📄 অহংকার ও প্রবঞ্চনা মানবসত্তাকে কুফরির দিকে ঠেলে দেয়
বর্তমানে আমাদের মধ্যে অহংকার, প্রবণতা ও আভিজাত্য কঠিনভাবে বাসা বেঁধেছে; কিন্তু আমরা জানি না যে, এই অহংকার ও প্রবণতা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। মানুষ যে সকল কারণে কাফের হয়ে মৃত্যুবারণ করে অহংকার তার মধ্যে অন্যতম। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: 'যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' অন্য হাদীসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: কিয়ামতের দিন অহংকারীদের ছোট পিপড়ার আকারে উত্থিত করা হবে। যারা মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হবে।
এখানে উমর রা.-এর খিলাফতকালে ঘটে যাওয়া অহংকার সম্পর্কে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করছি।
একবার এখানকার গাসসানাদের বাদশাহ ঘটনা আলোচনা করবো। গাসসান জামিয়াতুল আরবের দক্ষিণে অবস্থিত একটি বুস্টান অনুভূমিতে এলাকা। উমর রা.-এর খিলাফতের সময় গাসসানাদের এক শাসক মদিনায় আগমন করলো। লোকটি ঘোড়ার চড়ে ও অনেক লোক আর সৈন্যদের থেকে অহংকারের সাথে মদিনায় প্রবেশ করলো। সে মদিনায় এসেছে উমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে। যখন সে উমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করলো তখন তার মাথায় ছিলো স্বর্ণের মুকুট আর গায়ে ছিলো রেশমী পোশাক। উমর রা. তাকে ইসলাের দাওয়াতও দিলেন। লোকটির নাম ছিলো জাবালা ইবনুল আইহাম। তখন ইসলাম গ্রহণ করে সে মুসলমান হয়ে গেল। ইসলাম গ্রহণের পর উমর রা. তাঁকে স্বর্ণের মুকুট আর রেশমী পোশাক খুলে ফেলতে বললেন এবং মুসলমানদের জন্যে বৈধ পোশাক পরিধান করতে বললেন। লোকটি সেগুলো খুলে ইসলামি পোশাক পরিধান করলো, অতঃপর সে উমারা পালনের ইচ্ছা করলো এবং উমর রা. তাঁকে উমরার নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দিলেন এবং ইহرامের বিষয়টা বুঝিয়ে দিলেন। তখন সে ইহরাম পরিধান করে তালবিয়া পড়ে মক্কায় প্রবেশ করলো; কিন্তু তার অন্তরে তখনও অহংকার ও আভিজাত্যমানের কিছু অংশ বাকি ছিল।
সে মানুষের সাথে সাথে তালবিয়া ............ لبيك اللهم لبيك লা শারিক লাك لبيك পড়তে পড়তে মক্কার আসলো এবং কাবার চতুর্পার্শ্বে তাওয়াফ শুরু করলো। কাবা তখন বর্তমানের মত এত বিশাল আয়তনের ছিলো না এবং তা বহু উঁচুও ছিলো না; পূর্বে কাবার ছিলো পুরোনো একটি গৃহ এবং আয়তন ছিলো অনেক ছোট। তখন কাবার পাশে বিভিন্ন বিভিন্ন কিছু বিক্রি করতো অর্থাৎ কাবার পাশেই ছিলো বাজার। জাবালা ইবনে আইহাম কাবার চতুর্পার্শ্বে তাওয়াফ করতে লাগলো। উমর রা.ও তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। ভিড়ের মধ্যে তাওয়াফের সময় অসতর্কতাবশত এক বেদুইনের পা জাবালা ইবনে আইহামের চাদরের কোণায় লাগলো। এতে জাবালা ইবনে আইহাম অনেক রেগে গেল, সে চোখ বড় বড় করে বেদুইন লোকটির দিকে তাকাল এবং আমার চাদরে পাড়া দিলি কেনো একথা বলে তার চেহারার উপর জোড়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। যাতে বেদুইন লোকটির চোখ অন্ধ হওয়ার উপক্রম হল। বেদুইন লোকটি মনে মনে বলল, আমরা এখন আল্লাহ্র ঘরে আল্লাহ্র সামনে আছি। সুতরাং আমি কি হারাম্বের ভিতর এই লোকটির গালে থাপ্পড় দিবো? বেদুইন লোকটি জানতো এখানে একজন বিচারক আছে, তাই সে তাকে কোনো আঘাতও না করে বিষয়টি বিচারকের দরবারে উপস্থাপন করার জন্য গেল।
বেদুইন লোকটি উমর রা.-এর নিকট গিয়ে বলল, হে ওমর! জাবালা ইবনে আইহাম আমার চেহারায় এত জোড়ে থাপ্পড় দিয়েছে যে, আমার চোখ প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। উমর রা. তখন জাবালা ইবনে আইহামকে ডাকলেন। অতঃপর বিচার মজলিস কায়েম হল। ইসলােমে বিচারের ক্ষেত্রে সবাই সমান, বড়-ছোট, ধনী-গরিব সকলেই সমান, কারো মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এবিষয়ে এখানে আরো একটি চমৎকার ঘটনা বলে দিচ্ছি। আলি ইবনে আবু তালব রা. তখন আমিরুল মুমিনিন, খলিফাতুল মুসলিমিিন। তিনি একদিন বাজারে গেলেন এবং এক ইহুদিকে চাল বিক্রি করতে দেখলেন। চালটি দেখে আলি রা. কিনে ফেললেন। এটি তরির চাল, কোনো এক যুদ্ধের সময় তার হাত থেকে এটি পড়ে গিয়েছিল। পরে তিনি তা আর খোঁজ পান নি। আলি রা. তখন ইহুদি লোকটিকে বললেন, মনে হচ্ছে এটি আমার চাল। ইহুদি বললো, না এটা আপনার চাল নয়। আপনার কিনতে মনে চাইলে এটা কিনে নিতে পারেন। আলি রা. বললেন, আমি আমিরুল মুমিনিন, মিথ্যা বলা আমার জন্য জায়েয নেই। বরং এটি আমারই চাল। ইহুদি বললো, না এটা আপনার চাল নয়। অতঃপর তারা দুজনে কাবার নিকট অভিযোগ নিয়ে গেল। হ্যাঁ, ঘটনাটি যখন ঘটেছে তখন সময়টা ছিলো আলি রা.-এর খেলাফতের সময়!! তিনি তখন খলিফাতুল মুসলিমিন।
কাবার দরবারে আলি রা. গিয়ে বসে পড়লেন আর ইহুদি লোকটি তার চাল নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কাবি বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি আপনার প্রতিপক্ষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। আলি রা. তখন ইহুদির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কাবি তাঁকে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! বলেন আপনার অভিযোগ কী? আলি রা. বললেন, এই চালটি আমার চাল, অমুক যুদ্ধে আমার কাছ থেকে তা পড়ে গিয়েছিল। ইহুদি লোকটি বলল, না এটা আমার চাল, এটা আমি কিনেছি এবং আমি এখন এটা বিক্রি করতে চাই। কাবি বলল, হে আমিরুল মুমিনিন আপনার পক্ষে কোনো সাক্ষী আছে? আলি রা. বললেন, আমার ছেলে হাসান আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। কাবি বললেন, বাবার পক্ষে ছেলের সাক্ষ্য আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আপনার কি অন্য কোনো সাক্ষী আছে? তিনি বললেন, না। কাবি বললেন, তাহলে আমি চালটি ইহুদি লোকটিকে দেওয়ার ফায়সালা করছি। ইহুদি যখন এমন ফায়সালা দেখলো তখন সে একবার আলি রা.-এর দিকে তাকায়, একবার কাবির দিকে তাকায়। তখন সে বললো, এই ধর্মের বিচার একটা ইনসাফপূর্ণ!! কাবি আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে একজন ইহুদির পক্ষে ফায়সালা করছে!! যে কিনা বিশ্বাস করে উজাইর আল্লাহর পুত্র। আল্লাহ তাআলা দরিদ্র, আল্লাহরও বার্তা রয়েছে। সেই ইহুদির পক্ষে স্বয়ং আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে ফায়সালা করছে!! ইহুদি এই দৃশ্য দেখে সাথে সাথে কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন, এবং বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! নিন এটি আপনারই চাল, অমুক যুদ্ধে এটা আপনার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল, আপনি চলে যাওয়ার পর আমি তা নিয়ে গিয়েছিলাম। আলি রা. তখন বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করেছো, সুতরাং আমি এটা তোমাকে হাদিয়া দিলাম, নাও এটা এখন থেকে তোমার, অতঃপর তিনি চালটি তাঁকে দিয়ে দিলেন।
ইসলামে বিচারের ক্ষেত্রে সকলে সমান। এখানে দুর্বলের উপর সবলের পক্ষে অন্যায়ভাবে ফায়সালা করা হয় না। এখানে সবাই সমান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
"তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ধ্বংস হওয়ার কারণ হল, যখন তাদের সম্ভ্রান্ত কেউ চুরি করতো তখন তারা তাকে ছেড়ে দিতো। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করতো তখন তারা তার উপর দণ্ডবিধি আরোপ করতো।"
বলছিলাম গ্রাম্য লোকটি জাবালা ইবনে আইহামার সাথে আমিরুল মুমিনিন ওমর রা.-এর সামনে দাঁড়ালো। ওমর রা. বললেন, হে জাবালা! তুমি কেনো তাকে থাপ্পড় দিয়েছো? জাবালা বললো, সে তার পা দিয়ে আমার চাদর মাড়িয়েছে। ওমর রা. তাকে বললেন, এক লোক ভুল করে তোমার চাদর মাড়িয়েছে আর তুমি সকলের সামনে তাকে থাপ্পড় দিয়েছো? এখানে তো অন্য কোনোভাবেও তার সংশোধন করা যেতো। এভাবে সকলেই যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তাহলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বেঁধে যাবে এবং সমাজ আবার পূর্বের জাহিলিয়াতের দিকে ফিরে যাবে। পরস্পরের মাঝে রক্তারক্তি আর খুনোখুনি শুরু হয়ে যাবে। হে জাবালা! এখন ফয়সালা হল, এই লোকটি ও ঠিক তোমাকে সেভাবেই থাপ্পড় দিবে তুমি যেভাবে তাকে থাপ্পড় দিয়েছো। সে আমাকে থাপ্পড় দিবে অথচ আমি একজন রাজা? ওমর রা. বললেন হ্যাঁ, তুমি রাজা হলেও সে তোমাকে থাপ্পড় দিবে। তবে ভিন্ন আরেকটি ব্যবস্থা রয়েছে আর তা হল তুমি এই লোকটিকে সন্তুষ্ট করে তার কাছ থেকে ক্ষমা আদায় করে নিবে। তুমি তার হাত ধরো, তার কপালে চুমো খাও, অতঃপর তাকে বলো, ভাই আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর সে যদি তোমাকে ক্ষমা করে তাহলে বিষয়টি এখানেই শেষ। আর সে যদি তোমাকে ক্ষমা না করে তাহলে কিসাস নিতে হবে। জাবালা ইবনে আইহামা বললো, আমি আগামীকাল আসবো, তখন সে আমার থেকে কিসাস নিবে এবং আমাকে মারবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসাসের আদেশ দিতেন। এমনকি রহমাতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের থেকেও কিসাস নিতে বলতেন। বদরের যুদ্ধের দিন, তখনো যুদ্ধ শুরু হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের শৃঙ্খলার জন্য মুসলমানদের কাতার সোজা করছেন। একেক জন এগিয়ে যাচ্ছেন, ওকে পিছিয়ে দিচ্ছেন। সাওয়াদ ইবন দাজিয়া রা. বদরের যুদ্ধে শাখাদারের সৌভাগ্যপ্রাপ্ত সাহাবিদের একজন তিনি বারবার কাতারের সামনে এগিয়ে আসছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে পিছিয়ে দিছেন আর তিনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে একটি লাঠি ছিল। তিনি সেটা দিয়ে সাওয়াদ রা.-এর পেটে গুঁতা দিয়ে বললেন, সাওয়াদ পিছিয়ে যাও। সাওয়াদ রা. তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, আমার থেকে কিসাস নাও। সে বললো, আপনার লাঠি দিন। তিনি তাঁকে লাঠি দিলেন। অতঃপর সে বললো, আপনার পেট থেকে কাপড় সরান, তাহলে আমি আপনাকে আঘাত করবো যেমন আমাকে আঘাত করার সময় আমার পেটের উপর কাপড় ছিলো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন পেটের উপর থেকে কাপড় সরালেন আর তখন সাওয়াদ ইবন দাজিয়া রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জড়িয়ে ধরে তাঁর পেটের উপর চুমু খেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন সাওয়াদ! এমনটি করলে কেনো? সাওয়াদ রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন যে, যুদ্ধ তো শুরু হয়েই গেছে। তাই আমি চাইলাম সর্বশেষ আপনাকে স্পর্শ করি।
বলছিলাম জাবালা ইবনে আইহামা এটা মেনে পারছিলো না যে, তাকে একজন গ্রাম্য লোক থাপ্পড় দিবে। তাই সে বলল, আমি আগামীকাল আসবো। সে কি আগামীকাল এসেছিল? পরদিন ওমর রা. তাদের বিচারটা শেষ করার জন্য জাবালার জন্য অপেক্ষা করছিলেন; কিন্তু জাবালা আসলো না, সে এর পূর্বেই বাহনে আরোহণ করে তার সাথীদের নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে শামের দিকে রওয়ানা হয়ে গেছে এবং আবার তার দেশে গিয়ে খৃস্টান ধর্মে ফিরে গেছে। এবং
قُلْ هُوَ اللّٰهُ أَحَدٌ اَللّٰهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَّهُ كُفُوًا اَحَدٌ
'বলুন তিনি আল্লাহ এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।' এটা বলার পরিবর্তে সে বলছে খোদ্যা তিনজন। ঈসা আ. আল্লাহর পুত্র। এভাবেই খৃস্টান অবস্থাতেই সে বৃদ্ধ হয়ে গেল। এবং বৃদ্ধ বয়সে এসে সে একটি কবিতা রচনা করল।
'একটি খাম্বার লজ্জার সত্ত্বেও লোকটি খৃস্টান হয়ে গেল। আমার কী ক্ষতি হতো যদি আমি ধৈর্য ধারণ করতাম?'
'আমার অহংকার ও আত্মঅভিমান আমাকে শেষ করে দিল। এই অহংকারের কারণেই আমি সুস্থ চক্ষু বিক্রি করেছি অন্ধ চক্ষুর বিনিময়ে'
'হায়! আমার মা যদি আমাকে জন্মাই না দিত। হায়! আমার দুর্ভাগা, আমি যদি ওমরের কথায় ফিরে যেতাম।'
'হায়! আমি যদি শামার সাবাররণ কোনো নাগরিক হতাম। শ্রবণশক্তি আর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে বসে আছি।' লোকটি এই কবিতা বারবার আবৃত্তি করতো এবং সে একথাও বলতো, হায়! আমি যদি খৃস্টান হওয়ার পরিবর্তে অসহায় মিসকিন হয়ে কোনো নির্জন প্রান্তরে মেষ বা উট চড়াতাম! অতঃপর লোকটি এভাবে খৃস্টান অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করলো। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। এই লোকটি খৃস্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করার কী? একমাত্র অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনাই তাকে বেইমান করে মৃত্যুবরণ করালো। সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নতিস্বীকার করেনি, অহংকার করে আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই মৃত্যুর সময় তার ইমান নসিব হয়নি।
অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার সমস্যা হল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা মানুষকে হক ও সত্য গ্রহণে বাধা প্রদান করে। কত মানুষ যে রয়েছে অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার কারণে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে। আবার অনেক মানুষ শুধু বিনয় ও নম্রতার কারণেই হক গ্রহণ করতে পেরেছে। কত মানুষকে হকের দিকে আহ্বান করা হয়েছে কিন্তু তারা হককে হক হিসেবে জানার পরও শুধুমাত্র অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার কারণে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে।
উদাহরণস্বরূপ আবু জাহেলের কথাই বলি। আবু জাহেল ছিল এই উম্মতের ফিরাউন। একবার এক সাহাবি আবু জাহেলের সাথে সাক্ষাৎ করলো। লোকটির উদ্দেশ্য ছিলো আবু জাহেলকে ইসলামে দাওয়াত দেওয়া। সে বলল, হে আবুল হিকাম! তোমাকে একটি প্রশ্ন করি, তুমি কি জানো না যে, মুহাম্মাদ হকের উপরে আছে? আবু জাহেল বলল, না না সে বাতিলের উপর আছে, সে মিথ্যাবাদী সে প্রতারক। লোকটি আবার তাকে প্রশ্ন করলো, সত্যি করে বলো দেখি আমার সাথে মিথ্যা বলবে না। আবু জাহেল বলল, আমি জানি যে, সে সত্যের উপরেই আছে আর আমরা যে মূর্তির পূজা করছি তা আমাদের কোনো উপকার করতে পারবে না। লোকটি তখন তাকে প্রশ্ন করলো, তাহলে তুমি সত্য দ্বীন গ্রহণ করছো না কেনো? আবু জাহেল বলল, আমরা বানু মাখযুম গোত্র আর আবদে মানাফ গোত্র সর্বদা কুরাইশের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য প্রতিযোগিতা করেছি। তারা যদি মানুষকে খাবার খাওয়াতো তাহলে আমরাও খাবার খাওয়াতাম, তারা যদি মানুষকে পানি পান করাতো তাহলে আমরাও পানি পান করাতাম। অর্থাৎ আমরা প্রতিযোগিতার ঘোড়ার মত একবার এটা আগে আরেকবার ওটা। এখন আবদে মানাফ গোত্রে নবি আসল আমরা নবি কোথায় পাবো? এটা যদি খাবার খাওয়ানোর কোনো বিষয় হতো তাহলে আমরাও খাবার খাওয়াতাম, এটা যদি পানি পান করানোর মত কোনো বিষয় হতো তাহলে আমরাও পানি পান করাতাম; কিন্তু এটা তো পানি পান করানো বা খাবার খাওয়ানোর মত কোনো বিষয় না। এটা হল নবুওয়াতের বিষয়; তারা যখন বলবে, আমাদের মাঝে নবি আছে তখন আমরা নবি পাবো কোত্থেকে?? সুতরাং এর থেকে বাঁচার উপায় একটাই, তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, তাঁকে নবি হিসেবে না মানা।
হে ভাই! একটু লক্ষ করে দেখ, অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনা আর অহঙ্কারের গৌরব তাকে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখলো, দীনে ইসলামে প্রবেশে বাধা দিল। এই অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনা আর বংশের গৌরব যে কত মানুষকে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছে!! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :
وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللَّهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ ۚ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ ۚ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ
'আর তাকে যখন বলা হয় যে, আল্লাহকে ভয় করো, তখন তার পাপ তাকে অহংকারে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং তার জন্য দোযখই যথেষ্ট; আর নিঃসন্দেহে তা হল নিকৃষ্টতম ঠিকানা।'
অনেক মানুষকে অন্যের হক আদায় করার উপদেশ দেওয়া হয়; কিন্তু অহংকারবশত সে এই নসিহত গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে এবং বলে, আমাকে নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না, আমার বিষয় আমিই ভাল জানি। আমার পক্ষে কি কাউকে জুলুম করা সম্ভব? তোমরা আমাকে নসিহতের উপযুক্ত নও। এই অহংকারের কারণেই কত মানুষের সাথে তার ভাইয়ের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, তা আর কখনো ঠিক হয় নি।
এক লোক তার স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করার কারণে তার স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে গেছে। আমরা যখন সেই লোককে বললাম যে, আপনি স্বীকার করেন আর না করেন এখানে দোষ আপনারই। ভুল আপনি করেছেন। সুতরাং আপনার স্ত্রীর নিকট যান এবং তার নিকট দুঃখ প্রকাশ করুন। তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন। আপনার ছেলে-মেয়েরা ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত ঐতিহ্যের মত জীবনযাপন করছে। আপনার স্ত্রী আপনার কাছে কোনো ধন-সম্পদ চায় না। আপনি শুধু একবার তার সামনে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করুন, দেখবেন সে চলে আসবে। আবার সবকিছু আগের মত ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু সে বলে আমি তার সামনে দুঃখ প্রকাশ করবো? তার কাছে ক্ষমা চেয়ে আমি ছোট হবো? না এটা হতে পারে না। আমি তার সামনে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে পারবো না। ভাই! কোন জিনিসের কারণে সে এমনটি করলো? এটা কি শুধুমাত্র অহংকারের কারণে হয়নি? অবশ্যই অহংকারের কারণেই সে এটা থেকে বিরত থেকেছে।
অনেক মানুষ আছে যারা ইচ্ছা করে কোনো কারণ ছাড়াই বাম হাত দিয়ে খাবার খায়। আমরা যখন তাকে বলি, ভাই আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, আপনি ডান হাত দিয়ে খাবার খান; কিন্তু সে আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। কোন জিনিস তাকে সঠিক বিষয়টা বুঝা থেকে ফিরিয়ে রাখলো? শুধু কি অহংকারের কারণেই এমনটি করেনি এবং সঠিক বিষয়টা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেনি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামের সাথে বসা ছিলেন, সেখানে এক লোক বাম হাত দিয়ে খাবার খাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোমলভাবে অত্যন্ত স্নেহ-সহানুভূতির সাথে তাকে বললেন, তুমি ডান হাত দিয়ে খাবার খাও। সে বলল, এটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি আর কখনো সক্ষম হবেও না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তার ডান হাত অচল হয়ে গেছে, সে আর কখনো তা উঠাতে পারে নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন অহংকারের কারণে সে এটা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলো।
ভাই! একটু লক্ষ্য করুন, শুধুমাত্র অহংকারের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বদ দোয়া দিলেন। এই অহংকারের কারণে মানুষ ইসলাম গ্রহণ থেকে দূরে থাকে। অহংকারের কারণে অনেক মানুষ মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করে না। সে বলে আমি মসজিদে যাবো? সেখানে কত নিচু প্রকৃতির লোকও সালাত পড়ে!! হাজ্জাজ ইবনে আরতাবাহ একজন হাদিসের রাবি। অনেকেই তাকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলেছেন, কারণ সে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করতো না। তাঁরা বলেন, আমরা তাকে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায়ের ব্যাপারে নসিহত করতাম; কিন্তু সে বলতো আমি মসজিদে যাবো? অথচ সেখানে কুলি-মজুররাও থাকে, আমি তাদের সাথে একসাথে সালাত আদায় করবো? অর্থাৎ আমি আমার সুগন্ধিযুক্ত সুন্দর পোশাক নিয়ে তাদের সাথে দাঁড়ানো সালাত পড়বো? আর বর্তমানও তো অহংকারের কারণে কত মানুষ মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করে না। যেমন কলেজের প্রিন্সিপাল, ভার্সিটির চ্যান্সেলর, এলাকার গভর্নর ইত্যাদি লোকেরা মসজিদে গিয়ে সালাত পড়ে না। তারা বাড়িতে ছেলে সন্তানদের নিয়ে অথবা খাদেম-খুদাম ও আশপাশের লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করে।
আল্লাহ তোমাকে আহ্বান করছেন, তিনি তোমাকে বলছেন তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। অর্থাৎ তিনি বলছেন তোমরা মসজিদে গিয়ে সালাত আদায়কারীদের সাথে সালাত আদায় কর। সুতরাং হে প্রিন্সিপাল! হে চ্যান্সেলর! হে গভর্নর! আপনারা মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করুন, কারণ মসজিদ বানানো হয়েছে সালাত আদায়ের জন্য। এজন্যে নয় যে, প্রত্যেকে নিজ নিজ গৃহে সালাতের স্থান বানাবে এবং বলবে, আমি কৃষক-শ্রমিকদের সাথে সালাত আদায় করবো? আমি ছাত্রদের সাথে সালাত আদায় করবো? সে এটা কেন করলো? শুধুমাত্র অহংকারের কারণে কি সে এমনটি করেনি?
হে ভাই! কিয়ামতের দিন অহংকারীদের ছোট পিঁপড়ার আকারে উত্থিত করা হবে। যারা মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হবে।
এবং যার অন্তরে সামান্য পরিমাণও অহংকার থাকবে সে কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাকে এবং আপনাদেরকে শুধুমাত্র তাঁর জন্য বিনয় ও নম্র হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।
টিকাঃ
১. সূরা ইখলাস: ১-৩
১. সুরা বাকারা, আয়াত : ২০৬
📄 দৃষ্টি অবনত রাখা
كُلُّ الْحَوَادِثِ مَبْدَاهَا مِنَ النَّظَرِ وَمُعْظَمُ النَّارِ مِنْ مُسْتَصْغَرِ الشَّرَرِ كَمْ نَظَرَةٍ فَتَكَتْ بِقَلْبِ صَاحِبِهَا فَلَكِ السِّهَامُ بِلا قَوْسٍ وَلا وَتَرِ يَسُرُّ مَقلَةً مَا ضَرَّ مُهجَتَهُ لا مرحباً بسرور عاد بالضرر
সকল ঘটনা-দুর্ঘটনার সূচনা দৃষ্টি থেকে।
বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের সূচনাও হয় তুচ্ছ স্ফুলিঙ্গ থেকে।
কত দৃষ্টি যে দ্রষ্টাকে করেছে লণ্ডভণ্ড।
ধনুকহীন তীরের ন্যায় দৃষ্টিতে ছুটিয়ে দেয় ছিন্নভিন্ন।
অন্তর কষ্ট পায়, চক্ষু শীতল হয়।
এমন আনন্দের কোনো প্রয়োজন নেই যা কষ্ট বয়ে বেড়ায়।
দৃষ্টি ও দৃষ্টি নিবদ্ধের অনেক অবাক করা ও আশ্চর্জজনক ঘটনা রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম আ.কে সৃষ্টি করলেন। এবং জান্নাতে তার প্রশান্তির জন্য খাদ্য-পিনা, পোশাক-পরিচ্ছেদ, বিভিন্ন নহরসহ মনোরঞ্জনের সবকিছুরই প্রস্তুতি করে দিলেন।
وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ
'সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে তোমাদের কাঙ্ক্ষিত যত সব আরিয়া তোমরা দাবি কর সেখানে তার সবকিছুই তোমাদের জন্য থাকবে।'
তা সত্ত্বেও আদম আ. এমন একজনের প্রয়োজন অনুভব করছিলেন যে জান্নাতে তাকে সঙ্গ দিবে, তার সাথে কথা বলবে। তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম আ.কে সঙ্গ দেওয়ার জন্য তাঁর সৃষ্টিজীবের মধ্য থেকে কোন জিনিসকে বেছে নিলেন? তিনি কি কোনো পাখিকে বেছে নিলেন, যে মিষ্টি সুরে তাঁকে গান শুনাবে? না-কি কোনো আহ্লাদে বিভোর তার সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করলেন, যার সাথে দুইটি করে তিনি সময় কাটাবেন? না-কি কোনো ঘোড়া নির্বাচন করলেন যার উপর সওয়ার হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াবেন। না-কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম আ.কে সঙ্গ দেওয়ার জন্য এর কোনোটাকৈই নির্বাচন করেননি, কারণ যেনো আল্লাহ তাআলার আদম আ.কে পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন তিনি জানতেন যে, আদমের একজন নারী সঙ্গিনী প্রয়োজন। যার দিকে তাকিয়ে তার চক্ষু শীতল হবে, মন প্রশান্ত হবে, এবং আত্মা স্থির হবে।
সুতরাং আল্লাহ তাআলা আদমের সঙ্গী হিসেবে হাওয়া আ.কে নারী হিসেবে সৃষ্টি করলেন।
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا
'সুতরাং তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একটিমাত্র সত্তা থেকে আর তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন তাঁর জোড়া, যাতে করে সে তাঁর কাছে শান্তি পেতে পারে।'
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হাওয়া আ.কে আদম আ.-এর পাঁজরের হাড় দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এবং একজনের সাথে অন্য জনের দিলকে আকৃষ্ট করে দিয়েছেন।
এখন আমরা কয়েকজন প্রেমিকের গল্প শুনবো। তারা কীভাবে প্রেমে পড়েছিল? এবং কেনও প্রেমে পড়েছিল?
বনিও আছহাতে রহিমাহুমাল্লাহু একদিন এক শহরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি সেখানে দুই/তিন দিন অবস্থান করলেন এবং শহরের আশপাশে ঘোরাঘুরি করলেন। ঘোরাফেরার সময় শহরের বাইরে একটি পাথরের উপর দুটি আংটি আঁকা গেল, যার উপর লেখা ছিল—
يَا مَعْشَرَ الْعُشَّاقِ بِاللهِ خَبِّرُوْا إِذَا حَلَّ عِشْقٌ بِالْفَتَى كَيْفَ يَصْنَعُ
হে প্রেমিকরা! আল্লাহ্র জন্য বলো, কোনো যুবক প্রেমে পড়লে সে কি করবে?
তখন আসমাঈ রাহিমাহুল্লাহ্ তার পাশে আর একটি পাথর নিয়ে তার উপর লিখলেন:
يَدَارِي هَوَاهُ ثُمَّ يَكْتُمُ مَهْيِفِهِ بِكُلِّ الأُمُورِ وَ يَخْفَعُ
সে তার আসক্তিকে দমিয়ে রাখবে এবং তার দুঃখ লুকিয়ে রাখবে। প্রেমাস্পদের সকল বিষয়ে তৃপ্ত হবে।
وَ كَيْفَ يَدَارِي وَ الْهَوِى يَفْضَحُ الْحَشَي وَ فِى كُلِّ يَوْمٍ قَلْبِهِ يَتَفَجَّعُ
সে কীভাবে তার আসক্তিকে দমিয়ে রাখবে অথব প্রেমাসক্তি তার ভিতরকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে এবং দিনদিন তার হৃদয় কষ্টে ফেটে যাচ্ছে।
اِذَا لَمْ يَجِدْ حَلاً لِكَتْمَانِ عِشْقِهَا فَلَيْسَ لَهُ سَوِي الْمَوْتِ يُقْنِعُ
সে যদি তার ইশক লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোনো সমাধান না পায় তাহলে মৃত্যু ব্যতীত তার আর কোনো সমাধান নেই।
عَمِمًا أَطَعْنَا ثُمَّ مِتْنَا فَبَلَوْا سَلِمِي لَـنْ قَدْ كَانَ بِالْوَصْلِ يُمِعْ
আমি শুনলাম ও মানলাম অতঃপর মরেই গেলাম। তাকে আমার সালাম পৌঁছে দিয়ো যে সাক্ষাতে অমত ছিল।
এটা পাথরের কাহিনী, জানি না এটা সত্য না-কি মিথ্যা। তবে মজার ও আশ্চর্যের বিষয় হল আমি দুই বছর পূর্বে একবার শামে গিয়েছিলাম। আমি তখন কয়েকজন সঙ্গীর সাথে একটি রেস্টুরেন্টে গেলাম। রেস্টুরেন্টটি ছিলো শহরের বাইরে একটি বিনোদন-কেন্দ্রে। রেস্টুরেন্টটির পাশে ছিলো একটি পাহাড়। তার উপর একটি বিশাল পাথরের গায়ে লেখা-
قُلْ فِلْ الْحُبِّ ভালোবাসার হৃদয়।
তখন আমি হোটেলের এক কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলাম। এই পাথরের উপর এটা লেখার কারণ কী? সে বললো, আমরা এই পাথরের নাম রেখেছি প্রেমিকের পাথর। আমি তাকে বললাম, তোমরা এর নাম কেনো প্রেমিকের পাথর রেখেছো? একথা বলে আমি পাহাড়ের উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম পাহাড়টা অনেক উঁচু। এই পাহাড়ড়তে হেঁটে সেই পাথর পর্যন্ত পৌঁছা অনেক কষ্টকর ব্যাপার এবং পাথরের উপর সত্যিই খোদাই করে লেখা,
قُلْ فِلْ الْحُبِّ ভালোবাসার হৃদয়।
আমি তাকে বললাম, এর কারণ কী? সে বললো, এক লোক প্রেমে পড়েছিলো; কিন্তু সে তার প্রেমাস্পদকে পায়নি। তাই সে এই পাহাড়ের উপর এসে নিচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এ কারণে এর নাম হয়েছে ভালোবাসার হৃদয়।
জানি না সত্যিই এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিলো কি-না? অথবা এটাও আর দশটা কাহিনীর মত বানানো কোনো কাহিনী; কিন্তু এই ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে আমার এটা বোঝানো উদ্দেশ্য যে, ইশক ও মুহাব্বাত মানুষের হৃদয় নিয়ে খেলা করে। আর এই ইশকের সূচনা হয় দৃষ্টি থেকেই। অর্থাৎ মানুষ প্রথমে কারো প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, অতঃপর তার প্রেমে পড়ে।
আর এ কারণেই আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশঙ্কাজনক নারীর দিক থেকে ফজল ইবনে আব্বাসের চেহারা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। একবার হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাহনের চড়ে মানুষের হজ্জের বিষয় পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তার পাশে একটি উটের উপর ফজল ইবনে আব্বাস রা. ছিলেন। এমন সময় খু'আম গোত্রের এক নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো, হে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার বাবার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছে; কিন্তু তিনি অতিশয় বৃদ্ধ, বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না। সুতরাং আমি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করলে কি তার জন্যে তা আদায় হবে? এই নারীটি ছিলো অত্যন্ত সুন্দরী ও পরিচ্ছন্ন। আর ফজল ইবনে আব্বাস রা. ছিলেন সুদর্শন যুবক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ফজল ইবনে আব্বাস রা.-এর চেহারা ঘুরিয়ে দিলেন এই নারীর দিক থেকে ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি তাঁর পবিত্র হাত ফজল ইবনে আব্বাসের চেহারার উপর রেখে তার চেহারা ঘুরিয়ে দিলেন, যাতে সে এই নারীর দিকে দৃষ্টি দিতে না পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করার পর বললেন :
আমি এক যুবক ও যুবতীকে দেখলাম, অতঃপর আমি তাদের উপর শয়তানের ধোঁকার ব্যাপারে নিরাপদ ছিলাম না।
এই ঘটনাটি ছিলো হজ্জের সময়। এটা বর্তমান সময়ের কোনো বাজারে ছিলো না। অথবা ইন্টারনেটে কম্পিউটারের সামনে ছিলো না, যেখানে সে নারীটি যেভাবে খুশি সেভাবে দেখতে পারে। অথবা কোনো মোবাইলের সামনে ছিলো না, যার মাধ্যমে ভিডিও কলে সরাসরি চেহারা দেখে কথা বলা যায়। অথবা এটা কোনো টেলিভিশন চ্যানেলও ছিলো না, যেখানে নারীটির শরীরের আবৃত অংশের চেয়ে অনাবৃত অংশ থাকে বেশি। অথবা এটা কোনো ভার্সিটিও ছিলো না যেখানে নারীটা শরীরের সাথে লাগানো টাইট পোশাক পরে আসে এবং তাদের কেউ কেউ টাইট জামা পরে মাথার উপর স্কার্ফ রেখে ভাবে যে, সে পর্দা করছে!! অথচ তারা পর্দার ধারেও নেই। বরং তা ছিলো হজ্জের সময়, যখন মানুষ লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা বলছে তখন এক মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফাতওয়া জানতে এসেছে। আর যুবক্তটি ছিলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত মুবারক ফজল ইবনে আব্বাস রা.-এর গালের উপর রাখলেন এবং তাঁর চেহারা ঐ নারীর দিক থেকে ঘুরিয়ে দিলেন। যদিও ফজল ইবনে আব্বাস রা. নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হজ্জ পালনরত অবস্থায় ছিলেন;
কিন্তু শয়তান তো খুবই ধূর্ত, শয়তান সদা ব্যস্ত, শয়তান আল্লাহ তাআলাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে:
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ
'সে বললো, আপনার ইযযতের কসম, আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করে দেবো।'
শয়তান মানুষকে বিপথগামী করার দায়িত্ব নিয়েছে। আল্লাহ তাআলা শয়তান সম্পর্কে বলেন:
ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ
'এরপর আমি আসবো তাদের সামনের দিক থেকে, পিছনের দিক থেকে, ডান দিক থেকে, এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।'
এমন স্থানে হজ্জের সময় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজল ইবনে আব্বাস রা.-এর চেহারা ঘুরিয়ে দিলেন, তাঁর মাঝে এবং হারাম দুটি নিক্ষেপের মাঝে আড়াল হয়ে দাঁড়ালেন। এ কারণেই নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনো নারীর সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের চোখকে অবনত রাখল, আল্লাহ তাআলা তাকে এমন ইমান দান করবেন যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করতে পারবে।
হে ভাই তুমি নারীর সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি দেওয়া থেকে তোমার চোখকে অবনত রাখ। হোক সেটা ইন্টারনেটে, কম্পিউটারে, মোবাইলে, টেলিভিশন চ্যানেলে অথবা বাজারে যা ভার্সিটিতে, এক কথায় সর্বাবস্থায় তুমি নারীর দিকে তাকানো থেকে তোমার দৃষ্টি অবনত রাখ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
হে নবি আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেনো তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের যৌনঙ্গের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্যে সবচেয়ে বড় পবিত্রতা। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।
হা, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দৃষ্টি অবনত রাখলে, আল্লাহ তাআলা এমন ইমান দান করবেন, যার স্বাদ সে অনুভব করতে থাকবে।
সাহিত্যের বইয়ে দাসীর প্রতি এক বেদুইনের আকৃষ্ট হওয়ার একটি গল্প বর্ণিত হয়েছে। মরুভূমিতে তারও গরু ভেড়া এক বেদুইন থাকত। তার একটি দাসী ছিল, সে তাকে প্রচণ্ড রকমের ভালোবাসত, সর্বদা প্রেম মত্ত থেকে তার ভালোবাসায় ব্যাকুল থাকত। বেদুইন লোকটি তার সাথে হাসি-ঠাট্টা করতো, সেও তার সাথে হাসি-ঠাট্টা করতো। একবার তারা হাসাহাসি করছিলো আর আব্দুর যাচ্ছিল, হঠাৎ একটি আব্দুর দাসীর শ্বাসনালীতে আটকে গেল আর সে শ্বাস কষ্টে মারা গেল। তখন বেদুইন লোকটি প্রচণ্ড কাঁদতে লাগলো আর দাসীটিকে চুমু খেতে লাগল। তার শরীর ধরে তাকে নাড়তে লাগলো। অথচ দাসীটি তখন মারা গিয়েছে। সে সাত দিন পর্যন্ত তার থেকে বের হয়নি এবং দাসীটির লাশও সেখান থেকে সরিয়ে দাহন করেনি। লাশটি তার সামনেই পচে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। সাতদিন পর আশপাশের লোকেরা এসে তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, মহিলাটি মারা গিয়েছে, তার সামনে যা আছে এটা মহিলার লাশ, এবং তা এই মরেও বিকৃত হয়ে গেছে; কিন্তু এই ইশক ও মুহাব্বাতের কারণে সে তা টেরও পায়নি। ইশক ও মুহাব্বাত এমন বিষয় কোনো মানুষের অন্তরে তা প্রবেশ করে এবং ইবলিশ শয়তান ওর উপর তাকে বলতে থাকে তখন এটা তার বিবেক নষ্ট করে দেয় এবং তার দীন ও দুনিয়া উভয়টাই ধ্বংস করে দেয়।
অন্য আরেকটি ঘটনা, এক বেদুইন মরুভূমিতে দিনে পশু চড়াতো আর তাবুতে রাত কাটাতো। তার কাছে একটি দাসী ছিলো, যাকে সে প্রচণ্ড ভালোবাসতো। সে সর্বদা তার চিন্তায় ব্যস্ত থাকত। একদিন সে দেখলো তার এক গোলাম দাসীর দিকে তাকিয়ে আছে। ফলে বেদুইন লোকটি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে একটি বর্শা দিয়ে আঘাত করে দাসীটিকে হত্যা করে দিল। এরপর সে তার মাথার নিকটে বসে কাঁদতে লাগল।
ভাই লক্ষ্য করে দেখো, লোকটি কীভাবে ভালোবাসার কারণে এক নারীকে হত্যা করে ফেলল। আর বর্তমানে অধিক ভালোবাসা বা আগ্রহের কারণে একজন অপর জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। বর্তমানে শুধু যে, সুন্দরী নারীর প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়ার কারণে অপরাধের জড়িয়ে যাচ্ছে তা নয়; বরং অনেকে শাস্ত্রহীন সুশ্রী-সুদর্শন বালকের দিকে কুদৃষ্টি দেওয়ার কারণেও অনেক অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। আমি জেলের ভিতর নিজ চোখে দেখেছি, এইধরনের অবৈধ ইশকের কারণে বিভিন্ন জন জেলে শাস্তি ভোগ করছে। যেমন কারো এক বছরের, কারো দুই বছর কারো তিন বছর আবার কারো এর চেয়েও বেশি সময় জেলে বন্দি থাকার শাস্তি হয়েছে। আবার কারো কারো মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, কারণ সে তার মতোই কোনো যুবকের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে, কেউ আবার কোনো সুশ্রী বালককে অপহরণ করে তার সাথে অবৈধ-অনৈতিক কাজ করেছে, অতঃপর সে গ্রেফতার হয়েছে। (আল্লাহর পানাহ) আবার কেউ অপহরণ করার পর অনৈতিক কাজ করে তাকে হত্যাও পর্যন্ত করেছে, অতঃপর সে গ্রেফতার হয়েছে। সে এমন একটা জঘন্য কাজ কেন করল? কারণ সে তার প্রতি কুদৃষ্টি দিয়েছে, অতঃপর তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। সে যদি আল্লাহকে ভয় করে তার প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়া থেকে বিরত থাকত এবং তার সাথে অবৈধ সম্পর্ক গ্রহণের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহণ করতো তাহলে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টাই নিরাপদ থাকত; কিন্তু.....!!
আমি এমন যুবককেও দেখেছি যে কোনো এক যুবতীর সাথে অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে পড়েছে। অতঃপর তাকে ফুসলিয়ে বাইরে নিয়ে খারাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে। এরপর মেয়েটির পেটে তার সন্তান ধারণ করেছে। অতঃপর উভয় জনকেই গ্রেপ্তার করে জেলে বন্দি করা হয়েছে আর ঐ সন্তানকে জারজ সন্তান হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কারণ তারা অবৈধভাবে মিলিত হওয়ার কারণে এই সন্তান জন্ম নিয়েছে। এই যে, এতসব ঘটনা ঘটে, এর কারণ কী? এর মূল কারণ হল প্রথমে কুদৃষ্টি। তারপর অবৈধ সম্পর্ক তারপর.......!!
পূর্বে প্রেমিক-প্রেমাম্পদের সম্পর্ক থাকত লুকানো, দেখা আর কথা বলার মাঝে সীমাবদ্ধ; কিন্তু বর্তমানে অবস্থাটা অনেক গুরুতর আকার ধারণ করেছে। রাহাজাতুল মাজালিস নামক কিতাবে আদ্দাউল্লুসি বলেন, পূর্বে প্রেমিক-প্রেমাম্পদের অবস্থা ছিলো দেখা করা আর কথা বলার মাঝে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ বলা যায় পূর্বের প্রেম ছিলো পবিত্র প্রেম। এমনকি আনতারা, আবলাররাও মেঘকে ঘর থেকে বের করে হোটেলে নিয়ে যায়নি। বরং তারা ছিলো প্রেমিক, যদিও তাদের প্রেম ছিলো শরিয়ত-বিরুদ্ধ কাজ; কিন্তু তা ছিলো পরিচ্ছন-নির্মল প্রেম। তারা যার নাম দিয়েছিলো নিষ্কাম প্রেম বা পবিত্র ভালবাসা। প্রেমিক প্রেমিকাকে নিয়ে আর প্রেমিকা প্রেমিককে নিয়ে কবিতা রচনা করতো। রাহাজাতুল মাজালিস কিতাবে উল্লেখ আছে, পূর্বে প্রেমিক-প্রেমিকাদের প্রেম ছিলো তাকানো আর কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর বর্তমানের প্রেম হল স্পর্শ করা, চুম্বন করা আর তারপর......!! তারপর.......!! অর্থাৎ বর্তমানের প্রেম হল অশ্লীলতা আর বেহায়ামি। আল্লাহ তাআলা আমাদের হেফাযত করুন। বর্তমানে মোবাইল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে, ফেসবুক টুইটারও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে তারা যোগাযোগে রক্ষাকার, ছবি আদান-প্রদান করে প্রেমিক প্রেমিকারা তাদের সম্পর্ক বজায় রাখে......
পূর্বে শয়তান ছিলো এবং সে মানুষকে ধোকা দিয়ে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করতো; কিন্তু তখন মানুষকে ধোকা দেওয়া, পথভ্রষ্ট করা অত সহজ ছিলনা। তখন ছেলে মেয়েদের বিষয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। তারা চাইলেই কোনো গ্রুপে যেতে পারতো না, কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত হতে পারতো না, কারণ তার পরিবার সর্বদা তাকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতো। তার সকল গতিবিধি তারা লক্ষ্য করতো। তখন তাদের হাতে মোবাইল ছিলো না, ইন্টারনেট ছিলো না যে, যখন তখন বাড়ির বাইরের কারো সাথে যোগাযোগ করবে, বাড়ির নির্জনতার সুযোগে বাইরের কাউকে বাড়িতে নিয়ে আসবে; কিন্তু বর্তমানে ছেলেদের হাতে, মেয়েদের হাতে মোবাইল রয়েছে, কারো কাছে দুইটা-তিনটা পর্যন্ত মোবাইল থাকে। এর মাধ্যমে খুব সহজেই তারা কারো সাথে খারাপ সম্পর্ক করতে পারে এবং তা ছাত্রীয় ও রাখাতে পারে। অতঃপর সামান্য সুযোগে দেখা-সাক্ষাতও করতে পারে।
ইবনু জাউজি রহিুমাহুল্লাহ ইউসুফ আ.-এর সাথে আখিয়ে মিসরের স্ত্রীর ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, সুবহানাল্লাহ! যখন মহিলাটি তাঁকে কুতপ্রাব দিল তখন কীভাবে তিনি নিজেকে রক্ষা করলেন? মহিলাটি তাঁকে বলল, এসো আমরা খারাপ কাজে লিপ্ত হই; কিন্তু তিনি বললেন, আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। তিনি আমার প্রতিপালক, তিনি আমাকে উত্তম আশ্রয়স্থল দান করবেন। অতঃপর তিনি তার সামনে থেকে পিছন দিকে দৌড় দিলেন আর মহিলাটি পিছন থেকে তাঁর জামা টেনে ছেড়ে ফেলল। তিনি পলায়ন করতে সক্ষম হলেন। অতঃপর নিজেকে অশ্লীল কাজ থেকে বাঁচাতে গিয়ে কয়েক বছর জেলে বন্দি রইলেন। ইবনুল জাউজি রহিমাহুল্লাহ এই ঘটনা উল্লেখের পর বলেন, এর মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের সর্বোচ্চ প্রকার প্রকাশ পেয়েছে। আনুগত্য শুধু দুই রাকাত সালাত আদায় করা, নফল সিয়াম পালন করার নাম নয়; বরং আল্লাহর ভয়ে তাঁর নাফরমানির কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করাও আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের বিশেষ অংশ। বরং নির্জন মুহূর্তে যেখানে গুনাহের সুযোগ ও উপকরণ উভয়টাই তাকে যখন আল্লাহর ভয়ে নিজেকে গুনাহ থেকে রক্ষা করা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সর্বোচ্চ প্রকার। মানুষ যখন শক্তভাবে ইসলামে আকড়ে ধরবে এবং পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে ও নফসের হেফাজত করবে তখন তার ঈমান বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সে আল্লাহর ইচ্ছায় গুনাহের কাজে পতিত হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ﴿٣٠﴾
'হে নবি! আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেনো তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পবিত্রতা। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা আবাহিত আছেন।'
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন;
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: 'ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেনো তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে।'
দ্বিতীয় বিষয়টি হল প্রতিটা মানুষকেই ফিতনার স্থান এড়িয়ে চলতে হবে। যে বাজারে, যে মার্কেটে বেপর্দা নারীদের বেশি আনাগোনা, তুমি সে বাজার বা মার্কেটে না গিয়ে অন্য বাজার বা মার্কেটে যাও যেখানে নারীদের যাতায়াত কম। যে কলেজ বা ভার্সিটিতে মেয়ের সংখ্যা বেশি বা মেয়ের ফেতনা বেশি তুমি সেই কলেজ ভার্সিটি ত্যাগ করে অন্য কলেজ ভার্সিটি যাও, যেখানে মেয়েদের ফেতনা কম। তোমার যে বন্ধু তোমাকে খারাপ কাজের দিকে নিতে চায় তাদের বন্ধুত্ব ত্যাগ করে ভাল ও ভদ্র ছেলেদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো। তোমার যে বান্ধবী তোমাকে খারাপ কাজের দিকে নিতে চায়, অশ্লীলতার দিকে নিতে চায়, তাদের বন্ধুত্ব ত্যাগ করে ভাল ও পর্দাশীল মেয়েদের বান্ধবী হিসেবে গ্রহণ করো। যারা ধ্বংসের পথে গিয়েছে তাদের প্রতি লক্ষ না করে, তাদের পথে না গিয়ে বরং যারা ভাল তারা কীভাবে ভাল হল সেই দিকে লক্ষ করো এবং তাদের পথ অবলম্বন করো।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এবং তোমাদেরকে পূর্ণ কল্যাণ দান করুন। এবং আমাদের প্রত্যেককে গোপন ও প্রকাশ্য সকল ফেতনা থেকে হেফযত করুন। আমিন।
টিকাঃ
১. সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩১
১. সুরা আরাফ, আয়াত : ১৮৯
১. সূরা হুদ, আয়াত: ৮২
২. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৭
১. সূরা নূর, আয়াত: ৩০
১. সূরা নূর, আয়াত: ৩০
২. সূরা নূর, আয়াত: ৩১
📄 গাধা-চালক থেকে খলিফা
পৃথিবীতে মানুষ বিচিত্র ধরনের স্বপ্ন দেখে। মানুষের স্বপ্ন যেমন হয় বিভিন্ন ধরনের এবং তার বাস্তবায়নের পন্থাও এক এক জনের এক এক রকম। এক এক জন তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ণ করার ক্ষেত্রে এক এক ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিছু মানুষ আছে যারা স্বপ্ন দেখে কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য না কোনো উদ্যোগ কিম্বা কোনো পরিকল্পনা। সুতরাং তারা শুধু স্বপ্নই দেখে, তাদের স্বপ্ন কখনো পূর্ণ হয় না; বাস্তবতাবের মুখ দেখে না। সুতরাং আমাদের এই লেখা তাদের জন্য নয়। বরং আমাদের এই লেখা তাদের যারা স্বপ্ন দেখে এবং তা বাস্তবায়নেরও ইচ্ছা রাখে।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَّيْسَ بِأَمَانِيِّكُمْ وَلَا أَمَانِيِّ أَهْلِ الْكِتَابِ ۗ مَن يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدْ لَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا
'তোমাদের আশার উপর কোনো ভিত্তি নেই এবং আহলে কিতাবের আশার উপর কোনো ভিত্তি। যে মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পাবে এবং সে আল্লাহ ছাড়া নিজের কোনো সমর্থক ও সাহায্যকারী পাবে না।'
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই আয়াতে বলেন, কাফের-মুশরিকরা শুধু স্বপ্ন আর আশা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, কারণ জান্নাত স্বপ্ন আর আশা দিয়ে পাওয়া যায় না। জান্নাত পেতে হলে ইমান ও আমল উভয়টাই লাগবে। যারা খারাপ আমল করবে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। একটি প্রবাদ আছে, শুধু স্বপ্ন ও আশা মানুষকে সম্মানিত করতে পারে না, শত্রুকে পরাজিত করতে পারে না এবং শিকারি শিকার ধরতে পারে না। মানুষ উড়ন্ত পাখির দিকে তাকিয়ে যতই কল্পনা করুক না কেনো সেটা কখনই তার সামনে জুনা হয়ে আসবে না। কেউ যদি একটা সুন্দর বাড়ি পাওয়ার দিয়ে যাওয়ার সময় ভাবে, সে এমন একটা বাড়িতে রাত কাটাবে, অতঃপর এর জন্যে কোনো পরিশ্রম না করে এবং কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ না করে তাহলে এমন বাড়ি সে শুধু কল্পনাতেই দেখতে পাবে; বাস্তবে কখনো এমন বাড়িতে থাকা হবে না।
সুতরাং যারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কষ্ট পরিশ্রম করে এবং এর জন্যে ঝুঁকি নেয়, তারাই তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সফল হয় এবং তাদের স্বপ্নই বাস্তবতার মুখ দেখে। এখন এ বিষয়ে একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করবো।
এক গাধা-চালক গাধা চালিয়ে তার উপর মানুষ ও মানুষের পণ্য বহন করতো। নিজের ও পরিবারের জন্য উপার্জন করতো; কিন্তু তার স্বপ্ন ছিলো অনেক বড়; তার স্বপ্ন ছিলো দেশের খলিফা হওয়া, দেশের শাসক হওয়া। লোকটি শুধুমাত্র স্বপ্ন দেখেই বসে থাকেনি বরং সে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, অতঃপর সে অনুযায়ী কঠোর পরিশ্রমও করেছে, ফলে সে একদিন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে। সে একদিন সাধারণ গাধা-চালক থেকে জনগণের চোখে দেখা শাসকের রূপান্তরিত।
অনেক দিন আগের কথা, যখন স্পেন শাসন করত মুসলিম শাসকগণ। তখন স্পেনে মুহাম্মাদ ইবনে আবু আমের নামের এক লোক ছিলো। সে ছিলো গাধা-চালক। গাধা চালিয়েই নিজের ও পরিবারের খরচ উপার্জন করতো। আবু আমেরের দুই জন বন্ধু ছিলো, তাদেরও একটি করে গাধা ছিলো এবং তারাও ছিলো গাধা-চালক। সারা দিন গাধা চালিয়ে, তাতে মানুষ ও মানুষের পণ্য বহন করে ক্লান্ত হয়ে তিন বন্ধু একত্রে একটি ঘরে ঘুমাতে আসতো। তারা একই বাড়িতে থাকত এবং একসাথে খাবার খেতো ও রাতে ঘুমাতো।
একদিন রাতে বাসায় ফিরে সকলে খাবার খেত বসলো এবং গল্পগুজবে মেতে উঠলো, গল্পের এক ফাঁকে মুহাম্মাদ ইবনে আবু আমের তার অপর দুই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী: তোমরা ভবিষ্যতে কী হতে চাও? অর্থাৎ ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমরা কী স্বপ্ন দেখো? তখন তাদের একজন বললো, আমি চাই আমার পাঁচটি গাধা হবে এবং আমি সবগুলো দ্বারা দিয়ে অনেক বেশি ইনকাম করতে পারবো এবং এখনকার চেয়ে আরো অনেক স্বাচ্ছন্দ্য দিন কাটাতে পারবো। অপর জন বললো, আমার গাধা চালাতে ভাল লাগে না, আমি চাই গাধা চালানো বাদ দিয়ে এই বাজারে একটি দোকান দিয়ে দোকান চালাবো। অতঃপর সাথীরা আবু আমেরকে জিজ্ঞেস করলো তোমার স্বপ্ন কী, তুমি ভবিষ্যতে কী হতে চাও? মুহাম্মাদ ইবনে আবু আমের তখন বললো, আমি ভবিষ্যতে খলিফা হতে চায়। একথা শুনে তার সাথীরা বললো, কী...?‘‘একটি গাধা ব্যতীত তো তোমার কাছে আর কিছুই নেই। এই গাধাটিই তো তোমার দুনিয়া। আর তুমি কি-না খলিফা হতে চাও?? সে বললো, হ্যাঁ আমি খলিফা হতে চাই। আমি ভবিষ্যতে খলিফা হওয়ার স্বপ্ন দেখি। এরপর লোকটি তার বন্ধুদের বললো, আচ্ছা আমি যদি খলিফা হই তাহলে তোমরা আমার কাছে কী চাইবে? অর্থাৎ আমি কী দিলে তোমরা খুশি হবে? তখন তাদের একজন বললো, আমি চাই তুমি আমাকে থাকার জন্য একটি প্রাসাদ দিবে। লোকটি তাকে বললো, আর কী চাও? সে বললো, প্রাসাদের সাথে একটি বাগান। লোকটি বললো, আরো কিছু কী লাগবে? লোকটি বললো, আমার চারটা স্ত্রী থাকবে। এরপর আবু আমের তার সাথীকে প্রশ্ন করলো, আমি খলিফা হলে তুমি আমার কাছে কী চাইবে? সে বললো, আমি চাই তুমি খলিফা হলে আমাকে একটি গাধার উপর উল্টো করে বসিয়ে বাজারে ঘুরাবে আর বলবে এই লোকটি বড় মিথ্যাবাদী এবং সবচেয়ে বড় দাজ্জাল। সে তাকে বললো, অন্য কিছু কি চাও? সে বললো, আমাকে গাধার পিঠে ঘুরানোর সময় আমার মুখে কালিও মেখে নিবে। এরপর তারা সকলে বিদ্রূপ হাসির যায় যার মত ঘুমিয়ে পড়লো।
মানুষ কোনো স্বপ্ন দেখলে তাকে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা করতে হয় এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী সামনে অগ্রসর হতে হয়, কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। লোকটিও তারও স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তাকে কী করতে হবে তা দিয়েছে। সে কি এই গাধা নিয়েই বসে থাকবে? না-কি খলিফা হতে হলে তাকে অন্য কোনো পথে হাঁটতে হবে, যে পথে হাঁটলে সে খলিফা হতে পারবে? খোকনা আজ থেকে দশ বছর, বিশ বছর বা ত্রিশ বছর পর, কারণ মানুষ তো প্রতিটি বড় কাজ ছোট থেকেই শুরু করে, হাজার মাইল দূরের গতবাঁও তো এক পা দুই পা করেই সামনে এগুতে হয়। এই যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ওহি নাজিল হয়েছে, তাও তো অল্প একটু তথা ‘ইকরা’–এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। সুতরাং তুমি কোনো কিছুতেই ছোট মনে করো না। তুমি তোমার গতবাঁও গোধার পদক্ষেপ শুরু করে দাও আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন। সুতরাং আবু আমের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে লাগলো এবং সিদ্ধান্ত নিল যে, সে গাধাটি বিক্রি করে দিয়ে পুলিশে ভর্তি হবে এবং নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে খলিফার দেহরক্ষী বা কাছের কেউ হবে। সুতরাং আপাতত লক্ষ্যে গাধায় তার প্রথম পদক্ষেপ ওটাই হবে।
পরদিন সকালে সে তার গাধাটি বিক্রি করে দিল। তখন তার সাথীরা তাকে বললো, আরে তুমি গাধাটি বিক্রি করে দিলে? এখন খাবে কী? কীভাবে দিন কাটাবে? তুমি তো ক্ষুধা-পিপাসায় মারা যাবে!! তখন সে বললো, আমার টার্গেট অনেক বড়, আমাকে এখানে গাধা নিয়ে বসে চললে না। আমাকে আমার লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে এবং সে অনুযায়ী আমাকে সঠিক পদক্ষেপ সামনে এগুতে হবে। সুতরাং সে চাইলো পুলিশে ভর্তি হবে। তাই বাজারে পুলিশের পোশাক এবং অস্ত্র ক্রয় করলো এবং পুলিশে ভর্তি হয়ে গেল। এরপর মেধা-দক্ষতা ও কাজের প্রতি নিষ্ঠার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পুলিশে তার পদোন্নতি হতে থাকলো এবং উপরে উঠতে উঠতে একসময় সে খলিফার বিশেষ লোকে পরিণত হয়ে গেল।
এক কিছু দিন পর খলিফার ইন্তেকাল হল। খলিফার ইন্তেকালের পর তার দশ বছরের ছেলে খেলাফতের দায়িত্ব পেল। তখন তার মা তথা পূর্বের খলিফার স্ত্রী তার পরামর্শক হিসেবে মুহাম্মাদ ইবনে আবু আমেরসহ আরো দু’জনকে নিযুক্ত করল। অপর দুই জন হচ্ছে, ইবনে আবু গালিবের এবং ইবনে তুমিয়াইহি। খলিফার মা তাদের তিনজনকে বললো, তোমরা তিনজন আমার ছেলেরকে পরামর্শ দিয়ে খেলাফতের পরিচালনার কাজে সাহায্য করবে। এরপর আবু আমের, ইবনে তুমিয়াইহির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলো এবং এক পর্যায়ে খলিফার মা ইবনে তুমিয়াইহিকে এই বলে সরিয়ে দিলো যে, তুমি আমার ছেলেকে পরামর্শ দেওয়ার যোগ্য নও। এখন তার লক্ষ্যে পৌঁছার রাস্তা আরো পরিষ্কার হলো; কিন্তু এখনো মূল লক্ষ্যে পৌঁছার অনেক পথ বাকি। এখনো আবু গালিব তার পথের বাধা, তাই সে আবু গালিবের মেয়ের সাথে নিজ ছেলেরকে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিল। আবু গালিবের মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ের পর আবু গালিবকেও সে তার কথামতো চালাতে শুরু করলো। অন্য দিকে খলিফার বয়স মাত্র দশ বছর সুতরাং খেলাফতের ক্ষেত্রে এখন ইবনে আমেরের কথাই একক ভাবে কার্যকর হতে শুরু করলো।
বর্ণিত আছে বালক ছেলেটি তার কামরা থেকে খুব একটা বের হতো না এবং সে তার খেলাফতের সিংহাসনে বসতো না। আর ইবনে আমেরের অনুমতি ব্যতীত কেউ তার সাথে দেখাও করতে পারতো না। সুতরাং উজির-নাজির ও মন্ত্রীরা শুধু মাত্র আবু আমেরের সাথেই পরামর্শ করার সুযোগ পেত এবং তারা তার আদেশ চলতো। সুতরাং উজির-নাজির ও মন্ত্রীরা, অন্যান্য লোকেরা আবু আমেরের সন্তুষ্টি অর্জন করে চলতে শুরু করলো। আবু আমেরের এই পর্যন্ত পৌঁছাটা একদিনে বা একরাতে হয়ে যায়নি বরং তার এই পর্যন্ত পৌঁছতে দীর্ঘ বিশ বছর লেগেছে। এভাবে আরো কিছু দিন অতিবাহিত হওয়ার পর একটা সময় সে নিজেই প্রকৃত খলিফা হয়ে গেল। একারণেই স্পেনের খলিফাদের নামের পরিবর্তে তার নামের দিকবেত করে তার শাসন কালকে 'আদ্দাওলাতুল আমেরিয়্যা' নাম করণ করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই অবস্থান থেকে তিরিশ বছর পর সে যখন এই অবস্থানে পৌঁছে তখন তার সেই গাধা-চালক দুই বন্ধুর কথা মনে পড়ে যায়। সুতরাং সে এক লোককে ডেকে বলে, যাও অমুক বাজারে গিয়ে এই দুই নামের দুইলোককে খোঁজ করে আমার কাছে নিয়ে এসো।
অতঃপর লোকটি উক্ত বাজারে গেল এবং খলিফার দেওয়া লোক দুটিকে খুঁজে বের করলো। তারা তখনও তাদের আগের অবস্থাতেই ছিলো অর্থাৎ তারা তখনও সেই গাধা-চালকই ছিলো, তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। সে তাদেরকে বাদশার নিকট নিয়ে এলো। তারা যখন বাদশাহের সামনে দাঁড়ালো, বাদশাহ তাদের জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কি আমাকে চিনতে পেরেছো? তারা বললো, হ্যাঁ আমরা আপনাকে চিনতে পেরেছি এবং আমরা আপনার ব্যাপারে আগেই শুনেও পেরেছিলাম; কিন্তু আমরা সাধারণ গাধা-চালক হয়ে আপনার সাথে দেখা করি কীভাবে? বাদশাহ তখন তাদেরকে বললো, তোমাদের কি মনে আছে সেই রাতের কথা যে রাতে আমরা আমাদের স্বপ্নের কথা বলেছিলাম এবং আমি খলিফা হলে তোমরা আমার কাছে কী চাইবে? তারা বললো, হ্যাঁ আমাদের মনে আছে। তখন সে তাদের একজনকে উদ্দেশ্য করে বললো, তুমি তখন কি কামনা করেছিলে? সে বললো, বাদশাহর একটি বাড়ি এবং চারজন নারী বিয়ে করার বিষয়। বাদশাহ তাকে বললো, এই নাও তোমার বাড়ি, এই যে বাগান এবং এই নাও তোমার চারজন মেয়েকে বিয়ের মহরের টাকা। এরপর সে বললো, তুমি যদি এর চেয়েও বেশি কিছু চাইতে তাহলে আমি তোমাকে তা দিতাম। অতঃপর সে অপর জনের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমার আশা যেনো কী ছিলো? তখন সে বললো, হে খলিফা আমাকে ক্ষমা করে দিন। বাদশাহ বললো, তোমার চাহিদাটা কি সেটা আগে বলো। সে বললো, আপনি খলিফা হলে আমাকে উল্টো করে গাধার পিছনে চড়িয়ে চেহারায় কালি মাখিয়ে পুরো শহর ঘুরাবেন আর বলবেন এ হল সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী এবং সবচেয়ে বড় দাজ্জাল। তখন একজনকে আদেশ দিয়ে তার আশা বাস্তবায়ন করানো হল।
প্রিয় পাঠক! এই ঘটনাটা সত্য হোক বা মিথ্যা হোক তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না, তবে এটা সত্য হওয়ারই সম্ভবনা বেশি, কারণ এই ঘটনাটা ইতিহাসের কিভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে; কিন্তু এখানে আমাদের একটা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, মানুষের হিম্মত ও কঠোর পরিশ্রম তাকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছয়ে দেয়, লক্ষ্যটা যত বড়ই হোকনা কেনো। সঠিক পন্থায় পরিশ্রম ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে সে একদিন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছবে?’ বান্দা আল্লাহ তাআলার সাথে যেমন ধারণা করে আল্লাহ তাআলাও তাকে সে অনুযায়ী ফলাফল দিয়ে থাকেন। হাদীসে কুদসীতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেন:
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমার সাথে বান্দা যে ধারণা করে, আমি তাকে সে অনুযায়ী প্রতিদান দিয়ে থাকি।’
অর্থাৎ, বান্দা আমার সাথে যে ধারণা করে, আমি তাকে সে অনুযায়ী প্রতিদান দিয়ে থাকি। সুতরাং বান্দার উচিত তার রবের কাছে ভাল ধারণা করবে এবং ভাল জিনিস চাইবে, তার কাছে মাগফিরাত চাইবে, পরীক্ষার সফলতা চাইবে, ঋণ মুক্তি চাইবে। তোমার রবের কাছে কখনো খারাপ ধারণা করো না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَظُنُّونَ ظَنَّ السَّوْءِ وَكَانُوا قَوْمًا بُورًا
‘তোমরা মন্দ ধারণার বশবর্তী হয়েছিলে। তোমরা ছিলে ধ্বংসমুখী এক সম্প্রদায়।’
সুতরাং মানুষ কীভাবে আল্লাহ তাআলার সাথে ভাল ধারণা করবে? এবং সে কীভাবে তার ধারণাকে বাস্তবায়ন করবে? এবং কীভাবে সে তার স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছবে? বিষয়টি নিয়ে এখন আমরা আলোচনা করবো।
যে ব্যক্তি তার স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছতে চায় অবশ্যই এর জন্য তাকে সর্বপ্রথম সুন্দর একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং তার স্বপ্ন- বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে। সাথে সাথে তাকে আরেকটি কাজ করতে হবে, তাহল তাকে এমন মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে যারা তাকে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করবে। যে বলে আরে তোমার দ্বারা এমন কাজ করা সম্ভব না, তুমি এটা ছেড়ে বরং অন্য কাজ করুক ইত্যাদি ইত্যাদি... বিভিন্ন নিরুৎসাহিতকরণমূলক কথা। বরং তোমাকে এমন বন্ধু গ্রহণ করতে হবে যারা তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তোমাকে উৎসাহিত করবে, কখনো তোমাকেই দুর্বল হতে দিবে না। এ বিষয়ে এখানে আরো একটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যখন ইন্তেকাল হল তখন তিনি ছিলেন বালক। রাসূলের ইন্তেকালের পর তিনি অপর এক আনসারি বালককে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তো ইন্তেকাল হয়ে গেছে, এখন তো আর আমরা তাঁর কাছ থেকে ইলম শিখতে পারবো না। সুতরাং এসো আমরা তাঁর যে সকল সাহাবি এখনও জীবিত আছেন তাঁদের থেকে ইলম অর্জন করি। ছেলেটি তখন তাঁকে বললো, আমরা ইলম শিখবো ভাল কথা। ধরো তুমি ইলম শিখলে, আলেম হলে এখন কি তুমি রাসূলের বড় বড় সাহাবি বারা ইবনু রা. জীবিত তাঁদের কাতারে যেতে পারবে? মানুষ কি আবূ বকর, উমর রা.-এর মত বড় বড় আলেমদের রেখে তোমার কাছে এসে ইলমের জন্য ভিড় করবে? এর চেয়ে ভাল পছন্দ মত কোনো একটা কাজ শিখে সেই কাজে লেগে যাও। লক্ষ করুন মানুষের চিন্তার ফারাক কতটুকু!! অনেক মানুষ তো এমন আছে যাদের চিন্তা-চেতনা এর চেয়েও নিম্নমানের।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ছেলেটি যখন এমন কথা বললো, তখন আমি তাঁর থেকে দূরে সরে আসি এবং ইলম অর্জন শুরু করি। অন্য দিকে ছেলেটিও তার কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়, সে কামারের কাজ শিখে এবং ধীরে ধীরে সে কাজে দক্ষ হতে থাকে, সে কামারের হাফরের পাশে বসে তার আগুনের তাপ নিতে থাকে এবং তার দুর্গন্ধে সুযোগ মনে করতে থাকে। অন্যদিকে ইবনে আব্বাস রা. ইলম অর্জনের জন্য হেঁটে গড়ে বসে পড়েন। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস শুনার জন্য তাঁর এক সাহাবির বাড়িতে আসলাম, তখন তার দরজা বন্ধ ছিলো। আমি দরজায় টোকা দিয়ে দেখলাম তিনি ঘুমোচ্ছেন, আমি আর দরজায় টোকা দিলাম না, কারণ এতে তাঁর ঘুম ভেঙে যেতে পারে এবং তাঁর মেজাজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাহলে তিনি এমন অবস্থায় হাদিস বর্ণনা করবেন যখন তার মন ভাল থাকবে না। অন্যদিকে আমি যদি এখান থেকে চলে যাই তাহলে হয়তো তিনি ঘুম থেকে উঠে অন্য কোথাও চলে যাবেন। তখন আমি তাঁর কাছ থেকে ইলম শিখতে পাবো না। তাই আমি তাঁর দরজার সামনেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম আর বাতাসে বালু এসে আমার চেহারা ও কাপড় ভরে দিল। তিনি যখন ঘুম থেকে উঠে দরজা খুললেন তখন তিনি দেখেন আমার চেহারা ও কাপড়ের উপর ধুলো-বালি পড়ে আছে। তখন তিনি আমাকে বললেন, হে আল্লাহ রাসূলের চাচাত ভাই! আমাকে কেনো ঘুম থেকে জাগাও করলে না! আমি তখন তাঁকে বললাম, কারণ আমি চাচ্ছিলাম যে, আপনি ফুরফুরে মেজাজের থাকুন আর আমি আপনার কাছ থেকে ইলম অর্জন করি। এরপর তিনি আমাকে হাদিস বর্ণনা করে শুনান।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন আমি একবার যায়েদ ইবনে সাবেত রা.-এর সাথে ছিলাম। (আর যায়েদ ইবনে সাবেত রা. ছিলেন ইলমুল মিরাস (উত্তরাধিকার জ্ঞান) সম্পর্কে সব চেয়ে বড় আলেম সাহাবি।) ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি তাঁর উটের লাগাম ধরে তাঁকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, এটা ছেড়ে দাও। আমি তখন বললাম, এভাবেই উলামায়ে কেরামের সম্মানের ব্যাপারে আমাদের আদেশ করা হয়েছে। তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমার হাতটা আমার কাছে একটু দাও। (ইবনে আব্বাস রা. তখন ছিলেন ছোট বালক) তিনি বললেন, তখন তিনি আমার হাত ধরেন এবং তাতে চুমু খান এবং বলেন নবি-পরিবারের লোকদের সাথে এভাবে আচরণ করার জন্য আমাদের আদেশ করা হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!!
হে ভাই! এর ফলাফল কী হল? ইবনে আব্বাস রা. তার স্বপ্নের কোন চূড়ায় পৌঁছলেন? আজকের এই বার্তা শুধুমাত্র তাদের জন্য যারা তাদের জীবনে সফল হতে চায়, যারা তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে চায় এবং যারা তাদের আকাঙ্ক্ষার চূড়ায় আরোহণ করতে চায়। হোক সেটা ইলমের চূড়ায় আরোহণ অথবা কুরআনুল করিম হিফজের ক্ষেত্রে, দাওয়াতের ক্ষেত্রে, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে, আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অথবা লেখালিখি ও বয়ান-বক্তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণের আকাঙ্ক্ষা। তাই! যদি এমন করতাম তাহলে এমন হতে পারতাম!! এমন পরিতাপ কোনো কাজে আসবে না। যৌবন চলে যাওয়ার পর এমন আফসোস কি কোনো কাজে আসবে যে, যার যদি যৌবন বিক্রি হতো তাহলে ক্রয় করতাম!!! না ভাই 'যদি' কোনো কাজে আসবে না বরং দুরাত্বে লক্ষ্য পৌঁছতে হলে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কঠিন পরিশ্রম-সাধনা এবং আল্লাহ তাআলার সাহায্য।
হে ভাই! ইবনে আব্বাস রা. যে চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন সে বিষয়ে বলছি। মনোযোগ দিয়ে শোনো। ইমাম যাহাবি রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত কিতাব 'সিয়ারু আ’লামিন নুবালা' কিতাবে উল্লেখ করেছেন, ইবনে আব্বাস রা.-এর এক শিষ্য আবূ সালেহ, তিনি বর্ণনা করেন, একবার হজ্জ্বের সময় আমি ইবনে আব্বাস রা.-এর এমন এক দৃশ্য দেখলাম, সেই দৃশ্য যদি কোনো ইহুদি খৃষ্টান ও বরং জাতি দেখতো তাহলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে নিতো। তখন তাঁকে প্রশ্ন করা হল আপনি কী দৃশ্য দেখেছেন? তিনি বলেন, একবার হজ্জ্বের সময় মানুষ তাওয়াফ করছিলো এবং তাশরিয়া পড়ছিলো, এমন সময় ইবনে আব্বাস রা. দাঁড়িয়ে খুৎবা দিলেন এবং তিনি তাঁর খুৎবায় সূরা বাকারার তাফসির করলেন, তিনি একৈর পর এক আয়াত পড়ছিলেন এবং তাঁর তাফসির করছিলেন আর মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর বয়ান শুনছিল। আমি আসলে ভেবে পাচ্ছিলাম না যে, আমি কোন বিষয়টি নিয়ে আশ্চর্য হচ্ছি, আমি কি তাঁর এত সুন্দর কুরআন মুখস্থের বিষয়টি নিয়ে আশ্চর্য হচ্ছি? না-কি তাঁর তাফসিরের জ্ঞান দেখে আশ্চর্য হচ্ছি? তিনি তাফসির করছিলেন আর মানুষ তাঁর তাফসির শুনছিলো, তাঁদের মধ্যে কেউ তাঁর বয়ান পুরোটা শুনলো আর কেউ কিছুক্ষণ শুনে চলে যাচ্ছিল।
তার ব্যাপারে তার এক সাথী বলেন, আমি একবার ইবনে আব্বাস রা.- এর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে তাঁর বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম; কিন্তু পথে এসে দেখলাম মানুষের ভিড়। রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে, সামনে এগোনো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। আমি কোনো মতে ভিড় ঠেলে তাঁর বাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম। আমি যখন ভিড় ঠেলাছিলাম তখন আমার মনে হচ্ছিল যেনো পুরো মদিনার মানুষের ভিড় ভরে আছে। আমি মানুষের ভিড় ঠেলে তার বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেখি তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ, আমি দরজায় আঘাত করলাম এবং ভিতর থেকে দরজা খোলা হলে আমি ভিতর গেলাম এবং তাঁকে বললাম, ইবনে আব্বাস! কারা? তোমার বাড়ির সামনে এত মানুষ ভিড় করেছে কেনো? তখন তিনি বললেন এরা সকলে তাবেউল ইলম। এরা দূর-দূরান্ত থেকে সফর করে এখানে ইলম শিখার জন্য একত্র হয়েছে। এদের কেউ ইরাক, কেউ শাম, কেউ মিসর থেকে এসেছে। এরা আমার কাছে ইলম জিজ্ঞেস করার জন্য এসেছে। তখন লোকটি বলল, সুবহানাল্লাহ! তাঁদের কাছে যাও, রোদে তো তাঁরা পুড়ে যাচ্ছে। তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ আমি এখনই বের হবো।
এরপর ইবনে আব্বাস রা. ওযু করলেন এবং ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির উঠানে বসে খাদেমকে বললেন, যাও বাইরে গিয়ে বল, যারা কুরআন ও তাফসির সম্পর্কে প্রশ্ন করতে চাও। তারা যেনো ভিতরে প্রবেশ করে। অতএব তিনি তাফসির করতে লাগলেন এবং বিভিন্ন জনের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন, একজন তাঁকে সূরা বাকারার প্রথম প্রশ্ন করছে, অপরজন সূরা আলে ইমরান, অপরজন সূরা মায়েদা থেকে, কেউ কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করছে, কেউ আবার শানে নযুল, কেউ আবার কোনো আয়াতের অর্থ ও এভাবে সকলের উত্তর দেওয়ার পর তিনি বললেন তোমরা তোমাদের অন্য ভাইদের আসার সুযোগ দাও, তোমরা এখন চলে যাও। এরপর খাদেম বাইরে গিয়ে হাদিসের ছাত্রাদের ডাকলেন, তাঁরা আসলো এবং ইলম অর্জন করে চলে গেল। তারপর ফিকহ ও আহকামুল ইসলামের ছাত্রাদের ডাকলেন তারা আসলো, এভাবে সকল বিষয়ের ছাত্র একের পর এক আসলো এবং তাঁর থেকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করলো, আল্লাহর কসম বলছি হে, তাঁকে এমন কোনো প্রশ্ন করা হয় নি যার উত্তর তিনি বলেছেন যে, আমি জানি না। তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ইতিহাস, কবিতা সব বিষয়েই তিনি উত্তর দিয়েছিলেন। কুরাইশাহর দৃঢ়তা এভাবে এক একটা মজলিস নিয়ে গর্ত করতে চায়। তারা সারা জীবন গর্ত করতে পারবে।
এদিকে ইবনে আব্বাস রা.-এর প্রথম সাথী অর্থাৎ যাকে নিয়ে সে ইলম অর্জনের সফর বের হতে চেয়েছিল, এরিই মধ্যে অনেক বড় কামার হয়েছে। একদিন পথের মধ্যে দুইজন দেখে যায়, তখন সেই ছেলেটি ইবনে আব্বাস রা.-এর মাথায় চুমু খায় এবং তাকে একটা ফাতওয়া জিজ্ঞেস করে বলে ইবনে আব্বাস আল্লাহর শপথ করে বলছি তুমি আমার চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান ছিলে।
হে ভাই ও বোনরা! এটাকেই বলে উচ্চ মনোবল। তুমি কি দেখো না দুই জন ছেলে একসাথে পড়া-লেখা শুরু করে, এরপর একজন হয় অনেক বড় আলেম আর অন্যজন সাধারণই থেকে যায়। একজন হয় হয়েছেয়ে কুরআন, মসজিদের ইমাম-খতীব আর অন্যজন সাধারণ মানুষই থেকে যায়। এক মহিলা আল্লাহর পথের দায়ি' হয় আর অন্যজন সাধারণ নারীই থেকে যায়। সবাই বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে; কিন্তু পার্থক্য হল কর্ম-পদ্ধতি, সুন্দর পরিকল্পনা, কঠোর সাধনা আর আল্লাহর রহমত। সুতরাং যারা পৃথিবীতে কিছু হতে চায়, তারা যেনো মনোবল উঁচু রাখে এবং তার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন সাধনা করে যায়। ইন-শা-আল্লাহ সে একদিন সফল হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন।
টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ১২৩
১. সূরা আল আ’রাফ, আয়াত: ১২
📄 আত্মবিশ্বাস
আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়মনোবলের ক্ষেত্রে মানুষ কত-না বিচিত্র প্রকৃতির হয়ে থাকে। কারো সাথে কারো ইচ্ছা-বিশ্বাসের কোনো তুলনাই হয় না, যেমন কেউ আপন লক্ষ্যের অর্ধেকাটা পেলেই বেজায় খুশি; আবার কেউ কাঙ্ক্ষিত বস্তুর কিঞ্চিৎ পেলেই কত-না বেশি; কিন্তু কিছু মানুষ-যারা আপন লক্ষ্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেইতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে, যেমনটি বলা হয় যায়েদ ইবনু মুলাহহাবের ব্যাপারে (কথিত আছে, যায়েদ ইবনু মুলাহহাবের লক্ষ্য ছিলো দেশের মন্ত্রী-গভর্নর হওয়ার; তাই সে নিজের জন্যে নির্দিষ্ট কোনো ঘরবাড়ি নির্মাণ করেনি, সে থাকত কিছুদিন এ-বাড়িতে, কিছুদিন ও-বাড়িতে।) লোকেরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করতো, তুমি কখন নিজের জন্যে একটা বাড়ি নির্মাণ করবে? উত্তরে সে বলতো, আমার বাড়ি তো হল দারুল ইমারাত (প্রিন্সিপ্যালিটি হাউজ), নতূবা কারাগারের আবাধ্যা খর বা অন্ধকার কবর; এর বাইরে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই।
আসুন! এ বিষয়ে আমরা কয়েকটি ঘটনা আলোচনা করি। যার মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো যে, উঁচু মনোবল ও আত্মবিশ্বাস কাকে বলে? মনোবলের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য হয়ে থাকে? এবং কীভাবে উঁচু মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ পৃথিবীতে স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পারে?
বর্ণিত আছে, এক ব্যবসায়ী তার ছেলেকে ব্যবসা শিখাতে চাইলো, যাতে করে ছোট বয়স থেকেই সে কর্মঠ-পরিশ্রমী ও বিচক্ষণ হয়ে উঠতে পারে, সাথে সাথে সে যেনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখে এবং অলস-অকর্মণ্য হয়ে পরনির্ভরশীল না হয় যায়। বরং একজন পরিশ্রমী, খেটে খাওয়া মানুষে পরিণত হয়। সুতরাং একদিন ছেলেকে ডেকে বলল, প্রিয় ছেলে আমার! এই নাও এক হাজার দিরহাম, যাও অমুক দেশে গিয়ে পণ্য কিনে নিয়ে এসো। আমি চাই তুমি এখন থেকেই ব্যবসা শিখো, এবং কীভাবে পণ্য বেচা-কিনা করতে হয়, কীভাবে পণ্য বহন করতে হয় এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে কীভাবে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে হয় সেই কৌশল তুমি এখন থেকেই ভালোভাবে আয়ত্ত করা শিখো। সাথে সাথে অত্যন্ত উঁচু দর্জে দীর্ঘ সফর ও সফরের ক্লান্তির সাথৈ। অর্থাৎ তুমি এখন থেকেই একজন সফল ব্যবসায়ীত্তে পরিণত হও।
পিতার কথায় ছেলেটি টাকাগুনো নিয়ে সফর শুরু করলো। কিছু দূর যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের নিচে বিশ্রাম করতে বসলো। সে যখন গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করছিলো তখন দেখলো, একটি শিয়াল অলস ভঙ্গিতে তার সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়ে পাশের একটা গাছের নিচে বসলো, যেনো তার কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। এরপরই হঠাৎ সে দেখলো পেশী একটা হরিণ খুব জোরে দৌড়াচ্ছে আর তাকে ধরার জন্যে তার পিছে পিছে একটা সিংহ দৌড়াচ্ছে। হরিণটি প্রাণপনে ছুটছে আর পিছনের পা দিয়ে বাঘ ও পাথর ছুড়ে মারছে সিংহের মুখে; কিন্তু সিংহ নাছোড়ছাড় হয়ে তাকে ধরার জন্যে তার পিছনে ছুটছে। এক পর্যায়ে সিংহ যখন হরিণটির একেবারে কাছে চলে আসলো তখন হরিণটি তার পিছনের পা দিয়ে সিংহের নাকে মুখে লাথি মারতে লাগলো, সিংহটির চেহারায় ব্যথা ও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠলো তবুও সে তার পিছু ছাড়লো না। এভাবে এক পর্যায়ে সিংহটি হরিণকে ধরে ফেলল এবং তাকে ছিঁড়ে ভিন্ন অংশ খেয়ে বাকিটা ফেলে চলে গেল। এরপরশিয়ালটি বিরে-সুখে উঠে হেলদুলে গিয়ে তার আহার সম্পন্ন করলো। অলস শিয়ালটির আহার করতে না কোনো কষ্ট করতে হল না কোনো ধাবমান হরিণের সুরের আঘাতও সহ্য করতে হল বরং সে একটি গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করল আর খাবারও প্রস্তুত হয়ে তার সামনে চলে আসল। আর সে প্রস্তুতকৃত খাবার খেয়ে আবার এসে গাছের নিচে আরাম করা শুরু করলো।
এই কাহিনী দেখে ছেলেটি মনে মনে বলল, এই সিংহটি কত কষ্ট করে ক্লান্ত হয়ে হরিণটিকে শিকার করলো অথচ তার ভাগ্যে সামান্যই জুটলো, সে অল্প খেয়ে বাকিটা ফেলে চলে গেল। অন্যদিকে শিয়ালটি কোনো কষ্টই করলো না, তবুও সে কত আরামে খাবার খেতে পারলো। তাহলে আমি কেনো এত কষ্ট করে নিজেকে ক্লান্ত করে অর্থ উপার্জন করবো? কেউতো আর না খেয়ে ক্ষুধা-অবুজও ও পিপাসার্ত হয়ে মারা যায় না। অতঃপর সে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সামনে অগ্রসর না হয়ে পিছনে দেশে ফিরে এলো। এমন সময় তাকে দেখে দেখে পিতা তো একেবারে অবাক। তাকে জিজ্ঞেস করলো, প্রিয় ছেলে! তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে? ব্যবসা করতে যাওনি? ছেলেটি তখন বাবাকে দেখে দেখা শিয়াল, সিংহ আর হরিণের কাহিনী শুনিয়ে বললো, বাবা! কেউতো আর না খেয়ে মারা যায় না, সুতরাং আমিও না খেয়ে মরবো না। তাহলে কেনো এত পরিশ্রম করে নিজেকে কষ্ট দিবো?
বিচক্ষণ বাবা তখন এই নির্বোধ ছেলেকে বলল, প্রিয় ছেলে আমার! আমি চাই তুমি শিয়াল নয়; সিংহ হয়ে বেঁচে থাকো। পরিচালিত নয়; পরিচালক হও, আমি চাই তুমি গাড়ীওয়ালা হও; চেকপোষ্টে বাইক থেকে গাড়ির মালিককে চেক করার কাজ না করো, আমি চাই তুমি প্রকৌশলী হও; ভাড়াট্টিয়ে নয়। প্রিয় পাঠক! এটাই হল দুই জনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইচ্ছা-সংকল্পের মধ্যে পার্থক্য। আর এই পার্থক্যের কারণেই দুইজন ছাত্র একই সাথে একই ক্লাসে পড়ার পরও দুইজনের অবস্থান দুইধরনের হয় এবং দুই জনের মধ্যে থাকে অনেক বড় ব্যবধান।
এখন এখানে আমি আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটা মজার ঘটনা উল্লেখ করছি। আজ থেকে প্রায় ২০/২২ বছর আগের কথা। আমি যখন মাধ্যমিক স্তর শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র। আপনারা তো জানেনই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদের মধ্যে কতটা পরিবর্তন ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বেশিরভাগ ছাত্রেরর বাবাই ছেলেকে একটা গাড়ি কিনে দেয়। আর যার গাড়ি না থাকে সেও কোনো না কোনোভাবে একটা গাড়ী ব্যবস্থা করে নেয়। ছাত্ররা তখন মনে করতো থাকে তার পড়া-লেখার সময় শেষ হয়ে গেছে, কারণ এরপরে তো আর কোনো পড়া-লেখা নেই, এরপরই হল কর্মজীবন প্রবেশের সময়। অনেকেই আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিয়ের বিষয়টা চিন্তা করতে থাকে, আবার কেউ কেউ অন্যের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। অর্থাৎ প্রায় সকলেই মনে করে তার পড়া-লেখার সময় সে পার করে এসেছে, এখন আর তাকে পড়া-লেখা করতে হবে না।
যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম সপ্তাহেই আমাদেরকে বই-পত্র দেওয়ার কথা। আমাদেরকে দেওয়া হল শায়খ শওকানি রহ.-এর লেখা “আল ফাতহুল কাদির ফিত তফসীর” নামক কিতাবটি কিতাবটি বেশ বড়, ছয় খন্ডের। ইতঃপূর্বে আমরা এত বড় কিতাবের সাথে পরিচিত ছিলাম না, কারণ আমরা মাধ্যমিকে যে কিতাবগুনো পড়েছি তা ছিলো ছোট ছোট, কোনো কোনোটা তো ৪০ পৃষ্ঠার চেয়েও কম। এত বড় কিতাব হাতে পেয়ে অনেকেই কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখতে লাগলো, কেউ কেউ তাঁদের নিজের নাম লিখলো। আমি কিতাব খুলে ভিতরের আমার নাম লিখলাম, আমি আর আমার নাম লিখলাম ‘ড. মুহাম্মাদ আল-আরিকি’। আমার পাশে যে ছেলেটি বসা ছিলো সে মাঝেমধ্যে আমার সাথে পড়ছে। সে আমার নাম ‘ড. মুহাম্মাদ আল-আরিকি’ লিখতে দেখে আমার দিকে তাকালো আর আমাকে বললো, তুমি কি ডক্টর লিখেছ? অর্থাৎ তুমি ডক্টর হতে চাও? আমি বললাম, ইন-শা-আল্লাহ, আল্লাহর ইছায় আমি এখানে ভর্তি হয়েছি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার জন্যই। তখন সে বললো, আগে হয়ে নাও!! দাল (د.)দেখলেই সেটাকে ‘দাল’ মনে করো না, দাল দিয়া (حِجَازَا) দাজাজাজাও (মুরগি) হয়। সে ‘দাল’ দিয়ে আরো কয়েকটি শব্দ বললো, যা এখন আমার মনে নেই। আমি তখন হাসলাম এবং বললাম, অপেক্ষা করো যখন কয়েক বছর পর ডক্টর হবো তখন দেখতে পাবে।
আল্লাহর ইচ্ছায় এরপর থেকে আমি লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম এবং তা বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় সংকল্প করলাম, পড়া-লেখায় অনেক মেহনত-মুজাহাদা শুরু করলাম এবং একসময় ডক্টরেট সনদ অর্জন করলাম। এ ঘটনা বলার দ্বারা আমার উদ্দেশ্য হল একথা বুঝানো যে, আত্মবিশ্বাস দৃঢ় মনোবল ও চিন্তা-চেতনার মধ্যে মানুষে মানুষে অনেক পার্থক্য থাকে। অর্থাৎ তুমি যদি শুরু থেকে নিজের জন্যে একটা পরিকল্পনা সাজাও এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্প করো এবং লক্ষ্যে পৌঁছা পর্যন্তও কিছুতেই সন্তুষ্ট না হয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে লক্ষপানে ছুটে চলো, তাহলে তুমি একসময় তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছবেই, ইন-শা-আল্লাহ।
আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মেধাবী, পরিকল্পনাকারী ও সৃজনশীল আবিষ্কারকদের পছন্দ করতেন এবং তাঁদেরকে উৎসাহ দিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক শুক্রবার মসজিদে খুতবেরর ডালের সাথে হেলান দিয়ে খুত্ববা দিচ্ছিলেন, তখন এক নারী সামনে এগিয়ে এসে তাঁকে বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার ছেলে নিদ্রী, আপনার অনুমতি হলে আমি তাঁকে দিয়ে একটি শিখা বানাবো যাঁর উপর দাঁড়িয়ে আপনি খুত্ববা দিবেন। (মহিলাটি ছিলো বুদ্ধিমতী ও সৃজনশীল চিন্তার অধিকারিণী) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কী বললেন? তিনি কি তাঁকে বললেন, না মিম্বর বানানোর দরকার নেই, এখানে উদ্দেশ্য তো হল আমার আওয়াজ সকলের কানে পৌঁছায়, এখন তো আমার আওয়ায় সকলের কানে পৌঁছায়, সুতরাং মিম্বর বানানোর কোনো দরকার নেই, তার চেয়ে তুমি ঐ টাকাগুনো গরিব মানুষকে দান করে দাও। না তিনি একথা বলেন নি; বরং তিনি একজন বুদ্ধিমতী মহিলার সৃজনশীল চিন্তার মূল্যায়ন করলেন। তিনি তাকে বললেন ঠিক আছে তোমার ছেলেকে বলো, মিনার বানাতে।
এরপর স্বভাবের মাঝামাঝিতে ছেলেটি এসে তিনস্তর বিশিষ্ট মিনার তৈরি করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তার উপর দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন। এই মিনার্বের উপর দাঁড়িয়ে খুতবা দিলে আশের চেয়ে আওয়াজ আরো স্পষ্টতইে মানুষের কাছে পৌঁছে এবং ভিড়ের সময় আগে যেখানে সামনের দিক থেকে চার পাঁচ কাতারের বেশি মানুষের চেহারা দেখা যেতো না এখন সেখানে অনেক মানুষের চেহারা দেখা যায়।
এরকম অন্য আরেকটি ঘটনা, খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে আত্মযুদ্ধের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ করছিলেন তখন সালমান ফারসি রা. পরামর্শ দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের দেশে (পারস্য) যখন শত্রুরা আক্রমণ করতে আসতো তখন আমরা পরিখা খনন করতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সালমান ফারসি রা.-এর এই অভিনব পরামর্শ গ্রহণ করলেন। যদিও এই পদ্ধতির সাথে আরবদের পরিচয় ছিলো না, তথাপিও এই পরামর্শকে যুক্তিযুক্ত হওয়ার কারণে তিনি তা গ্রহণ করলেন এবং সাহাবিদের পরিখা খননের নির্দেশ দিলেন। পরিখা খননের জন্যে সাহাবিদের দশজন দশজন করে গ্রুপ করে দিলেন এবং প্রত্যেক দশগজ করে খননের দায়িত্ব দিলেন। তিনি নিজেও খনন কাজে শরিক হলেন। পরিখা খননের সময় সামনে পাথর পড়লে তা কীভাবে ভাঙতে হবে একটি পাথর ভেঙে সাহাবিদের তাও শিখিয়ে দিলেন।
হে ভাই! আমরা মুসলমানগণ, আমাদের ধর্ম ইসলাম। আমাদের ধর্ম স্থল সবচেয়ে সুন্দর ধর্ম ও সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এখানে সৃজনশীল ও পরিশ্রমীদের মূল্যায়ন করা হয়।
কিন্তু যে ব্যক্তি তার লক্ষ্য অর্জনের জন্যে কোনো পরিকল্পনা করবে না এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে ধারাবাহিকতাও এর জন্যে পরিশ্রম করবে না, সে কখনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না, এবং জীবনে উল্লেখযোগ্য কিছুই হতে পারবে না। সুতরাং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে চাইলে আত্মবিশ্বাসের সাথে ধারাবাহিকতাও পরিশ্রম করতে হবে।
বৃদ্ধ বয়সে জীবনের শেষ দিকে এসে আবু হুরাইরা রা. অধিক পরিমাণে হাদিস বর্ণনা করতেন। তখন কেউ কেউ বলতো ‘আবু হুরাইরা বেশি হাদিস বর্ণনা করে’। এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা রা. বলেন, মানুষ বলে আবু হুরাইরা বেশি হাদিস বর্ণনা করে, যেনো তারা এর মাধ্যমে আমার উপর এই অপবাদ আরোপ করতে চায়, যে আমি হাদিস বানিয়ে বর্ণনা করি!! এরপর তিনি বলেন, আমার আনসার ভাইয়েরা ক্ষেত-খামার ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সবসময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য গ্রহণ করতে পারতো না এবং তাঁর থেকে হাদিস মুখস্থ করতে পারতো না এবং আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কাজের ব্যস্ততার কারণে সবসময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য গ্রহণ করতে পারতো না এবং তাঁর থেকে হাদিস মুখস্থ করতে পারতো না; কিন্তু আমি ছিলাম দরিদ্র লোক, কোনো মতে পেট ভরে কিছুও খেতে পারলেই আমার চলতো, আমি সর্বদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাথে থাকতাম এবং একদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার স্মরণ শক্তি কম, আমার কিছুই মনে থাকে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, তোমার চাদর বিছাও, আমি তখন আমার গায়ের চাদর বিছালম। আমি ছিলাম খুব দরিদ্র, আমার চাদরের উপর দিয়ে তখন উকন হাঁটছিল। চাদর বিছানোর পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া পড়ে তাতে ফুঁ দিলেন এবং আমাকে বললেন এবার এটা গায়ে জড়িয়ে নাও। আমি তখন তা আমার বুকের সাথে জড়িয়ে নিলাম। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এরপর থেকে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা কিছু শুনতাম তা আর ভুলতাম না।
হে ভাই! সুযোগ সব সময় আসে না। হঠাৎ করে আসে আবার হঠাৎ শেষ হয়ে যায়। সুতরাং তোমাকে সর্বদা সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে। যখন যা আসে সাথে সাথে তা লুফে নিতে হবে এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। যেমন কবি বলেছেন,
وَمَا نَيْلُ الْمَطَالِبِ بِالتَّمَنِّي وَلَكِنْ تُؤْخَذُ الدُّنْيَا غَلابًا
'শুধু আশা-আকাঙ্ক্ষা দিয়ে উদ্দিষ্ট বস্তু অর্জন করা যায় না। বরং দুনিয়াকে ধরতে হলে তাকে পরাজিত করে নিতে হয়।'
সুতরাং একবার লক্ষ করে দেখো, আবু হুরাইরা রা. তার লক্ষ্যে স্থির থাকার কারণে আজ কোথায় পৌঁছে গেছেন, আজ চৌদ্দশত বছর পরেও ছোট-বড় সকলেই আবু হুরাইরা রা.কে চিনে। তুমি প্রথম ক্লাসের ছোট ছোট ছেলেকেও জিজ্ঞেস করো, তুমি কি আবু হুরাইরা রা.কে চিনো? উত্তরে সে বলবে, হ্যাঁ আবু হুরাইরা রা.কে চিনি, তিনি তো আমাদের প্রিয় নবিজির প্রিয় সাহাবি ছিলেন। অথচ এই আবু হুরাইরা রা. ইসলাম গ্রহণ করেন সপ্তম হিজরিতে অর্থাৎ তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাত্র তিন/চার বছর হাতে পেয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি ইসলামের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে রয়েছেন।
একই কথা বলা যায় খালেদ ইবনে ওয়ালিদ, আবু বকর ইবনে কুহাফা, ওমর ইবনে খাত্তাব, উসমান ইবনে আফফান, আলি ইবনে আবু তালেব রা.দের সম্পর্কে। তাঁরা সকলেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য গ্রহণে দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন। তাঁদের কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুহবত-সান্নিধ্যই ছিলো সবচেয়ে প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত বিষয়। তাঁরা সর্বদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ গ্রহণ করতেন। এই যে, বেলাল রা. এত উচ্চতর কীভাবে আরোহণ করলেন, কীভাবে তিনি এই কঠিন নির্যাতন সহ্য করে ইসলামের উপর অটল-অবিচল রইলেন? তাতো কেবল দৃঢ় সংকল্প ও উঁচু মনোবল এবং নিজের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে।
আর একটি ঘটনা বলব আজকের আলোচনা শেষ করছি, রাবিয়া ইবনে কা'ব রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওযুর পানি এনে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তাঁর খেদমতে সন্তুষ্ট। অথচ তখন তাঁর বয়স তের বছরও অতিক্রম করে নি। এই বালক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে ওযুর পানি ব্যবস্থা করেন। কখনো কখনো তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরজার সামনেই ঘুমিয়ে যেতেন, সেখানেই রাত কাটয়ে দিতেন, কারণ হয়তো রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হবেন আর তাঁর ওযুর পানির প্রয়োজন হবে; কিন্তু তখন তিনি পাবেন না। তাই তিনি তাঁর দরজার সামনেই ঘুমিয়ে যেতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তাঁর প্রতি খুবই সন্তুষ্ট। একদিন রাবিয়া ইবনে কা'ব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওযুর পানি দিলে দিচ্ছিলেন এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, রাবিয়া! তুমি আমার কাছে কিছু চাও। রাবিয়া ইবনে কা'ব রা. ছিলেন তখন ছোট, তিনি অনেক কিছুই চাইতে পারতেন, যেমন কাপড় চাইতে পারতেন, চাদর চাইতে পারতেন, লুঙ্গি চাইতে পারতেন, মজাদার কোনো খাবার চাইতে পারতেন অথবা অন্য কিছু; কিন্তু না তিনি এর কিছুই চাননি। তিনি বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি আপনার কাছে কিছু চাইবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ চাও। আমি বললাম, আমাকে একটু সুযোগ দিন, আমি একটু ভেবে বলি আমি কী চাইবো? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ভাবার সুযোগ দিলেন, অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! জান্নাতে আপনার সাথী হতে চাই। তখন নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এছাড়া অন্য কিছু কি চাও? তিনি বললেন, আমি তখন লজ্জা পেলাম এবং বললাম এটাই যথেষ্ট। অতঃপর তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে বললেন, জান্নাতে আমার সঙ্গী হতে চাইলে বেশি বেশি সালাত আদায় করবে।
আল্লাহু তায়ালা আমাদের সকলকে দৃঢ় সংকল্প ও উঁচু মনোবল সম্পন্ন আত্মবিশ্বাসী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।