📄 আল-আসমায়ি রহিমাহুল্লাহ: এক মহাসাফলোর গল্প
মানুষের বিভিন্ন স্বপ্ন থাকে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে তাকে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি, ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীনও হতে হয়। তবে তাদের মধ্যে যারা সেই সকল বাধা পেরিয়ে সামনে এগোতে থাকে সে-ই সফল হয় এবং সে-ই তাঁর স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছতে পারে। সুতরাং মানুষের মধ্যে কেউ তাঁর স্বপ্ন পূরণের জন্যে সকল ধরনের কষ্ট-মাশাক্কাত সহ্য করে, আবার কেউ কষ্ট দেখে লুকাতে চায়।
আর সফলতা তো বলা হবে তখনই যখন তা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানো হবে। স্বপ্ন-পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মানুষের হিম্মত ও মনোবল বিভিন্নধরনের হয়ে থাকে। তাদের কেউ পাহাড়ের কিছুটা উপরে নেমে যায়, কেউ চার ভাগের একভাগ, কেউ চার ভাগের তিনভাগ উপরে উঠে নেমে যায়; কিন্তু কিছু মানুষ থাকে যারা তাঁদের লক্ষ্যের চূড়ায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্তও ক্লান্ত হয় না। যখন সে চূড়ায় পৌঁছে কেবল তখনই অনুভব করে যে, সে কিছুটা সফল।
প্রতি বিষয়েই একটা চূড়া রয়েছে, যেমন পড়ালেখার চূড়া, ব্যবসা- বাণিজ্যের চূড়া, আবিষ্কারের চূড়া, হিফজুল কুরআনের চূড়া, বয়ান বক্তৃতার চূড়া, সন্তান লালন-পালনের চূড়া, পরিবারের সাথে উঠা-বসা, চলা-ফেরার আদব-আখলাকের চূড়া, এক কথায় প্রতিটি বিষয়েরই একটা সর্বোচ্চ চূড়া রয়েছে; কিন্তু মানুষ তার লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
এখন আমরা এবিষয়ে অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সকল বাধা-বিপত্তি উপেশক্ষা করে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার ক্ষেত্রে আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমা'য়ি রহ.-এর আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনবো। যদিও ইলমের প্রতিটি শাখায় আসমা'য়ির বিচরণ ছিলো; কিন্তু তার প্রসিদ্ধি ছিলো ভাষা বিষয়ক।
আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমা'য়ির যদিও ইলমের প্রায় প্রতিটি বিষয়ে অনেক দক্ষতা ছিলো; কিন্তু একজন ভাষা বিষয়ক হিসেবেই বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আমি এখন আপনাদের সামনে যে ঘটনা উল্লেখ করবো তা শায়খ তাকিউদ্দিন ‘আল ফারায় বাদাশ শিদাদ্’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন। আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমা'য়ি বসরায় বসবাস করতেন, তিনি ছিলেন ইলম-পিপাসু। তিনি প্রতিদিন কোনো না কোনো ইলমের শাখায় নিকট ইলম শিক্ষার জন্যে যেতো। আজ তাফসিরের শায়েখের কাছে, কাল হাদিসের শায়েখের কাছে, এর পরের দিন সাহিত্যের শায়েখের কাছে, এভাবে এক দিন একএক শায়েখের নিকট গিয়ে ইলম শিক্ষা করতেন। ইলমের দিকে অধিক মনোযোগী হওয়ার কারণে তিনি রুজি-রোজগারের প্রতি মন দিতে পারতেন না। তাঁর বাড়ির পাশেই ছিলো এক সবজি-বিক্রেতার দোকান। আসমারিয় বাড়ির ছিলো এলাকার একেবারে শেষ মাথায়, বাড়িও থেকে বের হয়ে মসজিদ অথবা শায়েখদের নিকট যাওয়ার পথে সবজি-বিক্রেতার দোকান পড়তো এবং সবজি-বিক্রেতার সাথে তাঁর দেখা হতো। শায়েখ আসমারিয় বয়স তখন বিশ বছরের কম। প্রতিদিন যাওয়া আসার পথে সবজি-বিক্রেতা তাঁকে জিজ্ঞেস করতো আসমারিয়! তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ? আসমারিয় বলতেন, আমি এখন আমার তাফসিরের শায়েখের নিকট তাফসীর শিক্ষার জন্যে যাচ্ছি। এরপর বিকেলে ফিরে আসার সময় তাঁকে আবার প্রশ্ন করতো, আসমারিয় তুমি এখন কোথা থেকে এসেছ? তিনি বলতেন, আমি এখন আমার সাহিত্যের শায়েখের নিকট থেকে আসলাম। পরদিন সকালে আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করতো, তুমি এখন কোথায় যাও? তিনি বলতেন, আমি আমার হাদিসের শায়েখের নিকট হাদিস শিখতে যাচ্ছি। এভাবে প্রতিদিন তাঁর যাওয়া-আসার সময় সবজি-বিক্রেতা তাঁকে প্রশ্ন করতো, কোথায় যাচ্ছ? কোথা থেকে এলে? আর তিনিও তাঁকে উত্তর দিতেন, অমুক শায়েকের নিকট যাচ্ছি, অথবা অমুক শায়েখের কাছে থেকে এলাম।
শায়েখ আসমারিয় এভাবেই ইলম অর্জনের পিছনের তাঁর দিন-রাত মেহনত করেছেন। এমন সময় একদিন সেই সবজি বিক্রেতা তাঁকে বলল, আসমারিয় তুমি কি এভাবে এঁদের পিছনে ঘুরে ঘুরে তোমার সময় নষ্ট করো না? ফলে তুমি এঁদের থেকে কিছুই পাবে না। আসমারিয় বললো, আমি ইলম অর্জন করছি, কুরআন মুখস্থ করছি, ভাষা শিখছি, কবিতা শিখছি। লোকটি তাঁকে আবারও বললো, তুমি তোমার সময় নষ্ট করো না। আসমারিয় বললো, না; এতে আমার সময় নষ্ট হয় না বরং আমার উপকার হয়। এবার সবজি-বিক্রেতা তাঁকে বললো, আসমারিয় আমার একটা মতামত শুনবে? (ভাই! তুমি একবার লক্ষ কর, উঁচু মনবাল আর নিচু মনবাল কাকে বলে?) এই যে, তুমি সকাল-বিকাল কষ্ট করে যে কিতাবগুলো বহন করো, (তখনকার কিতাব এখনকার মত এতো ছোটোখাটো ও সুন্দর সুন্দর ছিলো না। তখনকার কিতাব ছিলো অনেক বড় বড় পৃষ্ঠায় দোয়াতের কালি দিয়ে বড় বড় করে লেখা। উস্তাদ দরসে হাদিস বলতেন আর ছাত্র দোয়োতে কলম ভিজিয়ে মোটা কাগজে লিখতো। এখনকার মত পকেটে থেকে ছোট ও সুন্দর কলম বের করে নোট বুকের মধ্যে লেখা যেতো না। তাই তাঁদের একাদিনের দরসের লেখা হয়ে যেতো অনেক, কখনো কখনো তা মাথায় করে বহন করতে হতো। আর আসমারিয় রহ. সকাল-বিকাল তাঁর লেখা বইগুলো নিয়ে শায়েখের দরসে আসা-যাওয়া করতেন।) সবজি-বিক্রেতা তাকে বলল, আমার একটা মতামত শুনবে? এই যে তোমার কিতাবগুলো তুমি সকাল-বিকাল যা কষ্ট করে বহন করে নিয়ে যাও সেগুলো আমাকে দিয়ে দাও, বিনিময়ে আমি তোমাকে কিছু সবজি দিব। আসমারিয় বললেন, আমি তোমাকে তা দিব না আর আমার কাছে এর সমতুল্য কিছুই নেই। তখন লোকটি তাকে ঠাট্টা করে বলল, আসমারিয় শুনো! আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তিনি বললেন সেটা কী? তুমি তোমার সকল কিতাবগুলো নিয়ে এসো এবং সেগুলোকে বড় একটা বালতির মধ্যে পানি দিয়ে ভিজাও, অতঃপর আমি তোমার সাথে একত্র হয়ে দেখবো সেখান থেকে কী ধরনের রং বের হয়? তার রং কি লাল, নীল না কালো?
আসমারিয় বলেন, আমি তখন ছিলাম ছোট বালক, তাই আমি চুপ করে বাসায় ফিরে গেলাম। এরপর থেকে আমি ফজরের পূর্বেই বাড়িও থেকে বের হতাম, যাতে করে বের হওয়ার সময় সবজি-বিক্রেতার সাথে আমার দেখা না হয় এবং তাঁর সাথে আমার কথা বলতে না হয়। এবং রাতে ইশার পর যখন সবজি-বিক্রেতা তার দোকান বন্ধ করে বাড়িতে চলে যেতো তখন আমি বাড়িতে ফিরতাম, যাতে করে সে আমাকে দেখতেই না পায়। আসমারিয় রহ. বলেন, এরপর কঠিন দারিদ্রতা আমাকে ঘিরে ফেলে, যার ফলে আমি আমার বাড়ির আসবাবপত্র, বিছানা-পাতি সবকিছুই বিক্রি করে দিলাম, এমনকি আমি আমার পরনের একটিমাত্র জামা রেখে বাকি সবগুলো বিক্রি করে দিলাম। এরপর আমার অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হতে লাগলো; আমার মাথার চুল লম্বা হয়ে গেল, গোসল না করতে করতে শরীরে ও কাপড়ও ময়লা জমে গেল, কারণ চুল কাটার মত ও গোসল করার মত কোনো টাকা ছিলো না। অর্থাৎ আমি খুবই কঠিনভাবে জীবন কাটাতে লাগলাম।
আমার যখন এই অবস্থা তখন একদিন বানায়ি নিজ গ্রামে হাঁটছি, তখন হঠাৎ একলোকের চিৎকার শুনতে পেলাম; সে বলছে, হে আসমারিয়কে চিনি এবং আমাকে আসমারিয় নিকট নিয়ে যাবে? হে আসমারিয়কে কিংবা আমাকে আসমারিয় নিকট নিয়ে যাবে? তখন মানুষ আমার দিকে ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিল। অতঃপর সে আমার নিকট এলো এবং আমাকে দেখে বলল, তুমিই কি কবি সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ আসমারিয়? আমি বললাম, হাঁ আমিই আসমারিয়। তখন সে বললো, আমি বনরার আমির মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশিমির নিকট থেকে এসেছি, তিনিই আমাকে তোমার নিকট পাঠিয়েছেন। তিনি তোমাকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে বলেছেন; কিন্তু তুমি তো এই অবস্থা ও এই চেহারায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। তোমার অবস্থা খুবই নোংরা, চেহারায় ময়লা, কাপড়গুলো ময়লা ও নোংরা, চুলগুলোও বড়বড় ও এলোমেলো; অনেক দিন থেকে কাটা হয় না। অর্থাৎ তুমি এই অবস্থায় আমিরের সাথে দেখা করতে যেতে পারো না। আমি তাঁকে বললাম আল্লাহর শপথ, গোসলখানায় গিয়ে গোসল করার মত সামর্থ্য আমার নেই। আগের যুগে বিভিন্ন জায়গায় বড়বড় গোসলখানা থাকত, মানুষ সেখানে গিয়ে টাকা দিয়ে গোসল করতো। সেখানে ঠাণ্ডা পানি, গরম পানি উভয়টার ব্যবস্থা থাকত। থাকত সাবান-শ্যাম্পুর ব্যবস্থা, টাকার বিনিময় মানুষ সুবিধা করে নিত। অর্থাৎ আমার কোনো টাকা নেই যে, আমি তা দিয়ে গোসলখানায় গিয়ে গোসল করবো এবং আমার এমন সামর্থ্যও নেই যে, আমি সেলুনে গিয়ে চুল কাটাবো। তখন লোকটি বললো, ঠিক আছে তুমি এখানে অপেক্ষা করো, আমি আসছি। অতঃপর সে আমিরের নিকট ফিরে গেল এবং কিছুক্ষণ পর এসে বলল, এই নাও এক হাজার দিরহাম; এটা আমির পাঠিয়েছেন, এটা দিয়ে তুমি তোমার অবস্থার পরিবর্তন করো, তারপর আমার সাথে দেখা করো। তখন আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ! এটা বরকতের শুরু মাত্র। সে কিন্তু এখনও জানে না যে, আমির তাঁর কাছ থেকে কী চায়? সে বলল, অতঃপর আমি তাঁর থেকে টাকাগুলো নিয়ে ভাল কাপড় কিনলাম, সেলুনে গিয়ে চুল কাটলাম, গোসলখানায় গিয়ে গোসল করলাম, অতঃপর আমিরের নিকট গেলাম। সে আমাকে দেখে বলে তুমি কি কবি ও সাহিত্যিক আসমারিয়? আমি বললাম, হাঁ। সে বলল, খলিফা হারুনুর রশিদ নিজ ছেলের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য একজন কবি, সাহিত্যিক ও জ্ঞানীর জন্য আমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। আমি মানুষের কাছে জানতে পেরেছি যে, তুমি কবি সাহিত্যিক, পন্ডিতও পারো লিখতে পড়াতেও। সুতরাং তুমি চাইলে খলিফার ছেলের ব্যক্তিগত শিক্ষক হতে পার। আমি বললাম, ঠিক আছে আমি রাজি। তখন সে আমাকে বললো, এই নাও তোমার পথের খরচা; তুমি বাগদাদে চলে যাও। সে বলে এরপর আমি বাগদাদে ফিরে এলাম এবং সেখানে থাকা আমার সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে নিলাম এবং একজনকেও আমার বাড়ি দেখাতোনার দায়িত্ব দিয়ে বাগদাদে চলে গেলাম। অতঃপর আমি বাগদাদে গিয়ে খলিফা সাদে দেখা করলাম। খলিফা আমার আদব-আখলাক, কবিতা ও কবিতার ভাষা-অলংকার দেখে খুবই আশ্চর্য ও বিস্মিত হলেন।
এই লোকটি দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে পৃথক করে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইলমের মজলিসে হাঁটু গেড়ে বসেছিলো এবং নিজ মেহনতে নিজের কথা বলার স্টাইল, কবিতা ও ভাষার প্রচলিত রীতির মধ্যে পরিবর্তন এনেছেন এবং নতুন এক সাহিত্য-রীতিও চয়ন করেছেন। যারা জীবনে পরিবর্তন আনতে চায়, ভাষায় পরিবর্তন আনতে চায় আমি তাদেরকে তাঁর কিতাব পড়তে বলি, তাঁর কাছ থেকে শিখতে বলি।
সে যখন খলিফা সাদে গেলেন, খলিফা তাঁর আদব-আখলাক কবিতা ও কবিতার ভাষালংকার দেখে খুবই বিস্মিত ও খুশি হলেন। এবং তাঁকে বললেন, আমি চাই তুমি আমার ছেলের শিক্ষক হবে এবং তার শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব নিবে। সে বলল, অতঃপর রাজ-প্রাসাদে আমার ছাত্রের জন্য একটা কামরা ঠিক করা হল এবং আমি শাহজাদাকে পড়ানো শুরু করলাম।
আসমারিয় খলিফার নিকট থেকে বছর খানেক তাঁর ছেলেকে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিল, সে তাকে ভাষা শিখায়, কুরআনুল কারিম হিফয করায়, কবিতা শিখায়। আসমারিয় বলেন, খলিফা আমার জন্য একটা বেতন নির্ধারণ করেন; কিন্তু বেতনটা ছিলো আমার প্রয়োজনতিরিক্ত, কারণ আমার থাকা-খাওয়াও সহ সকল খরচ খলিফা প্রাসাদ থেকেই ব্যবস্থা করা হত। তাই আমি আমার বেতনের টাকা জমা করে বনরায় আমার গ্রামে পাঠিয়ে দিতাম। এরপর সেখানে ছোট ছোটো বাউন্ডির পরিবর্তে বড় একটা বাড়ি ক্রয় করলাম। অতঃপর মানুষজন যেন খলিফার নিকট প্রেরণ করার জন্য আমার কাছ থেকে বিভিন্ন চিঠিপত্র এবং আবেদন-দরখাস্ত লিখিয়ে নিত, কারণ আমার তারা ছিলো অনেক উচ্চাদের ও আবেদনপূর্ণ, যার মাধ্যমে তারা খলিফার কাছ থেকে তাদের উদ্দিষ্ট বস্তু হাসিল করতে পারতো আর এজন্যে তারা আমাকে নির্দিষ্ট পরিমাণে কিছু একটা দিত। আমি খলিফার ছেলের গৃহ-শিক্ষক হওয়ার কারণে খলিফার নিকট যেকোনো সময় যেতে পারতাম, তাই বিভিন্নজন আমার মাধ্যমে খলিফার কাছে তাদের প্রয়োজনীয়ও কথা জানাতো এবং তারা অনেক সময় খুশি হয়ে আমাকে অনেক কিছু দিত। এভাবে আমার অনেক সম্পদ হয়ে গেল আমি তা দিয়ে আমার গ্রামে একটি ফসলের ক্ষেত ও অনেকগুলো বাগান ক্রয় করলাম।
তিনি বলেন, একদিন খলিফা আমাকে বললেন, আমি চাই আমার ছেলে জুমার খুত্বা দিবে, এটা কি সম্ভব? আমি বললাম, হাঁ অবশ্যই সম্ভব। তখন তাঁর ছেলের বয়স ছিলো সতের-আঠার বছর। আর আসমারিয় তাকে সাত বছর পড়ানোর পরের ঘটনা। সে বলে, আমি শাহজাদাকে একটা খুত্বা মুখস্থ করালাম এবং তাকে বারবার তা অনুশীলন করালাম। অতঃপর এক জুমার দিন সে মিম্বারে আরোহণ করলো এবং খুত্বা দিল, মানুষ তাঁর খুত্বা শুনে খুবই আশ্চর্য হল। তাঁর খুত্বার প্রতিটি দিকই ছিলো খুবই উঁচু মানের ভাষা বক্তব্য ও বিষয়বস্তু; সবকিছুই ছিলো সুন্দর। এরপর চার দিক থেকে আমার নিকট সম্পদ আসা শুরু করলো, কারণ মানুষ তখন জেনে ফেলেছে যে, আমি তাকে এতো সুন্দর করে শিক্ষা দিয়েছি।
এরপর একদিন খলিফা আমাকে বলল, হে আবদুল্লাহ মালেক আল-আসমারিয়! আল্লাহ তায়ালা তোমার হায়াতে বরকত দান করুন। আমার ছেলে কুরআন হিফয করেছে, কবিতা ও অলংকার-শাস্ত্র শিক্ষা করেছে, হাদিস শিখেছে এবং এখন সে আমার সভাসদদের একজন। আমি মনে করি কার সাথে আর তোমাকে থাকতে হবে না। এখন তুমি কি আমাদের নিকট থেকে যাবে? তাহলে তোমাকে অভিনন্দন। আর বনরায় ফিরে যেতে চাইলে যেতে পার। আমি বললাম, আমি বসরায় ফিরে যাব। তখন সে বলল, আমার কাছে তুমি যা ইচ্ছে তাই চাইতে পারো, আমি তোমাকে তা দিব। আমি বললাম, আল্লাহ আপনার হায়াতে বরকত দান করুন, বসরায় আমার বাড়ি আছে, বাগান আছে, আমার আর কিছুদূরই প্রয়োজন নেই। তখন তিনি বললেন, না বরং আমি তোমাকে এই উট ও গবাদি পশুগোলা দিচ্ছি। অতঃপর সে আমার সাথে অনেকগুলো উট ও গবাদি পশু ওয়াদেশ দিলেন। এরপর তিনি বললেন তোমার কোনো ইচ্ছে থাকলে আমাকে বল। আমি বললাম, ঠিক আছে আমার একটা আকাঙ্ক্ষা হল, আপনি বসরার আমির মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশেমীকে একটা চিঠি লিখে পাঠাবেন যে, সে যখন আমার আগমনের কথা শুনবে তখন নিজ লোকজনকে নিয়ে আমাকে অভিনন্দনের জন্যে এগিয়ে আসবেন এবং বসরার সকল লোক তাঁর প্রাসাদে তিন দিন আমাকে সালাম করবে ও অভিনন্দন জানাতে আসবে। অর্থাৎ তিনি নিজের জন্যে কিছুটা সম্মান কামনা করলেন। খলিফা বসরার আমিরের নিকট চিঠি পাঠাল। অতঃপর বসরার আমির মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশেমী লোকজনকে নিয়ে আমার আগমনের অপেক্ষা করতে লাগল। এরপর যখন তারা আমিরের আগমনের কথা শুনতে পেল, তাকে অভিনন্দন জানানোর জন্যে শহরের বাইরে এলো এবং তাঁকে যথায়থ স্থান করে অভিনন্দন জানাল। মানুষজন তাঁর অপেক্ষায় ছিল। আমিরের কাছ থেকে তিনি তাঁর প্রাসাদটি দখল করলেন, সেখানে প্রথম দিন বসরার বড়বড় ব্যবসায়ী এবং সম্মানিত লোকজন তাঁকে অভিনন্দন ও সালাম জানাতে আসলো। এবং পরের দিন তাদের চেয়ে যারা নিম্ন পর্যায়ের তারা তাঁকে অভিনন্দন ও সালাম জানাতে আসলো। আর তৃতীয় দিন সাধারণ মানুষ তাঁকে অভিনন্দন এবং সালাম জানাতে আসল।
আসমাঈ বলেন, মানুষ যখন আমাকে সালাম করছে এবং অভিনন্দন জানাচ্ছে, তখন আমি তাদের মধ্যে এক লোককে দেখলাম খুবই জীর্ণশীর্ণ পোশাকে, মুজ্বা ব্যতীত শুধু চটি জুতা পরে আমাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছে, যার চেহারা থেকেই দরিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। সে যখন আমার কাছে আসলো এবং আমাকে সালাম করে বলল, হে আব্দুল মালেক! অর্থাৎ সে আমাকে কোনো ধরনের উপাধি ছাড়াই আমার নাম ধরে ডালল। আমি একথা শুনে অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম, কারণ খলিফা ব্যতীত কেউ আমাকে কোনো খেতাব ছাড়া শুধু আমার নাম ধরে ডাকে না। সুতরাং তার ডাক শুনে আমার খলিফার কথা মনে পড়ে গেল, কারণ খলিফা আমাকে শুধুমাত্র আব্দুল মালেক বলে ডাকতেন। শাহজাদার শিক্ষক ফমিলাভূষণ শায়খ এধরনের কোনো লকব ব্যতীত শুধু আব্দুল মালেক বলেই ডাকতেন।
সুতরাং তখন আমি তার দিকে তাকিয়ে তাকে চিনতে পারলাম এবং তাকে আমি বললাম, তুমি কি সেই সাজি-বক্তৃতা নও? সে বললো, হ্যাঁ। আমি বললাম, তোমাকে করা আমার সেই নসিহত কি তোমার মনে আছে যে, আমি তোমাকে বলেছিলাম, ‘তোমার সকল কিতাব একত্র করে একটি বড় বালতির মধ্যে রেখে তার উপর পানি ঢালো এবং আমরা দেখবো তার থেকে কোন রং বের হয়? তার রং কি লাল, নীল না কালো? তোমার কি সেই নসিহত মনে আছে? সে বললো, হ্যাঁ আমার মনে আছে। আমি বললাম, হ্যাঁ আমিও তোমার কথাগুলো আমল করেছি, আমি আমার সকল কিতাব নিয়েছি, সেগুলো পড়েছি এবং বারবার পড়ে আয়ত্ত করেছি, অতঃপর তা মুখস্থ করে আমার অন্তরের মধ্যে রেখে দিয়েছি, অতঃপর তার উপর আমার আগ্রহ চলে, আমার সময়কে হেফাযত করে তা বারবার পড়েছি এবং যথাসাধ্য পরিশ্রম করেছি। অতঃপর সেখান থেকে যা বের হয়েছে তা তো তুমি দেখতেই পাচ্ছো। আল্লাহ তাআলা আমাকে এর বিনিময়ে দুনিয়াতে এই মর্যাদা দান করেছেন আর আখেরাতের মর্যাদাও তো আছেই।
হ্যাঁ, ইলম মানুষকে আখেরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই একবার সম্মান দান করে। যেমনভাবে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাঁদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন।’
অনেক উলামায়ে কেরাম বলেন এখানে (أَرْجَأتُ) মর্যাদা দ্বারা উদ্দেশ্য হল আখেরাতের মর্যাদা এবং সাথে সাথে দুনিয়ার মর্যাদাও উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা তাঁদের মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে দেন, কারণ তাঁরাই হল দেশের প্রধান সম্পদ। আসমাঈ যদি কবিতা, ভাষা ও সাহিত্য আয়ত্ত করা; ভাষা ও সাহিত্যে তোরা সমসাময়িক অন্য সকলকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর এতো মর্যাদা হয়ে থাকে, তাহলে তোমার কি মনে হয় যারা কুরআন, হাদিস ও ফিকাহ আয়ত্ত করবে এবং মানুষের মাঝে ফাতওয়া দিবে, পরস্পরের মাঝে সৃষ্ট বিবাদের মীমাংসা করবে তাঁদের মর্যাদা কতটা হবে? নিঃসন্দেহে সেটা তো আরো উত্তম; আরো মর্যাদাবান, কারণ একজন ইমাম, একজন ফকিহ- কবি ও সাহিত্যিকের চেয়ে অনেক অনেক উত্তম।
লোকটি আসমাঈর সামনে এসে দাঁড়াল, আর তখন তিনি তাঁকে বললেন, হ্যাঁ আমি তোমার কথাগুলো আমল করেছি, আমি আমার সকল কিতাব নিয়েছি, সেগুলো পড়েছি এবং বারবার পড়ে আয়ত্ত করেছি। অতঃপর তা মুখস্থ করে আমার অন্তরে স্থান দিয়েছি এবং এর উপর আমার সমস্ত ইচ্ছা-আগ্রহ চলে, আমার সময়কে হেফাযত করে বারবার তা পড়েছি এবং কঠোর পরিশ্রম করেছি।
অতঃপর সেখান থেকে যা বের হয়েছে তা তো তুমি দেখতেই পাচ্ছো। আল্লাহ তাআলা আমাকে এর বিনিময়ে দুনিয়াতে এই মর্যাদা দান করেছেন আর আখেরাতের মর্যাদাও তো আছেই। তখন সাজি-বক্তৃতা তাঁকে বলল, আমি তোমার কাছে একটি কাজ চাচ্ছি, আশা করি তুমি আমাকে একটা কাজ দেবে। তোমার সকল কিতাব একত্র করে আমাকে দাও, আর তার বিনিময়ে তোমাকে কিছু সাজি দেব; একথা বলার পরিবর্তে লোকটি তাঁকে বলছে, তোমার কাছে আমাকে একটা কাজ দাও। আসমাঈ বললেন, আমি তখন তাকে আমার একটা বাগানের প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত করলাম।
হে ভাই! আপনাদের সকলের প্রতি আমার একটা বার্তা হল।
لَا مُحْمِدُ الْمَرْأُ أَنْ كَهَلَ تَبْلُغُ وَلِعَدِ حَتَّى الْعَلْيَا الصَّيِّرَا সুতরাং যে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে চায়, তাকে অবশ্যই কোনো একটা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এবং সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে তার সামর্থ্যের পুরোটা দিয়ে কঠোর মেহনত করতে হবে। হোক তার লক্ষ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে চূড়ায় পৌঁছবে অথবা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বা ইলমের ক্ষেত্রে। তার লক্ষ্য যেটা-ই হোক তাকে চূড়ান্তভাবে মেহনত করতে সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে; তাহলেই সে ঐ বিষয়ের চূড়ায় পৌঁছতে পারবে।
হে ভাই, তুমি আজ যে হাফেযে কুরআনকে দেখো, মানুষ যার তেলাওয়াত শুনার জন্যে অপেক্ষা করে; যে দাদিকে দেখো, মানুষ ভালবেসে তাদের দাওয়াত দেয়; তাদের সম্মান করে। যে বস্তাকে দেখো, মানুষ তাঁদের ওযান শুনার জন্যে দূর-দূরান্ত থেকে এসে ভিড় জমায়, তারা কিন্তু এমনি এমনি এই স্তরে এসে পৌঁছায় নি; বরং এই স্তরে পৌঁছার জন্যে তাঁদের অনেক কষ্ট ও মেহনত-মুজ্বাহাদা করতে হয়েছে, তারপরই তারা এই স্তরে এসে পৌঁছেছে। আসমাঈ নিজ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছে। সে এর জন্যে অনেক মেহনত করেছে, অনেক সকালে ঘুম থেকে উঠেছে এবং রাত্রে দেরিতে ঘুমাতে গিয়েছে, তার বিনোদাপ সময়ই ইলম অর্জনের পিছনে ব্যয় করেছে এবং পড়াশোনার কাজে প্রায় পুরো সময়টাই ব্যয় করেছে। এর জন্যে ধৈর্যের সাথে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছে। নিজেকে অনেক প্রিয় চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত রেখেছে। মানুষের ঠাট্টা-উপহাস সহ্য করে ইলমের পিছনে লেগে থেকেছে। তারপরেই তো সে নিজ লক্ষ্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছে। আর আমরা এতো বছর পরও এই আসমাঈকে চিনি। তাঁর কথা আলোচনা হলে আমাদের অনেকেই তাঁকে চিনতে পারি।
সুতরাং, আমরা যদি তাঁর মত কোনো বিষয়ের চূড়ায় পৌঁছতে চাই তাহলে আমাদেরও তাঁর মত মেহনত-মুজ্বাহাদা করতে হবে, এবং দুঃখ- কষ্ট সহ্য করতে হবে। কেউ যদি শিক্ষা অর্জন করতে চায়, আলেম হতে চায়, ফকিহ হতে চায় বা অন্য কিছু হতে চায় তাহলে তাকেও তাঁর মত কোনো দিকে না তাকিয়ে লক্ষ্যপানে ছুটে যেতে হবে। সফল লোকদের সান্নিধ্য গ্রহণ করতে হবে এবং এমন লোকদের সাথে চলতে ও বন্ধুত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে যাঁরা তাকে লক্ষ্যে পৌঁছতে উৎসাহ দিবে; তার মনোবলকে কখনই ভেঙে দিবে না।
আল্লাহ তাআলার নিকট এই কামনা করি যে, তিনি আমাদেরকে কল্যাণ দান করবেন। এবং এসকল ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দান করবেন। নিশ্চয় ঘটনার সময়ের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা।
টিকাঃ
১. সূরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১১
📄 ভয় ও আশার মধ্যে থাকতে হবে
‘সে কি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবে?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের এই প্রশ্ন করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. হাওয়াজিনের যুদ্ধের মধ্যে রয়েছেন। হাওয়াজিন গোত্রের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় হয়। এই মাত্র যুদ্ধ শেষ হয়েছে, এদিক ওদিক যুদ্ধ নিহত মানুষের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে। হাওয়াজিন গোত্রের নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয়েছে। বন্দিদের সাথে কীধরণের আচরণ করা হবে সে বিষয়টা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বন্দি নারী ও শিশুদের মাঝে একটি মহিলা পাগলের মত দৌড়াচ্ছে এবং প্রতিটি শিশুর চেহারার দিকে তাকাচ্ছে।
যেখান থেকে কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ আসছে, সেদিকেই সে দৌড়ে যাচ্ছে, কোনো মহিলার কোলে কোনো শিশুকে দেখলে দৌড়ে তার কাছে গিয়ে তার চেহারা দেখে নিচ্ছে। একবার এক মহিলার কোলে একটি শিশুকে দেখে দৌড়ে তার কাছে যায় এবং তার কাছ থেকে শিউরে নিচে ভাল করে দেখে আবার তার কাছে ফিরিয়ে দেয়। যে কেউ মহিলাটির এই অবস্থা দেখলে বুঝতে পারবে যে, মহিলা কোলের শিশুকে খুঁজে পাচ্ছে না, সে তাকে দুধ খাওয়ানোর জন্যে অস্থির। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাটির এই অবস্থা দেখছিলেন।
অনেক খোঁজা-খুঁজির পর মহিলাটি বাচ্চাটিকে পেল, সে তাকে কাছে পেয়েই দুই হাত দিয়ে কিছুক্ষণ বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখলো, অতঃপর তাকে খুব আগ্রহ দিয়ে বুকের দুধ পান করালো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানের প্রতি মায়ের এই দয়া, দরদ ও মমতা দেখে সাহাবায়ে কেরাম রা. কে প্রশ্ন করলেন, এই মহিলাটি কি তার এই সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবে? সাহাবায়ে কেরام রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে তাকে কখনই আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবে না। সে তাকে কীভাবে আগুনে নিক্ষেপ করবে? সে তাকে কোলে নিয়েছে, বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে তাকে দুধ পান করিয়েছে। সে তাকে অনেক ভালবাসে, সবকিছুর চেয়ে বেশি মুহাব্বত করে। সুতরাং সে তাকে কিছুতেই আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
‘ঐ সত্তার কসম করে বলছি, নিশ্চয় এই ছেলের প্রতি এই মায়ের যতটা দয়া ও ভালবাসা রয়েছে, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাকে তার চেয়েও বেশি ভালবাসেন ও দয়া করেন।’
নিশ্চয় বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলা এই ছেলের প্রতি মায়ের চেয়েও বেশি দয়ালু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের এ ধরনের বিভিন্ন বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিভিন্ন বিষয় বুঝাতেন। কখনো কখনো বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তাঁদেরকে সজাগ ও সতর্ক করতেন, আবার কখনো কোনো নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। সুতরাং এখানে তিনি সাহাবিদেরকে বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে একথা বুঝাচ্ছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি এই মায়ের চেয়েও বেশি দয়ালু, তাই তোমরা কখনো তাঁর দয়া থেকে নিরাশ হয়ো না। তিনি বলেন:
‘ঐ সত্তার কসম করে বলছি, নিশ্চয় এই ছেলের প্রতি এই মায়ের যতটা দয়া ও ভালবাসা রয়েছে, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাকে তার চেয়েও বেশি ভালবাসেন ও দয়া করেন।’
আর এ কারণেই সালাফদের মধ্যে থেকে একজন বলেছিলেন, আমাকে যদি আল্লাহ তাআলা এই সুযোগ দেন যে, তুমি আল্লাহ অথবা তোমার মা এই দুই জনের যাকে দিয়ে খুশি তোমার (পরকালের) হিসাব নিতে পারো, তাহলে আমি আল্লাহ তাআলাকেই আমার হিসাবের জন্যে বেছে নিব, কারণ তিনি আমার মায়ের চেয়েও আমার প্রতি বেশি অনুগ্রহশীল।
এ বিষয়ে অন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি, আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, আমরা একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম, এমন সময় অতিশয় বৃদ্ধ এক লোক আসলো, বয়সের ভারে যার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, পিঠ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল, এবং তার মাথার চুলগুলো সব সাদা হয়ে গিয়েছিল, এই লোকটি তিন পায়ের উপর ভর করে আসলো, অর্থাৎ তার দুই পা ও এক লাঠির উপর ভর করে হাঁটছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এমন এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ালো, বয়সের ভারে যার চোয়ালের জাওয়াল ঝুলে পড়েছে। লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি এমন লোকের ব্যাপারে কী বলেন, যে সব ধরনের গুনাহ করেছে; কোনো গুনাহই ছাড়ে নি? তার মন যা চেয়েছে সে তাই করেছে। তার অপরাধ ও গুনাহগুলো যদি পৃথিবীর সকল মানুষকে ভাগ করে দেওয়া হয়, তাহলেও তাদের সকলকে তা ঢেকে নিবে। এই লোকটির কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তার দিকে চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, আপনি কি ইসলাম গ্রহণ করেছেন? লোকটি বলল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে আপনার সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়েছে। সে বলল, আমার প্রচারণা ও আমার পাপ কাজগুলো সবই কি ক্ষমা করা হয়েছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ আপনার প্রচারণা ও পাপ কাজগুলোর সবই ক্ষমা করা হয়েছে। এরপর লোকটি তার লাঠির উপর ভর করে আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার বলতে বলতে চলে গেল। লোকটি অফুরন্ত দু’আ ও তাওবার অধিকারী ছিল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সুসংবাদদাতা; তিনি নিরাশাকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সহজকারী; তিনি কঠোর বা অনমনীয় ছিলেন না। তিনি মানুষকে আল্লাহর রহমতের আশা দেখাতেন। তিনি মানুষের পথ থেকে দয়া ও আশার দরজা বন্ধ করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন:
‘নিশ্চয় তোমরা সহজকারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছো; কঠোরতা আরোপকারী হিসেবে নও।’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুয়ায ইবনে জাবাল ও আবু মূসা আশআরী রা. কে ইয়ামানে পাঠালেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেন:
‘তোমরা মানুষকে সুসংবাদ দিবে, আশা দেখাবে; কখনো উপেক্ষা করে নিরাশ করবে না।
অর্থাৎ তোমরা মানুষকে সুসংবাদ দাও, তাদেরকে আল্লাহর দয়া, রহমত ও মুমিন বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালবাসার কথা বলবে। তাদেরকে নিরাশ করবে না দূরে ঠেলে দিবে না। তাদের সাথে নরম ও সহজ ব্যবহার করবে; কখনো কঠোর ও শক্ত ব্যবহার করবে না। তাদের সাথে নরম ও দয়ার সাথে কথা বলবে; কখনো মতানৈক্য যাবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে মানুষ নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী রয়েছে। অর্থাৎ এমন মানুষ রয়েছে যারা মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তাদেরকে ভয় দেখিয়ে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখে।
কিন্তু হাদিসে উল্লেখিত আতঙ্ক সৃষ্টিকারী বলে কাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে? তোমরা প্রথমে শুনে রাখো যে, এখানে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী বলে কাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, অতঃপর নিজেদের উপর তা যাচাই করে দেখো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
‘নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী রয়েছে, সুতরাং তোমাদের দ্বারা জনগণের দায়িত্বরত থাকবে তারা যেন তাদের সাথে সহজ ব্যবহার করে।’
অনেক মানুষ আছে যারা লম্বা-চওড়া সালাত আদায় করে; কিন্তু লম্বা-চওড়া সালাত আদায় করেও মানুষের দীনের ব্যাপারে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী হতে পারে, দীন থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখতে পারে! ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে তোমার কী মনে হয়, যে ঠিকমত ফরযের হুকুম আদায় করে না? সে কি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নয়? সে কি মানুষকে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখছে না? যে ব্যক্তি অনুভূতিহীনদের সামনে জরুরি কথা থাকে, তাদের সাথে গোঁয়া মুখে কথা বলে, সে কি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নয়? সে কি মানুষকে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখছে না? যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর সাথে ভাল ব্যবহার করে না, তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে, হোক সে প্রতিবেশী মুসলিম বা অমুসলিম, সে কি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নয়? সে কি মানুষকে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখছে না? যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তাকে তার হক ঠিকমত আদায় করে না, সে কি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নয়? সে কি মানুষকে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখছে না? হে ভাই! এর মাধ্যমে ইসলাম নিয়ে কথা বলার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিরোধী শক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে। মানুষ দীনকে যত বেশি আঁকড়ে ধরবে, সে তত বেশি আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করবে। আল্লাহর রহমত সুপ্রশস্ত। তবে তোমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা যেমন দয়ালু, ঠিক তেমনিভাবে তিনি কঠোরও।
মূসা আ.-এর সময় বনি ইসরাইলের এক লোকছিলো, যে মূসা আ.কে অনেক কষ্ট দিতো। ফল মূসা আ. আল্লাহ তাআলার কাছে অভিযোগ করে বলল, হে আমার প্রতিপালক! এই লোকটা আমাকে অনেক কষ্ট দেয়, আমার দাওয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, সব জায়গায় সে আমাকে নিয়ে ছিদ্রান্বেষণ করে, আমাকে অপমান করে। হে আমার প্রতিপালক! সে আমাকে অনেক কষ্ট দেয়, সুতরাং আপনি তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করুন। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, হে মূসা! আমি তাকে শাস্তির ক্ষমতা তোমার হাতে দিয়ে দিলাম; তুমি যখন চাইবে আকাশকে আদেশ করবে, আকাশ তার উপর প্রচুর-বৃষ্টি বর্ষণ করে তাকে ধ্বংস করে দিবে। অথবা জমিনকে আদেশ করবে, জমিন তাকে গিলে ফেলবে। এরপর কয়েক দিন পর রাস্তায় মূসা আ.-এর সাথে লোকটির দেখা হল আর লোকটি তাঁকে দেখে গালিগালাজ শুরু করে দিল। মূসা আ. তখন রাগান্বিত হয়ে জমিনকে বললেন, হে জমিন! তুমি তাকে পাকড়াও করো। তখন জমিন লোকটির টাখনু পর্যন্ত ভিতরে নিয়ে নিলো। তখন লোকটি বলতে লাগলো, হে মূসা! আমি তাওবা করছি, আমাকে রক্ষা করো, আমাকে উদ্ধার করো। মূসা আ. বললেন, জমিন! তাকে পাকড়াও করো। এবার জমিন আরেকটু ফাঁকা হল এবং তার হাঁটুর পর্যন্ত ভিতরে নিয়ে নিলো। লোকটি আবার বলল, হে মূসা! আমি তাওবা করেছি আমাকে রক্ষা করো, আমাকে উদ্ধার করো। মূসা আ. বললেন, জমিন! তাকে পাকড়াও করো।
এবার জমিন আরেকটু ফাঁকা হল এবং তার কোমর পর্যন্ত ভিতরে নিয়ে নিল। এরপর বুক পর্যন্ত, আর লোকটি চিৎকার করতেছিল, এরপর সম্পূর্ণ তাকে মাটির নিচে গিলে গেল আর লোকটি মারা গেল। তখন আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-এর নিকট ওহী প্রেরণ করে তাঁকে বললেন, হে মূসা! তোমার হৃদয় এতটা পাষাণ! আমার ইজ্জতের কসম করে বলছি, সে যদি আমার কাছে সাহায্য চাইতো আমি তাকে সাহায্য করতাম।
আমাদের রব আল্লাহ তাআলা অনেক দয়ালু; কিন্তু তিনি শাদিদুল ইক্বাব অর্থাৎ শাস্তি দানে কঠোরও বটে। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুহ আ.-এর সময় তুফানে ডুবে যাওয়া এক নারী ও তার সন্তানের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। সেখান থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা মহাপরাক্রমশালী, তিনি যখন অসন্তুষ্ট হন, ক্রুদ্ধও হন।
নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুহ আ.-এর সময় তুফানে ডুবে যাওয়া এক নারী ও তার সন্তানের ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। নূহ আ. আপন প্রতিপালকের নিকট দোয়া করলেন; যেমনিভাবে কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে:
قِيلَ يَا أَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَا سَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِيِّ وَقِيلَ بُعْدًا لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ تَبَارَكْتَ يَا بَيْنَا وَيَا بَيْنًا وَيَا مُغْنَى مَنْ كَانَ فَقِيرًا
'অতঃপর সে তাঁর পালনকর্তাকে ডেকে বললো, আমি অক্ষম, অতএব তুমি প্রতিবিধান করো। তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে। এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সব পানি মিলিত হল এক পরিকল্পিত কাজে। আমি নূহকে আরোহণ করালাম এক কাঠ ও পেরেক নির্মিত জলযানে। যা চলতো আমার দৃষ্টির সামনে। যা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিলো এটা ছিলো তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ।'
এভাবেই কুরআনে কারিমে নূহ আ.-এর কওমের ডুবে যাওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। অন্য আয়াতে তুফানটির ভয়াবহতা এভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا لَمَّا طَغَى الْمَاءُ حَمَلْنَاكُمْ فِي الْجَارِيَةِ
'যখন জলোচ্ছ্বাস হয়েছিলো, তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম।'
জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে আপনারা সকলেই তো জানেন। যখন জলোচ্ছ্বাস হয় তখন তা সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, গাছপালা উপড়ে ফেলে, বাড়িঘর চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়, পথের গাড়ি-ঘোড়াগোলোকে ভাসি নিয়ে যায়, চারপাশের সবকিছুকে শিকড়ের খোলামার মত লন্ডভন্ড করে দেয়। মানুষজন কাঁদতে থাকে, ধিক্কার করতে থাকে, সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকে, কেউ গাছের ডালে ঝুলে থাকে, কেউ কারেন্টের খুঁটা ধরে থাকে, কেউ পাহাড়ের ঊর্ধ্বে আর পানি তাদের সকলকেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই তুফানকেই 'তাগাল মা' ( طَغَى الْمَاءُ জলোচ্ছ্বাস হয়েছে) দ্বারা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا لَمَّا طَغَى الْمَاءُ حَمَلْنَاكُمْ فِي الْجَارِيَةِ
'যখন জলোচ্ছ্বাস হয়েছিলো, তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম।'
অর্থাৎ যখন জলোচ্ছ্বাস হল তখন আমি তোমাদেরকে নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম, তখন ঢেউ তাকে নিয়ে ডানে বামে কাত করাছিলো আর তোমাদের রবই তখন সেটাকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِنَجْعَلَهَا لَكُمْ تَذْكِرَةً وَتَعِيَهَا أُذُنٌ وَاعِيَةٌ
যাতে এ ঘটনা তোমাদের জন্য স্মৃতির বিষয় এবং কর্ণ এটাকে উপদেশ গ্রহণের উপযোগী হিসেবে গ্রহণ করে।'
অবশ্যই এটা একটা উপদেশবাণী। এখানে অনেক উপদেশ রয়েছে, আমি এখন আপনাদের সামনে সেই ঘটনাটি বর্ণনা করবো। আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের নিকট নূহ আ.-এর ঘটনা উল্লেখ করেন, অতঃপর তিনি এক নারীর ঘটনা বলেন, যে নূহ আ.-এর সম্প্রদায় থেকে বের হয়ে গিয়েছিলো আর তুফান তখন ক্রমশ বাড়ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ
'তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে। এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সব পানি মিলিত হল এক পরিকল্পিত কাজে।'
অর্থাৎ আসমান বিরামহীনভাবে মুষল ধারে বৃষ্টি বর্ষণ করতে ছিলো, মরুভূমি পাহাড়-পর্বত সব জায়গায় বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিলো। এবং ভূমি থেকে ঝর্ণার মাধ্যমে পানি বেরোচ্ছিলো। فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ অর্থাৎ পানি মিলিত হল এক পরিকল্পিত কাজে।
যখন তুফান শুরু হল, এক মহিলা নিজ সন্তানকে নিয়ে দৌড়াচ্ছিল আর একদিক সেদিক একটি আশ্রয়স্থল খুঁজছিলো, অতঃপর সে একটি পাহাড় দেখতে পেয়ে সন্তানকে নিয়ে পাহাড়ে আরোহণ করল। এদিকে পানি বাড়তে বাড়তে একসময় পর্বতচূড়ায় মহিলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর শিশুটির মাথা পর্যন্ত পানি চলে আসে, তখন মহিলাটি বাচ্চাকে কোলে নেয়। অতঃপর পানি যখন মহিলাটির বুক পর্যন্ত পৌঁছে তখন সে ছেলেকে মাথার উপরে নেয়, অতঃপর পানি যখন মাথার পর্যন্ত পৌঁছে তখন সে বাচ্চাকে দুই হাতের উপর রেখে উচ্চা করে ধরে রাখে এবং পানি বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে মহিলা ও ছেলেকে ডুবিয়ে দেয়। এরপর নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা যদি নূহ আ.-এর সম্প্রদায়ের কারো উপর দয়া করতেন, কাউকে রক্ষা করতেন, তাহলে তিনি এই মহিলা ও তার সন্তানকে রক্ষা করতেন; কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন:
كُذِّبُوا بِآيَاتِنَا فَأَخَذْنَاهُمْ أَخْذَ عَزِيزٍ مُقْتَدِرٍ
'তারা আমার সকল নিদর্শনের প্রতি মিথ্যাচারোপ করেছিলো। সুতরাং আমি পরাভূতকারী, পরাক্রমশালীর মতো তাদেরে পাকড়াও করেছিলাম।'
হে ভাই! আমরা জানি আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি আমাদের মা- বাবার চেয়েও আমাদের প্রতি দয়াশীল; কিন্তু এই বুঝ যেনো আমাদেরকে তাঁর নাফরমানির দিকে নিয়ে না যায়। একজন সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকবে আর বলবে, আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি আমাদের মা-বাবার চেয়েও আমার প্রতি দয়াশীল!! একজন ঘুষ খাবে আর বলবে, আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি আমাদের মা-বাবার চেয়েও আমার প্রতি দয়াশীল!! একজন অন্যায়ভাবে মানুষের হক মেরে দেবে, তার মাল চুরি করবে, তার মাল জোর করে নিয়ে খেয়ে ফেলবে, তার কাছ থেকে ধারে নিয়ে, পরে আর তা ফেরত দিবে না আর বলবে, আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি মা-বাবার চেয়েও আমার প্রতি দয়াশীল!! অসম্ভব। হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা দয়াশীল ও ক্ষমাশীল; কিন্তু তোমার জন্য আবশ্যক হল তুমি তাঁর নাফরমানির মাধ্যমে তাঁর এই দয়া ও ক্ষমাপ্রতিভাকে প্রতিহত করবে না। আর এ কারণেই উলামায়ে কেরাম বলেন, বান্দার জন্য আবশ্যক হল যে, সে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের আশা করবে এবং সর্বদা এই ভয়ে থাকবে যে, তার মাধ্যমে যেনো আল্লাহ তাআলার কোনো নাফরমানি না হয়ে যায়। আর এ কারণেই নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় গুনাহের পূর্বে ছোট গুনাহ থেকে সতর্ক করেছেন।
খায়বারের যুদ্ধ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিগণ ফিরে আসছেন, পথে এক উপত্যকায় যাত্রা-বিরতি করলেন। এক বালক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থাকলেন এবং খেদমত করতেন, অতঃপর যাত্রা-বিরতি শেষে তাঁরা যখন সেখান থেকে রওনা হওয়ার ইচ্ছা করলেন তখন বালকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটের পিঠে জিব (আসন) বাঁধতে ছিলো, এমন সময় দূরে কোথাও লুকিয়ে থাকা কাফেরদের অজ্ঞাত একটি তীর এসে বালকটির শরীরে বিদ্ধ হল আর তখন তার ইন্তেকাল হয়ে গেল। তখন সাহাবায়ে কেরাম তাকবির দিয়ে উঠলেন এবং বললেন, আল্লাহ আকবার! জান্নাতে তাঁকে স্বাগতম! শহিদ হিসেবে তাঁকে স্বাগতম! একজন বালক ছেলে বাড়ি-ঘর, পিতা-মাতা ত্যাগ করে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতরত অবস্থায় কাফেরের তীরের আঘাতে শহিদ হয়েছে!! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন:
'কখনই নয়! আল্লাহর শপথ সে গণিমতের মাল থেকে যে চাদর চুরি করেছে তা তার উপর জাহান্নামের আগুন জ্বালিয়ে দিবে।'
অর্থাৎ গণিমতের মাল বন্টন করার পূর্বে সে যে চাদরটি কারো কাছে না বলে নিয়ে নিয়েছে, কবরে তা তার উপর জাহান্নামের আগুন জ্বালিয়ে দিবে, এ কারণে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক লোক একটি বা দুইটি জুতা বা জুতার ফিতা নিয়ে এলো এবং তাঁকে বললো, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এই নিন, এগুলো আমি গণিমতের মাল থেকে নিয়েছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন:
'একটি জুতার ফিতাও জাহান্নামের অংশ অথবা দুইটি জুতার ফিতাও জাহান্নামের অংশ।'
এ সকল ঘটনা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলার ব্যাপক দয়া, রহমত ও মাগফিরাতের কথা; এজন্যে আলোচনা করা হয়েছে যাতে করে বান্দা তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তাআলাও বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
'বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর জুলুম-অবিচার করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।'
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার রহমত ব্যাপক ও বিস্তৃত; কিন্তু আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, তিনি শাস্তিদানেও প্রবল ও কঠিন। সুতরাং তাঁর রহমতের অধিক আশা আমাদের যেনো তাঁর নাফরমানির দিকে নিয়ে যা যায়। অর্থাৎ আমাদের এ দুইটা তথ্য-আল্লাহর রহমত ও তাঁর কঠোরতা উভয়েরই মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। অর্থাৎ মানুষকে আল্লাহর রহমতের আশায় বাণীও শুনাতে হবে, সাথে সাথে তাকে আল্লাহর শাস্তির ভয়ও দেখাতে হবে। যেমন এক লোক আল্লাহর নাফরমানি করতে করতে নিজের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে, সে বলছে- আমি এতো গুণাহ করেছি যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে আর মাফ করবেন না। তখন তাকে আল্লাহর রহমতের কথা শুনাতে হবে, ঐ মহিলার কথা বলা হবে যার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের বলেছিলেন, সে কি তার এই ছেলেকে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারবে? ঐ বৃদ্ধের ঘটনা শুনাতে হবে যে লাঠির উপর ভর করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসেছিল, এবং সে বলেছিলো, আমার প্রতারণা ও পাপাচারও কি ক্ষমা করা হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন, হাঁ আপনার প্রতারণা ও পাপাচারও ক্ষমা করা হবে। সাথে সাথে আমরা যদি এমন লোক দেখি, যে এই বলে বলে আল্লাহ তাআলার নাফরমানিতে লিপ্ত হচ্ছে- আল্লাহ তাআলা তো গফুরুর রহীম। এই লোককে বনি ইসরাইলের সেই নারী ও তার শিশুর ঘটনা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম বালকের ঘটনা শুনাতে হবে।
আল্লাহ তাআলার নিকট এই প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাদের সকলকে তাঁর রহমতের চাদরে আচ্ছাদিত করুন এবং আমাদের সকল অপরাধ ক্ষমা করুন, এবং আমাদেরকে হকের উপর অটল-অবিচল রাখুন। আমিন।
টিকাঃ
১. সূরা কামার, আয়াত: ১০-১৪
২. সূরা হাক্কাহ, আয়াত: ১১
১. সূরা হাক্কাহ, আয়াত: ১১
২. সূরা হাক্কাহ, আয়াত: ১২
১. সূরা কামার, আয়াত: ১১-১২
২. সূরা কামার, আয়াত: ৪২
১. সূরা যুমার: ৫৩
📄 জাহাজ-ভ্রমণকারী দল
এখন আপনাদের সামনে জাহাজ ডুবকারী একটি দল সম্পর্কে আলোচনা করবো; কিন্তু কারা এই জাহাজে ভ্রমণকারীগণ? তাঁরা কি ঐদল যাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাঁদের একদল জাহাজের উপরে তলায় ছিলো, অপর দল ছিলো নিচ-তলায়? না-কি তারা হল ইউনুস আ. কে জাহাজ থেকে সমুদ্রে নিক্ষেপকারী দল? না আমি এদের সম্পর্কে আলোচনা করবো না।
আমরা এখন অপর একটি জাহাজে ভ্রমণকারী দল সম্পর্কে আলোচনা করবো। আমরা এখন আলোচনা করবো, মুসলমানদের প্রথম সমুদ্র-ভ্রমণ সম্পর্কে। এখন প্রশ্ন হল সে প্রমণে কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরীক ছিলেন না-কি ছিলেন না? তাঁদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি পুরস্কারের ঘোষণা করেছেন? তাঁরা কেনো জাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়েই আমাদের সামনের আলোচনা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের জন্য যখন মক্কায় জীবন যাপন সংকীর্ণ হয়ে গেল; বেলাল রা. কে অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছে। আম্মার রা. ও তাঁর পরিবারের উপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তুমি একবার সেই দৃশ্য অনুধাবন করার চেষ্টা করো যখন কুরাইশরা মুসলমানদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। দুর্বল অসহায় ও গরিব সাহাবীগণই এই নির্যাতনের বেশি শিকার হচ্ছে। কাউকে খেজুর গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন করা হচ্ছে। কারো উপর জলন্ত অঙ্গার ঢেলে দেওয়া হচ্ছে; চাবুকের আঘাতে কারো কারো শরীরী চামরা তুলে ফেলা হচ্ছে; প্রচণ্ড গরমের সময় উত্তপ্ত মরুভূমির উপর ফেলে কারো উপর পাথরচাপা দেওয়া হচ্ছে। এমন নির্যাতন সহ্য করা কোনো মানুষের পক্ষে কি সম্ভব? আহ!! কী অমানুষিক নির্যাতন!
সাহাবীদের এই কঠিন আযাব থেকে বাঁচানোর জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা ও তার আশেপাশে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল খুঁজছিলেন, যেখানে হিজরত করে সাহাবায়ে কেরام রা. কুরাইশদের এই পাশবিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে পারবেন এবং একটু স্বস্তির সাথে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করতে পারবেন। এভাবে একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের বললেন, হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়ায়) একজন বাদশাহ রয়েছেন, যার কাছে কেউ জুলুমের শিকার হয় না। সুতরাং তোমরা তার কাছে যাও। তখনই সাহাবায়ে কেরামের একটি দল সফরের জন্যে প্রস্তুতি নিয়ে নিলেন। তাঁদের সংখ্যা ছিল নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় আশি জনের মত। তাঁরা দূরবর্তী এক অচেনা দেশ হাবশায় যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন।
তারা যখন এক দেশের উদ্দেশ্য বের হল যেখানে তাঁরা ইতোপূর্বে কখনো যায়নি, যার মাটি কখনো মাড়ায়নি, যার ভাষা তাঁরা বুঝে না। তা সত্ত্বেও তারা সেই দেশের উদ্দেশ্যে বের হল, অতঃপর সেখানে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিল।
বাদশাহ নাজ্জাশি ছিলেন খুব ন্যায়পরায়ণ একজন বাদশাহ। মুসলিম এই মুহাজির দলটি যখন হাবশায় পৌঁছে তখনও তিনি মুসলমান হননি। জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-এর নেতৃত্বে মুসলিমগণ যখন তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল, তাঁর সাথে কথা বললো, তাকে কুরআন তেলাওয়াত করে শুনাল, ইসলামের দাওয়াত দিল, ইসা আ. সম্পর্কে কথা বললো, ইসা আ.-এর ব্যাপারে মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে বললো, এবং তাকে সুরা মারইয়ামের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করে শুনালেন। বাদশাহ নাজ্জাশি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি মুসলমানদেরকে বললেন, তোমরা আমার দেশে যেখানে খুশি সেখানে থাকতে পারবে। এটা এক দীর্ঘ আলোচনা; আমরা এখন সে আলোচনায় যাব না। বরং আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় হল জাহাজে ভ্রমণকারী দল।
জাহাজে ভ্রমণকারী দল দ্বারা আমরা এসকল সম্মানিত সাহাবীদের কথা বলতে চাচ্ছি যারা ইসলামের জন্য সর্বপ্রথম নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে হাবশায় হিজরত করেছেন এবং হিজরতের পথে জাহাজে আরোহণ করে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। তাঁরা সেখানে সাত-আট বছর কাটালেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনায় এলেন তখনও তাঁরা হাবশাতেই অবস্থান করছেন। তাঁদেরকে তখনও মদিনায় আসতে বলা হয়নি। সপ্তম হিজরিতে হাবশায় তাঁদের অবস্থানের পনের বছর পূর্ণ হল। তাঁদের মধ্যে যারা যুবক ছিলো তাঁরা বৃদ্ধ হয়ে গেল, বাচ্চারা যুবক হল এবং শিশুরা যুবক হয়ে গেল এবং নতুন অনেক শিশুর জন্ম হল। সপ্তম হিজরিতে তাঁদের হাবশা থেকে মদিনায় ফিরে আসার জন্য বলা হল।
উম্মে খালেদ বিনতুল আ'স রা. হাবশায় জন্ম নেওয়া শিশুদের একজন ছোট মেয়ে। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে কারুকাজ করা একটা কাপড় হাদিয়া দেওয়া হয়েছিলো, তখন তিনি বলেন, উম্মে খালেদকে আমার নিকট নিয়ে এসো। তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে আনা হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তাতে পোশাকটি পরিধান করালেন, এবং তিনি কারুকাজের দিকে ইশারা করে বললেন:
هذا سنا يا أم خالد هذا সুনা।
((অর্থাৎ উম্মে খালেদ! এটা খুব সুন্দর) তিনি এটা হাবশার ভাষায় বললেন, কারণ উম্মে খালেদ হাবশায় জন্ম নিয়েছেন। সেখানকার ছোট ছোট শিশুদের সাথে মিশেছেন, খেলা করেছেন, এারণে আরবির চেয়ে হাবশার ভাষা বেশি বুঝতেন, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হাবশার ভাষায় বললেন যে উম্মে খালেদ! এটা হিযান (অর্থাৎ এটা খুব সুন্দর)।
বায়রার বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানের হাতে অনেক গনিমত আসলো। এর মাধ্যমে দীর্ঘ অভাব অনটনের পর তাঁদের মধ্যে কিছুটা সচ্ছলতা আসল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন হাবশায় হিজরতকারী সাহাবীদের আনার জন্য লোক পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডাকে সারা দিয়ে তাঁরা হাবশা থেকে দ্বিতীয়বার হিজরত করে চলে আসলেন। তাঁরা যখন মদিনায় আসলেন নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক খুশি হলেন। বিশেষ করে জাফর ইবনে আবু তালিব রা.কে পেয়ে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি জাফর ইবনে আবু তালিব রা.কে জড়িয়ে ধরলেন এবং তাঁর দুই চোখের মাঝখানে চুমু খেয়ে বললেন, তুমি চেহারাও চরিত্র আমার মত হয়ো।
জাফর রা.-এর ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা. আবু বকর রা.কে বিয়ে করেছেন। একদিন উম্মুল মুমিনিন হাফসা বিনতে ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর সাথে দেখা করতে আসলেন। ওমর রা.ও তখন তাঁদের নিকট এলেন। ওমর রা. সালাম দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং সেখানে আসমা রা.কে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে মেয়ে আসমা! তোমার কাছে ইনি কে? হাফসা রা. বললেন, আসমা বিনতে উমাইস। ওমর রা. বললেন, সমুদ্রে ভ্রমণকারিণী? সে বললো, হ্যাঁ। ইনি কি হাবশি? সে বললো, হ্যাঁ। ওমর রা. তখন তাঁকে দৃষ্টি করে বললেন, আমরা তো তোমাদের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হিজরত করেছি। একথা শুনে আসমা রা. রেগে গেলেন এবং বললেন, আপনারা আমাদের পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হিজরত করেছেন? তিনি তো আপনাদের অসুবিধের উপর দয়া করেছেন, ক্ষুধার্থদের খাবার দিয়েছেন, দুর্বলদের সাহায্য করেছেন। আর আমরা অচেনা দূরদেশ হাবশায় হিজরত করেছিলাম। আল্লাহর শপথ, আমি এটা আল্লাহর রাসূলের নিকট না জানিয়ে চুপ হবো না।
আসমা রা. তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ওমর রা. আমাকেবলেছেন, তারা আপনার সাথে আমাদের পূর্বে হিজরত ও জিহাদে শরীক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আমার ও আমার স্বামী জাফরের কি কোনো সাওয়াব হবে না? আমরা তো এ-বিষয় থেকে বঞ্চিত হয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, হে আসমা! যারা হাবশায় হিজরত করেছে এবং এজন্য যারা জাহাজে ভ্রমণ করেছে তাঁদের সকলকে জানিয়ে দাও যে, যারা হাবশায় হিজরত করেনি তাঁদের জন্য একটি প্রতিদান, আর তোমাদের জন্য দুইটি করে প্রতিদান রয়েছে। তোমরা হাবশায় হিজরতের জন্য একটি, অতঃপর মদিনায় হিজরতের জন্য আরেকটি, মোট দুইটি প্রতিদান পাবে। আসমা রা. বলেন, এরপর আমি বাইরে বের হলে, এই হাদিস শুনার জন্য হাবশায় হিজরতকারী দল দলে আমার কাছে আসলো।
হাবশায় হিজরত ছিলো তখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে সমুদ্র-ভ্রমণ। ঢেউ সর্বদা তাঁদের জাহাজ নিয়ে খেলা করেছে, একবার তা ঢেউয়ের তলে নামিয়ে দিয়েছে, একবার উপরে উঠিয়েছে, একবার ডানদিকে, একবার বামদিকে এভাবে প্রতি মুহূর্তে ছিলো তাঁদের ভয় ও আশঙ্কা; এই বুঝি জাহাজ ডুবে গেল, এই বুঝি জাহাজ ডুবে গেল। এছাড়া নারী-শিশু নিয়ে এতো দূরের অচিন দেশে সফর ছিলো খুবই আশঙ্কা জনক। অবশ্যই তাঁরা এর জন্যে একটি প্রতিদান বেশি পাবে। আর আল্লাহ তাআলা নেক বান্দাদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।
আসমা বিনতে উমাইস রা. দীন হেফাযতের জন্য হাবশায় হিজরত করেছেন। তিনি শুধু মাত্র স্বামী জাফর রা.-এর অনুসরণের জন্য হাবশায় হিজরত করেননি বরং তিনি দীনের হেফাযতের জন্য স্বামীর সাথে হাবশায় গিয়েছেন। তিনি যখন হাবশায় হিজরত করেছেন তখন একথার বলেননি যে, স্বামীর সাথে হিজরত করলে আমার নেকি হবে, সুতরাং আমি স্বামীর সাথে হিজরত করবো। না, শুধু মাত্র স্বামীর অনুসরণের জন্যেই তিনি হিজরত করেননি বরং তিনিও দীন হেফাযত করার জন্য হিজরত করেছেন। যেমনভাবে তাঁর স্বামী হিজরত করেছেন দীনের হেফাযতের জন্য।
হাবশা থেকে মদিনায় ফেরার আট-নয় মাস পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফর রা.কে রোমানদের (বাইজান্টাইনদের) সাথে যুদ্ধ করার জন্যে মুতায় প্রেরণ করেন। এই যুদ্ধে জাফর রা. শহীদ হন। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা পৃথিবীতে ইসলাম প্রচার করতেও পিছিয়ে চাইলেন এবং সেই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহদের নিকট দূত-মারফত ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত চিঠি পাঠালেন। এরই ধারাবাহিকতায় হারেস ইবনে উমাইর আল আয়দি রা.কে রোমের অনুগত গাসসানা বাদশাহ শুরাহবিল ইবনে আমর আল-গাসসানীর নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একটি চিঠি দিয়ে প্রেরণ করলেন; কিন্তু শুরাহবিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বার্তাবাহককে হত্যা করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি তখনই এর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যে মুজাহিদীনকে প্রস্তুত হতে বলেন এবং যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-এর নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের একটি দলকে বসরায় দিকে প্রেরণ করেন। আসমা বিনতে উমাইস রা.-এর স্বামী জাফর ইবনে আবু তালিব রা.ও মুতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তিনি সেখানে শহীদ হন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যায়েদ শহীদ হলে জাফর ইবনে আবু তালিব বাহিনীর দায়িত্ব নেবে আর জাফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা রা. বাহিনীর দায়িত্ব নেবে।
তিন হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী মুতা নামক স্থানে পৌঁছলো। অন্যদিকে রোমান খ্রিস্টানরা দুই লক্ষ সৈন্য-সমাবেশ ঘটিয়েছিল। কাফের বাহিনী মুসলিমদের থেকে শুধুমাত্র দুই তিনগুণ বেশিই ছিলো না বরং তাদের সংখ্যা ছিলো মুসলমানদের থেকে অনেক অনেকগুণ বেশি। অর্থাৎ দুই লক্ষ সৈন্যের সামনে মাত্র তিন হাজার সৈন্য। দুই বাহিনীর মধ্যে এক অসম কঠিন যুদ্ধ শুরু হল। যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণ পর যায়েদ রা. শহীদ হলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মত যুদ্ধের পতাকা হাতে নিলেন জাফর ইবনে আবু তালেব রা.। জাফর রা. অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করতে লাগলেন, যুদ্ধ যখন তুমুল আকার ধারণ করলো, হঠাৎ জাফর রা.-এর ঘোড়ার পা কেটে দেওয়া হল। তিনি ঘোড়া থেকে নেমে পায়ের উপর যুদ্ধ করতে লাগলেন। অতঃপর তাঁর ডান হাত কেটে গেল, তিনি তখন পতাকা বাম হাতে নিলে, অতঃপর তাঁর বাম হাতও কেটে গেল, তখন তিনি দাঁত দিয়ে কামড়ে পতাকা উঁচু করে রাখলেন এবং এভাবেই শাহাদাত বরণ করলেন। তখন তাঁর বয়স ছিলো তেত্রিশ বছর। যুদ্ধের পর তাঁর শরীরের নব্বইটি আঘাতের দাগ ছিলো, যার সবকটিই ছিলো সামনের দিক থেকে। তাঁর শাহাদাতের পর আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা রা. পতাকা হাতে নিলেন এবং তিনিও শাহাদাত বরণ করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা রা.-এর শাহাদাতের পর পতাকা নিচে পড়ে রইল মুসলমানরা তাঁদের পতাকা না দেখে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করতে লাগলো, তখন সাবেত ইবনে আকরাম রা. পতাকা উঠালেন এবং বললেন মুসলমানগণ তোমরা আমার কাছে এসে জড়ো হও, আমার কাছে এসে জড়ো হও। অতঃপর তিনি বললেন, হে মুসলিমগণ, তোমরা তোমাদের সেনাপতি নির্ধারণ করো। লোকেরা বললো, আপনিই সেনাপতি হন। তিনি বললেন, আমি সেনাপতি হওয়ার উপযুক্ত নই। অতঃপর খালেদ রা.কে সেনাপতি নির্ধারণ করা হল। খালেদ রা. রাত পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। এবং রাতে উভয় বাহিনী নিজ নিজ শিবিরে চলে গেল। খালেদ রা. বললেন, এভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন, আবার এই অবস্থায় ফিরে গেলে যুদ্ধ থেকে পলায়নের অপবাদ আসবে তাই তিনি আগামীকাল যুদ্ধ চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন না।
এবং যুদ্ধের পরিকল্পনার মধ্যে পরিবর্তন আনলেন। ডান দিকের সৈনিকদের বাম দিক দিয়ে এলেন এবং বাম দিকের সৈনিকদের ডানদিকে ও মাঝখানে নিয়ে এলেন এবং কিছু সৈনিকদেরকে পিছনে পাঠিয়ে এ আদেশ দিলেন যে, যখন যুদ্ধ তুমুল আকার ধারণ করবে তখন তোমরা খুব দ্রুত ময়দানের দিকে ছুটে আসবে। এবং উভয় পাশের পতাকা পরিবর্তন করে দিলেন, সাদা পতাকার স্থানে নীল পতাকা, নীল পতাকার স্থানে হলুদ পতাকা এবং হলুদ পতাকার স্থানে লাল পতাকা। উদ্দেশ্য ছিল কাফেরদের মনে এই ভীতি সৃষ্টি করা যে, মদিনা থেকে মুসলিমদের সাহায্যে নতুন দল এসে পৌঁছেছে।
পর দিন যখন যুদ্ধ শুরু হল, তখন কাফেরদের ডান দিকের সৈনিকরা দেখলো তারা নতুন সৈনিকের মোকাবিলা করছে, গতকাল যাদের সাথে লড়াই করেছে এঁরা তারা নয়। বাম দিকের ও মাঝের সৈনিকদের একই অবস্থা হল। এরপর তাঁদের পতাকাও আগেরটা নেই, তাই তারা এটা বিশ্বাস করে নিল যে, মদিনা থেকে মুসলিমদের সাহায্যে নতুন সৈন্যদল এসে পৌঁছেছে। এরপর যুদ্ধ যখন শুরু হল তখন পিছনে রেখে দেওয়া রিজার্ভ ফোর্স ময়দানে প্রবেশ করলো। এতে কাফেরদের মনোবল আরো ভেঙে গেল। তারা ভাবতে লাগলো মাত্র তিন হাজার সৈন্যের মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের যে অবস্থা হয়েছে! তাহলে নতুন সৈন্য আসলে আমাদের অবস্থা কী হবে? যুদ্ধ তুমুল আকার ধারণ করলো, মুসলিমগণ মনোবল হারা কাফেরদেরকে একের পর এক হত্যা করতে লাগলো। মুসলিমদের মধ্যে থেকে মাত্র আর জন শহীদ হলেন আর কাফেরদের অগণিত সৈনিক নিহত হল। রাতে যখন যুদ্ধ শেষ হল আবু সুলাইমান খালেদ বিন ওয়ালিদ রা. সাহাবিদেরকে মদিনার দিকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
এটা তো গেল যুদ্ধের ময়দানের ঘটনা। অন্যদিকে মদিনার অবস্থা হল, নবি কারিম রা. সাহাবিদের ডেকে একত্র করলেন এবং তিনি তাঁদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বাহিনীর সংবাদ শোনাবো না? তাঁরা বললো, নিশ্চয় শোনাবো হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যুদ্ধের পতাকা বহন করেছে যায়েদ, সে আক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর শহীদ হয়েছে, সুতরাং তোমরা তার মাগফিরাতের দোয়া করো। সাহাবায়ে কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে ক্ষমা করুন ও তাঁর প্রতি রহম করুন। তিনি বলেন, এরপর জাফর যুদ্ধের পতাকা গ্রহণ করেছে এবং আক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর শহীদ হয়েছে। সুতরাং তোমরা তার মাগফিরাতের দোয়া করো, সাহাবায়ে কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে ক্ষমা করুন এবং তাঁর প্রতি রহম করুন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা রা. পতাকা নিয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর শহীদ হয়েছে। সুতরাং তোমরা তার মাগফিরাতের দোয়া করো, সাহাবায়ে কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে ক্ষমা করুন এবং তাঁর প্রতি রহম করুন। তিনি বলেন, এরপর যুদ্ধের পতাকা বহন করেছে সাইফুল্লাহিল মাসলুল (আল্লাহর নাঙ্গা তলোয়ার) এবং তাঁর হাতে বিজয় অর্জন হয়েছে।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফর ইবনে আবু তালেব এর বাড়িতে গেলেন- তাঁর পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে ও তাঁর এতিম সন্তানদের দেখার জন্য। পিতার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিলো খুব গভীর। এতিম সন্তান, যারা তাদের বাবার সাথে দীর্ঘদিন হাবশায় থেকেছে, পিতার স্নেহের কোলে তাদের সকাল-সন্ধ্যা হয়েছে। কত সকাল বাবার স্নেহের কোলে দুষ্টুমি করে করে, কত দিন বাবাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে এবং তাঁর হাতও খেয়েছে, বাবার সাথে পান করেছে, তাঁর সাথে হাসি-মজা করেছে। বাবাকে চুমু খেয়েছে, বাবা তাদের চুমু খেয়েছে, বাবা তাদের কত আদর করেছে, কান্না করলে চোখের পানি মুছে দিয়েছে, মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়েছে, বুকে জড়িয়ে ধরেছে। আর তিনি তো ছিলেন যুবক, যার বয়স এখনো ত্রিশের ঘরেই ছিল। আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফর ইবনে আবু তালেব এর বাড়িতে আসলেন। বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। আসমা রা. বাড়ির ভিতর পাশ ঠিক করে তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন এবং বললেন, আমার ভাইয়ের সন্তানদেরকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। আসমা রা. বললেন, আমার সন্তানরা ছিলো পাখির ছানার মত সুন্দর। তারা এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখে প্রথমে তাদের বাবা মনে করে তাঁকে জড়িয়ে ধরলো এবং তাঁকে চুমু খেল। আসমা রা. বলেন, আমি তাদেরে সান্ত্বনা দেওয়ার প্রতিদিন গোসল করিয়ে, জামা-কাপড় পরিয়ে সাজিয়ে রাখতাম এবং তাদের বলতাম, তোমাদের বাবা এসে যেনো তোমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখতে পায়। আমি প্রতিদিন আটা পিষে রুটি বানাতাম, সন্তানরা আমাকে জিজ্ঞেস করতো, মা! তুমি রুটি বানাচ্ছো কেনো? আমি বলতাম, তোমাদের বাবা আসবেন তাই। আমার সন্তানরা সত্যিই প্রতিদিন তাদের বাবা আসার অপেক্ষা করতো। সুতরাং যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে এলেন তখন তারা মনে করেছে যে, তাদের বাবা এসে গেছে। তাই তারা তাঁকে জড়িয়ে ধরেছে এবং চুমু খেয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তখন তাদেরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। আসমা রা. বলেন, আমি তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার নিকট কি জাফর সম্পর্কে কোনো সংবাদ পৌঁছেছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন চুপ ছিলেন, আমি তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার নিকট কি জাফর সম্পর্কে কোনো সংবাদ পৌঁছেছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জাফর শহীদ হয়েছে। সে তখন বলল, তাঁর সন্তানরা কি এতিম হয়ে গেল? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি তাদের দারিদ্রতার ভয় করছো? আমি দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একথা বলছিলেন আর কাঁদছিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে বের হয়ে গেলেন এবং সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা জাফরের পরিবারের নিকট খাবার প্রেরণ করো, কারণ তারা আজ শোকাহত।
📄 এক নারী সাহাবির বীরত্বের গল্প
এখন আমরা এক বীরত্বের গল্প বলবো। এটি যখন ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর বীরত্বের ঘটনা নয় এবং এটা ওমর ইবনে খাতাব, আবু বকর, উসমান ও আলি রা.-এর বীরত্বের ঘটনা; আমাদের হাবিব সায়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বীরত্বের ঘটনাও এখন আমি আপনাদের সামনে বলবো না। আজ আমি আপনাদের সামনে এক নারীর বীরত্বের ঘটনা বলবো। ইসলামের জন্যে এক নারীর অবদানের গল্প শুনাবো। যে নারী দীলের খেদমতে কাজ করেছেন, মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকেছেন এবং সন্তানদের সঠিক উত্তম আচার-ব্যবহারে বড় করেছেন। ইসলাম প্রচারে ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনেক পুরুষকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ইসলামে নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে কম নয়। সর্বপ্রথম জমজমের পানি কে পান করেন? এবং কে সর্বপ্রথম সাফা-মারওয়া সায়ী করেছেন? তিনি একজন নারী; তিনি বিবি হাজেরা রা., নবি ইসমাইল আ.-এর মা। কে সর্বপ্রথম ইসলামে প্রবেশ করেছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ইমান এনেছেন? এবং কার অর্থ-সম্পদ সর্বপ্রথম ইসলামের জন্যে ব্যয় হয়েছে? তিনি একজন নারী; আম্মাজান খাদিজা রা.। ইসলামের জন্যে সর্বপ্রথম কার রক্ত ঝরেছে? ইসলামের জন্যে জান উৎসর্গকারী প্রথম শহিদ কে? তিনি একজন নারী; হযরত সুমাইয়া রা.। সুতরাং ইসলামে নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে কোনো দিক দিয়ে কম নয়।
আমরা আজ এমন একজন নারীর গল্প বলবো, ইসলামের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যার বিশেষ অবদান রয়েছে। দাওয়াত-ও-তালিগ ও সন্তান লালন-পালনে তাঁর অবদান বিস্ময়কর। আমরা এখন যে মহিয়সী নারীর গল্প বলবো তিনি হলেন উম্মে সুলাইম রা.। উম্মে সুলাইম রা.-এর নাম রুমাইসা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ব্যাপারে বলেন: আমি জান্নাতে প্রবেশ করে সেখানে রুমাইসাকে দেখেছি।
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উম্মে সুলাইম রা. ছিলেন মালেক ইবনে নযরের স্ত্রী। মালেক ইবনে নযর গোত্রের লোকদের সাথে মদিনায় বসবাস করতেন। আনাস ইবনে মালেক ইবনে নযর নামে তাঁর একটি পুত্র সন্তান ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় হিজরত করে আসলেন, তখন উম্মে সুলাইম রা. ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলেন; কিন্তু স্বামী মালেক ইবনে নযর এটা অস্বীকার করে বলল, চলো আমরা এখান থেকে পালিয়ে শামে (লেভেন্ট) চলে যাই এবং সেখানে গিয়ে মূর্তি-পূজা করে বসবাস শুরু করি। উম্মে সুলাইম রা. তাকে বললেন, মূর্তি-পূজা ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করে আপনার সমস্যা কী? আপনি কেনো ইসলামে প্রবেশ করছেন না? আপনি মূর্তি-পূজা করেন, যা আপনার উপকার বা অপকার কোনোটাতেই করতে পারে না। মূর্তি-পূজা আপনার কোনো কাজেই আসে না। আপনি এক ডাকলে সে আপনার ডাক শুনতে পাবে না, তার কাছে সাহায্য চাইলে সে আপনার কোনো সাহায্য করতে পারবে না। আপনি কীভাবে পাথর-মূর্তির ইবাদত করেন এবং তার নৈকট্য অর্জন করতে চান?!! আপনার সামনের এই মূর্তি আপনার কোনো ক্ষতিও করতে পারবে না এবং আপনার কোনো উপকারও করতে পারবে না। সুতরাং আপনি এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনেন এবং শিরিকমুক্তভাবে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করেন।
কিন্তু স্বামী মালেক ইবনে নযর তাঁর এই সত্য আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তাঁকে ছেড়ে দিয়ে শামে পালিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসলেন এবং ইসলাম সেখানে মজবুতভাবে খুঁটি স্থাপন করল। একদিন উম্মে সুলাইম রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে ছেলে আনাস ইবনে মালেক ইবনে নযর রা.কে নিয়ে উপস্থিত হন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আপনাদের সাথে জিহাদ করতে পারি না এবং আমার এমন সম্পদও নেই যা আমি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবো; কিন্তু এই আমার ছেলে আনাস আমার বুকের ধন, আমার সম্পদ, তাকে আমি আপনার খেদমতে পেশ করছি, আপনি তাকে গ্রহণ করে আমাকে ও তাকে ধন্য করুন। উম্মে সুলাইম রা. ছিলেন খুবই বুদ্ধিমতী ও বিচক্ষণ একজন নারী, তিনি চাচ্ছিলেন যে, ছেলে আনাসের শিক্ষা-দীক্ষা ও তরবিয়তের দায়িত্ব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থাকবে। তখন আনাস রা.-এর বয়স ছিলো মাত্র নয় বছর। অর্থাৎ তিনি চাচ্ছিলেন যে, ছেলে আনাস শিক্ষা-দীক্ষা সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে গ্রহণ করুক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল, তিনি আদরের সাথে মুখস্ত করতে বাচ্চাদের প্রতিটা বিষয় শিক্ষা দিতেন। উদাহরণস্বরূপ এখানে একটা ঘটনা উল্লেখ করছি, আমর ইবনে সালামা রা. বলেন, আমি তখন ছোট্ট বাচ্চা ছিলাম, একদিন আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খানা খাচ্ছিলাম, তখন আমার হাত প্লেটের এখান সেখান ঘোরাঘুরি করছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমাকে বলেন,
হে বালক ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খাবার শুরু করো, ডান হাত দিয়ে খাবার খাও, এবং নিজের পাশ থেকে খাবার খাও।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধীনদের প্রতিটা বিষয় শিক্ষা দিতেন। সুতরাং উম্মে সুলাইম রা. চাইছিলেন, ছেলে আনাস সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তরবিয়ত গ্রহণ করুক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে ছেলেকে পাঠানোর তাঁর আরেকটা উদ্দেশ্য ছিলো–এর মাধ্যমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারের সাথে তাঁর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি সুন্নতও সম্পর্কে সে খুব সহজেই জানতে পারবে, কারণ ছেলে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে থেকে ফিরে আসবে তখন বলবে, মা! রাসুলুল্লাহ খাবার সময় ডান হাত দিয়ে খান। মা! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে সালাত আদায় করেন এবং তিনি সালাতে অমুক অমুক সুরা তেলাওয়াত করেন। এরকম বিভিন্ন সুত্রত তিনি ছেলের মাধ্যমে খুব সহজেই শিখতে পারবেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনাসকে খেদমতের জন্যে গ্রহণ করলেন। আনাস রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করতো; এ বিষয়ে অনেক ঘটনা রয়েছে। সে বিষয়ের আলোচনা অনেক দীর্ঘ। সুতরাং আমরা এখানে তা উল্লেখ করছি না।
আবু তালহা মদিনার একজন ধনবান লোক, তার প্রচুর স্বর্ণ-রুপা, ক্ষেত-খামার ও বাগানাদিও রয়েছে; কিন্তু তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি জানতে পারলেন যে, উম্মে সুলাইম রা. তালাকপ্রাপ্তা হয়েছেন, তাঁর স্বামী নেই। তাই তিনি উম্মে সুলাইম রা.-এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলেন। উম্মে সুলাইম রা. তাঁকে বললেন, হে আবু তালহা! তুমি এমন পুরুষ যার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া যায় না; কিন্তু আমার মাঝে এবং তোমার মাঝে একটা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আবু তালহা বললো, সেই প্রতিবন্ধকতাটি কী? আমি তোমার মহর হিসেবে তোমাকে টাকা-পয়সা স্বর্ণ-রৌপ্য সব দেবো। উম্মে সুলাইম রা. বললেন, আমি মুসলিম আর তুমি কাফের, তাই আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারছি না, তবে তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি। আবু তালহা বললো, না আমি আমার ধর্মের উপরই থাকবো। উম্মে সুলাইম রা. তখন বললেন, হে আবু তালহা! তোমার কি লজ্জা করে না যে, তুমি কাঠের তৈরি মূর্তির পূজা করো অথচ তা তৈরি করে অমুক ব্যক্তি এক হাবশি গোলাম, অর্থাৎ তুমি সেই ইলাহের পূজা করো যার কাছে তোমার দরিদ্রতার সময়, কষ্টের সময়, অনুসূতার সময় আশ্রয় প্রার্থনা করো এবং যার কাছে হাত জোর করে কেঁদে কেঁদে নিজের প্রয়োজনের কথা বল অথচ তা একটি কাঠের তৈরি মূর্তি বৈ কিছু নয়, যা উৎপন্ন হয় মাটি থেকে আর তা খোদাই করে নির্দিষ্ট একটা আকৃতিতে তৈরি করে অমুক গোত্রের অন্ধের হাবশি গোলাম!! তোমার কি একটু লজ্জাও করে না যে, তুমি যার পূজা করো তা মাটি থেকে উৎপন্ন কাঠ থেকে খোদাই করে তৈরি করা একটি মূর্তি, যা বানিয়েছে এক হাবশি গোলাম। আবু তালহা বললো, হ্যাঁ সবই ঠিক আছে, কিন্তু আমি তোমাকে মহর হিসেবে অনেক সম্পদ দিবো। উম্মে সুলাইম রা. তাকে বললো, হে আবু তালহা! আমি তোমার কাছে মহর হিসেবে কোনো টাকা পয়সাই চাই না এবং তোমার কাছে কখনো কোনো টাকা পয়সা চাবোও না; বরং তুমি ইসলাম গ্রহণ করো, আমি তোমাকে বিয়ে করবো এবং তোমার ইসলাম গ্রহণটাই হবে আমার মহর। এরপর আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং উম্মে সুলাইম রা.কে বিয়ে করেন।
সাহাবায়ে কেরাম রা. বলেন, আমরা উম্মে সুলাইম রা.-এর মহরের মত এত বরকতময় মহর আর দেখিনি, তার মহর ছিলো আবু তালহার ইসলাম গ্রহণ। আবু তালহা রা.-এর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গর্জন শব্দের মতো যতটা ভীতি ছড়ায় একদল সৈন্যও ততটা ভয় ছড়াতে পারে না। আবু তালহা রা. ঐসকল মুসলিমদের অর্ন্তভুক্ত, যারা উহুদের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে অটল থেকেছেন। উহুদ-যুদ্ধের দিন পাহাড়ের উপর পাহারায় সাহাবিরা যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে মনে করে নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করে গণিমত সংগ্রহের জন্যে চলে যায় তখন কাফেররা এই সুযোগে مسلمانوں উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, মুসলমানরা অতর্কিত আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে পিছু হটে, তখন যেইসকল সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে বুক চিতিয়ে অটল ছিলো আবু তালহা রা. তাঁদের অন্যতম। তিনিও তাঁর সঙ্গী হয়ে কাফেরদের মোকাবিলা করেছেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও যুদ্ধ করেছেন। আবু বকর রা. আর্যব আবু তালহা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে ছিলেন। আবু তালহা রা.-এর শরীরেবও তীর বিদ্ধ হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের পেছনে তোমাদেরই এক ভাই রয়েছে, যে নিজের জন্য জান্নাতকে ওয়াজিব করে নিয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম রা. বলেন, তখন তাঁর শরীরের দিকে অক্ষম হল এবং তাঁকে আহত অবস্থায় সেখানে পেশ করা হলো। আবু তালহা রা. ছিলেন শ্রেষ্ঠ সাহাবিদের একজন। আর তাঁর ইসলাম গ্রহণ ও হেদায়েতের পথে আসা হয়েছে উম্মে সুলাইম রা.-এর মাধ্যমে।
উম্মে সুলাইম রা. সর্বদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত অনুসরণ রূপ করতেন এবং তিনি মনেপ্রাণে সর্বদা এই কামনা করতেন যে, ইসলাম প্রচারে তাঁরও ভূমিকা থাকুক। খন্দকের দিন যখন পরিখা খনন করতো তখনো মুসলিমরা ক্লান্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খিদের কারণে নিজের পেটে দুইটা পাথর বাঁধলেন, যাতে পাথরের ঠান্ডায় খিদের কষ্ট কিছুটা কম অনুভব হয়। তখন আবু তালহা উম্মে সুলাইম রা.-এর নিকট গেলেন এবং তাঁকে বললেন, হে উম্মে সুলাইম! আমি শুনলাম খিদের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আওরায় ক্ষীণ হয়ে এসেছে। সুতরাং তোমার ঘরে কি কিছু আছে? তিনি বললেন, আমার কাছে কয়েক টুকরা রুটি আর কিছু খেজুর আছে। তিনি বললেন, ঠিক আছে তুমি তা দিয়েই খাবার তৈরি করো। অতঃপর উম্মে সুলাইম রা. রুটি ভাজলেন এবং খেজুর আর রুটি একটা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ছেলে আনাস রা.-এর নিকট দিলেন এবং তাঁকে বললেন, আনাস! এগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যাও। আনাস রা. সেগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলেন এবং তাঁকে এক জায়গায় বসা পেলেন, তিনি খাবার নিয়ে তাঁর সামনে গেলেন এবং তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এই খাবার আপনার নিকট আমার মা পাঠিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী করলেন? তিনি কি একাই খাবার খেলেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা হাতে নিয়ে আনাস রা.কে বললেন, আনাস! এগুলো নিয়ে উম্মে সুলাইমের কাছে যাও। অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে মানুষ! দুপুরের খাবার খেতে এসো! আবু তালহা তো পুরো বিষয়টা জানতেন যে, এখানে মাত্র দু’তিনটি রুটি এবং কয়েকটি খেজুর আছে, এত মানুষ এতটুকু খাবার কীভাবে খাবে? তাই আবু তালহা রা. দ্রুত উম্মে সুলাইমের নিকট গেলেন এবং তাঁকে বললেন, হে উম্মে সুলাইম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আনসার ও মুহাজির সকলকে নিয়েই আসছেন!! উম্মে সুলাইম রা. ছিলেন মুমিন নারী, তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন কী হবে?। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলেন এবং বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন, অতঃপর তাঁকে অনুমতি দেওয়া হল। তিনি এসে রুটি ও খেজুরের টুকরাগুলো নিলেন এবং সেগুলোকে একসাথে করলেন। উম্মে সুলাইম রা. তখন এক লোটা ঘি নিয়ে আসলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো ও একসাথে ঢাললেন এবং তাঁর মুবারক হাত দিয়ে সবগুলো একসাথে মাখলেন, অতঃপর তাঁর মধ্যে দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন, তিনি দোয়া পড়লেন:
'হে আল্লাহ! আপনি এতে আমাদের জন্যে বরকত দান করেন।'
এরপর সাহাবায়ে কেরাম রা.কে বললেন, তোমরা ঘরে প্রবেশ করে খাবার খাও। সাহাবায়ে কেরাম রা. তখন দশজন করে ঘরে প্রবেশ করে সেখান থেকে পরিতৃপ্তিতে খাবার খেয়ে এবং পানি পান করে বের হচ্ছেন, আবার অপর দশজন প্রবেশ করছেন। উম্মে সুলাইম রা. এই দৃশ্য স্বচক্ষে দেখছেন যে, মাত্র তিন-চারটা রুটি, কিছু খেজুর আর অল্প ঘি এত মানুষের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যাচ্ছে!! তিনি স্বচক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা দেখছেন।
উম্মে সুলাইম রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত মুহাব্বত করতেন। তিনি সর্বদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে কল্যাণ কামনা করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন খায়বার রা.কে বিয়ে করলেন, সেই রাতে উম্মে সুলাইম রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে হাদিয়া প্রেরণ করলেন। তিনি সেদিন কী হাদিয়া পাঠালেন?
উম্মে সুলাইম রা. কিছু শুকনো দুধ নিলেন এবং সেগুলোকে ভালভাবে মেখে মাখনের মত বানালেন, অতঃপর এতে কুটির কুটির টুকরা দিলেন, খেজুর দিলেন এবং ঘি দিয়ে এক ধরনের সুস্বাদু খাবার তৈরি করে ছেলে আনাসকে দিয়ে বললেন, আনাস! এই হাদিয়া নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যাও এবং তাঁকে বল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এগুলো আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্যে সামান্য হাদিয়া। আনাস রা. এগুলো নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলেন এবং তা তাঁর সামনে রেখে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এগুলো হল মেহমানদারির খাবার, আমার মা এগুলো আপনার জন্যে পাঠিয়েছেন এবং বলেছেন 'আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্যে সামান্য হাদিয়া'। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা খুললেন এবং সেখান থেকে খুব খুশি হলেন। অতঃপর আনাস রা. কে বললেন, আনাস! যাও অমুক অমুককে গিয়ে ডেকে নিয়ে এসো। আনাস রা. বললেন, অতঃপর আমি গেলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার যার নাম বলেছেন তাদের ডেকে নিয়ে আসলাম। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহর নিকট এসে তাঁর সাথে বসলেন এবং সেখান থেকে খেলেন।
একদিন উম্মে সুলাইম রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার নিকট আমার একটা প্রয়োজন আছে। তখন তিনি বললেন, বলো তোমার প্রয়োজন কী? উম্মে সুলাইম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার খাদেম আনাসের জন্যে দোয়া করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন হাত উঠিয়ে তাঁর জন্যে দোয়া করলেন এবং বললেন:
'হে আল্লাহ আপনি তাঁর হায়াতকে লম্বা করে দিন, এবং তাঁর আমল সুন্দর করে দিন এবং তাঁর সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বৃদ্ধি করে দিন।'
সুবহানাল্লাহ! কত সুন্দর দোয়া! তিনি শুধু তাঁর জন্যে দীর্ঘ হায়াতের দোয়া করেননি, কারণ আত্মাহীন দীর্ঘ হায়াত কোনো কাজে আসবে না, তাই তিনি তাঁর জন্যে দীর্ঘ হায়াতের সাথে নেক আমলেরও দোয়া করেছেন, যাতে করে সে এই দীর্ঘ জীবনে ইবাদত করতে করতে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করতে পারে। আনাস রা. বলেন, আমার হায়াতও অনেক লম্বা হয়েছে, আমার সম্পদও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমার মেয়ে ফাতেমা আমাকে বলেছে, আমার বংশের একশত বিশ জনের চেয়েও বেশি মানুষের ইন্তিকাল হয়ে গেছে।
উম্মে সুলাইম রা.-এর স্বামীর প্রতি সন্তান ছিল। আবু তালহা রা.-এর থেকে তাঁর খুব প্রিয় সন্তান ছিল। আবু তালহা ছেলেকে অনেক ভালোবাসতো ও অনেক আদর করতো। তিনি যখনই বাইরে থেকে ঘরে আসতেন, তখনই তাকে জড়িয়ে ধরতেন এবং কোলে নিয়ে আদর করতেন। তাঁর সাথে খেলা করতেন, হাসি ঠাট্টা করতেন, কারণ সন্তান বাবা-মায়ের কলিজার টুকরা। হঠাৎ একদিন এই সন্তান অসুস্থ হল এবং অত্যন্ত কঠিন আকার ধারণ করল। সন্তানের অসুস্থতার খবর আবু তালহা রা. খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। তা সত্ত্বেও তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সালাত আদায়ের জন্যে মসজিদে গেলেন। আর তখন ছেলের রোগ আরো বেড়ে গেল এবং সে মারা গেল। উম্মে সুলাইম রা. তখন প্রতিবেশীদের বললেন, আমি বলার আগ পর্যন্ত তোমরা কেউ তাঁকে ছেলের মৃত্যু-সংবাদ দিও না। অতঃপর আবু তালহা রা. ফিরে এলেন। উম্মে সুলাইম রা. ছেলের লাশ ঢেকে রেখেছিলেন এবং ক্রন্দন করাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি ভালভাবে সেজেগুঁজে শরীরী শৃঙ্গারে মাখলেন এবং স্বামীর জন্যে খাবার প্রস্তুত করলেন। আবু তালহা রা. ফিরে এসে খাবার খেলেন এবং ছেলের অবস্থা জিজ্ঞেস করে বললেন, ছেলে এখন কেমন আছে? উম্মে সুলাইম রা. বললেন আগের চেয়ে এখন অনেক শান্ত আছে। আবু তালহা রা. ভাবলেন, ছেলে সুস্থ হয়ে এখন ঘুমাচ্ছে। অতঃপর তারা শুয়ে গেলেন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা হয় তাঁদের মধ্যেও তাই হল। সে যখন পরিপূর্ণ তৃপ্ত হল তখন তাঁকে বললেন, হে আবু তালহা! যদি কেউ কারো কাছে কিছু আমানত রাখে, অতঃপর কিছুদিন পর তা ফেরত চায়; কিন্তু সেই লোক তা অস্বীকার করে, এটা কি তার জন্যে ঠিক হবে? আবু তালহা রা. বললেন, না এটা করা কখনো ঠিক হবে না। তখন উম্মে সুলাইম রা. বললেন, তাহলে আপনি আপনার সন্তানের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করে সাওয়াবের আশা করুন। নিশ্চয় তোমার সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে আমানত দেওয়া হয়েছিল। আর এখন তিনি তাঁর আমানত ফেরত নিয়েছেন। একথা শুনে আবু তালহার মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায় ও তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং তাঁকে বলেন, তুমি আমাকে কলঙ্কিত হওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিলে, অতঃপর আমাকে বললেন, আমার ছেলে মারা গিয়েছে? তখন উম্মে সুলাইম রা. তাঁকে বললেন, যখন হান আপনার ছেলেকে কবর নিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত করুন। এরপর তিনি ছেলেকে গোসল দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে ফজরের সালাত আদায়ের পর কলিজার টুকরোকে জানাযার সালাতের সামনে নিয়ে আসলেন। অতঃপর স্ত্রী যা করেছে সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অভিযোগ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু তালহা ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যে গত রাতে যা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাতে বরকত দান করুন। কোনো কোনো রেওয়ায়াতকারী বলেন, এরপর আমি আবু তালহা ও উম্মে সুলাইমের থেকে সাতজন সন্তান দেখেছি যাদের প্রত্যেক কুরআনে হাফেয হয়েছেন।
এখান থেকেই বুঝা যায় যে, ইসলামের সম্মান, মর্যাদা ও কৃতিত্ব শুধুমাত্র পুরুষদের উপর সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলামে নারীর অবদানও অনেক, যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে জান্নাতে একত্র হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।