁকে নিয়ে বামে তাঁর বাড়ির দিকে না নিয়ে ডানে মরুভূমির দিকে নিয়ে গেল। আ'মাশ রহিমাহুল্লাহ ছেলেটির সাথে হাঁটছে কিন্তু তিনি জানেন না যে, ছেলেটি তাঁকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? অনেকক্ষণ হাঁটার পর আ'মাশ রহিমাহুল্লাহ ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা এখন কোথায় আসলাম? ছেলেটি তখন তাঁকে বললো, শায়েখ! আমরা এখন মরুভূমিতে আছি। আপনি যদি আমাকে এই মুহূর্তে একখণ্ড হাদিস বর্ণনা না করেন তাহলে আমি আপনাকে এই মরভূমির মধ্যে একা ফেলে চলে যাব। আপনি মরভূমিতে একা একা থাকলে মৃত্যুবরণ করবেন। অতঃপর আগামীকাল আমরা আপনাকে হয়তো কোনো বাঘ অথবা সাপের পেট থেকে উদ্ধার করব। আপনি কি আমাকে একশত হাদিস বর্ণনা করবেন না-কি আমি আপনাকে এই মরভূমিতে একা ফেলে চলে যাব? আমাশ রহিমাহুল্লাহ বললেন, তুমি আমার সাথে এমনটি করতে পার না, এটা হারাম। ছেলেটি তখন বললো; বরং আপনি নিজেই নিজের উপর হারাম। আমি এত দূর দেশ থেকে কত কষ্ট করে আসলাম, আমি তো আপনার সাথে কোনো সমস্যা করিনি। অথচ আপনি আমাকে হাদিস থেকে বঞ্চিত রাখছেন? আ’মাশ রহিমাহুল্লাহ যখন দেখলেন তিনি এখন অপারগ, হাদিস বর্ণনা ছাড়া তাঁর সামনে আর কোনো পথ নেই তখন বললেন, ঠিক আছে লিখো, আমি হাদিস বর্ণনা করছি। এরপর ছেলেটি লিখতে লাগল আর শায়খ আ’মাশ রহিমাহুল্লাহ হাদিস বর্ণনা করলেন। এরপর ছেলেটি কাগজগুলো সাথে নিয়ে শায়খের তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিতে গেলেন।
তাঁরা যখন শহরে প্রবেশ করল তখন ছেলেটি কাগজগুলো তার এক সাথীর কাছে দিয়ে দিল। অতঃপর শায়খের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল। তিনি যখন বাড়িতে পৌঁছালেন তখন বললেন, হে ছোকরা! তোমরা একে ধরো, এই ছেলেটি চোর, দেখো তার সাথে খাতা আছে। ছেলেটি তখন বললো, শায়খ! আমার কাছে কোনো খাতা নেই, আমি শহরে ঢুকেই তা এক সাথীর কাছে দিয়ে দিয়েছি। আ’মাশ রহিমাহুল্লাহ তখন বললেন, আমি তোমাকে যতগুলো হাদিস বর্ণনা করেছি তার সবগুলোই যাঈফ (দুর্বল)। ছেলেটি তখন বললো, শায়খ আপনি এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরব্যাপারে মিথ্যা কথা বর্ণনা করতে পারেন না। আ’মাশ রহিমাহুল্লাহ বললেন, হাঁ তুমি সত্য বলেছো; কিন্তু আমি এখন তোমাকে বলছি তুমি হাদিসগুলো মুছে ফেল, এগুলোই যাঈফ হাদিস। এরপর তিনি তাকে বললেন, এখন তোমার অন্তরও জ্বলতে থাক যেভাবে খানিক পূর্বে আমি কষ্ট পেয়েছি। বিভিন্ন কারণে তাঁরা ছাত্রদের সাথে কখনো কখনো কৌশল করতেন।
আল্লাহ তাআলার নিকট আমার জন্য এবং আপনাদের জন্য প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে উপকারী ইলম ও আমলে সালিহা (সৎকর্ম) করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১. সুরা তাওবাহ, আয়াত: ৬
২. সুরা নিসা, আয়াত : ১৬৪
📄 আমরা এবং পরিবেশ: কে কার পরিবর্তন করে?
প্রকৃতগতভাবেই মানুষ আশপাশের অবস্থা ও পরিবেশের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। সুতরাং যে জীবন ও জীবনের চলার পথ পরিবর্তন করতে চায় সে যেন তার চারপাশের অবস্থা ও পরিবেশ পরিবর্তন আনে। আমি যখন আমার সন্তানের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখি যা তার মধ্যে পূর্বে ছিলো না অথবা তার মধ্যে কোনো খারাপ অভ্যাস দেখতে পাই পূর্বে ছিলো না, তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কার সাথে চলাফেরা করো? তুমি কি নতুন কোনো বন্ধু গ্রহণ করেছ? অথবা তার কথা বলার মধ্যে অথবা ভাষার মধ্যে যদি কোনো পরিবর্তন দেখি তাহলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি নতুন কোনো বন্ধুর সাথে চলাফেরা শুরু করেছ? তোমার প্রতিষ্ঠানে কি অমুক অমুক অঞ্চলের কেউ ভর্তি হয়েছে? মানুষ স্বভাবগতভাবে তার চারপাশের অবস্থা ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়।
এখন আমরা উপত্যকায় বসবাসকারী এক বেদুইন কবির গল্প বলব, যে পূর্বে কখনো শহরে যায়নি এবং শহর দেখেনি। মরভূমিতে উঠা, দুম্বা আর ভেড়া-বকরি চড়িয়েই যার জীবন কেটেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই যার দেখা হত উঠ-দুম্বা আর ভেড়া-বকরির সাথে। যে এই বিশাল আকাশ, বিস্তৃত মরুভূমি, পাহাড়-পর্বত আর ঝর্ণা-প্রস্রবণ ব্যতীত কিছুই দেখেনি। শহরের পরিবেশ-পরিস্থিতি ও এর সভ্যতার সাথে তার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। আশপাশের পরিবেশ ও এর সভ্যতা-সংস্কৃতি অতিক্রম করে অন্য কিছু নিয়ে ভাবাটা মানুষের জন্যে অনেক কঠিন বিষয়; কখনো কখনো তা অসম্ভবও হয়ে উঠে। এই বেদুইন কবিও কথা বলতে পারে মরুভূমি অবস্থা নিয়ে, ঠান্ডা-গরম, ঝড়-বৃষ্টি নিয়ে; কিন্তু এর বাইরে তুমি তার থেকে কিছু আশা করতে পারো না। আমাদের আলোচ্য কবিও এই বাইরে নয়; কিন্তু এই কবি একদিন শহরে খলিফা মুতাওয়াক্কিলের নিকট গিয়ে একটি কবিতা আবৃত্তি করল আর তখনই খলিফা মুতাওয়াক্কিলের সাথে তার এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটল। সেই ঘটনাটিই আমাদের সামনের আলোচ্য বিষয়।
বেদুইন কবি আলি ইবনে হামাম তখন শুনেছে যে, খলিফা মুতাওয়াক্কিল কবিদের অনেক সম্মান করেন এবং তাদের হাদিয়া ও পুরস্কার দেন। তাই সে খলিফা মুতাওয়াক্কিলের নিকট গেল। সে খলিফার দরবারে গিয়ে দেখল সেখানে অনেক কবি খলিফার প্রশংসা করে কবিতা আবৃত্তি করছে। একজন কবিবায় বললে, হে আমিরুল মুমিনিন আপনার সুনাম ও সুখ্যাতি সূর্যের মত, এমন প্রশংসা শুনে মুতাওয়াক্কিল তাকে অনেক পুরস্কার দিল। এরপর আরেক কবি এসে বললে, আমিরুল মুমিনিন! আপনার অনুগ্রহ সুরাইয়া তারকার মত। মুতাওয়াক্কিল তাকেও পুরুস্কৃত করল। এভাবে একসময় বেদুইন কবি আলি ইবনে হামামের আবৃত্তির পালা এলো। তার তো কবিতা রচনার নির্দিষ্ট একটা সীমানা ছিলো,সে সীমানা কখনো অতিক্রম করতে পারেনি। সে বলল, হে খলিফা!’
وَأَنْتَ كَالْكَلْبِ فِي حِفْظِكَ لِلْوَدِّ كَالَيْسِ فِي قِرَاعِ الْخَطْبِ
أَنْتَ كَالدِّلْوِ لَا عَدِمَتْ دِلَاكَ كَثِيرًا كَدَلَائِلِ الذُّنُوبِ
‘বস্তুত রক্ষার ক্ষেত্রে আপনি কুকুরের ন্যায় এবং বিপদাপদ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে পুরুষ ছাগলের ন্যায়।’
‘আপনি দয়া ও মহানুভবতার ক্ষেত্রে বালতির মত, পানিতে পূর্ণ একজ বড় বালতি, যা থেকে কোনো বালতি খালি যায় না।’
কবিভার মধ্যে প্রথমে মুতাওয়াক্কিলকে কুকুর, তারপর ছাগল, এরপর বালতির সাথে তুলনা করা হয়েছে। মুতাওয়াক্কিল অত্যন্ত রাগী ও কঠোর স্বভাবের লোক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। কবির মুখে নিজেকে ছাগল-কুকুর আর বালতির সাথে তুলনা করতে শুনে তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন; রাগে তাঁর চোখ লাল হয়ে গেল। মুতাওয়াক্কিলকে রাগ হতে দেখে তাঁর আশপাশে থাকা মন্ত্রী ও সভাসদরা নিশ্চিতও ধরে নিল যে, এখনই এই কবির হত্যার আদেশ আসবে। তাই তারা পরিষদের কক্ষের ছিট থেকে বাঁচানোর জন্যে ওটিয়াকে দু’টু করে সরে গেল; কিন্তু আজ মুতাওয়াক্কিলের মধ্যে কিছুটা দয়া ও কোমলতা প্রকাশ পেল। আল্লাহ তাআলা তাকে কিছুটা সহানুভূতি দান করলেন। সে বুঝতে পারল যে, এই কবি গ্রাম থেকে আসা একজন অসহায় লোক। সে তার কবিতার মাধ্যমে তার প্রশংসাই করতে চেয়েছে। সে যে পরিবেশ থেকে এসেছে তা থেকে সে মুক্ত হতে পারেনি। তাই সে তাকে প্রশংসা করার ক্ষেত্রে কুকুর-ছাগল আর বালতির সাথে তুলনা করেছে। সুতরাং তার পরিবেশের পরিবর্তন দরকার। অতঃপর মুতাওয়াক্কিল কবির জন্যে প্রাসাদের একটি সুন্দর কামরায় থাকার ব্যবস্থা করার আদেশ দিল। কায়কেজন আধুনিক কবিকে তার সঙ্গ দেওয়ার, তার সাথে থাকার নির্দেশ দিল এবং প্রসাদের সবচেয়ে সুন্দরী দাসীকে তার জন্যে খাবার পরিবেশনের নির্দেশ দিল। এরপর মাত্র দুই কি তিন সপ্তাহ পর মুতাওয়াক্কিল কবি আলি ইবনে হামামকে তার নিকট উপস্থিত করার নির্দেশ দিল। কবিকে তার কাছে উপস্থিত করা হলে তিনি বললেন, তুমি এবার আমাকে নিয়ে কবিতা রচনা করো এবং আবৃত্তি করে আমাকে শুনাও।
এবার সে তার কবিতার মধ্যে মুতাওয়াক্কিলকে আধুনিক বিভিন্ন বিষয় এর সাথে তুলনা করতে বললো। তার এখনকার কবিতা শুণে দরবারের লোকেরা বুঝতে পারল যে, কেনো প্রথমবার মুতাওয়াক্কিল এই কবিকে হত্যার নির্দেশ দেয়নি। সে পরিবেশের কারণে বাদশার প্রশংসার ক্ষেত্রে কুকুর-ছাগল আর বালতির উপমা ব্যবহার করেছে। আর এখন সে উন্নত ও আধুনিক পরিবেশে কিছুদিন কাটানোর কারণে তার কবিতার রচ-রং পালটে গেছে, এখন তার কবিতার মধ্যে আধুনিক জিনিসের উপমা এসেছে।
তাহ! এখন আমরা বিষয়টি আমাদের বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখি। আমাদের চারপাশে কত খারাপ ছেলে রয়েছে আবার অনেক ভাল ছেলেও চারপাশে দেখতে পাও, যারা খারাপ তাদের অবশ্যই খারাপ বন্ধু-বান্ধব রয়েছে, আর ভালদের রয়েছে ভাল বন্ধু। সুতরাং যারা যারা ভাল তারা বন্ধুদের ভালোর দিকে নিয়ে গেছে, আর যারা খারাপ বন্ধুদের খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, অনেক মেয়ে যারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভাল ছিল, পর্দা করতো, খারাপ কোনো দিকে যেতো না, কোনো ছেলের সাথে হারাম সম্পর্ক করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকত; কিন্তু যখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল তখন থেকে চলাফেরা, কথাবার্তা ও আচার-আচরণে পরিবর্তন আসা শুরু করল। এর কারণ কী?
এর কারণ হল পরিবেশ। পরিবেশ ও সাহচর্যই তাকে ধীরেধীরে পরিবর্তন করে দিয়েছে। মানুষের জীবনে পরিবেশ ও সাহচর্য অনেক বড় প্রভাব ফেল। এর বিষয়টি আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا
‘সেদিন যালেম নিজ হস্তদ্বয় কামড়াতে কামড়াতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রাসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম।‘
কোন জিনিস তাকে রাসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতে বাধা দিয়েছে? তার মাঝে ও এর মাঝে কোনো জিনিস আড় দাঁড়িয়েছিল? আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا وَيْلَتَىٰ لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا
‘হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করতাম।‘
তাকে (অসৎ ব্যক্তিকে) বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে কী হবে? কুরআনের ভাষায় অনুন তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে কী ক্ষতি হবে?আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي ۗ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنْسَانِ خَذُولًا
‘আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিলো। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়।’
অর্থাৎ সত্যপথ থেকে আমি দূরে সরে গেছি। আর আমার দূরে সরে যাওয়ার কারণ হল সেই বন্ধু, যে আমার কাছে সত্য উপদেশ আসার পর আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। সে আমাকে কুরআনের মজলিসে যাওয়া থেকে বাধা দিয়েছিলো বা বিভ্রান্ত করেছিলো। সে আমাকে বলেছিল, সেখানে যাওয়ার দরকার নেই। বিভিন্ন ভাল চ্যানেল বা ভাল ব্লগ দেখতে নিষেধ করেছে। সে বলেছে, তুমি এটা দেখো না; সে বলেছে প্রতিদিন কুরআন তেলাওয়াতের কী দরকার? শুক্রবারে একদিন তেলাওয়াত করলেই তো যথেষ্ট। আমি সোম ও বৃহস্পতিবারের রোযা রাখতে চেয়েছি কিন্তু সে আমাকে বলেছে, রমযানের রোযা রাখাই যথেষ্ট। আমি ওয়ায় ও নসিহতের মজলিসে উপস্থিত হতে চেয়েছি, কিন্তু সে আমাকে বলেছে, সেখানে যাওয়ার দরকার নেই। আমি বলেছি, আমি অমুক মেয়ের সাথে সম্পর্ক করবো না বা তার সাথে সম্পর্ক ছেড়ে দিব; তখন সে বলেছে, আরে ভাই! এখন যৌবনকাল, যৌবনকে উপভোগ করো। এই বন্ধুই আমার কাছে উপদেশ আসার পর আমাকে উপদেশ গ্রহণ করা থেকে বাধা দিয়েছে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের আলোচনা করেছেন এবং তারা জান্নাতে নিয়ামত আর আনন্দ খুশির মধ্যেদুনিয়াতে থাকা তাদের ঐসকল বন্ধুদের কথা স্মরণ করবে যারা তাদের বিপথে নিতে চাইতো। আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে বলেন:
قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ إِنِّي كَانَ لِي قَرِينٌ
‘তাদের একজন বলবে, আমার এক সঙ্গী ছিলো।’
দুনিয়াতে আমার বন্ধু ছিল। আমি যখন মাদ্রাসায় বা কলেজে ছিলাম তখন আমার অনেক বন্ধু ছিলো, আমি যাদের সাথে একত্রে বসতাম, কথা বলতাম, কোথাও হাঁটতে যেতাম, এভাবে আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে; কিন্তু তাদের মধ্যে অমুক বন্ধু ছিলো খারাপ। সে বলত, কুরআনের ভাষায় শুনুন, সে কী বলতো, আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَقُولُونَ أَئِنَّا لَمَمِيتُونَ ۖ أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَئِنَّا لَمَبْعُوثُونَ
‘সে বলতো, তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আমরা যখন মরে যাবো এবং মাটি ও হাড্ডিতে পরিণত হবো, তখনও কি আমরা প্রতিফলপ্রাপ্ত হবো?’
অর্থাৎ তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আখেরাত ও কিয়ামত-দিবস বলতে কিছু আছে? সুতরাং জান্নাতে যাওয়ার পর বিশ্বাসী বন্ধু বলবে,
قَالَ هَلْ أَنْتُمْ مُطَّلِعُونَ
‘আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি তাকে উঁকি দিয়ে দেখতে চাও?’
সে জান্নাতে তার সেই বন্ধুকে খোঁজ করবে; কিন্তু সে তাকে জান্নাতে পাবে না। সুতরাং সে যেহেতু জান্নাত নেই তাই অবশ্যই সে জাহান্নামে থাকবে, কারণ মৃত্যুর পর জান্নাত ও জাহান্নাম ব্যতীত অন্য কোনো কিছু থাকবে না। সুতরাং সে তাকে জাহান্নামে পাবে।
فَاطَّلَعَ فَرَآهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ
‘অতঃপর সে উঁকি দিয়ে দেখবে এবং তাকে জাহান্নামের মাঝখানে দেখতে পাবে।’
সে যখন তাকে সেখানে দেখতে দেখতে বলবে,
قَالَ تَاللَّهِ إِنْ كِدْتَ لَتُرْدِينِ
‘সে বলবে, আল্লাহ কসম, তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিলে।’
আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিলে, আমাকে পথভ্রষ্ট করে প্রায় জাহান্নামেই নিয়ে গিয়েছিলে। এরপর বলবে,
وَلَوْلَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنْتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ فَمَا نَحْنُ بِمَيِّتِينَ إِلَّا مَوْتَتَنَا الْأُولَىٰ وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ لِمِثْلِ هَٰذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ
‘আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ না হলে আমিও গ্রেফতারকৃতদের সাথে উপস্থিত হতাম। এখন প্রথম মৃত্যু ছাড়া আমাদের আর মৃত্যু হবে না এবং আমরা শাস্তিপ্রাপ্তও হবো না। নিশ্চয় এটা এক মহাসফল্য। এমন সাফল্যের জন্য পরিশ্রমীদের পরিশ্রম করা উচিত।’
সুতরাং তুমি যদি নিজেকে পরিবর্তন করতে চাও তাহলে তোমার পরিবেশ পরিবর্তন কর। মুতাওয়াক্কিল আলীর ইবনে হায়ামের পরিবেশ পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। তাকে তার অবস্থান থেকে ভিন্ন এক স্থানে, ভিন্ন এক পরিবেশে রেখেছিলো। সুতরাং তুমিও নিজেকে পরিবর্তন করতে চাইলে ভিন্ন এক পরিবেশে নিয়ে যাও, যেখানে তুমি ভাল বন্ধু পাবে, ভাল সাথী পাবে। যাদের সাথে চলে তুমি নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবে।
একবার একটি বাজারে মাহফিল ছিলো, সেখানে লেকচার দেওয়ার পর এক যুবক এ বিষয়ে আমাকে অনেক অর্থপূর্ণএক একটি ঘটনা শুনিয়েছে। সেই ঘটনাটি কী? এবং তা থেকে আমরা কী শিক্ষাগ্ৰহণ করতে পারি?
আমি একবার উইসাগায়ের অঞ্চলে লেকচার দিতে গিয়েছিলাম। সেখানে এক বাজারের একটি মাহফিল। আমি লেকচার দিতে, লেকচারের বিষয়ও মোটামুটি এমনই ছিল [বিষয়টি ছিলো ‘তাআল্লুক্ব মাআল্লাহ’ তথা আল্লাহ তাআলার সাথে সুন্দর সম্পর্ক এবং এমন পরিবেশ থেকে দূরে থাকা যা আমাকে অকল্যাণের দিকে নিয়ে যেতে পারে’।
নিজেকে ভাল করার ইচ্ছা করলে অবশ্যই আমাকে খারাপ পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমন কেউ ধূমপান ছেড়ে দিতে চাইলে অবশ্যই তাকে ধূমপায়ীদের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে এবং তাদের সাথে সবধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, এমনকি মোবাইল থেকে তাদের নাম ও নাম্বার পর্যন্ত ডিলিট করতে হবে। অনুরূপভাবে একজন মাদকাসক্ত যদি নেশা ত্যাগ করতে চায় তাহলে অবশ্যই তাকে নেশাকারীদের সঙ্গ পরিপূর্ণভাবে ছেড়ে দিতে হবে, তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, কথাবার্তা সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে হবে। যে ব্যক্তি অশ্লীল ও নির্লজ্জ কাজ ছেড়ে দিতে চায় তার ব্যাপারেও একই কথা অর্থাৎ তাকে সকল খারাপ সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে এবং সকল অপরিচিত মেয়েদেরনাম্বার নামসহ মুছে দিতে হবে। অর্থাৎ মানুষ যখন ভাল হতে চাইবে, খারাপ কোনো কাজ বা খারাপ কোনো অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে চাইবে তাকে অবশ্যই খারাপ পরিবেশ ও খারাপ লোকদের সঙ্গ পরিত্যাগ করতে হবে। তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে।
আমার লেকচার শেষে এক যুবক এসে বললো, শায়খ আপনি বিষয়য়ে কথা বললেন আমার জীবনেও এমনই একটা ঘটনা ঘটেছে। আমি বললাম কী হয়েছিলো তোমার জীবনে? সে বলল, একবার আমার সাথীরা বললো, আমরা অমুক দেশে ঘুরতে যেতে চাই, তুমি কি আমাদের সাথে যাবে? দেশটি মুসলিম দেশ; কিন্তু সেখানে মদ-জুয়া আর অশ্লীলতার ভয়। আমি তাদের বললাম, আমি তোমাদের সাথে যেতে পারি কিন্তু কোনো খারাপ বা অশ্লীল জায়গায় যাওয়া যাবে না। তারা রাজি হল, আমরা সেখানে তিন-চার দিন ভালভাবেই কাটালাম, এরপর এক রাতে আমরা একটি স্থান পরিদর্শনে গেলাম যেখানে নেশা ও অশ্লীলতার ভরপুর ছিল। আমি তখন আমার সাথীদের বললাম, আমরা কিন্তু এই বিষয়ে অঙ্গীকার করে এসেছি যে, আমরা এধরনের জায়গায় প্রবেশ করবো না। এটা অশ্লীল কাজ, এটা হারাম। এটা সম্পূর্ণ-জায়েয ও গায়তএকটি কাজ, আল্লাহকে ভয় কর। শায়খ! তারা বলল, এসো যৌবনকালকে উপভোগ কর, একথা বলে তারা আমাকে খারাপ কাজের দিকে টেনে নিতে চেষ্টা করল। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আমাকে শক্তি দিলেন এবং আমারি ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি করে দিলেন। আমি তাদের কাছ থেকে পথ হয়ে হোটেলে চলে এলাম। দুই-তিন ঘণ্টা পর হোটেলের দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম, আমি আমার কামরার দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসে ছিলাম। আমি ওদের সাথে মেজাজী কণ্ঠও শুনতে পেলাম। আমার তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে, ওরা আজরাতো অশ্লীল ও ঘৃণভাবে কাটাতে চাচ্ছে।
এর দশ মিনিট পর ওদের একজন এসে আমার দরজায় নক করে বলতে লাগল, দরজা খুলো, আমাদের সাথে এসো জীবনটাকে উপভোগ কর। আমি বললাম, আমি আমার জীবনকে খুব ভালভাবে উপভোগ করছি। মদ পান না করলে, নারীর সাথে অবৈধ মেলামেশা না করলে কি জীবন উপভোগ করা যায় না? আলহামদুলিল্লাহ আমি আমার জীবনকে ভালভাবেই উপভোগ করছি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি দরজা খোলবো না এবং তোমাদের কাছে আসবো না। এরপর সে চলে গেল এবং দশ পনের মিনিট পর আবারও তারা দরজার কাছে এলো এবং দরজায় নক করে বলল, দরজা খোল; আমি বললাম, আমি কিছুতেই দরজা খুলব না। তখন তারা বলল, দরজা খুলে আমাদের মোবাইলের চার্জারটা দাও। আমি তাকিয়ে দেখলাম মোবাইলের চার্জার আমার কামরায়। আমি দরজা খুলে তাদের চার্জার দিতে গেলে তারা সকালে দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে দিল এবং একটা মেয়েকে আমার কামরার ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাহিরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। আমি ভিতর থেকে চিৎকার করতে লাগলাম কিন্তু তারা দরজা না খুলে বরং বাহির থেকে সংকেত হাসতে শুরু করলো। আমি ওদের পক্ষ থেকে সাহায্যের ব্যাপারে হতাশ হয়ে, ওদের সাহায্যের আশা ছেড়ে দিয়ে মেয়েটাকে ভয় দেখাতে লাগলাম; কিন্তু ওরা একা টাকা দিয়ে চুক্তি করেছিলো যেনো সে আমাকে খারাপ কাজ লিপু করে, তাই সে কোনোভাবেই আমার থেকে দূরে যেতে রাজি হচ্ছিল না, এদিকে বাইরে থেকে সকলেই হাসাহাসি করছিল। আমি এবার মেয়েটাকে বললাম, তুমি আমার সাথে খারাপ কাজ করতে চাও কিন্তু আমি তো এইভাবে আক্রান্ত, তখন মেয়েটিবললো, কত দিন থেকে তুমি এইভাবে আক্রান্ত? আমি বললাম, এক বছর; তখন সে বললো, সমস্যা নেই আমিও দুই বছর থেকে এইভাবে আক্রান্ত।
শায়খ! এবার মেয়েটি বললো, আমরা উভয়ে যেহেতু এইভাবে আক্রান্ত সুতরাং এটা আমাদের বিশ্বের কোনো ক্ষতি করবে না। মেয়েটি যখন এই কথা বললো, আমি তখন চিৎকার দিয়ে আমার সাথীদের বললাম, তোমরা দরজা খুলো, এই মেয়ে এইভাবে আক্রান্ত। দরজা খুলো, এই মেয়ে এইভাবে আক্রান্ত। তখন তারা দ্রুত দরজা খুলে তাকে হোটেল তাড়িয়ে দিলো। তারা তাকে এইভাবে ভয়ে কামরা থেকে বের করে দিল কিন্তুআল্লাহকে ভয় করল না। তারপর ছেলেটি বলল, শায়খ! আমি তখন থেকে বিশ্বাস করে নিয়েছি যে, খারাপ লোকেরা কখনই চাইবে না যে, আপনি ভাল থাকেন বরং তারা সর্বদা এটাই চাইবে যে, আপনিও তাদের মত খারাপ কাজি হতে হন। তারা যদি এটা বলতো যে, মা-শা-আল্লাহ তুমি তো অনেক ভাল, কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত হও না। আমাদেরও খারাপ কাজ বর্জন করা উচিত। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি তিনি যেনো আমাদেরকে ভাল রাখেন এবং খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করেন। আমিন।
হে ভাই! সমস্যা হল, প্রতিটি যিনাকারিনী নারীই কামনা করে যে, পৃথিবীর সকল নারীই যেনো যিনাকারিনী হয়ে যায়। আমার সাথে যোগাযোগ করে অনেকেই হেদায়েতের দোয়া চায় এবং হেদায়েতের পথে চলার আশা ব্যক্ত করে। আমি তাদের বলি, তোমার এই আশা এবং আদাহে কিয়ামতের আশায় কোনোই কাজ নেই। যে খারাপ কাজ করে সে সেটাকে বৈধ মনে করে এবং সেটা চালিয়ে যায়। কোনো জিনিস শুধু মাত্র আশা-আকাঙ্ক্ষা দিয়ে অর্জন করা যায় না। কবির ভাষায়,
‘আশা-আকাঙ্ক্ষা দিয়ে উদ্দেশ্য অর্জন করা যায় না; বরং দুনিয়াকে গ্রহণ করতে হলে তাকে পরাজিত করতে হবে।’
মানুষ যখন সত্যি সত্যিই হেদায়াত কামনা করবে, অবশ্যই তাকে এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যে মানুষ কমলার চাষ লাগাবে সে সেখান থেকে কমলা পাবে,এখানে কলা বা আঙ্গুরের আশা করাটা হবেচ নিতান্ত বোকামি। অনুরূপভাবে যে খারাপ লোকদের সাথে চলাফেরা করে,নিজেদের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করে অতঃপর তার সাথীদের দিকে তাকিয়ে বলবে আল্লাহ! সে কত বড় হয়েছে, সে মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করেছে, আমার এই সাথী ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছে, অপরজন ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে! আর আমি এই অবস্থায় পড়ে আছি। আমরা বলি, তোমার অবস্থা তো এমনই হবে। তুমি খারাপ লোকদের সাথে চলে জীবনের মূল্যবান সময়টুকু নষ্ট করেছো। তাহলে তোমার অবস্থা এমন হবে না তো কেমন হবে?
আমি অনেকগুলো জেল পরিদর্শন করেছি এবং সেখানে অনেক ধূমপানকারী ও নেশাগ্রস্থদের সাথে সাক্ষাৎ করেছি, কথা বলেছি এবং তাদের সামনে বক্তব্য দিয়েছি। এমনকি অনেক ফাঁসির আসামীদের সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, তাদের সাথে আমার কথা হয়েছে। তাদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি যে, তাদের এই পরিবর্তন পরিবেশনের কারণেই হয়েছে; খুনি বা নেশাগ্রস্থ হয়েছে। কোনো খুনিই জন্মের সময় মায়ের পেট থেকে অস্ত্র নিয়ে আসেনি। অথবা পৃথিবীতো এসেছে সে অস্ত্র দেখেনি যে, সে জন্মের পর থেকেই খুনি হয়ে জন্মাবে। অনুরূপভাবে কোনো ধূমপানকারীও জন্মের সময় তার মায়ের পেট থেকে গাঁজা, হিরোইন ও ইয়াবা নিয়ে আসেনি; বরং অন্য আর দশটা সন্তানের মত তাদেরও নিষ্পাপ অবস্থায় জন্ম হয়েছে; কিন্তু পরিবেশ তার মধ্যে বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়েছে। সে যখন খারাপ পরিবেশে থেকেছে, খারাপ লোকদের সাথে মিশেছে তখন সে খারাপের দিকে পরিবর্তিত হয়েছে।
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ যখন জাহান্নামিদের অবস্থা সম্পর্কিত এই আয়াত তেলাওয়াত করতেন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَمَا لَنَا مِن شَافِعِينَ ﴿ۙ وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٍ ﴾ۙ فَلَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَكُونَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ ﴿ۚ أُوْلَٰئِكَ مِنَ ٱلْمُجْرِمِينَ ﴾ۙ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً ۚ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُم مُّؤْمِنِينَ ﴿ۚ وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلرَّحِيمُ ﴾
‘আমাদের কোনো সুপারিশকারী নেই এবং কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধুও নেই। হায়, কোনোক্রমে আমরা পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ পেতাম! তাহলে আমরা মুমিন হয়ে যেতাম। যখন যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা যেভাবে তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন সেইভাবেই তিনি তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন, আপনার পালনকর্তা প্রবল পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু।’
হাসান বসরি রহ. যখন এই আয়াত তেলাওয়াত করেন তখন তিনি বলেন তোমরা দুনিয়াতে বেশি বেশি নেক লোকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করো। তোমরা যদি তাঁদের সাথে বন্ধুত্ব করতে না পারো বা না চাও তাহলে অন্ততপক্ষে তোমরা তাঁদের সাথে পরিচিত হও। যেমন তুমি কোনো মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে বন্ধুত্ব করো না, হাফেযে কুরআনের সাথে বন্ধুত্ব করো না, তালেবে ইলমের সাথে বন্ধুত্ব করো না তাহলে দেখলে সে যেনো এমন হয় যে, তুমি তাঁদের সাথে পরিচিত হবে, সে তোমার নাম জানে এবং তুমিও তাঁর নাম জানো। এটা শর্ত নয় যে, তাঁর সাথে প্রতিদিন আমরা দেখা-সাক্ষাৎ হবে বরং তাঁর সাথে দুই সপ্তাহে একবার দেখা করবে। তাও না পারলে সে যেনো আমাকে চিনে, আমার নাম জানে, আমি যখন তাঁর কাছে যাই সে যেনো আমার নাম নিয়ে বলতে পারে হে অমুক! কেমন আছেন? অভিনন্দন তোমাকে।
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা দুনিয়াতে সৎ ও নেককার লোকদের সাথে বেশি বেশি বন্ধুত্ব করো,কারণ কিয়ামতের দিন সৎ ও নেককার বন্ধু তোমার উপকারে আসবে। লোকেরা তাঁকে প্রশ্ন করল, কীভাবে? তিনি বলেন, জাহান্নামিদের জন্য নবি-রাসুলগণ, শহিদগণ এবং ফেরেশতাগণ শাফায়াত করবেন। আর জান্নাতিরা তাঁদের নিচে আলোচনা করবে। যেমন এক জান্নাতি বলবে, আমার অমুক বন্ধুর কী হয়েছে? জান্নাতি বন্ধু যখন দুনিয়াতে থাকা তার বন্ধুকে জান্নাতে দেখতে না পাবে। অথচ সে কাফেরও ছিলো না, সে মুমিন ছিলো কিন্তু কখনো কখনো গুনাহে লিপ্ত হত। সে বলবে, আমার অমুক বন্ধুর কী হয়েছে? সে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, অতঃপর যখন বলা হবে যে, তাকে তো জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে, তখন মুমিন বন্ধু বলবে, হে আমার রবঅমুক বন্ধুকে ছাড়া জান্নাতে আমার স্বাদ পূর্ণ হবে না। তখন আল্লাহ তাআলা আদেশ দিবেন আর তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। তখন জাহান্নামীরা একে অপরকে জিজ্ঞেস করবে, তার জন্য কে শাফায়াত করল? কোনো নবি কি তার জন্য শাফায়াত করেছে? বলা হবে, না; কোনো শহিদ? বলা হবে, না; তাহলে সে কি তার নেক আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে? বলা হবে, না; তাহলে কে তার জন্য শাফায়াত করল? তখন বলা হবে, তার অমুক বন্ধু তার জন্য শাফায়াত করেছে। আর তখন জাহান্নামিরা বলবে:
فَمَا لَنَا مِن شَافِعِينَ ﴿ۙ وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٍ ﴾ۙ فَلَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَكُونَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ ﴾
‘আমাদের কোনো সুপারিশকারী নেই এবং কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধুও নেই। হায়, যদি কোনক্রপে আমরা পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ পেতাম! তবে আমরা মুমিন হয়ে যেতাম।’
অর্থাত্ আমরা যদি দুনিয়ায় নেক ও সৎ বান্দাদের সাথে সম্পর্ক রাখতাম তাহলে আমরাও উত্তম লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম এবং তাদের সাথে জান্নাতেও থাকতে পারতাম।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে নেককার লোকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করার তাওফিক দান করুন এবং আমরা এতক্ষণ যা কিছু আলোচনা করলাম তার উপর আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১. সূরা ফুরকান, আয়াত: ২৭
২. সূরা ফুরকান, আয়াত: ২৮
১. সূরা ফুরকান, আয়াত : ২৮
২. সূরা সাফফাত, আয়াত : ৫১
১. সূরা সাফফাত, আয়াত : ৫১-৫৩
২. সূরা সাফফات, আয়াত : ৫৪
৩. সূরা সাফফাত, আয়াত : ৫৫
১. সূরা সাফফাত, আয়াত : ৫৬
২. সূরা সাফফات, আয়াত : ৫৭-৬১
১. সূরা আশ-শুআরা, আয়াত: ১০০-১০৩
১. সূরা শু'আরা, আয়াত: ১০০-১০২
২. সূরা আশ-শুআরা, আয়াত: ১০০-১০৩
📄 জান্নাতি নারীদের সর্দার
আমরা এখন কথা বলবো জান্নাতি নারীদের সর্দার ফাতেমাতুয যাহরা রা. সম্পর্কে। ফাতেমা রা. হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও শ্রেষ্ঠতম মানবী খাদিজা রা.-এর কন্যা (খাদিজা রা. হলেন নারী ও পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারিণী এবং ইসলামের জন্য সর্বপ্রথম অর্থব্যয়কারিণী)। এখন আমরা ফাতেমা রা. সম্পর্কে কথা বলবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ফাতেমা রা. এর সাথেথে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আলোচনা করবো। এর মাধ্যমে সকলে বাবা জানতো পারবে যে, মেয়েদের সাথে তাদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত এবং মেয়েরা জানতেও পারবে যে, বাবাদের সাথে তাদের আচরণ-উচ্চারণ কেমন হওয়া উচিত।
ফাতেমা রা. হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা, জান্নাতের সর্দার হাসান ও হুসাইন রা.-এর মা, ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি হায়দার রা.-এর স্ত্রী এবং তিনি জান্নাতি নারীদের সম্রাজ্ঞী। ফাতেমা রা. নারী ও পুরুষদের মধ্যে চেহারা ও চরিত্রে নবি কারিম রা.-এর সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ দিকের ঘটনা। ফাতেমা রা. একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন। যখন আসতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসতেন এবং তাঁকে নিজের ডান পাশে অথবা বাম পাশে বসাতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও যখন ফাতেমা রা.-এর নিকট যেতেন তখন তিনি এগিয়ে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং নিজ আসনে তাঁকে বসাতেন; কিন্তু এবার যখন ফাতেমা রা. আসলেন তিনি এগিয়ে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন না, কারণ এখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ সময়, তিনি শয্যাশায়ী। ফাতেমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে বসলেন। আয়েশা রা. বলেন, ফাতেমা রা. আমাদের নিকট আসলেন, তাঁর হাঁটা ছিলো রাসূলুল্লাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইঁটার মত; কিন্তু এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন না, কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে বসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মেয়ে আমার! অভিনন্দন তোমাকে, তোমার আগমন শুভ হোক! এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর কানে কানে কী যেনো বললেন, আর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তিনি যখন কাঁদলেন তাঁর কানে আরো কিছু বললেন আর তিনি হেসে দিলেন। আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এর চেয়ে আশ্চর্যজনক আর কিছুই দেখিনি যে, প্রথমে কাঁদলেন এরপর ততক্ষণাৎ আবার হাসলেন। আমি ফাতেমা রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, হে ফাতেমা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে কী বলেছেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা গোপন রেখেছেন আমি তা প্রকাশ করবো না। আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর একদিন আমি ফাতেমা রা.কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন আপনাকে কী বলেছিলেন? তখন তিনি আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন আমাকে বলেছিলেন, হে মেয়ে! জিবরাঈল আ. প্রতি বছর একবার করে আমার সাথে কুরআন দাওর তথা পুনরাবৃত্তি করতেন; কিন্তু এবছর তিনি আমার সাথে দুইবার কুরআন দাওর করেছেন, তাই আমার মনে হচ্ছে আমার অন্তিম মুহূর্ত সন্নিকট। ফাতেমা রা. বলেন, একথা শুনে আমি কেঁদে দেই। এরপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি জান্নাতি নারীদের সর্দারণী হবে? ফাতেমা রা. বলেন, একথা শুনে আমি হেসে দেই। এটাই আমার সুসংবাদ ও হাসির কারণ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর প্রতি অনেক বেশি লক্ষ রাখতেন, এমনকি আলি রা.-এর সাথে বিয়ের পরও তাঁর খোঁজ-খবর নিতেন। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক যুদ্ধ বন্দি নিয়ে আসা হল। আলি রা. তখন ফাতেমা রা. কে বললেন, একা একা বাড়ির সকল কাজ করতে কি তোমার ক্লান্তি লাগে না? বিয়ের পর থেকে বাড়ির সকল কাজ তিনি একাই করতেন এবং এতে তাঁর অনেক কষ্ট হতো, তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। আগেকার মেয়েরা বর্তমানের মেয়েদের মত এত আরাম-আয়েশে থাকত না। তাদের কূপ থেকে পানি আনতে হত, চাকি ঘুরিয়ে আটা পিষতে হত, উট-ঘোড়ার খাবার দিতে হত, এছাড়াও বাড়ির সকল কাজ নিজেদেরই করতে হত। এখনকার মত তাদের সামনে প্রস্তুতকৃত আটা আসতো না, কাপড় ধোয়ার জন্যে ওয়াশিং মেশিন ছিলো না, কল ঘুরালেই পানি বেরোতো না। বরং তারা অনেক পরিশ্রম করতেন, দূর থেকে পানি আনতেন, আটা পিশতেন, ঘোড়াকে খাবার খাওয়াতেন ইত্যাদি কঠিন ও কষ্টকর কাজগুলো তখন মেয়েরাই করতেন।
আলি রা. ফাতেমা রা.কে বললেন, ফাতেমা! বাড়ির এত কাজ করতে কি তোমার কষ্ট হয়? আটা পিশতে, ঘোড়ার খাবার দিতে, পানি আনতে, ঝাড়ু দিতে কি তোমার পক্ষে কষ্ট হয়ে যায়? ফাতেমা রা. বললেন, হ্যাঁ আমার কষ্ট হয়।
বিভিন্ন অঞ্চল বিজয় হওয়ার আগ পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটতো। তাঁদের খুব বেশি সম্পদ ছিলো না। তাঁরা সামান্য যা কিছু জমা করতেন জিহাদ ও যুদ্ধের সফরের জন্যে তা খরচ করতেন। এমনকি আলি রা. ও স্ত্রী ফাতেমা রা. একদিন অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লেন। আলি রা. তখন এক ইহুদির ক্ষেতে গেলেন এবং তাকে বললেন, আমি তোমার ক্ষেতে কাজ করতে চাই। সে বললো, কূপ থেকে পানি উঠাও। কূপের পাশে একটি খাউজ ছিলো, আলি রা. কূপ থেকে পানি উঠিয়ে খাউজে রাখতেন। তিনি তার সাথে প্রতি বালতি পানির বিনিময়ে একটি করে খেজুরের চুক্তি করলেন। ভাই! একবার চিন্তা কর, এক মুঠা শস্যের জন্যে তাদের কত কষ্ট করতে হয়েছে, বালতি দিয়ে গভীর কূপ থেকে পানি উঠিয়ে খাউজে রাখা। বিশেষ করে একজন ক্ষুধার্ত মানুষের জন্যে কতটা কষ্টের!! তা সত্ত্বেও তিনি পানি উঠিয়ে খাউজে রাখলেন। বারটি খেজুর নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং পরিবারকে বললেন, এই নাও তোমাদের খাবার।
আলি রা. ফাতেমা রা.কে বললেন, তোমার কি একজন খাদেমের প্রয়োজন? ফাতেমা রা. বললেন, হ্যাঁ। আলি রা. বললেন, তোমার বাবার কাছে আজ একজন বন্দি এসেছে, সুতরাং তুমি তাঁর কাছে গিয়ে একজন খাদেম চাও। তখন ফাতেমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন; কিন্তু তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তাই তিনি আয়েশা রা.-এর নিকট গেলেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে আয়েশা রা. তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, বাড়ির সকল কাজ একা করতে আমার কষ্ট হয়, আমি এতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তাই আমার একজন খাদেম প্রয়োজন। আয়েশা রা.-এর মনে ছিলো সদ্ব-পরিবার, তাতে ছিলো কোনো হিংসা বা বিদ্বেষের লেশ। তিনি ফাতেমা রা.কে ভালবাসতেন, ফাতেমা রা.ও তাঁকে মুগ্ধকরত করতেন। কিছুক্ষণ পর ফাতেমা রা. চলে গেলেন। অতঃপর রাতের শেষ প্রহরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরলেন আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ফাতেমা রা. এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেনো এসেছিল? আয়েশা রা.-এর অন্তর ছিলো স্বচ্ছ, তাঁর অন্তরে কোনো ধরনের হিংসা ছিলো না, তিনি বিদ্বেষবশত এই সংবাদ লুকিয়ে রাখেননি বা বলেননি যে, আমিও তো বাড়ি কাজ করি, আমিও তো ক্লান্ত হই, আমারও একজন খাদেম প্রয়োজন। না তিনি এমনটি বলেননি বরং তিনি ফাতেমা রা.-এর জন্যে সুপারিশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ফাতেমা রা. বাড়ির সকল কাজ একা করে, বাড়ির কাজ করতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাঁর কষ্ট হয়, তাঁর একজন খাদেম প্রয়োজন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনই ফাতেমা রা.-এর বাড়িতে আসলেন এবং দরজায় আঘাত করে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি কীভাবে প্রবেশ করলেন? তিনি কি এসে নিজে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলেন? তিনি কি ফাতেমা রা.কে খাদেম দিয়েছিলেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর বাড়িতে এসে দরজায় আঘাত করে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ভিতরে ফাতেমা রা.-এর সাথে আলিও রা. ছিলেন। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি সামান্য অপেক্ষা করুন, আমরা যন্নটা একটু গুছিয়ে নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন; বরং তোমরা তোমাদের আপন অবস্থাতেই থাক, কারণ ভিতরে যারা আছেন একজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে আর অন্যজন মেয়ের জামাই, তাঁর চাচাত ভাই, তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, ছোটকাল থেকেই যাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তানদের মতই ছিলেন, আলি রা. বলেন, আমি এই ফাতেমা ও খাদিজা রা. নিজ বাড়িতে তাঁকে লালন-পালন করে বড় করেছেন তিনি তো তাঁর ছেলের মতই। তাই তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের আপন অবস্থাতেই থাক।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা.-এর পাশে বসলেন এবং তাঁকে বললেন, তুমি কি আমার কাছে গিয়েছিলে? ফাতেমা রা. বললেন, হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেনো গিয়েছিলে? তিনি বললেন, আমার একজন খাদেম প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি তোমাকে খাদেমের চেয়ে উত্তম কিছুর সন্ধান দিবো না? তিনি বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই দিবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা যখন ঘুমোতে যাবে তখন তেত্রিশবার তাসবিহ তথা 'সুবহানাল্লাহ' বলবে। তেত্রিশবার হামদ তথা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলবে এবং তেত্রিশবার তাকবির তথা 'আল্লাহু আকবার' বলবে। তিনি বলেন, এটা তোমাদের জন্যে একজন খাদেম থেকেও উত্তম। তখন আলি রা. ও ফাতেমা রা. চোখে-চোখে তাকালেন, অতঃপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! খাদেম? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খাদেমকে আমি আসহাবে সুফ্ফার জন্য দিয়েছি, ক্ষুধায় যাদের পেট আর পিঠ একাকার হয়ে আছে।
আসহাবে সুফ্ফা হল ঐসকল দরিদ্র সাহাবি যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করে নিজ পরিবার-পরিজন ছেড়ে চলে এসেছে; তাঁদের নিকট আর ফিরে যেতে পারেনি, কারণপরিবারের লোকেরা ছিলো কাফের এবং তাঁদেরকে আবারাও কুফরির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁদের উপর চাপাতো চরম নির্যাতন। অন্যদিকে মদিনাতেও এমন কোনো স্থান ছিলো না যেখানে তাঁরা থাকবে। মুসলিমরা তখন ছিলো অনেক দরিদ্র অবস্থায়। তাই তাঁরা মসজিদে থাকতেন এবং এই কাট কেটে বিক্রি করতেন অথবা ঐ ধরনের সাধারণ কাজ করে নিজের ক্ষুধা নিবারণ করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অথবা ছাতা বা শামিয়ানা টানিয়ে দিয়েছিলেন; তাঁরা যার নিচে থাকত। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি এই খাদেমদেরকে আসহাবে সুফ্ফার জন্য বিক্রি করবো এবং এর মূল্য আসহাবে সুফ্ফাকে দিবো। আলি রা. বলেন, আমি এই কথা জীবনে আর কখনও ভুলিনি।
ফাতেমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক প্রিয় ছিলেন। আর একারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রা.ও তাঁকে অত্যন্ত মুহব্বত করতেন, কারণ তিনি তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আবু বকর রা. নিজ সন্তানদের চেয়েও ফাতেমা রা.কে বেশি ভালবাসতেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নিশ্চয় নবি-রাসূলগণ মিরাস হিসেবে কোনো সম্পদ রেখে যান না আমরা যে সম্পদ রেখে যাই তা হল সাদকা।
নবি-রাসূলগণ যেনো সাধারণ মানুষের মত দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত না পড়ে এবং সম্পদ সমানয়াবীয় গুণ যেনো তাঁদের মধ্যে প্রবেশ না করে তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁদের জন্যে শরয়ী বিধান হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তাঁরা যে সম্পদ রেখে যাবে তা मुसलमानों জনসদকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কোনো সম্পদ রেখে যাননি এবং তাঁর পূর্বের কোনো নবি-রাসূলও মিরাস হিসেবে কোনো সম্পদ রেখে যাননি। এমনকি দাউদ আ. যিনি ছিলেন বাদশাহ, তিনিও সুলাইমান আ.-এর জন্যে মিরাস হিসেবে কোনো সম্পদ রেখে যাননি, তিনি তাঁর জন্যে মিরাস হিসেবে নবুয়ত রেখে গেছেন। অনুরূপভাবে যাকারিয়া আ.ও কোনো সম্পদ মিরাস হিসেবে রেখে যাননি, ইরশাদ হয়েছে:
وَاِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَّرَائِي وَكَانَتِ امْرَاَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَّدُنْكَ وَلِيًّا ۙ يَّرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ اٰلِ يَعْقُوْبَ ۠ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا
‘আমি ভয় করি আমার পর আমার স্বগোত্রকে আর আমার স্ত্রী তো বন্যা; কাজেই আপনি নিজ-পক্ষ থেকে আমাকে একজন কর্তব্য পালনকারী দান করুন। সে ইয়াকুব বংশের আমার স্থলাভিষিক্ত হবে। হে আমার পালনকর্তা! তাঁকে সজাগকারী করুন।’
যাকারিয়া আ. ধনী ছিলেন না, তাঁর নিকট অনেক সম্পদ ছিলো না। তা সত্ত্বেও তিনি বলেছেন, হে আল্লাহ! আমি একজন পুত্রসন্তান চাই, যে আমার ওয়ারিস হবে। তাঁর যেহেতু সম্পদ ছিলো না, তাহলে তিনি কিসের ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে যেতে চান? তিনি ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হিসেবে নবুওয়ত রেখে যেতে চান, কারণ আম্বিয়া আ. যে সম্পদ রেখে যান তা সদকা। আর তাঁরা পরবর্তী্দের জন্য ইলম ও নবুওয়ত মীরাস হিসেবে রেখে যান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রা. ফাতেমা রা.-এর নিকট এসে বললেন, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে! আল্লাহ শপথ করে বলছি, নিশ্চয় তোমার সাথে সুসম্পর্ক রাখাকে আমি নিজ সন্তানদের সাথে সম্পর্ক রাখার চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করি। নিশ্চয় তুমি আমার কাছে আমার সন্তানদের চেয়েও বেশি প্রিয়। তুমি আমার সম্পদ থেকে যা খুশি নিয়ে নাও। তুমি কি আমার বাড়ি নিতে চাও, তাহলে নিয়ে নাও। আমার যদি উট, ভেড়া বা অন্য কোনো সম্পদ থাকে তাহলে তুমি তা নিতে চাইলেও নিয়ে নাও। তুমি আমার সম্পদ থেকে যা খুশি নিয়ে নাও। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারা এবং তোমাকে সম্পদ দিতে পারাকে আমি আমার সন্তানদের সম্পদ দেওয়ার চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করি; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ভূমি সদকা হিসেবে রেখে গেছেন। আমি এখন খলিফা, मुसलमानों তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছে। আল্লাহর শপথ, এই সম্পদ আমি আমার নিজের জন্যেও নিচ্ছি না বরং এটা মুসলমানের বাইতুল মালসম্পদ হিসেবে থাকবে। অতঃপর ফাতেমা রা. খুশিমনে তা দিয়ে দিলেন। কেনো-ই বা খুশি খুশি হয়ে তা দিবেন না? তিনি যে রাসূল-কন্যা জান্নাতি নারীদের সরদার।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের ছয় মাস পর ফাতেমা রা.-এর ইন্তেকাল হয়। তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে অসুস্থতার সময় আবু বকর ও উমর রা. তাঁকে দেখতে ও অবস্থার খোঁজখবর নিতে আসেন। আলী রা. তাঁদের আগমনের কথা তাঁকে বললেন এবং তাঁদেরকে আসার অনুমতি দিতে বললে তিনি তাঁদের আসার অনুমতি দেন। আবু বকর ও উমর রা. ঘরে প্রবেশ করেন এবং ফাতেমা রা.-এর পাশে বসেন, ফাতেমা রা. তখন পূর্ব পর্দার সাথে ঘরে অবস্থান করছিলেন। অতঃপর তাঁরা ফাতেমা রা.-এর জন্যে দোয়া করেন এবং ফাতেমা রা.ও তাঁদের জন্য দোয়া করেন। তাঁরা সেখান থেকে চলে আসেন। ফাতেমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মায়ায় বড় হয়েছেন। তিনি ছিলেন স্বচ্ছ হৃদয় ও নিরাপদ অন্তরের অধিকারিণী। তিনি সর্বদা मुसलमानों কল্যাণ কামনা করতেন। কোনো সাহাবির প্রতি তাঁর মনে বিন্দু পরিমাণও হিংসা বা বিদ্বেষ ছিলো না।
বংশ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর উম্মাহাতুল মুমিনিন সাথে ফাতেমা রা.-এর সম্পর্ক ছিলো খুব সুন্দর ও নির্মল। আয়িশা রা.-এর সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিলো খুবই প্রশংসনীয়। হাফসা, সাওদা, যায়নাব রা.সহ উম্মুল মুমিনিন সকলের সাথেই তাঁর সম্পর্ক ছিলো অত্যন্ত সুন্দর ও চমৎকার। তিনি উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রা.-এর কন্যা ফাতেমা রা., যাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লালন-পালন করে বড় করেছেন। এরপর আলীর বরের বয়সে আলী রা.-এর সাথে বিয়ে হয়ে আলী রা.-এর দায়িত্ব চলে যান। তিনি হাসান ও হুসাইন রা.-এর মা। তিনি তাঁদেরকে পূর্ণ কল্যাণের উপর বড় করেছেন। এমনকি তিনি তো হাসান ও হুসাইন রা.কে সেদে নিয়ে বেশিরভাগ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কাটাতেন। ফাতেমা রা. বর্ণনা করেন কীভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন রা.-এর সাথে খেলা করতেন, তাদের আদর করতেন। ফাতেমা রা. যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উঠে এসে ফাতেমা রা.কে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং তাঁকে নিজের জান অথবা বাম পাশে বসাতেন। আর প্রকারান্তরে ফাতেমা রা. তাঁর সাথে ও তাঁর সন্তানদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিহার বিভিন্ন হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি খুবই আগ্রহ নিয়ে আনন্দচিত্তে এই হাদিসগুলো বর্ণনা করতেন। আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করি যে, যিনি যেন ফাতেমা রা.-এর প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং জান্নাতে তাঁর মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে দেন, এবং উম্মাহাতুল মুমিনিনসহ সকল সাহাবিদের প্রতিও সন্তুষ্ট হন এবং জান্নাতে তাঁদের মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে দেন এবং আমাদেরকেও তাঁদের সাথে জান্নাতে যাওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।
টিকাঃ
১. সূরা মারইয়াম, আয়াত : ৫-৬
📄 এক গুপ্তচরের গল্প
অন্যের গোপন বিষয় তালাশ করা বা গুপ্তচরবৃত্তি করা অনেক পুরনো রীতি। এক্ষেত্রে আরব-অনারব মুসলিম-অমুসলিম সকলেই সমান। বিভিন্ন জন বিভিন্ন অর্থবর্জনক পন্থা অবলম্বন করে অন্যের বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করে বা অন্যের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। কখনো কখনো এই গুপ্তচরবৃত্তিটা হয়ে থাকে অন্যের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য, কখনো শুধুমাত্র মজা বা ঠাট্টা করার জন্য, অন্য কী করে তা জানার জন্য। আবার কখনো কখনো গুপ্তচরবৃত্তি হয়ে থাকে অন্যের ক্ষতি করার জন্য। এখন আমরা খলিফা মু’তাদিদের এক গুপ্তচরের কাহিনী বলবো। এই ঘটনা বলার দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্যটা এটা জানানো যে, মানুষ কখনো কখনো অন্যের বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করে- শুধুমাত্র মজা করার জন্য। অথচ কোনো কারণ ছাড়া অন্যের বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা জায়েজ নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করতে নিষেধ করেছেন। কুরআনেও এ বিষয়ে সতর্কবাণী এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘তোমরা কারো ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করবে না এবং কারো গোপন বিষয়ে জানতেও চাইবে না।’
কারো অনুমতি ব্যতীত তার গোপন বিষয় জানতে চাওয়া হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘যে ব্যক্তি অনুমতি ব্যতীত কারো লেখা চিঠি দেখে তার জন্য এমন এমন শাস্তি রয়েছে।’ অথবা হাদিসে এভাবে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘অনুমতি ব্যতীত অন্যের লেখা চিঠি দেখা তোমাদের কারো জন্য জায়েয নেই।’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘তোমরা কারো ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করবে না এবং কারো গোপন বিষয়ে জানতেও চাইবে না।’
খলিফা মুতাদিদের কাসেম বিন আবদুল্লাহ নামক খুবই আস্থাভাজন একজন মন্ত্রী ছিল। সে দরবারের প্রতিটি কাজ খুবই বিশ্বস্ততার সাথে করতো, খলিফা এতে তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট ছিল, খলিফা তার বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয়েও এই উজিরের সাথে কথা বলতো। প্রতিটি মানুষেরই ব্যক্তিগত কিছু বিষয় থাকে যা সে অন্য কাউকে জানাতে চায় না। সে তার পরিবারের সাথে একান্তে অনেক সময় কাটায়, তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করে। এই বিষয়গুলো সে বাইরের কাউকেই জানাতে চায় না। মন্ত্রী কাসেমও নিজ পরিবারের সাথে একান্তে অনেক সময় কাটাতেন, তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করতেন, যা সে খলিফাকে জানাতেন না। এবং এটা জানানো তারও দায়িত্বের মধ্যেও ছিল না।
একদিন সকালে কাসেম যখন খলিফার দরবারে উপস্থিত হয়েছে, খলিফা তখন তাঁকে ডেকে বললো, কাসেম! গতকাল তুমি অমুক অমুকের সাথে বাড়িতে গিয়েছিলে, তখন আমাকে ডাকো নি কেন? একথা শুনে মন্ত্রী কাসেম অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে, খলিফা কীভাবে আমার ব্যক্তিগত বিষয় জানলেন। এটা তো একান্ত আমার পারিবারিক বিষয়। এটা তো খলিফার জানার কথা নয়। এসকল বিষয় ভেবে তার মন অনেক খারাপ হয়ে গেল; কিন্তু তিনি খলিফার সামনে মুচকি হেসে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন। অতঃপর বিষয়টি নিয়ে তাঁর একজন সচিবের সাথে পরামর্শ করলেন। সচিব তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করলো যে, সে বিষয়টি দেখবে।
পরদিন ভোরে এই সচিব কাসেম ইবন আবদুল্লাহর প্রাসাদের সামনে এসে অবস্থান করলো। সে এতটাই ভাবে এসে দেখেছে যে, তখন কাসেম বাড়ি থেকে বের হয়নি। সে বাড়ির সামনে এসে প্রহরীদের প্রতি লক্ষ্য করতে শুরু করলো। সে বলল, আমি প্রহরীদের প্রতি লক্ষ্য করছিলাম, এমন সময় এক পণ্ডিত শিক্ষক সেখানে উপস্থিত। আমি লক্ষ্য করলাম প্রহরীরা সকলে তাকে চিনে এবং সেও তাদের সাথে কথা বলছে ও হাসি-ঠাট্টা করছে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে পণ্ডিত লোকটি বললো, তোমরা কেমন আছ? তোমাদের মনিব কাসেম কেমন আছে? সে গতকাল কখন বাড়িতে ফিরেছে? এভাবে খুব চাতুরতার সাথে কাসেম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে নিচ্ছে; কিন্তু কেউ বুঝতে পারছে না। তখন প্রহরীরা তাকে বললো, আমরা ভাল আছি, আমাদের মনিব কাসেমও ভাল আছেন, সে গতকাল অমুক অমুক সময়ে বাড়িতে ফিরেছেন। অন্যান্য দিনের চেয়ে সে কালকে একটু দেরিতেই ফিরেছেন, ফেরার সময় তার সাথে অমুক লোক ছিল। এরপর ভিক্ষুকটি ঢুকে তার কান জুড়ে ঘুরিয়ে বাড়ির আরো ভিতরে গেল; কিন্তু কেউ কিছুই মনে করল না, কারণ সে ভিক্ষুক, মানুষের কাছে চাওয়া ও ভিক্ষা করাই তার পেশা। সে বাড়ির ভিতরে গিয়ে কাসেমের প্রাসাদের নিকটবর্তী কর্মচারীদের কাছে গেলএবং পূর্বের ন্যায় এখানেও তাদের সাথে খুব কৌশলে কথা চালিয়ে গেল; সে তাদেরকে বললো, তোমাদের খবর কী? তোমাদের মনিবের খবর কী? তোমাদের মনিব গতকাল রাতে কার সাথে ছিল? তারা বললো, আমরা ভাল আছি, আমাদের মনিবও ভাল আছেন, সে গতকাল রাতে তার অমুক স্ত্রীর সাথে ছিলেন। তারপর সে বললো, সে কি আগে আগে-ই তাকে গাঁথালে তাহলে তো মনে হয় তার এই স্ত্রী অনেক সুন্দরী। সে খুব কৌশলে তাদের কাছ থেকে কাসেম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে নিল, তাদের কাছে হাত পাতার কারণে তারাও তাকে কিছু দান করলো। এরপর সে ভিক্ষার ভান করে আরো ভিতরে যেতে লাগল এবং পথে ছোট বড় দেখা হওয়া প্রত্যেকের কাছ থেকে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুকৌশলে কাসেম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে নিচ্ছিল। এরপর সে রান্নাঘরে প্রবেশ করলো, খোঁড়া ও দরিদ্র হওয়ার কারণে সকলেই তার প্রতি দয়াশীল হল এবং যে যার মত দান-সদকা করলো এবং ভিতরে প্রবেশ করতেও তাকে কেউ বাধা দিল না। সে রান্নাঘর থেকে দলিতে কিছু খাবারও ভরে নিল। এরপর সে বাটিতে প্রশ্ন করল, তুমি গতকাল রাতে কী রান্না করেছিলে? তোমার মনিব কাসেম কী পরিমাণ খাবার খায়? গতকাল সে কতটুকু খেয়েছে? কথাগুলো বাটুচিদের সাথে কথার ফাঁকে ফাঁকে কৌশলে জেনে নিল। এভাবে সে প্রসাদের ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি লোকের সাথে কথা বলে সেখান থেকে ঘরে আমাদের পিছনের এলাকায় চলে গেল।
সচিব বলে, সেখান থেকে বের হওয়ার পর আমি তাকে অনুসরণ করলাম। আমি দেখলাম সে একটি নির্জন রাস্তায় এসে নিজ আকৃতি পরিবর্তন করে ফেলল। এখন তাকে দেখে একজন সুন্দর সুঠামদেহী লোক মনে হচ্ছে। আমি এটা দেখে খুবই আশ্চর্য হলাম। এরপর সে তার ভিন্নরূপ ব্যাপারটা নিয়ে কয়েকজন ফকিরকে দিয়ে বললো, নাও এগুলো তোমাদের জন্য। অতঃপর সে একটি বাড়িতে প্রবেশ করল। আমি বাড়িটি চিহ্নিত করে সেখান থেকে চলে এলাম এবং রাতে আবার সেই বাড়ির কাছে গিয়ে তার উপর নম্বর রাখছিলাম, এমন সময় দেখলাম খলিফার দরবারের এক কাজের লোক সেই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। আমি তাকে চিনে ফেললাম। সে বাড়িতে এসে দরজায় আঘাত করল আর তখন ভিতর থেকে দরজার নিচ দিয়ে একটা কাগজ বেরিয়ে এলো, সেটি নিয়ে লোকটি চলে গেল। আমি জানি না আসলে কাগজে কী লেখা ছিল। এরপর আমি কয়েকজন প্রহরীকে নিয়ে এসে সেই বাড়িতে প্রবেশ করলাম এবং লোকটিকে ধরে বেঁধে কাসেমের কাছে নিয়ে গেলাম। কাসেম তাকে বলল, সত্য ঘটনা খুলে বল। সে বললো, আমি কিছুই করিনি। আমি একজন অসহায় লোক। তারপর যখন আমি তাকে প্রহার করা শুরু করলাম তখন সে বলল, হ্যাঁ, আমি খলিফা মুতাদিদের গুপ্তচর, সে আপনার সংবাদ সংগ্রহের বিনিময়ে প্রতি মাসে আমাকে এক হাজার দেরহাম বেতন দেন। আমি প্রচুর ডান করি এবং আপনার বাড়ির পাশে এই বাড়িটি ভাড়া নিয়েছি, যাতে করে কেউ আমাকে চিনতে না পারে এবং বুঝতে না পারে যে, আমি পশু ও ফকিরের ডান করছি। আমি ফকিরের বেশভূষা ধারণ করি এবং আমার এই বাড়ির উপরে কুড়িম দাড়ি লাগাই, অতঃপর আপনার প্রাসাদে প্রবেশ করে মানুষের কাছে ভিক্ষা চাই এবং কৌশলে ছোট-বড় সবার কাছ থেকে আপনার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করি। এরপর আমি আমার দ্বারা করা সেই বাড়িতে গিয়ে সকল তথ্য নিয়ে রাখি। রাতে খলিফার কাছ থেকে এক লোক এসে সেই কাগজ নিয়ে যায় এবং তা খলিফার নিকট হস্তান্তর করে। এর মাধ্যমে খলিফা মুতাদিদ জানতে পারে যে, আপনি প্রতিদিন কী করেন?
কাসেম লোকটিকে ধরে বন্দি করে রাখল। পরদিন রাতে মুতাদিদের প্রহরী এসে যখন লোকটির দরজায় আঘাত করল, তার স্ত্রী দরজা খুলে তাকে বললো, গতকাল কয়েকজন লোক এসে তাকে ধরে নিয়ে গেছে। আমি তাদের চিনিনা, আসলে তারা কারছিল? এরপর থেকে সে এখনও ফিরে আসেনি। সে এখন কোথায় আছে, কার কাছে আছে আমি জানি না। এর পরের রাতেও তার স্ত্রী ঘর থেকে বের হয়ে বললো, আমার স্বামী এখনও ফিরেনি, সে এখন জীবিত না মৃত আমি এর কিছুই জানি না।
এদিকে কাসেম প্রতিদিনের মত খলিফার দরবারে যাওয়া আসা করছে। কয়েক দিন পর খলিফা মুতাদিদ তাকে বলল, পশু লোকটি এখন কোথায়, আরে তার খবর কী? তাকে কী করেছ? কাসেম বলল, আমিরুল মুমিনিন আমি তো তাকে চিনি না। খলিফা বললো, না; তুমি তাকে চিনো। আল্লাহ্র শপথ করে বলছি, তুমি যদি তাকে হত্যা করে থাক অথবা তাকে কিছু করে থাক তাহলে আমি কিন্তু তোমার এই এই... করবো। আমি তোমাকে ওয়াদা দিছি এরপর থেকে তোমার ব্যক্তিগত বিষয় জানার চেষ্টা করবো না। এখন বলো, তুমি তাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছো? তাড়াতাড়ি তাকে বের করেদাও। কাসেম বলল, আমি তার সাথে ভাল ব্যবহার করেছি এবং হাদিয়ার দিয়ে তাকে আমার কাছ থেকে মুক্ত করে দিছি।
আমি যখন ইবনুল জাওযি রাহ.-এর লিখিত ‘আল মুনতাজিম ফি আখবারিল মুলুক ওয়াল উমাম’ নামক কিতাবে এই ঘটনা পড়লাম, তখন এটা ভেবে আমি অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিতহলাম যে, একজনের বিরুদ্ধে অন্যজনের গুপ্তচরবৃত্তি কাজটা সকল যুগে, সকল দেশে,সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান ছিলো এবং আছে। তুমি কখনো কখনো লক্ষ্য করে দেখবে যে, একজনকে বিশ্বাস করে তার কাছে তোমার গোপন বিষয় শেয়ার করেছো, আর কিছু দিন পরেই সে তোমার গোপন বিষয়টি অন্যজনের কাছে প্রকাশ করে দিয়েছে।। এর মাধ্যমে মানুষের উচিত যত বিশ্বাসতই হোক না কেনও কাউকে তার গোপন বিষয় সম্পর্কে অবগত না করা, কারণ মানুষের হৃদয় তো নিজের গোপন বিষয় লুকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেই অনেক সংকীর্ণ। তাহলে অন্যের বিষয় সে কীভাবে ধারণ করবে? তখন তো সে আরো সংকীর্ণরূপ পড়বে।
দ্বিতীয় বিষয় হল, কোনো কল্যাণ নিহিত না থাকলে কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে অনুসন্ধান বা গোচরবৃত্তি করা জায়েজ নেই। উদাহরণস্বরূপ, যেমন কারো ব্যাপারে নেশা করার সন্দেহ হল, আমরা তার ব্যাপারে গোপনে অনুসন্ধান করবো, তারপর বিষয়টা সত্য প্রমাণিত হলে এর জন্যে তার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
অনুরূপভাবে যদি কারো ব্যাপারে সন্দেহ হয় যে, সে অসৎ নারীর কাছে যাওয়া-আসা করে, তাহলে আমরা তার ব্যাপারে গোপনে অনুসন্ধান করবো, তারপর বিষয়টা সত্য প্রমাণিত হলে এর জন্যে তার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তবে এই কাজটা সবাই করবে না বরং পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার কেউ করবে অথবা এর দায়িত্বে থাকা অন কেউ এই কাজটা করবে। তবে কোনো কারণ ছাড়া অথবা শুধু শুধু মানুষের একান্ত বিষয়ে অনুসন্ধান করা বা গুপ্তচরবৃত্তি করা জায়েজ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতে নিষেধ করেছেন; বরং তিনি তো অন্যের ঘরে অনুমতি ব্যতীত উঁকি দিলে তার চোখ উপরে ফেলারও অনুমতি দিয়েছেন।
অনুমতি ব্যতীত কারো ঘরের দরজা বা জানালার ফাঁক দিয়ে কেউ তাকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চোখ উপড়ে ফেলার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কেউ এমনটি করলে তার কোনো দুন বা দিয়াত নেই। এটা তো জানা কথাই যে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কারো চোখ উপড়ে ফেলে, তাহলে এর হৃদপিণ্ডে তার চোখও তুলে ফেলা হবে। আল্লাহ্ তাআলা বলেন:
‘চোখের বিনিময় চোখ উপড়ে ফেলা হবে।’
অর্থাৎ কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের চোখ তুলে ফেলে তাহলে তার চোখও অনুরূপভাবে তুলে ফেলতে হবে। এর যদি কেউ ইচ্ছাকৃত নয় বরং ভুলে কারো চোখ তুলে ফেলে তাহলে তাকে অর্ধেক দিয়াত-রক্তপণ দিতে হবে। আর এটা মানুষের যে অঙ্গগুলো জোড়ায় আছে এর একটা যদি কেউ নষ্ট করে যেমন কেউ তুলে কারো হাতও কেটে ফেললো বা কারো পা কেটে ফেললো তাহলে তাকেঅর্ধেক দিয়াত দিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হারিণের সিঁ দিয়ে মাথা চুলকাচ্ছিলেন। এমন সময় এক লোক ঘরের ফাঁকা দিয়ে ভিতরের লোকদের দুষ্টমি দেখাচ্ছিল। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক রাগন্বিত হলেন। লোকটি যদি চলে না যেতো তাহলে তিনি তার চোখ উপড়ে দিতেন। তিনি বলেন, এটা বৈধ। এটা করলে কারো দিয়াত-রক্তপণ দিতে হবে না। এর মাধ্যমে তিনি কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে অনুসন্ধানের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। মানুষ যখন অন্যের গোপন বিষয়ে অনুসন্ধান করলো তখন সে নিজেও ধ্বংস হল, অনেককেও ধ্বংস করল। আর একারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
‘মানুষের মিথ্যাওনাহ করার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বর্ণনা করবে।’
এবং তিনি আরো বলেন:
‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ ছেড়ে দেওয়া।’
হে ভাই! কারো সাথে ও তার স্ত্রীর সাথে সমস্যা থাক বা না থাক তাতে তোমার কী? কে কত বেতন পেল না পেল তাতে তুমি কী করবে? এক লোক ও তার স্ত্রীর বা তার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সামান্য ঝামেলা থাকতেই পারে, তুমি কেনো অযথা তাদের গোপন খবর তালাশ করতে যাবে? অনর্থক বিষয়ে তুমি কেনো তাদের জিজ্ঞেস করতে যাবে? তুমি কেনো অনর্থক বিষয়ের পিছনে ছুটবে?
মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ ছেড়ে দেওয়া। ইস্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ে অনুসন্ধান করাটা খলিফা মুতাদিদেরমতোও ঠিক হয়নি। সাহাবায়ে কেরাম রা. কারো কোনো বিষয়ে অনর্থক নাক গলাতে যেতেন না। তাহলে তোমার কি হল যে, তুমি অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাতে যাবে? এমনিভাবে মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল কুরআন তিলাওয়াত করা; মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল নফল সালাত আদায় করা; মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল বেশি বেশি আল্লাহ্ তাআলার যিকির করা; অনুরূপভাবে মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ ছেড়ে দেওয়া।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো অনর্থক কাজ করতেন না। তিনি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত প্রতিটি ছোট ও বড় বিষয়ে প্রতি দৃষ্টি দিতেন না। সাহাবায়ে কেরাম রা.ও কখনো অনর্থক কাজ করেননি। আমরা ইতিহাস পড়ে দেখতে পাই যে, সাহাবায়ে কেরাম রা. অন্যের কোনো বিষয় নিয়ে অযথা মাথা ঘামাতেন না। অনুরূপভাবে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত পড়ে জানতে পারি যে, তিনি কখনো কোনো সাহাবীর দোষ তালাশ করেননি। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কারো প্রতি ইহসান-অনুগ্রহ করতে চাইতেন তখন তার বিষয়ে জিজ্ঞাস করতেন। যেমন নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসছিলেন, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ্ রা.ও সেই যুদ্ধে তাঁদের সাথে ছিলেন। তাঁরা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে উটের উপর চড়ে বিশাল উপত্যকা পাড়ি দিচ্ছিলেন। শুধুমাত্র আল্লাহ্ তাআলার নিকট প্রতিদানের আশায় এই তৃষ্ণার্ত রোদে কষ্ট সহ্য করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর সাথে তাঁদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছিল। মদীনায় পৌঁছতে অল্প পথ বাকি ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেয়াল করলেন যে, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ্ রা. সকলের থেকে পিছিয়ে পড়েছেন। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এলেন এবং তাঁকে বললেন, জাবের! চলো; জাবের রা. বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার উট অসুস্থ হয়ে পড়েছে, সে যাঁতেতে পারছে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার উটকে বসাও। তখন তিনি তার উটটাকে বসালেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার লাঠিটা আমাকে দাও। জাবের রা. লাঠি দিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তখন লাঠি দিয়ে উটের উপর আঘাত করলেন এবং এর জন্য দোয়া করলেন, তখন উট দাঁড়িয়ে গেল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পথ চলতে শুরু করল।
অতঃপর জাবের রা. তাঁর উটের উপর চড়লেন, এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজ উটের উপর উঠলেন। অতঃপর তিনি জাবের রা.-এর সাথে সাথে চলতে লাগলেন। জাবের রা.-এর বয়স তখন ছিলো একুশ বছর। তিনি জাবের রা.কে জিজ্ঞেস করলেন, জাবের! বিয়ে করেছ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.কে অনর্থক এমন প্রশ্ন করেননি। যেরকম আমরা একে অপরকে করে থাকি, ভাই কেমন আছেন? দিন কাল তো মনে হয় ভালোই কাটছে? শুনলাম, স্ত্রীর সাথে ঝামেলা হয়েছে? কারণ কী? এধরনের বিভিন্ন প্রশ্ন। আর তাই এমন প্রশ্ন করার তোমার প্রয়োজন কী। তুমি কেনো তার বিষয়ে জানতে চাইবে? তুমি কি মেয়ের বাবা না তার বড় ভাই? না-কি তুমি ছেলের বাবা? তুমি কি সমাজের মতবরক যে, এবিষয়ে মীমাংসা করবে? এমন অযথা প্রশ্ন ছেড়ে দাও। আবার কেউ কেউ এসে তোমাকে প্রশ্ন করবে, কী ভাই! শুনলাম অমুককে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছো, সত্য না-কি? এগুলো অনর্থক প্রশ্ন, কী দরকার অন্যের বিষয়ে এসব প্রশ্ন করার। মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা। যেমন সালাত আদায় করা, সিয়াম পালন করা ইসলামের সৌন্দর্য, তেমনিভাবে অনর্থক বিষয়ে জড়িত না হওয়াও ইসলামের সৌন্দর্য; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.কে অযথা প্রশ্ন করেননি; বরং তিনি তার প্রতি ইহসান করতে চেয়েছেন। যেমন তুমি কোনো দরিদ্র লোককে সাহায্যের উদ্দেশ্যে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তুমি তাকে বল, তোমার অবস্থা কী? বাড়ি ভাড়া কত? তুমি তাকে সাহায্য করার জন্যে এধরনের প্রশ্ন করো। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেও বুঝতে পারে যে, তুমি তাকে সাহায্য করার জন্যে এধরনের প্রশ্ন করেছ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.কে বললেন, হে জাবের! তুমি কি বিবাহ করেছ? জাবের রা. বলেন, জি ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি বিবাহ করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হলেন এবং বললেন, কুমারী না-কি বিবাহিতা নারী বিষয়ে করেছ? সে বললেন, বিবাহিতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কুমারী মেয়ে কেনা বিয়ে করলে না? তাহলে তুমি তার সাথে সোহাগ করতে পারতে আর সেও তোমার সাথে আনন্দ করতে পারতো। তখন জাবের রা. বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার বাবা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, আর তিনি আমার দায়িত্বে সাতজন বোন রেখে গেছেন। আমি বাড়িতে তাঁদের মতই আরেকজন মেয়ে আনতে চেয়েছি যাতো বাড়িতে আমার বোনের সাথে তার ঝগড়া-বিবাদ লেগে না যায়। তাই আমি একজন বয়স্কা মহিলা বিয়ে করেছি, যাতে সে বাড়িতে তাঁদের সাথে মায়ের মত হয়ে থাকতে পারে।
হে ভাই! বোনদের প্রতি এমন মায়াার কি কোনো দৃষ্টান্ত হতে পারে যে, নিজের আনন্দ-ফুর্তিকে, নিজের চাহিদাকে বোনদের জন্যে কুরবানি করে দিয়েছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত খুশি হলেন এবং তিনি জাবের রা.কে আর্থিক সাহায্য করতে চাইলেন। তাই তিনি তাঁকে বললেন, জাবের! তুমি কি তোমার উটটা আমার কাছে বিক্রি করবে? একথা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.-এর উটটির দিকে তাকালেন, যা ছিলো খুবই দুর্বল এবং কিছু পূর্বেও বসে পড়েছিলো। এখন তা সবল হয়ে উদ্যমতার সাথে হাঁটা শুরু করলো। হঠাৎ একথা শুনে জাবের রা. কী করবেন বুঝতে পারলেন না। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যে উটটি কিছুকাল পূর্বেও অসুস্থ ছিলো এবং এখন সুস্থ হয়ে উদ্যমতার সাথে চলছে, আপনি কি সেটার কথা বলছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ; তুমি আমার কাছে তা বিক্রি করো। জাবের রা. বললেন, আপনি এটা নিয়ে নিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না বরং তুমি আমার কাছে তা বিক্রি করো। জাবের রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কত টাকা দিয়ে ক্রয় করবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এক দিরহাম। জাবের রা. বললেন, কম হয়ে যায়। একটি উট মাত্র এক দিরহাম? অনেক কম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দুই দিরহাম। জাবের রা. বললেন, কম হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিন দিরহাম। জাবির বলেন, কম হয়ে যায়। এভাবে রাসূলুল্লাহ বাড়াতে বাড়াতে চল্লিশ দিরহাম ও সাথে এক উকিয়া স্বর্ণমুদ্রা পর্যন্ত বললেন। জাবির রা. তখন বললেন, ঠিক আছে তবে একটা শর্ত আছে আর তাহল, আমি মদিনা পর্যন্ত এর উপর আরোহণ করে যাব।
মদিনায় পৌঁছে জাবের রা. বাড়িতে গিয়ে পরিবারের নিকট মালপত্র নামিয়ে রেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে এলো এবং তাঁর নিকট উট হস্তান্তর করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বেলাল রা.কে বললেন, বেলাল! উটটি নিয়ে রেখে যাও এবং জাবেরের চল্লিশ দিরহামের সাথে কিছু বেশি দিয়ে দাও। বেলাল রা. তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেওয়া পরিমাণ মাল দিয়ে দিলেন। জাবের রা. উটের মূল্য গ্রহণ করে ভাবতে লাগলেন, আমি এই টাকা দিয়ে কী করবো! আমি এর মাধ্যমে অন্য একটি উট ক্রয় করবো না-কি এর মাধ্যমে আমার বোনদের বিয়ের ব্যবস্থা করবো? অথবা পরিবারের লোকদের জন্যে খাবার ক্রয় করবো? অর্থাৎ আমি তো এই উটের উপর সফর করতাম, এর মাধ্যমে পানি আনতাম, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বহন করতাম; কিন্তু এখন এর মূল্য দিয়ে আমি কী করবো? এটা ভাবতে ভাবতে জাবের রা. নিজ গৃহের দিকে ফিরে যাচ্ছেন, তখন রাসূলুল্লাহ সা. বেলাল রা.কে বললেন, বেলাল! যাও জাবেরকে উটটিও দিয়ে দাও এবং বলে বল, উট এবং উটের মূল্য উভয়টিই তাঁর জন্য। বেলাল রা. জাবের রা.-এর নিকট গেলেন এবং তাঁকে বললেন, জাবের! তোমার উট নিয়ে যাও। জাবের রা. বললেন কেনো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এটা নিবেন না? তখন তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উট এবং উটের মূল্য উভয়টিই তোমার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আচরণ দেখে জাবের রা. অত্যন্ত খুশি হলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের রা.কে সাহায্য করার জন্য তাঁর গোপন বিষয় জানতে চেয়েছেন ‘তোমরা কারো ব্যাপারে গোচরীভূত করবে না এবং কারো গোপন বিষয়ে জানতেও চাইবে না।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে একথা বলার, আবার নিজেই তাঁর খেলাফ করেননি।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের গোপন বিষয়ের হেফাজত করুন এবং আমাদেরকে অন্যের গোপন বিষয় সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন! আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের সকল অনিষ্টতা থেকে হেফাজত করুন। আমিন。
টিকাঃ
১. সূরা মায়িদা: ৪৫