📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 খৃস্টান বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ

📄 খৃস্টান বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সকল নবি-রাসূলদের একই দীন ও একই আকিদা-বিশ্বাস দিয়ে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ

‘আমি সকল রাসূলকে তাঁদের স্বজাতির ভাষায়ই প্রেরণ করেছি, যাতে করে স্পষ্টভাবে তাদের নিকট বর্ণনা করতে পারে।’

নবি-রাসূলগণ তাঁদের কওমের নিকট কী বর্ণনা করবে? অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন:

أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَمَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ

‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো মাবুদ নেই।’

সকল নবি-রাসূলই তাঁদের কওমের নিকট এসে তাঁদেরকে বলতেন, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো মাবুদ নেই; কিন্তু তাঁদের এই সতর্কবাণী সত্ত্বেও মানুষ শিরকে পতিত হয়। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করে। আল্লাহর জন্যে সন্তান সাব্যস্ত করে। এবং আল্লাহর সাথে অন্য মাবুদের ইবাদত করে। যেমন ইহুদিরা করেছে, আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে বলেন;

وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ

‘ইহুদিরা বলে ওয়াইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে ঈসা-মাসিহ আল্লাহর পুত্র। এটা হচ্ছে তাদের মুখের কথা।’

তারা কেনো ওয়াইরকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করে বলে যে, ওয়াইর আল্লাহর পুত্র? কারণ ওয়াইর একজন সত্য নবি ছিলেন, তিনি বসে বসে আল্লাহর ইবাদত করতেন আর আসমান থেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্যে খাবার আসতো। এ-কারণে ইহুদিরা বলতো, তিনি আল্লাহর পুত্র না হলে আল্লাহ তাঁর জন্যে আসমান থেকে খাবার পাঠাতেন না। তাই তারা তার বংশ আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে দিয়েছে। অন্য দিকে নাসারারা বলে মাসিহ (হযরত ঈসা আ.) আল্লাহর পুত্র,...।

আমরা এখন খৃস্টান বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটাবো। আমার কিছু খৃস্টান বন্ধু আছে। যাদের কেউ আমার প্রতিবেশী, তাদের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। তাদের সাথে আমার কথা হয়, গল্প হয়, হাসি-ঠাট্টা হয়। কেউ কেউ আমার সাথে লেখা-পড়া করেছে এবং তাদের কেউ কেউ এখনও আমাকে তাদের বন্ধু মনে করে। যদিও তারা মুসলিম নয় খৃস্টান, তবুও তাদের সাথে আমার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ইহুদি প্রতিবেশী ছিল, তিনি তাদের সাথে সর্বদা ভাল ব্যবহার করতেন। তিনি খৃস্টান মুত্তাফকিনের নিকট হাদিয়া প্রেরণ করেছেন এবং এবং তাওয়া গ্রহণ করেছেন। সুতরাং আমার আজকের আলোচনার বিষয় হল খৃস্টান বন্ধুদের সাথে কিছু আলোচনা এবং খৃস্টান গাড়ি চালকের সাথে আমার কথোপকথন।

আমি একবার মিসরে একটা মেলায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফেরার সময় বিমানবন্দরে আসার জন্যে আমি একটি ট্যাক্সি ভাড়া করতে রাস্তায় গিয়ে দাড়ালাম এবং হাত দিয়ে একটি ট্যাক্সির দিকে ইশারা করতেই একটি ট্যাক্সি আমার সামনে এসে থামল। আমি চালকের সাথে ড্রাইভার বিষয়ে একমত হওয়ার পর গাড়িতে উঠলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর আমি চালককে জিজ্ঞেস করলাম। কেমন আছেন? আল্লাহ রহমতে মনে হচ্ছে ভালই আছেন। ট্যাক্সি চালক কি কষ্ট হচ্ছে? সে বললো, কষ্ট তো কিছুটা হয়ই, তবে ছেলে-মেয়েদের জন্য তো এতটুকু কষ্ট করতেই হবে। আমি বললাম, সন্তানদের জন্যে কষ্ট করলে আল্লাহ তাআলা এর প্রতিদান দিবেন।

কিছুক্ষণ পর সামনে এক জায়গায় জ্যামে পড়লো, তখন আমি লক্ষ করলাম তার হাতে একটি ক্রুশ ঝুলানো। তখন আমি তাকে বললাম এটা কী? সে বললো, এটা ক্রুশ। আমি বললাম এটা হাতে রেখেছো কেনো? সে বললো, আমি খৃস্টান। আমি বললাম তোমার নাম কী? সে বললো, অমুক। আমি এখন তার নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে আমার মনে হচ্ছে সে বলেছিলো তার নাম ইয়াসির। আমি বললাম ভাল। আচ্ছা ইয়াসির আমি তোমার সাথে ইসলাম ও খৃস্টান ধর্ম সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি, তুমি কি এতে সম্মত আছো। সে বললো, ঠিক আছে।
আমি: ইয়াসির! তুমি তো মনে করো যে, ঈসা আ. আল্লাহর পুত্র ঠিক না?
ইয়াসির: হ্যাঁ। ঈসা আমাদের রবের পুত্র।
আমি: তাহলে বুঝা যায় আল্লাহ তাআলা সন্তান পছন্দ করেন এবং তিনি একাধিক সন্তান হন এবং এটাও পছন্দ করেন আর সেজন্যেই তার একটি সন্তান হয়েছে যার নাম ঈসা। কথাটা কি সঠিক?
ইয়াসির: হ্যাঁ।

আমি: আল্লাহ তাআলা চান যে, তাঁর অনেকগুলো সন্তান হোক আরএই চাওয়া পূরণের সক্ষমতাও তাঁর রয়েছে। তাহলে তাঁর একটিমাত্র সন্তান কেনো?

ইয়াসির: আল্লাহ আমাদের রব। আর তিনি এটা চেয়েছেন তাই এমনটি হয়েছে।

আমি: ইয়াসির! শোনো, আল্লাহ্ তাআলার কোনো সন্তান নেই। তোমরাই নিজেদের পক্ষ থেকে আল্লাহ্র ব্যাপারে এই অপবাদ দিয়েছো। এবার একটু ভিন্ন পয়েন্টে কথা বলি। আল্লাহ্ তাআলার তো সন্তান আছে যার নাম ঈসা, তাহলে ইঁসার সন্তান নেই কেনো? আর আল্লাহ্র সন্তান আছে এবং তিনি একাধিক সন্তানও চান, তাহলে তার বাবা-মা নেই কেনো?

ইয়াসির: আল্লাহ্ আমাদেরকে এটাই জানিয়েছেন। তাই আমরা তাদের ইবাদত করি। আর এটা তাদেরও হক। এর বাইরে আমি কিছুই জানি না, কারণ তিনি আরব রব, তিনি আমার ইলাহ্।

আমি: আর একটি বিষয়। তুমি তো মনে কর যে, ঈসা আ. আল্লাহ্র সন্তান আর তিনি গুনাহের কাফ্ফ্ফারার জন্য শুলে বিদ্ধ হয়েছেন?

ইয়াসির: হ্যাঁ।

আমি: কোন গুনাহ বা ভুলের কারণে তিনি শুলে বিদ্ধ হলেন?

ইয়াসির: আদম আ.-এর ভুলের কারণে।

আমি: আদম আ.-এর ভুলটা কী?

ইয়াসির: আল্লাহ্ তাআলা আদমকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছিলেন। তিনি জান্নাতে প্রবেশ করে একটি নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ্ তাঁকে ঐ ভুলের কারণে কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করলেন, যার কোনো কাফ্ফ্ফারা হয় না এবং তারপর এই অপরাধের গুনাহ্ তার সন্তানদের উপর থেকে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা আদম সন্তানদেরকে এই অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য নিজ সন্তানকে প্রেরণ করে শুলে চড়িয়েছিলেন, যাতে করে আদমের ভুলের কাফ্ফ্ফারা হয়।

আমি: চমৎকার! ভুলটা মূলত কার? আদম আ.-এর না-কি ঈসা আ.-এর?

ইয়াসির: আদম ভুল করেছে।

আমি: ভুল যদি আদম আ.-এর হয়ে থাকে তাহলে ঈসা আ.কে কেনো শুলে চড়ানো হলো? আদম আ.কেই শুলে চড়ানো হতো।

ইয়াসির: আমি জানি না এটা কেনো হলো; কিন্তু বিষয়টি এমনই হয়েছে।

আমি: আদম আ. যে অপরাধটা করেছে তা হলো কী একটা গাছের ফল খেয়েছেন আর তার কাফ্ফ্ফারা স্বরূপ আল্লাহ্ তাআলা নিজ সন্তানকে পাঠিয়ে শুলে চড়ালেন?! একজন আদম যদি দুইটি অপরাধ করতেন তাহলে এর জন্য কাফ্ফ্ফারা কী হতো? প্রথম ও ছোট অপরাধের কাফ্ফ্ফারা যদি হয়ে থাকে নিজ সন্তানকে শুলে চড়িয়ে হত্যা করা তাহলে দ্বিতীয় অপরাধের কাফ্ফ্ফারা কী হতো?

আমি: তিনি শুধু সামান্য একটা গাছের ফল খেয়েছেন, আর এটা তো ছোট একটা অপরাধ। আমি বললাম, এই ছোট একটা অপরাধের কাফ্ফ্ফারা জন‍্য আল্লাহ্ তাআলা নিজ সন্তানকে পাঠিয়ে শুলে চড়ালেন!! আল্লাহ্ তাআলার জন‍্য তো এটা সভাব ছিলো যে, তিনি এই ছোট একটি অপরাধের কাফ্ফ্ফারা নিজ সন্তানকে শুলে না চড়িয়ে অন‍্য কোনো ভাবে আদায় করবেন। যেমন তিনি আমাদের সকলকে টাঁকা পানি পান করতে নিষেধ করতেন। অথবা নির্দিষ্ট একটি দিনে তিনি আমাদেরকে রোগের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। অথবা তিনি আমাদের জন‍্য একশত রাকাত সালাত ফরয করতেন। অথবা তিনি আমাদেরকে অর্থের সম্পদ যাকাত হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন, অথবা অন‍্য কোনো শাস্তি যা অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, কারণ শাস্তি হয়ে থাকে সর্বদা অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থাৎ অপরাধ ছোট হলে শাস্তি হবে ছোট, অপরাধ বড় হলে শাস্তি হবে বড়। যেমন আমি ঘর থেকে বের হওয়ার পর আমার দশ বছরের ছোট ছেলে আমার ব্যক্তিগত কম্পিউটার নিয়ে খেলা করলো, অতঃপর আমি যখন বাড়িতে আসলাম তখন তাকে এই অপরাধের জন‍্য ধমক দিয়ে বলবো, আর কখনো কম্পিউটারের সামনে আসবে না। এটা একটি শাস্তির প্রকার। আমি যদি অন‍্য কোনো শাস্তি দিতে চাই তা হলে তাকে বলবো, ছেলে! আমার কম্পিউটারে যে লেখাছিলো তা তুমি লিখে দাও; কিন্তু ছেলে যদি ইচ্ছা করে কম্পিউটারের সামনে এসে তার উপর চা ঢেলে দেয় তাহলে তার শাস্তি হবে ভিন্ন, কারণ এই অপরাধটা আগের তুলনায় বড় অপরাধ। তাই তার শাস্তিও হবে বড়। আদম আ. যে অপরাধটা করেছে তা হলো কী একটা গাছের ফল খেয়েছেন আর তার কাফ্ফ্ফারা স্বরূপ আল্লাহ্ তাআলা নিজ সন্তানকে পাঠিয়ে শুলে চড়ালেন?! এখন আদম যদি দুইটি অপরাধ করতেন তাহলে এর জন্য কাফ্ফ্ফারা কী হতো? প্রথম ও ছোট অপরাধের কাফ্ফ্ফারা যদি হয়ে থাকে নিজ সন্তানকে শুলে চড়িয়ে হত্যা করা তাহলে দ্বিতীয় অপরাধের কাফ্ফ্ফারা কী হতো?

আমি: আবার তাকে বললাম, ইয়াসির! তুমি এখন বলবে ঈসা ইবনে মার‍্ইয়াম আ.কে কীভাবে শুলে চড়ানো হলো? অথচ আমরা জানি তাঁকে শুলে চড়ানো হয়নি। আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে শুলে চড়ানোর আগেই আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। যেমনিভাবে আল্লাহ্ তাআলা বলেন:

وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِن شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا ۝

'অথচ আল্লাহ্র কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি এবং তাঁর সাথে কোনো মা'বুদ নেই। থাকলে প্রত্যেক মা'বুদ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে চলে যেত এবং

ইয়াসির: ইহুদিরা তাঁকে ধরে শুলের উপর রেখে তাঁকে বেঁধেছে, অতঃপর তাঁর হাতে পায়ে পেরেক মেরেছে, তারপর তাঁর উপর সিরকা ঢেলে দিয়েছে, তারপর তাঁকে ছিঁড়িয়ে মেরে ফেলেছে।

আমি: তোমার কি এই ঘটনা শুনে এনে দৃশ্য কল্পনা করে একটুও কষ্ট হয় না?

ইয়াসির: হ্যাঁ, আমার অনেক কষ্ট হয়।

আমি: তোমাদের ধারণা মতো রব্বুল আলামিন তো তাঁর পিতা, তিনি কি এই দৃশ্য দেখেছেন? এবং তিনি কি তাঁর চিৎকারের আওয়াজ শুনেছেন?

ইয়াসির: হ্যাঁ, তিনি দেখেছেন এবং তাঁর চিৎস্কার শুনেছেন।

আমি: তিনি কি তাঁকে উদ্ধার করতে সক্ষম ছিলেন না?

ইয়াসির: হ্যাঁ ছিলেন।

আমি: তাহলে তিনি তাঁকে কেনো উদ্ধার করলেন না?

ইয়াসির: আমাদের অপরাধের কাফ্ফ্ফারার জন্য।

আমি: কী জন্যে আল্লাহ্ তাআলা একজন‍ের ভুলের কাফ্ফ্ফারা অন‍্যজনের মাধ‍্যমে নিলেন? তিনি এর জন‍্য অন‍্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করলেননা কেনো? কেনো তিনি আদমের ভুলের জন‍্য তাঁর একমাত্র সন্তানকে শুলে চড়ালেন?

এরপর আমি তাকে আরেকটা প্রশ্ন করলাম, ঈসা আ.কে কাদের গুনাহের কাফ্ফ্ফারার জন‍্য শুলিতে চড়ানো হয়েছে, তার পূর্ববর্তীদের জন‍্য না-কি তার পরবর্তীদদের জন‍্য?

ইয়াসির: মাসীহ্ সময় থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যারা আসবে তাদের জন‍্য।

আমি: ঠিক আছে। তাহলে তার আগে যে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ এসেছে ও ইন্তেকাল করেছে তাদের অবস্থা কী হবে? আর ঈসা আ. কে কেনো আর অনেক আগে পাঠানো হলো না? যাতে তিনি তার পূর্বে যারা এসেছিলো তাদের সকলের অপরাধের কাফ্ফ্ফারা করতে পারেন?

ইয়াসির: তিনি আমাদের প্রভু, তিনি এটা চেয়েছেন তাই এমনটা হয়েছে।

আমি: ইয়াসির শোনো! তুমি বলো যে, ঈসা আ. আল্লাহ্র সন্তান, সুতরাং তিনিও ইলাহ্। আর ইলাহ্ যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন এখন কথা হল ঈসা আ. একটা জিনিস এমনভাবে করতে চাচ্ছেন আর আল্লাহ্ বিষয়টি অন‍্য ভাবেকরতে চাচ্ছেন, এখন কার কথা কার্যকর হবে? ঈসা আ.-এর কথা না-কি আল্লাহ্র কথা? যেমন মনে করো আল্লাহ্ চাচ্ছেন, এক লোক মারা যাবে আর ঈসা আ. চাচ্ছেন, সে আজ মরবে না বরং সে কাল মারা যাবে। তাহলে এখন কার কথা কার্যকর হবে? ঈসা আ.-এর না আল্লাহ্র?

ইয়াসির: আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্র কথা চলবে।

আমি: কোনপ্রতিপালক? তোমাদের তো রব তিনজন। আল্লাহ্, তাঁর পুত্র এবং রুহুল কুদ্স বা পবিত্র আত্মা।

ইয়াসির: আমাদের রব, পিতার কথা চলবে।

আমি: তাহলে ঈসা আ. কি রব নন? যতক্ষণ পর্যন্ত ঈসার কথা কার্যকর না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ঈসা আ. রব হতে পারবে না, কারণ এটা হতে পারে না যে, রবের কথা চলবে না, তাঁর কথা কার্যকর হবে না।

ইয়াসির: ইঁসার কথা কার্যকর হবে না।

আমি: তাহলে পিতা ইলাহ্ নয়, কারণ ছেলের কথা কার্যকর হলে পিতার কথা কার্যকর হবে না। আর তখন পিতা ইলাহ্ হতে পারবে না, কারণ ইলাহ্ তো সে-ই যিনি যাছেতাই করতে পারেন।

ইয়াসির: আপনি কি জানেন? তাঁদের সকলের কথাই কার্যকর হবে।

আমি: দুই জনের কথা একই সাথে কোনো একটি বিষয়ের উপর কার্যকর হতে পারে না। অর্থাৎ এক লোক একই সময়ে মৃতও ও জীবিত উভয়টা হতে পারে না।

ইয়াসির: আরে ভাই! এক জনের কথা বাস্তবায়ন হবে।

আমি: কীভাবে? অথচ তাঁদের সকলেই ইলাহ্ বা প্রতিপালক!!

আর এ-কারণেই বিষয়টি আল্লাহ্ তাআলা যেমন বলেছেন তেমনই, আল্লাহ্ তাআলা বলেন:

مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَٰهٍ إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَٰهٍ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ ۝

'আল্লাহ্র কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি এবং তাঁর সাথে কোনো মা'বুদ নেই। থাকলে প্রত্যেক মা'বুদ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে চলে যেত এবং একজন অন্যজনের উপর প্রধান হয়ে যেতো। তারা যা বলে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র।

এই আয়াতেই প্রমাণ যে, আল্লাহ তাআলার কোনো সন্তান নেইএবং বিশ্বপরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি পবিত্র,সবকিছুঁর উর্ধ্বে।

একথা বলার পর আমি তাকে বললাম, ইয়াসির! আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমার কল্যাণকামী, আমি তোমাকে নসিহত করে বলছি, আল্লাহ তাআলা যদি সন্তান চাইতেন তাহলে তিনি তার সৃষ্টরমধ্যেশেষব ইচ্ছেয় যে কোনো সন্তানকে ইচ্ছেয় গ্রহণ করতেন। অথচ আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ থেকে অমূখাপেক্ষী। আল্লাহ তাআলা কাউকে জন্ম দেন নি, তিনি কারো কাছ থেকে জন্ম গ্রহণ করেন নি এবং তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই।

হে ভাই! এই হল আল্লাহ ও ইসা আ. সম্পর্কে তাদের ধারণা। আমি অবশ্যই তাদের কল্যাণকামী, তাদেরকে ভালবাসি। আমি তো পূর্বেই বলেছি অনেক খৃষ্টানের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আছে, যাদের সাথে আমার হাদিয়া দেওয়া নেওয়া হয়। আমি চাই না যে, একজন খৃষ্টানও বেইমান হয়ে এই বিশ্বাসের উপর মৃত্যুবরণ করুক যে, আল্লাহ! আপনি তিন জনের একজন, আপনি একক কোনো ইলাহ নন বরং আমি আপনার সাথে আরো দুইজনকে ইবাদত করি। আসলে এসবের আকিদা-বিশ্বাস তো জায়েয নেই, এটা তো আল্লাহ তাআলার সাথে শিরিক করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَ قَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمٰنُ وَلَدًاؕ لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا اِدًّاۙ تَكَادُ السَّمٰوٰتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَ تَنشَقُّ الْأَرْضُ وَ تَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّاۙ اَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمٰنِ وَلَدًاۚ وَ مَا يَنۡۢبَغِى لِلرَّحْمٰنِ اَنْ يَّتَّخِذَ وَلَدًاؕ اِنْ كُلُّ مَنْ فِى السَّمٰوٰتِ وَ الْأَرْضِ اِلَّاۤ اٰتِى الرَّحْمٰنِ عَبْدًاؕ لَقَدْ اَحْصٰهُمْ وَ عَدَّهُمْ عَدًّاؕ وَ كُلُّهُمْ اٰتِيْهِ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ فَرْدًاؕ

“তারা বলে: দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। নিশ্চয় তোমরা তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করেছ। হয় তো এর কারণেই নভোমণ্ডল ফেটে পড়বে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে এবং পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে। এ-কারণে যে, তারা দয়াময় আল্লাহর জন্য সন্তান আহ্বান করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভনীয় নয়। নভোমণ্ডল-ভূমণ্ডলে কেউ নেই যে, দয়াময় আল্লাহর কাছে দাস হয়ে উপস্থিত হবে না। তাঁর কাছে তাদের পরিসংখ্যান রয়েছে এবং তিনি তাদের গণনা করে রেখেছেন। কেয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে।”

কোনো মানুষের জন্য এ ধারণা করা বৈধ নয় যে, আল্লাহ তাআলার সন্তান রয়েছে।

আল্লাহ এক তাঁর কোনো শরিক নেই। ইসা ইবনে মারয়ম আ. আল্লাহর একজন নবি। আমরা তাঁকে সাহাবায়ে কেরামের চেয়ে বেশি ভালবাসি। আমরা যেমনভাবে আমাদের নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ভালবাসি, তেমনিভাবে ইসা আ. কেও আমরা ভালবাসি। আমরা সকল নবিকেই ভালবাসি, তাঁদেরকে মুহতরম করি; বরং আমরা তাঁদের আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি ভালবাসি এবং ইসা আ.-এর উপর ইমান আনা আমাদের উপর ওয়াজিব, যেমনিভাবে সকল নবি আ.-এর উপর ইমান আনা আমাদের উপর ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন ;

اٰمَنَ الرَّسُوْلُ بِمَاۤ اُنْزِلَ اِلَيْهِ مِنْ رَّبِّه وَالْمُؤْمِنُوْنَؕ كُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَ مَلٰٓئِكَتِه وَ كُتُبِه وَ رُسُلِهؕ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهؕ

“রাসুল বিশ্বাস রাখেন যে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলিমগণও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবাদির প্রতি এবং তাঁর নবি-রাসুলের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর নবি-রাসুলের মধ্যে কোনো তারতম্য করি না।”

আমরা কোনো নবি-রাসুলের মধ্যে পার্থক্য করি না। ইসা আ. অথবা মুসা আ. অন্য যেকোনো নবিকে অস্বীকার করা কারো জন্য বৈধ নয়। সুতরাং আমরা যেমনিভাবে তাঁর উপর ইমান আনি, তেমনিভাবে সকল নবি- রাসুলের উপর ইমান আনি। আমি আমার সকল খৃষ্টান জ্ঞানী বন্ধুদের আহ্বান করব তারা যেনো ভালভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন। তাহলে তারা দেখতে পাবে যে, এমন কোনো প্রমাণ নেই যাঁর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইসা আ. আল্লাহূর পুত্র। এমনকি ইঞ্জিলের কোথাও লেখা নেই যে, ইসা আ. নিজে দাবি করেছেন যে, তিনি আল্লাহ্র পুত্র। বর্তমানে ইঞ্জিলের যে চারটি সংস্করণ রয়েছে তাঁর কোথাও লেখা নেই যে, ইসা আ. আল্লাহ তাআলার সন্তান। (যদিও একথা কেউ বলতে পারবে না যে, বর্তমানে যে ইঞ্জিল রয়েছে তা সত্য এবং একথাও কেউ বলতে পারে না যে, তাঁর কোনোটাই কথার মধ্যে তাঁর কোনোটাই সত্য আর কোনোটাই সত্য নয়।)

পূর্বে মানুষ ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসের উপর থাকা সত্বেও তারা এটা জানতো যে, ইসা আ. আল্লাহর প্রেরিত নবি। এবং তারা এটাও জানতো যে, ইসা আ. তাঁর অনুসারী খৃষ্টানদেরকে এই সুসংবাদ দিয়ে গেছেন যে, তাঁর পরে এক নবি আসবে যার নাম হবে ‘আহমাদ’। তিনি তাঁদের বলেছেন ‘অচিরেই আমার পরে একজন রাসুল আসবে যার নাম হবে আহমাদ’। এবং তিনি তাঁদেরকে তাঁর অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:

وَ مُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَّأْتِيْ مِنْ بَعْدِى اسْمُهُ اَحْمَدُ ؕ

‘এবং আমি এমন একজন রাসুলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন, তাঁর নাম হবে আহমাদ।’

আমাদের হাবিব আমাদের নবি আহমদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে আগমন করেছেন। সুতরাং তাঁকে অনুসরণ করা এখন সকলের উপর ওয়াজিব। আর একারনেই আমরা ইবনুল আস রা. যখন মিসরে আগমন করলেন, মুসলিমগণ মিসর জয় করলেন, তখন মিসরের বেশিরভাগ মানুষ ছিলো খৃষ্টধর্মের অনুসারী। তারা যখন ইসলাম ধর্ম ও তার মাহাত্ম্যগুলো দেখলো এবং তারা এটা লক্ষ করলো যে, ইসলাম ধর্ম ইসা আ.-এর ধর্মের পরবর্তী ধর্ম এবং ইসা আ.-এর ধর্ম ছিলো তাঁর যুগে, তাঁর জাতির লোকদের জন্য। আর ইসা আ. নিজেই বলে গেছেন- তাঁর পরে আহমাদ নামে একজন নবি আল্লাহর সত্য ধর্ম নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করবেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা সারা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য শেষ নবি হিসেবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। তখন তাঁর অনুসরন করলো এবং হাজার হাজার মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো।

আমি অনেক খৃষ্টান ভাইদেরকে চিনি যারা অনেকে বড় বড় শিক্ষিত, তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের, বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার; কিন্তু তারা এখন ইসলাম ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে এসে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা মুসলমান হয়েছেন। এমনকি অনেক পাদ্রিও রয়েছেন যারা ইসলামে প্রবেশ করেছেন, কারণ তারা বিষয়টি নিয়ে ভালোভাবে গবেষণা করেছে, অত:পর তাদের সামনে যখন সত্য প্রকাশিত হয়েছে তখন তারা সত্যের ছায়াতলে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।

আমার জ্ঞানী খৃষ্টান বন্ধুদের যদি জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা বলুন তো আপনারা কি কোনো খৃষ্টান পাদ্রিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে দেখেছেন? অবশ্যই উত্তরে তারা বলবে, হ্যাঁ অনেক পাদ্রিই তো আছেন যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, যেমন আমেরিকার শায়খ ইউসুফ ইস্টেস। তাঁর মতো অনেকে আছে যারা এখন মুসলমান। তাঁদের লেখা অনেক বই আছে এবং ইন্টারনেটে তাঁদের বিভিন্ন লেকচার রয়েছে, অর্থাৎ তাঁরা সাধারণ মানুষ ছিলেন না বরং তাঁরা ছিলেন ধর্মগুরু, গির্জার পাদ্রি-পুরোহিত, তা সত্ত্বেও তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আর তুমি কি কখনো শুনেছো যে, কোনো মুসলিম শায়খ, বড় কোনো আলেম ইসলাম ছেড়ে খৃষ্টান ধর্মে প্রবেশ করেছেন? কেনো খৃষ্টান ধর্মগুরুও ও পাদ্রিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আর মুসলিম আলেমগণ ইসলাম ছেড়ে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে না?

আমি এখানে সাধারণ মানুষের কথা বলছি না। বরং আমি বলছি বড় বড় ব্যক্তিদের কথা যারা ধর্মের শায়খ। হাঁ তাঁদের ইসলামে প্রবেশের কারণ একটাই আর তা হল ইসা আ.-এর অনুসরণ।

তুমি যদি ইসা ইবনে মারয়াম আ.কে প্রকৃতপক্ষেই ভালবাসে থাকো, তাহলে তাঁর অনুসরণ করো। ইসা ইবনে মারয়াম আ. একথা বলেননি যে, তোমরা আমার ইবাদত করো বরং তিনি বলেছেন তোমরা আমার অনুসরণ করো। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَاَتَتْ بِه قَوْمَهَا تَحْمِلُهٗ ؕ قَالُوْا يٰمَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْـًٔا فَرِيًّاۚ يٰۤاُخْتَ هٰرُوْنَ مَا كَانَ اَبُوْكِ امْرَاَ سَوْءٍ وَّ مَا كَانَتْ اُمُّكِ بَغِيًّاۙ فَاَشَارَتْ اِلَيْهِ ؕ قَالُوْا كَيْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِى الْمَهْدِ صَبِيًّاۙ

‘অত:পর তিনি সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন। তারা বললো, হে মারয়াম! তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারুন-ভাগিনী, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিলেন না ব্যভিচারিণী। অত:পর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন, তারা বললো, যে কোনো শিশু তাঁর সাথে আমরা কেমন করে কথা বলবো?’

অনুরূপভাবে ইসা আ. একথাও বলেননি যে, আমি ইলাহ বা আমি আল্লাহর সন্তান বরং তিনি বলেছেন, আমি আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ তাআলা বলেন :

قَالَ اِنِّىْ عَبْدُ اللّٰهِ ؕ اٰتٰنِىَ الْكِتٰبَ وَ جَعَلَنِىْ نَبِيًّاۙ وَّ جَعَلَنِىْ مُبٰرَكًا اَيْنَ مَا كُنْتُ وَ اَوْصٰنِىْ بِالصَّلٰوةِ وَ الزَّكٰوةِ مَا دُمْتُ حَيًّاۙ

‘সন্তান বললো, আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দান করেছেন এবং আমাকে নবি বানিয়েছেন। আমি যেখানে থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন- যতদিন জীবিত থাকি ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে। "
প্রিয় ভাই! সত্যি বলছি, আমি সকলের কল্যাণকামী। অপররূপভাবে সকল মুসলমানই পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য কল্যাণকামী। আমরা যেমনিভাবে মুসলমানদের জন্য কল্যাণ কামনা করি, অপররূপভাবে ইহুদি-খৃষ্টানদের জন্যেও কল্যাণ কামনা করি। প্রতিটি মানুষই নিজের কল্যাণ কামনা করে এবং তার ও তার রবের মাঝে আকিদা-বিশ্বাসকে সুদৃঢ় রাখতে চায় এবং আল্লাহর কাছে সর্বদা কল্যাণের প্রার্থনা করে। আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেনো আমাকে এবং তোমাদের সকলকেই হেদায়াত দান করেন এবং সর্বদা কল্যাণের সাথে রাখেন এবং আমাদের সকলকেই এক আল্লাহর ইবাদত করার তাওফিক দান করেন। আমিন।

টিকাঃ
১. সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪
২. সুরা মু’মিন, আয়াত : ৩২
১. সুরা তাওবা, আয়াত : ৩০
১. সূরা নিসা, আয়াত : ১৫৭
১. সূরা মুমিনুন, আয়াত : ৯১
১. সুরা মারইয়াম, আয়াত : ৮৮-৯৫
২. সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৫
১. সূরা আস-সাফ, আয়াত : ৬
১. সূরা মারইয়াম, আয়াত : ২৭-২৯
১. সুরা মারইয়াম, আয়াত : ৩০-৩১

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 ইসলাম কি শুধু তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে?

📄 ইসলাম কি শুধু তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে?


মানুষের মধ্যে সর্বদা একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আর তা হল ইসলাম কি শুধুমাত্র তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে? মানুষ কি বাধ্য হয়ে দীনে ইসলামে প্রবেশ করেছে? না-কি তারা এই দীনের ব্যাপারে আশ্বস্ত হয়ে এই দীনকে ভালবেসে তা গ্রহণ করেছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিহি ওয়াসাল্লামবিভিন্ন অঞ্চলে সাহাবায়ে কেরামের প্রেরণ করেছেন, তারা সেখানে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, তাদেরকে হত্যা করেছেন, অনেককে বন্দি করেছেন, সুতরাং ইসলাম কি এভাবেই শুধুমাত্র রক্তপাতের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে? আমরা ইতিহাসের পাতায় পড়ি, মুসলমানগণ বিভিন্ন দুর্গে আক্রমণ করেছেন, তা অবরোধ করে রেখেছেন এক মাস, দুই মাস, তিন মাস বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে। যেমন মুসলমান কর্তৃক বাইতুল মাকদিস অবরোধ করে রাখা, এছাড়াও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক খায়বার অবরোধ করে রাখা। এ সকল অবরোধের সময় বিভিন্নভাবে অনেক মানুষ নিহত হয়েছে, যেমন কেউ দূর্গ থেকে পড়ে, কেউ আগুনে পুড়ে, কেউ নির্মিত তীরের আঘাতে হত, এছাড়াও বিভিন্নভাবে অনেক মানুষ নিহত হয়েছে, অনেকে আহত হয়েছে, সুতরাং ইসলাম কি এভাবেই তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে? আমরা সামনের আলোচনা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার চেষ্টা করবো ইন-শা-আল্লাহ। আমি এখানে একটা তালিকা পেশ করবো যা মাধ্যমে প্রমাণ হবে যে, ইসলাম কি শুধুমাত্র তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে না-কি এখানে অন্য আরো কোনো পদ্ধতি রয়েছে যা সাহায্যে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে? ইসলাম কি শুধুমাত্র তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে? না-কি অন্য কোনো পদ্ধতি রয়েছে যার সাহায্যে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে? এটা অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। আমি জানি এটা মানুষের মধ্যে বারবার উচ্চারিত হওয়া একটি প্রশ্ন; কিন্তু কিছু প্রশ্ন এমন রয়েছে যা বারবারই করা হয়ে থাকে, সুতরাং আমাদেরও উচিতও তা নিয়ে আলোচনা করা এবং তা নিয়ে কথা বলা। অর্থাৎ কিছু বিষয় থাকে যা উচারিত হোক বা কেনো প্রাজ্ঞজন তার উক্তিদের মুখেপার্থী, সুতরাং তাদেরও তা জানাতে হবে এবং সে সম্পর্কে তাদের সতর্ক করতে হবে। যেমন আমি প্রতি বছর বা দের/দুই বছরের মধ্যে একবার মাতা-পিতার সাথে সদাচার সম্পর্ক জুমআর দিন একটি খুতবা দেই। মাঝে মাঝে কেউ কেউ আমার কাছে আসে, আমাকে বলে, শায়খ এ-বিষয়ে তো এক দেড় বছর পূর্বে খুতবা দিয়েছেন! আমি তো তখনো আপনার পিছনে সালাত আদায় করেছি, তাহলে কেনো এ-সম্পর্কে আবারও খুতবা দিলেন? আমি তখন তাকে বলি দুই কারণে একে বিষয়ে বারবার খুতবা দেই। প্রথম কারণ: বিষয় বড় এক হলেও খুতবার মধ্যে নতুনত্ব থাকে, অনেকটাই ভিন্নতা থাকে, যেমন বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করি, এ বিষয়ের অন্যান্য আরো হাদিস নিয়ে আসি যা পূর্বে বলা হয়নি। দ্বিতীয় কারণ : বিষয়টা এমন যা নিয়ে সমাজ ও জাতির মধ্যে বেশি আলোচনা হওয়া উচিত। এছাড়াও আট বছর পূর্বে যেনো ছেলেটির বয়স ছিলো ১৪ বছর যখন তার বয়স ১৮/১৯ বছর অর্থাৎ এরই মধ্যে তার জীবনে অনেকটা পরিবর্তন ঘটেছে, তার উপর একটি দায়িত্ব এসে গেছে। তাই তার জন্য মাতা-পিতার সাথে সদাচারের আলোচনা করা প্রয়োজন। এমন আরো অনেক বিষয় রয়েছে যা বারবার আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, যেমন "মন্দ লোকের সাহায্য গ্রহণ", কারণ সমাজে মন্দ লোকের সংখ্যা অনেক, তাদের সাথে অনেক ভাল মানুষ মন্দ স্বভাবে চলে যায়। এরকমই সকল মানুষ যদি মা-বাবার সাথে ভাল ব্যবহার করতো তাহলে এ বিষয়ে নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন হতো না; কিন্তু পরিবার ও সমাজের চিত্র তো ভিন্ন। তাই এসকল বিষয় নিয়ে বারবার আলোচনার প্রয়োজন পড়ে। এই দীর্ঘ ভূমিকার পর আমার মূল আলোচনায় ফিরে আসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবি হিসেবে প্রেরিত হলেন, তিনি মানুষের মাঝে দীনে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন, মক্কার কুরাইশরা তাঁকে বাধা দিল, তাঁকে কষ্ট দিতে শুরু করলো এবং তাঁর মাঝে এবং দীন প্রচারের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ালো, এমনকি মক্কায় তাঁর চলাচল ও বেঁচে থাকাটাই সংকীর্ণ হয়ে গেল। এভাবেই একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করলেন। তিনি মদিনায় গিয়ে কিছু কাল অবস্থান করার পরই সেটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুললেন। মদিনায় তখন মুসলমানগণ ব্যতীত অন্য আরো কিছু অধিবাসীও ছিল, তারা হল ইহুদি ও মুনাফিক সম্প্রদায়। সুতরাং মদিনা একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের আকার ধারণ করার পর তার নিরাপত্তা ব্যবহার প্রয়োজন দেখা দিল, তাই সাহাবায়ে কেরাম রা. মদিনার সীমান্তে পাহারা দেওয়া শুরু করলেন, যেনো বহিরাগত সন্দেহভাজন কেউ মদিনায় প্রবেশ করতে না পারে। অথবা কোনো দিক থেকে যেনো হঠাৎ করে কেউ মদিনায় আক্রমণ করতে না পারে। সন্দেহভাজন কাউকে মদিনার আশপাশে দেখলে তাকে ধরে মদিনায় নিয়ে আসতে হবে, কারণ হতে পারে সে কোনো বাহিনীর অগ্রগামী দলের কেউ।

প্রহরী সীমান্ত-রক্ষীরা একদিন মদিনা-সীমান্ত দিয়ে ইহরাম পরিহিত এক লোককে পাড় হতে দেখল। তখন তারা লোকটির নিকট গিয়ে পরিচয় জানতে চাইল ও এ দিক দিয়ে চলাচলের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলো; সে বললো, আমি ছুমামা ইবনে উসাল, বনি হানিফের সরদার (বনু হানিফা মাজদ-বর্তমানে রিয়াদ-বসবাসকারী একটি গোত্র) তখন সীমান্তরক্ষী সাহাবীরা তাকে বলল, এখান দিয়ে কোথায় যাচ্ছ? সে বললো, আমি মক্কায় যাবো। সাহাবারা কেরাম রা. জানতেন যে, মক্কা হল রিয়াদের পশ্চিমে অবস্থিত, সুতরাং কেউ রিয়াদ থেকে মক্কায় যেতে চাইলেমদিনার এই পাশ দিয়ে আসার কথা নয়। তাই তারা মনে করলো যে, অবশ্যই লোকটা কোনো বাহিনীর অগ্রগামী দলের সদস্য হবে। অন্যথায় সে এখান দিয়ে হাঁটাটাট করবে কেনো? তাই তারা তাকে ধরে মদিনায় নিয়ে এলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তাই তারা তাকে মসজিদের পিলার সাথে বেঁধে রাখল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে এসে সালাত আদায় করার পর তাঁর তাঁকে বলল, আমরা সীমান্ত থেকে এই লোকটাকে ধরে এনেছি, সে সীমান্তের আশপাশে হাঁটাটাটি করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অত্যন্ত কোমলতা ও সহানুভূতি সহকারে বললেন, হে তুমি? সে বললো, আমি ছুমামা ইবনে উসাল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে বললেন তুমি কি নাজদের বনি হানিফের সরদার? সে বললো, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে রেখে সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর নিকট গেলেন এবং তাদের বললেন তোমরা কি জানো তোমরা কাকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছ? তারা বললো, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নাজদের বনি হানিফের সরদার ছুমামা ইবনে উসালকে গ্রেফতার করেছো। মক্কা গম ও সব আমদানি করে তা এই লোকটির নিকট থেকেই আসে। এমন একজন লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে, যে নাজদের বনি হানিফের সরদার এবং মক্কা যত গম ও সব আমদানি করে তা এই লোকটির নিকট থেকেই আসে! অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসলেন এবং তাকে বললেন, হে ছুমামা! ইসলাম গ্রহণ করো। সে বললো, না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ছুমামা তোমার সাথে কী আচরণ করা হবে তুমি মনে করো? সে বললো, আপনি হত্যা করতে চাইলে একজন রক্ত-মাংসের মানুষকে হত্যা করবেন (এটা একজন দৃঢ়চিত্তসম্পন্ন বাদশাহর মতোই কথা)। তিনি বললেন, আপনি হত্যা করতে চাইলে একজন রক্ত-মাংসের মানুষকে হত্যা করবেন, আর যদি অনুগ্রহ করতে চান তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর অনুগ্রহ করবেন। অর্থাৎ আপনি যদি আমার উপর দয়া করে আমাকে মুক্ত করে দেন তাহলে আপনি একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর অনুগ্রহ করলেন। আর যদি আপনি সম্পদ চান তাহলে আপনার যা ইচ্ছা তা চাইতে পারেন, আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আপনার তা দিয়ে দিবে। তারা আপনাকে মিলিয়ন দিরহাম দিতেও প্রস্তুত আছে; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনটিই চাহিলেন না। তিনি তাকে হত্যাও অবস্থাও ছেড়ে দিতে চাহিলেন না, আবার তার কাছ থেকে ফিদিয়া নিয়ে তাকে কায়েস অবস্থাও ছেড়ে দিতে চাহিলেন না। তিনি চাহিলেন যে, সে ইসলামের প্রতি প্রভাবিত হয়ে এখান থেকে ফিরে যাক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ওহুদের যুদ্ধে রেখে আজকের মতো বিদায় নিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দিলেন, তারা যেনো তার সাথে উত্তম ব্যবহার করে, ডাল ডাল খাবার পরিবেশন করে, এবং তার বাহনটিকে প্রতিদিন সকাল বিকেল তার সামনে দিয়ে ঘুরিয়ে দিয়ে যায়, কারণ মানুষ তার বাহনকে অনেক ভালবাসে। বর্তমানে যেমন অনেকের পছন্দের মডেলের গাড়ি থাকে, কোথাও গেলে পছন্দের সেই গাড়ি নিয়ে যায়। কোনো কারণে গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার পরিবর্তে একই মডেলের আরেকটি গাড়ি কিনে নেয়। কিন্তু আগে মানুষের নিকট গাড়ি ছিলো না; তারা পশুর উপর আরোহণ করতো, তাই তাদের নিকট বাহনের কদর ছিলো অনেক বেশি, কারণ অনেক কষ্ট করে একটি প্রশিক্ষিত পশু তার মালিকের মেজাজ ও অনুভূতি বুঝতো ও সে অনুযায়ী তার সাথে আচরণ করতো। সুতরাং সেকালে মানুষের কাছে বহন-উপযোগী পশুর কদর ছিলো অনেক বেশি। বিশেষ করে দূরদূরান্তে সফর-উপযোগী প্রশিক্ষিত পশুর। আর একারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আল্লাহ্ ওয়াসালাম হুমাযা ইবনে উসালের সামনে দিয়ে সকাল বিকেল তার বাহনটি ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, যাতে সে আশ্বস্ত থাকতে পারে যে, তার বাহনটির কোনো ক্ষয়ক্ষতি করা হয়নি। বর্তমানে অবস্থাটি উঁচু রয়েছে যেগুলা ভ্রমণের উপযোগী নয়। সেগুলা খাওয়ার উপযুক্তও। তুমি সেগুলা বাছাই করে তার গোশত খেতে পারবে; কিন্তু সেগুলোতে আরোহণ করে কোথাও ভ্রমণ করতে পারবে না। এখন তো ভ্রমণের উপযোগী পশু খুবই কম বরং একশ’র মধ্যে একটি পশুও কঠিন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম হুমাযা ইবনে উসালের সামনে দিয়ে সকাল-বিকাল তার বাহনটি ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, যাতে সে আশ্বস্ত থাকতে পারে যে, তার বাহনটির কোনো ক্ষতি করা হয়নি, তাকে হত্যা করা হয়নি বরং সেটা এখনও জীবিত রয়েছে এবং আগের মতই অক্ষত রয়েছে।

পর দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। দুমাযা ইবনে উসাল নামাযে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের কুরআন তেলাওয়াত শুনলেন। এরপর সারা দিন তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের সাথে সাহাবায়ের কেরাম রা.-এর আচরণ দেখলেন। অতঃপর দ্বিতীয় দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যখন তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাকে বললেন, দুমাযা! তোমার সাথে কী আচরণ করা হবে বলে তুমি মনে করো? আমি গতকাল যা বলেছিতাই, আপনারনিত্যতা করতে চাইলে একজন রক্ত-মাংসের মানুষকে হত্যা করবেন, আর যদি অনুগ্রহ করতে চান তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপরঅনুগহ্ব করবেন। আর যদি আপনি সম্পদ চান তাহলে আপনার যা ইচ্ছা তা চাইতে পারেন, আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আপনাকে তা দিয়ে দিবে। তারা আপনাকে মিলিয়ন দিরহাম দিতেও প্রস্তুত আছে; কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম এই তিনটি প্রস্তাবের কোনোটিই পছন্দ করলেন না। তিনি তো চান দুমাযা ইসলামে সুশীলতা ছাওয়ায় মোহিত হোক।

তাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম চুপ রইলেন এবং তার কাছ থেকে চলে গেলেন। আর দুমাযা সাহাবায়ে কেরামের সাথে মসজিদে রয়ে গেল, তিনি সাহাবায়ে কেরামের আচার-আচরণ দেখছিলেন আর মুগ্ধ হচ্ছিলেন। তিনি দেখছিলেন সাহাবায়ে কেরামের কেউ সালাত আদায় করছেন, কেউ আল্লাহ্ তাআলার দরবারে কান্নাকাটি করছেন, কেউ কুরআন তেলাওয়াত করছেন। এই দৃশ্যগুলো তার মধ্যে ধীরেসুধীরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকলো। এরপরের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যখন তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, দুমাযা তোমার সিদ্ধান্ত কী? সে বললো, আমি আগে যা বলেছি তাই।

এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তার সাথে কী করলেন? তিনি কি তার মাথার উপর তরবারি ধরে তাকে বললেন যে, ইসলাম গ্রহণ করো, না হলে হত্যা করবো!! না তিনি এটা করলেন না, কারণ জোর করে ভয় দেখিয়ে কাউকে ইসলাম গ্রহণ করানো আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন :

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

‘দীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত (সত-সঠিক পথ) ভ্রষ্টতা থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যে পথভ্রষ্ট তাগুতকে না মেনে আল্লাহতে বিশ্বাস করবে সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ়-মজবুত হাতল বা ভাঙ্গবার নয়। আল্লাহ্ সবাই শুনেন এবং জানেন।’¹

অন্য আয়াতে এসেছে, আল্লাহ্ তাআলা বলেন :

فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ

‘অতএব, যার ইচ্ছা বিশ্বাস স্থাপন করুন এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক।’²

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কারো উপর চাপ সৃষ্টি করেন নি এবং ইসলাম গ্রহণ ক্ষেত্রে কাউকে বাধ্যও করেননি। তিনি বলেন :

যে মানুষ! তোমরা ‘লা-ইলাহ ই’ল্লাল্লাহ্’ বলো, সকল হবে, নাজাত পাবে।

এমনকি তিনি মক্কার মানুষদেরও ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেননি, যারা তাকে নির্যাতন করে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যখন দুমাযা ইসলাম গ্রহণ করছে না এবং তার ইসলাম গ্রহণের কোনো সম্ভাবনাও নেই; সে ইসলাম গ্রহণের সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছে, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তার সাথে কী ধরনের আচরণ করলেন?

দুমাযা ইবনে উসাল ছিলেন সম্মানিত মানুষ। তাই তার সাথে তিনি সেই ব্যবহারই করলেন যা তার জন্য উপযুক্ত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যখন তৃতীয়বার তার কাছে আসলেন এবং তার সিদ্ধান্ত জানতে চাইলেন এবং সে আগের মতই তার উত্তর দিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তখন সাহাবায়ে কেরাম রা.-কে বললেন, তোমরা দুমাযাকে ছেড়ে দাও। সাহাবায়ে কেরাম রা. বললেন, আমরা তার কাছ থেকে কোনোধরনের মুক্তিপণ আদায় না করেই তাকে ছেড়ে দিব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম বললেন, হ্যাঁ তাকে ছেড়ে দাও।

অথচ দুমাযা ছিলো এমন এক কওমের সর্দার যে কওমের কাছে রয়েছে প্রচুর সম্পদ, গম-খয়ের ভান্ডার। তা সত্ত্বেও তিনি বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও। আর দুমাযা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম ও মুসলমানদের এই আচরণ ও কোমল ব্যবহার দেখে সেখান থেকে বের হলেন।

দুমাযা ইবনে উসাল মসজিদ থেকে বের হয়ে নিকটস্থ একটি পানির স্থানে গেলেন এবং গোসল করে দ্বিতীয়বার ইহরাম পরিধান করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের নিকট এসে বললেন : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহ্র রাসূল। এরপর দুমাযা ইবনে উসাল রা. বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আপনার চেহারাটি চেয়ে ঘৃণিত চেহারা আমার কাছে আর একটিও ছিলো না। আর এখন আপনার চেহারা আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় চেহারা। আল্লাহ্র শপথ আপনার শহরের চেয়ে ঘৃণিত শহর আমার কাছে আর একটিও ছিলো না, আর এখন আপনার শহরই আমার কাছে সব চেয়ে প্রিয় শহর। আল্লাহ্র ধর্মের চেয়ে ঘৃণিত আর কোনো ধর্ম আমার কাছে ছিলো না, আর এখন আপনার ধর্মই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ধর্ম। হে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম! আমাকে কিছুর নির্দেশ দিন। আমি এখন মুহরিম (ইহরাম পরিহিত) অবস্থায় আছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তাঁকে বললেন, তুমি তোমার ওমরাহ্ পূরণ করো।

দুমাযা ইবনে উসাল রা. মক্কার দিকে যাত্রা করলেন, তিনি যখন মক্কায় গেলেন তখন তাঁর তালবিয়া পাল্টে গেল। তিনি-

لبيك اللهم لبيك لبيك لا شريك لك لبيك إن الحمد و النعمة لك والملك لا شريك لك

এই তালবিয়ার পরিবর্তে বললেন :

لبيك لا شريك لك الحمد و النعمة لك لا شريك لك

তখন কুরাইশরা তার নিকট জড়ো হয়ে তাকে বলল, নতুন তালবিয়া!! তিনি বললেন হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম আল্লাহ্র রাসূল। তখন মক্কার লোকেরা তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাঁকে প্রহার করতে শুরু করলো, যাতে করে তারা তাঁকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে আবার অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইাা এটাই হচ্ছে ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের সাথে পার্থক্য, ইসলাম কাউকে তরবারি উচিয়ে জোরপূর্বক ইসলামে প্রবেশের কথা বলে না বরং কাফফেরাাই মানুষকে ইসলাম থেকে বের করার জন্য শক্তি ও তরবারি উভয়টাই ব্যবহার করে। আমরা দেখেছি এবং একথা আমরা কখনো ভুলতে পারবো যে, ক্রুসেডাররা বাইতুল মাসজিদ দখলের পর সেখানকার মুসলমানদের সাথে তারা কীধরণের আচরণ করেছিলো, তারা সেখানে নির্বিচারে নিরস্ত্র মুসলমানদের হত্যা করেছে, এমনকি শিশুরাও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি, মুসলমানদের রক্তের স্রোত ঘোড়ার গোড়ালী পর্যন্তও ভরিয়ে দিয়েছিলো। মুসলমানদের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন একটি ঘটনাও নেই। যাই হোক পুকুর ঘাটের ফিয়ে আসি, দুমাযা রা.কে প্রহার করতে দেখে আব্বাস রা. চিৎকার করে বললেন, হে লোকেরা! তোমরা কাকে মারছো? এ তো বনি হানিফার সরদার! এ-তো দুমাযা ইবনে উসাল। আল্লাহ্র শপথ তোমরা যদি দুমাযাকে প্রহার করো তাহলে তোমাদের নিকট বনি হানিফা থেকে গমের একটি দানাও আসবে না। তোমরা তো নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করতে চাচ্ছো। সে তো তোমাদের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে, তোমাদের নিকট খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিবে। আব্বাস রা.-এর কথা শুনে লোকেরা তাঁকে প্রহার করা বন্ধ করলো। দুমাযা রা.তখন বললেন, আল্লাহ্র শপথ! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম আমাকে অনুমতি না দিলে তোমাদের নিকট গমের একটি দানাও আসবে না।

অতঃপর কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের নিকট একজন দূত পাঠিয়ে তাঁকে অনুরোধ করে বললেন, হে মুহাম্মাদ! এই লোকটি আমাদের খাদ্যের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁকে কুরাইশদের নিকট খাদ্য রপ্তানি করতে বললেন।

হ্যাঁ, এভাবেই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। এভাবেই উত্তম আখলাকের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম ইসলাম প্রচার করেছেন। মানুষ তাঁর উত্তম চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আর যুদ্ধ ও জিহাদের মাধ্যমে ঐসকল অপশক্তিকে দমন দেওয়া হয়েছে যারা মানুষকে সত্য দীন ইসলাম গ্রহণ করাকে বাধা দিচ্ছিলো। যারা মানুষের মাঝে ও ইসলামের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িযেছে।

এখন এখানে আমি আপনাদের সামনে একটি পরিখাংশুখ্য পেশ করছি যা আমি ড. রাগেব আস-সিরজানির একটি বইয়ে পড়েছি, ইন তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে এবং তাতে মুসলমানদের থেকে যত জন শহীদ হয়েছেন তার সংখ্যা এবং কাফেরদের থেকে যারা নিহত হয়েছে তার একটা তালিকা উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় সর্বমোট যুদ্ধ হয়েছে ৬৩ টি। এর মধ্যে গাজওয়া হচ্ছে ২৭ টি। আর সারিয়্যা হচ্ছে ৩৬ টি। আর সবগুলো যুদ্ধ মিলিয়ে মুসলমানের থেকে সর্বমোট শহীদের সংখ্যা হল ২৫২ জন। আর কাফেরদের থেকে নিহতদের সংখ্যা হল সর্বমোট ১০২২ জন। এবার তুমি যদি অনুসন্ধান করো দেখতে পাবে যে, যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মুসলিম মুজাহিদদের মোট সৈন্যের মাত্র ১% যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আর কাফেরদের থেকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মোট সৈন্যের মাত্র ৯.৫% যুদ্ধে নিহত হয়েছে। এর অর্থ কী? এর অর্থ কি এটা দাঁড়ায় না যে, ইসলাম ও মুসলমানরা কখনো কারো রক্ত চায় না, অথবা অনর্থভাবে কাউকে হত্যা করতে চায় না।

এবার এসো কাফেরদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি যুদ্ধের পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মোট নিহতদের সংখ্যা হল ৫৪.৮ মিলিয়ন। কি অবাক লাগছে? তুমি এর চেয়েও বেশি অবাক হবে যদি তুমি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের সংখ্যা দেখো। ইঁ সেটি অবাক হওয়ারই বিষয়, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মোট সৈন্যের সংখ্যা ১৫.৬ মিলিয়ন। অর্থাৎ যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী সৈন্যদের চেয়ে নিহতদের সংখ্যা প্রায় ৪ গুণ বেশি। সুতরাং বুঝায় যায় যে, নিহতদের বেশিরভাগ মানুষই হল নিরপরাধ সাধারণ জনগণ। সৈন্যরা বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করে নির্বিচারে সেখানকার সাধারণ মানুষদেরকে হত্যা করেছে। সেখানকার নারী, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ সকলকে হত্যা করেছে। তারা বিভিন্ন জনবসতিতে প্রবেশ করে সেখানে নির্বিচারে গুলি করে, বোম্বিং করে, পারমাণবিক বোমা ফেলে মানুষ হত্যা করেছে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের আমিদের কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন, তারা যেনো কোনো আহতকে হত্যা না করে। কোনো নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি এমন সাধারণ মানুষদের হত্যা না করে। এমনকি তিনি গির্জার পাদ্রিদেরও হত্যা করতে নিধন করবেন।। আর একারণেই আমরা দেখতে পাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে ঘটে যাওয়া যুদ্ধে শহীদ ও নিহতদের সংখ্যা মোট যোগের ১% বা ২% অথবা এর চেয়েও কম।

বর্বর বর্বন্দের একত্র করা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দেন। তিনি সাহাবাদের বলে দেন যে, তারা যেনো যুদ্ধবন্দিদের সাথে ভাল ব্যবহার করে, তাদের সামনে ভাল খাবার পরিবেশন করে। মুসআব ইবনে উমাইয়ের রা. বলেন, আমার এক ভাই বন্দি ছিলো। আমরা ছিলাম পাহারাদারির দায়িত্বে। বন্দিদের জন্যে রুটি আর পানি দেওয়া হলে, আমরা তাদের খেজুর আর পানি দিয়ে আমরা নিজেরা শুকনো রুটি খেয়েছি। এই আচরণ দেখে কাফের বন্দিরা পর্যন্ত লজ্জিত হয়ে বলেছে, তোমরাও খেজুর নাও। তখন আমরা বলেছি, না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তোমাদের প্রতি সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এ কারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ

'তাঁরা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম-অনাথ ও বন্দিকে আহার্য দান করে।'

ইসলাম যদি শুধু মাত্র তরবারির মাধ্যমেই বিজয় অর্জন করতো তাহলে যখন তাঁদের উপর থেকে তরবারি উঠে যেতো তখন তাঁরা আবার তাঁদের কুফরিতে ফিরে যেতো। বর্তমান রাশিয়াতে কি এটাই ঘটেনি? রাশিয়াতে ৭০ বছর সমাজতন্ত্রের শাসন চলেছে। সমাজতন্ত্রিরা মানুষকে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক কমিউনিস্ট বানিয়েছে। এরপর যখনই সমাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়েছে তখন মানুষ আবার তাদের আগের ধর্মে ফিরে গেছে, খৃষ্টানরা খৃষ্টধর্মে ফিরে গেছে আর মুসলমানগণ ইসলাম ধর্মে ফিরে এসেছে। সুতরাং কোমলতা ছাড়া শুধু অস্ত্র তোমার কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।

কিন্তু একবার ইসলাম গ্রহণের পর মানুষ আর তাঁদের আগের কুফরি ধর্মে ফিরে যায়নি। বরং ইসলাম তাঁদের অন্তরে চিরদিনের জন্যে গেঁথে গেছে, সকল ঝড়ঝাপটা ও বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তাঁরা ইসলামকে আঁকড়ে ধরেছে। আর একারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ

'আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও সদুপদেশ শুনিয়ে এবং (যদি কখনো বিতর্কের প্রয়োজন পড়ে তাহলে) তাঁদের সাথে বিতর্ক করুন উৎকৃষ্ট পন্থায়।'

ইন্দোনেশিয়া, যেখানে বর্তমান মুসলমানের সংখ্যা ২১০ মিলিয়ন। সেখানে ইসলাম প্রচারের জন্যে কোনো তরবারি ব্যবহার হয়নি। মুসলিম ব্যবসায়ীরা সেখানে গিয়েছেন স্থানীয় লোকেরা মুসলমানদের ব্যবসার দেখে মুসলমান হয়েছেন। ব্যবসায়ীরা প্রথমে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন, অতঃপর মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তখন তাঁরা এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় আরো একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন, এভাবে পুরো ইন্দোনেশিয়াতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে। এবং বর্তমানে যাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন তাঁদের কেউ তরবারির মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করতে বাধ্য করছে না। বরং তাঁরা ইসলামের মূল সৌন্দর্য দেখে স্বেচ্ছায় ইসলামে প্রবেশ করছেন। উদাহরণস্বরূপ জার্মানির কথাই বলা যাক, সেখানকার সরকার বলছে, জার্মানিতে দিন দিন ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জার্মান সরকার বলছে, বর্তমানে জার্মানিতে প্রতি দুই ঘন্টায় একজন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। এই পরিসংখ্যানটা হল ২০০৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত। এরা কি তরবারির ভয়ে মুসলমান হয়েছেন? এ-তো তোমার সামনে জার্মান সরকারের হিসেব। আমার যেসকল বন্ধু জার্মানিতে থাকে, আমি তাদের বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁদের বলেছি সত্যিই কি এই সংখ্যক মানুষ মুসলমান হচ্ছে? তখন তারা আমাকে বলেছে, না এটা ঠিক সংখ্যা নয়; বরং সঠিক সংখ্যাটা আরো বেশি। এটা সরকারি হিসেব, সরকার সঠিক সংখ্যাটা প্রকাশ করতে চাচ্ছে না।

ইসলাম নেতা ও কোমলতার মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। অনুরূপভাবে ইসলাম জিহাদের মাধ্যমেও প্রসারিত হয়েছে। একথা বলা ভুল যে, ইসলাম তরবারির মাধ্যমে প্রসারিত হয়নি। আবার একথা বলাও ভুল যে, ইসলাম শুধু মাত্র তরবারির মাধ্যমেই প্রসারিত হয়েছে। বরং ইসলাম এই দুইটার সমন্বয় প্রসারণিত হয়েছে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মাধ্যমে জবরদস্তিকারীদের জুলুম নির্যাতন দূর হয়েছে এবং মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পেয়েছে, ফলে তাঁরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। অনুরূপভাবে উত্তম কথা ও কোমল ব্যবহারের মাধ্যমেও ইসলাম প্রসারিত হয়েছে। (সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, ইসলাম প্রসারিত হয়েছে তরবারি বিশিষ্ট আখলাকের মাধ্যমে)

মহান আল্লাহ তাআলা নিকট প্রার্থনা করি, তিনি আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে পরিপূর্ণ কল্যাণ দান করুন। আমি এবং আপনারা যে যেখানেই থাকি, তিনি আমাদের কল্যাণ ও বরকতের সাথে রাখুন এবং আমাদের সকলকে তাঁর আনুগত্যে লেগে রাখুন। আমিন।

টিকাঃ
¹ সূরা বাকারা, আয়াত : ২৫৬
² সূরা কাহাফ, আয়াত : ২৯
১. সূরা ইনসান, আয়াত: ৮
১. সূরা নাহল, আয়াত: ১২৫

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা

📄 নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়েছেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে মদিনাকে একটি ইসলামি রাষ্ট্র পরিণত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা থেকে সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে জিহাদের উদ্দেশ্যে সফরে বের হতেন। এমনই এক জিহাদের সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে রাতে চলছিলেন। রাতটি ছিলো খুবই অন্ধকার। অন্ধকারের কারণে উটগুলো তাঁদের নিয়ে ঠিক মত চলতে পারছিলো না। আর সাহাবায়ে কিরাম রা. ও সামনে ঠিক মত দেখতে পারছিলেন না, তাঁরা উটগুলোকে ধরে সামনের ইটিহাচ্ছিলেন। অন্যদিকে তাঁদের সকলের আরোহণের মতও পর্যাপ্ত পরিমাণে বাহনও ছিলো না। তাঁদের কয়েক জনের জন্যে একটি করে বাহন ছিলো। তাই তাঁরা পালাক্রমে একের পর একজন করে উটের পিঠে উঠে সফর করছিলেন। যেমন একজন এক ঘণ্টা, তারপর আরেক জন, তারপর আরেক জন এভাবে। দীর্ঘরাত পর্যন্ত চলতে চলতে তাঁরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই তাঁদের সকলেরই এই কামনা করছিলো যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি দিনের দিয়ে রাস্তার পাশে কোথাও যাত্রা বিরতি করতেন!! এদিক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবায়ে কিরামের এই কষ্টের বিষয়টি লক্ষ করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে রাস্তার পাশে এক স্থানে যাত্রা বিরতি করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তাঁরা সকলে এক স্থানে যাত্রা বিরতি করলেন। যেহেতু তাঁরা সকলেই ছিলো ক্লান্ত তাই সকলেরই ঘুম ও বিশ্রামের প্রয়োজন ছিলো তীব্র; কিন্তু সকলে ঘুমিয়ে গেলে ফজরের জন্য তাঁদের জাগাবে কে, এ নিয়ে একটা সমস্যা দেখা দিল। অর্থাৎ কে সজাগ থেকে তাঁদের ফজরের জন্যে জাগ্রত করবে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, কে আছো যে না ঘুমিয়ে আমাদের ফজরের সালাতের জন্য অপেক্ষা করবে? বিলাল রা. বললেন, আমি হে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আপনাদের জন্যে না ঘুমিয়ে ফজরের অপেক্ষা করবো। একথা বলে বিলাল রা. সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। অন্য দিকে সকলে বিছানা পেতে ঘুমিয়ে গেল। বিলাল রা. রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে লাগলেন, কুরআন তেলাওয়াত করতে লাগলেন এবং আল্লাহর তাসবীহ নিকট দোয়া করছিলেন আর ফজরের অপেক্ষা করছিলেন। অতঃপর যখন ফজরের আর সামান্য সময় বাকি আছে তখন তিনি তাঁর বাহনের সাথে হেলান দিয়ে বসে ফজরের অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুআজ্জিন, তিনি জানতেন জানতেন কখন ফজর হয়, কখন দিন হয় আর কখন রাত হয়। ফজর হতে আর যখন সামান্য সময় বাকি ছিল, সফর দিনের বাহনের সাথে হেলান দিয়ে ফজরের অপেক্ষা করছিলেন; কিন্তু সারা দিনের সফরের ক্লান্তির কারণে তাঁর দুটো চোখ ঘুমে নেমেশ গেলো, তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। এভাবেই ফজরের সময় শেষ হয়ে সূর্য উঠে গেল; কিন্তু কেউই সজাগ হল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমে, সাহাবায়ে কেরাম রা.ও ঘুমে!!

অতঃপর যখন সূর্যের আলো এসে মুখে পড়লো, ওমর রা. লাফ দিয়ে উঠে গেলেন এবং বললেন সূর্যের উত্তাপ চলে গেছে, সূর্যের আলোই আমাদের জাগ্রত করেছে, সূর্যের আলো আমাদের জাগ্রত করেছে। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে বেলাল রা.- এর নিকট গেলেন এবং তাঁকে বললেন, বেলাল! কী ব্যাপার, কী হয়েছ বলো? বেলাল রা. বললেন, আপনাদেরকে যে আটকে রেখেছিল, জাগ্রত হতে দেয়নি; আমাকেও সে-ই আটকে রেখেছ, জাগ্রত হতে দেয়নি। আমি যা দেখেছি শুধু তাই বলতে পারবো। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রা. ক্রুদ্ধ হলেন যে, কীভাবে তিনি তাদেরকে ঘুমের মধ্যে রেখে ঘুমিয়ে গেলেন? এই ঘটনা থেকেই বুঝা যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর সালাতের প্রতি কতটা গুরুত্ব ছিল। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা এ জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলো, এখানে শয়তান এসেছে। তখন তাঁরা সেখান থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে সালাত আদায় করলেন; কিন্তু তাঁদের একজন সালাত আদায় না করে দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। সকলের সাথে সালাতে শরিক হলেন না। সালাতে শরিক না হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমার কী হয়েছে, তুমি সালাত আদায় করলে না কেনো? সে বললো, হে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি অপবিত্র; কিন্তু পানি নেই। সামান্য যে পরিমাণ পানি রয়েছে তা দিয়ে কোনো রকম ওজু হবে; কিন্তু আমার তো গোসলের প্রয়োজন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তোমার পবিত্র হওয়ার জন্য পবিত্র মাটিই যথেষ্ট। দুই হাত মাটিতে মেরে মুখ মাখসে করবে এবং দুই হাতের কব্জিসহ মাখসে করবে। অতঃপর যখন পানি উপস্থিত হবে তখন গোসল করে নিবে।

হাদিস শরীফে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

‘পবিত্র মাটি মুমিনের জন্য পবিত্রকারী, যদিও দশ বছর পানি না থাকে। অতঃপর যখন পানি পাওয়া যাবে তখন আল্লাহ্র উপর ভরসা করে তা দিয়ে নিজের চামড়া স্পর্শ করবে।’ (অর্থাৎ পানি দিয়ে গোসল করবে)

এই হাদিসের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়াম্মুমের আদেশ করেছেন। অতঃপর যখন শেখার সামনে দিকে কাফেলা যাত্রা শুরু করল; কিন্তু কিছু দূর সামনে অগ্রসর হওয়ার পরই তাঁদের পানির প্রয়োজন দেখা দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আলি রা.সহ আরো কয়েক জনকে পানির সন্ধানে পাঠালেন। তাঁরা পানির সন্ধানে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়লেন; কিন্তু কোথাও যখন পানির দেখা পাজ্ছিলেনা তখন দূরে উটের পিঠে একজন মহিলাকে দেখতে পেলেন। তখন তাঁরা মহিলাটির নিকটে আসলেন এবং সেখানে এসে দেখেন তার সাথে উটের পিঠে চামড়ার তৈরি বড় বড় দুইটি পাত্র ভর্তি পানি আছে। তখন তারা তাকে পানির স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বললো, আমি যেখান থেকে পানি এনেছি তা এখান থেকে একদিন ও একরাতের পথ। একথা শুনে তাঁরা তাকে বললো, তুমি আমাদের সাথে এসো। সে বললো, কোথায় যাব? তাঁরা বললো, আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট। সে বললো, তিনি কি সেই লোক যাকে লোকেরা আস-সাবি নাম দিয়েছ? (যারা নিজ ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করে তাদেরকে সাবি বলা হতো) তাঁরা বললো, তুমি যাকে উদ্দেশ্য করেছ তিনি সেই।

তখন তাঁরা তাকে নিয়ে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে সৎকথা বলতে বললেন। অতঃপর সে তার পানি ভর্তি পাত্র দুটি নামাল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পাত্রের মুখ খুলে বললেন। তাঁরা পাত্রটির কাছে এসে তার মুখ খুললো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বরকতের জন্য দোয়া করলেন এবং তার মধ্যে ছুঁই দিয়ে তার মুখ বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর তিনি অন্য পাত্রটির মুখ খুলতে বললেন এবং বরকতের জন্য দোয়া করে তাতে ছুঁই দিয়ে মুখ বন্ধ করলেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে পাত্রে পানি নিতে বললেন। মহিলাটি দাঁড়িয়ে দেখছে এই দৃশ্য দেখাচ্ছিলো আর ভাবছিলো এটাও কি সম্ভব? এটা কি বিশ্বাস করা যায় যে, মাত্র দুই পাত্র পানি পুরো একটা বাহিনীর জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে!!

সাহাবায়ে কেরাম রা. একজন একজন করে আসছেন, মটকার নিচে নিজের পাত্র রাখছেন, অতঃপর ভরা পাত্র নিয়ে খুশি মনে নিজ স্থানে ফিরে যাচ্ছেন; এরপর আরেকজন আসছেন সেও তার পাত্র ভরে নিয়ে যাচ্ছেন; এরপর তৃতীয়জন, চতুর্থজন এভাবে কাফেলার সকলে এসে পানি নিয়ে গেল। মহিলাটি দাঁড়িয়ে দেখছে এই দৃশ্য দেখছে। শেষে অপবিত্র লোকটিকে ডেকে বললেন, এখান থেকে পানি নিয়ে গোসল করে পবিত্র হও। লোকটি তখন সেখান থেকে পানি নিয়ে গোসল করলো। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্র দুটোর মুখ বেঁধে উটের পিঠে বেঁধে দিতে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাটির সাথে ভাল ও সুন্দর আচরণ করতে বললেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. মহিলার সাথে সুন্দর ব্যবহার করলেন। সে যাতে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান তার অন্তরে প্রবেশ করে, সেজন্য তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, তোমার পাত্র যতটুকু পানি ছিলো এখনও ততটুকুই রয়েছে এবং এই তুমি তোমার জান ও মালের ব্যাপারে কোনো খবরদারির আশঙ্কা করবে না। আমরা তোমার জান-মালের কোনো ক্ষতি করবো না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে বললেন, তোমরা তাকে কিছু হাদিযা দাও। সাহাবায়ে কেরام রা. কেউ খেজুর, কেউ আটা, কেউ রুটি এভাবে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কিছু একটি কাপড়ে বেঁধে রাখলেন। অতঃপর মহিলাটি যখন তার উটের পিঠে চড়ে বসলো, তখন সবার ভর্তি পাত্রটি তার কাছে দেওয়া হলো। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি তো জানো যে, আমরা তোমার পাত্র থেকে একটুও পানি কমাইনি আর তুমি এটা (হাদিয়া) গ্রহণ করো, এগুলো তোমার সন্তানদের জন্য।

মহিলাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের আচরণ ও পানির কাহিনী দেখে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে তার কওমের নিকট ফিরে গেল। এখন প্রশ্ন হল এই ঘটনা মহিলাটির উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছিলো? সে কী পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল?

মহিলাটি নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উটের পিঠে চড়িলো আর আশ্চর্য হয়ে ভাবছিলোএমন মানুষও কি জগতে আছে? এমন ঘটনাও ঘট সম্ভব? এই ঘটনাও কি খুবই বিশ্বাসাতীত হল, কারণ সে জীবনের প্রথমবার সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছে এবং দেখেছে তার এক মু'জিযা, অথচ সে তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি ও মুসলমান হয়নি। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কী সুন্দর ব্যবহার করলেন, একজন অমুসলিম নারীর সাথে কি সুন্দর আচরণ করলেন!! আর এটাই তো এই আয়াতের সত্যতা, আল্লাহ তায়ালা বলেন :

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

‘আমি আপনাকে রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।’

তিনি মুসলমানের জন্যেও রহমত, অমুসলিমের জন্যও রহমত। তিনি বড়দের জন্যও রহমত, ছোটদের জন্যও রহমত। তিনি দাস-দাসীদের জন্যেও রহমত আবার স্বাধীন মানুষের জন্যেও রহমত অর্থাৎ তিনি গোটা পৃথিবীর জন্য রহমত। তিনি রহমত ও কোমলতা নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন :

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ

‘আল্লাহর রহমতই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন, পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো।’

এই মহিলাটি কাফের, পথভ্রষ্ট ও মূর্তিপূজারী হওয়া সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কোমল ও সর্বোত্তম ব্যবহার করলেন।

মহিলাটি এখন নির্জন শুষ্ক প্রান্তরে একাকী হেঁটে তার কওমের কাছে ফিরে গেল। তখন তারা তাকে বললো, হে অমুক! তোমার এতো দেরি হল কেনো? অর্থাৎ পূর্বের চেয়ে এবার পানি আনতে এতো দেরিহল কেনো? তখন সে বললো, আমি আজ একজন জাদুকর দেখে এলাম, আমার বিশ্বাস সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাদুকর হবেন। সে কিন্তু একথা বলেনি যে, আমি একজন প্রেরিত রাসূলকে দেখে এলাম। বরং সে বলেছে আমি সবচেয়ে বড় জাদুকরকে দেখে এলাম। সে পানির পাত্রের মুখ খুলে বাহিনীর সকলকে পানি ছেলে দিলেন। আমি সবচেয়ে বড় জাদুকরকে দেখলাম, তবে হতে পারে সে প্রেরিত নবি হবেন। এরপর মহিলাটি তার কওমের কাছে সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করতে লাগল।

এর কিছুদিন পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের ইসলাম প্রচারের জন্য প্রেরণ করলেন, সাহাবায়ে কেরাম রা. বিভিন্ন অঞ্চল জয় করে সেখানে ইসলাম প্রচার করলেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. যখন মহিলাটির কওমের কাছে আসলো তখন তাঁরা তাদের ওদিকে এগিয়ে গেলেন, তাদের সাথে যুদ্ধ করলেন না। তাঁরা তার ডানের, বাম্নের, সামনের, পিছনের গোত্রের সাথে যুদ্ধ করলেন কিন্তু মহিলাটির কওমকে এড়িয়ে গেলেন। তখন মহিলাটি তার কওমের লোকদের বললো, আমার মনে হয় এরা তোমাদের উপর আক্রমণ করছে না এর কারণ হল এরা তোমাদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আশাবাদী। আমি তো তাঁদের এই মু'জিযা দেখেছি, তাহলে তাঁকে সত্য বলে মেনে নিতে তোমাদের সমস্যা কী? মহিলাটির আহ্বানে তার কওমের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করলো আর এভাবেই মহিলাটি সকলের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যম হল। এই মহিলার অবস্থান এবং সে যা দেখেছে তা সাহাবায়ে কেরام রা. অনেকবার দেখেছেন, বারবার দেখেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বললেন :

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَبَ

'আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ কিতাব।'

অর্থাৎ সুস্পষ্ট অনেক নিদর্শন দিয়ে নবি-রাসূলদের প্রেরণ করা হয়েছে যার মাধ্যমে জানা ও পরিচিতি হওয়া যাবে যে, তাঁরা হলেন আল্লাহর নবি। আর এ-কারণেই আল্লাহ তা'আলা যখন যে নবিকে প্রেরণ করেছেন তখন তাঁর সাথে এমন কোনো নিদর্শন বা মুজিজা দিয়ে পাঠিয়েছেন যার মাধ্যমে বুঝা যায় যে, তিনি হলেন আল্লাহর নবি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেক মুজিজা দিয়েছেন, যা বিভিন্ন সময় তাঁর থেকে প্রকাশ পেয়েছে।

আর একটি মুজেযার কথা এখানে উল্লেখ করছি। সেটি আরো বেশি আশ্চর্যজনক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের নিয়ে উমরা পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে তাঁরা হুদাইবিয়া নামক স্থানে যাত্রা বিরতি করলেন। (হুদাইবিয়া তখন ছিলো মক্কার বাইরের একটি অঞ্চল তবে বর্তমানে তাকে মক্কার ভিতরের একটি অংশ মনে করা হয়।) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১৪০০ সাহাবিকে নিয়ে উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওয়ানা হন; কিন্তু হুদাইবিয়া নামক স্থানে কুরাইশরা তাঁদের বাধা প্রদান করে। ফলে সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানেই অবস্থান করেন। জাবের রা. থেকে বর্ণিত যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে ওযুর জন্য একটি পাত্রে পানি দেওয়া হল, তখন সাহাবায়ে কেরাম রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে এসে জড়ো হলেন। এমন সময় তাঁদেরকে পাশে একত্রিত হতে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন কী ব্যাপার? তোমরা এসময় এখানে একত্রিত হলে যে? সাহাবিগণ তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের কাছে কোনো পানি নেই যা দিয়ে আমরা ওযু করব এবং যেখান থেকে পান করবো। পুরো কাফেলার মধ্যে শুধু এতটুকু পানিই রয়েছে যা দিয়ে আপনি ওযু করছেন। তিনি তো আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর সত্য নবি। তিনি যখন দেখলেন কাফেলার সকলে পানির কষ্ট করছে। তাঁর সামনে যেটুকু পানি রয়েছে তা ব্যতীত কাফেলার আর কোনো পানি নেই। তখন তিনি তাঁর হাত ঐ পানির মধ্যে রাখলেন এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট দোয়া করলেন। জাবের রা. বলেন, আল্লাহ্র শপথ আমরা দেখলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আঙুল দিয়ে পানি বের হচ্ছে এবং পাত্রটি ভরে গেল, অতঃপর আমরা আমাদের সকলের নিকট যত পাত্র ছিলো সবগুলো পাত্র ভরে নিলাম এবং আমরা পানি পান করলাম ও ওযু করলাম। জাবের রা. কে প্রশ্ন করা হল, তখন আপনাদের লোকসংখ্যা কত ছিলো? তিনি বলেন, আমরা এক হাজার চারশত (১৪০০) ছিলাম। আল্লাহ্র শপথ আমরা যদি এক লক্ষও থাকতাম তাহলেও তা আমাদের সকলের জন্য যথেষ্ট হতো।

আপনারা কি নিশ্চিত? তিনি বলেন আমরা এক হাজার চারশত (১৪০০) ছিলাম। আল্লাহ্র শপথ আমরা যদি এক লক্ষও থাকতাম তাহলেও তা আমাদের সকলের জন্য যথেষ্ট হতো। পূর্বের মহিলা অমুসলিম থাকা অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিজা দেখেছে, অতঃপর তিনি মুসলমান হয়েছেন। সাহাবায়ে কেরام রা.এর মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকে মুজিজা দেখেছেন, আবার ইসলাম গ্রহণ করার পরও দেখেছেন।

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিজা দেখে আশ্চর্য হয়েছেন তাঁদের মধ্যে একজন হলেন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তখন অল্প বয়সের বালক ছেলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আবু বকর রা.কে সঙ্গে নিয়ে মক্কার প্রান্তরে হাঁটছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বকরি চড়াচ্ছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক পিপাসার্ত হলেন এবং সামনে কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর এক স্থানে একজোড়া বকরি দেখতে পেলেন। তিনি বকরি চড়াতে থাকা এই বালককে নিকট আনলেন এবং তাকে বললেন, হে অমুক! আমাদেরকে দুধ পান করাও। তখন সে বলল, আমি দারিদ্র্যগ্রস্ত, আমাকে এগুলো দেখাশুনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমি এগুলোর মালিক নই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে বালক! তোমার কাছে কি এমন বকরি আছে যা এখনো বাচ্চা দেয় নাই, অর্থাৎ যার ওলানে এখনো দুধ আসে নাই। সে বললো, হ্যাঁ আছে, অতঃপর সে একটি ছোট বকরি নিয়ে আসলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওলানে হাত বুলালেন এবং দোয়া করলেন। তখন ছাফাতটি ভর দু'পা ছড়িয়ে দিল এবং সাথে সাথে তার ওলান দুধের ভরে গেল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এই দৃশ্য দেখে তখন আশ্চর্য হয়েছেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ দোহন করলেন এবং তিনি তা থেকে পান করলেন, আবু বকর রা. পান করলেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.ও পান করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, আপনি যা বলেছেন তা আমাকে শিক্ষা দিন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন, তুমি বালক তোমাকে শেখানো হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, অতঃপর আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে সত্তরটি সুরা মুখস্থ করে নিলাম। এক্ষেত্রে আমার সাথে কেউ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়নি।

এগুলো হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিজা বা নিদর্শন। তাঁর নিদর্শন এখনো জারি আছে আর তাঁর মধ্যে সবচেয়ে বড় নিদর্শন হল আল-কুরআনুল কারিম।

আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করি-তিনি আমাদের অন্তরে ইমানকে দৃঢ় করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি অন্তরসমূহ স্থিরকারী, আপনি আমাদের অন্তরকে আপনার আনুগত্যের উপর স্থির করে দিন। আমিন।

টিকাঃ
১. সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭
২. সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯
১. সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯
১. সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৫

📘 আত্মবিশ্বাস > 📄 অহংকার ও প্রবঞ্চনা মানবসত্তাকে কুফরির দিকে ঠেলে দেয়

📄 অহংকার ও প্রবঞ্চনা মানবসত্তাকে কুফরির দিকে ঠেলে দেয়


বর্তমানে আমাদের মধ্যে অহংকার, প্রবণতা ও আভিজাত্য কঠিনভাবে বাসা বেঁধেছে; কিন্তু আমরা জানি না যে, এই অহংকার ও প্রবণতা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। মানুষ যে সকল কারণে কাফের হয়ে মৃত্যুবারণ করে অহংকার তার মধ্যে অন্যতম। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: 'যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' অন্য হাদীসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: কিয়ামতের দিন অহংকারীদের ছোট পিপড়ার আকারে উত্থিত করা হবে। যারা মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হবে।

এখানে উমর রা.-এর খিলাফতকালে ঘটে যাওয়া অহংকার সম্পর্কে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করছি।

একবার এখানকার গাসসানাদের বাদশাহ ঘটনা আলোচনা করবো। গাসসান জামিয়াতুল আরবের দক্ষিণে অবস্থিত একটি বুস্টান অনুভূমিতে এলাকা। উমর রা.-এর খিলাফতের সময় গাসসানাদের এক শাসক মদিনায় আগমন করলো। লোকটি ঘোড়ার চড়ে ও অনেক লোক আর সৈন্যদের থেকে অহংকারের সাথে মদিনায় প্রবেশ করলো। সে মদিনায় এসেছে উমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে। যখন সে উমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করলো তখন তার মাথায় ছিলো স্বর্ণের মুকুট আর গায়ে ছিলো রেশমী পোশাক। উমর রা. তাকে ইসলাের দাওয়াতও দিলেন। লোকটির নাম ছিলো জাবালা ইবনুল আইহাম। তখন ইসলাম গ্রহণ করে সে মুসলমান হয়ে গেল। ইসলাম গ্রহণের পর উমর রা. তাঁকে স্বর্ণের মুকুট আর রেশমী পোশাক খুলে ফেলতে বললেন এবং মুসলমানদের জন্যে বৈধ পোশাক পরিধান করতে বললেন। লোকটি সেগুলো খুলে ইসলামি পোশাক পরিধান করলো, অতঃপর সে উমারা পালনের ইচ্ছা করলো এবং উমর রা. তাঁকে উমরার নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দিলেন এবং ইহرامের বিষয়টা বুঝিয়ে দিলেন। তখন সে ইহরাম পরিধান করে তালবিয়া পড়ে মক্কায় প্রবেশ করলো; কিন্তু তার অন্তরে তখনও অহংকার ও আভিজাত্যমানের কিছু অংশ বাকি ছিল।

সে মানুষের সাথে সাথে তালবিয়া ............ لبيك اللهم لبيك লা শারিক লাك لبيك পড়তে পড়তে মক্কার আসলো এবং কাবার চতুর্পার্শ্বে তাওয়াফ শুরু করলো। কাবা তখন বর্তমানের মত এত বিশাল আয়তনের ছিলো না এবং তা বহু উঁচুও ছিলো না; পূর্বে কাবার ছিলো পুরোনো একটি গৃহ এবং আয়তন ছিলো অনেক ছোট। তখন কাবার পাশে বিভিন্ন বিভিন্ন কিছু বিক্রি করতো অর্থাৎ কাবার পাশেই ছিলো বাজার। জাবালা ইবনে আইহাম কাবার চতুর্পার্শ্বে তাওয়াফ করতে লাগলো। উমর রা.ও তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। ভিড়ের মধ্যে তাওয়াফের সময় অসতর্কতাবশত এক বেদুইনের পা জাবালা ইবনে আইহামের চাদরের কোণায় লাগলো। এতে জাবালা ইবনে আইহাম অনেক রেগে গেল, সে চোখ বড় বড় করে বেদুইন লোকটির দিকে তাকাল এবং আমার চাদরে পাড়া দিলি কেনো একথা বলে তার চেহারার উপর জোড়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। যাতে বেদুইন লোকটির চোখ অন্ধ হওয়ার উপক্রম হল। বেদুইন লোকটি মনে মনে বলল, আমরা এখন আল্লাহ্র ঘরে আল্লাহ্র সামনে আছি। সুতরাং আমি কি হারাম্বের ভিতর এই লোকটির গালে থাপ্পড় দিবো? বেদুইন লোকটি জানতো এখানে একজন বিচারক আছে, তাই সে তাকে কোনো আঘাতও না করে বিষয়টি বিচারকের দরবারে উপস্থাপন করার জন্য গেল।

বেদুইন লোকটি উমর রা.-এর নিকট গিয়ে বলল, হে ওমর! জাবালা ইবনে আইহাম আমার চেহারায় এত জোড়ে থাপ্পড় দিয়েছে যে, আমার চোখ প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। উমর রা. তখন জাবালা ইবনে আইহামকে ডাকলেন। অতঃপর বিচার মজলিস কায়েম হল। ইসলােমে বিচারের ক্ষেত্রে সবাই সমান, বড়-ছোট, ধনী-গরিব সকলেই সমান, কারো মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এবিষয়ে এখানে আরো একটি চমৎকার ঘটনা বলে দিচ্ছি। আলি ইবনে আবু তালব রা. তখন আমিরুল মুমিনিন, খলিফাতুল মুসলিমিিন। তিনি একদিন বাজারে গেলেন এবং এক ইহুদিকে চাল বিক্রি করতে দেখলেন। চালটি দেখে আলি রা. কিনে ফেললেন। এটি তরির চাল, কোনো এক যুদ্ধের সময় তার হাত থেকে এটি পড়ে গিয়েছিল। পরে তিনি তা আর খোঁজ পান নি। আলি রা. তখন ইহুদি লোকটিকে বললেন, মনে হচ্ছে এটি আমার চাল। ইহুদি বললো, না এটা আপনার চাল নয়। আপনার কিনতে মনে চাইলে এটা কিনে নিতে পারেন। আলি রা. বললেন, আমি আমিরুল মুমিনিন, মিথ্যা বলা আমার জন্য জায়েয নেই। বরং এটি আমারই চাল। ইহুদি বললো, না এটা আপনার চাল নয়। অতঃপর তারা দুজনে কাবার নিকট অভিযোগ নিয়ে গেল। হ্যাঁ, ঘটনাটি যখন ঘটেছে তখন সময়টা ছিলো আলি রা.-এর খেলাফতের সময়!! তিনি তখন খলিফাতুল মুসলিমিন।

কাবার দরবারে আলি রা. গিয়ে বসে পড়লেন আর ইহুদি লোকটি তার চাল নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কাবি বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি আপনার প্রতিপক্ষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। আলি রা. তখন ইহুদির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কাবি তাঁকে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! বলেন আপনার অভিযোগ কী? আলি রা. বললেন, এই চালটি আমার চাল, অমুক যুদ্ধে আমার কাছ থেকে তা পড়ে গিয়েছিল। ইহুদি লোকটি বলল, না এটা আমার চাল, এটা আমি কিনেছি এবং আমি এখন এটা বিক্রি করতে চাই। কাবি বলল, হে আমিরুল মুমিনিন আপনার পক্ষে কোনো সাক্ষী আছে? আলি রা. বললেন, আমার ছেলে হাসান আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। কাবি বললেন, বাবার পক্ষে ছেলের সাক্ষ্য আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আপনার কি অন্য কোনো সাক্ষী আছে? তিনি বললেন, না। কাবি বললেন, তাহলে আমি চালটি ইহুদি লোকটিকে দেওয়ার ফায়সালা করছি। ইহুদি যখন এমন ফায়সালা দেখলো তখন সে একবার আলি রা.-এর দিকে তাকায়, একবার কাবির দিকে তাকায়। তখন সে বললো, এই ধর্মের বিচার একটা ইনসাফপূর্ণ!! কাবি আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে একজন ইহুদির পক্ষে ফায়সালা করছে!! যে কিনা বিশ্বাস করে উজাইর আল্লাহর পুত্র। আল্লাহ তাআলা দরিদ্র, আল্লাহরও বার্তা রয়েছে। সেই ইহুদির পক্ষে স্বয়ং আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে ফায়সালা করছে!! ইহুদি এই দৃশ্য দেখে সাথে সাথে কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন, এবং বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! নিন এটি আপনারই চাল, অমুক যুদ্ধে এটা আপনার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল, আপনি চলে যাওয়ার পর আমি তা নিয়ে গিয়েছিলাম। আলি রা. তখন বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করেছো, সুতরাং আমি এটা তোমাকে হাদিয়া দিলাম, নাও এটা এখন থেকে তোমার, অতঃপর তিনি চালটি তাঁকে দিয়ে দিলেন।

ইসলামে বিচারের ক্ষেত্রে সকলে সমান। এখানে দুর্বলের উপর সবলের পক্ষে অন্যায়ভাবে ফায়সালা করা হয় না। এখানে সবাই সমান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

"তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ধ্বংস হওয়ার কারণ হল, যখন তাদের সম্ভ্রান্ত কেউ চুরি করতো তখন তারা তাকে ছেড়ে দিতো। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করতো তখন তারা তার উপর দণ্ডবিধি আরোপ করতো।"

বলছিলাম গ্রাম্য লোকটি জাবালা ইবনে আইহামার সাথে আমিরুল মুমিনিন ওমর রা.-এর সামনে দাঁড়ালো। ওমর রা. বললেন, হে জাবালা! তুমি কেনো তাকে থাপ্পড় দিয়েছো? জাবালা বললো, সে তার পা দিয়ে আমার চাদর মাড়িয়েছে। ওমর রা. তাকে বললেন, এক লোক ভুল করে তোমার চাদর মাড়িয়েছে আর তুমি সকলের সামনে তাকে থাপ্পড় দিয়েছো? এখানে তো অন্য কোনোভাবেও তার সংশোধন করা যেতো। এভাবে সকলেই যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তাহলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বেঁধে যাবে এবং সমাজ আবার পূর্বের জাহিলিয়াতের দিকে ফিরে যাবে। পরস্পরের মাঝে রক্তারক্তি আর খুনোখুনি শুরু হয়ে যাবে। হে জাবালা! এখন ফয়সালা হল, এই লোকটি ও ঠিক তোমাকে সেভাবেই থাপ্পড় দিবে তুমি যেভাবে তাকে থাপ্পড় দিয়েছো। সে আমাকে থাপ্পড় দিবে অথচ আমি একজন রাজা? ওমর রা. বললেন হ্যাঁ, তুমি রাজা হলেও সে তোমাকে থাপ্পড় দিবে। তবে ভিন্ন আরেকটি ব্যবস্থা রয়েছে আর তা হল তুমি এই লোকটিকে সন্তুষ্ট করে তার কাছ থেকে ক্ষমা আদায় করে নিবে। তুমি তার হাত ধরো, তার কপালে চুমো খাও, অতঃপর তাকে বলো, ভাই আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর সে যদি তোমাকে ক্ষমা করে তাহলে বিষয়টি এখানেই শেষ। আর সে যদি তোমাকে ক্ষমা না করে তাহলে কিসাস নিতে হবে। জাবালা ইবনে আইহামা বললো, আমি আগামীকাল আসবো, তখন সে আমার থেকে কিসাস নিবে এবং আমাকে মারবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসাসের আদেশ দিতেন। এমনকি রহমাতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের থেকেও কিসাস নিতে বলতেন। বদরের যুদ্ধের দিন, তখনো যুদ্ধ শুরু হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের শৃঙ্খলার জন্য মুসলমানদের কাতার সোজা করছেন। একেক জন এগিয়ে যাচ্ছেন, ওকে পিছিয়ে দিচ্ছেন। সাওয়াদ ইবন দাজিয়া রা. বদরের যুদ্ধে শাখাদারের সৌভাগ্যপ্রাপ্ত সাহাবিদের একজন তিনি বারবার কাতারের সামনে এগিয়ে আসছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে পিছিয়ে দিছেন আর তিনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে একটি লাঠি ছিল। তিনি সেটা দিয়ে সাওয়াদ রা.-এর পেটে গুঁতা দিয়ে বললেন, সাওয়াদ পিছিয়ে যাও। সাওয়াদ রা. তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, আমার থেকে কিসাস নাও। সে বললো, আপনার লাঠি দিন। তিনি তাঁকে লাঠি দিলেন। অতঃপর সে বললো, আপনার পেট থেকে কাপড় সরান, তাহলে আমি আপনাকে আঘাত করবো যেমন আমাকে আঘাত করার সময় আমার পেটের উপর কাপড় ছিলো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন পেটের উপর থেকে কাপড় সরালেন আর তখন সাওয়াদ ইবন দাজিয়া রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জড়িয়ে ধরে তাঁর পেটের উপর চুমু খেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন সাওয়াদ! এমনটি করলে কেনো? সাওয়াদ রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন যে, যুদ্ধ তো শুরু হয়েই গেছে। তাই আমি চাইলাম সর্বশেষ আপনাকে স্পর্শ করি।

বলছিলাম জাবালা ইবনে আইহামা এটা মেনে পারছিলো না যে, তাকে একজন গ্রাম্য লোক থাপ্পড় দিবে। তাই সে বলল, আমি আগামীকাল আসবো। সে কি আগামীকাল এসেছিল? পরদিন ওমর রা. তাদের বিচারটা শেষ করার জন্য জাবালার জন্য অপেক্ষা করছিলেন; কিন্তু জাবালা আসলো না, সে এর পূর্বেই বাহনে আরোহণ করে তার সাথীদের নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে শামের দিকে রওয়ানা হয়ে গেছে এবং আবার তার দেশে গিয়ে খৃস্টান ধর্মে ফিরে গেছে। এবং

قُلْ هُوَ اللّٰهُ أَحَدٌ ۝ اَللّٰهُ الصَّمَدُ ۝ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ ۝ وَلَمْ يَكُنْ لَّهُ كُفُوًا اَحَدٌ

'বলুন তিনি আল্লাহ এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।' এটা বলার পরিবর্তে সে বলছে খোদ্যা তিনজন। ঈসা আ. আল্লাহর পুত্র। এভাবেই খৃস্টান অবস্থাতেই সে বৃদ্ধ হয়ে গেল। এবং বৃদ্ধ বয়সে এসে সে একটি কবিতা রচনা করল।

'একটি খাম্বার লজ্জার সত্ত্বেও লোকটি খৃস্টান হয়ে গেল। আমার কী ক্ষতি হতো যদি আমি ধৈর্য ধারণ করতাম?'

'আমার অহংকার ও আত্মঅভিমান আমাকে শেষ করে দিল। এই অহংকারের কারণেই আমি সুস্থ চক্ষু বিক্রি করেছি অন্ধ চক্ষুর বিনিময়ে'

'হায়! আমার মা যদি আমাকে জন্মাই না দিত। হায়! আমার দুর্ভাগা, আমি যদি ওমরের কথায় ফিরে যেতাম।'

'হায়! আমি যদি শামার সাবাররণ কোনো নাগরিক হতাম। শ্রবণশক্তি আর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে বসে আছি।' লোকটি এই কবিতা বারবার আবৃত্তি করতো এবং সে একথাও বলতো, হায়! আমি যদি খৃস্টান হওয়ার পরিবর্তে অসহায় মিসকিন হয়ে কোনো নির্জন প্রান্তরে মেষ বা উট চড়াতাম! অতঃপর লোকটি এভাবে খৃস্টান অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করলো। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। এই লোকটি খৃস্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করার কী? একমাত্র অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনাই তাকে বেইমান করে মৃত্যুবরণ করালো। সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নতিস্বীকার করেনি, অহংকার করে আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই মৃত্যুর সময় তার ইমান নসিব হয়নি।

অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার সমস্যা হল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা মানুষকে হক ও সত্য গ্রহণে বাধা প্রদান করে। কত মানুষ যে রয়েছে অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার কারণে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে। আবার অনেক মানুষ শুধু বিনয় ও নম্রতার কারণেই হক গ্রহণ করতে পেরেছে। কত মানুষকে হকের দিকে আহ্বান করা হয়েছে কিন্তু তারা হককে হক হিসেবে জানার পরও শুধুমাত্র অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার কারণে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে।

উদাহরণস্বরূপ আবু জাহেলের কথাই বলি। আবু জাহেল ছিল এই উম্মতের ফিরাউন। একবার এক সাহাবি আবু জাহেলের সাথে সাক্ষাৎ করলো। লোকটির উদ্দেশ্য ছিলো আবু জাহেলকে ইসলামে দাওয়াত দেওয়া। সে বলল, হে আবুল হিকাম! তোমাকে একটি প্রশ্ন করি, তুমি কি জানো না যে, মুহাম্মাদ হকের উপরে আছে? আবু জাহেল বলল, না না সে বাতিলের উপর আছে, সে মিথ্যাবাদী সে প্রতারক। লোকটি আবার তাকে প্রশ্ন করলো, সত্যি করে বলো দেখি আমার সাথে মিথ্যা বলবে না। আবু জাহেল বলল, আমি জানি যে, সে সত্যের উপরেই আছে আর আমরা যে মূর্তির পূজা করছি তা আমাদের কোনো উপকার করতে পারবে না। লোকটি তখন তাকে প্রশ্ন করলো, তাহলে তুমি সত্য দ্বীন গ্রহণ করছো না কেনো? আবু জাহেল বলল, আমরা বানু মাখযুম গোত্র আর আবদে মানাফ গোত্র সর্বদা কুরাইশের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য প্রতিযোগিতা করেছি। তারা যদি মানুষকে খাবার খাওয়াতো তাহলে আমরাও খাবার খাওয়াতাম, তারা যদি মানুষকে পানি পান করাতো তাহলে আমরাও পানি পান করাতাম। অর্থাৎ আমরা প্রতিযোগিতার ঘোড়ার মত একবার এটা আগে আরেকবার ওটা। এখন আবদে মানাফ গোত্রে নবি আসল আমরা নবি কোথায় পাবো? এটা যদি খাবার খাওয়ানোর কোনো বিষয় হতো তাহলে আমরাও খাবার খাওয়াতাম, এটা যদি পানি পান করানোর মত কোনো বিষয় হতো তাহলে আমরাও পানি পান করাতাম; কিন্তু এটা তো পানি পান করানো বা খাবার খাওয়ানোর মত কোনো বিষয় না। এটা হল নবুওয়াতের বিষয়; তারা যখন বলবে, আমাদের মাঝে নবি আছে তখন আমরা নবি পাবো কোত্থেকে?? সুতরাং এর থেকে বাঁচার উপায় একটাই, তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, তাঁকে নবি হিসেবে না মানা।

হে ভাই! একটু লক্ষ করে দেখ, অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনা আর অহঙ্কারের গৌরব তাকে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখলো, দীনে ইসলামে প্রবেশে বাধা দিল। এই অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনা আর বংশের গৌরব যে কত মানুষকে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছে!! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :

وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللَّهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ ۚ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ ۚ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ

'আর তাকে যখন বলা হয় যে, আল্লাহকে ভয় করো, তখন তার পাপ তাকে অহংকারে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং তার জন্য দোযখই যথেষ্ট; আর নিঃসন্দেহে তা হল নিকৃষ্টতম ঠিকানা।'

অনেক মানুষকে অন্যের হক আদায় করার উপদেশ দেওয়া হয়; কিন্তু অহংকারবশত সে এই নসিহত গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে এবং বলে, আমাকে নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না, আমার বিষয় আমিই ভাল জানি। আমার পক্ষে কি কাউকে জুলুম করা সম্ভব? তোমরা আমাকে নসিহতের উপযুক্ত নও। এই অহংকারের কারণেই কত মানুষের সাথে তার ভাইয়ের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, তা আর কখনো ঠিক হয় নি।

এক লোক তার স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করার কারণে তার স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে গেছে। আমরা যখন সেই লোককে বললাম যে, আপনি স্বীকার করেন আর না করেন এখানে দোষ আপনারই। ভুল আপনি করেছেন। সুতরাং আপনার স্ত্রীর নিকট যান এবং তার নিকট দুঃখ প্রকাশ করুন। তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন। আপনার ছেলে-মেয়েরা ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত ঐতিহ্যের মত জীবনযাপন করছে। আপনার স্ত্রী আপনার কাছে কোনো ধন-সম্পদ চায় না। আপনি শুধু একবার তার সামনে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করুন, দেখবেন সে চলে আসবে। আবার সবকিছু আগের মত ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু সে বলে আমি তার সামনে দুঃখ প্রকাশ করবো? তার কাছে ক্ষমা চেয়ে আমি ছোট হবো? না এটা হতে পারে না। আমি তার সামনে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে পারবো না। ভাই! কোন জিনিসের কারণে সে এমনটি করলো? এটা কি শুধুমাত্র অহংকারের কারণে হয়নি? অবশ্যই অহংকারের কারণেই সে এটা থেকে বিরত থেকেছে।

অনেক মানুষ আছে যারা ইচ্ছা করে কোনো কারণ ছাড়াই বাম হাত দিয়ে খাবার খায়। আমরা যখন তাকে বলি, ভাই আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, আপনি ডান হাত দিয়ে খাবার খান; কিন্তু সে আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। কোন জিনিস তাকে সঠিক বিষয়টা বুঝা থেকে ফিরিয়ে রাখলো? শুধু কি অহংকারের কারণেই এমনটি করেনি এবং সঠিক বিষয়টা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেনি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামের সাথে বসা ছিলেন, সেখানে এক লোক বাম হাত দিয়ে খাবার খাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোমলভাবে অত্যন্ত স্নেহ-সহানুভূতির সাথে তাকে বললেন, তুমি ডান হাত দিয়ে খাবার খাও। সে বলল, এটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি আর কখনো সক্ষম হবেও না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তার ডান হাত অচল হয়ে গেছে, সে আর কখনো তা উঠাতে পারে নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন অহংকারের কারণে সে এটা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলো।

ভাই! একটু লক্ষ্য করুন, শুধুমাত্র অহংকারের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বদ দোয়া দিলেন। এই অহংকারের কারণে মানুষ ইসলাম গ্রহণ থেকে দূরে থাকে। অহংকারের কারণে অনেক মানুষ মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করে না। সে বলে আমি মসজিদে যাবো? সেখানে কত নিচু প্রকৃতির লোকও সালাত পড়ে!! হাজ্জাজ ইবনে আরতাবাহ একজন হাদিসের রাবি। অনেকেই তাকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলেছেন, কারণ সে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করতো না। তাঁরা বলেন, আমরা তাকে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায়ের ব্যাপারে নসিহত করতাম; কিন্তু সে বলতো আমি মসজিদে যাবো? অথচ সেখানে কুলি-মজুররাও থাকে, আমি তাদের সাথে একসাথে সালাত আদায় করবো? অর্থাৎ আমি আমার সুগন্ধিযুক্ত সুন্দর পোশাক নিয়ে তাদের সাথে দাঁড়ানো সালাত পড়বো? আর বর্তমানও তো অহংকারের কারণে কত মানুষ মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করে না। যেমন কলেজের প্রিন্সিপাল, ভার্সিটির চ্যান্সেলর, এলাকার গভর্নর ইত্যাদি লোকেরা মসজিদে গিয়ে সালাত পড়ে না। তারা বাড়িতে ছেলে সন্তানদের নিয়ে অথবা খাদেম-খুদাম ও আশপাশের লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করে।

আল্লাহ তোমাকে আহ্বান করছেন, তিনি তোমাকে বলছেন তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। অর্থাৎ তিনি বলছেন তোমরা মসজিদে গিয়ে সালাত আদায়কারীদের সাথে সালাত আদায় কর। সুতরাং হে প্রিন্সিপাল! হে চ্যান্সেলর! হে গভর্নর! আপনারা মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করুন, কারণ মসজিদ বানানো হয়েছে সালাত আদায়ের জন্য। এজন্যে নয় যে, প্রত্যেকে নিজ নিজ গৃহে সালাতের স্থান বানাবে এবং বলবে, আমি কৃষক-শ্রমিকদের সাথে সালাত আদায় করবো? আমি ছাত্রদের সাথে সালাত আদায় করবো? সে এটা কেন করলো? শুধুমাত্র অহংকারের কারণে কি সে এমনটি করেনি?

হে ভাই! কিয়ামতের দিন অহংকারীদের ছোট পিঁপড়ার আকারে উত্থিত করা হবে। যারা মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হবে।

এবং যার অন্তরে সামান্য পরিমাণও অহংকার থাকবে সে কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাকে এবং আপনাদেরকে শুধুমাত্র তাঁর জন্য বিনয় ও নম্র হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমিন।

টিকাঃ
১. সূরা ইখলাস: ১-৩
১. সুরা বাকারা, আয়াত : ২০৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00