📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 এক গুনাহগার ব্যক্তির গল্প

📄 এক গুনাহগার ব্যক্তির গল্প


এখন আমরা এক গুনাহগার ব্যক্তির গল্প বলবো, এক মদ্যাব লোকের গল্প বলবো। আবু মিহ্জান আস-সাকাফি রা.-এর গল্প বলবো যাদের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি থাকার কারণে জাহেলিয়াতে থাকাবস্থায় আবু মিহ্জান আস-সাকাফি একটি কবিতায় তার ছেলেকে অসিয়ত করে বলেছিলো— ‘আমি যখন মারা যাবো, তখন তুমি আমাকে আঙ্গুর বাগানের পাশ্বে কবর দিয়ে। যাতে আমার মৃত্যুর পরে আমার হাড়গুলো এর রস পান করতে পারে।’ ‘তুমি আমাকে নির্জন প্রান্তরে দাফন করো না, কারণ আমার ভয় হয় যে, তাহলে আমি মরে গেলে এর (মদের) স্বাদ আর কখনো গ্রহণ করতে পারবো না।’ অতঃপর যখন ইসলামের আগমন ঘটলো, আবু মিহ্জান আস-সাকাফি রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পরও তিনি মদ পান করতেন। এরপর মদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে যখন শরয়ি হুকুম জারি হল, আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ

‘হে মুমিনগণ! এই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে?’

তখন সাহাবায়ে কিরাম রা. বললেন, হে আমাদের রব! আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেছি। হে আমাদের রব! আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেছি। আবু মিহ্জান রা.ও বললেন, হে আমাদের রব! আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেছি, আমরা তো শেষ হয়ে গেছি। যখন মদ পান করা হারাম হয়ে গেল, তখন আবু মিহ্জান রা. কী করলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় আবু মিহ্জান রা. কখনো কখনো মদ পান করতেন আর তখন তাঁকে এর হদ-শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত করা হত। এরপর তিনি আবারও মদ পান করতেন এবং তাঁকে আবারও এর হদ হিসেবে বেত্রাঘাত করা হত। তিনি কিছুদিন মদ পান করা থেকে বিরত থাকতেন; কিন্তু একদিন পর পরই আবারও শয়তান তাঁকে ধোঁকা দিত আর তিনি মদ পানে লিপ্ত হতেন, তখন তাঁর উপর এর হদ প্রয়োগ করা হতো; কিন্তু তিনি কখনোই ঈমান থেকে বের হননি এবং সালাত আদায় করা ত্যাগ করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুনাহগারদের সাথে সবসময় ভাল ব্যবহার করতেন। কেউ যদি এমন কোনো অন্যায় করতো যার জন্য শরিয়তে হদ বা শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে, তাহলে তিনি এর জন্য তার উপর শরিয়ি হদ প্রয়োগ করতেন; কিন্তু এরপর তার সাথে ভাল ব্যবহার করতেন, তাকে সৎকাজের জন্য উৎসাহ দিতেন, গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি গুনাহগারদের দেখে তাঁদেরকে ঘৃণা করতেন না। মদ পান করা একটা খারাপ কাজ, সে মদ পান করলো মানে একটা খারাপ কাজ করলো, অতঃপর যদি সালাত আদায় করে, তাহলে সে একটা ভাল কাজ করলো। যেহেত মদ পান করাটা অনেক বড় একটা পাপ এবং এর প্রভাব মানুষের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বাকি থাকে আর সালাত অল্প সময়ের ইবাদত, তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে, তার মধ্যে ভালোর পরিমাণটা হল ত্রিশ পার্সেন্ট (৩০%) আর খারাপীর পরিমাণটা সত্তুর পার্সেন্ট ৭০%। মদ পান করা সত্ত্বেও সে যেহেতু সালাত আদায় করে, তাহলে আমাদের বলতে হবে যে, তার মধ্যে আল্লাহর মুহাম্মাদত ও ইসলামের ভালবাসা আছে। যদিও তা পরিমাণে কম, মানে একশত পার্সেন্টের মধ্যে ত্রিশ পার্সেন্ট। মাত্র। তবুও কিন্তু তার মধ্যে আল্লাহর মুহাম্মাদত বিদ্যমান আছে। এটা বলা যাবে না যে, তার মধ্যে আল্লাহর মুহাম্মাদত একেবারেই নেই। এরপর আসুন মদ পান করার সাথে সাথে সে দান-সদকা করে, সন্তান লালনপালন করে, মাতা-পিতার সেবা-যত্ন করে। অর্থাৎ আরো অনেকগুলো ভাল কাজ করে। তাহলে আমরা এটা ধরে নিতে পারি যে, সে একটা খারাপ কাজ করার বিপরীতে অনেকগুলো ভাল কাজ করে। অর্থাৎ এখন যদি আমরা পার্সেন্টের হিসাবটা করি তাহলে এমন দাঁড়াবে যে, তার মধ্যে খারাপ বা মদ কাজের প্রভাবটা ৩০% অথবা ৪০% আর ভালোর প্রভাবটা ৭০% বা ৬০%। অর্থাৎ তার ভালোর পরিমাণটা খারাপের চেয়ে বেশি। তাহলে আমাদের উচিত হবে তাঁকে সাহায্য করে ভালোকাজের প্রতি আরো বেশি উৎসাহিত করা। আমাদের জন্যে কখনই এটা উচিত হবে না যে, তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা। তুমি মদ পান করো, সুতরাং তুমি আমাদের থেকে দূরে থাকো, আমাদের কাছে আসবে না; একথা বলে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া আমাদের জন্যে কখনই উচিত হবে না। তাহলে সে ভালোর দিকে আসার পরিবর্তে দিন দিন আরো বেশি খারাপের মধ্যে ডুব দিতে থাকবে। অর্থাৎ খারাপের মধ্যে ৪০% থেকে ৫০% চলে যাবে, এরপর আমরা যখন তার সাথে আরো বেশি খারাপ আচরণ করব তখন সেই পরিমাণটা আরো বাড়তে থাকবে, অর্থাৎ ৫০% থেকে ৮০% চলে যাবে। বরং তার সাথে আমাদের ভাল ব্যবহার করা উচিত। আমরা যদি তার সাথে ব্যবহারের পরিবর্তে ভাল ব্যবহার করি, সহানুভূতির সাথে তাকে বলি যে, ভাই তুমি মদ পান করো ঠিক আছে; কিন্তু তুমি তো মাতা-পিতার খেদমত করো। ইন-শা-আল্লাহ তাঁদের দোয়ার বরকত একদিন তুমি তাওবা করবে মদ পান ছেড়ে দিবে। তুমি তো সালাত আদায় করো, তুমি সালাত আদায় করতে থাকো, ইন-শা-আল্লাহ একদিন দেখবে সালাত তোমাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন ‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে’ আর মদ পানও তো একটা খারাপ কাজ, সালাত তোমাকে সেটা থেকেও বিরত রাখবে। আমরা যখন তাঁকে এভাবে ভাল কাজের প্রতি উক্ত করতে থাকবো যখন থীরবীরের মধ্যে ভাল কাজের পরিমাণটা বাড়বে এবং খারাপ কাজের পরিমাণটা আস্তে আস্তে কমতে থাকবে।

আবু মিহজান রা.-এর ঘটনা শেষ করার পূর্বে অন্য আরেকজনের একটি ঘটনা বলি। আব্দুল্লাহ নামে এক সাহাবি ছিলেন যাকে মানুষ হাম্মার (গাধার মালিক) বলে ডাকত। এটা তাকে তিরস্কার করে বা গালি দিয়ে ডাকত না। যেমন আমরা বর্তমানে কাউকে ‘রাজ’ বলে সম্বোধন করে তার ধূর্ততা ও চালাকি বুঝায়, এর মাধ্যমে তাকে কিন্তু একটি হিংস্র পাখি বুঝায় না বরং তার ধূর্ততা ও চালাকি বুঝায়। অনুরূপভাবে সাহসী লোককে আমরা সিংহের সাথে তুলনা করি, তাকে সিংহ বলার মাধ্যমে আমরা বনের কোনো হিংস্র প্রাণী বুঝাই না। পূর্বেও মানুষ একজন অপরজনকে এখরণের বিভিন্ন খেতাবে ডাকত। সুতরাং তারা ধৈর্যশীল মানুষকে হাম্মার বলে ডাকত। আব্দুল্লাহ আল-হাম্মার রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেক মুহাব্বত করতেন। তিনি সর্বদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কিছু হাদিয়া দিতে চাইতেন; কিন্তু তিনি ছিলেন দরিদ্র, তাঁর টাকা-পয়সা ছিল না। তিনি একবার বাজারে গেলেন, তখনকার বাজার ও এখনকার বাজারের মত ছিলো না, তখন মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্য নিয়ে বাজারে যেতো এবং বিক্রি করে চলে আসতো। এই সাহাবিও বাজারে গেলেন এবং তাঁর একটি জিনিস পছন্দ হল, সে তাঁর মালিকের সাথে দর-দাম করে তাকে বললেন, ঠিক আছে তুমি আমার সাথে আসো, আমি তোমাকে এর মূল্য পরিশোধ করে দিচ্ছি। সাহাবি লোকটিকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন এবং তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এটা আপনার জন্যে হাদিয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদিয়া গ্রহণ করলেন, তখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি এটার মূল্য পরিশোধ করে দিন, একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দিকে তাকাল এবং বললো, এটা কি তুমি আমাকে হাদিয়া দাওনি? সে বলল, হ্যাঁ! হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এটা আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য হাদিয়া; কিন্তু আমি দরিদ্র মানুষ, আমার কোনো টাকা-পয়সা নেই, তাই আপনি এটার মূল্য পরিশোধ করে দিন। সুবহানাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাহাবাদের কেরাম রা.-এর মুহাব্বত ছিলো এমনই অকৃত্রিম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মূল্য পরিশোধ করে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে লোকটির ভালোবাসা ছিলো চমৎকার; সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত মুহাব্বত করতো; কিন্তু লোকটি মদ পান করতো, কারণ সে জাহেলি যুগ থেকেই ছিলো মদাসক্ত। তাঁকে এ কাজ থেকে অনেক নিষেধ করা হতো; কিন্তু কখনো কখনো তাঁর মদদুর্বল হয়ে যেতো আর সে মদ পান করতো। সে যখনই মদ পান করতো তখন তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে আসা হতো এবং এর শাস্তি-স্বরূপ তাঁকে বেত্রাঘাত করা হতো, অতঃপর সে চলে যেতো। এভাবে একদিন তাঁকে মদ পান করার শাস্তি দেওয়ার পর সে বের হচ্ছিল, তখন এক সাহাবি তাঁকে বললো, তোমার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক, এবার শাস্তির দেওয়ার পরও তুমি মদ পান করো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি তাঁকে লানত করো না, কারণ আমি জানি সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে মুহাব্বত করে, তাদের ভালবাসে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কল্যাণের দিকে, তাঁর ভাল কাজের দিকে লক্ষ করেছেন; তাঁর মন্দ দিকটির প্রতি কিন্তু তিনি লক্ষ করেন নি এবং বারবার মদ পান করার পরও তাঁকে তিরস্কার করেন নি। বরং তাঁকে সৎ ও ভাল কাজের প্রতি উত্থুদ্ধ করেছেন।

আবু মিহজান রা. ছিলেন একজন সৎ, নেককার ও মুত্তাকি লোক; কিন্তু কখনো কখনো তাঁর পা পিছলে যেতো, তিনি মদ পান করে ফেলতেন। কাদিসিয়ার যুদ্ধের সময় তিনি মুজাহিদদের সাথে যুদ্ধে বের হলেন। যুদ্ধের আমির ছিলেন সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.। ময়দানে পৌছার পর সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. এবং কাফের সেনাপতির মধ্যে দীর্ঘ পর আদানপ্রদান হল। এটা অনেক দিন চলতে থাকল। এই সময়ে আবু মিহজান রা.-এর মদের প্রতি আগ্রহ দেখা হল থীরবীরের এ চুড়ান্ত আকার ধারণ করল; কিন্তু তিনি এখানে এত মুজাহিদদের মধ্যে কীভাবে মদ পান করবেন?

আবু মিহজান রা. লুকিয়ে একটি নিরাপদ স্থানে গেলেন এবং চারপাশটা ভালোভাবে দেখে নিয়ে মদ পান করলেন; কিন্তু তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ধরা পড়লেন। তাঁকে গ্রেফতার করে আমিরুল মুজাহিদীন আমির সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর নিকট নিয়ে আসা হল। সা’দ রা. তাঁকে ধরে একটি ঘরের মধ্যে বেধিকরে রাখলেন এবং এবং তাঁকে যুদ্ধ অংশগ্রহণ করে নিষেধ করে দিলেন। তখন আবু মিহজান রা. কী করলেন? তিনি কি এটাকে নিজের জন্য আশীর্বাদ মনে করে হাসা-পা ওঠিয়ে বসে রইলেন? না, আবু মিহজান রা. বরং নিজের জন্য এটাকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের বিশাল সাওয়াব থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করলেন। তিনি অনেক অস্থির হয়ে পড়লেন এবং এবং বললেন, এটা স্থিরতার বিষয় নয়। আমি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে বিশাল সাওয়াবের অধিকারী হওয়ার জন্য এসেছি আর সা’দ রা. আমাকে মদ পানের অপরাধে এই সাওয়াব অর্জন থেকে বিরত রাখছে। আবু মিহজান রা. ঘরে বন্দি অবস্থায় বসে আছেন, বাইরে যুদ্ধ চলছে। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ ও তীর-তরবারির ঝনঝনানি তাঁর কানে আসছে। তিনি বাইরে যুদ্ধের আওয়াজ শুনে অস্থির হয়ে চিৎকার করতে লাগলেন।

এবং বলতে লাগলেন:

كَفَى حُزْنًا أَنْ تُدْخَلَ الخَيْلُ بِالْقَنَا * وَأَتْرُكُ مَشْدُودًا عَلَيَّ وَثَاقِي

إِذَا قُمْتُ عَنَّى الحَدِيدُ وَ غُلْقَتْ * مَصَارِيعُ دُونَ تَصِمِ المنَادِي

يَقْطَعُ قَلْبِي حَسْرَةً أَنْ أَرَى الوَغْ * وَلَا سَامِعَ صَوْتِي وَلَا مِنْ يُرَادِي

وَأَنَّ أشْهَدَ الإِسْلَامَ يَدْعُو مُعَوِّقًا * فَلَا لِلْجِهَادِ الإِسْلَامِ حَيَّ دِعَانَا

وَقَدْ كُنْتُ ذَا مَالِ وَ إِسْرَةٍ * وَ قَدْ تَرَكُونِي وَاحِدًا لَا أُعَا لَيَا

فَلِلَّهِ عَهْدٍ لَا أُخِيفُ بَعْدَهُ * لَأَنَّ فَرَجَتْ لَا أَزُورُ الخَوَانِي

'দুঃখ করার জন্যে তো এটাই যথেষ্ট যে, ঘোড়া যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করছে আর আমাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলে রাখা হয়েছে।'

'আমি যখন দাঁড়াতে যাই তখন দেখি আমাকে লোহার লাগাম পরিয়ে বদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং যুদ্ধের শোরগোলের কারণে আমার আহবানও কেউ শুনতে পায় না।'

'যুদ্ধ শুরু হতে দেখে পরিতাপে আমার কষ্ট কেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু আমার আওয়াজ শুনার মত কেউ নেই এবং আমাকে দেখার কেউ নেই।'

'আমি দেখেছি ইসলাম একজন সাহায্যকারীর সন্ধান করছে; কিন্তু সে যখন আমাকে ডাকছে আমি তার কোনো সাহায্য করতে পারছি না।'

'আমি ছিলাম অনেক সম্পদের অধিকারী, এবং আমার অনেক ভাই ছিলো; কিন্তু তারা সকলে আমাকে একা ফেলে চলে গেছে; এখন আমার কোনো ভাই নেই।'

'আমি আল্লাহর সাথে অঙ্গিকার করছি। আমি তাঁর অঙ্গিকার কখনো ভঙ্গ করবো না। আমি যদি এখান থেকে মুক্ত হতে পারি তাহলে আর কখনোই পানশালায় যাবো না।' (মদ পান করবো না)

এরপর তিনি বাড়িতে থাকা লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, বাড়িতে কি কেউ আছেন? বাড়িতে কি কেউ আছেন? তিনি জানতেন যে, এই বাড়িতে একজন মহিলা আছেন আর তিনি সেনাপতি সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর স্ত্রী। সে সময় দীর্ঘাদিন যুদ্ধ চলতে থাকত, কখনো কখনো তা পাঁচ-ছয় মাস পর্যন্ত চলত। তাই স্ত্রীরদের নিয়ে যুদ্ধে বের হতেন এবং তাদেরকে যুদ্ধের পিছনে দূরে থাকতে রেখে যেতেন। আবু মিহজান রা. জানতেন তাকে যে বাড়িতে আটক রাখা হয়েছে তাতে কেউ একজন আছে, তাই তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন, বাড়িতে কি কেউ আছেন? বাড়িতে কি কেউ আছেন? তখন সা’দ রা.-এর স্ত্রী সালমা তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন। তিনি তাঁকে কী বললেন? এরপর কি তিনি যুদ্ধে শরিক হয়েছেন?

সালমা রা. এসে তাঁকে বললেন, তোমার কী প্রয়োজন? আমাকে ডাকছো কেনো? সালমা মনে করেছিলেন সে পানি অথবা খাবার চাচ্ছে; কিন্তু না। তিনি বাবার চান নি এবং পানিও চান নি। তিনি বললেন, হে সালমা! আমাকে মুক্ত করে দাও এবং আমাকে আমার তরবারি ও সা’দ রা.-এর ঘোড়া 'বালকা'কে দাও, কারণ তিনি জানতেন সা’দ রা. যুদ্ধে শরিক হননি; তিনি আহত, ঘোড়ার উপর বসে থাকতে পারেন না, তাই তিনি বাড়িঁর ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন আর তাঁর ঘোড়া বাড়ির পিছনে বাঁধা অবস্থায় আছে। সা'দ রা. যদিও সমস্যার কারণে যুদ্ধে শরিক হতে পারেননি কিন্তু নিষ্কর্মা তো আর অজরুহ ছিলেন না, তারা এই বসে থাকার বাস করে বলেছেন:

وَعَدْنَا وَقَدْ أَمَتْ نِسَاءَ كَبِيرُوفُوَسَادٌ مَعَدَّ لَيْسَ فِيهِنَّ أَمْ

'সে আমাদের কাছ থেকে যুদ্ধের অধিকার গ্রহণ করে আর অনেক নারী বিধবা হয়। অথচ সা’দের স্ত্রীর বিধবা হওয়ার কোনো ভয় নেই।'

(অর্থাৎ সা'দ রা. তো যুদ্ধই করে না, তাহলে সে নিহত হবে কীভাবে)

আবু মিহজান রা. বললেন, তুমি আমাকে মুক্ত করে দাও এবং আমাকে তরবারি ও বালকা দাও। আমি তোমাকে আল্লাহর নামে ওয়াদা করে বলছি আমি যদি নিরাপদ এবং বেঁচে থাকি তাহলে আবার ফিরে এসে স্বেচ্ছায় হাত-পা শিকলে দিয়ে বন্দিত্ব বরণ করবো। আর যদি যুদ্ধে নিহত হই তাহলে তো তোমরা আমার থেকে মুক্ত হয়ে গেলে। তিনি তখন তাঁকে মুক্ত করে দিলেন এবং তাঁকে তরবারি ও বালকা ঘোড়া দিলেন। সা’দ রা. এসবের কিছুই জানতেন না, কারণ তিনি তখন বাড়ির ছাদের উপর থেকে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ চরত। এ দিকে আবু মিহজান রা. যুদ্ধ হয়ে তরবারি হাতে নিয়ে ঘোড়ায় চড়লেন এবং যুদ্ধের দিকে ছুটে চললেন। তখন যুদ্ধের অবস্থা তুঙ্গে। ঘোড়া নিয়ে যুদ্ধের ময়দানের চুকে পড়লো এবং একবার ডানদিকে, একবার বাম দিকে, একবার সামনের দিকে, একবার পিছনের দিকে ছুটতে লাগল। আর তিনি ঘোড়ার উপর মজবুত পাথরের ন্যায় বসে কাফেরদের উপর তীব্র আক্রমণ চালালেন; তাদের হত্যা করছেন এবং তাদের দিক থেকে আসা আক্রমণগুলো প্রতিহত করছেন। এদিক দূর থেকে সা’দ রা. এই দৃশ্য দেখছেন আর অবাক হচ্ছেন। তিনি ভাবছেন এমন বীরপুরুষ সাথে যে যুদ্ধ করছে তিনি মনে মনে বলছেন যোদ্ধাকে দেখে তো আবু মিহজান মনে মনে হয় আর ঘোড়াকে দেখতে বালিকার মত; কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? বালকা ঘরের পিছনে বাঁধা আর আবু মিহজান ঘরের ভিতরে বন্দি অবস্থায় আছে? যদি ধরেও নেই এটা বালকা, তাহলে আবু মিহজান কীভাবে এটা উপর উঠল? আর যদি মনে করি যে, এটা আবু মিহজান তাহলে সে বালকাকে পেলো কোথায়? এভাবে সূর্য ডুবে গেল, উভয় পক্ষের সৈনিকরা আজকের মত যুদ্ধ বন্ধ করে নিজ নিজ তাবুতে ফিরে গেল। আবু মিহজান রা. ফিরে এলেন তাঁর চেহারায় রক্তের দাগ, তাঁর কাপড় ছেঁড়া, কারণ তিনি তো যুদ্ধ গিয়েছেন, তিনি তো আর বিবাহ করতে যান নি যে, কাপড় ও শরীর পরিচ্ছন্ন থাকবে। আবু মিহজান রা. ফিরে এসে বালকাকে যথাস্থানে বেঁধে নিজের পায়ে বেড়ি পরে বন্দি হলেন।

তখন সা’দ রা. সাদ থেকে নেমে ঘোড়ার কাছে গেলেন এবং দেখলেন, এর শরীর থেকে ঘাম ঝরছে, তিনি বুঝে গেলেন যে, এটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। অতঃপর আবু মিহজান রা.-এর দিকে গেলেন আর তাঁর মধ্যে যুদ্ধের ছাপ দেখতে পেলেন। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আবু মিহজান! তুমি কি যুদ্ধ করেছো? তিনি বললেন, হাঁ আমি যুদ্ধ করেছি। আমি তোমার কাছে আল্লাহর শপথ করে ওয়াদা করছি যে, আমি আর কখনো মদ পান করবো না। সা’দ রা. তখন বললেন এবং আমিও তোমাকে আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, তুমি যদি মদ পান না করো তাহলে আমিও তোমাকে আর শাস্তি দিবো না।

এরপর আবু মিহজান রা. অনেক বড় মুজাহিদ হয়েছিলেন, কারণ শয়তান তাঁকে একথা বলে ধোঁকা দিয়ে দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারেনি যে, আবু মিহজান! তুমি কীভাবে দীনের খেদমত করবে? এতে তোমার কী লাভ হবে? তুমি তো মদ্যপীর? তুমি একজন ফাসেক, পাপাচারী, মদ পান করো, তাহলে কীভাবে তুমি দীনের খেদমত করবে? কীভাবে তুমি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে? অথচ তুমি একজন মদ্যপ! না শয়তান তাঁকে এভাবে ধোঁকা দিতে পারেনি। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত দীনের কোনো না কোনো কাজে তাঁর প্রয়োজন অবশ্যই হবে।

এই দীন যেমন কামেল ও পরিপূর্ণ ঈমানদারের মাধ্যমে উপকৃত হয়, ঠিক তেমনিভাবে একজন অসম্পূর্ণ ঈমানদারের মাধ্যমেও উপকৃত হয়, অনুরূপভাবে একজন গুনাহগার ও পাপাচারী মুমিনের মাধ্যমেও উপকৃত হয় এবং কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির মাধ্যমেও উপকৃত হয়। একজন কবিরা গুনাহে লিপ্ত; কিন্তু সে যদি একটা মসজিদ নির্মাণ করে তাহলে এতে সমস্যার কী আছে? হ্যাঁ, সে গুনাহগার, কবিরা গুনাহে লিপ্ত; কিন্তু তাঁর এই মসজিদ নির্মাণ তো একটা পুণ্যোর কাজ এবং সে তো এই মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে তাঁর কবিরাহ গুনাহ থেকে তওবা করবে। এতে কী সমস্যা যে, একজন লোক কখনো কখনো সালাত ত্যাগ করে, তা সত্ত্বেও সে মানুষকে মদ পান করা থেকে বিরত থাকতে বলে এবং মানুষকে সালাত আদায়ের আদেশ করে সে বলে, যে অমুক! আল্লাহকে ভয় করো সালাত আদায় করো। সে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করলে সমস্যা কী? হোক-না দীন পালনের ক্ষেত্রে তার ঘাটতি আছে। এমনকি কেউ আছে যে, সে কখনো ভুল করে নি, গুনাহের কাজ করে নি? এমনকি কেউ আছে যে, সারা জীবন শুধু নেকির কাজই করেছি?

মানুষ গুনাহে লিপ্ত হলেও তাকে সর্বদা এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাকেও উদ্দেশ্য করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ

‘আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে এবং উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে।’

এবং এ আয়াতেও আল্লাহ তাআলা তাকেও উদ্দেশ্য করেছেন। তিনি বলেন:

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

‘যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকাজ করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ মুসলিম, তাঁর অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার হতে পারে?’

আমরা যতই গুনাহগার হই না কেনো আল্লাহ তাআলার সকল আয়াতের উদ্দিষ্ট আমরাই। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমান থাকবো আমরাই তাঁর সকল আয়াতের উদ্দিষ্ট। যতক্ষণ আমরা চেষ্টা করবো তিনি যেনো আমাদের একটা ভালো কাজের মাধ্যমে অন্য একটা খারাপ কাজ মুছে দেন।

এক লোক হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহর নিকট আসলে হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ তাকে প্রশ্ন করলেন, হে লোক! তুমি কি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করো? সে বললো, না। তিনি বললেন, কেনো? সে বললো, আমার ভয় হয় যে, আমি মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবো আর আমি নিজেই তা করবো না এবং আমি মানুষকে অসৎ কাজের নিষেধ করবো আর আমি নিজেই তাতে লিপ্ত থাকবো, কারণ আমি অনেক ভুল করি, আমি অনেক গুনাহে লিপ্ত। তখন হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, সুবহানাল্লাহ! শয়তান তো এটাই চায় যে, সে তোমাদের এভাবেই ধোঁকা দিবে। হে লোক! আমাদের মধ্যে কে আছে যে গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত? যে কোনো একটা বিতর্কিত কাজে লিপ্ত নয়? তা সত্ত্বেও তো আমরা মানুষকে ওয়াজ-নসিহত করি, যে জানে হয়তো এর মাধ্যমে একজন লোক মুক্তি পেয়ে যাবে? সুতরাং শয়তান যেনো তোমাকে নিয়ে আর খেলা করতে না পারে এবং তোমাকে ধোঁকা দিতে সফল না হয়। এমনকি কেউ যদি গুনাহ ও পাপাচরের ঘর থেকে বের হয় এবং তাতে কোনো ভিক্ষুক তাঁর কাছে হাত পাতে তাহলে তখনও যেনো সে তাকে সদকা করে। তুমি তো এর বিনিময়ে প্রতিদান পাবে। তুমি বলবে, শায়খ! আমি তো এই মাত্র মদ পান করেছি অথবা কোনো অশ্লীল কাজ করার কারণে আমি এখনও তো নাপাক। আর তাই এটা একটা কাজ আর ওটা আরেকটা কাজ। তুমি গুনাহের কাজ করেছো, এর জন্যে আল্লাহ তাআলা তোমার হিসাব নিবেন। অনুরূপভাবে তুমি কোনো নেকির কাজ করলে তাঁর হিসেবেও আল্লাহ তাআলা করবেন।

নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধে বেরুতেন তখন তিনি কিন্তু একথা বলে ঘোষণা দিতেন না যে, আমাদের সাথে কেবল পুত-পবিত্র লোকেরাই বেরুতে পারবে, যারা কখনো কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়নি কেবল তারাই আমাদের সাথে যেতে পারবে। না, তিনি কখনোই এমন আদেশ দেননি, কারণ তাঁর সাথে যারা জিহাদে বেরুতো তারা কেউ ফেরেশতা ছিলো না যে, তাঁরা কখনো আল্লাহর কোনো আদেশ অমান্য করবে না বরং সর্বদা তাঁর আদেশ মেনে চলবে। বরং নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, তাঁর সাথে যুদ্ধ যাচ্ছে তাঁরা হল আদম সন্তান, আর আদম সন্তান ভুল করবেই। তাই তো তিনি বলেন :

‘প্রতিটি আদম সন্তানই ভুল-অন্যায়কারী আর সবচেয়ে ভাল অন্যায়কারী হল সে যে তাওবাকারী ও অনুতাপী।’

সুতরাং এসো আমার সকলেই একমত হই যে, আমাদের মধ্যে যারা মাদ্রাসায় আছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে এবং যত বস্তু আছে, হোক তারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানে একসাথে থাকার কারণে বন্ধুত্ব হয়েছে অথবা কোনো এক সফরে গিয়ে তারা সারিচয় হয়েছে অথবা অন্য কোনো যোগাযোগে, আমরা যা যতটুকু পারি নেককাজ করবো এবং কাউকে কোনো অন্যায় কাজ করতে দেখলে তাকে বাধা দিবো, হোক-না মোরগ কোনো একটা বিষয়ে ঘাটাতি আছে, আমি কোনো একটা অপরাধের সাথে জড়িয়ে আছি; কিন্তু এটা যেনো আমাকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরত রাখতে না পারে। অনুরূপভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বাজারে অথবা অন্য কোনো স্থানে সকল বোনেরা বলছো, যখন আপনি বাজারে যাচ্ছেন আপনি দেখলেন, আপনারই কোনো সহপাঠী বা পরিচিত কেউ কোনো একটা খারাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে, তাহলে আপনি তাকে তা থেকে নিষেধ করবেন, এমনকি আপনি যদি হিজাববিহীন বেপর্দায এবং আপনার মধ্যে কোনো গুনাহের বিষয়ও থাকে তবুও আপনি তাকে তা থেকে নিষেধ করবেন। আপনি তাকে বলবেন হে বোন! এটা ঠিক যে আমি এখন বেপর্দায আছি, এটা একটা গুনাহের কাজ; কিন্তু তুমি যা করেছো এটা অন্যায়, সুতরাং তুমি এ কাজ থেকে বিরত থাকো। অথবা আপনি কোনো বোনকে দেখলেন যে, সে সালাত আদায় করছে না তখন আপনি তাকে সালাত আদায় করতে বলবেন, আপনি তাকে বলবেন বোন! তুমি পর্দা করো না ঠিক আছে, তবে সালাতটা তো কমপক্ষে আদায় করো, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

‘মুসলমান এবং কাফের-মুশরিকদের মাঝে পার্থক্য হল সালাত ছেড়ে দেওয়া।’

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘আমাদের মাঝে এবং তাদের মাঝে যে চুক্তি রয়েছে তাহলে সালাত, সুতরাং যে সালাত ত্যাগ করল সে কুফরি করলো।’

হাঁ, আপনি যদি বেপর্দায থাকেন তাহলে আপনি কোনো সালাত ত্যাগকারীকে সালাতের আদেশ দিলে আপনার কি কোনো ক্ষতি হবে? আপনি আপনারি কাজ থেকে অশ্লীল কাজ থেকে বিরত হতে বলুন আপনার কি কোনো ক্ষতি হবে? আমরা যখন মানুষকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবো থাকবো এবং ভাববো যে, পুরো কুরআনে কারীম আল্লাহ তাআলা আমাকেই সম্বোধন করেছেন, তাহলে আবার সাহাবাদের যুগ ফিরে আসবে।

আবু মিহজান রা. যদিও একটা যুদ্ধের মধ্যে ছিলেন এবং একটা গুনাহ করতেন, তা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে কখনো ছোটো করে দেখেন নি। তিনি বলেছেন, হাঁ আমি একটা ভুল করেছি, আমার দ্বারা একটা কবিরা গুনাহ হয়ে যায় এবং একটা বিষয় শয়তান আমাকে নিয়ে খেলা করে; কিন্তু আমি কিছুতেই শয়তানকে এই সুযোগ দিব না যে, শয়তান আমার উপর এই জঘন্য ও বেশি প্রভাব বিস্তার করুক। আমাকে আরো বেশি গুনাহের কাজে লিপ্ত করুক। যা এটা সত্য যে, শয়তান আমাকে একবারে ধোঁকা দিয়েছে, আমি মদ পান করেছি, একবার ধোঁকা খেয়েছি; কিন্তু আমি তাকে এর চেয়ে বেশি সুযোগ দিব না, আমি জিহাদ থেকে বিরত থাকবো না বরং আমি জিহাদ করবো এবং দীনের সাহায্য করবো। আর একারণেই দীনের বিজয় হয়েছে। এমন অসংখ্য মানুষের মাধ্যমে দীনের বিজয় হবে শয়তান যাদেরকে ধোঁকা দিয়ে বিচলিত করতে পারে নি।

আমি আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাদের এবং আপনাদের তাঁর আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করুন। এবং আমরা যেখানে থাকি না কেনো তিনি আমাদেরকে তাঁর কল্যাণ ও বরকতের সাথে রাখুন। আমিন。

টিকাঃ
১. সূরা মায়েদা, আয়াত : ৯১
১. সূরা নাহাল, আয়াত : ১২৫
১. সূরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৩

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 আমরা যে কত নেকি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি!!

📄 আমরা যে কত নেকি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি!!


জান্নাতের সবচেয়ে উচ্চ স্তর চাওয়া ও কামনার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন ধরনের। আমাদের হাবিব, আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রা.কে জান্নাতের উচ্চতর কামনা করার জন্য উৎসাহিত করতেন। সাহাবাদের মধ্যে জান্নাতের সবচেয়ে উচ্চ স্তর অর্জনের জন্য অগ্রস্রুতি করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সাহাবায়ে কেরামের জিজ্ঞাসা ও প্রশ্নের ধরন থেকেই এটা বুঝা যায় যে, তাঁরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিষয়টাই কামনা ও পেতে চাইতেন। উদাহরণস্বরূপ বলি, যেমন একজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি? একটু ভেবে দেখো যে, সকল আমলই তো পছন্দনীয়; কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় কোনটি? তাই তাঁর প্রশ্ন হল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি? তিনি বলেন, সময়মতো সালাত আদায় করা অপর একজন এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কিয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী কে থাকবে? লক্ষ্য করে দেখুন, এখানে কিন্তু সে এই প্রশ্ন করে নি যে, কারাকারা আপনার নিকটবর্তী থাকবে? বরং তাঁর প্রশ্ন হল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কিয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী কে থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ও কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তীসে-ই থাকবে, যার আখলাক-আচরণ তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দর হবে। এক সাহাবি এক যুদ্ধের শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! বান্দার কোন আমল দেখে আল্লাহ তাআলা বেশি খুশি হন এবং তিনি হাসেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে শত্রুদের ভিতরে গিয়ে যুদ্ধ করে। চতুর্থ আরেক জন এসে প্রশ্ন করে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে উত্তম আমল কোনটি? অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম রা. সর্বদা জান্নাতের উচ্চতর ও সবচেয়ে উর্দ্ধ মর্যাদা কামনা করতেন। আর একারণেই প্রতিটি কল্যাণকর কাজের বিষয়ে তাঁরা অনেক আগ্রহী থাকতেন। এবং আমলের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে প্রতিযোগীতাও লিপ্ত হতেন। জান্নাতের উঁচু মর্যাদা নিয়ে প্রতিযোগিতাকারী সাহাবিদের মধ্যে একজন ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.। জানাযার নামাজ নিয়ে তাঁর একটি চমৎকার ঘটনা রয়েছে, এখন আমরা এখানে সেই ঘটনাটি উল্লেখ করছি।

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. আবু হুরাইরা রা.কে একটি হাদিস বলতে শুনলেন। আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

‘যে ব্যক্তি জানাযার সালাত আদায় করবে তার এক কিরাত সাওয়াব হবে। (আর এক কিরাত হল উহুদ পাহাড়ের সমান সাওয়াব) আর যে, কবর দেওয়ার আগ পর্যন্ত মাইয়েতের সাথে থাকবে, তার দুই কিরাত সাওয়াব হবে।’

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এই হাদিস প্রথম শুনলেন, তাই তিনি আবু হুরাইরা রা.কে বললেন, ঠিক তোমারে? তুমি এটা কী বলছ? আবু হুরাইরা রা. বললেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমাদেরকে তাই বলছি যা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শুনেছি। অর্থাৎ যারা জানাযার সালাত আদায় করবে, তার জন্যে এক কিরাত সাওয়াব হবে। আর যারা তাওয়া অনুসরণ করে কবর পর্যন্ত যাবে, কবর খনন করবে, তাকে গোসল করাবে, তাকে কবরে নামাবে, জানাযায় খাটায় বহন করবে, তাকে কবর দিবে, মাইয়েতের পরিবারকে সান্ত্বনা দিবে, তাদের জন্যে দুই কিরাত সাওয়াব। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. যখন এই হাদিস প্রথমবার শুনলেন তখন তিনি এক লোককে এই হাদিস যাচাই করার জন্যে আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠালেন। আয়েশা রা. আলেমা সাহাবি, তিনি ছিলেন হাফিজুল হাদিস এবং ফকিহ। তাই আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এক লোককে আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠালেন এবং তাকে বললেন, তুমি আয়েশা রা.-এর নিকট গিয়ে এই হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো।

লোকটি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর নিকট থেকে চলে গেল, তখন ইবনে ওমর রা. একটি পাথরের টুকরা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে লোকটির আসার অপেক্ষা করতে ছিলেন এবং ভাবতে লাগলেন, এটা কি হাদিস হিসেবে প্রমাণিত হবে না-কি হবে না। যদি এটা হাদিস হয়ে থাকে তাহলে এতগুলো বছর আমি এই সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছি!! আমি আখেরাতের ব্যাপারে সাওয়াব অর্জনের ব্যাপারে পরিপূর্ণ মনোযোগী নয়ি। আমি যদি আখেরাতের ব্যাপারে পূর্ণ মনোযোগী হতাম! তাহলে আমি কেনো এই হাদিস জানি না? তিনি পেরেশানিতে একটি পাথর হাতে নিয়ে ঘুরতে লাগলেন এবং লোকটি ফিরে আসা পর্যন্ত প্রত্যাবর্তন ছিলেন। অতঃপর যখন লোকটি ফিরে এসে বলল, হ্যাঁ আয়েশা রা. বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই হাদিস শুনেছেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হাতে থাকা পাথরটি মাটিতে ছুড়ে মারলেন এবং বললেন, সুবহানাল্লাহ! কত সাওয়াব আমাদের থেকে ছুটে গেল!!

সেই মানুষ নেকির কাজ ছুটে গেলে আফসোস করে ও সামনে যেনো তা না ছুটে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকে সেইতো সফল মানুষ। সাইদ ইবনে আবদুল আজিজ বলতেন, আমি সর্বদাই জামাতে সালাত আদায় করার ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকতাম। একদিন আনার জামাত ছুটপেল, তখন আমার খুবই আফসোস হল, আমি পেরেশান হয়ে পড়লাম। অধিক আফসোস ও পেরেশানির কারণে আমি ভেঙে পড়লাম। সেই মুহূর্তে আমার এক সাথী ইবনে মারওয়ান আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল, আল্লাহ তোমাকে জামাত ছুটে যাওয়ার শোক কাটিয়ে উঠার তাওফিক দান করুন। তিনি বলেন, আমার সন্তান যদি মারা যেতো তাহলেও তো আমাকে কতো মানুষ সান্ত্বনা দিতে আসতো। অথচ আজ আমার জামাত ছুটে গেল কিন্তু ....। অর্থাৎ তাদের কাছে জামাত ছুটে যাওয়াটা সন্তান মারা যাওয়ার চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক ছিল। তাঁরা এটাকে এর চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক ও কষ্টকর মনে করতেন। সালাফিদের একজন বলতেন,আমার একবার এশার জামাত ছুটে গেল, তখন আমি পার্শ্ববর্তী মসজিদে গেলাম, সেখানে গিয়ে দেখি সেখানেও জামাত শেষ হয়ে গেছে। অতঃপর আমি অন্য পার্শ্ববর্তী মসজিদে গিয়ে দেখি এখানেও জামাত চলছে। অতঃপর আমি বাড়ি ফিরে এলাম এবং আফসোস করতে লাগলাম যে, কীভাবে আমার সাতসাতটি মর্যাদা ছুটে গেল!! তিনি বলেন, অবশ্যই আমি সাতশবার সালাত আদায় করবো।

কোনো নেকির কাজ ছুটে যাওয়া তাঁদের কাছে সাধারণ কোনো ব্যাপার ছিলো না। তাঁরা এটাকে কোনো সাধারণ ব্যাপার মনে করতেন না। তাঁদের কেউ এরকম বলতো না যে, একবার জামাতও ছুটেছে, এটা তো সাধারণ ব্যাপার, আমি তো সবসময় জামাতেই সালাতআদায় করি। গতকাল জামাতের সাথে সালাত পড়েছি, এর পূর্বে পড়েছি সামনেও পড়বো। এক ওয়াক্ত জামাত ছুটেছে তো এতে কী এমন বিশেষ ক্ষতি হয়ে গেছে? অথবা আমি এই মিসকিনকে কিছু সদকা করিনি তো কী হয়েছে? আমি তো ইতঃপূর্বে অনেক সদকা করেছি? না তাঁরা কখনো এমনটি বলেননি। বরং তাঁদের যখনই কোনো নেকির কাজ ছুটে যেতো তখনই তাঁরা এর জন্যে অনেক আফসোস করতেন। বরং এটা তাঁদের কাছে নিজ সন্তান হারানোর চেয়েও বেশি কষ্টকর ও বেদনাদায়ক ছিল।

সালাফ বলতেন, অতঃপর আমি সাতশবার সালাত আদায় করলাম। সালাত আদায় করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে সেখানেই ঘুমিয়ে গেলাম। আমি যখন ঘুমিয়ে গেলাম তখন স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটা ঘোড়ায় আরোহণ করেছি। আর আমার এসকল সাথীরাও ঘোড়ায় আরোহণ করেছে যারা জামাতের সাথে ইশার সালাত আদায় করেছে, অতঃপর তাঁরা ঘোড়া ছুটাচ্ছে এবং দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমিও তাদের পিছন পিছন ঘোড়া ছুটাচ্ছি, তাদের সামনে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করছি; কিন্তু আমি তাদের সাথে যাবো তো দূরের কথা তাদেরই ধরতে পারছি না। তখন তাদের থেকে একজন আমার দিকে তাকিয়ে বলো, তুমি তো আমাদের কিছুতেই ধরতে পারবেনা, কারণ আমরা তো ইশারার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করেছি।

হয়তো অধিক পেরেশানির কারণে এই স্বপ্নটা দেখেছে, কারণ সে এই আফসোস করেকরে রাতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল, কীভাবে আমার জামাত ছুটপেল; কিন্তু তাঁর এই আফসোস ও পেরেশানি ছিলো বিশাল প্রতিদান পাওয়ার আশায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরامকে উৎসাহ দিতেন তাঁরা যেনো বেশি বেশি সাওয়াবের আশা করে এবং নেক আমল করার ব্যাপারে আগ্রহী থাকে। একারণেই সাহাবায়ে কেরাম রা. কোনো কল্যাণ ও নেক আমল ছুটে গেলে এর জন্যে অনেক আফসোস করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.কে বলেন, হে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর! (আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর বয়স তখন পনের বছরও কম ছিল।) তুমি অমুকের মতো হয়ো না, সে তো রাতে জাগ্রত হয়েও কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করেন।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সারা বছর রোজা রাখতেন। তিনি দুই ঈদের দিন ব্যতীত আর কোনো দিন রোজা ভাঙতেন না। তিনি সারা রাত জাগ্রত থেকে সালাত আদায় করতেন এবং দৈনিক এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি মানুষকে কোনো সময়ই দিতেন না,এমনকি নিজ পরিবারকেও কোনো সময় দিতেন না। দিন-রাত শুধু ইবাদত-বন্দেগি করতেন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডাকে ডাকলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তাঁকে এর উপর উৎসাহিত করেছেন? তিনি তাঁকে সাওয়াব অর্জনের প্রতি এই আগ্রহের প্রশংসা করেছেন না-কি তিনি তাঁর এই আগ্রহকে দমিয়ে দিয়েছেন?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর! আমি কি তোমাকে বলবো যে, তুমি সারা রাত জেগে সালাত আদায় করো? তিনি বললেন, হ্যাঁ হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি রাতের তিন ভাগের এক ভাগ বা অর্ধেক রাত জেগে সালাত আদায় করবে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরথেকে কিছুটা ইবাদত কমাতে চাইলেন, যাতে করে অতিরিক্ত ইবাদতের কারণে লোকটি ক্লান্ত না হয়ে পড়ে। হ্যাঁ সাওয়াব ও নেকির কাজ ছুটে গেলে আমাদের ক্রন্দন ও আফসোস করা উচিত। যেমনটি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর ব্যাপারে ঘটেছিল। যখন হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর মায়ের মৃত্যু হল, তখন তিনি অধিক ক্রন্দন করতে লাগলেন। লোকেরা তাঁকে বলল, শায়খ! আপনি কাঁদছেন অথচ আপনিই তো আমাদের ধৈর্য শিক্ষা দেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার জান্নাতে যাওয়ার দুইটি পথ ছিল, আজ আমার থেকে একটি বন্ধ হয়ে গেল। আর এখন মাত্র একটি পথ বাকি আছে।

হে ভাই! সালাফগণ কোনো নেকি ছুটে গেলে এমনই আফসোস করতেন। বলছিলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. কে বললেন, আমার কাছে বলা হয়েছে তুমি না-কি দৈনিক কুরআন খতম করো? তিনি বললেন, জি। তিনি বললেন, তুমি এমনটি করো না বরং তুমি মাসে এক খতম তিলাওয়াত করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি প্রতি সপ্তাহে এক খতম তিলাওয়াত করো। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি প্রতি তিন দিন এক খতম তিলাওয়াত করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না; এরচেয়ে বেশি তিলাওয়াত করবে না। যে ব্যক্তি তিন দিনের কমে তিলাওয়াত করে সে কুরআন বুঝবে না। আর সিয়ামের ব্যাপারে তাঁকে বললেন, তুমি মাসে তিন দিন সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রতি সোমবারে ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি একদিন সিয়াম পালন করে ও একদিন ভঙ্গ করো অর্থাৎ একদিন পর পর সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবো? তিনি বললেন, না; এর চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। এটা হচ্ছে দাউদ আ.-এর সিয়াম। তিনি একদিন সিয়াম পালন করতেন এবং একদিন ভঙ্গ করতেন।

এরপর থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. এভাবে আমল করতেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. সর্বদা নেক আমলের জন্য আগ্রহী থাকতেন। তাঁদের একটি নেক আমল ছুটে গেলে এর জন্যে অনেক আফসোস করতেন। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. ‘কিরাতের’ হাদিস পেরিতে তুনার পর আফসোস করেছেন। তিনি যখন জানাযার সালাত আদায় করলে এক কিরাত এবং তাকে সমাহিত করা পর্যন্ত তার সাথে থাকলে আরো এক কিরাত মোট দুই কিরাত সাওয়াব পাওয়া যায় তখন তিনি অধিক পেরেশান হয়ে পাথর হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। এভাবেই তাঁদের যখন কোনো নেকি কাজ ছুটে যেতো তখন তারা এর জন্যে আফসোস করতেন ও কাঁদতেন।

হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রা.- এর নিকট গিয়ে দেখলেন আয়েশা রা. কাঁদছেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, তুমি কাঁদছো কেন? একথা শুনে তিনি আরো বেশি করে কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি এজন্য কাঁদছো যে, তুমি হাজ্জ ও ওমরাহ করার কারণে তোমার ওমরাহ ছুটে গেছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমার শরীর হাজ্জ ও ওমরাহ নিয়ে ফিরে যাবে আর আমি শুধু হাজ্জ নিয়ে যাব। হে ভাই! তুমি কি একবার লক্ষ করেছো? নেকির কাজ ছুটে যাওয়ার কারণে তিনি কিভাবে কাঁদছেন ছে। উম্মে সালামা রা. হাজ্জ ও ওমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, হাফসা রা. হাজ্জ ও ওমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, যায়নাব রা, হাজ্জ ও ওমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, তাহলে তিনি কিভাবে শুধু হাজ্জ করে ফিরে যাবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আয়েশা রা.-এর ক্রন্দন দেখলেন তখন তিনি তাঁর ভাই আব্দুর রহমান রা. কে আদেশ দিলেন তিনি যেনো তাঁকে ওমরাহ করিয়ে নিয়ে আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কারো মধ্যে ভালো কাজের আগ্রহ দেখতেন তখন তিনি খুশি হতেন। আব্দুর রহমান রা. আয়েশা রা.কে নিয়ে তানঈমে গেলেন, তানঈম হল সবচেয়ে কাছের মিকাত। মক্কাবাসীদের মিকাত এবং যারা দূর থেকে হজ্জ করতে আসে তারা ওমরার জন্য সেখান থেকে ইহরাম বাঁধে। তানঈমে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে, যার নাম মসজিদ আয়েশা রা., কারণ আয়েশা রা. ওমরার জন্য সেখান থেকে ইহরাম বেঁধেছেন এই কারণে এ মসজিদের নাম হয়েছে ‘মসজিদে আয়েশা রা.।’ অতঃপর আয়েশা রা. তাঁর ভাই আব্দুর রহমান রা.-এর সাথে তানঈমে গেলেন এবং ইহরাম বাঁধলেন, অতঃপর বাইতুল্লাহর এসে তাওয়াফ করে তালবিয়া পড়ে ওমরাহ আদায় করলেন। হ্যাঁ সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহিন এভাবেই কোনো নেকির কাজ ছুটে গেলে আফসোস করতেন ও এর জন্যে ক্রন্দন করতেন।

হে ভাই! যারাই নেকির কাজ করার জন্য দৃঢ় সংকল্প করবে এবং কোনো নেকির কাজ ছুটে গেলে এর জন্যে আফসোস করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কল্যাণকর কাজ করার তাওফিক দান করবেন। যে ব্যক্তি সালাতের আগের সুন্নত ছুটে গেলে আফসোস করে, অতঃপর ফরয সালাতের পর এর কাযা করে নেয়, সে অচিরেই জামাতের সাথে সালাত আদায় করার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি একবার দেখলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের পর সালাত আদায় করেছেন। ফলে আমি আশ্চর্য হলাম, কারণ সেটা হল সালাতের জন্যে নিষিদ্ধ সময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, তখন আমি আমার এক দাসী।কে বললাম, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে তাঁকে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামা বলেছে, আমি আপনাকে বলতে শুনেছি আপনি এই সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। তাহলে আপনি কিভাবে সালাত আদায় করছেন? তিনি বললেন, তিনি যদি তোমাকে ইশারা করেন তাহলে তুমি সেখান থেকে চলে আসবে। তখন দাসীটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! উম্মে সালামা বলেছে, আমি আপনাকে বলতে শুনেছি যে, আপনি এই সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। তাহলে আপনি কিভাবে সালাত আদায় করছেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ইশারা করলেন এবং তিনি সালাত আদায় করতে থাকলেন। তখন সে চলে গেল। অতঃপর তিনি যখন সালাত শেষ করলেন তখন বললেন, হে উম্মে সালামা বনি কায়েসের প্রতিনিধি দল এসেছিল, তাঁরা আমাকে যোহরের পরের দুই রাকাত সালাত পড়া থেকে ব্যস্ত রেখেছিল, তাই আমি তা এখন আদায় করলাম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে এর উপর প্রশিক্ষণ দিতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন এক সাহাবি ফজরের পর নিষিদ্ধ সময়ে সালাত আদায় করছে। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী করছো? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ফজরের নফল (সুন্নত) আদায় করছি, আমি তা ফজরের পূর্বে আদায় করতে পারিনি। আমার থেকে তা ছুটে গেছে। সুতরাং আমি তা এখন আদায় করছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি প্রতি সপ্তাহে এক খতম তিলাওয়াত করো। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘যে সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে যাবে অথবা সালাত আদায়ের কথা ভুলে যাবে, অতঃপর যখন স্মরণ হয় তখনই যেনো সে তা আদায় করে নেয়।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে কিয়ামুল লাইল না করে ঘুমিয়ে থাকতেন, তিনি তা সকালে সূর্য উঠার পর আদায় করে নিতেন। যাতে এর প্রতিদান থেকে বঞ্চিত না হন।

সুতরাং আমাদের অবস্থাও যেনো এমন হয়, আমাদের কোনো নেকের কাজ ছুটে গেলে এর জন্য আফসোস করিয়ে, হায়! আমি উত্তম সময়ে সালাত আদায় করতে পারলাম না, মুস্তাহাব সময়ে ওমরাহ করতে পারলাম না, দোয়া কবুলের উত্তম সময় দোয়া করতে পারলাম না এবং মসজিদ নির্মাণের সুযোগটি আমি গ্রহণ করতে পারলাম না। এমন বিভিন্ন আমল ও সাওয়াবের কাজ আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেলে আমাদের আফসোস করা উচিত এবং পরে এর অনুরূপ কাজ করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ঈমান ও হেদায়েত এবং প্রতিটি কল্যাণকর কাজ সময়মতো করার তাওফিক দান করেন। এবং আমরা যেখানেই থাকি, যে অবস্থাই থাকি তিনি আমাদেরকে তাঁর রহমত ও বরকতের মধ্যে রাখবেন। আমিন।

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 উলামায়ে কেরামের মর্যাদা

📄 উলামায়ে কেরামের মর্যাদা


আল্লাহ তাআলা উলামায়ে কেরামের মর্যাদা অনেক উচ্চে রেখেছেন। তিনি বলেন :

شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

‘আল্লাহ সাক্ষী দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। ফেরেশতাগণ ও ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি মহা পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’

আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে উলামায়ে কেরামের সাক্ষ্যকে ফেরেশতাদের সাক্ষ্যের সাথে একত্রে এনেছেন।

অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় পায়।’

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উলামায়ে কেরامকে পছন্দ করেন এবং উলামায়ে কেরামকে নির্বাচন করে তাঁদের অন্তরে তাঁর ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। মানব জীবনের প্রতিটি বিষয়ে উলামায়ে কেরামের যতটা প্রয়োজন প্রকৌশল ও অন্ধকারের প্রতি ততটা প্রয়োজন নেই। আল্লামা হাফিয ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহু তাঁর ‘মিফতাহু দারি আসসাদাহ’ নামক কিতাবে বলেন, মানুষ ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকৌশলীদের ব্যতীত চলতে পারবে, কারণ এই বিষয়টা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আয়ত্ত করা যায়। হাঁ একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, বর্তমান সময়ে ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকৌশলীদের গুরুত্ব অনেক; কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকৌশলী না থাকলেও মানুষ চলতে পারবে, তারা তাদের কাজ নিজেরাই চালিয়ে নিতে পারবে, কারণ অনেকেতো কোনো ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকৌশলীর সাহায্য ব্যতীত নিজেদের বাড়ি নির্মাণ করেছে এবং এখনও করছে, এর কোনো হিসাব নেই। মানুষ ডাক্তার ব্যতীত চলতে পারবে, কারণ মানুষ যদি বাধ্য হয় তাহলে তাদের ব্যতীতও সে এ কাজ চালিয়ে নিতে পারে। মানুষের প্রকৃতিই এমন যে, বাধ্য হলে সে যেকোনো কাজ করতে পারে। সে তার অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই বুঝতে পারে যে, কোন জিনিসটা তার জন্যে উপকার আর কোন জিনিস অপকার; কিন্তু মানুষ কখনোই উলামায়ে কেরাম ব্যতীত চলতে পারবে না, কখনোই তাদের থেকে মুখাপেক্ষী হতে পারবে না, কারণ শরীয়তের ইলম কোনো অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন হয়নি এবং তা অর্জন হয়নি কোনো মানুষের দ্বারা; বরং তা নাযিল হয়েছে ওহির মাধ্যমে এবং সে ওহিবাচক হিসেবে আল্লাহ তাআলা পাঠিয়েছেন নবি ও রাসুল আ.কে। অতঃপর নবি রাসুলগণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আনিত ওহি মানুষকে শিখিয়েছেন এবং তাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। একারণেই আল্লাহ তাআলা সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টা উলামায়ে কেরামের জন্যে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

এমনকি কিয়ামতের দিনও আলেমদের সম্মান ও মর্যাদা থাকবেসকল একবর্গ সবার থেকে আলাদা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘ইন্নালমালাক্বাতা আলেমদের চেয়ে আলেমের মর্যাদা হল সকল তারকার উপর চাঁদের মর্যাদার মত।’

অন্য হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘ইলম ছাড়া আলেমদের চেয়ে আলেমের মর্যাদা হল তোমাদের সাধারণ মানুষের উপর আমার মর্যাদার মত।’

হে ভাই! একবার লক্ষ করে দেখো আলেমদের মর্যাদা কত বড়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জ্ঞানহীন আবেদদের চেয়ে আলেমদের মর্যাদা হল তোমাদের সাধারণ মানুষের উপর আমার মর্যাদার মত। একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের মধ্য থেকে একটি জামাতকে কোনো এক যুদ্ধে পাঠালেন। সেখান থেকে ফেরার সময় এক স্থানে যারা বিরতি করলেন এবং সেখানে রাত কাটালেন। রাতে এক আহত মুজাহিদের ইহতিলাম হল (স্বপ্নদোষ হল)। তাঁর মাথায় ছিলো ক্ষত। সে সকালে ঘুম থেকে উঠে সাথীদের বললো, হে কওম! আমার ইহতিলাম হয়েছে, আর আমার নিকট পর্যাপ্ত পানিও নেই। এখন তোমরা কি মনে করো যে, আমার গোসল না থাকার ব্যাপারে এবং সালাত আদায়ের ব্যাপারে কোনো সুযোগ আছে? লোকেরা বললো, না আমরা এব্যাপারে তোমার কোনো সুযোগ দেখছি না। লোকটি আবার বললো; কিন্তু আমার মাথায় তো আঘাতের ক্ষত রয়েছে, যদি সেখানে পানি লাগে তাহলে আমার ক্ষতি হবে। লোকেরা বললো, না আমরা এব্যাপারে তোমার কোনো সুযোগ দেখছি না। তোমাকে গোসল করেই সালাত আদায় করতে হবে। তখন অপারগ হয়ে লোকটি গোসল করল এবং তার ক্ষতের মধ্যে পানি লাগার কারণে সে মারা গেল। অতঃপর দীর্ঘ সফরের পর কাফেলা যখন মদিনায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলো এবং তাঁকে লোকটির ইহতিলাম হওয়া, গোসল করা ও মারা যাওয়ার ঘটনা বলা হল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, সে কি গোসল করার কারণে মারা গেছে? তাঁরা বললো, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যারা তাঁকে হত্যা করেছে আল্লাহ তাআলা তাদের ধ্বংস করবেন। যারা তাঁকে হত্যা করেছে আল্লাহ তাআলা তাদের ধ্বংস করবেন। যারা তাঁকে হত্যা করেছে আল্লাহ তাআলা তাদের ধ্বংস করবেন। তারা যখন অজ্ঞ তাহলে কেন তারা জিজ্ঞেস করলো না। তারা যখন জানে না তাহলে কেনো তারা জিজ্ঞেস করলো না। অক্ষমের চিকিৎসাকে তো অজ্ঞকে জিজ্ঞেস করা। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘তার জন্যে তো এটাই যথেষ্ট ছিলো যে, সে তার দুই হাত পবিত্র মাটিতে মারবে এবং তা দিয়ে তার মুখমণ্ডল এবং দুই হাতের কনুইসহ মাসাহ করবে। এবং তার মাথার উপর ব্যাডিজ পেঁচিয়ে এর উপর মাসাহ করবে।’

ইবনে হাবাইর রহিমাহুল্লাহ ছিলেন একজন মহামারিময় উজির, তিনি অনেক সম্পদের অধিকারী এবং সমাজের একজন সম্মানিত লোক ছিলেন। তিনি উলামায়ে কেরামকে সম্মান করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য নিজে গৃহ দাওয়াতও করতেন। একদিনে মায়েশারের এক দিন উলামায়ে কেরামের সাথে বসেছেন। সেখানে মায়েশি মায়েশারের এক জন উপস্থিত হলেন। তাঁরা একটি মাসআলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন মালেকি মাযহাবের ফকিহ মাসআলাটি নিয়ে তাঁদের সাথে মোকাবেলাও শুরু করলেন। মাসআলাটির ক্ষেত্রে সেখানে থাকা সকল আলেম একমত; কিন্তু একমাত্র তিনিই তাতে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। অতঃপর তাঁরা বলল, হ্যাঁ মাসআলাটি আপনি যেমন বলেছেন তেমনও হবে, তবে আমরা যেটা বলছি সেটাই উত্তম। মালেকি ফকিহ বললেন না বরং উত্তম এটা। ইবনে হাবাইর রহিমাহুল্লাহ তখন আশ্চর্য হয়ে তাঁকে বললো, সকল আলেম একদিকে আর তুমি একদিকে? তখন সে ইবনে হাবাইরের সাথেও মোকাবেলাও শুরু করলো এবং নিজের মতের উপরে অটল রইলো এবং বললো, আমি যেটা বলেছি সেটাই সঠিক। ইবনে হাবাইর তখন বললো, তুমি কি এটা গাঁধা? তখন শরূফ চুপ হয়ে গেল। এর কিছুক্ষন পর মজলিস শেষ করে সকলে চলে গেল। একবর্গ বড় মহান আলেম ও শায়েখকে এধরনের কথা বলার কারণে ইবনে হাবাইর খুবই লজ্জিত হলেন এবং বললেন, একজন শায়েখের ব্যাপারে, একজন আলেমের ব্যাপারে আমি এধরনের বাক্য কীভাবে বললাম? অথচ তিনি একজন আলেম!! এভাবে আক্ষেপ আর পেরেশানির কারণে ওই রাতে তিনি আর ঘুমাতে পারলেন না।

হে ভাই! একবার লক্ষ করে দেখো, তাঁরা উলামায়ে কেরামের কতটা সম্মান করতো। ঐসকল লোকেদের কতটা সম্মান করতো, যারা ইলম অর্জনের জন্যে হাঁটু গেড়েছে, দীর্ঘ সময় ব্যয় করে কুরআন হিফয করেছে এবং কুরআন-হাদিস বুঝার জন্যে জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছে এবং কুরআন-সুন্নাহর খেদমতের জন্যে নিজের জীবন ওয়াকফ করেছে? আল্লাহ তাআলা এই লোকেদের মাধ্যমেই তো তাঁর দীনের খেদмат করেন, সুতরাং এই আলেমদের সম্মান করতে হবে। ইজ্জত ও সম্মানই তাঁর প্রাপ্য। পত্র-পত্রিকায় তাকে ঠাট্টা-উপহাস করা বৈধ নয়, ইন্টারনেট এর ব্লগে, টেলিভিশন এর টকশোতে তাকে নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করা বৈধ নয়। অবশ্যই এগুলো বন্ধ করতে হবে এবং তাঁদের সম্মান করতে হবে, তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে।

যে জাতি আলেম-উলামাদের দুর্বল করে রাখল, তাঁদের অসম্মান করলো, তারা তো নিজেরাই নিজেদের অসম্মান করলো, তাদের দীনকে দুর্বল করে ফেললো এবং নিজেদের সম্মান নিজেরাই ধ্বংস করলো।

ইবনে হাবাইর রহিমাহুল্লাহ ওহিরও পেরেশানির মধ্যে রাত কাটালেন। পরদিন সকালে আবার যখন উলামায়ে কেরام আসলেন, গতকাল ‘গাঁধা’ বলে যে আলেমকে গালি দিয়েছিলেন তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান করলেন এবং তাঁর হাতেও চুমু খেলেন, অতঃপর বললেন, হে মানুষ! গতকাল অসতর্কতাবশত ভুলে আমার থেকে এই আলেমুল প্রতি অসম্মানমূলক কথা বের হয়েছিল। আল্লাহ্র শপথ করে বলছি, একারণে গতকাল সারা রাত আমার ঘুম হয়নি। সুতরাং আপনি আমার প্রতি সদয় হোন, আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আলেম বললেন, ঠিক আছে আমি আপনাকে ক্ষমা দিলাম; কিন্তু আলেম বলেননা, আপনি আমার প্রতি সদয় হোন, আমাকে অনুগ্রহ করুন। তখন তিনি বললেন, ঠিক আছে আমি আপনার প্রতি সদয় হলাম। ইবনে হাবাইর দাঁড়িয়ে বললেন, আমার কাছে আপনার প্রয়োজনের কথা বলুন। না আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে আল্লাহ্র দোহাই দিয়ে বলছি আপনি বলুন আপনার কোনো ঋণ আছে কি-না? আপনি যেহেতু আমাকে আল্লাহ্র কসম দিয়ে বলেছেন তাই বলছি আমার উপর ঋণ আছে। কত? আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি আপনাকে আল্লাহ্র দোহাই দিয়ে বলছি যে, আপনি আপনার ঋণ সম্পর্কে আমাকে জানাবেন। আমার উপর একশত দিনার ঋণ আছে। এই নিন আমি আমার ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে আপনার ঋণ পরিশোধের জন্যে একশত দিনার দিচ্ছি এবং আমি আপনাকে গতকাল যে কথা বলেছি তার জন্যে আমার পক্ষ থেকে এই নিন আরো একশত দিনার।

ইবনে হাবাইর ছিলেন একজন প্রভাবশালী উজির, তিনি চাইলেই এই মূর্খকে হত্যার নির্দেশ দিতে পারতেন; কিন্তু তা না করে তিনি তাঁর সম্মান করলেন, তার ঋণ পরিশোধ করে দিলেন, কারণ ওলামায়ে কেরাম সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, তাঁদের সম্মানই করতে হয়।

শায়খ সাইদ আল-হালাবি রহিমাহুল্লাহ, যিনি হাত প্রসারিত করেননি, তাই তাঁকে গা ভটিয়ে দিতে হয়নি। শায়খ সাইদ আল হালাবি রহিমাহুল্লাহ ছিলেন একজন বড় আলেম ও আল্লাহর ওলি। মানুষ তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করতো। তিনি সর্বদা শাসকদের থেকে মুখাপেক্ষী থেকেছেন, তাদের কাছ থেকে তিনি কিছুই গ্রহণ করেননি, কারণ আলেম যখন শাসকদের মুখাপেক্ষী হয়, তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করে এবং তাদের মজলিসে বেশি বেশি যাওয়া আসা করে ও সেখানে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারপর শাসকদের ব্যাপারে ফতোয়ার পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতি করতে শুরু করে; কিন্তু আলেম যখন শাসকদের থেকে মুখাপেক্ষী থাকে তখন তাঁর ফতোয়া হয় একমাত্র আল্লাহর জন্য। এর মধ্যে কারো কোনো পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির দুর্গন্ধ থাকে না। সুতরাং সাইদ আল-হালাবি রহিমাহুল্লাহও ছিলেন শাসকদের থেকে মুখাপেক্ষী, তিনি তাদের থেকে কোনো হাদিয়া গ্রহণ করতেন না। আর একবারই খলিফা তাঁকে কাযি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর তাঁর নিকট কিছু সম্পদ হাদিয়া হিসেবে প্রেরণ করেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, আমি আমার জন্যে বাইতুল মাল থেকে নির্ধারিত বেতনের বাইরে কিছুই গ্রহণ করব না। খলিফা তাঁকে বললেন, এটা আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য হাদিয়া। তিনি বললেন, আপনি যদি আমাকে হাদিয়া দিতে চান তাহলে আমাকে কাযির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিন। তখন খলিফা বললেন, ঠিক আছে আপনি কাযিই থেকে যান। এরপর খলিফা বললেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি যত দিন সে আমার হাদিয়া গ্রহণ না করবে ততদিন সে বিচার ক্ষেত্রে আমার পক্ষপাতিত্ব ও আমার প্রতি স্বজনপ্রীতি করবে না।

সাইদ আল-হালাবি রহিমাহুল্লাহ নিজ সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিলেন। তিনি শাসকদের থেকে কখনো কোনো কিছু গ্রহণ করতেন না বরং কষ্ট হলেও নিজ সম্পদ দিয়ে নিজের ও পরিবারের জনের ব্যয় করতেন। একদিন তিনি মসজিদে দরস দিচ্ছিলেন, বয়সের কারণে তাঁর পায়ে ব্যথা ছিলো, তাই তিনি তাঁর পা ছড়িয়ে দিয়ে রাখতেন। তিনি যখন মসজিদে দরস দিচ্ছেন তখন ইব্রাহিম পাশা মসজিদ-প্রদর্শনে আসলেন। ইব্রাহিম পাশা অত্যন্ত রাগী ও কঠোর মেজাজের মানুষ। সে যখন মসজিদে প্রবেশ করল, তাকে দেখে সকলে দরস ও কথাবার্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেল এবং সালাম করতে লাগল; কিন্তু সাইদ আল-হালাবি রহিমাহুল্লাহ দরস বন্ধ করলেন না বরং তিনি দরস চালিয়ে গেলেন। অতঃপর ইব্রাহিম পাশা যখন অন্যদের থেকে ফারেগ হয়ে সাইদ আল-হালাবির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন দরসের কিছু কিছু ছাত্র দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানাল; কিন্তু সাইদ আল-হালাবি রহিমাহুল্লাহ দরস বন্ধ করে দাঁড়ানো তো দূরের কথা তিনি তাঁর পা-টা পর্যন্ত ভাঁজ করলেন না বরং তাঁর পা আগে যেমন ছড়ানো ছিলো তেমনই প্রসারিত অবস্থায় দরস চালিয়ে গেলেন। ইব্রাহিম পাশা যখন মসজিদ-প্রদর্শন শেষে বাইরে গেল তখন বললো, এই শায়খ কে যিনি পা প্রসারিত করে বসে আছেন? তাকে বলা হল ইনি হলেন প্রসিদ্ধ আলেম শায়খ সাইদ আল-হালাবি।

অতঃপর সে বললো, সকলে যখন আমাকে সম্মান জানানোর জন্য কথাবার্তা ও পড়া-লেখা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেল, সে কেন দাঁড়াল না? লোকেরা বললো, আমরা জানি না। অতঃপর তিনি এক হাজার দিনার বের করে একজনকে দিয়ে বললো, এটা নিয়ে শায়খের কাছে গিয়ে আমার পক্ষ থেকে এটা তাঁকে দাও। অতঃপর সে মসজিদের অপরপ্রান্তে চলে গেল। শায়খ হালাবি রহিমাহুল্লাহ দরস চালিয়ে যাচ্ছেন। লোকটি তাঁর কাছে আসলে এবং বললো, শায়খ এই নিন এক হাজার দিনার। তৎকালীন সময়ের এক হাজার দিনার অনেক সম্পদ, তা দিয়ে অনায়াসেই কয়েক বছর বসে কাটানো যেতো। শায়খ বললেন, এটা কোথা থেকে এসেছে? লোকটি বললো, এটা ইব্রাহিম পাশা পাঠিয়েছেন। শায়খ তখন বললেন, ইব্রাহিম পাশা কি এটা আমার নিকট পাঠিয়েছে? সে বললো, হাঁ। তিনি বললেন, তুমি এটা তাঁর কাছে ফেরত নিয়ে যাও এবং গিয়ে বললে, 'শায়খ আপনাকে বলেছেন- 'যে পা প্রবাহিত করে রাখে সে হাত প্রসারিত করে না।' প্রকৃতপক্ষে শায়খ হালাবি রহিমাহুল্লাহ যখন শাসকদের থেকে অমুখাপেক্ষী থেকেছেন তখনই তিনি পা প্রসারিত করতে পেরেছেন। আর তিনি যখন পা প্রসারিত করে রেখেছেন তখন শাসকদের দেওয়া সম্পদ গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন। তিনি যদি তাঁর কাছে থেকে সম্পদ গ্রহণ করতেন তাহলে অবশ্যই তাঁর প্রতি একটি দুর্বলতা তৈরি হয়ে যেতো এবং তার সাথে তালুবরদারী করতে চাইতো। তাঁর এই কথা 'যে পা প্রবাহিত করে রাখে সে হাত প্রসারিত করে না' এই কথার অর্থ হল, আমি একজন আলেম, তোমাদের সম্পদের প্রতি আমার কোনো লোভ নেই। আমার যা কিছু আছে তা দিয়েই আমার চলবে। আমি ফতোয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করব না, ফতোয়ার ক্ষেত্রে তোমাদের সাথে স্বজনপ্রীতিও করতে পারব না।

ইলমের মর্যাদা-মিনার এক রূপ উচ্চ, যার উচ্চতা পরিমাপ করা যায় না। একবার হজ্বের সময় খলিফা হারুনুর রশিদের একটি মাসআলা নিয়ে সমস্যা হল। তিনি আশেপাশে থাকা আলেমদের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করলেন, তখন তাঁরা বললেন, এটা একেবারে নতুন একটি মাসআলা, এই মাসআলা সম্পর্কে আমরা ফতোয়া দিতে পারব না। তবে এ বিষয়ে আতা ইবনে আবি রাবাহ ফতোয়া দিতে পারবেন। আতা ইবনে আবি রাবাহ রহিমাহুল্লাহ ছিলেন যুগের হজ্ব ও হজ্বের আহকাম সম্পর্কে সবচেয়ে বড় আলেম ও ইমাম। আতা রহিমাহুল্লাহ ছিলেন হাবশি গোলাম, তিনি ছিলেন কালো, তাঁর নাক ছিলো চেপ্টা এবং তিনি খোঁড়াও ছিলেন। হারুনুর রশিদ বললেন, তোমরা আতা ইবনে আবি রাবাহকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। অতঃপর তাঁরা আতা রহিমাহুল্লাহর নিকট গেল এবং তাঁকে বললো, খলিফা আপনাকে তাঁর সাথে দেখা করতে বলেছেন। আতা রহিমাহুল্লাহ তখন দরসে ছিলেন, তাঁর আশেপাশে দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক ছাত্রের ভীড় উঠলে। তাঁদের কেউ খুরাসান থেকে এসেছে, কেউ ইরাক থেকে, কেউ শাম থেকে, কেউ ইয়ামান থেকে ইলম শিখার জন্য এসেছে। তিনি বললেন, আমি এসকল গরিব ছাত্রদের দরস বন্ধ করে খলিফার নিকট যাব? বরং তোমরা খলিফাকে গিয়ে বললে, 'আমি ব্যর্থ।' এবং তোমরা তাঁকে একথাও বললে যে, ইলম কারো কাছে যায় না বরং ইলমের নিকট যেতে হয়। অর্থাৎ আলেমকে ইলমের নিকট আসতে হয় ইলম কখনো আলেমকে ইলমের নিকট আসে না।

একদা যখন হারুনুর রশিদকে নিকট পৌঁছল তখন তিনি তাঁর দুই ছেলে মামুন আর আমিনকে নিয়ে শায়খ আতা রহিমাহুল্লাহর নিকট গেলেন। খলিফাকে দেখে পাশে থাকা দূরদূরান্ত থেকে আগত গরিব ছাত্ররা সরে গেল এবং খলিফাকে সামনে যাওয়ার জায়গা করে দিল। তাঁরা যখন আতা রহিমাহুল্লাহর নিকট পৌঁছালেন এবং মানুষ খলিফাকে দেখল, তখন তারা সরে গিয়ে তাঁর জন্যে জায়গা করে দিল। তাঁরা দীর্ঘক্ষণ বসে খলিফাকে আতা রহিমাহুল্লাহর সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এভাবে লাইন ধরে খলিফাকে সামনে আসতে দেখে আতা রহিমাহুল্লাহ অনেক রাগান্বিত হলেন। আমরা তো সকলেই আল্লাহর বান্দা, তাঁর কাছে আমরা সকলে সমান। আমাদের সকলেরই সমানভাবে হজ্বের মাসআলার প্রতি মুখাপেক্ষী, তাহলে তোমাদের কেন হাদিয়া গ্রহণ করব না আল্লাহর জন্য? এরপর আতা রহিমাহুল্লাহর নিকট আসলেন এবং তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন, শায়খ আমার একটি মাসআলা জানার আছে। আতা রহিমাহুল্লাহ বললেন, আপনি পিছনে গিয়ে লাইনে দাঁড়ান, আমরা সকলেরই আল্লাহর তাআলার প্রতি মুখাপেক্ষী। খলিফা হারুনুর রশিদ কাতারে পেছনে গেলে, তাঁর সাথে তাঁর দুই ছেলে মামুন আর আমিন। এরপর একে একে যখন খলিফার পালা এলো তিনি আতা রহিমাহুল্লাহর সামনে গিয়ে সালাম দিলেন এবং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাঁকে মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আতা রহিমাহুল্লাহ তখন তাঁর সালামের জবাব দিলেন, প্রশ্নের উত্তর দিলেন এবং তাঁর সাথে ভাল ব্যবহার করলেন ও সুন্দরভাবে কথা বললেন। অতঃপর খলিফা তাঁর শুকরিয়া আদায় করে চলে গেল। সেখান থেকে বের হয়ে তিনি তাঁর দুই ছেলেকে তাকিয়ে বললেন, 'হে ছেলে! তোমরা ইলম শিখ। এই ইলম নিজেকে একবারে ছোট ও নগণ্য মনে করি, কারণ তার কাছে যা আছে আমি আর কারো মুখাপেক্ষী। এই সম্পদ তিনি ব্যতীত অন্য আর কারো কাছে পাব না। আর আমার কাছে তো এই সম্পদ ব্যতীত কিছুই নেই। সুতরাং আমার কাছে যা আছে যা তা অন্যের কাছেও পাওয়া যাবে। যে কোনো ব্যবসায়ী তাঁর প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে, তাঁর ঋণ আদায় করে দিতে পারবে, তাঁকে বাড়ি-গাড়ি সব করে দিতে পারবে; কিন্তু তাঁর কাজে যা আছে আমি তা অন্য কারো কাছে পাব না।

আর এ কারণেই তাঁরা ওলামায়ে কেরামকে সম্মান করতো; কিন্তু বর্তমানে অনেকেই ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, তাঁদের গালাগালি করে। অনেক সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ওলামায়ে কেরাম ও দীনদার লোকদের নিয়ে উপহাসমূলক প্রতিবেদন প্রচারণা হয়, তাঁদেরকে হেয়-প্রতিপন্ন করে; তাঁদের প্রতি ছড়িয়ে দেওয়া হয় স্থানহানিজনক শব্দ ও বাক্য। এবং কখনো কখনো তো তা দীন এর আহকাম নিয়ে, শরয়ী কোনো বিধান নিয়ে কটুক্তিমূলক প্রতিবেদন ও দুঃসাহস দেখা যায়। ইন্টারনেটে, বিভিন্ন রূপে ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়, শরয়ী হুকুম-আহকাম ও বিধি-বিধান নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করা হয়। টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে নাটক-সিনেমা র মাধ্যমে ওলামায়ে কেরাম ও দীনের বিধি-বিধান নিয়ে ঠাট্টা ও উপহাস করা হয়। এমনকি কোনো কোনো চ্যানেলে তো সরাসরি টক-শো’র মাধ্যমে ওলামায়ে কেরাম ও দীনের বিধি-বিধান নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করা হয়। এমনটি নিতান্তই না-জায়েজ ও হারাম কাজ। ওলামায়ে কেরام নবি-রাসূলদের ওয়ারিশ, সুতরাং তাদের কাছে কেউ ঠাট্টা-উপহাস কোনোভাবে জায়েজ নয়। তোমার যদি তাদের সাথে কোনো মতানৈক্য থাকে তাহলে তুমি সরাসরি তাদের সাথে কথা বল বা আর কাছে তোমার মতামত প্রকাশ করো। তাঁদের সাথে সম্মান ও আদাবের সাথে কথা বল। তুমি যদি কোনো আলেমকে নিয়ে কিছু লিখতে চাও তাহলে যথাযথ সম্মান বজায় রেখে শালীনভাবে অশ্লীল লিখ। কোনো আলেমের সম্মানহানি করা কিংবা তার ব্যাপারে অশ্লীল শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করা ঘৃণ্যতম অন্যায়। এটা নাজায়েজ; এটা সম্পূর্ণ হারাম কাজ।

আল্লাহ তা'আলার নিকট এই প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাদেরকে উলামায়ে কেরামের যথাযথ সম্মান করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদেরকে হক্কানি আলেম দ্বীন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন。

টিকাঃ
১. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮
২. সূরা ফাতির, আয়াত: ২৮

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 ইমাম আবু হানিফা রহ. যোগ্য উত্তরসূরি রেখে গেছেন

📄 ইমাম আবু হানিফা রহ. যোগ্য উত্তরসূরি রেখে গেছেন


কখনো কখনো মানুষ নিজ প্রতিনিধি ও উত্তরসূরির সন্ধান করে আর একজনও সে মেধাবী, চরিত্রবান, দীনদার ও উত্তম আমল-আখলাক বিশিষ্ট একজনকে খোঁজ করে উত্তরসূরি বানিয়ে নিজের অবর্তমানে তাঁকে স্থলাভিষিক্ত করে। মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজ উত্তরসূরি রেখে যেতে চায়, যেমন ইলমের ক্ষেত্রে একজন আলেম চায় যে, তার স্থলাভিষিক্ত অন্য একজন আলেম রেখে যেতে। একজন ভাল ডাক্তার চায় যে, তার স্থানে অন্য একজন ডাক্তার তৈরি করে যেতে, অনুরূপভাবে একজন ব্যবসায়ীও চায় তারপর এ ব্যবসা অন্য একজন ধরে রাখুক। এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ একজন প্রতিনিধি বা স্থলাভিষিক্ত রেখে যেতে চায়।

এখন আমরা ইমাম আবু হানিফা নুমান ইবনে সাবেত রাহিমাহুল্লাহ ও তাঁর এক ছাত্রের ঘটনা বর্ণনা করবো। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন একজন বিখ্যাত ইমাম ও ফকিহ্। ইমাম শাফি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ব্যাপারে বলেন 'মানুষ ফিকরের ক্ষেত্রে আবু হানিফার রাহিমাহুল্লাহ মুখাপেক্ষী'। তাঁর জন্ম ৮০ হিজরিতে এবং মৃত্যু ১৫০ হিজরিতে।

আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ মসজিদে দরস দিতেন। তাঁর দরসে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে কত শত ছাত্র উপস্থিত হত! ভূমি কল্পনায় সেই মজলিসে উপস্থিত হলে দেখতে পাবে, মসজিদ ভর্তি ছাত্র আর একজন উস্তাদ দরস দিচ্ছিলেন। ছাত্ররা বিভিন্ন জায়গা থেকে কিতাব নিয়ে উপস্থিত হয়েছে; কেউ কিতাব পড়ছে, কেউ ইলমি আলোচনা করছে, কেউ ফাতওয়া জিজ্ঞেস করছে, সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। এসকল ছাত্রদের মধ্যে বারো বছরের ছোট এক বালকও ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর দরসে উপস্থিত হতো। বালকটি ইমাম সাহেবকে মাঝে মাঝে প্রশ্নও করতো। প্রশ্ন থেকেই ছেলেটির মেধার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রশ্ন দুইধরনের হয়ে থাকে, বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন, দিগ্ভ্রান্তপূর্ণ প্রশ্ন। অর্থাৎ কিছু প্রশ্ন আছে যা থেকে বুঝা যায় প্রশ্নকারী মেধাবী ও বুদ্ধিমান। আর কিছু প্রশ্ন থেকেই প্রশ্নকারীর দিগ্ভ্রান্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্ণিত আছে আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ একবার দরস দিচ্ছিলেন, তাঁর চারপাশে অনেক ছাত্র। তাঁর পায়ে ব্যথা ছিলো, যার কারণে তিনি পা ছড়িয়ে রেখেছেন। এমন সময় সুন্দর পাগড়ি, উচ্চমানের জুব্বা ও দামি চাদর পড়া অপরিচিত এক লোক উপস্থিত হল। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ তাঁকে দেখে কোনো দূর দেশের বড় আলেম ও শায়খ মনে করলেন। তাই তিনি তাঁর সম্মানে কষ্ট করে নিজের পা ভাঁজ করলেন। দরস শেষ করে ইমাম ছাত্রদের বললেন, তোমাদের কারো কি কোনো প্রশ্ন আছে? তখন সেই আগন্তুক বললো, আমার একটা প্রশ্ন আছে। ইমাম সাহেব শ্রদ্ধার সাথে বললেন, আপনার প্রশ্ন কী বলেন? লোকটি বলল, শায়খ! রমযান এলে আমরা কী করবো? তিনি বললেন, রোযা রাখবে। হজ্জের সময় হলে আমরা কী করবো? হজ্জ করবে। যখন হজ্জ ও রোযা একসাথে হবে তখন আমরা কী করবো? রোযা রাখবো না-কি হজ্জ করবো? আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ এই প্রশ্ন শুনে বললেন, আবু হানিফার জীবনে এমন পা প্রসারিত করার সময় হয়েছে। আরে রমযান ও হজ্জ কীভাবে একত্র হবে! এটা একটা মাস আর সেটা ভিন্ন আরেকটা মাস। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ বুঝতে পারলেন যে, তিনি লোকটিকে প্রাপ্য সম্মানের চেয়ে বেশি দিয়ে ফেলেছেন।

যাই হোক আমরা যে ছেলেটির কথা বলছিলাম সে হল আবু ইউসুফ; বারো বছরের ছোটএক বালক। পরবর্তীতে হানাফি মাযহাবের বড় ইমাম; ইমাম আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ। এই বালকটির মেধা ও তার বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন দেখে আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ মুগ্ধ হতেন ও আশ্চর্য হতেন; কিন্তু আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ লক্ষ করতেন, ছেলেটি দরসে অনিয়মিত, প্রতিদিন দরসে উপস্থিত হয় না। তাই একদিন ছেলেটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ছেলে! তুমি কেনো অনুপস্থিত থাকো? নিয়মিত দরসে আসো না কেনো? আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আমরা গরিব, তাই আমার বাবা আমাকে বাজারে পাঠায় কুলিঁর কাজ করে বাবা-মাকে কিছু দেওয়ার জন্যে। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ তখন তাঁকে বললেন, হে ছেলে! তুমি ইলম অর্জন করো, ইলম অর্জন করা ফরয; সাথে সাথে তা অনেক বড় ফযিলতপূর্ণ কাজ। ইলম অর্জন করলে আল্লাহ তাআলা তোমাকে অনেক উঁচু মর্যাদা দিবেন। সে বললো, ঠিক আছে আমি তাই করবো। অতঃপর সে দরসে বসে গেল। কিছুক্ষন পর তাঁর বাবা এসে পিঠেতে তাঁকে মসজিদ থেকে বের করতে লাগল, আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ তখন তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, আপনি আপনার ছেলেকে ইলম অর্জন করার সুযোগ দেন না কেনো? সে বলল, আবু হানিফা! তোমার রুটি তো তোমার জন্যে ভাজা অবস্থায় প্রস্তুত থাকে; কিন্তু আমরা গরিব মানুষ। আমাদের কষ্ট করে মাথায় ঘাম দিয়ে ফাটে রুটি-রুজিঁর ব্যবস্থা করতে হয়। সুতরাং সে কাজ করে আমাকে সাহায্য করে ও তার ছোট ভাই বোনদের জন্যে খরচ করে। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, আপনার ছেলে দৈনিক কত টাকা উপার্জন করে? সে বলল, দৈনিক দুই দিরহাম উপার্জন করে। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ঠিক আছে আপনি ছেলেকে আমার কাছে রেখে যান; সে আমার কাছে ইলম শিখবে আর আমি তাকে প্রতিদিন দুই দিরহাম করে দিব। আপনি তো আপনার ছেলেকে প্রতিদিন দুই দিরহাম উপার্জনের জন্যেই কুলির কাজ করান। সুতরাং আমিও তাকে প্রতিদিন দুই দিরহাম করেই দিব, আপনি তাকে আমার কাছে রেখে যান। তাঁর বাবা এতে রাজি হল। অতঃপর আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, শুনুন! আমি আপনার ছেলেকে এমন ইলম শিখা দিব, সে যদি ভালোভাবে তা আয়ত্ত করতে পারে তাহলে সে খলিফাদের মজলিসে গালিচার উপর বসে বাদামের ফালুদা খাবে। (বাদামের ফালুদা এখনকার হালুয়া যা খলিফা, আমির-উমারা ও বড় বড় ব্যবসায়ীরা ছাড়া অন্যেরা খেতে পারত না, কারণ তাহলেও অনেক দামি।) তখন লোকটি আশ্চর্য হয়ে বলল, সে বাদামের ফালুদা খাবে!? সে খলিফাদের সাথে বসবে!?

এরপর থেকে আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহকে প্রতিদিন দুই দিরহাম করে দেন। আর আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহতা পিতা মিতাকে নিয়ে দেন। এভাবে আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ বড় হলেন, তাঁর বুদ্ধি-বৃদ্ধি প্লো এবং অনেক জ্ঞানলাভের জন্যা হল। এখন সে আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর সাথে ইলমি আলোচনা করেন; কিন্তু একদিন হঠাৎ করে আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ অসুস্থ হয়ে গেলেন এবং তাঁর অসুস্থতা অনেক কঠিন আকার ধারণ করলো। তাই তিনি দরসে উপস্থিত হতে পারছেন না। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ তাঁকে দরসে না দেখে অন্যদের জিজ্ঞেস করলে তারা বললো, সে অসুস্থ। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর দরসে না গিয়ে অন্য আর এক ছাত্র কামরায় প্রবেশ করলেন। আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহর রোগ তখন কঠিন আকার ধারণ করেছিল, তিনি তখন প্রায় মৃত্যুমুখশায়। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ প্রিয় ছাত্রের এই অবস্থা দেখে অনেক ব্যথিত হলেন। মা স্নেহের হাত রেখে অনেকক্ষণ বসে রইলেন। তিনি বললেন, এত বছর কষ্ট করে তাকে বড় করেছি, এখন তাকে যখন গঠন করার সময় হয়েছে তখনই তার এ অবস্থা হল। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ তাকে কাছে থেকে বললেন, হায় আবু ইউসুফ! আশাহিল্লাহ! আমার পর তুমি মানুষকে দরস দিবে, আমার আসনে বসবে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে; কিন্তু মৃত্যুও এখন তোমাকে নিয়ে খেলা করছে।

আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ প্রিয় ছাত্র আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহর জন্য দোয়া করতে লাগলেন এবং মসজিদের অন্যান্য ছাত্রদেরকে দরসে থাকলেন। কয়েকদিন পর আবু ইউসুফ রা.-এর অবস্থার পরিবর্তন হতে লাগল, তিনি দিনদিন সুস্থ হতে লাগলেন, এভাবে একদিন পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন। কয়েকদিন পর গোসল করে সুন্দর পোশাক পরিধান করে মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরুলেন। তখন পরিশ্বরের লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথায় যেতে চাচ্ছো? আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর দরসে। তারা বললো, তোমার আর তাঁর দরসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং তুমি নিজেই এখন শায়খ হয়ে গেছো। তিনি বললেন, আমি কীভাবে শায়খ হলাম? তারা বললো, তোমার অসুস্থতার সময় আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ যখন তোমাকে দেখতে এসেছিলেন, তখন তোমাকে দেখে যাওয়ার সময় তিনি বলেছেন, “হায় আবু ইউসুফ! আশাছিলা আমার পর তুমি মানুষকে দরস দিবে, আমার আসনে বসবে, আমার স্থলাভিষিক্ত হবে; কিন্তু মৃত্যুও এখন তোমাকে নিয়ে খেলা করছে” একথা অর্থ আর আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ যদি মৃত্যুবরণ করেন তাহলে তুমি তাঁর আসনে বসে মানুষকে দরস দিবে, তাদের ইলম শিখাবে, কিতাবের ব্যাখ্যা করবে যেমন আবু হানিফা এখন করছেন। সুতরাং আবু হানিফা শায়খ আর তুমিও শায়খ। আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ তখন বললেন, আহা! আমি শায়খ হয়ে গেছি!! অতঃপর আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর দরসে না গিয়ে অন্য আর একটি মজলিসে গিয়ে পড়ানো শুরু করলেন এবং তাঁর সামনেও ছাত্ররা জমা হল। আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ দেখলেন এখানে নতুন একটি মজলিস বসেছে এবং নতুন এক শায়খ দরস দিচ্ছেন। তাই তিনি বললেন, শহরে কি নতুন কোনো শায়খ আগমন করেছেন? তারা বললো, না। তিনি বললেন, আশ্চর্য! তাহলে ইনি কে? তারা বললো, সে আবু ইউসুফ। তিনি বললেন, আবু ইউসুফ সুস্থ হয়েছে? তারা বললো, হ্যাঁ সে সুস্থ হয়েছে। তিনি বললেন, তাহলে সে আমার দরসে আসে না কেনো? তারা বললো, আপনি তাঁকে দেখতে গিয়ে যে কথা বলেছেন তাঁকে তা শোনানো হয়েছে। তখন আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ বললেন, চামড়া খুলে সে যে শিক্ষা গ্রহণ করবে না।

অতঃপর আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ এক ছাত্রকে ডাকলেন এবং তাঁকে বললেন, সেখানে যে শায়খ বসে আছেন তাঁর কাছে যাও এবং বল, শায়খ আমার একটা প্রশ্ন আছে, তখন সে এই ভেবে খুশি হয়ে যাবে যে, আমার কাছেও মানুষ প্রশ্ন করতে আসছে!! এবং তোমার কী প্রশ্ন? করতে পার। তখন তুমি বলবে, শায়খ এক লোকের একটা লম্বা জামা আছে, অতঃপর সে এক দরজির কাছে তা ছোট করার জন্য দিয়েছে। দরজি কাপড় রেখে কয়েকদিন পর আসতে বলেছে। অতঃপর নির্ধারিত দিন লোকটি দরজির কাছে গেলে দরজি অস্বীকার করে বলল, তুমি আমাকে কোনো কাপড় দাওনি। লোকটি তখন পুলিশের নিকট গিয়ে অভিযোগ করল। পুলিশ এসে দরজির দোকান ও তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে কাপড়টি খুঁজে বের করল এবং মালিককে তা দিয়ে দিল। এখন আমার প্রশ্ন হল দরজি এর মজুরি পাবে না-কি পাবে না? এখন সে যদি বলে যে, দরজি এর মজুরি পাবে না তাহলে বলেবে, আপনি ভুল উত্তর দিয়েছেন। আর যদি সে বলে মজুরি পাবে না তাহলে ও বলবে, আপনি ভুল উত্তর দিয়েছেন।

ছাত্রটি আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহর নিকট গেল এবং তাঁকে সালাম করে বললো, শায়খ আমার একটি প্রশ্ন আছে। আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ খুশি হয়ে তাকে বললেন, তোমার প্রশ্ন কী? লোকটি বললো, শায়খ এক লোকের একটা লম্বা জামা আছে, অতঃপর সে দরজির কাছে তা ছোট করার জন্য দিয়েছে। দরজি তার কাপড় রেখে দিয়ে কয়েকদিন পরে আসতে বলেছে। অতঃপর নির্ধারিত দিনে লোকটি দরজির কাছে গেলে দরজি অস্বীকার করে বসে, তুমি আমাকে কোনো কাপড় দাওনি। লোকটি তখন পুলিশের নিকট গিয়ে অভিযোগ করল। পুলিশ এসে দরজির দোকান ও তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে কাপড়টি খুঁজে বের করল এবং তার মালিককে তা দিয়ে দিল। এখন আমার প্রশ্ন হল দরজির এর মজুরি পাবে না-কি পাবে না? আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ বললেন, সে যেহেতু জামা ছোট করেছে তাই সে এর মজুরি পাবে। সে বলল, শায়খ আপনি ভুল বলছেন। আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ বললেন, বিষয়টা আবার বল, সে আবারও বলল। আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ বললেন, সে যেহেতু অস্বীকার করেছে তাই সে মজুরি পাবে না। সে বলল, আপনি ভুল বলছেন। আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ বললেন, তোমাকে কে পাঠিয়েছে? সে বললো, আমাকে শায়খ আবু হানিফা পাঠিয়েছেন।

আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ তখন আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর নিকট গেলেন এবং তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, শায়খ! মাসআলার উত্তর কী? আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ তাঁর দিকে না তাকিয়ে দরস দিতে লাগলেন। আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ আবারও বললেন, শায়খ! মাসআলাটার উত্তর কী? আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ তার কোনো উত্তর না দিয়ে দরস শেষ করলেন। অতঃপর আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর সামনে এসে বললেন এবং বললেন, শায়খ! মাসআলা। আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ বললেন, তুমি তো শায়খ উত্তর দাও। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি নই বরং আপনিই শায়খ। আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ বললেন, তোমার মাসআলাটা কী বল? তিনি বললেন আপনি জানেন। আবু ইউসুফ তার কাপড়-মালিকের মাসআলা? আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ বলেন, দরজি তার মজুরি পাবে না-কি পাবে না এই মাসআলা?এর উত্তর হল আমরা ভালভাবে যাচাই করবো যে, আসলে কাপড়টা কার মাপে কাটা হয়েছে? যদি কাপড়টা দরজি নিজের মাপে কাটে তাহলে সে তার মজুরি পাবে না, কারণ সে চুরির নিয়তে কাপড়টি কেটে সেলাই করেছে এবং সে কাপড় কাটা ও সেলাই করার কাজটা করেছে নিজের জন্য, কাপড়ের মালিকের জন্য নয়। আর যদি কাপড়টি কাপড়ের মালিকের মাপে তাহলে সে মজুরি পাবে,কারণ সে কাপড়ের মালিকের জন্যেই কাজ করেছে, অতঃপর তার মনে কুমন্ত্রণা জায়গা করেছে এবং সে তা চুরি করেছে। অতঃপর তিনি বললেন, আবু ইউসুফ মাসআলাটি বুঝেছো? আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ বললেন, জ্বী বুঝেছি। এরপর ২৫০ হিজরিতে আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর মৃত্যু পর্যন্ত আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ তার দরসে বলেন। আর তাঁর মৃত্যুর পর আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ রাষ্ট্রের চীফ জাস্টিস তথা প্রধান বিচারপতি হন।

আবু ইউসুফ রহ. একদিন খলিফার মজলিসে বসা। আজ মজলিসে আরো অনেক সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আছেন। খলিফা নিজ আসনে বসা। তার সামনে অনেক লোক; বিভিন্নজন বিভিন্ন প্রয়োজনে নিয়ে এসেছে। আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ একটি চেয়ারা বসে। খাদেমরা তখন তাঁদের জন্য খাবার নিয়ে এল এবং খলিফার জন্য বিশেষ হালুয়া তথা বাদামের ফালুদা আনা হল এবং তাঁর সামনে রাখলেন। খলিফা খাদেমকে বললেন, শায়খের মাধ্যমে তরফ কর। অর্থাৎ আগে শায়খকে দাও। একথা বলে আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহর দিকে ইঙ্গিত করলেন। আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ তখন প্রধান বিচারপতি। খাদেম আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহর সামনে বাদামের ফালুদা রাখল। আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহসামনে বাদামের ফালুদা দেখে হাসতে শুরু করলেন এবং হাসতে হাসতে শুয়ে গেলেন।

খলিফা এই অবস্থা দেখে অত্যন্ত আশ্চর্য হলেন যে, আমরা আপনাকে সম্মান করে হালুয়া দিলাম আর আপনি এভাবে হাসছেন!! তাই সে বললো, শায়খ! হাসছেন কেনো? আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ বললেন, আল্লাহর শপথ আমার ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য নেই; বরং আমার বাবাকে বলা ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহর একটা কথা মনে পড়ল। তিনি আমার বাবাকে বলেছিলেন, আমি তোমার সন্তানকে এমন ইলম শিক্ষা দেব যে, সে যদি তা ভালভাবে আয়ত্ত করতে পারে তাহলে একদিন খলিফা ও আমির-ওমরাদের সাথে গালিবায় বসে বাদামের ফালুদা খাবে। আমার বাবা তখন আশ্চর্য হয়ে বলেছিলেন, সে বাদামের ফালুদা খাবে!? সে খলিফার সাথে বসবে!? আপনারা লক্ষ করুন, ইলম আমার মর্যাদা কোথায় নিয়ে গেছে, এই তো আমি খলিফাদের মজলিসে সবার সামনে গালিচার উপর বসে বাদামের ফালুদা খাচ্ছি।

অবশ্যই আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের এবং আলেমদের মর্যাদা অনেক উঁচু করে দিয়েছেন।

আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ মেধাবী ও প্রতিভাবানদের সম্মান করতেন; তাঁদের প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখতেন। আমরা অনেক সময় পণ্ডিতদের প্রশংসা করে বলি, তারা মেধাবী ও প্রতিভাবানদের মূল্যায়ন করে। তাদের গুরুত্ব দেয়, তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গড়ে তুলে। কোনো একটা বিষয় আবিষ্কারের জন্য তারা সামনে সকল দরজা খুলে দেয়। অথচ আমরা?

আমাদের সালাফগণও মেধাবী ও প্রতিভাবানদের মূল্যায়ন করতেন এবং তাদেরকে শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সব রকমের সহযোগিতা করতেন। ঠিক যেমন আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিভাবানদের মূল্যায়ন করতেন।

আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ কখনই চাননি যে, আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ হারিয়ে যাক, তাঁর মেধা ও প্রতিভা নষ্ট হয়ে যাক। তিনি কুলির কাজ করে রুটি-রুজিঁর ব্যবস্থা করে জীবন পার করে দিক। আমি বলছি না যে, কুলির কাজ করা খারাপ বরং কুলির পেশা তো একটা মহান ও সম্মানিত পেশা যে,এর মাধ্যমে হালাল রুজি উপার্জন হয়। আর দোয়া কবুলের প্রধান শর্ত হচ্ছে হালাল রুজি ভক্ষণ করা; কিন্তু ইলম অর্জন করা ও তার জন্যে মেহনত করা কুলির পেশার থেকে অনেক উত্তম, কারণ এর মাধ্যমে একজন আলেম শুধু নিজে উপকৃত হয় না বরং পুরো জাতি আলেমের মুখাপেক্ষী। সুতরাং ইলমের মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে আর একারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘ইলমহীন আবেদদের চেয়ে আলেমদের মর্যাদা হল সকল তারকার উপর চাঁদের মর্যাদার মত।'

অন্য হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : 'জ্ঞানহীন আবেদদের চেয়ে আলেমদের মর্যাদা হল তোমাদের সাধারণ মানুষের উপর আমার মর্যাদার মত।'

আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ যখন দেখলেন আবু ইউসুফ ছেলেটা অন্য সবার চেয়ে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। তাঁর মধ্যে বিশেষ কিছু আছে। তাই তিনি তাঁকে সাহায্য করলেন এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব নিলেন। ফলে আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ স্বতন্ত্র ও বিশেষ কিছু হয়ে উঠলেন এবং তিনি ইমাম আবু ইউসুফ হয়ে উঠলেন। সুতরাং হে ভাই! আমরাও যখন আমাদের সাথীদের মধ্যে স্বতন্ত্র কাউকে দেখবো, কারো মধ্যে বিশেষ কিছু দেখবো তাতো তখন তাকে উৎসাহিত করবো, তার পৃষ্ঠপোষকতা করবো, তাকে বই কিনে দিবো। সে যদি কোনো কারণে পড়ালেখা বন্ধ করে দিতে চায় তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করবো, কেনো সে পড়ালেখা বন্ধ করতে চাচ্ছে? সে যদি টাকার কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দিতে চায় তাহলে আমরা তাদের ও তাদের পরিবারের খরচ বহন করবো এবং তাদেরকে জাতির সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলবো,যুগের আবু ইউসুফ হিসেবে গড়ে তুলবো।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, মানুষ যেনোনিজ সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে গর্ব না করে, কারণ প্রত্যেক জ্ঞানের উপর একজন আলেম রয়েছেন। পরিশেষে মহান আল্লাহ তাআলার নিকট এই প্রার্থনা করি যে, তিনি যেনো আমাদের ও আপনাদের সকলকে যা কিছু বললাম ও শুনলাম এর উপর আমল করার তাওফিক দান করেন এবং আমাদের সকলের ইলম ও বুদ্বি-উপলব্ধি আরো বৃদ্ধি করে দিন। আমিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00