📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 পালাতক সুফিয়ান সাওরি

📄 পালাতক সুফিয়ান সাওরি


তোমরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাঁর সকল আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলো, তাহলে তিনি তোমাদের দুঃখ-মুসিবতের সময় তোমাদের স্মরণ করবেন এবং তোমাদের সাহায্য করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.কে এমনই ওসিয়ত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে ছিলাম, তখন তিনি আমাকে বলেন, হে বালক! তোমাকে কিছু উপদেশ শিক্ষা দিচ্ছি, মনোযোগ দিয়ে শোনো! তুমি আল্লাহর সকল বিধিবিধান মেনে চলবে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে হেফাজত করবেন। তুমি আল্লাহর বিধিবিধানগুলোর হেফাজত করো, আল্লাহ তাআলা তোমাকে তাঁর পাশে পাবে। তোমার কোনো কিছুর চাওয়ার থাকলে একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই তা চাইবে, সাহায্য পাওয়ার প্রয়োজন হলে একমাত্র আল্লাহ তাআলার নিকটেই সাহায্য চাইবে। মনে রেখো, সারা দুনিয়ার সকল মানুষও যদি তোমার কোনো উপকার করতে একত্র হয় তাহলে ও তারা তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না, তবে আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য যতটুকু লিখে রেখেছেন ততটুকু ব্যতীত। এবং তোমার কোনো ক্ষতি করতে সারা দুনিয়ার মানুষও যদি একত্র হয় তাহলেও তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, তবে আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য যতটুকু লিখে রেখেছেন ততটুকু ব্যতীত। তাকদির লেখার কলম উড়িয়ে নেওয়া হয়েছে এবং খাতাও শুকিয়ে গেছে।

অন্য এক রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

'তুমি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো তাঁর সকল আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলো তাহলে তিনি দুঃখ-মুসিবতের সময় তোমাকে স্মরণ করবেন এবং তোমাকে সাহায্য করবেন।'

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করতে বলেছেন এবং তাঁর আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলতে বলেছেন। তাহলে আল্লাহ তাআলাও দুঃখ-মুসিবতের সময় আমাদের স্মরণ করবেন এবং আমাদের সাহায্য করবেন। এখন এবিষয়ে আমরা সুফিয়ান সাওরি রহ.-এর একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা বলবো। তিনি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করার কারণে আল্লাহ তাআলা মুসিবাতের সময় কীভাবে তাঁর সাহায্য করলেন এবং তাঁকে বিপদ-মুসিবত থেকে উদ্ধার করলেন? সে বিষয়টি জানবো।

সুফিয়ান সাওরি’র পূর্ণ নাম হল সুফিয়ান ইবনে সাঈদ আস-সাওরি। তিনি বাগদাদের অনেক বড় একজন আলেম ও ইমাম। তৎকালীন খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর তাঁকে কাজী বা বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিতে চাইলেন; কিন্তু তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। আমাদের সালাফগণ সর্বদাই বিচারকের পদ গ্রহণ করা থেকে দূরে থাকতেন। তাঁরা এই পদ গ্রহণ করতে ভয় পেতেন যে, হয়তো তারা দ্বারা কারো প্রতি জুলুম হয়ে যাবে আর একারণে তাঁকে আল্লাহ তাআলার শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

لا تحكم بين اثنين

'যদি বিচারক বানানো হয়, যেন তাকে দুই জবাই করে দেওয়া হল'

অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

'বিচারক তিন প্রকার, দুই প্রকার বিচারক জাহান্নামীদের যাবে আর একপ্রকার জান্নাতে যাবে।'

সুতরাং সালাফগণ সর্বদা এই ভয় করতেন যে, না জানি তার নাম আবার প্রথম দুই প্রকার জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। হয়তো তিনি মানুষের প্রতি জুলুম করে ফেলবেন অথবা না জেনে কারো ব্যাপারে কোনো কথা বলে ফেলেন, সঠিকভাব তদন্ত না করেই কারো ব্যাপারে ভুল ফায়সালা দিয়ে দিবেন। সুতরাং নিরাপদ দূরত্বে থাকার চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। আর একারণেই সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ সরাসরি বিচারকের পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।

খলিফা আবু জাফর তাঁকে ডেকে পাঠালেন। আবু জাফর ছিল খুবই রাগী ও একরোখা প্রকৃতির মানুষ। তাঁর মতো একরোখা প্রকৃতির মানুষ দ্বিতীয়টি পাওয়া দুষ্কর। তিনি সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ কে বললেন, হে সুফিয়ান! আমি তোমাকে কাজী বানাতে চাই। সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আমি বিচারক হতে চাই না। খলিফা বলল, তোমাকে কাজী হতেই হবে। সুফিয়ান সাওরি বললেন, আল্লাহর শপথ আমি কাজী হবো না। খলিফা বলল, তাহলে তরবারি দিয়ে গর্দান উড়িয়ে দেবো। সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বললেন, আমিরুল মুমিনীন আমাকে আগামীকাল পর্বত সভার সুযোগ দিন। সে বলল, ঠিক আছে তোমাকে আগামীকাল পর্বত সভার সুযোগ দেওয়া হল; কিন্তু রাতে সুফিয়ান সাওরি রহ. শহর ছেড়ে পালিয়ে বের হয়ে গেলেন। নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নির্ধারণ করা ছাড়াই তিনি শহর থেকে বের হলেন। তাঁর প্রথম টার্গেট হল, যে শহর থেকে এখান থেকে আগে পালাতে হবে। শহর থেকে বের হয়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে তারপর ঠিক করলেন যে, তিনি ইয়ামানে যাবেন। তাই তিনি ইয়ামানের দিকে রওয়ানা হলেন।

কিন্তু ইয়ামানে পৌঁছার পূর্বেই পথে খাবার দাবার ও টাকা পয়সা সব শেষ হয়ে গেল। পূর্বে মানুষ সফরে বের হলে খাবার পানীয়সহ সকল জিনিস সঙ্গে নিয়ে বের হতে হতো, কারণ কোনো কোনো সফরে তাদের সপ্তাহ, মাস এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যেতো। গন্তব্যে পৌঁছার পূর্বেই যদি কখনো তাদের খরচ শেষ হয়ে যেতো তাহলে পশ্চিমের যেকোনো শহরে বা বাজারে কয়েক দিন কাজ করতো, মানুষের মালামাল বহন করতো বা কারো বাগানে কাজ নিতো এবং চলার মত টাকা-পয়সা হলে আবার বাকি পথ সফর করতো। সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ যখন পথখরচ শেষ হয়ে গেল, তিনি এক লোকের আঙ্গুর বাগানে কাজ নিলেন। এদিকে খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে বিরাট পুরস্কার ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে সুফিয়ান সাওরি রহ. একটি বাগানে কাজ নিয়েছেন; কিন্তু বাগানের মালিক জানে না যে, তিনি হলেন ইমাম সুফিয়ান সাওরি।

একদিন বাগানের মালিকের নিকট মেহমান এলেন, তিনি সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহকে বললেন, হে গোলাম! আমাদের জন্য কিছু আঙ্গুর নিয়ে এসো। সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ আঙ্গুর নিয়ে এলেন; কিন্তু তা ছিল টক। মালিক বললেন, এগুলো নয়, মিষ্টি আঙ্গুর নিয়ে এসো। তিনি আবার গেলেন এবং ভালভাবে বাছাই করে আঙ্গুর নিয়ে এলেন; কিন্তু এগুলোও ছিল টক। মালিক তখন তাকে বলল, তুমি কি টক আর মিষ্টির মধ্যে পার্থক্য করতেও জান না?
-আমি জানি না যে, বাগানের কোনো আঙ্গুর টক আর কোন আঙ্গুর মিষ্টি?
-কেন জান না?
-কারণ আমি কখনো আপনার বাগানের আঙ্গুর খেয়ে দেখি নি।
-আপনি তো আমাকে আঙ্গুর খাওয়ার অনুমতি দেন নি তাই। আপনার অনুমতি ব্যতীত যদি একটি আঙ্গুরও আমি খাই তাহলে এর জন্যে আল্লাহ তাআলা আমার কাছ থেকে হিসাব নিবেন।

মালিক বলল, তুমি এসব করেছো একমাত্র আল্লাহর ভয়ে; আল্লাহর শপথ, তাহলে তো তুমি সুফিয়ান সাওরি’র মত হয়ে যাবে। ইনিই যে সুফিয়ান সাওরি তা লোকটিকে জানে না। সুফিয়ান সাওরি রহ. যখন থেকে এই বাগানে কাজ নিয়েছেন, তখন থেকে তিনি সময় মত বাগানে এসে নির্ধারিত কাজ শেষ করে নিজের থাকার ঘরে চলে যেতেন। এছাড়া কখনই তিনি আঙ্গুরের একটি দানাও মুখে দেন নি, কারণ এই চুক্তি তাঁর সাথে করা হয় নি এবং মালিক তাঁকে আঙ্গুর খাওয়ার অনুমতিও দেন নি। তাই তিনি নফসকে তা থেকে বিরত রেখেছেন।

এদিকে বাগানের মালিক বাজারে চলে গেল। বাজারে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন ধরনের মানুষ এসে থাকে। লোকটি সাথীদের সাথে কথা বলছিল, কথার এক ফাঁকে সে বলল, আল্লাহর শপথ আজ আমার এবং আমার বাগানের কাজের লোকটির সাথে এমন এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন সেখান থেকে একজন বলল, আপনার কাজের লোকের চেহারা বা আকৃতির বর্ণনা কি আপনার মনে আছে? সে বলল, হ্যাঁ, তাঁর চেহারার আকৃতিও এমন এমন। চেহারার বর্ণনা শুনে লোকটি বলল, এটা তো সুফিয়ান সাওরি’র আকৃতির বর্ণনা। অবশ্যই আমরা তাঁকে গ্রেফতার করে খলিফার নিকট নিয়ে যাবো এবং তার কাছ থেকে ঘোষিত পুরস্কার গ্রহণ করবো; কিন্তু তারা যখন সুফিয়ান সাওরিকে ধরার জন্য আসলো ততক্ষণে তিনি ইয়ামানের দিকে রওয়ানা হয়ে গেছেন।

তিনি ইয়ামানে প্রবেশ করে একটা সম্মানজনক কাজের সন্ধানে বাজারে গেলেন। যেমন লোকজনের মাল পাহারা দেওয়া, দোকানের কর্মচারী হওয়া, শ্রমিক হয়ে মজুরি খাটা ইত্যাদি সম্মানজনক কাজ। শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়েও যদিও কল্যাণ উভয়ের মধ্যেই থাকে। মুমিন তো এই হাদীসে জানে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।

অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

তোমাদের কেউ যদি রশি দিয়ে কাঠের বোঝা বেঁধে পিঠে বহন করে তা বিক্রি করে আর এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার অভাব দূর করে- এটা কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম। মানুষের কাছে হাত পাতালে হয়তো মানুষ কিছু দেয় অথবা মুখ ফিরিয়ে না করে দেয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একজন লোক এলো এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি দরিদ্র, আমার কিছু নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তোমার বাড়িতে যা আছে তাই নিয়ে এসো। লোকটি বাড়ি থেকে এক জোড়া জুতা নিয়ে এলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তা বিক্রির আদেশ দিলেন; কিন্তু সে তা বিক্রি করতে পারল না। তাই রাসূলুল্লাহ বললেন, কে আছে যে, এই জুতা ক্রয় করবে? তখন এক সাহাবি তা দুই দেরহাম দিয়ে ক্রয় করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে দুই দেরহাম দিয়ে বললেন, এখান থেকে এক দেরহাম দিয়ে একটি কুড়াল ও রশি ক্রয় করো এবং অন্য দেরহাম দিয়ে তোমার সন্তানের জন্য খাবার ক্রয় করো। লোকটি কুড়াল ও রশি কিনে আনল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, যাও অমুক জায়গা থেকে কাঠ কেটে আনো। লোকটি সেখানে গিয়ে কাঠ কাটলো অতঃপর রশি দিয়ে বেঁধে কাঁধে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে এলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কে আছে যে, এই কাঠ কিনবে? তিনি তা এক দেরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে লোকটিকে দিলেন এবং বললেন, এখন তোমার পুঁজি আছে এবং রশি ও কুড়াল আছে সুতরাং প্রতিদিন এভাবে নিজের জন্যে উপার্জন করবে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, আমাদের মধ্যে অনেক মানুষ পূর্ব শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজে কাজ না করে অন্যের কাছে হাত পাতে ও নিজেকে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও অপদস্থ করে। চমৎকার একটা ঘটনা বলছি, ঘটনাটি আমার এক বন্ধুর সাথে ঘটেছে। আমার এক সাথী রাতে হোটেলে গিয়েছিল যখন সেও। সেখান থেকে বের হয়ে সে যখন গাড়ির কাছে আসে তখন এক লোক এসে তার সামনে হাত পেতে বসলো, আমাকে দুইটা রিয়াল দিন, আমি রাতের খাবার খাবো। লোকটি ছিল পূর্ণ সুস্থ। তখন আমার সাথীটি তাকে বললো, তুমি ভাল মানুষ, কাজ করারও সামর্থ্য রাখো, তাহলে কাজ না করে মানুষের কাছে হাত পাতছো কেন? লোকটি বলল, ভাই আমাকে কেউ কাজ দেয় না, আমি কোনো কাজ খুঁজে পাই না। আপনি আমাকে দুইটা রিয়াল দিন, আমি রাতের খাবার খাবো। আমার সাথী বললেন, আমি তখন গাড়ির ভেতর থেকে একটা ছিপা বেরা লোকটিকে বললাম, এই নাও তেনা ও বালতি ওখান থেকে পানি এনে আমার গাড়িটা মুছে দাও, দুই-তিন রিয়াল নয় আমি তোমাকে পনের রিয়াল দিবো। তখন লোকটি বললো, ভাই আমি আপনার কাছে কাজ চাইনি বরং আমি আপনার কাছে কিছু টাকা সদকা চাচ্ছি। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! তুমি সামান্য একটু কাজ করে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে পনের রিয়াল ইনকাম করবে, এটা তোমার কাছে পছন্দ হচ্ছে না। অথচ তেনা ও আমার বালতি ও আমার আর ওখানে আল্লাহ্র দেওয়া নেয়ামত পানি রয়েছে তুমি শুধু একটু পরিশ্রম করে আমার গাড়িটা মুছেছ আর পনের রিয়াল ইনকাম করবে। এটা কি লাঞ্চিত-অপমানিত হয়ে হাত পাতার চেয়ে উত্তম নয়? তুমি যখন মানুষের কাছে হাত পাতো তখন কেউ তোমাকে কিছু দেয় আর কেউ অপমান করে ফিরিয়ে দেয়। তখন লোকটি আমার তেনা আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে একদিকে চলে গেল।

সুফিয়ান সাওরি রঃ জানতেন উপার্জনের জন্য কাজ করা অপমানের কিছু নয়। বরং এটা অন্যের উপর নির্ভরশীল হওয়া থেকে উত্তম। এর মাধ্যমে মানুষের শরীরের মান নষ্ট হয় না বরং তা আল্লাহ তায়ালা হেফাযত করবেন এবং এর বিনিময়ে প্রতিদান দিবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি করতে করতে মারা গেলে কিয়ামতের দিন তার চেহারার গোশতে কোনো পানি থাকবে না। সুতরাং সুফিয়ান সাওরি রঃ অন্যান্য মানুষের মত বাজারে প্রবেশ করলেন এবং কারো দ্বারা নয় বরং নিজের জন্যে একটা কাজ খুঁজলেন; কিন্তু অপরিচিত হওয়ার কারণে কিছু মানুষ তার উপর চোরের অপবাদ দিল। তিনি বললেন, হে লোকেরা আল্লাহ্র শপথ করে বলছি আমি চোর নই, আমি চুরি করি না; কিন্তু লোকেরা বললো, না বরং তুমি চোর। এভাবে কিছুক্ষণ বিতর্কের পর লোকেরা তাকে ইয়াযামের আমিরর নিকট নিয়ে গেল।

ইয়াযামে তখন খলিফা আবু জাফর আল মানসুরের নিয়োগকৃত গভর্নর দায়িত্ব পালন করছিল। আর সুফিয়ান সাওরি রঃ খলিফা আবু জাফরের পালতক একজন আসামী। তাঁকে যখন গভর্নরের সামনে নিয়ে যাওয়া হল, গভর্নর চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন ইনি চোর হতে পারেন না, কারণ তাঁর চেহারার মধ্যে সম্ভ্রান্ত লোকের প্রতিচ্ছবি ভাসছিল। তাঁকে দেখেই মনে হচ্ছিল তিনি একজন বড় আলেম হবেন। গভর্নরকে অনেক চোর বাটপারের বিচার করতে হয়, সুতরাং তিনি চেহারা দেখেই বলতে পারেন কে চোর আর কে ভাল মানুষ?তিনি সুফিয়ান সাওরির চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন ইনি চোর নন বরং ইনি একজন বড় আলেম হবেন। সুতরাং ইয়াযামের গভর্নর বিষয়টি যাচাই করতে চাইলেন, তাই তিনি উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা সকলে বের হয়ে যাও আমি তাঁর সাথে একাকী কথা বলবো। অতঃপর সকলে যখন বের হয়ে গেল, তিনি তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন তুমি কে?

-আমি আবদুল্লাহ, বললেন সুফিয়ান সাওরি।
-তোমার নাম কী?
-আবদুল্লাহ।
-আল্লাহর দোহায় দিয়ে বলছি তোমার প্রকৃত নাম বল।
-সুফিয়ান।
-কার ছেলে?
-আবদুল্লাহর ছেলে।
-আমি তোমাকে আল্লাহর দোহায় দিয়ে বলছি তুমি তোমার নাম এবং তোমার বাবার নাম বলো।
-সুফিয়ান ইবনে সাঈদ।
-আস-সাওরি?

-হ্যাঁ আস-সাওরি।
-তুমিই কি সুফিয়ান ইবনে সাঈদ আস-সাওরি?
-হ্যাঁ আমিই সুফিয়ান ইবনে সাঈদ আস-সাওরি।
-তুমি কি আমিরুল মুমিনিনের পলাতক অপরাধী?
-হ্যাঁ আমিই সেই।

-তোমাকে ধরিয়ে জন্যেই কি খলিফা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন?
-হ্যাঁ আমাকে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।

অতঃপর গভর্নর কিছুক্ষণ চুপ রইলেন, মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর মাথা উঠিয়ে বললেন, হে সুফিয়ান! তুমি ইয়াযামের যেখানে পছন্দ হয় সেখানেই থাকতে পারো। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি যদি আমার পায়ের নিচে লুকিয়ে থাকো আর তোমাকে যদি দেখা যায় তাহলে আমি আমার পা-ও উঠাবো না।

সুতরাং তুমি যদি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাঁর সকল আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলো, তাহলে তিনি দুঃখ-মুসিবতের সময় তোমাকে স্মরণ করবেন এবং তোমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি সুস্থতার সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তিনি অসুস্থতার সময় তোমাকে স্মরণ করবেন, তোমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি স্বচ্ছলতার সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তিনি তোমার দারিদ্রতার সময় তোমাকে স্মরণ করবেন, তোমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি শক্তি-সামর্থ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তিনি তোমার দুর্বলতার সময় তোমাকে স্মরণ করবেন, তোমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি স্বাধীন থাকা অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তিনি তোমার বন্দি থাকা অবস্থায় তোমাকে স্মরণ করবেন, তোমাকে সাহায্য করবেন। তুমি যদি সম্মানিত ও ক্ষমতাবান থাকা অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তিনি তোমার ক্ষমতা চলে গেলে তোমাকে স্মরণ করবেন, তোমাকে সাহায্য করবেন। অর্থাৎ তুমি যদি সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাঁর সকল আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলো তাহলে তিনি দুঃখ-মুসিবতের সময় তোমাকে স্মরণ করবেন এবং তোমাকে সাহায্য করবেন। ইয়াযামের গভর্নর বললেন, তুমি ইয়াযামের যেখানে পছন্দ হয় সেখানেই থাকতে পারো, আল্লাহ্র শপথ করে বলছি তুমি যদি আমার পায়ের নিচে লুকিয়ে থাকো আর তোমাকে যদি দেখা যায় তাহলে আমি আমার পা-ও উঠাবো না।

একবার আবু জাফর আল-মানসুর শুনতে পেল, সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ মক্কায় হারাম শরিফে অবস্থান করছেন। তখন ছিলো হজ্বের মৌসুম। আবু জাফরও হজ্বের জন্যে মক্কায় আসছিল। সে একথা শুনার সাথে সাথে এক দল সৈন্যকে এই নির্দেশ দিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিল যে, তোমরা সুফিয়ান সাওরিকে হারাম থেকে গ্রেপ্তার করবে। গ্রেফতার করে তাকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখবে, আমি এসে নিজে তাকে হত্যা করবো। আবু জাফরের প্রেরিত সৈন্যরা এসে ঘোষণা করতে লাগল যে, তোমাদের মধ্যে কে আছে, আমাদেরকে সুফিয়ান সাওরিকে চিনিয়ে দিতে পারবে? এবং সুফিয়ান সাওরির কাছে নিয়ে যেতে পারবে? তোমাদের মধ্যে কে আছে, আমাদেরকে সুফিয়ান সাওরিকে চিনিয়ে দিতে পারবে? এবং সুফিয়ান সাওরির কাছে নিয়ে যেতে পারবে? খলিফা আবু জাফর পথে আছেন, তিনি মক্কায় আসছেন।

সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ তখন কাবার দিকে মুখ করে দুই হাত আসমানের দিকে তুলে আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করে বললেন, 'হে আমার রব! আমি আপনার কসম করে বলছি, আবু জাফর যেনো মক্কায় পৌঁছাতে না পারে, হে আমার রব আবু জাফর যেনো মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে, সে আমার প্রতি জুলুম করেছে, সে মানুষের প্রতি জুলুম করেছে, হে আমার রব! আবু জাফর যেনো মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে।'

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন;

'কিছু উঁচুচ্চল ও ধুলোমলিন চেহারার অধিকারী লোক আছে, যাদেরকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না, তারা যদি আল্লাহ তায়ালাকে নিয়ে কোনো কসম করেন তাহলে আল্লাহ্ তায়ালা তা পূর্ণ করেন।'

সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহর দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আবু জাফর যেনো মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে। আর তখনই মৃত্যুর ক্ষেত্রেতা আসমান থেকে আবু জাফরের উপর নামলো। আবু জাফর লাশ হয়ে মক্কায় প্রবেশ করল এবং হারামে তার জানাযা পড়া হল।

তুমি যদি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাঁর সকল আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলো তাহলে তিনি দুঃখ-মুসিবতের সময় তোমাকে স্মরণ করবেন এবং তোমাকে সাহায্য করবেন।

আল্লাহ তায়ালার নিকট এই কামনা করি যে, তিনি যেনো আমাদেরকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় তাঁর স্মরণ করান ও তাঁর সকল আদেশ নিষেধগুলো মেনে চলার তাওফীক দান করেন। আল্লাহ তায়ালা যেনো আমাদেরকে এমন সকল ঘটনা থেকে উপদেশ গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন। যেমনভাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ ۗ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ وَلَٰكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

'নিশ্চয়ই তাঁদের ঘটনার বৃদ্ধমানদের জন্যে রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনো মনগড়া কথা নয়; বরং এটা হল এর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁদের জন্যে হেদায়াত ও রহমতের উপকরণ।'

টিকাঃ
১. সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১১১

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 পবিত্র খাবার গ্রহণ করুন

📄 পবিত্র খাবার গ্রহণ করুন


এক লোক সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহকে প্রশ্ন করলো, সালাতের সময় কাতারার কোন পাশে দাঁড়ানো উত্তম? প্রথম কাতারার ডান পাশে না-কি বাম পাশে? তখন সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'প্রথমে দেখো খাবারের জন্য রুটির যে টুকরোটা নিয়েছো তা হালাল না-কি হারাম? তুমি কাতারার যেখানেই সালাত আদায় করো তা তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। তুমি সালাত আদায় করার ক্ষেত্রে খুব ভালভাবে যাচাই-বাছাই করো যে, আমি সালাত কোথায় আদায় করব? অথচ তুমি এমন একটি কাজেই লিগ যা তোমাকে সালাত কল হওয়ার থেকে বিরত রাখে”। যেমনিভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রা.কে উদ্দেশ্য করে বলেন:

তোমরা কি জানো প্রকৃত দরিদ্র কে? তাঁরা বললেন, আমাদের মধ্যে দরিদ্র তো সেই যার কোনো দিনার বা দেরহাম নেই (অর্থ-কড়ি নেই)। তখন তিনি বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে দরিদ্র তো সে-ই যে, কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাতের সাওয়াব নিয়ে আসবে; কিন্তু সে এ-ব্যক্তিকে গালি দিয়েছে, ওকে প্রহার করেছে, অন্যায়ভাবে এর মাল ভক্ষণ করেছে, তখন এই লোক তার সাওয়াব থেকে দিবে, এই লোক তার সাওয়াব থেকে নিবে, অতঃপর যখন তার সাওয়াব শেষ হয়ে যাবে তখন এই লোক তার অপরাধগুলো এই লোককে দিয়ে দিবে, এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

সুতরাং সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ লোকটিকে বলেন, তুমি প্রথম কাতারে সালাত আদায় করলে তাতে কী লাভ হবে যদি তুমি মানুষের হক নষ্ট করো, অন্যের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো? সুতরাং তুমি হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ কর।

হালাল খাবারের ক্ষেত্রে আমাদের সালাফদের অবস্থা সম্পর্কে এখন আমরা আলোচনা করবো। দোয়া কবুলের গোপন রহস্য হল হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ করা এবং এ বিষয়ে এখানে কিছু হাদিস ও ঘটনা উল্লেখ করবো।

নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করেন না এবং তিনি মুমিন বান্দাদের তাই আদেশ করেছেন যা তিনি নবি-রাসুলদের আদেশ করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَأَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوْا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوْا صَالِحًا إِنِّيْ بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِيْمٌ

'হে রাসুলগণ, পবিত্র বস্তু আহার কর এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত।'

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা পবিত্র খাবারকে নেক আমলের পূর্বে এনেছেন। অর্থাৎ তোমার সালাত আদায় করা, দিনের বেলা সিয়াম পালন করা এবং রাত্রি জাগরণ করে আল্লাহর ইবাদত করা ও কুরআন তেলাওয়াত করার পূর্বে হালাল খাবার ভক্ষণ করো। আল্লাহ তাআলা এখানে তাঁর রাসুলদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, হে রাসুলগণ! তোমরা হালাল খাবার গ্রহণ করো। এরপর তিনি বলেছেন, এবং সৎ আমল করো। অর্থাৎ নেক আমলের পূর্বে হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ করো, যাতে করে হারাম খাবার গ্রহণের কারণে তোমার নেক আমলগুলো নষ্ট না হয়ে যায়। একারণেই আল্লাহ তাআলাবলেছেন:

كُلُوْا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوْا صَالِحًا তোমরা পবিত্র বস্তু গ্রহণ কর এবং সৎআমল কর।

অতপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ধুলোমলিন চুল ও চেহারা ওয়ালা এক লোকের উপমা দিয়ে বলেন, সে আসমানের দিকে হাত তুলো বলে, হে আমার রব! হে আমার রব! তিনি বলেন, অথচ তার খানা-পিনা হারাম, তার পোশাক-পরিচ্ছেদ হারাম, সে যা ভক্ষণ করে তা হারাম, তাহলে তার দোয়া কবুল হবে কীভাবে?!

আবুল মাআলি আল-জুয়াইনি, হারামাইন শারিফায়নের ইমাম, মুনাব্বারার ময়দানে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রতিক্ষণ কখনই তাঁকে নিকৃষ্টতর করতে পারতো না। তাঁর পিতা ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাদায়ী একজন মানুষ। সংসারে অভাব-অনটন আর দরিদ্রতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সর্বদা হালালভাবে উপার্জন করতেন এবং পরিবারের জন্য হালাল ও পবিত্র খাবারের ব্যবস্থা করতেন। সন্তান আবুল মাআলি আল-জুয়াইনির যখন জন্ম হল তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি সর্বদা সতর্ক থাকবে যে, সন্তানকে তুমি ব্যতীত অন্য কেউ যেনো দুধ পান না করায়, কারণ আমি জানি যে, তুমি তাকে যে দুধ পান করাও তা হালাল খাবার থেকে উৎপন্ন; কারণ আমি কেবল হালাল খাবারই তোমার জন্য উপার্জিত করি; কিন্তু অন্যের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। সুতরাং তুমি সতর্ক থাকবে যে, তাকে যেনো তুমি ব্যতীত অন্য কেউ দুধ পান না করায় এবং আমার সন্তান হালাল ব্যতীত কখনো হারাম খাবার গ্রহণ না করে।

একদিন তার এক প্রতিবেশি তার বাড়িতে বেড়াতে আসলো। তখন তার স্ত্রী মেহমানদের জন্য অন্য ঘরে খাবার আনতে গেলে সন্তান কোঁ কোঁ করে উঠলো। প্রতিবেশি মহিলাটি তখন খাদ্য খানাদোর জন্য তাকে কোলে নিয়ে তারে দুধ পান করানো শুরু করলো। (তখনকার সময়ে এক মহিলা অন্য কোনো সন্তানকে স্তন পান করানোটা ছিলো অতি সাধারণ ব্যাপার।) তার মা খাবার নিয়ে এসে দেখে প্রতিবেশি তার ছেলেকে দুধ পান করাচ্ছে, তখন দ্রুত তাকে ছাড়ো থেকে কেড়ে নিল এবং তাকে এর জন্য তিরস্কার করে বললো, এর বাবা আমাকে এ ব্যাপারে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, তিনি আমার সন্তানের ব্যাপারে এটা আশঙ্কিত থাকবে যে, সে হালাল দুধ ব্যতীত কখনো হারাম দুধ পান করে নি। আর এ ব্যাপারে তিনি আমাকে ব্যতীত অন্য কাউকে বিশ্বাস করতেন না। আবুল মাআলি আল-জুয়াইনি রহিমাহুল্লাহু বড় হলেন এবং অনেক বড় আলেম ও মুনামিয়ে পরিণত হলেন। বর্ণিত আছে তিনি মুনাব্বারার সময় কথার মাঝখানে মাঝে মাঝে চুপ হয়ে যেতেন, তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হতো না। তখন তিনি বলতেন, এটা হল সেই মন্দ পানের ফল।

এটাই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, হালাল খাবার মানুষের মেধা, ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে অনেক প্রভাব ফেলে। যেমনিভাবে সুফিয়ান সাওরি রা. ঐলোককে বলেছিলেন, যে তার কাছে জানতে চেয়েছিলো সালাতের সময় কাতারের কোন পাশে দাঁড়ানো উত্তম? প্রথম কাতারের ডান পাশে না-কি বাম পাশে? তখন সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহু তাকে বলেছিলেন, 'প্রথমে দেখো খাবারের জন্য রুটির যে টুকরোটা নিয়েছো তা হালাল না-কি হারাম? তুমি কাতারের যেখানেই সালাত আদায় করো তা তোমার কোনো ক্ষতি করবে না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ঘরে প্রবেশ করে বিছানার উপর একটি খেজুর পেলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। তিনি খেজুরটি মুখের কাছে নিয়ে খাবার উপক্রম হলেন অতঃপর তা না খেয়ে বললেন, আল্লাহ শপথে আমার যদি এই ভয় না হত যে, এটা সদকার খেজুর তাহলে আমি তা ভক্ষণ করতাম। এরপর তিনি তা সদকা করার আদেশ দেন। একবার তাঁর কাছে সদকা জমা করা হল, তখন হাসান অথবা হুসাইন রা. এসে একটি খেজুর নিয়ে মুখে দিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ কাছে এসে হাত দিয়ে তাঁর মুখ থেকে সেই খেজুর বের করলেন এবং তাঁকে বললেন, বাখ! বাখ! তাঁর মুখ থেকে সেই খেজুর বের করে হাত দিয়ে মুখে যথাস্থানে তা রেখে দিলেন এবং তাঁকে বললেন, তুমি কি জান না যে, এগুলো সদকার খেজুর আর মুহাম্মদ ও মুহাম্মদদের পরিবারের জন্য তা হালাল নয়। এই হাদিসই প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালাল খাবার গ্রহণের ব্যাপারে কতটা সতর্ক ছিলেন?এবং তিনি কখনই হালাল ব্যতীত হারাম খাবার গ্রহণ করেননি।

একবার সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন। হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আমার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া করুন, তিনি যেনো আমাকে মুস্তাজাবুদ দাওয়া (যার দোয়া কবুল হয়) বানিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে হাত তুলে তাঁর জন্য এই দোয়া করে বলতে পারতেন যে, 'হে আল্লাহ! আপনি সা'দকে মুস্তাজাবুদ দাওয়া বানিয়ে দিন'। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামেকে এই শিক্ষাই দিতেন যে, কোনো কিছুই তাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হবে না বরং কর্মের মাধ্যমে সবকিছু অর্জন করতে হবে। তাই তিনি সা'দ রা.-এর জন্য সাথেসাথে হাত তুলে এই দোয়া করেননি যে, 'হে আল্লাহ! আপনি সা'দকে মুস্তাজাবুদ দাওয়া বানিয়ে দিন' তিনি তাঁকে বললেন, 'তুমি তোমার খাবারকে পবিত্র করো, তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওয়া হয়ে যাবে'।

হে ভাই! সমস্যা তোমার মধ্যে না বরং সমস্যা তোমার মধ্যে। তুমি তোমার খাবারকে পবিত্র করো তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওয়া হয়ে যাবে।

এরপর থেকে সা'د রা. কখনোই হালাল ব্যতীত কোনো খাবার গ্রহণ করেননি। বর্ণিত আছে সা'দ রা.-এর বাড়িতে একটি বকরির ছিলো তিনি ও তাঁর পরিবার এর দুধ পান করতেন, একদিন বকরিটি তাঁর এক প্রতিবেশির ক্ষেতে প্রবেশ করে। সেই ক্ষেতের মধ্যে ঘাসের সাথে গম ও সবু গাছানো ছিলো। বকরিটি সেখান থেকে পেট পুরে ঘরে ফিরল। অতঃপর সা'দ রা. এই বিষয়টি জানতে পেরে এই ভয়ে আর কখনই সেই বকরির দুধ পান করেননি যে, হয়ত তার দুধ অনুমতি ব্যতীত প্রতিবেশির ক্ষেত থেকে খাওয়া খাবার থেকে উৎপন্ন হয়েছে। হাঁ, সা'দ রা. ছিলেন মুস্তাজাবুদ দাওয়া।

ওমর রা. সা'د রা. কে ইরাকেরর গভর্নর নিযুক্ত করেন। একবার ওমর রা.-এর নিকট ইরাকাবাসীর পক্ষ থেকে সা'দ রা.এর ব্যাপারে অভিযোগের একটি চিঠি আসলো; তাতে লেখাছিলো যে, সা'দ এমন এমন। ওমর রা. তাঁর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে বিষয়টি যাচাই করতে চাইলেন। তিনি খবর তথ্য সংগ্রহে তাঁর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে বিষয়টি যাচাই করতে চাইলেন। তিনি খবর তথ্য সংগ্রহে তাঁর সাথ সাথ তাঁর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, কারণ তিনি সা'দ রা.কে চিনতেন, তাঁর ব্যাপারে ভালোভাবে অবগত ছিলেন যে, তিনি কেমন? তাই তিনি বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করতে চাইলেন, যেমনিভাবে সুলাইমান আ. হুদহুদ পাখির সংবাদ যাচাই করেছিলেন। এরশাদ হয়েছে:

إِنِّيْ وَجَدْتُ امْرَأَةً مُلْهَمَةً وَ لَهَا عَرُشٌ عَظِيْمٌ ٥ وَجَدْتُهَا وَ قَوْمَهَا يَسْجُدُوْنَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَنُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُوْنَ

'আমি এক নারীকে সাবাসীবীর উপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছু দেওয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম যে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সেজদা করে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের (মন্দ) কার্যাবলী সুশোভিত করে দিয়েছে, অতঃপর তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। তাই তারা সৎপথ পায় না।'

এই সংবাদ শুনে সুলাইমান আ. কী বললেন? তিনি কি সাথে সাথে একথা বললেন যে, হে আমার বাহিনী! তোমরা তারাতারি তাদের উপর আক্রমণ করো এবং তাদের সবকিছু ধ্বংস করে দাও। বরং তিনি বলেছেন, ইরশাদ হয়েছে:

قَالَ سَنَنظُرُ أَصَدَقْتَ أَمْ كُنتَ مِنَ الْكَاذِبِينَ

'সুলাইমান বললেন, এখন আমি দেখবো তুমি সত্য বলছো না-কি মিথ্যা বলছো।'

আর এটাই হল শরয়ি বিধান যে, কোনো সংবাদ এলে তা যাচাই করে তারপর সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভালভাবে যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। একারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সামনে এই আয়াত তেলাওয়াত করতেন।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ

'মুমিনগণ, যদি কোনো পাপচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।'

সুতরাং যে কোনো সংবাদ প্রথমে যাচাই করতে হবে। কোনো একটা বিষয় শুনেই সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

তাই ওমর রা.আ. সা'দ রা.-এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার জন্য ইরাকে একজন দূত প্রেরণ করলেন। দূত এসে সা'দ রা.-কে সবকিছু খুলে বললো। দূত বললো, আমি মানুষের কাছে আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবো, সুতরাং আপনি আমার সাথে আসুন, আমরা কয়েকটি মসজিদে সালাত আদায় করবো এবং মানুষকে আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবো। অতঃপর সে একটি মসজিদে আসলো এবং সেখানে সালাত আদায় করলো, মনে করুন যোহরের সালাত আদায় করলো, সালাতের পর তিনি লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর পক্ষ থেকে এসেছি। তাঁর কাছে এমন এমন সংবাদ পৌঁছেছে, সুতরাং তোমাদের আমিরের ব্যাপারে তোমাদের কোনো অভিযোগ ও মন্তব্য থাকলে তা আমাকে বল। লোকজন সা'দ রা.-এর প্রশংসা করলো, কেউ তাঁর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ বা মন্তব্য করেনি। এভাবে তিনি অনেকগুলো মসজিদে ঘুরলেন; কিন্তু কেউ সা'দ রা.-এর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেনি। অতঃপর তিনি বনি আসাদের মসজিদে গেলেন এবং এই মসজিদে এমন একটা ঘটনা ঘটলো যা সা'দ রা.-কে অনেক কষ্ট দিল এবং তা তাঁকে আল্লাহ তায়ালার নিকট দু'হাত তুলে দোয়া করতে বাধ্য করলো।

ওমর রা.-এর দূত সা'দ রা.কে সঙ্গে নিয়ে এই মসজিদে আসলেন এবং সেখানে সালাত আদায়ের পর দাঁড়িয়ে বললেন, হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর পক্ষ থেকে এসেছি। তাঁর কাছে এমন এমন সংবাদ পৌঁছেছে, সুতরাং তোমাদের আমিরের ব্যাপারে তোমাদের কি কোনো অভিযোগ ও মন্তব্য আছে? যদি থাকে তাহলে আমাকে তা বলো। তখন লোকজন সা'দ রা.-এর প্রশংসা করলেন, কেউ তাঁর ব্যাপারে খারাপ কোনো অভিযোগ বা মন্তব্য করলেন না। তাদের কেউ বললেন, তিনি হলেন সর্বোত্তম আমির; অপর একজন বললেন, এটা তো আমাদের জন্য অনেক বড় সৌভাগ্য যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবি আমাদের আমির। দূত কারো কাহ থেকে কোনো অভিযোগ না পেয়ে আবার বললেন, একথা ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো কথা আছে কি?লোকেরা সকলে চুপ করে তার কথা শুনলো, কেউ কোনো কথা বললো না। অতঃপর দূত যখন সেখান থেকে ফিরে আসার ইচ্ছা করলেন এবং সা'দ রা.-এর প্রশংসা ব্যতীত কারো কোনো মন্তব্য শুনতে পেলেন না, তখন তিনি তাদের সকলকে আবার বললেন, আমি আল্লাহর ওয়াসাতেও তোমাদের সকলকে বলছি, একথা ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো কথা আছে কি-না আমাকে বল। তখন পিছন থেকে এক এক লোক বললো, আপনি যেহেতু আমাদেরকে আল্লাহর দোহায় দিয়ে বলছেন, সুতরাং আপনাকে সত্য বলা আমাদের জন্য ওয়াজিব হয়ে গেছে। তিনি তখন তাকে বললেন, ঠিক আছে তোমার অভিযোগ কী বল? লোকটি তখন বলল, তোমার সা'দ সমানভাবে বন্টন করে না, সে ন্যায়বিচার করে না এবং সে জিহাদেব বের হয় না। অর্থাৎ সে আমাদের মাঝে সমানভাবে বন্টন করে না, আমাদের মাঝে ন্যায়বিচার করে না, আমাদের কেউ তার কাছে বিচার নিয়ে গেলে শত্রুতাবশত একজনের ব্যাপারে অন্যায় ফয়সালা করে। এবং সে কাপুরুষ, জিহাদে যেতে ভয় পায়, আমাদেরকে জিহাদে পাঠিয়ে সে ঘরে বসে থাকে।

এমন কথা কি সা'দ রা.-এর ব্যাপারে বলা যেতে পারে? একমাত্র সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-ই হলেন সেই সৌভাগ্যবান সাহাবি যার ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন 'তোমার জন্য আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক' তিনি বলেন (اُمِّي وَ اَبِي) ইয়া সা'দ! তুমি তীর নিক্ষেপ কর, তোমার জন্য আমার মাতা পিতা কুরবান হোক। উহুদের যুদ্ধের দিন কিছু সাহাবির ভুলের কারণে কাফেররা যখন مسلمانوں উপর আক্রমণ শুরু করলো এবং মুসলমানগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তখনমাত্র কয়েকজন সাহাবি কাফেরদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তীর নিক্ষেপ করছিল, সা'দ রা. তাঁদের অন্যতম। সা'দ রা. তীর নিক্ষেপ করে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকে কাফেরদের আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন এবং তাঁকে পাহাড়ের উপর একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থলে যাওয়ার জন্য সাহায্য করছিলেন। সা'দ রা. যখন কাফেরদের দিকে তীর নিক্ষেপ করছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন, (اُمِّي وَ اَبِي) ইয়া সা'দ! তুমি তীর নিক্ষেপ কর, তোমার জন্য আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক। একমাত্র সা'দ রা.-ই হলেন সেই সাহাবি যার ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমার জন্য আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক। আর তুমি সেই সা'দের ব্যাপারে বলছো, সে ভীরু, কাপুরুষ; যুদ্ধে বের হয় না!!

সা'দ রা. জানতেন এই লোকটি তাঁর ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলছে, সে তাঁর উপর জুলুম করছে। আর তিনি তো হালাল খাবার গ্রহণ করতেন, সুতরাং তিনি হাত উঠালেন এবং লোকটির জন্য দোয়া করলেন। লোকটি বলছে সা'দ রা. ইনসাফ করে না; কিন্তু দোয়া দোয়ার ক্ষেত্রেও সা'দ রা. কতটা ইনসাফ করে দোয়া করলেন!! তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! যদি আপনার এই বান্দা অহংকারবশত এমনটি করে থাকে তাহলে আপনি তার হায়াতকে বৃদ্ধি করে দিন, সর্বদা তাকে দরিদ্রতার মধ্যে রাখুন এবং তাকে ফেতনায় পতিত করুন। এরপর সা'দ রা. সেখান থেকে বের হয়ে এলেন এবং বললেন, আমার মাঝে এবং তোমার মাঝে আল্লাহইหยাওছবে, যিনি আমার সকল গোপন বিষয় জানেন এবং তোমার সকল গোপন বিষয় জানেন। তিনি আমার অতীতও জানেন এবং তোমার অতীতও সম্পর্কে জানেন, আর তিনিই আমার জন্য তোমার ব্যাপারে যথেষ্ট হবেন। সা'দ রা. বলেন, আমি ইমারত (নেতৃত্ব) চাই না আর এর কিছুই চাই না। তিনি ইমারত ছেড়ে চলে গেলেন। আর তার দোয়া এই সেই লোকের উপর লেগেই রইল, কারণ সা'দ রা.-এর ইন্তকাল হয়ে গেল আর আল্লাহ তায়ালা তো চিরঞ্জীব, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। এই লোকটির হায়াতও অনেক দীর্ঘ হল যে, সে বৃদ্ধ হতে হতে তার ভ্রু ঝুলে চোখের উপর পড়ল। তার উপর কঠিন দরিদ্রতা নেমে এলো, ফলে সে রাস্তার পাশে মানুষের নিকট হাত পেতে ভিক্ষা করা শুরু করলো। আর তার পাশ দিয়ে যখন কোনো মহিলা অতিক্রম করতো, তখন সে চোখ তোলে তার দিকে তাকাতো, তাদেরকে হাত দিয়ে স্পর্শ করতো, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যেতো।

লোকেরা তখন তাকে বলতো, তোমার কি লজ্জা নেই? এমন বুড়ো বয়সে এমন কাজ করো। তোমরা ছোঁয়া নিয়ে কি তোমার লজ্জা হয় না? তুমি একজন বৃদ্ধ মানুষ, বয়সের ভারে চেহরা ঝুলে পড়েছে, রাস্তার পাশে বসে মানুষের কাছে ভিক্ষা করছো আর তোমার পাশ দিয়ে কোনো মহিলা অতিক্রম করলে তুমি হাত বের করে তাদেরকে স্পর্শ করো!! তোমার কি একটুকুও লজ্জা নেই? যদি কোনো যুবক এমনটি করতো তাহলে অবশ্যই আমরা তাকে শাস্তি দিতাম; কিন্তু তোমার মত এমন একজন বৃদ্ধ একাজ কীভাবে করে? তখন সে বলত, আমি কী করবো? আমার উপর যে, সৎ ও নেককার সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর বদদোয়া লেগেছে।

সুতরাং তুমি খাবারকে হালাল ও পবিত্র করো, তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওয়া হতে পারবে। (অর্থাৎ তোমার দোয়া কবুল করা হবে)

إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ

'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে দাখিল হবে।'

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে দোয়া করার আদেশ দিয়েছেন। এবং তিনি আমাদের দোয়া কবুলের ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন, وَ قَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ তোমরা আমার নিকট দোয়া কর। আমরা যদি আপনার নিকট দোয়া করি, তাহলে এর ফলাফল কী হবে? তিনি বলেন- أُسْتَجِبْ لَكُمْ তাহলে আমি তা কবুল করব।

এবং আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ আল্লাহ তায়ালার রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর নাম। হে আল্লাহ! আপনি কেনো আমাদেরকে আপনার নাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন? তিনি বললেন : (ফাত্হুল বারী) (ফাতাদ্বা'উহু (তোমরা তার (নামের) মাধ্যমে) দোয়া করো।) তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করে বল- ‘হে শ্রবণকারী! আমার দোয়া শ্রবণ করুন ও তা কবুল করুন। হে নিকটবর্তী! আমাকে আপনার নেকট্য দান করুন। হে ক্ষমাশীল! আমাকে ক্ষমা করুন। হে শেফা দানকারী! আমাকে শেফা দান করুন। হে গোপনকারী! আমার দোষক্রুটিগুলো গোপন করুন। হে ধনী-অমুখাপেক্ষী! আমাকে ধনাত্যতা দান করুন। এভাবে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা দোয়া কবুল করবেন; কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। বরং কখনো কখনো আমরা নিজেরাই আমাদের মাঝে এবং দোয়া কবুলের মাঝে একটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখি, যে প্রতিবন্ধকতার কারণে আমাদের দোয়া কবুল হয় না। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাটি হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ না করা। তুমি পবিত্র খাবার গ্রহণ কর, তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওওয়া হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ব্যক্তির কথা বলেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ধুলোমলিন চুল ও চেহারায়, যে আসমানের দিকে হাত তুলে বলে, হে আমার রব! হে আমার রব! তিনি বলেন, অথচ তার খানা-পিনা হারাম, তার পোশাক-পরিচ্ছেদ হারাম, সে যা ভক্ষণ করে তা হারাম, তাহলে তার দোয়া কবুল হবে কীভাবে?! একজন হারাম রুজে লিপ্ত এবং নাপাকি তথা মদ পান করে, এরপর বলে, ভাই! আমার দোয়া কবুল হয় না। হ্যাঁ, তোমার দোয়া তো কবুল হবেই না, কারণ তুমি তো মদ পান করো। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি মদাসক্ত অবস্থায় ইন্তেকাল করলো, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সাথে মূর্তি-পূজারীর মত সাক্ষাৎ করবে। অন্য হাদীসে তিনি বলেন : যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের পূঁজ ও মলমূত্র পান করাবেন।

কখনো কখনো তুমি অন্যায়ভাবে মানুষের হক ভক্ষণ করো। শ্রমিকের পারিশ্রমিক বুঝিয়ে দাও না। তোমার বাড়ির অসহায় কাজের মেয়েটিকে তার প্রাপ্য ভাড়া প্রদান করো না। আর তুমি আবার অভিযোগ করে বলো, আমার দোয়া কবুল হয় না?? গতকাল আমার কাছে একজন ফাতওয়া চেয়েছে, শায়খ! আমার ভাইয়ের নিকট এক কাজের মেয়ে সাত বছর ধরে কাজ করে, এই সাত বছরে সে তার কাছ থেকে বেতন গ্রহণ করে নি এবং সে ব্যক্তি বেতন তার পরিবারের নিকট পাঠাতেও রাজি নয় এবং সে তা খরচও করে নি। এখন আমার ভাইয়ের নিকট তার কি কোনো হক আছে? সে কি আমার ভাইয়ের নিকট বেতন পাবে? হে ভাই! এক মহিলা একটি বিদ্যালয়ে আটকে রাখার কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে, তাহলে তোমার কী ধারণা আল্লাহর বান্দার উপর জুলুম করলে কী অবস্থা হবে? হে ভাই! একজন ইহুদিও যদি তোমার নিকট কাজ করে, তাহলে তোমার উপর ওয়াজিব হল তুমি তার পারিশ্রমিক ঠিক মত দিবে। তাহলে এখন অন্যদের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা? তুমি তোমার খাবারকে পবিত্র রাখো; তাহলে তুমি দোয়া করলে তা কবুল হবে। আমি আমার ছেলে-মেয়েদের বলি, তোমরা মদ ও ধূমপান করা থেকে সাবধান থাকবে, কারণ এগুলো হল নাপাকি, কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র জিনিসকে হালাল করেছেন এবং অপবিত্র জিনিসকে হারাম করেছেন। তোমরা চুরি ও মানুষের সাথে প্রতারণা থেকে সাবধান থাকবে এবং সাবধান থাকবে অন্যায়ভাবে মানুষের মাল ভক্ষণ করা থেকে। আল্লাহ তাআলার নিকট আমার জন্য এবং আপনাদের সকলের জন্যে প্রার্থনা করি যে, আমরা যেখানেই থাকি যিনি যেনো আমাদের উপর রহম ও বরকত দান করেন এবং তার নিকট এই প্রার্থনা করি যিনি যেনো আমাদের পবিত্র খাবার খাওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।

টিকাঃ
১. সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১
১. সূরা নামল, আয়াত: ২০-২৪
২. সূরা নামল, আয়াত: ২৭
৩. সূরা হুজুরাত, আয়াত: ৬
১. সূরা গাফির, আয়াত: ৬০

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 এক গুনাহগার ব্যক্তির গল্প

📄 এক গুনাহগার ব্যক্তির গল্প


এখন আমরা এক গুনাহগার ব্যক্তির গল্প বলবো, এক মদ্যাব লোকের গল্প বলবো। আবু মিহ্জান আস-সাকাফি রা.-এর গল্প বলবো যাদের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি থাকার কারণে জাহেলিয়াতে থাকাবস্থায় আবু মিহ্জান আস-সাকাফি একটি কবিতায় তার ছেলেকে অসিয়ত করে বলেছিলো— ‘আমি যখন মারা যাবো, তখন তুমি আমাকে আঙ্গুর বাগানের পাশ্বে কবর দিয়ে। যাতে আমার মৃত্যুর পরে আমার হাড়গুলো এর রস পান করতে পারে।’ ‘তুমি আমাকে নির্জন প্রান্তরে দাফন করো না, কারণ আমার ভয় হয় যে, তাহলে আমি মরে গেলে এর (মদের) স্বাদ আর কখনো গ্রহণ করতে পারবো না।’ অতঃপর যখন ইসলামের আগমন ঘটলো, আবু মিহ্জান আস-সাকাফি রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পরও তিনি মদ পান করতেন। এরপর মদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে যখন শরয়ি হুকুম জারি হল, আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ

‘হে মুমিনগণ! এই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে?’

তখন সাহাবায়ে কিরাম রা. বললেন, হে আমাদের রব! আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেছি। হে আমাদের রব! আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেছি। আবু মিহ্জান রা.ও বললেন, হে আমাদের রব! আমরা তো ধ্বংস হয়ে গেছি, আমরা তো শেষ হয়ে গেছি। যখন মদ পান করা হারাম হয়ে গেল, তখন আবু মিহ্জান রা. কী করলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় আবু মিহ্জান রা. কখনো কখনো মদ পান করতেন আর তখন তাঁকে এর হদ-শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত করা হত। এরপর তিনি আবারও মদ পান করতেন এবং তাঁকে আবারও এর হদ হিসেবে বেত্রাঘাত করা হত। তিনি কিছুদিন মদ পান করা থেকে বিরত থাকতেন; কিন্তু একদিন পর পরই আবারও শয়তান তাঁকে ধোঁকা দিত আর তিনি মদ পানে লিপ্ত হতেন, তখন তাঁর উপর এর হদ প্রয়োগ করা হতো; কিন্তু তিনি কখনোই ঈমান থেকে বের হননি এবং সালাত আদায় করা ত্যাগ করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুনাহগারদের সাথে সবসময় ভাল ব্যবহার করতেন। কেউ যদি এমন কোনো অন্যায় করতো যার জন্য শরিয়তে হদ বা শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে, তাহলে তিনি এর জন্য তার উপর শরিয়ি হদ প্রয়োগ করতেন; কিন্তু এরপর তার সাথে ভাল ব্যবহার করতেন, তাকে সৎকাজের জন্য উৎসাহ দিতেন, গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি গুনাহগারদের দেখে তাঁদেরকে ঘৃণা করতেন না। মদ পান করা একটা খারাপ কাজ, সে মদ পান করলো মানে একটা খারাপ কাজ করলো, অতঃপর যদি সালাত আদায় করে, তাহলে সে একটা ভাল কাজ করলো। যেহেত মদ পান করাটা অনেক বড় একটা পাপ এবং এর প্রভাব মানুষের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বাকি থাকে আর সালাত অল্প সময়ের ইবাদত, তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে, তার মধ্যে ভালোর পরিমাণটা হল ত্রিশ পার্সেন্ট (৩০%) আর খারাপীর পরিমাণটা সত্তুর পার্সেন্ট ৭০%। মদ পান করা সত্ত্বেও সে যেহেতু সালাত আদায় করে, তাহলে আমাদের বলতে হবে যে, তার মধ্যে আল্লাহর মুহাম্মাদত ও ইসলামের ভালবাসা আছে। যদিও তা পরিমাণে কম, মানে একশত পার্সেন্টের মধ্যে ত্রিশ পার্সেন্ট। মাত্র। তবুও কিন্তু তার মধ্যে আল্লাহর মুহাম্মাদত বিদ্যমান আছে। এটা বলা যাবে না যে, তার মধ্যে আল্লাহর মুহাম্মাদত একেবারেই নেই। এরপর আসুন মদ পান করার সাথে সাথে সে দান-সদকা করে, সন্তান লালনপালন করে, মাতা-পিতার সেবা-যত্ন করে। অর্থাৎ আরো অনেকগুলো ভাল কাজ করে। তাহলে আমরা এটা ধরে নিতে পারি যে, সে একটা খারাপ কাজ করার বিপরীতে অনেকগুলো ভাল কাজ করে। অর্থাৎ এখন যদি আমরা পার্সেন্টের হিসাবটা করি তাহলে এমন দাঁড়াবে যে, তার মধ্যে খারাপ বা মদ কাজের প্রভাবটা ৩০% অথবা ৪০% আর ভালোর প্রভাবটা ৭০% বা ৬০%। অর্থাৎ তার ভালোর পরিমাণটা খারাপের চেয়ে বেশি। তাহলে আমাদের উচিত হবে তাঁকে সাহায্য করে ভালোকাজের প্রতি আরো বেশি উৎসাহিত করা। আমাদের জন্যে কখনই এটা উচিত হবে না যে, তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা। তুমি মদ পান করো, সুতরাং তুমি আমাদের থেকে দূরে থাকো, আমাদের কাছে আসবে না; একথা বলে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া আমাদের জন্যে কখনই উচিত হবে না। তাহলে সে ভালোর দিকে আসার পরিবর্তে দিন দিন আরো বেশি খারাপের মধ্যে ডুব দিতে থাকবে। অর্থাৎ খারাপের মধ্যে ৪০% থেকে ৫০% চলে যাবে, এরপর আমরা যখন তার সাথে আরো বেশি খারাপ আচরণ করব তখন সেই পরিমাণটা আরো বাড়তে থাকবে, অর্থাৎ ৫০% থেকে ৮০% চলে যাবে। বরং তার সাথে আমাদের ভাল ব্যবহার করা উচিত। আমরা যদি তার সাথে ব্যবহারের পরিবর্তে ভাল ব্যবহার করি, সহানুভূতির সাথে তাকে বলি যে, ভাই তুমি মদ পান করো ঠিক আছে; কিন্তু তুমি তো মাতা-পিতার খেদমত করো। ইন-শা-আল্লাহ তাঁদের দোয়ার বরকত একদিন তুমি তাওবা করবে মদ পান ছেড়ে দিবে। তুমি তো সালাত আদায় করো, তুমি সালাত আদায় করতে থাকো, ইন-শা-আল্লাহ একদিন দেখবে সালাত তোমাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন ‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে’ আর মদ পানও তো একটা খারাপ কাজ, সালাত তোমাকে সেটা থেকেও বিরত রাখবে। আমরা যখন তাঁকে এভাবে ভাল কাজের প্রতি উক্ত করতে থাকবো যখন থীরবীরের মধ্যে ভাল কাজের পরিমাণটা বাড়বে এবং খারাপ কাজের পরিমাণটা আস্তে আস্তে কমতে থাকবে।

আবু মিহজান রা.-এর ঘটনা শেষ করার পূর্বে অন্য আরেকজনের একটি ঘটনা বলি। আব্দুল্লাহ নামে এক সাহাবি ছিলেন যাকে মানুষ হাম্মার (গাধার মালিক) বলে ডাকত। এটা তাকে তিরস্কার করে বা গালি দিয়ে ডাকত না। যেমন আমরা বর্তমানে কাউকে ‘রাজ’ বলে সম্বোধন করে তার ধূর্ততা ও চালাকি বুঝায়, এর মাধ্যমে তাকে কিন্তু একটি হিংস্র পাখি বুঝায় না বরং তার ধূর্ততা ও চালাকি বুঝায়। অনুরূপভাবে সাহসী লোককে আমরা সিংহের সাথে তুলনা করি, তাকে সিংহ বলার মাধ্যমে আমরা বনের কোনো হিংস্র প্রাণী বুঝাই না। পূর্বেও মানুষ একজন অপরজনকে এখরণের বিভিন্ন খেতাবে ডাকত। সুতরাং তারা ধৈর্যশীল মানুষকে হাম্মার বলে ডাকত। আব্দুল্লাহ আল-হাম্মার রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেক মুহাব্বত করতেন। তিনি সর্বদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কিছু হাদিয়া দিতে চাইতেন; কিন্তু তিনি ছিলেন দরিদ্র, তাঁর টাকা-পয়সা ছিল না। তিনি একবার বাজারে গেলেন, তখনকার বাজার ও এখনকার বাজারের মত ছিলো না, তখন মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্য নিয়ে বাজারে যেতো এবং বিক্রি করে চলে আসতো। এই সাহাবিও বাজারে গেলেন এবং তাঁর একটি জিনিস পছন্দ হল, সে তাঁর মালিকের সাথে দর-দাম করে তাকে বললেন, ঠিক আছে তুমি আমার সাথে আসো, আমি তোমাকে এর মূল্য পরিশোধ করে দিচ্ছি। সাহাবি লোকটিকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন এবং তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এটা আপনার জন্যে হাদিয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদিয়া গ্রহণ করলেন, তখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি এটার মূল্য পরিশোধ করে দিন, একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দিকে তাকাল এবং বললো, এটা কি তুমি আমাকে হাদিয়া দাওনি? সে বলল, হ্যাঁ! হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এটা আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য হাদিয়া; কিন্তু আমি দরিদ্র মানুষ, আমার কোনো টাকা-পয়সা নেই, তাই আপনি এটার মূল্য পরিশোধ করে দিন। সুবহানাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাহাবাদের কেরাম রা.-এর মুহাব্বত ছিলো এমনই অকৃত্রিম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মূল্য পরিশোধ করে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে লোকটির ভালোবাসা ছিলো চমৎকার; সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত মুহাব্বত করতো; কিন্তু লোকটি মদ পান করতো, কারণ সে জাহেলি যুগ থেকেই ছিলো মদাসক্ত। তাঁকে এ কাজ থেকে অনেক নিষেধ করা হতো; কিন্তু কখনো কখনো তাঁর মদদুর্বল হয়ে যেতো আর সে মদ পান করতো। সে যখনই মদ পান করতো তখন তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে আসা হতো এবং এর শাস্তি-স্বরূপ তাঁকে বেত্রাঘাত করা হতো, অতঃপর সে চলে যেতো। এভাবে একদিন তাঁকে মদ পান করার শাস্তি দেওয়ার পর সে বের হচ্ছিল, তখন এক সাহাবি তাঁকে বললো, তোমার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক, এবার শাস্তির দেওয়ার পরও তুমি মদ পান করো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি তাঁকে লানত করো না, কারণ আমি জানি সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে মুহাব্বত করে, তাদের ভালবাসে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কল্যাণের দিকে, তাঁর ভাল কাজের দিকে লক্ষ করেছেন; তাঁর মন্দ দিকটির প্রতি কিন্তু তিনি লক্ষ করেন নি এবং বারবার মদ পান করার পরও তাঁকে তিরস্কার করেন নি। বরং তাঁকে সৎ ও ভাল কাজের প্রতি উত্থুদ্ধ করেছেন।

আবু মিহজান রা. ছিলেন একজন সৎ, নেককার ও মুত্তাকি লোক; কিন্তু কখনো কখনো তাঁর পা পিছলে যেতো, তিনি মদ পান করে ফেলতেন। কাদিসিয়ার যুদ্ধের সময় তিনি মুজাহিদদের সাথে যুদ্ধে বের হলেন। যুদ্ধের আমির ছিলেন সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.। ময়দানে পৌছার পর সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. এবং কাফের সেনাপতির মধ্যে দীর্ঘ পর আদানপ্রদান হল। এটা অনেক দিন চলতে থাকল। এই সময়ে আবু মিহজান রা.-এর মদের প্রতি আগ্রহ দেখা হল থীরবীরের এ চুড়ান্ত আকার ধারণ করল; কিন্তু তিনি এখানে এত মুজাহিদদের মধ্যে কীভাবে মদ পান করবেন?

আবু মিহজান রা. লুকিয়ে একটি নিরাপদ স্থানে গেলেন এবং চারপাশটা ভালোভাবে দেখে নিয়ে মদ পান করলেন; কিন্তু তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ধরা পড়লেন। তাঁকে গ্রেফতার করে আমিরুল মুজাহিদীন আমির সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর নিকট নিয়ে আসা হল। সা’দ রা. তাঁকে ধরে একটি ঘরের মধ্যে বেধিকরে রাখলেন এবং এবং তাঁকে যুদ্ধ অংশগ্রহণ করে নিষেধ করে দিলেন। তখন আবু মিহজান রা. কী করলেন? তিনি কি এটাকে নিজের জন্য আশীর্বাদ মনে করে হাসা-পা ওঠিয়ে বসে রইলেন? না, আবু মিহজান রা. বরং নিজের জন্য এটাকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের বিশাল সাওয়াব থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করলেন। তিনি অনেক অস্থির হয়ে পড়লেন এবং এবং বললেন, এটা স্থিরতার বিষয় নয়। আমি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে বিশাল সাওয়াবের অধিকারী হওয়ার জন্য এসেছি আর সা’দ রা. আমাকে মদ পানের অপরাধে এই সাওয়াব অর্জন থেকে বিরত রাখছে। আবু মিহজান রা. ঘরে বন্দি অবস্থায় বসে আছেন, বাইরে যুদ্ধ চলছে। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ ও তীর-তরবারির ঝনঝনানি তাঁর কানে আসছে। তিনি বাইরে যুদ্ধের আওয়াজ শুনে অস্থির হয়ে চিৎকার করতে লাগলেন।

এবং বলতে লাগলেন:

كَفَى حُزْنًا أَنْ تُدْخَلَ الخَيْلُ بِالْقَنَا * وَأَتْرُكُ مَشْدُودًا عَلَيَّ وَثَاقِي

إِذَا قُمْتُ عَنَّى الحَدِيدُ وَ غُلْقَتْ * مَصَارِيعُ دُونَ تَصِمِ المنَادِي

يَقْطَعُ قَلْبِي حَسْرَةً أَنْ أَرَى الوَغْ * وَلَا سَامِعَ صَوْتِي وَلَا مِنْ يُرَادِي

وَأَنَّ أشْهَدَ الإِسْلَامَ يَدْعُو مُعَوِّقًا * فَلَا لِلْجِهَادِ الإِسْلَامِ حَيَّ دِعَانَا

وَقَدْ كُنْتُ ذَا مَالِ وَ إِسْرَةٍ * وَ قَدْ تَرَكُونِي وَاحِدًا لَا أُعَا لَيَا

فَلِلَّهِ عَهْدٍ لَا أُخِيفُ بَعْدَهُ * لَأَنَّ فَرَجَتْ لَا أَزُورُ الخَوَانِي

'দুঃখ করার জন্যে তো এটাই যথেষ্ট যে, ঘোড়া যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করছে আর আমাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলে রাখা হয়েছে।'

'আমি যখন দাঁড়াতে যাই তখন দেখি আমাকে লোহার লাগাম পরিয়ে বদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং যুদ্ধের শোরগোলের কারণে আমার আহবানও কেউ শুনতে পায় না।'

'যুদ্ধ শুরু হতে দেখে পরিতাপে আমার কষ্ট কেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু আমার আওয়াজ শুনার মত কেউ নেই এবং আমাকে দেখার কেউ নেই।'

'আমি দেখেছি ইসলাম একজন সাহায্যকারীর সন্ধান করছে; কিন্তু সে যখন আমাকে ডাকছে আমি তার কোনো সাহায্য করতে পারছি না।'

'আমি ছিলাম অনেক সম্পদের অধিকারী, এবং আমার অনেক ভাই ছিলো; কিন্তু তারা সকলে আমাকে একা ফেলে চলে গেছে; এখন আমার কোনো ভাই নেই।'

'আমি আল্লাহর সাথে অঙ্গিকার করছি। আমি তাঁর অঙ্গিকার কখনো ভঙ্গ করবো না। আমি যদি এখান থেকে মুক্ত হতে পারি তাহলে আর কখনোই পানশালায় যাবো না।' (মদ পান করবো না)

এরপর তিনি বাড়িতে থাকা লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, বাড়িতে কি কেউ আছেন? বাড়িতে কি কেউ আছেন? তিনি জানতেন যে, এই বাড়িতে একজন মহিলা আছেন আর তিনি সেনাপতি সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর স্ত্রী। সে সময় দীর্ঘাদিন যুদ্ধ চলতে থাকত, কখনো কখনো তা পাঁচ-ছয় মাস পর্যন্ত চলত। তাই স্ত্রীরদের নিয়ে যুদ্ধে বের হতেন এবং তাদেরকে যুদ্ধের পিছনে দূরে থাকতে রেখে যেতেন। আবু মিহজান রা. জানতেন তাকে যে বাড়িতে আটক রাখা হয়েছে তাতে কেউ একজন আছে, তাই তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন, বাড়িতে কি কেউ আছেন? বাড়িতে কি কেউ আছেন? তখন সা’দ রা.-এর স্ত্রী সালমা তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন। তিনি তাঁকে কী বললেন? এরপর কি তিনি যুদ্ধে শরিক হয়েছেন?

সালমা রা. এসে তাঁকে বললেন, তোমার কী প্রয়োজন? আমাকে ডাকছো কেনো? সালমা মনে করেছিলেন সে পানি অথবা খাবার চাচ্ছে; কিন্তু না। তিনি বাবার চান নি এবং পানিও চান নি। তিনি বললেন, হে সালমা! আমাকে মুক্ত করে দাও এবং আমাকে আমার তরবারি ও সা’দ রা.-এর ঘোড়া 'বালকা'কে দাও, কারণ তিনি জানতেন সা’দ রা. যুদ্ধে শরিক হননি; তিনি আহত, ঘোড়ার উপর বসে থাকতে পারেন না, তাই তিনি বাড়িঁর ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন আর তাঁর ঘোড়া বাড়ির পিছনে বাঁধা অবস্থায় আছে। সা'দ রা. যদিও সমস্যার কারণে যুদ্ধে শরিক হতে পারেননি কিন্তু নিষ্কর্মা তো আর অজরুহ ছিলেন না, তারা এই বসে থাকার বাস করে বলেছেন:

وَعَدْنَا وَقَدْ أَمَتْ نِسَاءَ كَبِيرُوفُوَسَادٌ مَعَدَّ لَيْسَ فِيهِنَّ أَمْ

'সে আমাদের কাছ থেকে যুদ্ধের অধিকার গ্রহণ করে আর অনেক নারী বিধবা হয়। অথচ সা’দের স্ত্রীর বিধবা হওয়ার কোনো ভয় নেই।'

(অর্থাৎ সা'দ রা. তো যুদ্ধই করে না, তাহলে সে নিহত হবে কীভাবে)

আবু মিহজান রা. বললেন, তুমি আমাকে মুক্ত করে দাও এবং আমাকে তরবারি ও বালকা দাও। আমি তোমাকে আল্লাহর নামে ওয়াদা করে বলছি আমি যদি নিরাপদ এবং বেঁচে থাকি তাহলে আবার ফিরে এসে স্বেচ্ছায় হাত-পা শিকলে দিয়ে বন্দিত্ব বরণ করবো। আর যদি যুদ্ধে নিহত হই তাহলে তো তোমরা আমার থেকে মুক্ত হয়ে গেলে। তিনি তখন তাঁকে মুক্ত করে দিলেন এবং তাঁকে তরবারি ও বালকা ঘোড়া দিলেন। সা’দ রা. এসবের কিছুই জানতেন না, কারণ তিনি তখন বাড়ির ছাদের উপর থেকে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ চরত। এ দিকে আবু মিহজান রা. যুদ্ধ হয়ে তরবারি হাতে নিয়ে ঘোড়ায় চড়লেন এবং যুদ্ধের দিকে ছুটে চললেন। তখন যুদ্ধের অবস্থা তুঙ্গে। ঘোড়া নিয়ে যুদ্ধের ময়দানের চুকে পড়লো এবং একবার ডানদিকে, একবার বাম দিকে, একবার সামনের দিকে, একবার পিছনের দিকে ছুটতে লাগল। আর তিনি ঘোড়ার উপর মজবুত পাথরের ন্যায় বসে কাফেরদের উপর তীব্র আক্রমণ চালালেন; তাদের হত্যা করছেন এবং তাদের দিক থেকে আসা আক্রমণগুলো প্রতিহত করছেন। এদিক দূর থেকে সা’দ রা. এই দৃশ্য দেখছেন আর অবাক হচ্ছেন। তিনি ভাবছেন এমন বীরপুরুষ সাথে যে যুদ্ধ করছে তিনি মনে মনে বলছেন যোদ্ধাকে দেখে তো আবু মিহজান মনে মনে হয় আর ঘোড়াকে দেখতে বালিকার মত; কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? বালকা ঘরের পিছনে বাঁধা আর আবু মিহজান ঘরের ভিতরে বন্দি অবস্থায় আছে? যদি ধরেও নেই এটা বালকা, তাহলে আবু মিহজান কীভাবে এটা উপর উঠল? আর যদি মনে করি যে, এটা আবু মিহজান তাহলে সে বালকাকে পেলো কোথায়? এভাবে সূর্য ডুবে গেল, উভয় পক্ষের সৈনিকরা আজকের মত যুদ্ধ বন্ধ করে নিজ নিজ তাবুতে ফিরে গেল। আবু মিহজান রা. ফিরে এলেন তাঁর চেহারায় রক্তের দাগ, তাঁর কাপড় ছেঁড়া, কারণ তিনি তো যুদ্ধ গিয়েছেন, তিনি তো আর বিবাহ করতে যান নি যে, কাপড় ও শরীর পরিচ্ছন্ন থাকবে। আবু মিহজান রা. ফিরে এসে বালকাকে যথাস্থানে বেঁধে নিজের পায়ে বেড়ি পরে বন্দি হলেন।

তখন সা’দ রা. সাদ থেকে নেমে ঘোড়ার কাছে গেলেন এবং দেখলেন, এর শরীর থেকে ঘাম ঝরছে, তিনি বুঝে গেলেন যে, এটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। অতঃপর আবু মিহজান রা.-এর দিকে গেলেন আর তাঁর মধ্যে যুদ্ধের ছাপ দেখতে পেলেন। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আবু মিহজান! তুমি কি যুদ্ধ করেছো? তিনি বললেন, হাঁ আমি যুদ্ধ করেছি। আমি তোমার কাছে আল্লাহর শপথ করে ওয়াদা করছি যে, আমি আর কখনো মদ পান করবো না। সা’দ রা. তখন বললেন এবং আমিও তোমাকে আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, তুমি যদি মদ পান না করো তাহলে আমিও তোমাকে আর শাস্তি দিবো না।

এরপর আবু মিহজান রা. অনেক বড় মুজাহিদ হয়েছিলেন, কারণ শয়তান তাঁকে একথা বলে ধোঁকা দিয়ে দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারেনি যে, আবু মিহজান! তুমি কীভাবে দীনের খেদমত করবে? এতে তোমার কী লাভ হবে? তুমি তো মদ্যপীর? তুমি একজন ফাসেক, পাপাচারী, মদ পান করো, তাহলে কীভাবে তুমি দীনের খেদমত করবে? কীভাবে তুমি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে? অথচ তুমি একজন মদ্যপ! না শয়তান তাঁকে এভাবে ধোঁকা দিতে পারেনি। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত দীনের কোনো না কোনো কাজে তাঁর প্রয়োজন অবশ্যই হবে।

এই দীন যেমন কামেল ও পরিপূর্ণ ঈমানদারের মাধ্যমে উপকৃত হয়, ঠিক তেমনিভাবে একজন অসম্পূর্ণ ঈমানদারের মাধ্যমেও উপকৃত হয়, অনুরূপভাবে একজন গুনাহগার ও পাপাচারী মুমিনের মাধ্যমেও উপকৃত হয় এবং কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির মাধ্যমেও উপকৃত হয়। একজন কবিরা গুনাহে লিপ্ত; কিন্তু সে যদি একটা মসজিদ নির্মাণ করে তাহলে এতে সমস্যার কী আছে? হ্যাঁ, সে গুনাহগার, কবিরা গুনাহে লিপ্ত; কিন্তু তাঁর এই মসজিদ নির্মাণ তো একটা পুণ্যোর কাজ এবং সে তো এই মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে তাঁর কবিরাহ গুনাহ থেকে তওবা করবে। এতে কী সমস্যা যে, একজন লোক কখনো কখনো সালাত ত্যাগ করে, তা সত্ত্বেও সে মানুষকে মদ পান করা থেকে বিরত থাকতে বলে এবং মানুষকে সালাত আদায়ের আদেশ করে সে বলে, যে অমুক! আল্লাহকে ভয় করো সালাত আদায় করো। সে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করলে সমস্যা কী? হোক-না দীন পালনের ক্ষেত্রে তার ঘাটতি আছে। এমনকি কেউ আছে যে, সে কখনো ভুল করে নি, গুনাহের কাজ করে নি? এমনকি কেউ আছে যে, সারা জীবন শুধু নেকির কাজই করেছি?

মানুষ গুনাহে লিপ্ত হলেও তাকে সর্বদা এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাকেও উদ্দেশ্য করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ

‘আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে এবং উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে।’

এবং এ আয়াতেও আল্লাহ তাআলা তাকেও উদ্দেশ্য করেছেন। তিনি বলেন:

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

‘যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকাজ করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ মুসলিম, তাঁর অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার হতে পারে?’

আমরা যতই গুনাহগার হই না কেনো আল্লাহ তাআলার সকল আয়াতের উদ্দিষ্ট আমরাই। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমান থাকবো আমরাই তাঁর সকল আয়াতের উদ্দিষ্ট। যতক্ষণ আমরা চেষ্টা করবো তিনি যেনো আমাদের একটা ভালো কাজের মাধ্যমে অন্য একটা খারাপ কাজ মুছে দেন।

এক লোক হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহর নিকট আসলে হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ তাকে প্রশ্ন করলেন, হে লোক! তুমি কি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করো? সে বললো, না। তিনি বললেন, কেনো? সে বললো, আমার ভয় হয় যে, আমি মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবো আর আমি নিজেই তা করবো না এবং আমি মানুষকে অসৎ কাজের নিষেধ করবো আর আমি নিজেই তাতে লিপ্ত থাকবো, কারণ আমি অনেক ভুল করি, আমি অনেক গুনাহে লিপ্ত। তখন হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, সুবহানাল্লাহ! শয়তান তো এটাই চায় যে, সে তোমাদের এভাবেই ধোঁকা দিবে। হে লোক! আমাদের মধ্যে কে আছে যে গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত? যে কোনো একটা বিতর্কিত কাজে লিপ্ত নয়? তা সত্ত্বেও তো আমরা মানুষকে ওয়াজ-নসিহত করি, যে জানে হয়তো এর মাধ্যমে একজন লোক মুক্তি পেয়ে যাবে? সুতরাং শয়তান যেনো তোমাকে নিয়ে আর খেলা করতে না পারে এবং তোমাকে ধোঁকা দিতে সফল না হয়। এমনকি কেউ যদি গুনাহ ও পাপাচরের ঘর থেকে বের হয় এবং তাতে কোনো ভিক্ষুক তাঁর কাছে হাত পাতে তাহলে তখনও যেনো সে তাকে সদকা করে। তুমি তো এর বিনিময়ে প্রতিদান পাবে। তুমি বলবে, শায়খ! আমি তো এই মাত্র মদ পান করেছি অথবা কোনো অশ্লীল কাজ করার কারণে আমি এখনও তো নাপাক। আর তাই এটা একটা কাজ আর ওটা আরেকটা কাজ। তুমি গুনাহের কাজ করেছো, এর জন্যে আল্লাহ তাআলা তোমার হিসাব নিবেন। অনুরূপভাবে তুমি কোনো নেকির কাজ করলে তাঁর হিসেবেও আল্লাহ তাআলা করবেন।

নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধে বেরুতেন তখন তিনি কিন্তু একথা বলে ঘোষণা দিতেন না যে, আমাদের সাথে কেবল পুত-পবিত্র লোকেরাই বেরুতে পারবে, যারা কখনো কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়নি কেবল তারাই আমাদের সাথে যেতে পারবে। না, তিনি কখনোই এমন আদেশ দেননি, কারণ তাঁর সাথে যারা জিহাদে বেরুতো তারা কেউ ফেরেশতা ছিলো না যে, তাঁরা কখনো আল্লাহর কোনো আদেশ অমান্য করবে না বরং সর্বদা তাঁর আদেশ মেনে চলবে। বরং নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, তাঁর সাথে যুদ্ধ যাচ্ছে তাঁরা হল আদম সন্তান, আর আদম সন্তান ভুল করবেই। তাই তো তিনি বলেন :

‘প্রতিটি আদম সন্তানই ভুল-অন্যায়কারী আর সবচেয়ে ভাল অন্যায়কারী হল সে যে তাওবাকারী ও অনুতাপী।’

সুতরাং এসো আমার সকলেই একমত হই যে, আমাদের মধ্যে যারা মাদ্রাসায় আছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে এবং যত বস্তু আছে, হোক তারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানে একসাথে থাকার কারণে বন্ধুত্ব হয়েছে অথবা কোনো এক সফরে গিয়ে তারা সারিচয় হয়েছে অথবা অন্য কোনো যোগাযোগে, আমরা যা যতটুকু পারি নেককাজ করবো এবং কাউকে কোনো অন্যায় কাজ করতে দেখলে তাকে বাধা দিবো, হোক-না মোরগ কোনো একটা বিষয়ে ঘাটাতি আছে, আমি কোনো একটা অপরাধের সাথে জড়িয়ে আছি; কিন্তু এটা যেনো আমাকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরত রাখতে না পারে। অনুরূপভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বাজারে অথবা অন্য কোনো স্থানে সকল বোনেরা বলছো, যখন আপনি বাজারে যাচ্ছেন আপনি দেখলেন, আপনারই কোনো সহপাঠী বা পরিচিত কেউ কোনো একটা খারাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে, তাহলে আপনি তাকে তা থেকে নিষেধ করবেন, এমনকি আপনি যদি হিজাববিহীন বেপর্দায এবং আপনার মধ্যে কোনো গুনাহের বিষয়ও থাকে তবুও আপনি তাকে তা থেকে নিষেধ করবেন। আপনি তাকে বলবেন হে বোন! এটা ঠিক যে আমি এখন বেপর্দায আছি, এটা একটা গুনাহের কাজ; কিন্তু তুমি যা করেছো এটা অন্যায়, সুতরাং তুমি এ কাজ থেকে বিরত থাকো। অথবা আপনি কোনো বোনকে দেখলেন যে, সে সালাত আদায় করছে না তখন আপনি তাকে সালাত আদায় করতে বলবেন, আপনি তাকে বলবেন বোন! তুমি পর্দা করো না ঠিক আছে, তবে সালাতটা তো কমপক্ষে আদায় করো, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

‘মুসলমান এবং কাফের-মুশরিকদের মাঝে পার্থক্য হল সালাত ছেড়ে দেওয়া।’

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘আমাদের মাঝে এবং তাদের মাঝে যে চুক্তি রয়েছে তাহলে সালাত, সুতরাং যে সালাত ত্যাগ করল সে কুফরি করলো।’

হাঁ, আপনি যদি বেপর্দায থাকেন তাহলে আপনি কোনো সালাত ত্যাগকারীকে সালাতের আদেশ দিলে আপনার কি কোনো ক্ষতি হবে? আপনি আপনারি কাজ থেকে অশ্লীল কাজ থেকে বিরত হতে বলুন আপনার কি কোনো ক্ষতি হবে? আমরা যখন মানুষকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবো থাকবো এবং ভাববো যে, পুরো কুরআনে কারীম আল্লাহ তাআলা আমাকেই সম্বোধন করেছেন, তাহলে আবার সাহাবাদের যুগ ফিরে আসবে।

আবু মিহজান রা. যদিও একটা যুদ্ধের মধ্যে ছিলেন এবং একটা গুনাহ করতেন, তা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে কখনো ছোটো করে দেখেন নি। তিনি বলেছেন, হাঁ আমি একটা ভুল করেছি, আমার দ্বারা একটা কবিরা গুনাহ হয়ে যায় এবং একটা বিষয় শয়তান আমাকে নিয়ে খেলা করে; কিন্তু আমি কিছুতেই শয়তানকে এই সুযোগ দিব না যে, শয়তান আমার উপর এই জঘন্য ও বেশি প্রভাব বিস্তার করুক। আমাকে আরো বেশি গুনাহের কাজে লিপ্ত করুক। যা এটা সত্য যে, শয়তান আমাকে একবারে ধোঁকা দিয়েছে, আমি মদ পান করেছি, একবার ধোঁকা খেয়েছি; কিন্তু আমি তাকে এর চেয়ে বেশি সুযোগ দিব না, আমি জিহাদ থেকে বিরত থাকবো না বরং আমি জিহাদ করবো এবং দীনের সাহায্য করবো। আর একারণেই দীনের বিজয় হয়েছে। এমন অসংখ্য মানুষের মাধ্যমে দীনের বিজয় হবে শয়তান যাদেরকে ধোঁকা দিয়ে বিচলিত করতে পারে নি।

আমি আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাদের এবং আপনাদের তাঁর আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করুন। এবং আমরা যেখানে থাকি না কেনো তিনি আমাদেরকে তাঁর কল্যাণ ও বরকতের সাথে রাখুন। আমিন。

টিকাঃ
১. সূরা মায়েদা, আয়াত : ৯১
১. সূরা নাহাল, আয়াত : ১২৫
১. সূরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৩

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 আমরা যে কত নেকি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি!!

📄 আমরা যে কত নেকি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি!!


জান্নাতের সবচেয়ে উচ্চ স্তর চাওয়া ও কামনার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন ধরনের। আমাদের হাবিব, আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রা.কে জান্নাতের উচ্চতর কামনা করার জন্য উৎসাহিত করতেন। সাহাবাদের মধ্যে জান্নাতের সবচেয়ে উচ্চ স্তর অর্জনের জন্য অগ্রস্রুতি করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সাহাবায়ে কেরামের জিজ্ঞাসা ও প্রশ্নের ধরন থেকেই এটা বুঝা যায় যে, তাঁরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিষয়টাই কামনা ও পেতে চাইতেন। উদাহরণস্বরূপ বলি, যেমন একজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি? একটু ভেবে দেখো যে, সকল আমলই তো পছন্দনীয়; কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় কোনটি? তাই তাঁর প্রশ্ন হল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি? তিনি বলেন, সময়মতো সালাত আদায় করা অপর একজন এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কিয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী কে থাকবে? লক্ষ্য করে দেখুন, এখানে কিন্তু সে এই প্রশ্ন করে নি যে, কারাকারা আপনার নিকটবর্তী থাকবে? বরং তাঁর প্রশ্ন হল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কিয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী কে থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ও কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তীসে-ই থাকবে, যার আখলাক-আচরণ তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দর হবে। এক সাহাবি এক যুদ্ধের শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! বান্দার কোন আমল দেখে আল্লাহ তাআলা বেশি খুশি হন এবং তিনি হাসেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে শত্রুদের ভিতরে গিয়ে যুদ্ধ করে। চতুর্থ আরেক জন এসে প্রশ্ন করে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে উত্তম আমল কোনটি? অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম রা. সর্বদা জান্নাতের উচ্চতর ও সবচেয়ে উর্দ্ধ মর্যাদা কামনা করতেন। আর একারণেই প্রতিটি কল্যাণকর কাজের বিষয়ে তাঁরা অনেক আগ্রহী থাকতেন। এবং আমলের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে প্রতিযোগীতাও লিপ্ত হতেন। জান্নাতের উঁচু মর্যাদা নিয়ে প্রতিযোগিতাকারী সাহাবিদের মধ্যে একজন ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.। জানাযার নামাজ নিয়ে তাঁর একটি চমৎকার ঘটনা রয়েছে, এখন আমরা এখানে সেই ঘটনাটি উল্লেখ করছি।

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. আবু হুরাইরা রা.কে একটি হাদিস বলতে শুনলেন। আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

‘যে ব্যক্তি জানাযার সালাত আদায় করবে তার এক কিরাত সাওয়াব হবে। (আর এক কিরাত হল উহুদ পাহাড়ের সমান সাওয়াব) আর যে, কবর দেওয়ার আগ পর্যন্ত মাইয়েতের সাথে থাকবে, তার দুই কিরাত সাওয়াব হবে।’

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এই হাদিস প্রথম শুনলেন, তাই তিনি আবু হুরাইরা রা.কে বললেন, ঠিক তোমারে? তুমি এটা কী বলছ? আবু হুরাইরা রা. বললেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমাদেরকে তাই বলছি যা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শুনেছি। অর্থাৎ যারা জানাযার সালাত আদায় করবে, তার জন্যে এক কিরাত সাওয়াব হবে। আর যারা তাওয়া অনুসরণ করে কবর পর্যন্ত যাবে, কবর খনন করবে, তাকে গোসল করাবে, তাকে কবরে নামাবে, জানাযায় খাটায় বহন করবে, তাকে কবর দিবে, মাইয়েতের পরিবারকে সান্ত্বনা দিবে, তাদের জন্যে দুই কিরাত সাওয়াব। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. যখন এই হাদিস প্রথমবার শুনলেন তখন তিনি এক লোককে এই হাদিস যাচাই করার জন্যে আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠালেন। আয়েশা রা. আলেমা সাহাবি, তিনি ছিলেন হাফিজুল হাদিস এবং ফকিহ। তাই আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এক লোককে আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠালেন এবং তাকে বললেন, তুমি আয়েশা রা.-এর নিকট গিয়ে এই হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো।

লোকটি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর নিকট থেকে চলে গেল, তখন ইবনে ওমর রা. একটি পাথরের টুকরা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে লোকটির আসার অপেক্ষা করতে ছিলেন এবং ভাবতে লাগলেন, এটা কি হাদিস হিসেবে প্রমাণিত হবে না-কি হবে না। যদি এটা হাদিস হয়ে থাকে তাহলে এতগুলো বছর আমি এই সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছি!! আমি আখেরাতের ব্যাপারে সাওয়াব অর্জনের ব্যাপারে পরিপূর্ণ মনোযোগী নয়ি। আমি যদি আখেরাতের ব্যাপারে পূর্ণ মনোযোগী হতাম! তাহলে আমি কেনো এই হাদিস জানি না? তিনি পেরেশানিতে একটি পাথর হাতে নিয়ে ঘুরতে লাগলেন এবং লোকটি ফিরে আসা পর্যন্ত প্রত্যাবর্তন ছিলেন। অতঃপর যখন লোকটি ফিরে এসে বলল, হ্যাঁ আয়েশা রা. বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই হাদিস শুনেছেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হাতে থাকা পাথরটি মাটিতে ছুড়ে মারলেন এবং বললেন, সুবহানাল্লাহ! কত সাওয়াব আমাদের থেকে ছুটে গেল!!

সেই মানুষ নেকির কাজ ছুটে গেলে আফসোস করে ও সামনে যেনো তা না ছুটে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকে সেইতো সফল মানুষ। সাইদ ইবনে আবদুল আজিজ বলতেন, আমি সর্বদাই জামাতে সালাত আদায় করার ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকতাম। একদিন আনার জামাত ছুটপেল, তখন আমার খুবই আফসোস হল, আমি পেরেশান হয়ে পড়লাম। অধিক আফসোস ও পেরেশানির কারণে আমি ভেঙে পড়লাম। সেই মুহূর্তে আমার এক সাথী ইবনে মারওয়ান আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল, আল্লাহ তোমাকে জামাত ছুটে যাওয়ার শোক কাটিয়ে উঠার তাওফিক দান করুন। তিনি বলেন, আমার সন্তান যদি মারা যেতো তাহলেও তো আমাকে কতো মানুষ সান্ত্বনা দিতে আসতো। অথচ আজ আমার জামাত ছুটে গেল কিন্তু ....। অর্থাৎ তাদের কাছে জামাত ছুটে যাওয়াটা সন্তান মারা যাওয়ার চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক ছিল। তাঁরা এটাকে এর চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক ও কষ্টকর মনে করতেন। সালাফিদের একজন বলতেন,আমার একবার এশার জামাত ছুটে গেল, তখন আমি পার্শ্ববর্তী মসজিদে গেলাম, সেখানে গিয়ে দেখি সেখানেও জামাত শেষ হয়ে গেছে। অতঃপর আমি অন্য পার্শ্ববর্তী মসজিদে গিয়ে দেখি এখানেও জামাত চলছে। অতঃপর আমি বাড়ি ফিরে এলাম এবং আফসোস করতে লাগলাম যে, কীভাবে আমার সাতসাতটি মর্যাদা ছুটে গেল!! তিনি বলেন, অবশ্যই আমি সাতশবার সালাত আদায় করবো।

কোনো নেকির কাজ ছুটে যাওয়া তাঁদের কাছে সাধারণ কোনো ব্যাপার ছিলো না। তাঁরা এটাকে কোনো সাধারণ ব্যাপার মনে করতেন না। তাঁদের কেউ এরকম বলতো না যে, একবার জামাতও ছুটেছে, এটা তো সাধারণ ব্যাপার, আমি তো সবসময় জামাতেই সালাতআদায় করি। গতকাল জামাতের সাথে সালাত পড়েছি, এর পূর্বে পড়েছি সামনেও পড়বো। এক ওয়াক্ত জামাত ছুটেছে তো এতে কী এমন বিশেষ ক্ষতি হয়ে গেছে? অথবা আমি এই মিসকিনকে কিছু সদকা করিনি তো কী হয়েছে? আমি তো ইতঃপূর্বে অনেক সদকা করেছি? না তাঁরা কখনো এমনটি বলেননি। বরং তাঁদের যখনই কোনো নেকির কাজ ছুটে যেতো তখনই তাঁরা এর জন্যে অনেক আফসোস করতেন। বরং এটা তাঁদের কাছে নিজ সন্তান হারানোর চেয়েও বেশি কষ্টকর ও বেদনাদায়ক ছিল।

সালাফ বলতেন, অতঃপর আমি সাতশবার সালাত আদায় করলাম। সালাত আদায় করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে সেখানেই ঘুমিয়ে গেলাম। আমি যখন ঘুমিয়ে গেলাম তখন স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটা ঘোড়ায় আরোহণ করেছি। আর আমার এসকল সাথীরাও ঘোড়ায় আরোহণ করেছে যারা জামাতের সাথে ইশার সালাত আদায় করেছে, অতঃপর তাঁরা ঘোড়া ছুটাচ্ছে এবং দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমিও তাদের পিছন পিছন ঘোড়া ছুটাচ্ছি, তাদের সামনে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করছি; কিন্তু আমি তাদের সাথে যাবো তো দূরের কথা তাদেরই ধরতে পারছি না। তখন তাদের থেকে একজন আমার দিকে তাকিয়ে বলো, তুমি তো আমাদের কিছুতেই ধরতে পারবেনা, কারণ আমরা তো ইশারার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করেছি।

হয়তো অধিক পেরেশানির কারণে এই স্বপ্নটা দেখেছে, কারণ সে এই আফসোস করেকরে রাতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল, কীভাবে আমার জামাত ছুটপেল; কিন্তু তাঁর এই আফসোস ও পেরেশানি ছিলো বিশাল প্রতিদান পাওয়ার আশায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরامকে উৎসাহ দিতেন তাঁরা যেনো বেশি বেশি সাওয়াবের আশা করে এবং নেক আমল করার ব্যাপারে আগ্রহী থাকে। একারণেই সাহাবায়ে কেরাম রা. কোনো কল্যাণ ও নেক আমল ছুটে গেলে এর জন্যে অনেক আফসোস করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.কে বলেন, হে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর! (আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর বয়স তখন পনের বছরও কম ছিল।) তুমি অমুকের মতো হয়ো না, সে তো রাতে জাগ্রত হয়েও কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করেন।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সারা বছর রোজা রাখতেন। তিনি দুই ঈদের দিন ব্যতীত আর কোনো দিন রোজা ভাঙতেন না। তিনি সারা রাত জাগ্রত থেকে সালাত আদায় করতেন এবং দৈনিক এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি মানুষকে কোনো সময়ই দিতেন না,এমনকি নিজ পরিবারকেও কোনো সময় দিতেন না। দিন-রাত শুধু ইবাদত-বন্দেগি করতেন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডাকে ডাকলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তাঁকে এর উপর উৎসাহিত করেছেন? তিনি তাঁকে সাওয়াব অর্জনের প্রতি এই আগ্রহের প্রশংসা করেছেন না-কি তিনি তাঁর এই আগ্রহকে দমিয়ে দিয়েছেন?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর! আমি কি তোমাকে বলবো যে, তুমি সারা রাত জেগে সালাত আদায় করো? তিনি বললেন, হ্যাঁ হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি রাতের তিন ভাগের এক ভাগ বা অর্ধেক রাত জেগে সালাত আদায় করবে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরথেকে কিছুটা ইবাদত কমাতে চাইলেন, যাতে করে অতিরিক্ত ইবাদতের কারণে লোকটি ক্লান্ত না হয়ে পড়ে। হ্যাঁ সাওয়াব ও নেকির কাজ ছুটে গেলে আমাদের ক্রন্দন ও আফসোস করা উচিত। যেমনটি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর ব্যাপারে ঘটেছিল। যখন হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর মায়ের মৃত্যু হল, তখন তিনি অধিক ক্রন্দন করতে লাগলেন। লোকেরা তাঁকে বলল, শায়খ! আপনি কাঁদছেন অথচ আপনিই তো আমাদের ধৈর্য শিক্ষা দেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার জান্নাতে যাওয়ার দুইটি পথ ছিল, আজ আমার থেকে একটি বন্ধ হয়ে গেল। আর এখন মাত্র একটি পথ বাকি আছে।

হে ভাই! সালাফগণ কোনো নেকি ছুটে গেলে এমনই আফসোস করতেন। বলছিলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. কে বললেন, আমার কাছে বলা হয়েছে তুমি না-কি দৈনিক কুরআন খতম করো? তিনি বললেন, জি। তিনি বললেন, তুমি এমনটি করো না বরং তুমি মাসে এক খতম তিলাওয়াত করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি প্রতি সপ্তাহে এক খতম তিলাওয়াত করো। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি প্রতি তিন দিন এক খতম তিলাওয়াত করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না; এরচেয়ে বেশি তিলাওয়াত করবে না। যে ব্যক্তি তিন দিনের কমে তিলাওয়াত করে সে কুরআন বুঝবে না। আর সিয়ামের ব্যাপারে তাঁকে বললেন, তুমি মাসে তিন দিন সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রতি সোমবারে ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি একদিন সিয়াম পালন করে ও একদিন ভঙ্গ করো অর্থাৎ একদিন পর পর সিয়াম পালন করবে। তিনি বললেন আমি কি এর চেয়ে বেশি সিয়াম পালন করতে পারবো? তিনি বললেন, না; এর চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। এটা হচ্ছে দাউদ আ.-এর সিয়াম। তিনি একদিন সিয়াম পালন করতেন এবং একদিন ভঙ্গ করতেন।

এরপর থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. এভাবে আমল করতেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. সর্বদা নেক আমলের জন্য আগ্রহী থাকতেন। তাঁদের একটি নেক আমল ছুটে গেলে এর জন্যে অনেক আফসোস করতেন। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. ‘কিরাতের’ হাদিস পেরিতে তুনার পর আফসোস করেছেন। তিনি যখন জানাযার সালাত আদায় করলে এক কিরাত এবং তাকে সমাহিত করা পর্যন্ত তার সাথে থাকলে আরো এক কিরাত মোট দুই কিরাত সাওয়াব পাওয়া যায় তখন তিনি অধিক পেরেশান হয়ে পাথর হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। এভাবেই তাঁদের যখন কোনো নেকি কাজ ছুটে যেতো তখন তারা এর জন্যে আফসোস করতেন ও কাঁদতেন।

হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রা.- এর নিকট গিয়ে দেখলেন আয়েশা রা. কাঁদছেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, তুমি কাঁদছো কেন? একথা শুনে তিনি আরো বেশি করে কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি এজন্য কাঁদছো যে, তুমি হাজ্জ ও ওমরাহ করার কারণে তোমার ওমরাহ ছুটে গেছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমার শরীর হাজ্জ ও ওমরাহ নিয়ে ফিরে যাবে আর আমি শুধু হাজ্জ নিয়ে যাব। হে ভাই! তুমি কি একবার লক্ষ করেছো? নেকির কাজ ছুটে যাওয়ার কারণে তিনি কিভাবে কাঁদছেন ছে। উম্মে সালামা রা. হাজ্জ ও ওমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, হাফসা রা. হাজ্জ ও ওমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, যায়নাব রা, হাজ্জ ও ওমরাহ করে ফিরে যাচ্ছে, তাহলে তিনি কিভাবে শুধু হাজ্জ করে ফিরে যাবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আয়েশা রা.-এর ক্রন্দন দেখলেন তখন তিনি তাঁর ভাই আব্দুর রহমান রা. কে আদেশ দিলেন তিনি যেনো তাঁকে ওমরাহ করিয়ে নিয়ে আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কারো মধ্যে ভালো কাজের আগ্রহ দেখতেন তখন তিনি খুশি হতেন। আব্দুর রহমান রা. আয়েশা রা.কে নিয়ে তানঈমে গেলেন, তানঈম হল সবচেয়ে কাছের মিকাত। মক্কাবাসীদের মিকাত এবং যারা দূর থেকে হজ্জ করতে আসে তারা ওমরার জন্য সেখান থেকে ইহরাম বাঁধে। তানঈমে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে, যার নাম মসজিদ আয়েশা রা., কারণ আয়েশা রা. ওমরার জন্য সেখান থেকে ইহরাম বেঁধেছেন এই কারণে এ মসজিদের নাম হয়েছে ‘মসজিদে আয়েশা রা.।’ অতঃপর আয়েশা রা. তাঁর ভাই আব্দুর রহমান রা.-এর সাথে তানঈমে গেলেন এবং ইহরাম বাঁধলেন, অতঃপর বাইতুল্লাহর এসে তাওয়াফ করে তালবিয়া পড়ে ওমরাহ আদায় করলেন। হ্যাঁ সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহিন এভাবেই কোনো নেকির কাজ ছুটে গেলে আফসোস করতেন ও এর জন্যে ক্রন্দন করতেন।

হে ভাই! যারাই নেকির কাজ করার জন্য দৃঢ় সংকল্প করবে এবং কোনো নেকির কাজ ছুটে গেলে এর জন্যে আফসোস করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কল্যাণকর কাজ করার তাওফিক দান করবেন। যে ব্যক্তি সালাতের আগের সুন্নত ছুটে গেলে আফসোস করে, অতঃপর ফরয সালাতের পর এর কাযা করে নেয়, সে অচিরেই জামাতের সাথে সালাত আদায় করার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি একবার দেখলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের পর সালাত আদায় করেছেন। ফলে আমি আশ্চর্য হলাম, কারণ সেটা হল সালাতের জন্যে নিষিদ্ধ সময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, তখন আমি আমার এক দাসী।কে বললাম, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে তাঁকে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামা বলেছে, আমি আপনাকে বলতে শুনেছি আপনি এই সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। তাহলে আপনি কিভাবে সালাত আদায় করছেন? তিনি বললেন, তিনি যদি তোমাকে ইশারা করেন তাহলে তুমি সেখান থেকে চলে আসবে। তখন দাসীটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! উম্মে সালামা বলেছে, আমি আপনাকে বলতে শুনেছি যে, আপনি এই সময় সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। তাহলে আপনি কিভাবে সালাত আদায় করছেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ইশারা করলেন এবং তিনি সালাত আদায় করতে থাকলেন। তখন সে চলে গেল। অতঃপর তিনি যখন সালাত শেষ করলেন তখন বললেন, হে উম্মে সালামা বনি কায়েসের প্রতিনিধি দল এসেছিল, তাঁরা আমাকে যোহরের পরের দুই রাকাত সালাত পড়া থেকে ব্যস্ত রেখেছিল, তাই আমি তা এখন আদায় করলাম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে এর উপর প্রশিক্ষণ দিতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন এক সাহাবি ফজরের পর নিষিদ্ধ সময়ে সালাত আদায় করছে। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী করছো? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ফজরের নফল (সুন্নত) আদায় করছি, আমি তা ফজরের পূর্বে আদায় করতে পারিনি। আমার থেকে তা ছুটে গেছে। সুতরাং আমি তা এখন আদায় করছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি প্রতি সপ্তাহে এক খতম তিলাওয়াত করো। তিনি বললেন, আমি কি এর চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘যে সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে যাবে অথবা সালাত আদায়ের কথা ভুলে যাবে, অতঃপর যখন স্মরণ হয় তখনই যেনো সে তা আদায় করে নেয়।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে কিয়ামুল লাইল না করে ঘুমিয়ে থাকতেন, তিনি তা সকালে সূর্য উঠার পর আদায় করে নিতেন। যাতে এর প্রতিদান থেকে বঞ্চিত না হন।

সুতরাং আমাদের অবস্থাও যেনো এমন হয়, আমাদের কোনো নেকের কাজ ছুটে গেলে এর জন্য আফসোস করিয়ে, হায়! আমি উত্তম সময়ে সালাত আদায় করতে পারলাম না, মুস্তাহাব সময়ে ওমরাহ করতে পারলাম না, দোয়া কবুলের উত্তম সময় দোয়া করতে পারলাম না এবং মসজিদ নির্মাণের সুযোগটি আমি গ্রহণ করতে পারলাম না। এমন বিভিন্ন আমল ও সাওয়াবের কাজ আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেলে আমাদের আফসোস করা উচিত এবং পরে এর অনুরূপ কাজ করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ঈমান ও হেদায়েত এবং প্রতিটি কল্যাণকর কাজ সময়মতো করার তাওফিক দান করেন। এবং আমরা যেখানেই থাকি, যে অবস্থাই থাকি তিনি আমাদেরকে তাঁর রহমত ও বরকতের মধ্যে রাখবেন। আমিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00