📄 আত্মবিশ্বাস
আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়মনোবলের ক্ষেত্রে মানুষ কত-না বিচিত্র প্রকৃতির হয়ে থাকে। কারো সাথে কারো ইচ্ছা-বিশ্বাসের কোনো তুলনাই হয় না, যেমন কেউ আপন লক্ষ্যের অর্ধেকাটা পেলেই বেজায় খুশি; আবার কেউ কাঙ্ক্ষিত বস্তুর কিঞ্চিৎ পেলেই কত-না বেশি; কিন্তু কিছু মানুষ-যারা আপন লক্ষ্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেইতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে, যেমনটি বলা হয় যায়েদ ইবনু মুলাহহাবের ব্যাপারে (কথিত আছে, যায়েদ ইবনু মুলাহহাবের লক্ষ্য ছিলো দেশের মন্ত্রী-গভর্নর হওয়ার; তাই সে নিজের জন্যে নির্দিষ্ট কোনো ঘরবাড়ি নির্মাণ করেনি, সে থাকত কিছুদিন এ-বাড়িতে, কিছুদিন ও-বাড়িতে।) লোকেরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করতো, তুমি কখন নিজের জন্যে একটা বাড়ি নির্মাণ করবে? উত্তরে সে বলতো, আমার বাড়ি তো হল দারুল ইমারাত (প্রিন্সিপ্যালিটি হাউজ), নতূবা কারাগারের আবাধ্যা খর বা অন্ধকার কবর; এর বাইরে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই।
আসুন! এ বিষয়ে আমরা কয়েকটি ঘটনা আলোচনা করি। যার মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো যে, উঁচু মনোবল ও আত্মবিশ্বাস কাকে বলে? মনোবলের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য হয়ে থাকে? এবং কীভাবে উঁচু মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ পৃথিবীতে স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পারে?
বর্ণিত আছে, এক ব্যবসায়ী তার ছেলেকে ব্যবসা শিখাতে চাইলো, যাতে করে ছোট বয়স থেকেই সে কর্মঠ-পরিশ্রমী ও বিচক্ষণ হয়ে উঠতে পারে, সাথে সাথে সে যেনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখে এবং অলস-অকর্মণ্য হয়ে পরনির্ভরশীল না হয় যায়। বরং একজন পরিশ্রমী, খেটে খাওয়া মানুষে পরিণত হয়। সুতরাং একদিন ছেলেকে ডেকে বলল, প্রিয় ছেলে আমার! এই নাও এক হাজার দিরহাম, যাও অমুক দেশে গিয়ে পণ্য কিনে নিয়ে এসো। আমি চাই তুমি এখন থেকেই ব্যবসা শিখো, এবং কীভাবে পণ্য বেচা-কিনা করতে হয়, কীভাবে পণ্য বহন করতে হয় এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে কীভাবে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে হয় সেই কৌশল তুমি এখন থেকেই ভালোভাবে আয়ত্ত করা শিখো। সাথে সাথে অত্যন্ত উঁচু দর্জে দীর্ঘ সফর ও সফরের ক্লান্তির সাথৈ। অর্থাৎ তুমি এখন থেকেই একজন সফল ব্যবসায়ীত্তে পরিণত হও।
পিতার কথায় ছেলেটি টাকাগুনো নিয়ে সফর শুরু করলো। কিছু দূর যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের নিচে বিশ্রাম করতে বসলো। সে যখন গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করছিলো তখন দেখলো, একটি শিয়াল অলস ভঙ্গিতে তার সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়ে পাশের একটা গাছের নিচে বসলো, যেনো তার কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। এরপরই হঠাৎ সে দেখলো পেশী একটা হরিণ খুব জোরে দৌড়াচ্ছে আর তাকে ধরার জন্যে তার পিছে পিছে একটা সিংহ দৌড়াচ্ছে। হরিণটি প্রাণপনে ছুটছে আর পিছনের পা দিয়ে বাঘ ও পাথর ছুড়ে মারছে সিংহের মুখে; কিন্তু সিংহ নাছোড়ছাড় হয়ে তাকে ধরার জন্যে তার পিছনে ছুটছে। এক পর্যায়ে সিংহ যখন হরিণটির একেবারে কাছে চলে আসলো তখন হরিণটি তার পিছনের পা দিয়ে সিংহের নাকে মুখে লাথি মারতে লাগলো, সিংহটির চেহারায় ব্যথা ও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠলো তবুও সে তার পিছু ছাড়লো না। এভাবে এক পর্যায়ে সিংহটি হরিণকে ধরে ফেলল এবং তাকে ছিঁড়ে ভিন্ন অংশ খেয়ে বাকিটা ফেলে চলে গেল। এরপরশিয়ালটি বিরে-সুখে উঠে হেলদুলে গিয়ে তার আহার সম্পন্ন করলো। অলস শিয়ালটির আহার করতে না কোনো কষ্ট করতে হল না কোনো ধাবমান হরিণের সুরের আঘাতও সহ্য করতে হল বরং সে একটি গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করল আর খাবারও প্রস্তুত হয়ে তার সামনে চলে আসল। আর সে প্রস্তুতকৃত খাবার খেয়ে আবার এসে গাছের নিচে আরাম করা শুরু করলো।
এই কাহিনী দেখে ছেলেটি মনে মনে বলল, এই সিংহটি কত কষ্ট করে ক্লান্ত হয়ে হরিণটিকে শিকার করলো অথচ তার ভাগ্যে সামান্যই জুটলো, সে অল্প খেয়ে বাকিটা ফেলে চলে গেল। অন্যদিকে শিয়ালটি কোনো কষ্টই করলো না, তবুও সে কত আরামে খাবার খেতে পারলো। তাহলে আমি কেনো এত কষ্ট করে নিজেকে ক্লান্ত করে অর্থ উপার্জন করবো? কেউতো আর না খেয়ে ক্ষুধা-অবুজও ও পিপাসার্ত হয়ে মারা যায় না। অতঃপর সে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সামনে অগ্রসর না হয়ে পিছনে দেশে ফিরে এলো। এমন সময় তাকে দেখে দেখে পিতা তো একেবারে অবাক। তাকে জিজ্ঞেস করলো, প্রিয় ছেলে! তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে? ব্যবসা করতে যাওনি? ছেলেটি তখন বাবাকে দেখে দেখা শিয়াল, সিংহ আর হরিণের কাহিনী শুনিয়ে বললো, বাবা! কেউতো আর না খেয়ে মারা যায় না, সুতরাং আমিও না খেয়ে মরবো না। তাহলে কেনো এত পরিশ্রম করে নিজেকে কষ্ট দিবো?
বিচক্ষণ বাবা তখন এই নির্বোধ ছেলেকে বলল, প্রিয় ছেলে আমার! আমি চাই তুমি শিয়াল নয়; সিংহ হয়ে বেঁচে থাকো। পরিচালিত নয়; পরিচালক হও, আমি চাই তুমি গাড়ীওয়ালা হও; চেকপোষ্টে বাইক থেকে গাড়ির মালিককে চেক করার কাজ না করো, আমি চাই তুমি প্রকৌশলী হও; ভাড়াট্টিয়ে নয়। প্রিয় পাঠক! এটাই হল দুই জনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইচ্ছা-সংকল্পের মধ্যে পার্থক্য। আর এই পার্থক্যের কারণেই দুইজন ছাত্র একই সাথে একই ক্লাসে পড়ার পরও দুইজনের অবস্থান দুইধরনের হয় এবং দুই জনের মধ্যে থাকে অনেক বড় ব্যবধান।
এখন এখানে আমি আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটা মজার ঘটনা উল্লেখ করছি। আজ থেকে প্রায় ২০/২২ বছর আগের কথা। আমি যখন মাধ্যমিক স্তর শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র। আপনারা তো জানেনই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদের মধ্যে কতটা পরিবর্তন ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বেশিরভাগ ছাত্রেরর বাবাই ছেলেকে একটা গাড়ি কিনে দেয়। আর যার গাড়ি না থাকে সেও কোনো না কোনোভাবে একটা গাড়ী ব্যবস্থা করে নেয়। ছাত্ররা তখন মনে করতো থাকে তার পড়া-লেখার সময় শেষ হয়ে গেছে, কারণ এরপরে তো আর কোনো পড়া-লেখা নেই, এরপরই হল কর্মজীবন প্রবেশের সময়। অনেকেই আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিয়ের বিষয়টা চিন্তা করতে থাকে, আবার কেউ কেউ অন্যের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। অর্থাৎ প্রায় সকলেই মনে করে তার পড়া-লেখার সময় সে পার করে এসেছে, এখন আর তাকে পড়া-লেখা করতে হবে না।
যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম সপ্তাহেই আমাদেরকে বই-পত্র দেওয়ার কথা। আমাদেরকে দেওয়া হল শায়খ শওকানি রহ.-এর লেখা “আল ফাতহুল কাদির ফিত তফসীর” নামক কিতাবটি কিতাবটি বেশ বড়, ছয় খন্ডের। ইতঃপূর্বে আমরা এত বড় কিতাবের সাথে পরিচিত ছিলাম না, কারণ আমরা মাধ্যমিকে যে কিতাবগুনো পড়েছি তা ছিলো ছোট ছোট, কোনো কোনোটা তো ৪০ পৃষ্ঠার চেয়েও কম। এত বড় কিতাব হাতে পেয়ে অনেকেই কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখতে লাগলো, কেউ কেউ তাঁদের নিজের নাম লিখলো। আমি কিতাব খুলে ভিতরের আমার নাম লিখলাম, আমি আর আমার নাম লিখলাম ‘ড. মুহাম্মাদ আল-আরিকি’। আমার পাশে যে ছেলেটি বসা ছিলো সে মাঝেমধ্যে আমার সাথে পড়ছে। সে আমার নাম ‘ড. মুহাম্মাদ আল-আরিকি’ লিখতে দেখে আমার দিকে তাকালো আর আমাকে বললো, তুমি কি ডক্টর লিখেছ? অর্থাৎ তুমি ডক্টর হতে চাও? আমি বললাম, ইন-শা-আল্লাহ, আল্লাহর ইছায় আমি এখানে ভর্তি হয়েছি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার জন্যই। তখন সে বললো, আগে হয়ে নাও!! দাল (د.)দেখলেই সেটাকে ‘দাল’ মনে করো না, দাল দিয়া (حِجَازَا) দাজাজাজাও (মুরগি) হয়। সে ‘দাল’ দিয়ে আরো কয়েকটি শব্দ বললো, যা এখন আমার মনে নেই। আমি তখন হাসলাম এবং বললাম, অপেক্ষা করো যখন কয়েক বছর পর ডক্টর হবো তখন দেখতে পাবে।
আল্লাহর ইচ্ছায় এরপর থেকে আমি লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম এবং তা বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় সংকল্প করলাম, পড়া-লেখায় অনেক মেহনত-মুজাহাদা শুরু করলাম এবং একসময় ডক্টরেট সনদ অর্জন করলাম। এ ঘটনা বলার দ্বারা আমার উদ্দেশ্য হল একথা বুঝানো যে, আত্মবিশ্বাস দৃঢ় মনোবল ও চিন্তা-চেতনার মধ্যে মানুষে মানুষে অনেক পার্থক্য থাকে। অর্থাৎ তুমি যদি শুরু থেকে নিজের জন্যে একটা পরিকল্পনা সাজাও এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্প করো এবং লক্ষ্যে পৌঁছা পর্যন্তও কিছুতেই সন্তুষ্ট না হয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে লক্ষপানে ছুটে চলো, তাহলে তুমি একসময় তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছবেই, ইন-শা-আল্লাহ।
আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মেধাবী, পরিকল্পনাকারী ও সৃজনশীল আবিষ্কারকদের পছন্দ করতেন এবং তাঁদেরকে উৎসাহ দিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক শুক্রবার মসজিদে খুতবেরর ডালের সাথে হেলান দিয়ে খুত্ববা দিচ্ছিলেন, তখন এক নারী সামনে এগিয়ে এসে তাঁকে বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার ছেলে নিদ্রী, আপনার অনুমতি হলে আমি তাঁকে দিয়ে একটি শিখা বানাবো যাঁর উপর দাঁড়িয়ে আপনি খুত্ববা দিবেন। (মহিলাটি ছিলো বুদ্ধিমতী ও সৃজনশীল চিন্তার অধিকারিণী) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কী বললেন? তিনি কি তাঁকে বললেন, না মিম্বর বানানোর দরকার নেই, এখানে উদ্দেশ্য তো হল আমার আওয়াজ সকলের কানে পৌঁছায়, এখন তো আমার আওয়ায় সকলের কানে পৌঁছায়, সুতরাং মিম্বর বানানোর কোনো দরকার নেই, তার চেয়ে তুমি ঐ টাকাগুনো গরিব মানুষকে দান করে দাও। না তিনি একথা বলেন নি; বরং তিনি একজন বুদ্ধিমতী মহিলার সৃজনশীল চিন্তার মূল্যায়ন করলেন। তিনি তাকে বললেন ঠিক আছে তোমার ছেলেকে বলো, মিনার বানাতে।
এরপর স্বভাবের মাঝামাঝিতে ছেলেটি এসে তিনস্তর বিশিষ্ট মিনার তৈরি করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তার উপর দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন। এই মিনার্বের উপর দাঁড়িয়ে খুতবা দিলে আশের চেয়ে আওয়াজ আরো স্পষ্টতইে মানুষের কাছে পৌঁছে এবং ভিড়ের সময় আগে যেখানে সামনের দিক থেকে চার পাঁচ কাতারের বেশি মানুষের চেহারা দেখা যেতো না এখন সেখানে অনেক মানুষের চেহারা দেখা যায়।
এরকম অন্য আরেকটি ঘটনা, খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে আত্মযুদ্ধের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ করছিলেন তখন সালমান ফারসি রা. পরামর্শ দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের দেশে (পারস্য) যখন শত্রুরা আক্রমণ করতে আসতো তখন আমরা পরিখা খনন করতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সালমান ফারসি রা.-এর এই অভিনব পরামর্শ গ্রহণ করলেন। যদিও এই পদ্ধতির সাথে আরবদের পরিচয় ছিলো না, তথাপিও এই পরামর্শকে যুক্তিযুক্ত হওয়ার কারণে তিনি তা গ্রহণ করলেন এবং সাহাবিদের পরিখা খননের নির্দেশ দিলেন। পরিখা খননের জন্যে সাহাবিদের দশজন দশজন করে গ্রুপ করে দিলেন এবং প্রত্যেক দশগজ করে খননের দায়িত্ব দিলেন। তিনি নিজেও খনন কাজে শরিক হলেন। পরিখা খননের সময় সামনে পাথর পড়লে তা কীভাবে ভাঙতে হবে একটি পাথর ভেঙে সাহাবিদের তাও শিখিয়ে দিলেন।
হে ভাই! আমরা মুসলমানগণ, আমাদের ধর্ম ইসলাম। আমাদের ধর্ম স্থল সবচেয়ে সুন্দর ধর্ম ও সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এখানে সৃজনশীল ও পরিশ্রমীদের মূল্যায়ন করা হয়।
কিন্তু যে ব্যক্তি তার লক্ষ্য অর্জনের জন্যে কোনো পরিকল্পনা করবে না এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে ধারাবাহিকতাও এর জন্যে পরিশ্রম করবে না, সে কখনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না, এবং জীবনে উল্লেখযোগ্য কিছুই হতে পারবে না। সুতরাং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে চাইলে আত্মবিশ্বাসের সাথে ধারাবাহিকতাও পরিশ্রম করতে হবে।
বৃদ্ধ বয়সে জীবনের শেষ দিকে এসে আবু হুরাইরা রা. অধিক পরিমাণে হাদিস বর্ণনা করতেন। তখন কেউ কেউ বলতো ‘আবু হুরাইরা বেশি হাদিস বর্ণনা করে’। এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা রা. বলেন, মানুষ বলে আবু হুরাইরা বেশি হাদিস বর্ণনা করে, যেনো তারা এর মাধ্যমে আমার উপর এই অপবাদ আরোপ করতে চায়, যে আমি হাদিস বানিয়ে বর্ণনা করি!! এরপর তিনি বলেন, আমার আনসার ভাইয়েরা ক্ষেত-খামার ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সবসময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য গ্রহণ করতে পারতো না এবং তাঁর থেকে হাদিস মুখস্থ করতে পারতো না এবং আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কাজের ব্যস্ততার কারণে সবসময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য গ্রহণ করতে পারতো না এবং তাঁর থেকে হাদিস মুখস্থ করতে পারতো না; কিন্তু আমি ছিলাম দরিদ্র লোক, কোনো মতে পেট ভরে কিছুও খেতে পারলেই আমার চলতো, আমি সর্বদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাথে থাকতাম এবং একদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার স্মরণ শক্তি কম, আমার কিছুই মনে থাকে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, তোমার চাদর বিছাও, আমি তখন আমার গায়ের চাদর বিছালম। আমি ছিলাম খুব দরিদ্র, আমার চাদরের উপর দিয়ে তখন উকন হাঁটছিল। চাদর বিছানোর পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া পড়ে তাতে ফুঁ দিলেন এবং আমাকে বললেন এবার এটা গায়ে জড়িয়ে নাও। আমি তখন তা আমার বুকের সাথে জড়িয়ে নিলাম। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এরপর থেকে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা কিছু শুনতাম তা আর ভুলতাম না।
হে ভাই! সুযোগ সব সময় আসে না। হঠাৎ করে আসে আবার হঠাৎ শেষ হয়ে যায়। সুতরাং তোমাকে সর্বদা সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে। যখন যা আসে সাথে সাথে তা লুফে নিতে হবে এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। যেমন কবি বলেছেন,
وَمَا نَيْلُ الْمَطَالِبِ بِالتَّمَنِّي وَلَكِنْ تُؤْخَذُ الدُّنْيَا غَلابًا
'শুধু আশা-আকাঙ্ক্ষা দিয়ে উদ্দিষ্ট বস্তু অর্জন করা যায় না। বরং দুনিয়াকে ধরতে হলে তাকে পরাজিত করে নিতে হয়।'
সুতরাং একবার লক্ষ করে দেখো, আবু হুরাইরা রা. তার লক্ষ্যে স্থির থাকার কারণে আজ কোথায় পৌঁছে গেছেন, আজ চৌদ্দশত বছর পরেও ছোট-বড় সকলেই আবু হুরাইরা রা.কে চিনে। তুমি প্রথম ক্লাসের ছোট ছোট ছেলেকেও জিজ্ঞেস করো, তুমি কি আবু হুরাইরা রা.কে চিনো? উত্তরে সে বলবে, হ্যাঁ আবু হুরাইরা রা.কে চিনি, তিনি তো আমাদের প্রিয় নবিজির প্রিয় সাহাবি ছিলেন। অথচ এই আবু হুরাইরা রা. ইসলাম গ্রহণ করেন সপ্তম হিজরিতে অর্থাৎ তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাত্র তিন/চার বছর হাতে পেয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি ইসলামের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে রয়েছেন।
একই কথা বলা যায় খালেদ ইবনে ওয়ালিদ, আবু বকর ইবনে কুহাফা, ওমর ইবনে খাত্তাব, উসমান ইবনে আফফান, আলি ইবনে আবু তালেব রা.দের সম্পর্কে। তাঁরা সকলেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য গ্রহণে দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন। তাঁদের কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুহবত-সান্নিধ্যই ছিলো সবচেয়ে প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত বিষয়। তাঁরা সর্বদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ গ্রহণ করতেন। এই যে, বেলাল রা. এত উচ্চতর কীভাবে আরোহণ করলেন, কীভাবে তিনি এই কঠিন নির্যাতন সহ্য করে ইসলামের উপর অটল-অবিচল রইলেন? তাতো কেবল দৃঢ় সংকল্প ও উঁচু মনোবল এবং নিজের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে।
আর একটি ঘটনা বলব আজকের আলোচনা শেষ করছি, রাবিয়া ইবনে কা'ব রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওযুর পানি এনে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তাঁর খেদমতে সন্তুষ্ট। অথচ তখন তাঁর বয়স তের বছরও অতিক্রম করে নি। এই বালক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে ওযুর পানি ব্যবস্থা করেন। কখনো কখনো তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরজার সামনেই ঘুমিয়ে যেতেন, সেখানেই রাত কাটয়ে দিতেন, কারণ হয়তো রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হবেন আর তাঁর ওযুর পানির প্রয়োজন হবে; কিন্তু তখন তিনি পাবেন না। তাই তিনি তাঁর দরজার সামনেই ঘুমিয়ে যেতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তাঁর প্রতি খুবই সন্তুষ্ট। একদিন রাবিয়া ইবনে কা'ব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওযুর পানি দিলে দিচ্ছিলেন এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, রাবিয়া! তুমি আমার কাছে কিছু চাও। রাবিয়া ইবনে কা'ব রা. ছিলেন তখন ছোট, তিনি অনেক কিছুই চাইতে পারতেন, যেমন কাপড় চাইতে পারতেন, চাদর চাইতে পারতেন, লুঙ্গি চাইতে পারতেন, মজাদার কোনো খাবার চাইতে পারতেন অথবা অন্য কিছু; কিন্তু না তিনি এর কিছুই চাননি। তিনি বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি আপনার কাছে কিছু চাইবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ চাও। আমি বললাম, আমাকে একটু সুযোগ দিন, আমি একটু ভেবে বলি আমি কী চাইবো? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ভাবার সুযোগ দিলেন, অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! জান্নাতে আপনার সাথী হতে চাই। তখন নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এছাড়া অন্য কিছু কি চাও? তিনি বললেন, আমি তখন লজ্জা পেলাম এবং বললাম এটাই যথেষ্ট। অতঃপর তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে বললেন, জান্নাতে আমার সঙ্গী হতে চাইলে বেশি বেশি সালাত আদায় করবে।
আল্লাহু তায়ালা আমাদের সকলকে দৃঢ় সংকল্প ও উঁচু মনোবল সম্পন্ন আত্মবিশ্বাসী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
📄 আত্মবিশ্বাস ঘন মেঘমালাকেও সরিয়ে দেয়
আল্লাহর দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস ও কঠিন পরিশ্রম- বাধার সকল প্রাচীর ভেঙে চুরমার করে দেয়। তুমি অধিক সম্পদের উপর ভরসা করতে পারো না এবং ভরসা করতে পারো না শারীরিক শক্তির উপর, তীক্ষ্ণ মেধার উপর, এবং কোনো জাতি-গোষ্ঠী বা দলের উপর; কিন্তু তুমি ভরসা করতে পারবে আত্মবিশ্বাসী একটি মনকে যা সত্য চিনে এবং ইসলামি চিন্তা-চেতনা লালন করে।
আমি আজ থেকে পনের বছর পূর্বে সুইডেন গিয়েছিলাম এবং সেখানে 'মালমু' শহরের একটি মসজিদে পনের বছরের এক প্রতিবাদী বালককে সাথে সাক্ষাৎ করেছি। ছেলেটি মূলত সুমালিয় বংশোদ্ভূত সুইডেনের নাগরিক। ছেলেটি প্রতিবাদী, হাত পা অচল, কথা বলতে পারে না। অথচ তার হাত ধরে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি, বালকটি মারাত্মক প্রতিবাদী; কিন্তু সে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেয়। এখন প্রশ্ন হল ছেলেটি কীধরনের প্রতিবাদী? কীভাবে এমন একজন প্রতিবাদী হাতে এত মানুষ মুসলমান হল? এটি একটি আশ্চর্যের ঘটনা। এ বিষয় নিয়েই আমাদের আলোচনা।
সুইডেনে থাকাকালে একদিন সুইডিশ এক বন্ধু জানালো যে, আজ আমরা 'মালমু' শহরের এক মসজিদ-পরিদর্শনে যাবো। মালমুতে তখন মসজিদ ছিলো মাত্র একটি। অবশ্য এটি ছাড়াও অনেক জায়গায় সালাত আদায় করা হত। যেমন অফিসের হলরুম, বেডরুম এরকম বিভিন্ন জায়গায় সালাত আদায় হতো; কিন্তু মেহরাব, মিনার ও মিনারসহ যে মসজিদ বুঝায় তা ছিলো মাত্র একটি। অর্থাৎ আজ থেকে পনের বছর আগে মালমুতে মাত্র একটি মসজিদ ছিল। পরে মসজিদের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের মসজিদগুলো অন্যান্য জায়গায় চেয়ে একটু ভিন্নধরনের হয়ে থাকে। মালমু মসজিদের চারপাশের ছিলো সবুজ-শ্যামল বাগান। আমরা যখন মসজিদে প্রবেশ করলাম তখন সালাতের সময় ছিলো না। সময়টা ছিলো পূর্বাহ্ন। মসজিদে প্রবেশ করে দেখি সেখানে চেয়ারের উপর একজন যুবক ছেলে বসা বেলা। ছেলেটি সুমালিয় বংশোদ্ভূত সুইডেন-নাগরিক। ছেলেটি প্রতিবাদী, হাত, পা নাড়তে পারে না। চেয়ারের দুই হাতের সাথে তার দুই হাত বাঁধা, কারণ তার হাত সর্বদা কাঁপতে থাকে, হাতের উপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অনুরূপভাবে তার পা দুটোও চেয়ারের পায়ার সাথে বাঁধা, কারণ তার পা-ও অচল; সর্বদা কাঁপতে থাকে। সাথে সাথে সে বাকপ্রতিবন্ধীও; কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল ছেলেটি একজন দায়ী, সে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেয়। যদিও সে কথা বলতে পারে না; কিন্তু সে ইংরেজি, সুইডিস ও সুমালিয়া ভাষা বুঝে।
আমি ছেলেটির কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখলাম এবং তার কপালে চুমু খেলাম। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কেমন আছো? ছেলেটি আরবি বুঝে না, তাই আমি ইংরেজিতে বললাম, তুমি কেমন আছো?। এরপর তাকে অসুস্থতার ধৈর্যধারণের ফজিলত শুনালাম এবং সান্ত্বনা দিলাম। আমি এক বন্ধুকে কাছে ডেকে আমার কথার তরজমা করতে বললাম। বন্ধুটি আমার কাছে আসলো, তখন আমি ছেলেটিকে একটি হাদিস বললাম,
قال (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন)বন্ধুত্ব এটুকুর তরজমা করলো। আমি বললাম, ما يصيب المؤمن (ما يصيب المؤمن যেসব মুসিবতে আক্রান্ত হয়।) বন্ধুটি এর তরজমা করলো। এরপর আমি বললাম, من وب (وب বন্ধুটি বললো, আবার বলেন। আমি আবার বললাম, এবার সে বললো, শায়খ! আমি এই আরবিটা বুঝতে পারছি না। তখন আমি এর ব্যাখ্যা করে দিলাম। বন্ধুটি ছিলো ইরাকি বংশোদ্ভূত সুইডিস নাগরিক। অতঃপর সে চলে গেল, আমি দেশে ছিলাম। আমি তাকে ডেকে বললাম, আপনি আসুন, আমি আপনাকে আরবিতে এর ব্যাখ্যা করে দিবো কিন্তু সে আর সামনে আসলো না। অন্য একজন সামনে আসলো এবং ছেলেটিকে আমার কথা তরজমা করে শুনাল।
এ বিষয় শেষ করে আমি তাকে বললাম, জনৈহি তোমার হাতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে? এটা কীভাবে হয়েছে? আমাকে একটু ব্যাখ্যা করে বলো। তখন ছেলেটি তার এক সাথীর দিকে তাকাল। সুইডিস সমাজ-কল্যাণ মন্ত্রণালয় পক্ষ থেকে এই ছেলের জন্যে সকালে দুইজন এবং বিকেলে দুইজন করে লোক ঠিক করে দেওয়া আছে। যারা তাকে সঙ্গ দেয় এবং তার খেদমত করে ও বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করে দেয়। ছেলেটি তার মাথা দিয়ে এদের একজনের দিকে ইশারা করার পর লোকটি পালকি সাদৃশ একটি বাক্স নিয়ে এলো। তাতে লাঠির মধ্যে পেঁচানো অনেকগুলো বেনার দেখতে পেলাম এবং প্রতিটি বেনারর মধ্যে অনেকগুলো ঘর আঁকা ছিলো ও প্রতিটি ঘরের মধ্যে বিভিন্ন বাক্য লেখা, যেমন কোনোটিতে লেখা আমি পানি চাচ্ছি, কোনোটিতে লেখা আমি টয়লেটে যাব, আমার মার সাথে সাক্ষাৎ করবো, আমার বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করবো ইত্যাদি বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা লেখা আছে। তার যখন যেটার প্রয়োজন হয় সে তার সাথীদের মাথা দিয়ে সেটার দিকে ইশারা করে আর তারা সেটা পূরণ করে দেয়।
ছেলেটি আমাকে ইশারায় বলল, শায়খ! আমি কুরআন হিফয করতে চাই তাই আপনি আমাকে পূর্ণ কুরআনের অডিও ক্যাসেটের ব্যবস্থা করে দিন।
সে কথা বলতে পারে না; কিন্তু বুঝতে পারে, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি এটা এটা চাচ্ছ? ছেলেটি মাথা দিয়ে ইশারায় তার ইচ্ছার বিষয়ট সম্মতি জানাল।
হে ভাই! তুমি একবার ছেলেটার সাহস ও উঁচু মনোবলের দিকে লক্ষ করো। এরপর ছেলেটি আমাকে বলল, শায়খ আমি সৌদিআরবে ইলম শিক্ষা করার জন্য সফর করতে চাই। সুবহানাল্লাহ! ছেলেটির হিম্মত কত? হাঁটতে পারে না, চলতে পারে না, এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে পারে না, কথা বলতে পারে না, সে ইলম শিক্ষার জন্য ভিনদেশে সফর করতে চায়?।
এরপর আমার বন্ধুরা আমাকে বলল, শায়খ! এই ছেলেটির মাধ্যমে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমি বললাম এটা কীভাবে সম্ভব? যে ছেলে কথা বলতে পারে না, কারো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, কারো খণ্ডন করে না, কারো বিরুদ্ধে দলিল পেশ করতে পারে না তার মাধ্যমে কীভাবে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে? তার কাছে তো কথা বলার মতো, মনের ভাব প্রকাশ করার মত এই কয়েকটি শেখা ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যম নেই!! সে কি তার এই ফেস্টুনের দিকে ইশারা করে মানুষদের ইসলামের দিকে আহ্বান করে? এটা কীভাবে সম্ভব? তারা আমাকে বললো, শায়খ! সকালে যখন তার কাছে দুইজন লোক আসে তখন সে তাদের একজনকে ইশারা করে বলে, আমি এখন আমার এক বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করবো, তখন তাদের একজন গিয়ে তার বন্ধুকে ডেকে নিয়ে আসে, তখন সে অপর লোকটিকে বলে তুমি আমার এই বন্ধুর কাছে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করে বল যে, ইসলাম কী? অতঃপর তা আমাকে ব্যাখ্যা করে শুনাও। তখন দায়িত্বে থাকা লোকটি তার বন্ধুকে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করে আর সে তার সামনে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরে। এরপর ছেলেটি লোকটির মাধ্যমে বন্ধুকে প্রশ্ন করে এবার তুমি আমাকে ইসলাম ধর্ম ও খৃষ্টান ধর্মের মধ্যে পার্থক্য করে দেখাও। তখন সে ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্মের পার্থক্যগুলো তার সামনে ব্যাখ্যা করে। কী ভাই বিশ্বাস হচ্ছে না? আমি এই ঘটনাটা সচক্ষে দেখেছি। তাদের আলোচনা শেষ হলে ছেলেটি তার বোর্ডের দিকে ইশারা করে সেলফে থাকা ইসলাম সম্পর্কে একটি বই তাকে হাদিয়া দিতে বলে, এভাবেই এই প্রতিবন্ধী বালকটির কাছে আসা তার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে।
সত্যিই দৃঢ় সঙ্কল্প ও আত্মবিশ্বাস আকাশের ঘন মেঘমালাকেও সরিয়ে দেয়। যে ছেলেটি প্রতিবন্ধী হাত পা নড়াতে পারে না, কথা বলতে পারে না সে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছে, মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করছে। ছেলেটি কিন্তু এই বলে বসে থাকে নি যে, আমি প্রতিবন্ধী, হাত-পা নড়াতে পারি না, কথা বলতে পারি না, সুতরাং আমার কোনো দায়িত্ব নেই। আমি কীভাবে দাওয়াত দিবো? আমি তো লিখতেও পারি না, বলতেও পারি না। সে এভাবে বসে না থেকে তার সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছে এবং তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একবার চিন্তা করে দেখুন, কিয়ামতের দিন এই প্রতিবন্ধী বালকটির অবস্থান কোথায় থাকবে, সে আম্বিয়া আ.এর সাথে জান্নাতে যাবে, কারণ আম্বিয়া আ.ও মানুষদের দ্বীনের দাওয়াত দিতেন, অনুপ্রেরণা তাদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করাত আর সেও মানুষদের দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছে এবং তার হাতেও মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে।
আমি আমার নিজেকে ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ঘটনাই হল আল্লাহর তাআলার সৈনিকদের অন্তর্ভুক্ত।’ অর্থাৎ অনেক মানুষ কোনো একটি ঘটনা ওনার কারণে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
রিয়াদ প্রতিবন্দীদের জন্য একটা হাসপাতাল রয়েছে। সে সকল লোক কঠিন পঙ্গুত্বের শিকার তাদেরকে সেখানে নেওয়া হয়। যেমন একজনের পিঠ ভেঙ্গে গেছে, মাথা ভেঙ্গে গেছে, সে মাথা ব্যতীতও অন্য কিছুই নড়াতে পারে না। এমন কঠিন পঙ্গুদের সেখানে ভর্তি করা হয়। ঐ হাসপাতালে রোগীদের দেখতে, তাদের সান্ত্বনা দিতে আমরা মাঝে-মধ্যে সেখানে যাই। রুগীদের দেখতে যাওয়া, তাদেরটা সান্ত্বনাদি দেওয়াও ইসলামের কাজ; এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। তাহলে তুমি কেনো তাদেরকে দেখতে যাবে না? যারা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অসহায় অবস্থায় আছে। তাদের কেউ কেউ এক বছর, দুই বছর আবার কেউ আরো অনেক বেশি সময় ধরে সেখানে আছে। আমি এমন এক হাসপাতাল পরিদর্শনের জন্য গেলাম। হাসপাতালটি অনেক পুরুনো। সেখানে গেলে তোমার মনে হবে যে, তুমি কোনো একটা নির্জন বনে প্রবেশ করেছো, কারণ সেখানে যাতায়াতকারী মানুষের সংখ্যা অনেক কম। সাথে সাথে হাসপাতালটি খুবই অপ্রস্তুত ও অবহেলায় পড়ে আছে। যেনো দেখভালের জন্য কেউ নেই। কেউ তার সংস্কার-কাজ করে না। আমি আমার এক সাথীর সাথে সেই হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। আমরা সেখানে চল্লিশ ঘণ্টা অবস্থান করছিলাম। সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বছরের পর বছর ধরে এক যুবককে কামরায় প্রবেশ করি। তার অবস্থা এতটাই নায়ক ছিল যে, সে তার মাথা ব্যতীতও অন্য কিছুই নড়াতে পারতো না। আমি তার কামরায় প্রবেশ করে তার সামনে একটি আশ্চর্যজনক জিনিস ঝুলানো দেখলাম। যা ছেলেটির এমন উঁচু মনোবল আর দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ বহন করে, যা অনেক সুস্থ মানুষের মধ্যেও নেই। ছেলেটি তার সামনে কী ঝুলিয়ে রেখেছিল?
ছেলেটি তার সামনে টেলিভিশনের কোনো মনিটর ঘুরিয়ে রাখেনি যে, সেযেখানে বিভিন্ন চিত্র দেখবে। অথবা সে তার সামনে ল্যাপটপ বা কম্পিউটারও রাখেনি যে, যখন যা মন চাইবে মাউচে টিপ দেওয়ার মাধ্যমে তা চলে আসবে। বরং ছেলেটি তার পরিবারের কাছে দাবি করেছে যে, তারা যেনো বড় কাগজে বড় বড় অক্ষরে কুরআন লিখে তার সামনে বিভিন্ন অংশ ঝুলিয়ে রাখে, যাতে সে দূর থেকে দেখেও পড়তে পারে এবং তা মুখস্থ করতে পারে, কারণ ছেলেটির মাথা ব্যতীতও সমস্ত শরীর অবশ। হাত পা কিছুই নড়াতে পারে না। কুরআন হাতে নিয়ে পড়তে তো দূরের কথা, সে তো হাতই নড়াতে পারে না। তাই সে তার পরিবারের কাছে দাবি করেছে যে, তারা যেনো কুরআনুল কারিম বড় বড় অক্ষরে লিখে পৃষ্ঠা এক পৃষ্ঠা করে তার সামনের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখে এবং সে তা দেখে দেখে মুখস্থ করতে পারে। এক পৃষ্ঠা মুখস্থ হলে সে মাথা দিয়ে ইশারা করে আর তারা এর পরের পৃষ্ঠা ঝুলিয়ে দেয়। আমি যখন তার কামরায় প্রবেশ করলাম তখন ছেলেটি সূরা মুজাদালাহ মুখস্থ করেছে। আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, সে এপর্যন্ত কত পৃষ্ঠা মুখস্থ করেছে? সে বললো, দশ পাতার চেয়ে বেশি। আমি ছেলেটির পাশে একটি বাক্স দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এতো কী? আমাকে বলা হল, এর মধ্যে কুরআন লিখা পৃষ্ঠাগুলো রয়েছে। এর এতে প্রায় দুইশত পৃষ্ঠার মত আছে।
সুবহানাল্লাহ! ছেলেটির শরীর অচল হওয়া সত্ত্বেও কুরআন মুখস্থ করার সঙ্কল্প করেছে এবং এবং পনের পাতার মত কুরআন মুখস্থ করে ফেলেছে। ছেলেটি কিন্তু একথা বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকে নি যে, আমি অতন্তবড়ো রোগে আক্রান্ত। আমি হাত পা নড়াতে পারি না, কথা বলতে পারি না। আমি পূর্বেই একটি কথা বলতে ভুলে গেছি যে, ছেলেটি কথাও বলতে পারে না। আমার সাথে যে লোকটি ছিলো সে আমাকে বলেছে, ছেলেটি তার সামনে ঝুলানো কাগজ থেকে কুরআন মুখস্থ করে। এক পৃষ্ঠা মুখস্থ হয়ে গেলে সে তার পরিবারকে মাথা দ্বারা ইশারা করে, আর তারা তার পরবর্তী পৃষ্ঠা ঝুলিয়ে দেয়। আমি এরও অনেক দিন পর ছেলেটিকে দেখতে আবারও সেই হাসপাতালে গেলাম। তখন সে একটু একটি তার হাত নাড়াতে পারে। অর্থাৎ একশত ভাগের পনের ভাগ। আমি দেখেছি হাতের একটি কলম ধরিয়ে দিলাম আর ছেলেটি কলম ধরল এবং তার সেই অবস্থা হাত দিয়েই শিখতে চেষ্টা করল। সে তার ইচ্ছেমত সামান্য কিছু লিখল, কারণ সে লিখতে পারে না। সুবহানাল্লাহ!! কী দৃঢ় মনোবল!!
আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব আফসোস করে বলে, হায় আমি যদি কুরআন হিফজ করতে পারতাম! অথবা তারা যখন কোনো কুরআনের মজলিস, হিফজুল কুরআনের মজলিস দেখে অথবা কোনো দশ বছরের ছোট হাফেজে কুরআনকে দেখে তখন বলে, এতটুকু বাচ্চা কুরআন মুখস্ত করেছে!!? হায় আমি যদি তার মত হতে পারতাম! হায়! আমি যদি কুরআন মুখস্ত করতে পারতাম! কিছু আমার হয় না, আমি পারি না। আরে ভাই! তুমি পারো এবং পারবে। বরং তোমার মনোবল দুর্বল, তোমার দুর্বল হিম্মত তোমাকে বসিয়ে রেখেছে। তুমিও তার মত কাজ করতে পারবে। তুমিও মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে পারবে এবং মানুষকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতে পারবে। তুমিও পারবে কুরআন মুখস্ত করতে; কিন্তু সমস্যা হল মানুষের হিম্মত মানুষকে বসিয়ে রাখে। তোমার হিম্মত তোমাকে বসিয়ে রেখেছে। তুমি যদি হিম্মত করে সামনে বাড়তে তাহলে অবশ্যই তা অর্জন করতে পারতে।
আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ রা. অন্ধ ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি তার টার্গেট ও লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। এক রাফে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর ও ওমর রা.-এর সাথে বাইরে বের হলেন। আবু বকর ও ওমর রা. ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী এবং তার উজির। তখন ছিলো অন্ধকার রাত, সকল মানুষ নিজ নিজ ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুই সাথীকে নিয়ে মসজিদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় মসজিদের ভেতর থেকে কুরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অন্ধকার রাতে মসজিদ থেকে কুরআনের আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তার পড়া শুনলেন। ভিতর থেকে এক অন্ধ সাহাবী আবদুুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ রা. কুরআন পাঠ করছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, কুরআন যেভাবে নাযিল হয়েছে কেউ যদি সেভাবে তেলাওয়াত করতে চায়, তাহলে সে যেন আবদুল্লাহর মতো তেলাওয়াত করে। এরপর আবদুল্লাহ রা. কুরআন তেলাওয়াত শেষ করে দোয়া শুরু করলেন। তিনি জানেন না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তেলাওয়াত শুনেছেন এবং এখন তাঁর দোয়ায়ও শুনেছেন। তিনি দোয়া করতে লাগলেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি চাও তোমাকে দেওয়া হবে। তুমি চাও তোমাকে দেওয়া হবে। তুমি চাও তোমাকে দেওয়া হবে। অর্থাৎ তুমি আরো বেশি করে চাও, আল্লাহ তাআলা তোমাকে দিবেন। তোমার দোয়া কবুল করবেন।
আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ রা. বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর এক যুদ্ধের সময় আবদুল্লাহ রা. বললেন, আমি তোমাদের সাথে যুদ্ধে যেতে চাই। লোকেরা বললো, তুমি উজরগ্রস্ত; আল্লাহ তাআলা তোমার সমস্যা গ্রহণ করবেন। ইরশাদ হয়েছে:
لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ
‘অন্ধের জন্যে, খঞ্জের জন্যে এবং অসুস্থ ব্যক্তির জন্যে কোনো অপরাধ নাই।’
কিন্তু তিনি বললেন, আমি যুদ্ধে যেতে চাই। সুতরাং তোমরা আমাকে যুদ্ধের একটি পতাকা দাও। আমি পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো, আমি অন্ধ মানুষ; পালাতে চাইলেও পালাতে পারবো না। ময়দানে মুসলমানদের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। মানুষ যুদ্ধ করবে এবং পতাকা দেখে একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করবে। আমাকে যুদ্ধের পতাকা দিলে অন্য একজন দৃষ্টিসম্পন্ন মুজাহিদ শাখদাজ্য কার্বদের সাথে যুদ্ধ করতে পারবে। অতঃপর তিনি তাদের সাথে জিহাদ বের হলেন এবং জিহাদের পতাকা নিয়ে সুদৃঢ় পর্বতের ন্যায় ময়দানে অটল রইলেন। মুজাহিদগণ যখন যুদ্ধ করতে করতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো, তখন তাঁকে দেখে আবার একত্র হতো। তিনি পতাকা হতে একটা তীর বা তরবারি আঘাতের অপেক্ষা করছিলেন।। এভাবে একসময় তিনি শাহাদাত বরণ করলেন। অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও জিহাদের পতাকা বহন করে তিনি শহিদ হলেন। সুবহানাল্লাহ!!
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী, হাঁটা-চলা করার শক্তিশূন্য লোকদের উপর সেই অবহেলাকারীদের শক্তি কোনো উজর নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের যাকে যে শক্তি দিয়েছেন, প্রত্যেককে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। বাকশক্তিশূন্য লোককে প্রশ্ন করবেন, কেনো তুমি মানুষকে আল্লাহ তাআলার দিকে ডাকো নি? কেনো তুমি সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করো নি? হাঁটা ও চলা-ফেরার শক্তিশূন্য লোককে প্রশ্ন করবেন, কেনো তুমি মসজিদে যাওনি এবং আল্লাহর আনুগত্যের কাজে তোমার পা-কে ব্যবহার করো নি? অর্থাৎ প্রতিটি সক্ষম লোককেই তার সক্ষমতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাকে যে শক্তি দান করেছিলাম তুমি তাকে কোন কাজে ব্যয় করেছ? এই সকল প্রতিবন্ধী লোক, যারা জীবনের অনেক চাহিদাই পূরণ করতে পারে না। তা সত্ত্বেও তাদের জীবনে একটা প্রভাব বা ফল রয়ে যাচ্ছে। তাহলে যাদের শক্তি আছে, সামর্থ্য আছে তাদের জীবনের কী পরিমাণ প্রভাব ও ফল থাকা দরকার? বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, শিক্ষক-ছাত্র, ইমাম-মুয়াজ্জিন, শ্রমিক- চাকরিজীবী সকলেরই তাদের জীবনের একটা প্রভাব রেখে যাওয়ার কামনা করা উচিত। যার যে শক্তি ও সক্ষমতা আছে তা-ই দ্বীনের সাহায্যে, নিজের ও উম্মাহর উপকারে ব্যয় করা উচিত।
আমি আল্লাহ তাআলার নিকট এই প্রার্থনা করি যে, তিনি যেনো আমাকে এবং আপনাদের সকলকে তার আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করেন। প্রতিটি কল্যাণকর কাজ করার তাওফিক দান করেন। আমরা যেখানেই থাকি না কেনো তিনি যেনো আমাদেরকে তাঁর রহমত ও বরকতের মধ্যে রাখেন এবং আমাদের জীবনের একটা ছাপ বা ফল বাকি রাখেন। বান্দার জীবনের ছাপ ও ফল তাঁদের রবের নিকট বাকি থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :
إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي الْمَوْتَى وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُّبِينٍ
‘আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি। আমি প্রত্যেক বস্তু সুস্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি।’
মানুষের মধ্যে এমন মানুষ রয়েছে যারা মৃত্যুবরণ করে আর তাঁদের নেক আমল বাকি থাকে এবং বদ আমলগুলো তাঁদের সাথে মৃত্যুবরণ করে। আবার এমন মানুষও রয়েছে, তারা যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তাঁদের সাথে সাথে তাঁদের নেক আমলগুলোও মৃত্যুবরণ করে। আবার কারো কারো বদ আমলগুলো বাকি থাকে অর্থাৎ খারাপ কিছু রেখে যায়। যার কারণে অন্য মানুষ আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করে। এটা এমন একটি মাসআলা যা ব্যাপারে আমাদের সকলেরই সতর্ক থাকা উচিত। মানুষের নেক আমল বাকি থাকার কারণে তাঁরা যেমনিভাবে প্রতিদান পাবে, অনুরূপভাবে বদ আমল বাকি থাকার কারণেও তারা তার প্রতিদান পাবে। সুতরাং খারাপ কাজের চাবিকাঠি হওয়ার পরিবর্তে নেক-কাজের মাধ্যম হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন。
টিকাঃ
১. সুরা নুর, আয়াত: ৬১
১. সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ১২
📄 আল-আসমায়ি রহিমাহুল্লাহ: এক মহাসাফলোর গল্প
মানুষের বিভিন্ন স্বপ্ন থাকে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে তাকে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি, ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীনও হতে হয়। তবে তাদের মধ্যে যারা সেই সকল বাধা পেরিয়ে সামনে এগোতে থাকে সে-ই সফল হয় এবং সে-ই তাঁর স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছতে পারে। সুতরাং মানুষের মধ্যে কেউ তাঁর স্বপ্ন পূরণের জন্যে সকল ধরনের কষ্ট-মাশাক্কাত সহ্য করে, আবার কেউ কষ্ট দেখে লুকাতে চায়।
আর সফলতা তো বলা হবে তখনই যখন তা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানো হবে। স্বপ্ন-পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মানুষের হিম্মত ও মনোবল বিভিন্নধরনের হয়ে থাকে। তাদের কেউ পাহাড়ের কিছুটা উপরে নেমে যায়, কেউ চার ভাগের একভাগ, কেউ চার ভাগের তিনভাগ উপরে উঠে নেমে যায়; কিন্তু কিছু মানুষ থাকে যারা তাঁদের লক্ষ্যের চূড়ায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্তও ক্লান্ত হয় না। যখন সে চূড়ায় পৌঁছে কেবল তখনই অনুভব করে যে, সে কিছুটা সফল।
প্রতি বিষয়েই একটা চূড়া রয়েছে, যেমন পড়ালেখার চূড়া, ব্যবসা- বাণিজ্যের চূড়া, আবিষ্কারের চূড়া, হিফজুল কুরআনের চূড়া, বয়ান বক্তৃতার চূড়া, সন্তান লালন-পালনের চূড়া, পরিবারের সাথে উঠা-বসা, চলা-ফেরার আদব-আখলাকের চূড়া, এক কথায় প্রতিটি বিষয়েরই একটা সর্বোচ্চ চূড়া রয়েছে; কিন্তু মানুষ তার লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
এখন আমরা এবিষয়ে অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সকল বাধা-বিপত্তি উপেশক্ষা করে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার ক্ষেত্রে আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমা'য়ি রহ.-এর আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনবো। যদিও ইলমের প্রতিটি শাখায় আসমা'য়ির বিচরণ ছিলো; কিন্তু তার প্রসিদ্ধি ছিলো ভাষা বিষয়ক।
আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমা'য়ির যদিও ইলমের প্রায় প্রতিটি বিষয়ে অনেক দক্ষতা ছিলো; কিন্তু একজন ভাষা বিষয়ক হিসেবেই বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আমি এখন আপনাদের সামনে যে ঘটনা উল্লেখ করবো তা শায়খ তাকিউদ্দিন ‘আল ফারায় বাদাশ শিদাদ্’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন। আবদুল মালেক ইবনে কুরাইব আল আসমা'য়ি বসরায় বসবাস করতেন, তিনি ছিলেন ইলম-পিপাসু। তিনি প্রতিদিন কোনো না কোনো ইলমের শাখায় নিকট ইলম শিক্ষার জন্যে যেতো। আজ তাফসিরের শায়েখের কাছে, কাল হাদিসের শায়েখের কাছে, এর পরের দিন সাহিত্যের শায়েখের কাছে, এভাবে এক দিন একএক শায়েখের নিকট গিয়ে ইলম শিক্ষা করতেন। ইলমের দিকে অধিক মনোযোগী হওয়ার কারণে তিনি রুজি-রোজগারের প্রতি মন দিতে পারতেন না। তাঁর বাড়ির পাশেই ছিলো এক সবজি-বিক্রেতার দোকান। আসমারিয় বাড়ির ছিলো এলাকার একেবারে শেষ মাথায়, বাড়িও থেকে বের হয়ে মসজিদ অথবা শায়েখদের নিকট যাওয়ার পথে সবজি-বিক্রেতার দোকান পড়তো এবং সবজি-বিক্রেতার সাথে তাঁর দেখা হতো। শায়েখ আসমারিয় বয়স তখন বিশ বছরের কম। প্রতিদিন যাওয়া আসার পথে সবজি-বিক্রেতা তাঁকে জিজ্ঞেস করতো আসমারিয়! তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ? আসমারিয় বলতেন, আমি এখন আমার তাফসিরের শায়েখের নিকট তাফসীর শিক্ষার জন্যে যাচ্ছি। এরপর বিকেলে ফিরে আসার সময় তাঁকে আবার প্রশ্ন করতো, আসমারিয় তুমি এখন কোথা থেকে এসেছ? তিনি বলতেন, আমি এখন আমার সাহিত্যের শায়েখের নিকট থেকে আসলাম। পরদিন সকালে আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করতো, তুমি এখন কোথায় যাও? তিনি বলতেন, আমি আমার হাদিসের শায়েখের নিকট হাদিস শিখতে যাচ্ছি। এভাবে প্রতিদিন তাঁর যাওয়া-আসার সময় সবজি-বিক্রেতা তাঁকে প্রশ্ন করতো, কোথায় যাচ্ছ? কোথা থেকে এলে? আর তিনিও তাঁকে উত্তর দিতেন, অমুক শায়েকের নিকট যাচ্ছি, অথবা অমুক শায়েখের কাছে থেকে এলাম।
শায়েখ আসমারিয় এভাবেই ইলম অর্জনের পিছনের তাঁর দিন-রাত মেহনত করেছেন। এমন সময় একদিন সেই সবজি বিক্রেতা তাঁকে বলল, আসমারিয় তুমি কি এভাবে এঁদের পিছনে ঘুরে ঘুরে তোমার সময় নষ্ট করো না? ফলে তুমি এঁদের থেকে কিছুই পাবে না। আসমারিয় বললো, আমি ইলম অর্জন করছি, কুরআন মুখস্থ করছি, ভাষা শিখছি, কবিতা শিখছি। লোকটি তাঁকে আবারও বললো, তুমি তোমার সময় নষ্ট করো না। আসমারিয় বললো, না; এতে আমার সময় নষ্ট হয় না বরং আমার উপকার হয়। এবার সবজি-বিক্রেতা তাঁকে বললো, আসমারিয় আমার একটা মতামত শুনবে? (ভাই! তুমি একবার লক্ষ কর, উঁচু মনবাল আর নিচু মনবাল কাকে বলে?) এই যে, তুমি সকাল-বিকাল কষ্ট করে যে কিতাবগুলো বহন করো, (তখনকার কিতাব এখনকার মত এতো ছোটোখাটো ও সুন্দর সুন্দর ছিলো না। তখনকার কিতাব ছিলো অনেক বড় বড় পৃষ্ঠায় দোয়াতের কালি দিয়ে বড় বড় করে লেখা। উস্তাদ দরসে হাদিস বলতেন আর ছাত্র দোয়োতে কলম ভিজিয়ে মোটা কাগজে লিখতো। এখনকার মত পকেটে থেকে ছোট ও সুন্দর কলম বের করে নোট বুকের মধ্যে লেখা যেতো না। তাই তাঁদের একাদিনের দরসের লেখা হয়ে যেতো অনেক, কখনো কখনো তা মাথায় করে বহন করতে হতো। আর আসমারিয় রহ. সকাল-বিকাল তাঁর লেখা বইগুলো নিয়ে শায়েখের দরসে আসা-যাওয়া করতেন।) সবজি-বিক্রেতা তাকে বলল, আমার একটা মতামত শুনবে? এই যে তোমার কিতাবগুলো তুমি সকাল-বিকাল যা কষ্ট করে বহন করে নিয়ে যাও সেগুলো আমাকে দিয়ে দাও, বিনিময়ে আমি তোমাকে কিছু সবজি দিব। আসমারিয় বললেন, আমি তোমাকে তা দিব না আর আমার কাছে এর সমতুল্য কিছুই নেই। তখন লোকটি তাকে ঠাট্টা করে বলল, আসমারিয় শুনো! আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তিনি বললেন সেটা কী? তুমি তোমার সকল কিতাবগুলো নিয়ে এসো এবং সেগুলোকে বড় একটা বালতির মধ্যে পানি দিয়ে ভিজাও, অতঃপর আমি তোমার সাথে একত্র হয়ে দেখবো সেখান থেকে কী ধরনের রং বের হয়? তার রং কি লাল, নীল না কালো?
আসমারিয় বলেন, আমি তখন ছিলাম ছোট বালক, তাই আমি চুপ করে বাসায় ফিরে গেলাম। এরপর থেকে আমি ফজরের পূর্বেই বাড়িও থেকে বের হতাম, যাতে করে বের হওয়ার সময় সবজি-বিক্রেতার সাথে আমার দেখা না হয় এবং তাঁর সাথে আমার কথা বলতে না হয়। এবং রাতে ইশার পর যখন সবজি-বিক্রেতা তার দোকান বন্ধ করে বাড়িতে চলে যেতো তখন আমি বাড়িতে ফিরতাম, যাতে করে সে আমাকে দেখতেই না পায়। আসমারিয় রহ. বলেন, এরপর কঠিন দারিদ্রতা আমাকে ঘিরে ফেলে, যার ফলে আমি আমার বাড়ির আসবাবপত্র, বিছানা-পাতি সবকিছুই বিক্রি করে দিলাম, এমনকি আমি আমার পরনের একটিমাত্র জামা রেখে বাকি সবগুলো বিক্রি করে দিলাম। এরপর আমার অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হতে লাগলো; আমার মাথার চুল লম্বা হয়ে গেল, গোসল না করতে করতে শরীরে ও কাপড়ও ময়লা জমে গেল, কারণ চুল কাটার মত ও গোসল করার মত কোনো টাকা ছিলো না। অর্থাৎ আমি খুবই কঠিনভাবে জীবন কাটাতে লাগলাম।
আমার যখন এই অবস্থা তখন একদিন বানায়ি নিজ গ্রামে হাঁটছি, তখন হঠাৎ একলোকের চিৎকার শুনতে পেলাম; সে বলছে, হে আসমারিয়কে চিনি এবং আমাকে আসমারিয় নিকট নিয়ে যাবে? হে আসমারিয়কে কিংবা আমাকে আসমারিয় নিকট নিয়ে যাবে? তখন মানুষ আমার দিকে ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিল। অতঃপর সে আমার নিকট এলো এবং আমাকে দেখে বলল, তুমিই কি কবি সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ আসমারিয়? আমি বললাম, হাঁ আমিই আসমারিয়। তখন সে বললো, আমি বনরার আমির মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশিমির নিকট থেকে এসেছি, তিনিই আমাকে তোমার নিকট পাঠিয়েছেন। তিনি তোমাকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে বলেছেন; কিন্তু তুমি তো এই অবস্থা ও এই চেহারায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। তোমার অবস্থা খুবই নোংরা, চেহারায় ময়লা, কাপড়গুলো ময়লা ও নোংরা, চুলগুলোও বড়বড় ও এলোমেলো; অনেক দিন থেকে কাটা হয় না। অর্থাৎ তুমি এই অবস্থায় আমিরের সাথে দেখা করতে যেতে পারো না। আমি তাঁকে বললাম আল্লাহর শপথ, গোসলখানায় গিয়ে গোসল করার মত সামর্থ্য আমার নেই। আগের যুগে বিভিন্ন জায়গায় বড়বড় গোসলখানা থাকত, মানুষ সেখানে গিয়ে টাকা দিয়ে গোসল করতো। সেখানে ঠাণ্ডা পানি, গরম পানি উভয়টার ব্যবস্থা থাকত। থাকত সাবান-শ্যাম্পুর ব্যবস্থা, টাকার বিনিময় মানুষ সুবিধা করে নিত। অর্থাৎ আমার কোনো টাকা নেই যে, আমি তা দিয়ে গোসলখানায় গিয়ে গোসল করবো এবং আমার এমন সামর্থ্যও নেই যে, আমি সেলুনে গিয়ে চুল কাটাবো। তখন লোকটি বললো, ঠিক আছে তুমি এখানে অপেক্ষা করো, আমি আসছি। অতঃপর সে আমিরের নিকট ফিরে গেল এবং কিছুক্ষণ পর এসে বলল, এই নাও এক হাজার দিরহাম; এটা আমির পাঠিয়েছেন, এটা দিয়ে তুমি তোমার অবস্থার পরিবর্তন করো, তারপর আমার সাথে দেখা করো। তখন আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ! এটা বরকতের শুরু মাত্র। সে কিন্তু এখনও জানে না যে, আমির তাঁর কাছ থেকে কী চায়? সে বলল, অতঃপর আমি তাঁর থেকে টাকাগুলো নিয়ে ভাল কাপড় কিনলাম, সেলুনে গিয়ে চুল কাটলাম, গোসলখানায় গিয়ে গোসল করলাম, অতঃপর আমিরের নিকট গেলাম। সে আমাকে দেখে বলে তুমি কি কবি ও সাহিত্যিক আসমারিয়? আমি বললাম, হাঁ। সে বলল, খলিফা হারুনুর রশিদ নিজ ছেলের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য একজন কবি, সাহিত্যিক ও জ্ঞানীর জন্য আমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। আমি মানুষের কাছে জানতে পেরেছি যে, তুমি কবি সাহিত্যিক, পন্ডিতও পারো লিখতে পড়াতেও। সুতরাং তুমি চাইলে খলিফার ছেলের ব্যক্তিগত শিক্ষক হতে পার। আমি বললাম, ঠিক আছে আমি রাজি। তখন সে আমাকে বললো, এই নাও তোমার পথের খরচা; তুমি বাগদাদে চলে যাও। সে বলে এরপর আমি বাগদাদে ফিরে এলাম এবং সেখানে থাকা আমার সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে নিলাম এবং একজনকেও আমার বাড়ি দেখাতোনার দায়িত্ব দিয়ে বাগদাদে চলে গেলাম। অতঃপর আমি বাগদাদে গিয়ে খলিফা সাদে দেখা করলাম। খলিফা আমার আদব-আখলাক, কবিতা ও কবিতার ভাষা-অলংকার দেখে খুবই আশ্চর্য ও বিস্মিত হলেন।
এই লোকটি দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে পৃথক করে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইলমের মজলিসে হাঁটু গেড়ে বসেছিলো এবং নিজ মেহনতে নিজের কথা বলার স্টাইল, কবিতা ও ভাষার প্রচলিত রীতির মধ্যে পরিবর্তন এনেছেন এবং নতুন এক সাহিত্য-রীতিও চয়ন করেছেন। যারা জীবনে পরিবর্তন আনতে চায়, ভাষায় পরিবর্তন আনতে চায় আমি তাদেরকে তাঁর কিতাব পড়তে বলি, তাঁর কাছ থেকে শিখতে বলি।
সে যখন খলিফা সাদে গেলেন, খলিফা তাঁর আদব-আখলাক কবিতা ও কবিতার ভাষালংকার দেখে খুবই বিস্মিত ও খুশি হলেন। এবং তাঁকে বললেন, আমি চাই তুমি আমার ছেলের শিক্ষক হবে এবং তার শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব নিবে। সে বলল, অতঃপর রাজ-প্রাসাদে আমার ছাত্রের জন্য একটা কামরা ঠিক করা হল এবং আমি শাহজাদাকে পড়ানো শুরু করলাম।
আসমারিয় খলিফার নিকট থেকে বছর খানেক তাঁর ছেলেকে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিল, সে তাকে ভাষা শিখায়, কুরআনুল কারিম হিফয করায়, কবিতা শিখায়। আসমারিয় বলেন, খলিফা আমার জন্য একটা বেতন নির্ধারণ করেন; কিন্তু বেতনটা ছিলো আমার প্রয়োজনতিরিক্ত, কারণ আমার থাকা-খাওয়াও সহ সকল খরচ খলিফা প্রাসাদ থেকেই ব্যবস্থা করা হত। তাই আমি আমার বেতনের টাকা জমা করে বনরায় আমার গ্রামে পাঠিয়ে দিতাম। এরপর সেখানে ছোট ছোটো বাউন্ডির পরিবর্তে বড় একটা বাড়ি ক্রয় করলাম। অতঃপর মানুষজন যেন খলিফার নিকট প্রেরণ করার জন্য আমার কাছ থেকে বিভিন্ন চিঠিপত্র এবং আবেদন-দরখাস্ত লিখিয়ে নিত, কারণ আমার তারা ছিলো অনেক উচ্চাদের ও আবেদনপূর্ণ, যার মাধ্যমে তারা খলিফার কাছ থেকে তাদের উদ্দিষ্ট বস্তু হাসিল করতে পারতো আর এজন্যে তারা আমাকে নির্দিষ্ট পরিমাণে কিছু একটা দিত। আমি খলিফার ছেলের গৃহ-শিক্ষক হওয়ার কারণে খলিফার নিকট যেকোনো সময় যেতে পারতাম, তাই বিভিন্নজন আমার মাধ্যমে খলিফার কাছে তাদের প্রয়োজনীয়ও কথা জানাতো এবং তারা অনেক সময় খুশি হয়ে আমাকে অনেক কিছু দিত। এভাবে আমার অনেক সম্পদ হয়ে গেল আমি তা দিয়ে আমার গ্রামে একটি ফসলের ক্ষেত ও অনেকগুলো বাগান ক্রয় করলাম।
তিনি বলেন, একদিন খলিফা আমাকে বললেন, আমি চাই আমার ছেলে জুমার খুত্বা দিবে, এটা কি সম্ভব? আমি বললাম, হাঁ অবশ্যই সম্ভব। তখন তাঁর ছেলের বয়স ছিলো সতের-আঠার বছর। আর আসমারিয় তাকে সাত বছর পড়ানোর পরের ঘটনা। সে বলে, আমি শাহজাদাকে একটা খুত্বা মুখস্থ করালাম এবং তাকে বারবার তা অনুশীলন করালাম। অতঃপর এক জুমার দিন সে মিম্বারে আরোহণ করলো এবং খুত্বা দিল, মানুষ তাঁর খুত্বা শুনে খুবই আশ্চর্য হল। তাঁর খুত্বার প্রতিটি দিকই ছিলো খুবই উঁচু মানের ভাষা বক্তব্য ও বিষয়বস্তু; সবকিছুই ছিলো সুন্দর। এরপর চার দিক থেকে আমার নিকট সম্পদ আসা শুরু করলো, কারণ মানুষ তখন জেনে ফেলেছে যে, আমি তাকে এতো সুন্দর করে শিক্ষা দিয়েছি।
এরপর একদিন খলিফা আমাকে বলল, হে আবদুল্লাহ মালেক আল-আসমারিয়! আল্লাহ তায়ালা তোমার হায়াতে বরকত দান করুন। আমার ছেলে কুরআন হিফয করেছে, কবিতা ও অলংকার-শাস্ত্র শিক্ষা করেছে, হাদিস শিখেছে এবং এখন সে আমার সভাসদদের একজন। আমি মনে করি কার সাথে আর তোমাকে থাকতে হবে না। এখন তুমি কি আমাদের নিকট থেকে যাবে? তাহলে তোমাকে অভিনন্দন। আর বনরায় ফিরে যেতে চাইলে যেতে পার। আমি বললাম, আমি বসরায় ফিরে যাব। তখন সে বলল, আমার কাছে তুমি যা ইচ্ছে তাই চাইতে পারো, আমি তোমাকে তা দিব। আমি বললাম, আল্লাহ আপনার হায়াতে বরকত দান করুন, বসরায় আমার বাড়ি আছে, বাগান আছে, আমার আর কিছুদূরই প্রয়োজন নেই। তখন তিনি বললেন, না বরং আমি তোমাকে এই উট ও গবাদি পশুগোলা দিচ্ছি। অতঃপর সে আমার সাথে অনেকগুলো উট ও গবাদি পশু ওয়াদেশ দিলেন। এরপর তিনি বললেন তোমার কোনো ইচ্ছে থাকলে আমাকে বল। আমি বললাম, ঠিক আছে আমার একটা আকাঙ্ক্ষা হল, আপনি বসরার আমির মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশেমীকে একটা চিঠি লিখে পাঠাবেন যে, সে যখন আমার আগমনের কথা শুনবে তখন নিজ লোকজনকে নিয়ে আমাকে অভিনন্দনের জন্যে এগিয়ে আসবেন এবং বসরার সকল লোক তাঁর প্রাসাদে তিন দিন আমাকে সালাম করবে ও অভিনন্দন জানাতে আসবে। অর্থাৎ তিনি নিজের জন্যে কিছুটা সম্মান কামনা করলেন। খলিফা বসরার আমিরের নিকট চিঠি পাঠাল। অতঃপর বসরার আমির মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান আল-হাশেমী লোকজনকে নিয়ে আমার আগমনের অপেক্ষা করতে লাগল। এরপর যখন তারা আমিরের আগমনের কথা শুনতে পেল, তাকে অভিনন্দন জানানোর জন্যে শহরের বাইরে এলো এবং তাঁকে যথায়থ স্থান করে অভিনন্দন জানাল। মানুষজন তাঁর অপেক্ষায় ছিল। আমিরের কাছ থেকে তিনি তাঁর প্রাসাদটি দখল করলেন, সেখানে প্রথম দিন বসরার বড়বড় ব্যবসায়ী এবং সম্মানিত লোকজন তাঁকে অভিনন্দন ও সালাম জানাতে আসলো। এবং পরের দিন তাদের চেয়ে যারা নিম্ন পর্যায়ের তারা তাঁকে অভিনন্দন ও সালাম জানাতে আসলো। আর তৃতীয় দিন সাধারণ মানুষ তাঁকে অভিনন্দন এবং সালাম জানাতে আসল।
আসমাঈ বলেন, মানুষ যখন আমাকে সালাম করছে এবং অভিনন্দন জানাচ্ছে, তখন আমি তাদের মধ্যে এক লোককে দেখলাম খুবই জীর্ণশীর্ণ পোশাকে, মুজ্বা ব্যতীত শুধু চটি জুতা পরে আমাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছে, যার চেহারা থেকেই দরিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। সে যখন আমার কাছে আসলো এবং আমাকে সালাম করে বলল, হে আব্দুল মালেক! অর্থাৎ সে আমাকে কোনো ধরনের উপাধি ছাড়াই আমার নাম ধরে ডালল। আমি একথা শুনে অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম, কারণ খলিফা ব্যতীত কেউ আমাকে কোনো খেতাব ছাড়া শুধু আমার নাম ধরে ডাকে না। সুতরাং তার ডাক শুনে আমার খলিফার কথা মনে পড়ে গেল, কারণ খলিফা আমাকে শুধুমাত্র আব্দুল মালেক বলে ডাকতেন। শাহজাদার শিক্ষক ফমিলাভূষণ শায়খ এধরনের কোনো লকব ব্যতীত শুধু আব্দুল মালেক বলেই ডাকতেন।
সুতরাং তখন আমি তার দিকে তাকিয়ে তাকে চিনতে পারলাম এবং তাকে আমি বললাম, তুমি কি সেই সাজি-বক্তৃতা নও? সে বললো, হ্যাঁ। আমি বললাম, তোমাকে করা আমার সেই নসিহত কি তোমার মনে আছে যে, আমি তোমাকে বলেছিলাম, ‘তোমার সকল কিতাব একত্র করে একটি বড় বালতির মধ্যে রেখে তার উপর পানি ঢালো এবং আমরা দেখবো তার থেকে কোন রং বের হয়? তার রং কি লাল, নীল না কালো? তোমার কি সেই নসিহত মনে আছে? সে বললো, হ্যাঁ আমার মনে আছে। আমি বললাম, হ্যাঁ আমিও তোমার কথাগুলো আমল করেছি, আমি আমার সকল কিতাব নিয়েছি, সেগুলো পড়েছি এবং বারবার পড়ে আয়ত্ত করেছি, অতঃপর তা মুখস্থ করে আমার অন্তরের মধ্যে রেখে দিয়েছি, অতঃপর তার উপর আমার আগ্রহ চলে, আমার সময়কে হেফাযত করে তা বারবার পড়েছি এবং যথাসাধ্য পরিশ্রম করেছি। অতঃপর সেখান থেকে যা বের হয়েছে তা তো তুমি দেখতেই পাচ্ছো। আল্লাহ তাআলা আমাকে এর বিনিময়ে দুনিয়াতে এই মর্যাদা দান করেছেন আর আখেরাতের মর্যাদাও তো আছেই।
হ্যাঁ, ইলম মানুষকে আখেরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই একবার সম্মান দান করে। যেমনভাবে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাঁদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন।’
অনেক উলামায়ে কেরাম বলেন এখানে (أَرْجَأتُ) মর্যাদা দ্বারা উদ্দেশ্য হল আখেরাতের মর্যাদা এবং সাথে সাথে দুনিয়ার মর্যাদাও উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা তাঁদের মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে দেন, কারণ তাঁরাই হল দেশের প্রধান সম্পদ। আসমাঈ যদি কবিতা, ভাষা ও সাহিত্য আয়ত্ত করা; ভাষা ও সাহিত্যে তোরা সমসাময়িক অন্য সকলকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর এতো মর্যাদা হয়ে থাকে, তাহলে তোমার কি মনে হয় যারা কুরআন, হাদিস ও ফিকাহ আয়ত্ত করবে এবং মানুষের মাঝে ফাতওয়া দিবে, পরস্পরের মাঝে সৃষ্ট বিবাদের মীমাংসা করবে তাঁদের মর্যাদা কতটা হবে? নিঃসন্দেহে সেটা তো আরো উত্তম; আরো মর্যাদাবান, কারণ একজন ইমাম, একজন ফকিহ- কবি ও সাহিত্যিকের চেয়ে অনেক অনেক উত্তম।
লোকটি আসমাঈর সামনে এসে দাঁড়াল, আর তখন তিনি তাঁকে বললেন, হ্যাঁ আমি তোমার কথাগুলো আমল করেছি, আমি আমার সকল কিতাব নিয়েছি, সেগুলো পড়েছি এবং বারবার পড়ে আয়ত্ত করেছি। অতঃপর তা মুখস্থ করে আমার অন্তরে স্থান দিয়েছি এবং এর উপর আমার সমস্ত ইচ্ছা-আগ্রহ চলে, আমার সময়কে হেফাযত করে বারবার তা পড়েছি এবং কঠোর পরিশ্রম করেছি।
অতঃপর সেখান থেকে যা বের হয়েছে তা তো তুমি দেখতেই পাচ্ছো। আল্লাহ তাআলা আমাকে এর বিনিময়ে দুনিয়াতে এই মর্যাদা দান করেছেন আর আখেরাতের মর্যাদাও তো আছেই। তখন সাজি-বক্তৃতা তাঁকে বলল, আমি তোমার কাছে একটি কাজ চাচ্ছি, আশা করি তুমি আমাকে একটা কাজ দেবে। তোমার সকল কিতাব একত্র করে আমাকে দাও, আর তার বিনিময়ে তোমাকে কিছু সাজি দেব; একথা বলার পরিবর্তে লোকটি তাঁকে বলছে, তোমার কাছে আমাকে একটা কাজ দাও। আসমাঈ বললেন, আমি তখন তাকে আমার একটা বাগানের প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত করলাম।
হে ভাই! আপনাদের সকলের প্রতি আমার একটা বার্তা হল।
لَا مُحْمِدُ الْمَرْأُ أَنْ كَهَلَ تَبْلُغُ وَلِعَدِ حَتَّى الْعَلْيَا الصَّيِّرَا সুতরাং যে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে চায়, তাকে অবশ্যই কোনো একটা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এবং সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে তার সামর্থ্যের পুরোটা দিয়ে কঠোর মেহনত করতে হবে। হোক তার লক্ষ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে চূড়ায় পৌঁছবে অথবা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বা ইলমের ক্ষেত্রে। তার লক্ষ্য যেটা-ই হোক তাকে চূড়ান্তভাবে মেহনত করতে সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে; তাহলেই সে ঐ বিষয়ের চূড়ায় পৌঁছতে পারবে।
হে ভাই, তুমি আজ যে হাফেযে কুরআনকে দেখো, মানুষ যার তেলাওয়াত শুনার জন্যে অপেক্ষা করে; যে দাদিকে দেখো, মানুষ ভালবেসে তাদের দাওয়াত দেয়; তাদের সম্মান করে। যে বস্তাকে দেখো, মানুষ তাঁদের ওযান শুনার জন্যে দূর-দূরান্ত থেকে এসে ভিড় জমায়, তারা কিন্তু এমনি এমনি এই স্তরে এসে পৌঁছায় নি; বরং এই স্তরে পৌঁছার জন্যে তাঁদের অনেক কষ্ট ও মেহনত-মুজ্বাহাদা করতে হয়েছে, তারপরই তারা এই স্তরে এসে পৌঁছেছে। আসমাঈ নিজ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছে। সে এর জন্যে অনেক মেহনত করেছে, অনেক সকালে ঘুম থেকে উঠেছে এবং রাত্রে দেরিতে ঘুমাতে গিয়েছে, তার বিনোদাপ সময়ই ইলম অর্জনের পিছনে ব্যয় করেছে এবং পড়াশোনার কাজে প্রায় পুরো সময়টাই ব্যয় করেছে। এর জন্যে ধৈর্যের সাথে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছে। নিজেকে অনেক প্রিয় চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত রেখেছে। মানুষের ঠাট্টা-উপহাস সহ্য করে ইলমের পিছনে লেগে থেকেছে। তারপরেই তো সে নিজ লক্ষ্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছে। আর আমরা এতো বছর পরও এই আসমাঈকে চিনি। তাঁর কথা আলোচনা হলে আমাদের অনেকেই তাঁকে চিনতে পারি।
সুতরাং, আমরা যদি তাঁর মত কোনো বিষয়ের চূড়ায় পৌঁছতে চাই তাহলে আমাদেরও তাঁর মত মেহনত-মুজ্বাহাদা করতে হবে, এবং দুঃখ- কষ্ট সহ্য করতে হবে। কেউ যদি শিক্ষা অর্জন করতে চায়, আলেম হতে চায়, ফকিহ হতে চায় বা অন্য কিছু হতে চায় তাহলে তাকেও তাঁর মত কোনো দিকে না তাকিয়ে লক্ষ্যপানে ছুটে যেতে হবে। সফল লোকদের সান্নিধ্য গ্রহণ করতে হবে এবং এমন লোকদের সাথে চলতে ও বন্ধুত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে যাঁরা তাকে লক্ষ্যে পৌঁছতে উৎসাহ দিবে; তার মনোবলকে কখনই ভেঙে দিবে না।
আল্লাহ তাআলার নিকট এই কামনা করি যে, তিনি আমাদেরকে কল্যাণ দান করবেন। এবং এসকল ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দান করবেন। নিশ্চয় ঘটনার সময়ের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা।
টিকাঃ
১. সূরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১১
📄 ভয় ও আশার মধ্যে থাকতে হবে
‘সে কি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবে?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের এই প্রশ্ন করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. হাওয়াজিনের যুদ্ধের মধ্যে রয়েছেন। হাওয়াজিন গোত্রের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় হয়। এই মাত্র যুদ্ধ শেষ হয়েছে, এদিক ওদিক যুদ্ধ নিহত মানুষের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে। হাওয়াজিন গোত্রের নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয়েছে। বন্দিদের সাথে কীধরণের আচরণ করা হবে সে বিষয়টা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বন্দি নারী ও শিশুদের মাঝে একটি মহিলা পাগলের মত দৌড়াচ্ছে এবং প্রতিটি শিশুর চেহারার দিকে তাকাচ্ছে।
যেখান থেকে কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ আসছে, সেদিকেই সে দৌড়ে যাচ্ছে, কোনো মহিলার কোলে কোনো শিশুকে দেখলে দৌড়ে তার কাছে গিয়ে তার চেহারা দেখে নিচ্ছে। একবার এক মহিলার কোলে একটি শিশুকে দেখে দৌড়ে তার কাছে যায় এবং তার কাছ থেকে শিউরে নিচে ভাল করে দেখে আবার তার কাছে ফিরিয়ে দেয়। যে কেউ মহিলাটির এই অবস্থা দেখলে বুঝতে পারবে যে, মহিলা কোলের শিশুকে খুঁজে পাচ্ছে না, সে তাকে দুধ খাওয়ানোর জন্যে অস্থির। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাটির এই অবস্থা দেখছিলেন।
অনেক খোঁজা-খুঁজির পর মহিলাটি বাচ্চাটিকে পেল, সে তাকে কাছে পেয়েই দুই হাত দিয়ে কিছুক্ষণ বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখলো, অতঃপর তাকে খুব আগ্রহ দিয়ে বুকের দুধ পান করালো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানের প্রতি মায়ের এই দয়া, দরদ ও মমতা দেখে সাহাবায়ে কেরাম রা. কে প্রশ্ন করলেন, এই মহিলাটি কি তার এই সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবে? সাহাবায়ে কেরام রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে তাকে কখনই আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবে না। সে তাকে কীভাবে আগুনে নিক্ষেপ করবে? সে তাকে কোলে নিয়েছে, বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে তাকে দুধ পান করিয়েছে। সে তাকে অনেক ভালবাসে, সবকিছুর চেয়ে বেশি মুহাব্বত করে। সুতরাং সে তাকে কিছুতেই আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
‘ঐ সত্তার কসম করে বলছি, নিশ্চয় এই ছেলের প্রতি এই মায়ের যতটা দয়া ও ভালবাসা রয়েছে, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাকে তার চেয়েও বেশি ভালবাসেন ও দয়া করেন।’
নিশ্চয় বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলা এই ছেলের প্রতি মায়ের চেয়েও বেশি দয়ালু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের এ ধরনের বিভিন্ন বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিভিন্ন বিষয় বুঝাতেন। কখনো কখনো বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তাঁদেরকে সজাগ ও সতর্ক করতেন, আবার কখনো কোনো নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। সুতরাং এখানে তিনি সাহাবিদেরকে বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে একথা বুঝাচ্ছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি এই মায়ের চেয়েও বেশি দয়ালু, তাই তোমরা কখনো তাঁর দয়া থেকে নিরাশ হয়ো না। তিনি বলেন:
‘ঐ সত্তার কসম করে বলছি, নিশ্চয় এই ছেলের প্রতি এই মায়ের যতটা দয়া ও ভালবাসা রয়েছে, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাকে তার চেয়েও বেশি ভালবাসেন ও দয়া করেন।’
আর এ কারণেই সালাফদের মধ্যে থেকে একজন বলেছিলেন, আমাকে যদি আল্লাহ তাআলা এই সুযোগ দেন যে, তুমি আল্লাহ অথবা তোমার মা এই দুই জনের যাকে দিয়ে খুশি তোমার (পরকালের) হিসাব নিতে পারো, তাহলে আমি আল্লাহ তাআলাকেই আমার হিসাবের জন্যে বেছে নিব, কারণ তিনি আমার মায়ের চেয়েও আমার প্রতি বেশি অনুগ্রহশীল।
এ বিষয়ে অন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি, আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, আমরা একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম, এমন সময় অতিশয় বৃদ্ধ এক লোক আসলো, বয়সের ভারে যার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, পিঠ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল, এবং তার মাথার চুলগুলো সব সাদা হয়ে গিয়েছিল, এই লোকটি তিন পায়ের উপর ভর করে আসলো, অর্থাৎ তার দুই পা ও এক লাঠির উপর ভর করে হাঁটছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এমন এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ালো, বয়সের ভারে যার চোয়ালের জাওয়াল ঝুলে পড়েছে। লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি এমন লোকের ব্যাপারে কী বলেন, যে সব ধরনের গুনাহ করেছে; কোনো গুনাহই ছাড়ে নি? তার মন যা চেয়েছে সে তাই করেছে। তার অপরাধ ও গুনাহগুলো যদি পৃথিবীর সকল মানুষকে ভাগ করে দেওয়া হয়, তাহলেও তাদের সকলকে তা ঢেকে নিবে। এই লোকটির কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তার দিকে চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, আপনি কি ইসলাম গ্রহণ করেছেন? লোকটি বলল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে আপনার সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়েছে। সে বলল, আমার প্রচারণা ও আমার পাপ কাজগুলো সবই কি ক্ষমা করা হয়েছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ আপনার প্রচারণা ও পাপ কাজগুলোর সবই ক্ষমা করা হয়েছে। এরপর লোকটি তার লাঠির উপর ভর করে আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার বলতে বলতে চলে গেল। লোকটি অফুরন্ত দু’আ ও তাওবার অধিকারী ছিল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সুসংবাদদাতা; তিনি নিরাশাকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সহজকারী; তিনি কঠোর বা অনমনীয় ছিলেন না। তিনি মানুষকে আল্লাহর রহমতের আশা দেখাতেন। তিনি মানুষের পথ থেকে দয়া ও আশার দরজা বন্ধ করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন:
‘নিশ্চয় তোমরা সহজকারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছো; কঠোরতা আরোপকারী হিসেবে নও।’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুয়ায ইবনে জাবাল ও আবু মূসা আশআরী রা. কে ইয়ামানে পাঠালেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেন:
‘তোমরা মানুষকে সুসংবাদ দিবে, আশা দেখাবে; কখনো উপেক্ষা করে নিরাশ করবে না।
অর্থাৎ তোমরা মানুষকে সুসংবাদ দাও, তাদেরকে আল্লাহর দয়া, রহমত ও মুমিন বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালবাসার কথা বলবে। তাদেরকে নিরাশ করবে না দূরে ঠেলে দিবে না। তাদের সাথে নরম ও সহজ ব্যবহার করবে; কখনো কঠোর ও শক্ত ব্যবহার করবে না। তাদের সাথে নরম ও দয়ার সাথে কথা বলবে; কখনো মতানৈক্য যাবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে মানুষ নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী রয়েছে। অর্থাৎ এমন মানুষ রয়েছে যারা মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তাদেরকে ভয় দেখিয়ে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখে।
কিন্তু হাদিসে উল্লেখিত আতঙ্ক সৃষ্টিকারী বলে কাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে? তোমরা প্রথমে শুনে রাখো যে, এখানে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী বলে কাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, অতঃপর নিজেদের উপর তা যাচাই করে দেখো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
‘নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী রয়েছে, সুতরাং তোমাদের দ্বারা জনগণের দায়িত্বরত থাকবে তারা যেন তাদের সাথে সহজ ব্যবহার করে।’
অনেক মানুষ আছে যারা লম্বা-চওড়া সালাত আদায় করে; কিন্তু লম্বা-চওড়া সালাত আদায় করেও মানুষের দীনের ব্যাপারে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী হতে পারে, দীন থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখতে পারে! ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে তোমার কী মনে হয়, যে ঠিকমত ফরযের হুকুম আদায় করে না? সে কি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নয়? সে কি মানুষকে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখছে না? যে ব্যক্তি অনুভূতিহীনদের সামনে জরুরি কথা থাকে, তাদের সাথে গোঁয়া মুখে কথা বলে, সে কি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নয়? সে কি মানুষকে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখছে না? যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর সাথে ভাল ব্যবহার করে না, তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে, হোক সে প্রতিবেশী মুসলিম বা অমুসলিম, সে কি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নয়? সে কি মানুষকে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখছে না? যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তাকে তার হক ঠিকমত আদায় করে না, সে কি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নয়? সে কি মানুষকে দীন থেকে ফিরিয়ে রাখছে না? হে ভাই! এর মাধ্যমে ইসলাম নিয়ে কথা বলার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিরোধী শক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে। মানুষ দীনকে যত বেশি আঁকড়ে ধরবে, সে তত বেশি আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করবে। আল্লাহর রহমত সুপ্রশস্ত। তবে তোমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা যেমন দয়ালু, ঠিক তেমনিভাবে তিনি কঠোরও।
মূসা আ.-এর সময় বনি ইসরাইলের এক লোকছিলো, যে মূসা আ.কে অনেক কষ্ট দিতো। ফল মূসা আ. আল্লাহ তাআলার কাছে অভিযোগ করে বলল, হে আমার প্রতিপালক! এই লোকটা আমাকে অনেক কষ্ট দেয়, আমার দাওয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, সব জায়গায় সে আমাকে নিয়ে ছিদ্রান্বেষণ করে, আমাকে অপমান করে। হে আমার প্রতিপালক! সে আমাকে অনেক কষ্ট দেয়, সুতরাং আপনি তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করুন। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, হে মূসা! আমি তাকে শাস্তির ক্ষমতা তোমার হাতে দিয়ে দিলাম; তুমি যখন চাইবে আকাশকে আদেশ করবে, আকাশ তার উপর প্রচুর-বৃষ্টি বর্ষণ করে তাকে ধ্বংস করে দিবে। অথবা জমিনকে আদেশ করবে, জমিন তাকে গিলে ফেলবে। এরপর কয়েক দিন পর রাস্তায় মূসা আ.-এর সাথে লোকটির দেখা হল আর লোকটি তাঁকে দেখে গালিগালাজ শুরু করে দিল। মূসা আ. তখন রাগান্বিত হয়ে জমিনকে বললেন, হে জমিন! তুমি তাকে পাকড়াও করো। তখন জমিন লোকটির টাখনু পর্যন্ত ভিতরে নিয়ে নিলো। তখন লোকটি বলতে লাগলো, হে মূসা! আমি তাওবা করছি, আমাকে রক্ষা করো, আমাকে উদ্ধার করো। মূসা আ. বললেন, জমিন! তাকে পাকড়াও করো। এবার জমিন আরেকটু ফাঁকা হল এবং তার হাঁটুর পর্যন্ত ভিতরে নিয়ে নিলো। লোকটি আবার বলল, হে মূসা! আমি তাওবা করেছি আমাকে রক্ষা করো, আমাকে উদ্ধার করো। মূসা আ. বললেন, জমিন! তাকে পাকড়াও করো।
এবার জমিন আরেকটু ফাঁকা হল এবং তার কোমর পর্যন্ত ভিতরে নিয়ে নিল। এরপর বুক পর্যন্ত, আর লোকটি চিৎকার করতেছিল, এরপর সম্পূর্ণ তাকে মাটির নিচে গিলে গেল আর লোকটি মারা গেল। তখন আল্লাহ তাআলা মূসা আ.-এর নিকট ওহী প্রেরণ করে তাঁকে বললেন, হে মূসা! তোমার হৃদয় এতটা পাষাণ! আমার ইজ্জতের কসম করে বলছি, সে যদি আমার কাছে সাহায্য চাইতো আমি তাকে সাহায্য করতাম।
আমাদের রব আল্লাহ তাআলা অনেক দয়ালু; কিন্তু তিনি শাদিদুল ইক্বাব অর্থাৎ শাস্তি দানে কঠোরও বটে। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুহ আ.-এর সময় তুফানে ডুবে যাওয়া এক নারী ও তার সন্তানের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। সেখান থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা মহাপরাক্রমশালী, তিনি যখন অসন্তুষ্ট হন, ক্রুদ্ধও হন।
নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুহ আ.-এর সময় তুফানে ডুবে যাওয়া এক নারী ও তার সন্তানের ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। নূহ আ. আপন প্রতিপালকের নিকট দোয়া করলেন; যেমনিভাবে কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে:
قِيلَ يَا أَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَا سَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِيِّ وَقِيلَ بُعْدًا لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ تَبَارَكْتَ يَا بَيْنَا وَيَا بَيْنًا وَيَا مُغْنَى مَنْ كَانَ فَقِيرًا
'অতঃপর সে তাঁর পালনকর্তাকে ডেকে বললো, আমি অক্ষম, অতএব তুমি প্রতিবিধান করো। তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে। এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সব পানি মিলিত হল এক পরিকল্পিত কাজে। আমি নূহকে আরোহণ করালাম এক কাঠ ও পেরেক নির্মিত জলযানে। যা চলতো আমার দৃষ্টির সামনে। যা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিলো এটা ছিলো তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ।'
এভাবেই কুরআনে কারিমে নূহ আ.-এর কওমের ডুবে যাওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। অন্য আয়াতে তুফানটির ভয়াবহতা এভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا لَمَّا طَغَى الْمَاءُ حَمَلْنَاكُمْ فِي الْجَارِيَةِ
'যখন জলোচ্ছ্বাস হয়েছিলো, তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম।'
জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে আপনারা সকলেই তো জানেন। যখন জলোচ্ছ্বাস হয় তখন তা সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, গাছপালা উপড়ে ফেলে, বাড়িঘর চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়, পথের গাড়ি-ঘোড়াগোলোকে ভাসি নিয়ে যায়, চারপাশের সবকিছুকে শিকড়ের খোলামার মত লন্ডভন্ড করে দেয়। মানুষজন কাঁদতে থাকে, ধিক্কার করতে থাকে, সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকে, কেউ গাছের ডালে ঝুলে থাকে, কেউ কারেন্টের খুঁটা ধরে থাকে, কেউ পাহাড়ের ঊর্ধ্বে আর পানি তাদের সকলকেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই তুফানকেই 'তাগাল মা' ( طَغَى الْمَاءُ জলোচ্ছ্বাস হয়েছে) দ্বারা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا لَمَّا طَغَى الْمَاءُ حَمَلْنَاكُمْ فِي الْجَارِيَةِ
'যখন জলোচ্ছ্বাস হয়েছিলো, তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম।'
অর্থাৎ যখন জলোচ্ছ্বাস হল তখন আমি তোমাদেরকে নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম, তখন ঢেউ তাকে নিয়ে ডানে বামে কাত করাছিলো আর তোমাদের রবই তখন সেটাকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِنَجْعَلَهَا لَكُمْ تَذْكِرَةً وَتَعِيَهَا أُذُنٌ وَاعِيَةٌ
যাতে এ ঘটনা তোমাদের জন্য স্মৃতির বিষয় এবং কর্ণ এটাকে উপদেশ গ্রহণের উপযোগী হিসেবে গ্রহণ করে।'
অবশ্যই এটা একটা উপদেশবাণী। এখানে অনেক উপদেশ রয়েছে, আমি এখন আপনাদের সামনে সেই ঘটনাটি বর্ণনা করবো। আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের নিকট নূহ আ.-এর ঘটনা উল্লেখ করেন, অতঃপর তিনি এক নারীর ঘটনা বলেন, যে নূহ আ.-এর সম্প্রদায় থেকে বের হয়ে গিয়েছিলো আর তুফান তখন ক্রমশ বাড়ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ
'তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে। এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সব পানি মিলিত হল এক পরিকল্পিত কাজে।'
অর্থাৎ আসমান বিরামহীনভাবে মুষল ধারে বৃষ্টি বর্ষণ করতে ছিলো, মরুভূমি পাহাড়-পর্বত সব জায়গায় বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিলো। এবং ভূমি থেকে ঝর্ণার মাধ্যমে পানি বেরোচ্ছিলো। فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ অর্থাৎ পানি মিলিত হল এক পরিকল্পিত কাজে।
যখন তুফান শুরু হল, এক মহিলা নিজ সন্তানকে নিয়ে দৌড়াচ্ছিল আর একদিক সেদিক একটি আশ্রয়স্থল খুঁজছিলো, অতঃপর সে একটি পাহাড় দেখতে পেয়ে সন্তানকে নিয়ে পাহাড়ে আরোহণ করল। এদিকে পানি বাড়তে বাড়তে একসময় পর্বতচূড়ায় মহিলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর শিশুটির মাথা পর্যন্ত পানি চলে আসে, তখন মহিলাটি বাচ্চাকে কোলে নেয়। অতঃপর পানি যখন মহিলাটির বুক পর্যন্ত পৌঁছে তখন সে ছেলেকে মাথার উপরে নেয়, অতঃপর পানি যখন মাথার পর্যন্ত পৌঁছে তখন সে বাচ্চাকে দুই হাতের উপর রেখে উচ্চা করে ধরে রাখে এবং পানি বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে মহিলা ও ছেলেকে ডুবিয়ে দেয়। এরপর নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা যদি নূহ আ.-এর সম্প্রদায়ের কারো উপর দয়া করতেন, কাউকে রক্ষা করতেন, তাহলে তিনি এই মহিলা ও তার সন্তানকে রক্ষা করতেন; কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন:
كُذِّبُوا بِآيَاتِنَا فَأَخَذْنَاهُمْ أَخْذَ عَزِيزٍ مُقْتَدِرٍ
'তারা আমার সকল নিদর্শনের প্রতি মিথ্যাচারোপ করেছিলো। সুতরাং আমি পরাভূতকারী, পরাক্রমশালীর মতো তাদেরে পাকড়াও করেছিলাম।'
হে ভাই! আমরা জানি আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি আমাদের মা- বাবার চেয়েও আমাদের প্রতি দয়াশীল; কিন্তু এই বুঝ যেনো আমাদেরকে তাঁর নাফরমানির দিকে নিয়ে না যায়। একজন সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকবে আর বলবে, আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি আমাদের মা-বাবার চেয়েও আমার প্রতি দয়াশীল!! একজন ঘুষ খাবে আর বলবে, আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি আমাদের মা-বাবার চেয়েও আমার প্রতি দয়াশীল!! একজন অন্যায়ভাবে মানুষের হক মেরে দেবে, তার মাল চুরি করবে, তার মাল জোর করে নিয়ে খেয়ে ফেলবে, তার কাছ থেকে ধারে নিয়ে, পরে আর তা ফেরত দিবে না আর বলবে, আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি মা-বাবার চেয়েও আমার প্রতি দয়াশীল!! অসম্ভব। হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা দয়াশীল ও ক্ষমাশীল; কিন্তু তোমার জন্য আবশ্যক হল তুমি তাঁর নাফরমানির মাধ্যমে তাঁর এই দয়া ও ক্ষমাপ্রতিভাকে প্রতিহত করবে না। আর এ কারণেই উলামায়ে কেরাম বলেন, বান্দার জন্য আবশ্যক হল যে, সে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের আশা করবে এবং সর্বদা এই ভয়ে থাকবে যে, তার মাধ্যমে যেনো আল্লাহ তাআলার কোনো নাফরমানি না হয়ে যায়। আর এ কারণেই নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় গুনাহের পূর্বে ছোট গুনাহ থেকে সতর্ক করেছেন।
খায়বারের যুদ্ধ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিগণ ফিরে আসছেন, পথে এক উপত্যকায় যাত্রা-বিরতি করলেন। এক বালক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থাকলেন এবং খেদমত করতেন, অতঃপর যাত্রা-বিরতি শেষে তাঁরা যখন সেখান থেকে রওনা হওয়ার ইচ্ছা করলেন তখন বালকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটের পিঠে জিব (আসন) বাঁধতে ছিলো, এমন সময় দূরে কোথাও লুকিয়ে থাকা কাফেরদের অজ্ঞাত একটি তীর এসে বালকটির শরীরে বিদ্ধ হল আর তখন তার ইন্তেকাল হয়ে গেল। তখন সাহাবায়ে কেরাম তাকবির দিয়ে উঠলেন এবং বললেন, আল্লাহ আকবার! জান্নাতে তাঁকে স্বাগতম! শহিদ হিসেবে তাঁকে স্বাগতম! একজন বালক ছেলে বাড়ি-ঘর, পিতা-মাতা ত্যাগ করে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতরত অবস্থায় কাফেরের তীরের আঘাতে শহিদ হয়েছে!! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন:
'কখনই নয়! আল্লাহর শপথ সে গণিমতের মাল থেকে যে চাদর চুরি করেছে তা তার উপর জাহান্নামের আগুন জ্বালিয়ে দিবে।'
অর্থাৎ গণিমতের মাল বন্টন করার পূর্বে সে যে চাদরটি কারো কাছে না বলে নিয়ে নিয়েছে, কবরে তা তার উপর জাহান্নামের আগুন জ্বালিয়ে দিবে, এ কারণে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক লোক একটি বা দুইটি জুতা বা জুতার ফিতা নিয়ে এলো এবং তাঁকে বললো, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এই নিন, এগুলো আমি গণিমতের মাল থেকে নিয়েছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন:
'একটি জুতার ফিতাও জাহান্নামের অংশ অথবা দুইটি জুতার ফিতাও জাহান্নামের অংশ।'
এ সকল ঘটনা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলার ব্যাপক দয়া, রহমত ও মাগফিরাতের কথা; এজন্যে আলোচনা করা হয়েছে যাতে করে বান্দা তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তাআলাও বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
'বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর জুলুম-অবিচার করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।'
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার রহমত ব্যাপক ও বিস্তৃত; কিন্তু আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, তিনি শাস্তিদানেও প্রবল ও কঠিন। সুতরাং তাঁর রহমতের অধিক আশা আমাদের যেনো তাঁর নাফরমানির দিকে নিয়ে যা যায়। অর্থাৎ আমাদের এ দুইটা তথ্য-আল্লাহর রহমত ও তাঁর কঠোরতা উভয়েরই মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। অর্থাৎ মানুষকে আল্লাহর রহমতের আশায় বাণীও শুনাতে হবে, সাথে সাথে তাকে আল্লাহর শাস্তির ভয়ও দেখাতে হবে। যেমন এক লোক আল্লাহর নাফরমানি করতে করতে নিজের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে, সে বলছে- আমি এতো গুণাহ করেছি যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে আর মাফ করবেন না। তখন তাকে আল্লাহর রহমতের কথা শুনাতে হবে, ঐ মহিলার কথা বলা হবে যার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের বলেছিলেন, সে কি তার এই ছেলেকে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারবে? ঐ বৃদ্ধের ঘটনা শুনাতে হবে যে লাঠির উপর ভর করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসেছিল, এবং সে বলেছিলো, আমার প্রতারণা ও পাপাচারও কি ক্ষমা করা হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন, হাঁ আপনার প্রতারণা ও পাপাচারও ক্ষমা করা হবে। সাথে সাথে আমরা যদি এমন লোক দেখি, যে এই বলে বলে আল্লাহ তাআলার নাফরমানিতে লিপ্ত হচ্ছে- আল্লাহ তাআলা তো গফুরুর রহীম। এই লোককে বনি ইসরাইলের সেই নারী ও তার শিশুর ঘটনা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম বালকের ঘটনা শুনাতে হবে।
আল্লাহ তাআলার নিকট এই প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাদের সকলকে তাঁর রহমতের চাদরে আচ্ছাদিত করুন এবং আমাদের সকল অপরাধ ক্ষমা করুন, এবং আমাদেরকে হকের উপর অটল-অবিচল রাখুন। আমিন।
টিকাঃ
১. সূরা কামার, আয়াত: ১০-১৪
২. সূরা হাক্কাহ, আয়াত: ১১
১. সূরা হাক্কাহ, আয়াত: ১১
২. সূরা হাক্কাহ, আয়াত: ১২
১. সূরা কামার, আয়াত: ১১-১২
২. সূরা কামার, আয়াত: ৪২
১. সূরা যুমার: ৫৩