📄 নাস্তিকদের সাথে কথোপকথন
একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে আমাদের আজকের আলোচনা শুরু করবো। ঘটনাটি খুবই বিস্ময়কর। সাথে সাথে এটা আল্লাহর অস্তিত্বের অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে শক্ত দলিলও বটে। এর মাধ্যমে নাস্তিকদের সাথে আমাদের সালাফদের (পূর্বপুরুষদের) আচরণের একটা ধারণা পাওয়া যাবে যে, নাস্তিকদের সাথে আমাদের সালাফদেরব্যবহার কীধরনের ছিলো? নাস্তিকদের অস্তিত্ব কি পূর্বেও ছিল? সালাফগণ কীভাবে তাদের মোকাবিলা করতেন? বর্তমানেও কি নাস্তিকদের অস্তিত্ব আছে? তাহলে আমরা কীভাবে তাদের মোকাবিলা করবো?
বর্তমান সময়ে নাস্তিকদের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। সেই সাথে বাড়ছে তাদের প্রচারণা-প্রতারণার মাধ্যমে মধ্যে সংশয়-বিদ্বেষি ছড়ানোর প্রবণতা। বিভিন্ন সেমিনারে, টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে এবং ইন্টারনেটে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা মানুষের মধ্যে সংশয় ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।
সুতরাং তাদের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হবে? তাদের সাথে আচরণ-উচ্চারণের ক্ষেত্রে কীভাবে আমরা সালাফদের বর্ণিত ঘটনাগুলো শিক্ষা গ্রহণ করবো?
ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ 'সুমানিয়া' সম্প্রদায়ের কয়েকজন লোকের সাথে মুনাযারা করলেন। (‘সুমানিয়া' হল এক নাস্তিক-জনগোষ্ঠী, যারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না; তারা মনে করে গ্রহ-নক্ষত্রেরা ও এই বিশাল আকাশ এবং নদী-নালা, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত ও পশুপাখি समेत এই বিস্তৃত ভূপৃষ্ঠ এমনি এমনিই হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়ে গেছে; এগুলোর কোনো স্রষ্টা নেই, এগুলো সৃষ্টির পিছনে কোনো সৃষ্টিকর্তার হাত নেই।)
দ্বিপাক্ষিক দীর্ঘ বিতর্কের পরও যখন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা গেল না তখন উভয় পক্ষই এই সিদ্ধান্তে একমত যে, আগামীকাল সকলেই আমিরের দরবারে সময়মত হবে এবং সেখানে তাদের বিতর্কের ইতি টানবে। পরদিন সকালে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নাস্তিকরা আমিরের দরবারে এসে হাজির হল; কিন্তু ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ সময়মত উপস্থিত হন নি। তিনি ইচ্ছা করেই কিছু সময় দেরি করলেন। ওদিকে নাস্তিকরা এসে যখন আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ কে পেলো না; তারা তার আসতে বিলম্ব হতে দেখে হেসে ওঠো করে দিল, এবং আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ-এর অনুসারীদের অবজ্ঞা করে বলতে লাগলো, কোথায় তোমাদের আলেম? কোথায় তোমাদের আবু হানিফা? সে দেরি করছে কেনো? সে তো ওয়াদা লঙ্ঘন করছে। তোমরা কি এমন লোকের অনুসরণ করো; এমন লোককে তোমাদের নেতা মনে করোয়ার ওয়াদাই ঠিক নেই; যে কথা দিয়ে রাখছে না, সময় মত আমাদের মজলিসে উপস্থিত হয় না, ইত্যাদি বিভিন্নভাবে তারা মুসলমানদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছিলো। এদিকে আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ ইচ্ছা করেই দেরি করছিলেন। তিনি দীর্ঘক্ষণ বিলম্বের পর মজলিসে এসে উপস্থিত হলেন। নাস্তিকরা যখন তাঁকে দেখলেন তখন সকলে একযোগে তাঁর দিকে প্রশ্নের ঝাঁপ ছুঁড়ে দিয়ে বলল- আপনি দেরি করলেন কেনো? আপনি দাবি করেন আল্লাহ আছেন, আর আপনি তাঁকে ভয়ও করেন, তিনি আপনার প্রতিটি বিষয়ের হিসেব নিবেন, আর তিনিই তো সকলকে ওয়াদা ঠিক রাখতে বলেছেন, তাহলে আপনার এই কথার বাস্তবতা কোথায়?
আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ তখন বললেন, হে লোক সকল! তোমরা প্রথমে আমার কথা শুনো তারপর আমার ব্যাপারে যে ফায়সালা করবে আমি তা মাথা পেতে মেনে নিবো; কিন্তু আমার কথা শোনার পূর্বে আমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। আমি সঠিক সময়েই উপস্থিত হতে চেয়েছিলাম; কিন্তু নদীর পাড়ে এসে দেখি সেখানে কোনো নৌকা নেই। অনেক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন কোনো নৌকার দেখা পেলাম না; আমি তখন এখানে উপস্থিতির ব্যাপারে এক ধরনের সন্দেহে পড়ে গেলাম। আর ঠিক তখনই চার দিক অন্ধকার করে প্রচণ্ড এক ঝড় শুরু হল এবং আমার পাশের বড় একটি গাছের উপর বিশাল এক বজ্র পড়ল আর সাথে সাথে গাছটি দুই টুকরা হয়ে এমনি এমনি একটি করে মাটিতে আর একটি করে পানিতে পড়লো। আমি বলতে পারবো না, হঠাৎ কোত্থেকে একটি লোহার টুকরো এলো এবং গাছের ডালের সাথে একা একা লেসে একটি কুড়াল হয়ে গেল। অতঃপর কুড়ালটি একা একা গাছের ডালপালাগুলো কাটতে লাগলো আর গাছটি এমনি এমনি ফেড়ে তক্তা তক্তা হতে লাগলো। তারপর এমনি এমনি হাতুড়ি আর পেড়েক এসে পিটিয়ে পিটিয়ে একটি নৌকা তৈরি করে ফেললো। আমি অবাক বিস্ময়ে এই দৃশ্য দেখছিলাম, এরই মধ্যে নৌকাটি পানিতে পড়ে আমার সামনে আসলো আর আমি তাতে চড়ে বসলাম। অতঃপর নৌকাটি একা একা দাঁড় টেনে টেনে আমাকে নদীর এপার পৌঁছে দিল। এবং এসো আমরা আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক করি যে, এই বিশ্বজগতের একা একা সৃষ্টি হয়েছে, না-কি এর সৃষ্টির পিছনে রয়েছে কোনো এক মহান স্রষ্টার নিপুণ হাতের ছোঁয়া!
এমন আশ্চর্য ঘটনা শুনে নাস্তিকরা বলল, থামেন! আগে বলেন, আপনি কি সুস্থ আছেন? আপনার মাথা কি ঠিক আছে, না আপনি পাগল হয়ে গেছেন? তিনি বললেন, আমি ঠিকই আছি, আমি অসুস্থ নই এবং আমার বিবেক-বুদ্ধিও নষ্ট হয় নি। তারা বললো, এটা কীভাবে সম্ভব? এটা কি কোনো বিশ্বাসযোগ্য কথা হতে পারে যে, এমনি এমনি একটি গাছ ছিঁড়ে তক্তা তক্তা হয়ে তক্তা নৌকা তৈরি হয়ে গেল, অতঃপর তা একা একা মাঝি মানুষ পারাপার করল?! ঠিক আছে আমরা ধরে নিলাম একটি বজ্র এসে একটা গাছের উপর পড়েছে, অতঃপর গাছটি দুই টুকরা হয়ে একেক টুকরো পানিতে আর একক টুকরো মাটিতে পড়েছে; কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব যে, এমনি এমনি একটা নৌকা তৈরি হয়ে যাবে, অতঃপর তা কোনো মাঝি ছাড়া একাকী দাঁড়া টেনে মানুষ পারাপার করবে, অথচ একটা নৌকা তৈরি করতে কত লোকের প্রয়োজন হয়! কেউ গাছ কাটবে, কেউ তক্তা বানাবে, কেউ পেরেক পেঁচে কাঠ লাগাবে, কেউ দাঁড়া টানবে ইত্যাদি বিভিন্ন কাজের জন্যে বিভিন্ন মানুষের প্রয়োজন; কিন্তু আপনি বলছেন, কোনো মানুষ ছাড়া একাকী একটা গাছ কেটে তক্তা হয়ে নৌকা তৈরি হয়ে গেছে, অতঃপর কোনো মাঝি ছাড়া একাকী তা মানুষ পারাপার করছে! অসম্ভব! এটা হতে পারে না; এটা কোনো বিশ্বাসযোগ্য কথা হতে পারে না?
ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ তখন বললেন, সুবহানাল্লাহ! আপনারাই বলেছেন, এই বিশাল আসমান ও তারগ্রহ-নক্ষত্র এবং এই বিস্তৃত যমীন ও এর নদী-নালা, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত ও পশু-পাখি সবকিছু এমনি এমনি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়ে গেছে; এগুলোর সৃষ্টির পিছনে কোনো সৃষ্টিকর্তার হাত নেই, অথচ সেই আপনারাই আবার বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, ছোট একটি নৌকা হঠাৎ করে একাকী কোনো কারিগর ছাড়াই তৈরি হয়ে একাকী মানুষ পারাপার করছে? তখন অবিশ্বাসী নাস্তিকরা নিরুত্তর হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা জালেম সম্প্রদায়কে কখনো হেদায়েত দেন না।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! নাস্তিকতার মহামারি ইউরোপে শুরু হয়ে এর ঢেউ আমাদের সমাজে, মুসলিম দেশেও এর ছড়াছড়ি পড়ছে। ইউরোপে নাস্তিকতার সৃষ্টি ও প্রসারকে আশ্চর্যজনক কিছু মনে করি না; বরং সেখানে এমন মানুষের বসবাস, যারা সত্য ধর্মের আলো ও সঠিক দীন থেকে অনেক দূরে, যারা আল্লাহর সাথে অন্যকে শরিক করে। তারা বলে আল্লাহ তাআলার সন্তান রয়েছে; ইসা আ. হলেন আল্লাহর সন্তান। দেখুন, কত উদ্ভট-অদ্ভুত ওদের দাবি যে, আল্লাহর সন্তান হল একটি, আর আল্লাহর সন্তান (তাদের ধারণানুযায়ী) ইসা আ.-এর কোনো সন্তান নেই!! এটা হল সম্পূর্ণ বাস্তব বহির্ভূত এক দাবি; গমজ মড়া কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি তা মেনে নিতে পারে না। সাথে সাথে সেখানকার মানুষ বিভিন্ন ধরণের কুপ্রবৃত্তায় ডুবে থাকে; বিশেষ করে যুবক-যুবতী সম্প্রদায়। তারা বিভিন্ন ধরণের অশ্লীলতায় লিপ্ত, তারা কোনো ধরণের ধর্মীয় বিধিবিধানের প্রতি সম্মান ও ভ্রূক্ষেপ করে না- এরপর চলে আসে সোজা নাস্তিকতার দিকে, কেনো না-বা আসবে না? বরং এটাই হওয়ার কথা, কারণ তারা যা ইচ্ছে তাই করতে চায়। যখন খুশি যেভাবে খুশি মদ পান করতে চায়। যেখানে খুশি যার সাথে খুশি যেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হতে চায়। তারা যা ইচ্ছে তাই থেকে থেকে চায়; যখন-তখন যেখানে ইচ্ছে ঘুমতে চায়; যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে উঠতে চায়। যখন তারা যদি দীন মানে করে, তাহলে তাদেরকে বলা হবে- এটা তো হারাম, এটা করা যাবে না, এটা করলে আল্লাহ তাআলা শাস্তি দিবেন, তোমার পেশেফ কাজদের অনুমতি দেই, এর জন্য তোমার জবাবদিহি করতে হবে। যখন এ-ধরনের আহ্বান তার মন থেকে একের পর এক বেরুতে থাকে, তখন মনচাহি জিন্দেগি কাটাতে হলে তাকে অবাধ দীন থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে, আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ্বাসী হয়ে তাকে নাস্তিকতারই গ্রহণ করতে হবে; তাহলেই সে সবকিছুই যেভাবে যখন খুশি করতে পারবে।
বর্তমানে ইউরোপে নাস্তিকতাব্যাপক ছড়াছড়ি। আমি নিজ বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা এখানে উল্লেখ করছি। আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে আমি ইউরোপের এক খুটুন ভূমিতে ছিলাম; সেখানের বেশিরভাগ মানুষই খুস্টান, দেশের এখানে-সেখানে সর্বত্র গির্জা বিদ্যমান, সব জায়গায় থেকে গির্জার মূর্তি আর আওয়াজ আসতে থাকত। রাস্তার মোড়ে মোড়ে যোগ মিশ্র কুমিজ বৃদ্ধি মুর্তি আর ছবি টানাচানো থাকে (যদিও এটা সম্পূর্ণ মনগড়া-মিথ্যা ছবি)। আমি তাদের একটা পরিসংখ্যানের রিপোর্ট দেখেছি। পরিসংখ্যানটা করা হয় কয়েকটি প্রশ্নের উপর; তার একটি প্রশ্ন হল, তোমার ধর্ম কী? এই প্রশ্নের উত্তর সেখানের ১০% লোক লিখেছে, আমার ধর্ম হল ‘খুস্টধর্ম’। এরপর প্রশ্ন করা হয়েছে, তুমি কি কোনো কারণে জীবনে একবার হলেও গির্জায় প্রবেশ করেছ? তো তা যে কোনো কারণে, যেমন পড়ালেখা, বিবাহ বা অন্য কোনো উপলক্ষে? এই প্রশ্নের উত্তরে মাত্র ৭% লোক হ্যাঁ বলেছে। অর্থাৎ তারা জীবনে একবার হলেও গির্জায় প্রবেশ করেছে। এরপর প্রশ্ন করা হয়েছে তুমি কি প্রতি সপ্তাহে গির্জায় প্রবেশ করো? মাত্র ১% লোক বলেছে, তারা সপ্তাহে একদিন গির্জায় প্রবেশ করে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে যেমন সুইডেন, জর্দান, ফ্রান্স, আমেরিকা ইত্যাদি দেশ থেকে যেসকল লোক আমাদের কাছে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, জুমার পর নিজেদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করে, আমি তাঁদের অনেককে জিজ্ঞেস করেছি যে, আপনি কতবার গির্জায় প্রবেশ করেছেন? তাঁদের অনেকেই এই উত্তর দেয় যে, সে জীবনে একবারের জন্যেও গির্জায় প্রবেশ করেনি, অথচ তাদের কারো বয়স ত্রিশ, কারো চল্লিশ বা তার চেয়ে কম-বেশি। সুতরাং তাঁদের সমাজে নাস্তিকতা ছড়ানো আশ্চর্যের কিছু না; এ বিষয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল আমাদের দেশে, মুসলিম সমাজে নাস্তিকতার প্রচার-প্রসার। এমন সমাজে নাস্তিকাবাদ বিস্তার করা-যেখানে জনগণের ধর্ম ইসলাম, যারা পরকালে বিশ্বাসী, যারা জান্নাত-জাহান্নামের প্রতি ইমান রাখে, যাদের কাছেরাছে অবিস্মৃত মহান আল-কুরআন। যখন তাদের মধ্যে নাস্তিকতা ছড়ায় তখন বুঝতে হবে যে, কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে, কোথাও কোনো ঝামেলা হচ্ছে, যার প্রতিকার ও প্রতিষেধক প্রয়োজন; যার সংশোধন অত্যাবশ্যক।
পূর্বে এমন কিছু গর্ভদ লোক ছিলো, যারা নিজেরাই সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করতো। একবার এদেরই একজন এক আলেমের নিকট গিয়ে বললো, আমি সৃষ্টি করতে পারি- আপনি কি এটি বিশ্বাস করেন? তখন আলেম বললেন, আচ্ছা আপনি সৃষ্টি করতে পারেন!!? সে বললো, হ্যাঁ আমি সৃষ্টি করতে পারি। আলেম বললেন, ঠিক আছে আমাকে কিছু একটা সৃষ্টি করে দেখান, তখন লোকটি উক্ত আলেমকে একটি কল্পিত গাছের নিকট নিয়ে গেল। অতঃপর লোকটি গাছের মধ্যে খোদাই করে একটি গর্ত তৈরি করে ভিতরে কিছু গোশতের টুকরো রেখে তার মুখ বন্ধ করে দিল, এবং সেই আলেমকে বললো, একমাস পর এখানে আবার আসতে হবে। অতঃপর একমাস পার হওয়ার পর লোকটি উক্ত আলেমকে নিয়ে আবারও সেই গাছের নিকট আসল। তখন কী হল?
একমাস পর যখন আলেম সেই ‘সৃষ্টিকর্তা’ (!) লোকটির সাথে উক্ত গাছের নিকট আসল, তখন লোকটি অগ্রসর হয়ে গাছের মধ্যে সৃষ্ট সেই গর্তের মুখ থেকে আবরনটি সরিয়ে দিলো, আর তখন দেখা গেল সেখানে কিছু পোকামাকড় ইঁটাঁটাঁটি করছে। তখন লোকটি আলেমকে বললো, এই দেখুন আমি এই পোকামাকড় সৃষ্টি করেছি। তখন আলেম তাকে বললেন, আপনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন? সে বললো, হ্যাঁ আমিই এগুলো সৃষ্টি করেছি। আলেম বললেন, তোমার সৃষ্টির সংখ্যা কত? সে বললো, আমি জানি না। আলেম বললেন, তুমি সৃষ্টি করেছো অথচ তুমিই তোমার সৃষ্টির পরিমাণ সম্পর্কে অজ্ঞাত! আচ্ছা বল দেখি, তোমার সৃষ্টির মধ্যে কতটি পুরুষ আর কতটিমহিলা? সে বললো, আমি জানি না। অতঃপর তিনি বললেন, আচ্ছা বল দেখি, এই পোকামাকড় যে হাঁটছে, এগুলো এখন কোথায় যাবে, কী খাবে, কতদিন বাঁচবে? সে বললো, *অধিাসংগাতি* না। তখন আলেম বললেন, সুবহানাল্লাহ! তুমি সৃষ্টি করলে অথচ তুমি এগুলো সম্পর্কে কিছুই বলতে পারো না যে- তাদের সংখ্যা কত, পুরুষ ক'টি, মহিলা ক'টি, তারা কী খাবে, কোথায় যাবে, কতদিন বাঁচবে? তখন নাস্তিক লোকটি হতবুদ্ধি হয়ে গেল।
এই নির্বাচনের একটি স্টট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। আসলে যারা আল্লাহর প্রভুত্বের ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব দাবি করে তারা নির্বোধ; তাদের কথার কোনো ভিত্তি নেই। কোনো বুদ্ধিমান লোক তাদের কথা বিশ্বাস করতে পারে না; এমনকি সমাজেও তাদের কথার কোনো ধর্তব্য নেই।
যুবাইর ইবনু মুতইম রা. তখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নি। তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করতে মদিনায় এসে মসজিদের নিকট চলে এলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদে নববিতে সাহাবায়ে কেরাম রা.কে নিয়ে মাগরিবের সালাত আদায় করছিলেন এবং সুরা তুর তেলাওয়াত করছিলেন। মসজিদের বাহির থেকে যুবাইর রা. তেলাওয়াত শুনছিলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন-
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ
'তারা কি আপনা-আপনিই সৃজিত হয়ে গেছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা?'
যুবাইর ইবনু মুতইম রা. বলেন, যখন এই আয়াত তেলাওয়াত করা হল, তখন আমার মনে হচ্ছিল, আমার অন্তর খুশিতে উদ্বৃত্তে উড়তে শুরু করছে। আমি মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, বাস্তবে কি অনস্তিত্ব থেকে আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, না-কি আমাদেরকে আমাদের থেকেই সৃজন করা হয়েছে?
একবার এক বেদুইনকে প্রশ্ন করা হল, তুমি কীভাবে তোমার প্রতিপালককে চিনতে পেরেছো? বেদুইন লোকটি বলল, এই-যে বিশাল আকাশ ও এর কক্ষপথ; এই বিস্তৃত ভূমি ও এর উপত্যকা-গিরিপথ এবং এই মহাসমুদ্র ও এর ঢেউ-তরঙ্গমালা- এর সবকিছুই কি মহাজ্ঞানী একজন স্রষ্টার প্রমাণ বহন করে না?
পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুই মহান স্রষ্টা এক আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে, আর প্রকারান্তরে আমাদের সালাফগণ পৃথিবীর সুখ্যাতিসম্পন্ন সৃষ্টর মাধ্যমেও আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ পেশ করতেন। যেমনিভাবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন:
وَ هُوَ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ حَتَّىٰ إِذَا أَقَلَّتْ سَحَابًا ثِقَالًا سُقْنَاهُ لِبَلَدٍ مَّيِّتٍ فَأَنزَلْنَا بِهِ الْمَاءَ فَأَخْرَجْنَا بِهِ مِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ كَذَلِكَ نُخْرِجُ الْمَوْتَىٰ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
'তিনিই বৃষ্টির পূর্বে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন। এমনকি যখন বায়ুভরা ভারী মেঘমালা বয়ে আনে, তখন আমি এ মেঘমালাকে একটি মৃত শহরের দিকে হাঁকিয়ে দেই; অতঃপর এ-মেঘ থেকে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করি; অতঃপর পানি দ্বারা সব রকমের ফল উৎপন্ন করি। এমনিভাবে আমি মৃতদেরকে পুনরুজ্জীবিত করবো, যাতে তোমরা চিন্তা করতে পারো।'
একবার এক মূলহিদ তথা নাস্তিক এক বালককে প্রশ্ন করলো, তুমি কি মুসলিম?
বালক ছেলেটি ছিলো বুদ্ধিমান সে বলল, হ্যাঁ আমি মুসলিম।
নাস্তিক : অর্থাৎ তুমি মুসলিম, তুমি আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করো?
বালক : হ্যাঁ আমি মুসলিম, আমি আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করি।
নাস্তিক : তুমি কি তাঁকে কখনো দেখেছো?
বালক : না। আমি তাঁকে কখনো দেখি নি।
নাস্তিক : তুমি কি তাঁর কথা কখনো শুনেছো?
বালক : না আমি তাঁর কথা কখনো শুনি নি।
নাস্তিক : তুমি কি তাঁকে কখনো স্পর্শ করেছো?
বালক : না। আমি তাঁকে কখনো স্পর্শ করি নি।
নাস্তিক : তুমি কি কখনো তাঁর ঘ্রাণ শুঁকেছো?
বালক : না আমি কখনো তাঁর ঘ্রাণ শুঁকি নি।
নাস্তিক : তুমি কি কখনো তাঁর স্বাদ গ্রহণ করেছো?
বালক : না আমি কখনো তাঁর স্বাদ গ্রহণ করি নি।
নাস্তিক : তাহলে তোমার রব আল্লাহর কোনো অস্তিত্ব নেই,কারণ তুমি যাকে কখনো দেখো নি, যার কথা কখনো শুনো নি, যাকে কখনো স্পর্শ করো নি, যার ঘ্রাণ শুঁকো নি তার কোনো অস্তিত্বই নেই। অর্থাৎ যাকে পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায় না তার কোনো অস্তিত্ব নেই।
বাচ্চাটি ছিলো বুদ্ধিমান, সে তাকে উল্টো প্রশ্ন করে বললো, আপনার কি আকল তথা বিবেক-বুদ্ধি আছে?
নাস্তিক : হ্যাঁ আছে।
বালক : আপনি কি আপনার বিবেক কখনো দেখেছেন?
নাস্তিক : না, আমি তা কখনো দেখি নি।
বালক : আপনি কি এর কোনো কথা কখনো শুনেছেন?
নাস্তিক : না আমি এর কোনো কথা কখনো শুনি নি।
বালক : আপনি কি একে কখনো স্পর্শ করেছেন?
নাস্তিক : না, আমি একে কখনো স্পর্শ করি নি।
বালক : আপনি কি কখনো এর ঘ্রাণ শুঁকেছেন?
নাস্তিক : না আমি কখনো এর ঘ্রাণ শুঁকি নি।
বালক : আপনি কি কখনো এর স্বাদ গ্রহণ করেছেন?
নাস্তিক : না আমি কখনো এর স্বাদ গ্রহণ করি নি।
বালকটি তখন তাকে বললো, তাহলে তো আপনি পাগল; আপনার কোনো বিবেক নেই। নাস্তিক লোকটি বলল, না আমি পাগল নই, অবশ্যই আমার বুদ্ধিশক্তি আছে।
বালক ছেলেটি বললো, আপনি কীভাবে জানলেন যে, আপনার বুদ্ধিশক্তি আছে?
নাস্তিক : আমি এর প্রভাব টের পাই। অর্থাৎ এর বিভিন্ন নিদর্শন থেকে আমি আমার আকলের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারি; তাহলে কীভাবে বলবো যে, আমার কোনো বিবেক নেই; আমি পাগল?
নিদর্শন দেখেই তো বিষয় সম্পর্কে জানা যাবে; যেমন পূর্ণ বয়স্ক এক লোক রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটছে, বাচ্চাদের সাথে খেলছে, অথবা রাস্তা পারাপারের সময় গাড়ির প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করছে না; এই লোককে দেখে মানুষ বলবে, লোকটি পাগল, তার বিবেক নেই। তারা কীভাবে তাকে চিনতে পারলো? তারা কি তার মাথার খুলি ভেঙে মগজ খুলে দেখেছে না, তারা তা দেখেনি; তবুও তারা তাকে চিনতে পেরেছে। তার কার্যাবলির নিদর্শন দেখে চিনতে পেরেছে যে, তার কোনো বিবেক নেই; সে পাগল। অনুরূপভাবে সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন লোকের বিভিন্ন নিদর্শন দেখে জানা যাবে যে, তার জ্ঞান আছে। যখন দেখা যাবে, সে সবকিছু সঠিকভাবে সম্পাদন করছে, উল্টোপাল্টা কিছু করছে না, তখন মানুষ তাকে বলবে, সে জ্ঞানী, তার বিবেক-বুদ্ধি ঠিক আছে।
একটা প্রশ্ন : আমরা কীভাবে জানবো যে, আল্লাহর অস্তিত্ব আছে?
এর উত্তর হল, আমরা তাঁর নিদর্শন দেখে, তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টি দেখে; আসমান, যমিন, পাহাড়-পর্বত দেখে এবং আমাদের নিকট যে অবিকৃত কুরআন আছে, এ-মধ্যে দেখা দেখে জানতে পারবো যে, আল্লাহ আছেন আর এসবকিছুই বলে দেয় যে, এক আল্লাহর অস্তিত্ব বিদ্যমান।
আফসোস! বর্তমানে নাস্তিকদের সংখ্যা অনেক; যারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। তারা যখন ইসলামে প্রবেশ না করে এবং আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস না করে তখন তাদের উপর নেমে আসে আল্লাহর ওলার পক্ষ থেকে নানা দুশ্চিন্তা ও অশান্তি। আর এই অশান্তি-উদ্বেগ থেকে বাঁচেও তারা বেছে নেয় আত্মহত্যার ভয়াবহ পথ অথবা জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন নেশাজাত দ্রব্য; যাতে তারা এই দুশ্চিন্তা ভুলে থাকতে পারে।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে হেদায়েতের উপর রাখুন; এই দীনের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় ও বৃদ্ধি করে দিন; আমাদেরকে সততার উপর অটল-অবিচল রাখুন; আমরা যেখানেই থাকি আমাদেরকে পবিত্র-স্বর্গসুখী করে রাখুন। আমিন।
টিকাঃ
১. সুরা তুর, আয়াত: ৩৫
১. সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৭
📄 গাইরুল্লাহর ইবাদত
ইসলাম-পূর্ব মানুষের চিন্তা-চেতনা ছিলো বিক্ষিপ্ত এবং তাদের আকিদা- বিশ্বাস ছিলো ছড়ানো-ছিটানো। তারা বিভিন্ন মূর্তি-প্রতিমাপূজা করতো। এরপর ইসলাম এসে তাদের সকল বাতিল ও মিথ্যা চিন্তা-আকিদা মুছে দিয়ে দিল। তাদের অসাড় বিক্ষিপ্ত চিন্তা ও বিশ্বাস নিয়ে এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি-
ইমরুল কায়েস, জাহেলি আরবের এক বিখ্যাত কবি। এক লোক এসে তাকে বলল, ইমরুল কায়েস! অমুক তোমার বাবাকে হত্যা করেছে। ইমরুল কায়েস বলল, সে কি আমার বাবাকে হত্যা করেছে? লোকটি বলল, হ্যাঁ সে তোমার বাবাকে হত্যা করেছে। ইমরুল কায়েস জানতো যে, সে এখন বেশ উত্তেজিত হবে এবং বাবা-হত্যার প্রতিশোধ নিতে ছুটে যাবে; তাই সে বললো, আজ মদ পান ও আমোদ-ফুর্তি করবো, আর আগামীকাল বিষয়টি ভেবে দেখবো; প্রতিশোধ নেবো এবং বাবার হত্যাকারীর সাথে বোঝাপড়া করবো। অর্থাৎ সে আজ মদ পান করবে আর আগামীকাল প্রতিশোধ নিবে। অতঃপর সে এটাই করলো।
এরপর আগামীকাল, সে পিতা-হত্যার প্রতিশোধ নিতে চাইলো; তাই সে ভাগ্য নির্ধারণের জন্য কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন কাগজে 'শান্তিটি কর' 'শান্তিটি করো না' এই দুইটি বাক্য লিখল এবংতা একটি পাত্রে করে মূর্তির সামনে রাখল, অতঃপর সেখান থেকে একটি কাগজ বের করলো। কাগজ খুলে দেখল তাতে লেখা 'শান্তিটি করো না', এরপর আরেকটি কাগজ নিলো এবং দেখল তাতেও লেখা 'শান্তিটি করো না' এরপর আবারও আরেকটি কাগজ খুললো; তাতেও দেখা গেল সে-একই লেখা 'শান্তিটি করো না'। তখন সে পাত্রটি মূর্তির মুখে ছুঁড়ে মারলো। সে ভেবেছিলো, গোপন- প্রকাশ্য সকল রহস্য মূর্তিটি জানে; তাই তারা মূর্তিকেও সম্মান করতো; আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা না করে তার কাছে প্রার্থনা করতো। কখনো কখনো তার সামনে পশু বলি দিতো, বিভিন্ন রঙের বাতি জ্বালাতো, নাচ-গান করতো, তার চতুর্দিকে চক্কর দিতো, এমনকি তুমি ইসলাম-পূর্বার দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাবে, তার চতুর্পার্শ্বে মূর্তি স্থাপন করা, আর কাফ্ফেরা বিভিন্নভাবে তার ইবাদত করতো। তারা বিশ্বাস করতো, এই মূর্তিগুলো তাদের উপকারে করতে পারে, তাদের ক্ষতি করতে পারে, তাদের অসুস্থকে সুস্থ করতে পারে, অনুপস্থিতকে উপস্থিত করতে পারে এবং গোপন-প্রকাশ্য সকল বিষয় জানে। একটা তুচ্ছ পাথরের ব্যাপারেই তারা এতসব ধারণা পোষণ করতো। অতঃপর ইসলাম এসে এসসবকিছু বাতিল করে দিয়েছে।
ইমরুল কায়েস মূর্তির সামনে পাত্র রেখে তার মাধ্যমে ভাগ্য যাচাইয়ে করতে চাইছিল; কিন্তু তা থেকে বারবার বের হচ্ছিল, 'শান্তিটি করো না' 'শান্তিটি করো না' অর্থাৎ তোমার বাবার হত্যাকারীকে হত্যা করো না। প্রথমবার যখন 'শান্তিটি করো না' লেখা বের হল তখন সে ভাবল, হয়তো মূর্তিকে কিছু সম্পদ দিলে সে সঠিক পরামর্শ দিবে; তাই সে তার সামনে কিছু সম্পদ রাখলো এবং দ্বিতীয়বার ভাগ্য নির্ধারণ করলো, তখনো বের হল 'শান্তিটি করো না'। এরপর সে ভাবলো হয়তো তার সম্পদের পরিমাণ কম হয়েছে; তাই সে তার সামনে আরো সম্পদ রাখলো এবং ভাগ্য নির্ধারণের জন্য কাগজ বের করলো; কিন্তু এবারও বেরুল 'শান্তিটি করো না' লেখা। সে যখন তিনবার দেখলো 'শান্তিটি করো না' 'শান্তিটি করো না' 'শান্তিটি করো না', তখন রাগাম্বিত হয়ে পাত্রটি মূর্তির মুখে ছুঁড়ে মারলো এবং বললো, হে মূর্তি! যদি নিহত ব্যক্তি তোর বাবা হতো, তাহলে তুই বলতি 'শান্তিটি কর', একথা বলে সে পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করতে গেল।
আমার এই ঘটনা বলার উদ্দেশ্য হল একথা বুঝানো যে, জাহেলিয়াতে মানুষ মূর্তিপূজার ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের আকিদা পোষণ করতো। আবু রাজা আল-আতারিদি রা. বলেন, আমরা জাহেলি যুগে মূর্তি ও পাথরের পূজা করতাম। তিনি বলেন, একবার আমরা সফরে বেরুলাম এবং আমরা যে মূর্তির পূজা করতাম তাকেও সফরে আমাদের সাথে নিয়ে নিলাম। সফরে আমাদের যখন রান্নার সময় হতো তখন আমরা তিনদিকে তিনটি পাথর রেখে তার উপর পাতিল রেখে নিচে আগুন জ্বালিয়ে রান্না করতাম; কিন্তু আমরা যখন তৃতীয় পাথর খুঁজে না পেতাম তখন আমাদের সেই মূর্তিটিকে তৃতীয় পাথর হিসেবে ব্যবহার করতাম আর বলতাম, যখন আগুন এর নিকটবর্তী হবে তখন সে আগুনতাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। তিনি বলেন, এরকম আমরা একদিন সফরে চলতে লাগলাম। (তুমি জাহেলিয়্যূগে মানুষের নির্বুদ্ধিতার প্রতি একবার লক্ষ করে দেখো, মূর্তিপূজার ব্যাপারে তারা কতোটা নির্বোধ ছিলো, এরপর দেখো ইসলাম এসে কীভাবে তা ঠিক করেছে) তিনি বলেন, আমরা একদিন চলতে লাগলাম, তখন আমাদের গোত্রের এক লোক চিৎকার করে বলতে লাগলো, তোমাদের ইলাহ তোমাদের প্রতিপালক হারিয়ে গেছে,তোমাদের ইলাহকে খুঁজে বের করো। আমরা তখন ব্যক্তিগত হয়ে প্রতিটি জায়গায় তার খোঁজ করতে লাগলাম, এমন সময় এক লোক চিৎকার করে বললো, আমি তোমাদের ইলাহকে দেখেছি, তোমাদের ইলাহ কি এমন নয়? তিনি বলেন, আমি তখন তার নিকট গেলাম এবং দেখলাম গোত্রের লোকেরা তার ইবাদত করছে, তার সামনে সিজদাবনত অবস্থায় রয়েছে। আমরা তখন তার সামনে একটি উট বলি দিলাম।
আমি জানি তোমরা আমার এই ঘটনা শুনে হাসবে, যেমন তোমরা হাসো ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর ঘটনা শুনে। ওমর রা. বলেন, আমার কোনো সম্পদ ছিলো না, যা দিয়ে আমি মূর্তি ক্রয় করবো। তাই আমি কিছু খেজুর জমাতাম এবং তা দিয়ে মূর্তি বানিয়ে তার উপাসনা করতাম, তারপর আমার যখন খিদে পেতো তখন আমি তা থেকে খেয়ে নিতাম। জাহেলিয়াতে মানুষ এমন তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন বিষয়ের ইবাদত করতো যেগুলো মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে আর না কোনো উপকার করতে পারে। এই তুচ্ছ বিষয়গুলোর ইবাদত এখনও বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ এখনও মানুষ এ-ধরনের মাটি ও পাথরের মূর্তির ইবাদত করে, তাদের সামনে মাথানত করে সিজদা করে, তাদের সামনে খাবার রাখে ও পশু বলি দেয়। উদাহরণস্বরূপ, তুমি শ্রীলঙ্কা বা জাপানের দিকে তাকাও, তারা জাগতিক দিক থেকে উন্নতি ও প্রগতির শীর্ষে; কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সঠিক পথের সন্ধান পায়নি, তারা শিরকমুক্তভাবে এক আল্লাহর ইবাদত করে না। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বৌদ্ধ ধর্মও মূর্তিপূজার অন্তর্ভুক্ত। তুমি চিনে যাও, করিয়াতে যাও, সেখানেও একই চিত্র দেখতে পাবে। তারা বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী, তারা মূর্তির ইবাদত করে এবং মূর্তির নৈকট্য অর্জনের জন্য তাদের সামনে মাথানত করে। তাদের ইবাদতের নিদর্শন ও পদ্ধতিগুলো দেখলে তুমি আশ্চর্য হবে। কীভাবে তাদের আকল তাদেরকে এই অনুমতি দেয় যে, তারা নিজ হাতে স্বর্ণ, পাথর বা মাটি বা অন্য কোনো পদার্থের মাধ্যমে যে মূর্তি নির্মাণ করলো, আবার নিজেই সে মূর্তিকে রব হিসেবে ইবাদত করে! নিজ-হাতে নির্মিত মূর্তির সামনে গিয়ে বলে, হে প্রভু আমাকে ক্ষমা করো!! আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করো, আমার অমুক প্রয়োজন পূর্ণ করে দাও!
আল্লাহ তাআলা এদের সম্পর্কে বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ فَاسْتَمِعُوا لَهُ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَن يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ وَإِن يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَّا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ
'হে লোক সকল! একটি উপমা বর্ণনা করা হল, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো; তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা কর, তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সকলে একত্রিত হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয় তাহলেতারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না; उपासক ও উপাস্য উভয়ই দুর্বল।'
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ
'তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনবে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। কিয়ামতের দিন তারা তোমাদেরশিরিক অস্বীকার করবে। বস্তুত আল্লাহর ন্যায় কেউ তোমাকে অবহিত করতে পারবে না। ২
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এখানে বর্ণনা বলেছেন যে, ত্রেসকল বোকা যেসকল মূর্তিপূজা করে এবং পূর্বে যাদের পূজা করাহতো তারা না কোনো ক্ষতি করতে পারে না কারো কোনো উপকার দান করতে পারে।
ত্রেসকল লোকের অবস্থা সত্যিই আশ্চরজনক। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে চিনে বা জাপানে বিশ্ববিদ্যালয়র শিক্ষক, হাসপাতালের ডাক্তার, বড় ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানী অর্থাৎ অনেক জ্ঞানী ও পন্ডিত কিন্তু সে লাল কাপড় পড়ে মূর্তির সামনে এসে মাথানত করছে, তার পাশে তাওয়াফ করছে, তার কাছে মাগফিরাত, নাজাত ও ক্ষমা প্রার্থনা করছে এবং তার চিন্তা- উদ্বেগ ও রোগ-শোক দূর করার জন্য তার নিকট প্রার্থনা করতে চাচ্ছে।
সাথে সাথে ত্রেসকল লোকদের প্রতি লক্ষ করো, যারা বিভিন্ন কবরের নিকট যায় এবং আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে তার কাছে প্রার্থনা করে। কবরের উপর স্তম্ভ নির্মাণ করে, তার উপর গিলাফ বিছিয়ে রাখে, অতঃপর নিজ হাতে সেটাকে মুখে দেওয়াকে, তার উপর টাকা-পয়সা ছিটানোকে নিজের জন্য কল্যাণকর ও সৌভাগ্য-সমৃদ্ধির কারণ মনে করে। অথচ সেই কবরের অধিবাসী নিজেই নিজের কোনো উপকার করার ক্ষমতা রাখে না।
হে ভাই! তুমি এসকল কবর নির্মাণার্জনের জন্য টাকা খরচ করার পরিবর্তে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করো বা মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তা নির্মাণ করো; কিন্তু আফসোসের বিষয় হল মানুষ এসকল কবরের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা খরচ করছে, এরপর তারা সেই কবরের কাছে আসছে এবং আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে তার নিকট প্রার্থনা করছে, দয়া ভিক্ষা চাইছে। মাজারের চৌকাঠে চুমু খাচ্ছে, মাথা ঠেকাচ্ছে এবং তাদের কল্যাণকর কাজগুলোকে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করছে।
এসকল কবরের সাথে আর হিন্দু মূর্তির সাথে কি কোনো পার্থক্য আছে? মূর্তির কাছেও মানুষ যায়, তার সামনে মাথানত করে, তার কাছে প্রার্থনা করে, রহমত ভিক্ষা চায়। আর কবর বা মাজারের কাছেও মানুষ আসে, তার সামনে মাথানত করে, তার কাছে প্রার্থনা করে রহমত ভিক্ষা চায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এটা পছন্দ করেন না তিনি চান না যে, তাঁর সাথে অন্য কারো ইবাদত করা হোক। আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
‘এবং এই ওহিও করা হয়েছে যে, সমজিদসমূহ আল্লাহ আলালাকে স্মরণ করার জন্য। অতএব, তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে ডেকো না।’
আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারো জন্য কোনোখানের কোনো ইবাদত কখনই জায়েজ নেই। যে তার নিজের উপর থেকে একটা মশা তাড়াতে পারে না সে তোমার উপর থেকে বিপদ-আপদ কীভাবে দূর করবে? এবং সে তোমার উপকার করবে কীভাবে?
একবারে ভারতে ইসলাম প্রবেশকারী সাহাবায়ে কেরাম রা.ও বিষয়টা বুঝতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসআব ইবনে উমায়ের রা.কে মদিনায় ইসলাম প্রচারের জন্য প্রেরণ করলেন। তিনি মদিনায় গিয়ে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, কুরআন শেখাতেন এবং তাবে'ঈনের ইসলাবের পরিবর্তন ও দ্বন্দ-আক্বান শিক্ষা দিতেন ও মানুষকে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করতে বলতেন। তার দাওয়াতে উমার ইবনে জামুহ রা.-এর চার সন্তান ইসলাম গ্রহণ করলেন। উমার ইবনে জামুহ রা. একজন বিশিষ্ট সাহাবি ছিলেন, তার চার সন্তান তার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তারা চেষ্টা চালিয়ে তাদের পিতাও ইসলাম গ্রহণ করুন। তাদের পর তাদের মাতাও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা তাদের পিতাকে বলল, বাবা! এই শহরে একজন লোক এসেছেন, যিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান করছেন। তাহলে আপনি কেনো তার কাছে যাচ্ছেন না এবং তার কথা শুনছেন না? তিনি বললেন, আমি যাচ্ছি না কারণ আমার কাছে ‘মানাফ’ আছে, আমার কাছে মূর্তি আছে, আমার ইলাহ আছে। তারা বললো, সমস্যা কি? আপনি তার কাছে যাবেন এবং তার কথা শুনে চলে আসবেন, এতে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। ছেলেদের কথায় তিনি মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর নিকট গেলেন, তার কাছে বসলেন এবং তার কাছ থেকে কুরআন তেলাওয়াত শুনলেন। অতঃপর তার ও তার মূর্তির সাথে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে।
উমার ইবনে জামুহ রা. মদিনার রাস্তায় হেঁটেহেঁটে মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর নিকট গেলেন। তখনকার মদিনা বর্তমানের মদিনার মতো ছিলো না। তখন মদিনার ঘরগুলো ছিলো পুরনো, রাস্তাগুলো ছিলো মাটির এবং রাস্তার পাশে গাছপালা ছিল। তিনি মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর নিকট গিয়ে তার পাশে বসলেন এবং তাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কিসের দিকে মানুষকে ডাকেন? মুসআব ইবনে উমায়ের রা. বললেন, আমি এক আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকি, যার কোনো শরিক নেই এবং আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিও মানুষকে ইমান আনতে আহবান করি। অতঃপর মুসআব ইবনে উমায়ের রা. তাকে কুরআন পড়ে শুনালেন। কুরআন শুনে তিনি খুবই প্রভাবিত হলেন; কিন্তু তিনি বললেন, এ বিষয়েও বন্ধুদের লোকের সাথে আমার পরামর্শ করতে হবে। আমি আমার কওমের সরদার, আমি এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না। অতঃপর তিনি বাড়িতে ফিরে এসে মূর্তি মানাফের নিকট গেলেন এবং বললেন, হে মানাফ! লোকটি তোমাকে বেঁধে ফেলেছো চাল, তুমি তো তার আগমন সম্পর্কে জান। হে মুনাফ! এ ব্যাপারে তুমি কি বলো? তুমি কথা বলছো না কেনো? তুমি মনে হয় গত রাতে আমার উপর রাগ করেছো। ঠিক আছে আজ যাচ্ছি, আগামীকাল তোমার কাছে আসবো। অতঃপর যখন রাত হল তখন তার ছেলেরা মূর্তির নিকট আসলো এবং তা নিয়ে বাড়ির পেছনে ময়লা ফেলার স্থানে রেখে এলো।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মূর্তির ঘরে গিয়ে সেখানে মানাফকে পেল না। তখন সে বললো, মানাফ কোথায়? আমাদের রব কোথায়? ছেলেরা বললো, আমরা জানি না। সে তখন তাকে বাড়ির আশেপাশে খুঁজতে লাগলো, অবশেষে বাড়ির পিছনের ময়লার স্থানে গিয়ে পেল। তখন সে বললো, মানুষ তোমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে, তুমি কি তাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলে না? অথচ আমি তোমার কাছে নিজের বিপদাপদ থেকে মুক্তি কামনা করি। এরপরও সে তাকে সেখান থেকে উঠিয়ে ভালোভাবে ধৌত করে সুগন্ধি মেখে ঘরে রাখলো। অতঃপর বললো, হে মানাফ! লোকেরা তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করার কারণে, তোমাকে অপমান করার কারণে মনে হয় গত রাতে তুমি আমার উপর রাগ করেছো। এরপর রাতে তিনি একটি তরবারি এনে তার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন এবং বললেন হে মানাফ! একটা বকরিরও তো তার পাহাড়াকে হেফাজত করবে। তাহলে তোমার কি হল? তুমি কেনো নিজেকে রক্ষা করতে পারো না? এই নাও তরবারি, এটা দিয়ে তুমি আত্মরক্ষা করবে। গভীর রাতে তার ছেলেরা এসে গলা থেকে তারবারারিটা সরিয়ে তার সাথে একটা মৃত কুকুর বেঁধে একটি পরিত্যক্ত কূপের মধ্যে ফেলে দিয়ে আসলো। পরদিন সকালে উঠে সে মানাফকে খুঁজতে লাগলো; কিন্তু তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছিলো না। তখন সে বললো, কে আমাদের ইলাহের সাথে শত্রুতা করেছে? ছেলেরা বললো, আমরা জানি না। অতঃপর সে খুঁজতে খুঁজতে সেই পরিত্যক্ত কূপের কাছে গেল এবং তাতে তাকিয়ে দেখে তার ইলাহ যার ইবাদত সে করে তা একটি মৃত কুকুরের সাথে বাঁধা অবস্থায় সেখানে পড়ে আছে। তখন সে বললেন:
وَرَبِّ يَقُولُ الْعَالِيَانِ بِرَهَافِهِ خَابَ مَنْ بَاتَ اللَّهِ الْعَالِمِ
‘যার মাথার উপর শিয়াল পেশাব করে সে কি রব হতে পারে। যার উপর শিয়াল পেশাব করে সে তো ব্যর্থ।’
অথবা তিনি বলেন:
وَاللَّهِ لَوْ كُنْتَ إِلَهاً وَكَانَتْ وَسِيلَةٌ بَيْنَ الْقُرُونِ
‘আল্লাহর শপথ, তুমি যদি ইলাহ হতে তাহলে তুমি একটি মৃত কুকুরের সাথে পরিত্যক্তা কুঁড়ে থাকতে না।’
এরপর তিনি মুসআবা ইবনে উমায়ের রা.-এর নিকট গেলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।
যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করে, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, রোগ মুক্তি চায়, আল্লাহ তাআলা তাদের বিষয়টা তার সাথেও সম্পৃক্ত করে দেন। সেটা কোনো কবর হোক, মূর্তি হোক বা ঘর-দর্গাহ যাই হোক। মানুষের কর্মকাণ্ড এবং তাদের ইবাদতের বস্তু দেখলে সত্যিই তুমি আশ্চর্য না হয়ে পারবে না।
সুচিন্তিতভাবে মানুষ ইবাদত গ্রহণ শ্রবণ, সে কিছুর না কিছু ইবাদত করবেই। তাই আল্লাহ তাআলা নবি-রাসূলদের মাধ্যমে মানুষের নিকট এই ওহিও পাঠালেন যে, তারা যেনো এক আল্লাহর ইবাদত করে, তার সাথে কারো শরিক না করে; কিন্তু মানুষ সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বিভিন্ন জিনিসের পূজা করে। তুমি যদি বর্তমানে মানুষের ইবাদতের প্রকার ও প্রকৃতি দেখ তাহলে অবাক হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, তুমি হিন্দুস্থানে গেলে দেখবে সেখানে মানুষ অতিতুচ্ছ জিনিসেরও পূজা করছে। তুমি সেখানে অনেক শিক্ষিত লোকও দেখবে যে গাড়ীর সেফটি অর্জন করার জন্য, তার ইবাদত করার জন্য তার পিছনে ছুটছে। গাড়ী কখনো যদি রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে সেখান থেকে সেটাকে সরিয়ে দিতেও তারা ভয় পায়। অথচ সেটা একটা গাড়ী! তুমি সেখানে এমন লোকও দেখতে পাবে, যে গাড়ীর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তার পিছনে অনেক সম্পদ ব্যয় করছে, অথচ এই পরিমাণ সম্পদ সে তার মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে ও পরিবার-পরিজনদের জন্য ব্যয় করে না। একটা গাড়ী! একটা প্রাণী!!!
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা খুৎবায় আলোচনায় বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ فَادْعُوهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُوا لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَدِيقِينَ
'আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা সবাই তোমাদের মতোই বান্দা। অতএব, তোমরা যাদেরকে ডাকো, তখন তাদের পক্ষেও তো সে ডাক কবুল করা উচিত, যদি তোমরা সদাব্রতী হয়ে থাকো।’
ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা, তাহলে কীভাবে তুমি তাঁর ইবাদত করো? অনুরূপভাবে গরুর আত্মার সৃষ্টির একটি অংশ, সেও আল্লাহর ইবাদত করে, তাহলে তুমি কীভাবে তার পূজা করো? আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে বলেন:
تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ ۚ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ ۚ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
'সাত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সমস্তকিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পারো না। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল।'
অনুরূপভাবে সে নিজেও তো কিয়ামতের দিন আল্লাহর নাজাতও কামনা করবে, কারণ কিয়ামতের দিন প্রতিটি প্রাণীর বিচার করা হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
'নিশ্চয় কিয়ামতের দিন শিবিহীন ছাগলের জন্য শিবিহীন ছাগলকে তাড়িয়ে নিয়ে আসা হবে। অর্থাৎ শিবিহীন ছাগলকে দুনিয়াতে যদি শিরওয়ালি ছাগল তার শিং দিয়ে গুঁতা দেয়, তাহলে শিংবিহীন ছাগল থেকে শিং নিয়ে শিংবিহীন ছাগলকে দেওয়া হবে, অতঃপর সে দুনিয়াতে যেভাবে তাকে গুঁতা দিয়েছিলো সেভাবে তাকে গুঁতা দিবে।’
সুতরাং এই গরুরও কিয়ামতের দিন নিজের মুক্তি কামনা করবে। সে জানে যে, কিয়ামতের দিন তাকে থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে, কারণ আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন এমন কাউকে শাস্তি দিবেন না যাকে তিনি দুনিয়াতে সে ব্যাপারে সতর্ক করেন নি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا
‘কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।’
এই বিষয়টা গরুও জানে যে, তাকেও কিয়ামতের দিন হিসেবের মুখোমুখি হতে হবে। তা সত্ত্বেও এই লোকগুলো তার সামনে আসে, তাকে পূজা করে। শিক্ষিত অনেক বড় বড় সার্টিফিকেটর অধিকারী লোকজন গরুর পিছনে পিছনে দৌড়ায়- তার ইবাদত করার জন্যে, তার নৈকট্য অর্জন করার জন্যে।
মানুষ যদি আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেয়, তার সাথে অন্য কিছুর শরিক করা শুরু করে (আল্লাহর কোনো শরিক নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়) তাহলেও আল্লাহর কোনো ক্ষতি হবে না, কারণ সবকিছুই আল্লাহ তাআলার নিকট একটি মশার পাখার সমানও না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সারা দুনিয়ার মূল্য যদি আল্লাহ তাআলার নিকট একটি মশার পাখার সমানও হত তাহলে তিনি একজন কাফেরকেও একফোঁটা পানিও পান করাতেন না।
হে ভাই! সারা দুনিয়ার মূল্য যদি আল্লাহ তাআলার কাছে একটি মশার পাখার সমানও না হয় তাহলে ঐ কাফেরের ব্যাপারে তোমার কী মতামত, যে আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করে আল্লাহ তাআলার সাথে অন্যকে শরিক করে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দাউস গোত্রের নারী ‘যুল খুল্লাইস’ নামক মূর্তির সামনে এসে তাদের পাছা নাড়াবে। (অর্থাৎ যুল খুল্লাইস নামক মূর্তির পূজা করবে।)’
যুল খুল্লাইস একটি মূর্তির নাম। জাহেলি যুগে দাউস গোত্রের লোকেরা যার ইবাদত করতো। আর দাউস হল আরবের দক্ষিণে অবস্থিত কয়েকটি গোত্রের নাম।
সুতরাং মানুষ আবারও মূর্তি পূজার দিকে ফিরে যাবে। আর এককথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে বলেছেন:
কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দাউস গোত্রের নারী যুল খুল্লাইস নামক মূর্তির সামনে এসে তাদের পাছা নাড়াবে। অর্থাৎ মানুষ তাওহীদ থেকে দূরে সরে গিয়ে আবার মূর্তিপূজায় লিপ্ত হবে। তারা বিভিন্ন শিরকের মধ্যে পতিত হবে।
কার্বভাই বর্তমানে তুমি অনেক মানুষকে দেখবে কবরকে সম্মান করছে, তার পাশে তাওয়াফ করছে, ঘুরছে, তার সামনে বসে মাথা নত করছে, তার কাছে প্রার্থনা করছে, কিন্তু তুমি তাকে কখনো মসজিদে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতে দেখবে না। এরপরও সে বলবে যে, আমি আল্লাহর ইবাদত করি। সত্য কথা হল, তুমি আল্লাহর ইবাদত করো না। তুমি যদি আল্লাহর ইবাদত করতে চাও তাহলে একনিষ্ঠ হয়ে শিরকমুক্তভাবে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করো। তুমি ইবাদতের ক্ষেত্রে কখনো সীমালঙ্ঘন করো না। তোমার ইবাদত, তোমার দোয়া-মুনাজাত, কায়দা-কাটি যেহেতু হয় একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যে। তা যেনো কোনো মূর্তি, কবর অথবা কোনো মানুষ বা ভূতের জন্যে না হয়।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে শিরকমুক্ত একত্ববাদী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১. সূরা হজ্জ, আয়াত : ৭৩
২. সূরা ফাতির, আয়াত : ১৪
১. সূরা জিন, আয়াত: ১৮
১. সূরা আরাফ, আয়াত: ১৯৪
২. সূরা ইসরা, আয়াত: ৪৪
১. সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত : ১৫
📄 খৃস্টান বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সকল নবি-রাসূলদের একই দীন ও একই আকিদা-বিশ্বাস দিয়ে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
‘আমি সকল রাসূলকে তাঁদের স্বজাতির ভাষায়ই প্রেরণ করেছি, যাতে করে স্পষ্টভাবে তাদের নিকট বর্ণনা করতে পারে।’
নবি-রাসূলগণ তাঁদের কওমের নিকট কী বর্ণনা করবে? অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন:
أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَمَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ
‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো মাবুদ নেই।’
সকল নবি-রাসূলই তাঁদের কওমের নিকট এসে তাঁদেরকে বলতেন, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো মাবুদ নেই; কিন্তু তাঁদের এই সতর্কবাণী সত্ত্বেও মানুষ শিরকে পতিত হয়। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করে। আল্লাহর জন্যে সন্তান সাব্যস্ত করে। এবং আল্লাহর সাথে অন্য মাবুদের ইবাদত করে। যেমন ইহুদিরা করেছে, আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে বলেন;
وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ
‘ইহুদিরা বলে ওয়াইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে ঈসা-মাসিহ আল্লাহর পুত্র। এটা হচ্ছে তাদের মুখের কথা।’
তারা কেনো ওয়াইরকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করে বলে যে, ওয়াইর আল্লাহর পুত্র? কারণ ওয়াইর একজন সত্য নবি ছিলেন, তিনি বসে বসে আল্লাহর ইবাদত করতেন আর আসমান থেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্যে খাবার আসতো। এ-কারণে ইহুদিরা বলতো, তিনি আল্লাহর পুত্র না হলে আল্লাহ তাঁর জন্যে আসমান থেকে খাবার পাঠাতেন না। তাই তারা তার বংশ আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে দিয়েছে। অন্য দিকে নাসারারা বলে মাসিহ (হযরত ঈসা আ.) আল্লাহর পুত্র,...।
আমরা এখন খৃস্টান বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটাবো। আমার কিছু খৃস্টান বন্ধু আছে। যাদের কেউ আমার প্রতিবেশী, তাদের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। তাদের সাথে আমার কথা হয়, গল্প হয়, হাসি-ঠাট্টা হয়। কেউ কেউ আমার সাথে লেখা-পড়া করেছে এবং তাদের কেউ কেউ এখনও আমাকে তাদের বন্ধু মনে করে। যদিও তারা মুসলিম নয় খৃস্টান, তবুও তাদের সাথে আমার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ইহুদি প্রতিবেশী ছিল, তিনি তাদের সাথে সর্বদা ভাল ব্যবহার করতেন। তিনি খৃস্টান মুত্তাফকিনের নিকট হাদিয়া প্রেরণ করেছেন এবং এবং তাওয়া গ্রহণ করেছেন। সুতরাং আমার আজকের আলোচনার বিষয় হল খৃস্টান বন্ধুদের সাথে কিছু আলোচনা এবং খৃস্টান গাড়ি চালকের সাথে আমার কথোপকথন।
আমি একবার মিসরে একটা মেলায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফেরার সময় বিমানবন্দরে আসার জন্যে আমি একটি ট্যাক্সি ভাড়া করতে রাস্তায় গিয়ে দাড়ালাম এবং হাত দিয়ে একটি ট্যাক্সির দিকে ইশারা করতেই একটি ট্যাক্সি আমার সামনে এসে থামল। আমি চালকের সাথে ড্রাইভার বিষয়ে একমত হওয়ার পর গাড়িতে উঠলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর আমি চালককে জিজ্ঞেস করলাম। কেমন আছেন? আল্লাহ রহমতে মনে হচ্ছে ভালই আছেন। ট্যাক্সি চালক কি কষ্ট হচ্ছে? সে বললো, কষ্ট তো কিছুটা হয়ই, তবে ছেলে-মেয়েদের জন্য তো এতটুকু কষ্ট করতেই হবে। আমি বললাম, সন্তানদের জন্যে কষ্ট করলে আল্লাহ তাআলা এর প্রতিদান দিবেন।
কিছুক্ষণ পর সামনে এক জায়গায় জ্যামে পড়লো, তখন আমি লক্ষ করলাম তার হাতে একটি ক্রুশ ঝুলানো। তখন আমি তাকে বললাম এটা কী? সে বললো, এটা ক্রুশ। আমি বললাম এটা হাতে রেখেছো কেনো? সে বললো, আমি খৃস্টান। আমি বললাম তোমার নাম কী? সে বললো, অমুক। আমি এখন তার নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে আমার মনে হচ্ছে সে বলেছিলো তার নাম ইয়াসির। আমি বললাম ভাল। আচ্ছা ইয়াসির আমি তোমার সাথে ইসলাম ও খৃস্টান ধর্ম সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি, তুমি কি এতে সম্মত আছো। সে বললো, ঠিক আছে।
আমি: ইয়াসির! তুমি তো মনে করো যে, ঈসা আ. আল্লাহর পুত্র ঠিক না?
ইয়াসির: হ্যাঁ। ঈসা আমাদের রবের পুত্র।
আমি: তাহলে বুঝা যায় আল্লাহ তাআলা সন্তান পছন্দ করেন এবং তিনি একাধিক সন্তান হন এবং এটাও পছন্দ করেন আর সেজন্যেই তার একটি সন্তান হয়েছে যার নাম ঈসা। কথাটা কি সঠিক?
ইয়াসির: হ্যাঁ।
আমি: আল্লাহ তাআলা চান যে, তাঁর অনেকগুলো সন্তান হোক আরএই চাওয়া পূরণের সক্ষমতাও তাঁর রয়েছে। তাহলে তাঁর একটিমাত্র সন্তান কেনো?
ইয়াসির: আল্লাহ আমাদের রব। আর তিনি এটা চেয়েছেন তাই এমনটি হয়েছে।
আমি: ইয়াসির! শোনো, আল্লাহ্ তাআলার কোনো সন্তান নেই। তোমরাই নিজেদের পক্ষ থেকে আল্লাহ্র ব্যাপারে এই অপবাদ দিয়েছো। এবার একটু ভিন্ন পয়েন্টে কথা বলি। আল্লাহ্ তাআলার তো সন্তান আছে যার নাম ঈসা, তাহলে ইঁসার সন্তান নেই কেনো? আর আল্লাহ্র সন্তান আছে এবং তিনি একাধিক সন্তানও চান, তাহলে তার বাবা-মা নেই কেনো?
ইয়াসির: আল্লাহ্ আমাদেরকে এটাই জানিয়েছেন। তাই আমরা তাদের ইবাদত করি। আর এটা তাদেরও হক। এর বাইরে আমি কিছুই জানি না, কারণ তিনি আরব রব, তিনি আমার ইলাহ্।
আমি: আর একটি বিষয়। তুমি তো মনে কর যে, ঈসা আ. আল্লাহ্র সন্তান আর তিনি গুনাহের কাফ্ফ্ফারার জন্য শুলে বিদ্ধ হয়েছেন?
ইয়াসির: হ্যাঁ।
আমি: কোন গুনাহ বা ভুলের কারণে তিনি শুলে বিদ্ধ হলেন?
ইয়াসির: আদম আ.-এর ভুলের কারণে।
আমি: আদম আ.-এর ভুলটা কী?
ইয়াসির: আল্লাহ্ তাআলা আদমকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছিলেন। তিনি জান্নাতে প্রবেশ করে একটি নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ্ তাঁকে ঐ ভুলের কারণে কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করলেন, যার কোনো কাফ্ফ্ফারা হয় না এবং তারপর এই অপরাধের গুনাহ্ তার সন্তানদের উপর থেকে যায়। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা আদম সন্তানদেরকে এই অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য নিজ সন্তানকে প্রেরণ করে শুলে চড়িয়েছিলেন, যাতে করে আদমের ভুলের কাফ্ফ্ফারা হয়।
আমি: চমৎকার! ভুলটা মূলত কার? আদম আ.-এর না-কি ঈসা আ.-এর?
ইয়াসির: আদম ভুল করেছে।
আমি: ভুল যদি আদম আ.-এর হয়ে থাকে তাহলে ঈসা আ.কে কেনো শুলে চড়ানো হলো? আদম আ.কেই শুলে চড়ানো হতো।
ইয়াসির: আমি জানি না এটা কেনো হলো; কিন্তু বিষয়টি এমনই হয়েছে।
আমি: আদম আ. যে অপরাধটা করেছে তা হলো কী একটা গাছের ফল খেয়েছেন আর তার কাফ্ফ্ফারা স্বরূপ আল্লাহ্ তাআলা নিজ সন্তানকে পাঠিয়ে শুলে চড়ালেন?! একজন আদম যদি দুইটি অপরাধ করতেন তাহলে এর জন্য কাফ্ফ্ফারা কী হতো? প্রথম ও ছোট অপরাধের কাফ্ফ্ফারা যদি হয়ে থাকে নিজ সন্তানকে শুলে চড়িয়ে হত্যা করা তাহলে দ্বিতীয় অপরাধের কাফ্ফ্ফারা কী হতো?
আমি: তিনি শুধু সামান্য একটা গাছের ফল খেয়েছেন, আর এটা তো ছোট একটা অপরাধ। আমি বললাম, এই ছোট একটা অপরাধের কাফ্ফ্ফারা জন্য আল্লাহ্ তাআলা নিজ সন্তানকে পাঠিয়ে শুলে চড়ালেন!! আল্লাহ্ তাআলার জন্য তো এটা সভাব ছিলো যে, তিনি এই ছোট একটি অপরাধের কাফ্ফ্ফারা নিজ সন্তানকে শুলে না চড়িয়ে অন্য কোনো ভাবে আদায় করবেন। যেমন তিনি আমাদের সকলকে টাঁকা পানি পান করতে নিষেধ করতেন। অথবা নির্দিষ্ট একটি দিনে তিনি আমাদেরকে রোগের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। অথবা তিনি আমাদের জন্য একশত রাকাত সালাত ফরয করতেন। অথবা তিনি আমাদেরকে অর্থের সম্পদ যাকাত হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন, অথবা অন্য কোনো শাস্তি যা অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, কারণ শাস্তি হয়ে থাকে সর্বদা অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থাৎ অপরাধ ছোট হলে শাস্তি হবে ছোট, অপরাধ বড় হলে শাস্তি হবে বড়। যেমন আমি ঘর থেকে বের হওয়ার পর আমার দশ বছরের ছোট ছেলে আমার ব্যক্তিগত কম্পিউটার নিয়ে খেলা করলো, অতঃপর আমি যখন বাড়িতে আসলাম তখন তাকে এই অপরাধের জন্য ধমক দিয়ে বলবো, আর কখনো কম্পিউটারের সামনে আসবে না। এটা একটি শাস্তির প্রকার। আমি যদি অন্য কোনো শাস্তি দিতে চাই তা হলে তাকে বলবো, ছেলে! আমার কম্পিউটারে যে লেখাছিলো তা তুমি লিখে দাও; কিন্তু ছেলে যদি ইচ্ছা করে কম্পিউটারের সামনে এসে তার উপর চা ঢেলে দেয় তাহলে তার শাস্তি হবে ভিন্ন, কারণ এই অপরাধটা আগের তুলনায় বড় অপরাধ। তাই তার শাস্তিও হবে বড়। আদম আ. যে অপরাধটা করেছে তা হলো কী একটা গাছের ফল খেয়েছেন আর তার কাফ্ফ্ফারা স্বরূপ আল্লাহ্ তাআলা নিজ সন্তানকে পাঠিয়ে শুলে চড়ালেন?! এখন আদম যদি দুইটি অপরাধ করতেন তাহলে এর জন্য কাফ্ফ্ফারা কী হতো? প্রথম ও ছোট অপরাধের কাফ্ফ্ফারা যদি হয়ে থাকে নিজ সন্তানকে শুলে চড়িয়ে হত্যা করা তাহলে দ্বিতীয় অপরাধের কাফ্ফ্ফারা কী হতো?
আমি: আবার তাকে বললাম, ইয়াসির! তুমি এখন বলবে ঈসা ইবনে মার্ইয়াম আ.কে কীভাবে শুলে চড়ানো হলো? অথচ আমরা জানি তাঁকে শুলে চড়ানো হয়নি। আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে শুলে চড়ানোর আগেই আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। যেমনিভাবে আল্লাহ্ তাআলা বলেন:
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِن شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا
'অথচ আল্লাহ্র কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি এবং তাঁর সাথে কোনো মা'বুদ নেই। থাকলে প্রত্যেক মা'বুদ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে চলে যেত এবং
ইয়াসির: ইহুদিরা তাঁকে ধরে শুলের উপর রেখে তাঁকে বেঁধেছে, অতঃপর তাঁর হাতে পায়ে পেরেক মেরেছে, তারপর তাঁর উপর সিরকা ঢেলে দিয়েছে, তারপর তাঁকে ছিঁড়িয়ে মেরে ফেলেছে।
আমি: তোমার কি এই ঘটনা শুনে এনে দৃশ্য কল্পনা করে একটুও কষ্ট হয় না?
ইয়াসির: হ্যাঁ, আমার অনেক কষ্ট হয়।
আমি: তোমাদের ধারণা মতো রব্বুল আলামিন তো তাঁর পিতা, তিনি কি এই দৃশ্য দেখেছেন? এবং তিনি কি তাঁর চিৎকারের আওয়াজ শুনেছেন?
ইয়াসির: হ্যাঁ, তিনি দেখেছেন এবং তাঁর চিৎস্কার শুনেছেন।
আমি: তিনি কি তাঁকে উদ্ধার করতে সক্ষম ছিলেন না?
ইয়াসির: হ্যাঁ ছিলেন।
আমি: তাহলে তিনি তাঁকে কেনো উদ্ধার করলেন না?
ইয়াসির: আমাদের অপরাধের কাফ্ফ্ফারার জন্য।
আমি: কী জন্যে আল্লাহ্ তাআলা একজনের ভুলের কাফ্ফ্ফারা অন্যজনের মাধ্যমে নিলেন? তিনি এর জন্য অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করলেননা কেনো? কেনো তিনি আদমের ভুলের জন্য তাঁর একমাত্র সন্তানকে শুলে চড়ালেন?
এরপর আমি তাকে আরেকটা প্রশ্ন করলাম, ঈসা আ.কে কাদের গুনাহের কাফ্ফ্ফারার জন্য শুলিতে চড়ানো হয়েছে, তার পূর্ববর্তীদের জন্য না-কি তার পরবর্তীদদের জন্য?
ইয়াসির: মাসীহ্ সময় থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যারা আসবে তাদের জন্য।
আমি: ঠিক আছে। তাহলে তার আগে যে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ এসেছে ও ইন্তেকাল করেছে তাদের অবস্থা কী হবে? আর ঈসা আ. কে কেনো আর অনেক আগে পাঠানো হলো না? যাতে তিনি তার পূর্বে যারা এসেছিলো তাদের সকলের অপরাধের কাফ্ফ্ফারা করতে পারেন?
ইয়াসির: তিনি আমাদের প্রভু, তিনি এটা চেয়েছেন তাই এমনটা হয়েছে।
আমি: ইয়াসির শোনো! তুমি বলো যে, ঈসা আ. আল্লাহ্র সন্তান, সুতরাং তিনিও ইলাহ্। আর ইলাহ্ যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন এখন কথা হল ঈসা আ. একটা জিনিস এমনভাবে করতে চাচ্ছেন আর আল্লাহ্ বিষয়টি অন্য ভাবেকরতে চাচ্ছেন, এখন কার কথা কার্যকর হবে? ঈসা আ.-এর কথা না-কি আল্লাহ্র কথা? যেমন মনে করো আল্লাহ্ চাচ্ছেন, এক লোক মারা যাবে আর ঈসা আ. চাচ্ছেন, সে আজ মরবে না বরং সে কাল মারা যাবে। তাহলে এখন কার কথা কার্যকর হবে? ঈসা আ.-এর না আল্লাহ্র?
ইয়াসির: আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্র কথা চলবে।
আমি: কোনপ্রতিপালক? তোমাদের তো রব তিনজন। আল্লাহ্, তাঁর পুত্র এবং রুহুল কুদ্স বা পবিত্র আত্মা।
ইয়াসির: আমাদের রব, পিতার কথা চলবে।
আমি: তাহলে ঈসা আ. কি রব নন? যতক্ষণ পর্যন্ত ঈসার কথা কার্যকর না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ঈসা আ. রব হতে পারবে না, কারণ এটা হতে পারে না যে, রবের কথা চলবে না, তাঁর কথা কার্যকর হবে না।
ইয়াসির: ইঁসার কথা কার্যকর হবে না।
আমি: তাহলে পিতা ইলাহ্ নয়, কারণ ছেলের কথা কার্যকর হলে পিতার কথা কার্যকর হবে না। আর তখন পিতা ইলাহ্ হতে পারবে না, কারণ ইলাহ্ তো সে-ই যিনি যাছেতাই করতে পারেন।
ইয়াসির: আপনি কি জানেন? তাঁদের সকলের কথাই কার্যকর হবে।
আমি: দুই জনের কথা একই সাথে কোনো একটি বিষয়ের উপর কার্যকর হতে পারে না। অর্থাৎ এক লোক একই সময়ে মৃতও ও জীবিত উভয়টা হতে পারে না।
ইয়াসির: আরে ভাই! এক জনের কথা বাস্তবায়ন হবে।
আমি: কীভাবে? অথচ তাঁদের সকলেই ইলাহ্ বা প্রতিপালক!!
আর এ-কারণেই বিষয়টি আল্লাহ্ তাআলা যেমন বলেছেন তেমনই, আল্লাহ্ তাআলা বলেন:
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَٰهٍ إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَٰهٍ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ
'আল্লাহ্র কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি এবং তাঁর সাথে কোনো মা'বুদ নেই। থাকলে প্রত্যেক মা'বুদ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে চলে যেত এবং একজন অন্যজনের উপর প্রধান হয়ে যেতো। তারা যা বলে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র।
এই আয়াতেই প্রমাণ যে, আল্লাহ তাআলার কোনো সন্তান নেইএবং বিশ্বপরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি পবিত্র,সবকিছুঁর উর্ধ্বে।
একথা বলার পর আমি তাকে বললাম, ইয়াসির! আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমার কল্যাণকামী, আমি তোমাকে নসিহত করে বলছি, আল্লাহ তাআলা যদি সন্তান চাইতেন তাহলে তিনি তার সৃষ্টরমধ্যেশেষব ইচ্ছেয় যে কোনো সন্তানকে ইচ্ছেয় গ্রহণ করতেন। অথচ আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ থেকে অমূখাপেক্ষী। আল্লাহ তাআলা কাউকে জন্ম দেন নি, তিনি কারো কাছ থেকে জন্ম গ্রহণ করেন নি এবং তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই।
হে ভাই! এই হল আল্লাহ ও ইসা আ. সম্পর্কে তাদের ধারণা। আমি অবশ্যই তাদের কল্যাণকামী, তাদেরকে ভালবাসি। আমি তো পূর্বেই বলেছি অনেক খৃষ্টানের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আছে, যাদের সাথে আমার হাদিয়া দেওয়া নেওয়া হয়। আমি চাই না যে, একজন খৃষ্টানও বেইমান হয়ে এই বিশ্বাসের উপর মৃত্যুবরণ করুক যে, আল্লাহ! আপনি তিন জনের একজন, আপনি একক কোনো ইলাহ নন বরং আমি আপনার সাথে আরো দুইজনকে ইবাদত করি। আসলে এসবের আকিদা-বিশ্বাস তো জায়েয নেই, এটা তো আল্লাহ তাআলার সাথে শিরিক করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَ قَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمٰنُ وَلَدًاؕ لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا اِدًّاۙ تَكَادُ السَّمٰوٰتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَ تَنشَقُّ الْأَرْضُ وَ تَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّاۙ اَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمٰنِ وَلَدًاۚ وَ مَا يَنۡۢبَغِى لِلرَّحْمٰنِ اَنْ يَّتَّخِذَ وَلَدًاؕ اِنْ كُلُّ مَنْ فِى السَّمٰوٰتِ وَ الْأَرْضِ اِلَّاۤ اٰتِى الرَّحْمٰنِ عَبْدًاؕ لَقَدْ اَحْصٰهُمْ وَ عَدَّهُمْ عَدًّاؕ وَ كُلُّهُمْ اٰتِيْهِ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ فَرْدًاؕ
“তারা বলে: দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। নিশ্চয় তোমরা তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করেছ। হয় তো এর কারণেই নভোমণ্ডল ফেটে পড়বে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে এবং পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে। এ-কারণে যে, তারা দয়াময় আল্লাহর জন্য সন্তান আহ্বান করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভনীয় নয়। নভোমণ্ডল-ভূমণ্ডলে কেউ নেই যে, দয়াময় আল্লাহর কাছে দাস হয়ে উপস্থিত হবে না। তাঁর কাছে তাদের পরিসংখ্যান রয়েছে এবং তিনি তাদের গণনা করে রেখেছেন। কেয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে।”
কোনো মানুষের জন্য এ ধারণা করা বৈধ নয় যে, আল্লাহ তাআলার সন্তান রয়েছে।
আল্লাহ এক তাঁর কোনো শরিক নেই। ইসা ইবনে মারয়ম আ. আল্লাহর একজন নবি। আমরা তাঁকে সাহাবায়ে কেরামের চেয়ে বেশি ভালবাসি। আমরা যেমনভাবে আমাদের নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ভালবাসি, তেমনিভাবে ইসা আ. কেও আমরা ভালবাসি। আমরা সকল নবিকেই ভালবাসি, তাঁদেরকে মুহতরম করি; বরং আমরা তাঁদের আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি ভালবাসি এবং ইসা আ.-এর উপর ইমান আনা আমাদের উপর ওয়াজিব, যেমনিভাবে সকল নবি আ.-এর উপর ইমান আনা আমাদের উপর ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন ;
اٰمَنَ الرَّسُوْلُ بِمَاۤ اُنْزِلَ اِلَيْهِ مِنْ رَّبِّه وَالْمُؤْمِنُوْنَؕ كُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَ مَلٰٓئِكَتِه وَ كُتُبِه وَ رُسُلِهؕ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهؕ
“রাসুল বিশ্বাস রাখেন যে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলিমগণও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবাদির প্রতি এবং তাঁর নবি-রাসুলের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর নবি-রাসুলের মধ্যে কোনো তারতম্য করি না।”
আমরা কোনো নবি-রাসুলের মধ্যে পার্থক্য করি না। ইসা আ. অথবা মুসা আ. অন্য যেকোনো নবিকে অস্বীকার করা কারো জন্য বৈধ নয়। সুতরাং আমরা যেমনিভাবে তাঁর উপর ইমান আনি, তেমনিভাবে সকল নবি- রাসুলের উপর ইমান আনি। আমি আমার সকল খৃষ্টান জ্ঞানী বন্ধুদের আহ্বান করব তারা যেনো ভালভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন। তাহলে তারা দেখতে পাবে যে, এমন কোনো প্রমাণ নেই যাঁর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইসা আ. আল্লাহূর পুত্র। এমনকি ইঞ্জিলের কোথাও লেখা নেই যে, ইসা আ. নিজে দাবি করেছেন যে, তিনি আল্লাহ্র পুত্র। বর্তমানে ইঞ্জিলের যে চারটি সংস্করণ রয়েছে তাঁর কোথাও লেখা নেই যে, ইসা আ. আল্লাহ তাআলার সন্তান। (যদিও একথা কেউ বলতে পারবে না যে, বর্তমানে যে ইঞ্জিল রয়েছে তা সত্য এবং একথাও কেউ বলতে পারে না যে, তাঁর কোনোটাই কথার মধ্যে তাঁর কোনোটাই সত্য আর কোনোটাই সত্য নয়।)
পূর্বে মানুষ ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসের উপর থাকা সত্বেও তারা এটা জানতো যে, ইসা আ. আল্লাহর প্রেরিত নবি। এবং তারা এটাও জানতো যে, ইসা আ. তাঁর অনুসারী খৃষ্টানদেরকে এই সুসংবাদ দিয়ে গেছেন যে, তাঁর পরে এক নবি আসবে যার নাম হবে ‘আহমাদ’। তিনি তাঁদের বলেছেন ‘অচিরেই আমার পরে একজন রাসুল আসবে যার নাম হবে আহমাদ’। এবং তিনি তাঁদেরকে তাঁর অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
وَ مُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَّأْتِيْ مِنْ بَعْدِى اسْمُهُ اَحْمَدُ ؕ
‘এবং আমি এমন একজন রাসুলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন, তাঁর নাম হবে আহমাদ।’
আমাদের হাবিব আমাদের নবি আহমদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে আগমন করেছেন। সুতরাং তাঁকে অনুসরণ করা এখন সকলের উপর ওয়াজিব। আর একারনেই আমরা ইবনুল আস রা. যখন মিসরে আগমন করলেন, মুসলিমগণ মিসর জয় করলেন, তখন মিসরের বেশিরভাগ মানুষ ছিলো খৃষ্টধর্মের অনুসারী। তারা যখন ইসলাম ধর্ম ও তার মাহাত্ম্যগুলো দেখলো এবং তারা এটা লক্ষ করলো যে, ইসলাম ধর্ম ইসা আ.-এর ধর্মের পরবর্তী ধর্ম এবং ইসা আ.-এর ধর্ম ছিলো তাঁর যুগে, তাঁর জাতির লোকদের জন্য। আর ইসা আ. নিজেই বলে গেছেন- তাঁর পরে আহমাদ নামে একজন নবি আল্লাহর সত্য ধর্ম নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করবেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা সারা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য শেষ নবি হিসেবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। তখন তাঁর অনুসরন করলো এবং হাজার হাজার মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো।
আমি অনেক খৃষ্টান ভাইদেরকে চিনি যারা অনেকে বড় বড় শিক্ষিত, তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের, বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার; কিন্তু তারা এখন ইসলাম ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে এসে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা মুসলমান হয়েছেন। এমনকি অনেক পাদ্রিও রয়েছেন যারা ইসলামে প্রবেশ করেছেন, কারণ তারা বিষয়টি নিয়ে ভালোভাবে গবেষণা করেছে, অত:পর তাদের সামনে যখন সত্য প্রকাশিত হয়েছে তখন তারা সত্যের ছায়াতলে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।
আমার জ্ঞানী খৃষ্টান বন্ধুদের যদি জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা বলুন তো আপনারা কি কোনো খৃষ্টান পাদ্রিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে দেখেছেন? অবশ্যই উত্তরে তারা বলবে, হ্যাঁ অনেক পাদ্রিই তো আছেন যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, যেমন আমেরিকার শায়খ ইউসুফ ইস্টেস। তাঁর মতো অনেকে আছে যারা এখন মুসলমান। তাঁদের লেখা অনেক বই আছে এবং ইন্টারনেটে তাঁদের বিভিন্ন লেকচার রয়েছে, অর্থাৎ তাঁরা সাধারণ মানুষ ছিলেন না বরং তাঁরা ছিলেন ধর্মগুরু, গির্জার পাদ্রি-পুরোহিত, তা সত্ত্বেও তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আর তুমি কি কখনো শুনেছো যে, কোনো মুসলিম শায়খ, বড় কোনো আলেম ইসলাম ছেড়ে খৃষ্টান ধর্মে প্রবেশ করেছেন? কেনো খৃষ্টান ধর্মগুরুও ও পাদ্রিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আর মুসলিম আলেমগণ ইসলাম ছেড়ে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে না?
আমি এখানে সাধারণ মানুষের কথা বলছি না। বরং আমি বলছি বড় বড় ব্যক্তিদের কথা যারা ধর্মের শায়খ। হাঁ তাঁদের ইসলামে প্রবেশের কারণ একটাই আর তা হল ইসা আ.-এর অনুসরণ।
তুমি যদি ইসা ইবনে মারয়াম আ.কে প্রকৃতপক্ষেই ভালবাসে থাকো, তাহলে তাঁর অনুসরণ করো। ইসা ইবনে মারয়াম আ. একথা বলেননি যে, তোমরা আমার ইবাদত করো বরং তিনি বলেছেন তোমরা আমার অনুসরণ করো। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاَتَتْ بِه قَوْمَهَا تَحْمِلُهٗ ؕ قَالُوْا يٰمَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْـًٔا فَرِيًّاۚ يٰۤاُخْتَ هٰرُوْنَ مَا كَانَ اَبُوْكِ امْرَاَ سَوْءٍ وَّ مَا كَانَتْ اُمُّكِ بَغِيًّاۙ فَاَشَارَتْ اِلَيْهِ ؕ قَالُوْا كَيْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِى الْمَهْدِ صَبِيًّاۙ
‘অত:পর তিনি সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন। তারা বললো, হে মারয়াম! তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারুন-ভাগিনী, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিলেন না ব্যভিচারিণী। অত:পর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন, তারা বললো, যে কোনো শিশু তাঁর সাথে আমরা কেমন করে কথা বলবো?’
অনুরূপভাবে ইসা আ. একথাও বলেননি যে, আমি ইলাহ বা আমি আল্লাহর সন্তান বরং তিনি বলেছেন, আমি আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ তাআলা বলেন :
قَالَ اِنِّىْ عَبْدُ اللّٰهِ ؕ اٰتٰنِىَ الْكِتٰبَ وَ جَعَلَنِىْ نَبِيًّاۙ وَّ جَعَلَنِىْ مُبٰرَكًا اَيْنَ مَا كُنْتُ وَ اَوْصٰنِىْ بِالصَّلٰوةِ وَ الزَّكٰوةِ مَا دُمْتُ حَيًّاۙ
‘সন্তান বললো, আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দান করেছেন এবং আমাকে নবি বানিয়েছেন। আমি যেখানে থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন- যতদিন জীবিত থাকি ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে। "
প্রিয় ভাই! সত্যি বলছি, আমি সকলের কল্যাণকামী। অপররূপভাবে সকল মুসলমানই পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য কল্যাণকামী। আমরা যেমনিভাবে মুসলমানদের জন্য কল্যাণ কামনা করি, অপররূপভাবে ইহুদি-খৃষ্টানদের জন্যেও কল্যাণ কামনা করি। প্রতিটি মানুষই নিজের কল্যাণ কামনা করে এবং তার ও তার রবের মাঝে আকিদা-বিশ্বাসকে সুদৃঢ় রাখতে চায় এবং আল্লাহর কাছে সর্বদা কল্যাণের প্রার্থনা করে। আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেনো আমাকে এবং তোমাদের সকলকেই হেদায়াত দান করেন এবং সর্বদা কল্যাণের সাথে রাখেন এবং আমাদের সকলকেই এক আল্লাহর ইবাদত করার তাওফিক দান করেন। আমিন।
টিকাঃ
১. সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪
২. সুরা মু’মিন, আয়াত : ৩২
১. সুরা তাওবা, আয়াত : ৩০
১. সূরা নিসা, আয়াত : ১৫৭
১. সূরা মুমিনুন, আয়াত : ৯১
১. সুরা মারইয়াম, আয়াত : ৮৮-৯৫
২. সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৫
১. সূরা আস-সাফ, আয়াত : ৬
১. সূরা মারইয়াম, আয়াত : ২৭-২৯
১. সুরা মারইয়াম, আয়াত : ৩০-৩১
📄 ইসলাম কি শুধু তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে?
মানুষের মধ্যে সর্বদা একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আর তা হল ইসলাম কি শুধুমাত্র তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে? মানুষ কি বাধ্য হয়ে দীনে ইসলামে প্রবেশ করেছে? না-কি তারা এই দীনের ব্যাপারে আশ্বস্ত হয়ে এই দীনকে ভালবেসে তা গ্রহণ করেছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিহি ওয়াসাল্লামবিভিন্ন অঞ্চলে সাহাবায়ে কেরামের প্রেরণ করেছেন, তারা সেখানে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, তাদেরকে হত্যা করেছেন, অনেককে বন্দি করেছেন, সুতরাং ইসলাম কি এভাবেই শুধুমাত্র রক্তপাতের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে? আমরা ইতিহাসের পাতায় পড়ি, মুসলমানগণ বিভিন্ন দুর্গে আক্রমণ করেছেন, তা অবরোধ করে রেখেছেন এক মাস, দুই মাস, তিন মাস বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে। যেমন মুসলমান কর্তৃক বাইতুল মাকদিস অবরোধ করে রাখা, এছাড়াও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক খায়বার অবরোধ করে রাখা। এ সকল অবরোধের সময় বিভিন্নভাবে অনেক মানুষ নিহত হয়েছে, যেমন কেউ দূর্গ থেকে পড়ে, কেউ আগুনে পুড়ে, কেউ নির্মিত তীরের আঘাতে হত, এছাড়াও বিভিন্নভাবে অনেক মানুষ নিহত হয়েছে, অনেকে আহত হয়েছে, সুতরাং ইসলাম কি এভাবেই তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে? আমরা সামনের আলোচনা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার চেষ্টা করবো ইন-শা-আল্লাহ। আমি এখানে একটা তালিকা পেশ করবো যা মাধ্যমে প্রমাণ হবে যে, ইসলাম কি শুধুমাত্র তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে না-কি এখানে অন্য আরো কোনো পদ্ধতি রয়েছে যা সাহায্যে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে? ইসলাম কি শুধুমাত্র তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে? না-কি অন্য কোনো পদ্ধতি রয়েছে যার সাহায্যে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে? এটা অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। আমি জানি এটা মানুষের মধ্যে বারবার উচ্চারিত হওয়া একটি প্রশ্ন; কিন্তু কিছু প্রশ্ন এমন রয়েছে যা বারবারই করা হয়ে থাকে, সুতরাং আমাদেরও উচিতও তা নিয়ে আলোচনা করা এবং তা নিয়ে কথা বলা। অর্থাৎ কিছু বিষয় থাকে যা উচারিত হোক বা কেনো প্রাজ্ঞজন তার উক্তিদের মুখেপার্থী, সুতরাং তাদেরও তা জানাতে হবে এবং সে সম্পর্কে তাদের সতর্ক করতে হবে। যেমন আমি প্রতি বছর বা দের/দুই বছরের মধ্যে একবার মাতা-পিতার সাথে সদাচার সম্পর্ক জুমআর দিন একটি খুতবা দেই। মাঝে মাঝে কেউ কেউ আমার কাছে আসে, আমাকে বলে, শায়খ এ-বিষয়ে তো এক দেড় বছর পূর্বে খুতবা দিয়েছেন! আমি তো তখনো আপনার পিছনে সালাত আদায় করেছি, তাহলে কেনো এ-সম্পর্কে আবারও খুতবা দিলেন? আমি তখন তাকে বলি দুই কারণে একে বিষয়ে বারবার খুতবা দেই। প্রথম কারণ: বিষয় বড় এক হলেও খুতবার মধ্যে নতুনত্ব থাকে, অনেকটাই ভিন্নতা থাকে, যেমন বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করি, এ বিষয়ের অন্যান্য আরো হাদিস নিয়ে আসি যা পূর্বে বলা হয়নি। দ্বিতীয় কারণ : বিষয়টা এমন যা নিয়ে সমাজ ও জাতির মধ্যে বেশি আলোচনা হওয়া উচিত। এছাড়াও আট বছর পূর্বে যেনো ছেলেটির বয়স ছিলো ১৪ বছর যখন তার বয়স ১৮/১৯ বছর অর্থাৎ এরই মধ্যে তার জীবনে অনেকটা পরিবর্তন ঘটেছে, তার উপর একটি দায়িত্ব এসে গেছে। তাই তার জন্য মাতা-পিতার সাথে সদাচারের আলোচনা করা প্রয়োজন। এমন আরো অনেক বিষয় রয়েছে যা বারবার আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, যেমন "মন্দ লোকের সাহায্য গ্রহণ", কারণ সমাজে মন্দ লোকের সংখ্যা অনেক, তাদের সাথে অনেক ভাল মানুষ মন্দ স্বভাবে চলে যায়। এরকমই সকল মানুষ যদি মা-বাবার সাথে ভাল ব্যবহার করতো তাহলে এ বিষয়ে নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন হতো না; কিন্তু পরিবার ও সমাজের চিত্র তো ভিন্ন। তাই এসকল বিষয় নিয়ে বারবার আলোচনার প্রয়োজন পড়ে। এই দীর্ঘ ভূমিকার পর আমার মূল আলোচনায় ফিরে আসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবি হিসেবে প্রেরিত হলেন, তিনি মানুষের মাঝে দীনে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন, মক্কার কুরাইশরা তাঁকে বাধা দিল, তাঁকে কষ্ট দিতে শুরু করলো এবং তাঁর মাঝে এবং দীন প্রচারের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ালো, এমনকি মক্কায় তাঁর চলাচল ও বেঁচে থাকাটাই সংকীর্ণ হয়ে গেল। এভাবেই একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করলেন। তিনি মদিনায় গিয়ে কিছু কাল অবস্থান করার পরই সেটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুললেন। মদিনায় তখন মুসলমানগণ ব্যতীত অন্য আরো কিছু অধিবাসীও ছিল, তারা হল ইহুদি ও মুনাফিক সম্প্রদায়। সুতরাং মদিনা একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের আকার ধারণ করার পর তার নিরাপত্তা ব্যবহার প্রয়োজন দেখা দিল, তাই সাহাবায়ে কেরাম রা. মদিনার সীমান্তে পাহারা দেওয়া শুরু করলেন, যেনো বহিরাগত সন্দেহভাজন কেউ মদিনায় প্রবেশ করতে না পারে। অথবা কোনো দিক থেকে যেনো হঠাৎ করে কেউ মদিনায় আক্রমণ করতে না পারে। সন্দেহভাজন কাউকে মদিনার আশপাশে দেখলে তাকে ধরে মদিনায় নিয়ে আসতে হবে, কারণ হতে পারে সে কোনো বাহিনীর অগ্রগামী দলের কেউ।
প্রহরী সীমান্ত-রক্ষীরা একদিন মদিনা-সীমান্ত দিয়ে ইহরাম পরিহিত এক লোককে পাড় হতে দেখল। তখন তারা লোকটির নিকট গিয়ে পরিচয় জানতে চাইল ও এ দিক দিয়ে চলাচলের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলো; সে বললো, আমি ছুমামা ইবনে উসাল, বনি হানিফের সরদার (বনু হানিফা মাজদ-বর্তমানে রিয়াদ-বসবাসকারী একটি গোত্র) তখন সীমান্তরক্ষী সাহাবীরা তাকে বলল, এখান দিয়ে কোথায় যাচ্ছ? সে বললো, আমি মক্কায় যাবো। সাহাবারা কেরাম রা. জানতেন যে, মক্কা হল রিয়াদের পশ্চিমে অবস্থিত, সুতরাং কেউ রিয়াদ থেকে মক্কায় যেতে চাইলেমদিনার এই পাশ দিয়ে আসার কথা নয়। তাই তারা মনে করলো যে, অবশ্যই লোকটা কোনো বাহিনীর অগ্রগামী দলের সদস্য হবে। অন্যথায় সে এখান দিয়ে হাঁটাটাট করবে কেনো? তাই তারা তাকে ধরে মদিনায় নিয়ে এলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তাই তারা তাকে মসজিদের পিলার সাথে বেঁধে রাখল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে এসে সালাত আদায় করার পর তাঁর তাঁকে বলল, আমরা সীমান্ত থেকে এই লোকটাকে ধরে এনেছি, সে সীমান্তের আশপাশে হাঁটাটাটি করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অত্যন্ত কোমলতা ও সহানুভূতি সহকারে বললেন, হে তুমি? সে বললো, আমি ছুমামা ইবনে উসাল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে বললেন তুমি কি নাজদের বনি হানিফের সরদার? সে বললো, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে রেখে সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর নিকট গেলেন এবং তাদের বললেন তোমরা কি জানো তোমরা কাকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছ? তারা বললো, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নাজদের বনি হানিফের সরদার ছুমামা ইবনে উসালকে গ্রেফতার করেছো। মক্কা গম ও সব আমদানি করে তা এই লোকটির নিকট থেকেই আসে। এমন একজন লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে, যে নাজদের বনি হানিফের সরদার এবং মক্কা যত গম ও সব আমদানি করে তা এই লোকটির নিকট থেকেই আসে! অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসলেন এবং তাকে বললেন, হে ছুমামা! ইসলাম গ্রহণ করো। সে বললো, না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ছুমামা তোমার সাথে কী আচরণ করা হবে তুমি মনে করো? সে বললো, আপনি হত্যা করতে চাইলে একজন রক্ত-মাংসের মানুষকে হত্যা করবেন (এটা একজন দৃঢ়চিত্তসম্পন্ন বাদশাহর মতোই কথা)। তিনি বললেন, আপনি হত্যা করতে চাইলে একজন রক্ত-মাংসের মানুষকে হত্যা করবেন, আর যদি অনুগ্রহ করতে চান তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর অনুগ্রহ করবেন। অর্থাৎ আপনি যদি আমার উপর দয়া করে আমাকে মুক্ত করে দেন তাহলে আপনি একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর অনুগ্রহ করলেন। আর যদি আপনি সম্পদ চান তাহলে আপনার যা ইচ্ছা তা চাইতে পারেন, আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আপনার তা দিয়ে দিবে। তারা আপনাকে মিলিয়ন দিরহাম দিতেও প্রস্তুত আছে; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনটিই চাহিলেন না। তিনি তাকে হত্যাও অবস্থাও ছেড়ে দিতে চাহিলেন না, আবার তার কাছ থেকে ফিদিয়া নিয়ে তাকে কায়েস অবস্থাও ছেড়ে দিতে চাহিলেন না। তিনি চাহিলেন যে, সে ইসলামের প্রতি প্রভাবিত হয়ে এখান থেকে ফিরে যাক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ওহুদের যুদ্ধে রেখে আজকের মতো বিদায় নিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দিলেন, তারা যেনো তার সাথে উত্তম ব্যবহার করে, ডাল ডাল খাবার পরিবেশন করে, এবং তার বাহনটিকে প্রতিদিন সকাল বিকেল তার সামনে দিয়ে ঘুরিয়ে দিয়ে যায়, কারণ মানুষ তার বাহনকে অনেক ভালবাসে। বর্তমানে যেমন অনেকের পছন্দের মডেলের গাড়ি থাকে, কোথাও গেলে পছন্দের সেই গাড়ি নিয়ে যায়। কোনো কারণে গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার পরিবর্তে একই মডেলের আরেকটি গাড়ি কিনে নেয়। কিন্তু আগে মানুষের নিকট গাড়ি ছিলো না; তারা পশুর উপর আরোহণ করতো, তাই তাদের নিকট বাহনের কদর ছিলো অনেক বেশি, কারণ অনেক কষ্ট করে একটি প্রশিক্ষিত পশু তার মালিকের মেজাজ ও অনুভূতি বুঝতো ও সে অনুযায়ী তার সাথে আচরণ করতো। সুতরাং সেকালে মানুষের কাছে বহন-উপযোগী পশুর কদর ছিলো অনেক বেশি। বিশেষ করে দূরদূরান্তে সফর-উপযোগী প্রশিক্ষিত পশুর। আর একারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আল্লাহ্ ওয়াসালাম হুমাযা ইবনে উসালের সামনে দিয়ে সকাল বিকেল তার বাহনটি ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, যাতে সে আশ্বস্ত থাকতে পারে যে, তার বাহনটির কোনো ক্ষয়ক্ষতি করা হয়নি। বর্তমানে অবস্থাটি উঁচু রয়েছে যেগুলা ভ্রমণের উপযোগী নয়। সেগুলা খাওয়ার উপযুক্তও। তুমি সেগুলা বাছাই করে তার গোশত খেতে পারবে; কিন্তু সেগুলোতে আরোহণ করে কোথাও ভ্রমণ করতে পারবে না। এখন তো ভ্রমণের উপযোগী পশু খুবই কম বরং একশ’র মধ্যে একটি পশুও কঠিন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম হুমাযা ইবনে উসালের সামনে দিয়ে সকাল-বিকাল তার বাহনটি ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, যাতে সে আশ্বস্ত থাকতে পারে যে, তার বাহনটির কোনো ক্ষতি করা হয়নি, তাকে হত্যা করা হয়নি বরং সেটা এখনও জীবিত রয়েছে এবং আগের মতই অক্ষত রয়েছে।
পর দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। দুমাযা ইবনে উসাল নামাযে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের কুরআন তেলাওয়াত শুনলেন। এরপর সারা দিন তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের সাথে সাহাবায়ের কেরাম রা.-এর আচরণ দেখলেন। অতঃপর দ্বিতীয় দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যখন তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাকে বললেন, দুমাযা! তোমার সাথে কী আচরণ করা হবে বলে তুমি মনে করো? আমি গতকাল যা বলেছিতাই, আপনারনিত্যতা করতে চাইলে একজন রক্ত-মাংসের মানুষকে হত্যা করবেন, আর যদি অনুগ্রহ করতে চান তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপরঅনুগহ্ব করবেন। আর যদি আপনি সম্পদ চান তাহলে আপনার যা ইচ্ছা তা চাইতে পারেন, আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আপনাকে তা দিয়ে দিবে। তারা আপনাকে মিলিয়ন দিরহাম দিতেও প্রস্তুত আছে; কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম এই তিনটি প্রস্তাবের কোনোটিই পছন্দ করলেন না। তিনি তো চান দুমাযা ইসলামে সুশীলতা ছাওয়ায় মোহিত হোক।
তাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম চুপ রইলেন এবং তার কাছ থেকে চলে গেলেন। আর দুমাযা সাহাবায়ে কেরামের সাথে মসজিদে রয়ে গেল, তিনি সাহাবায়ে কেরামের আচার-আচরণ দেখছিলেন আর মুগ্ধ হচ্ছিলেন। তিনি দেখছিলেন সাহাবায়ে কেরামের কেউ সালাত আদায় করছেন, কেউ আল্লাহ্ তাআলার দরবারে কান্নাকাটি করছেন, কেউ কুরআন তেলাওয়াত করছেন। এই দৃশ্যগুলো তার মধ্যে ধীরেসুধীরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকলো। এরপরের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যখন তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, দুমাযা তোমার সিদ্ধান্ত কী? সে বললো, আমি আগে যা বলেছি তাই।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তার সাথে কী করলেন? তিনি কি তার মাথার উপর তরবারি ধরে তাকে বললেন যে, ইসলাম গ্রহণ করো, না হলে হত্যা করবো!! না তিনি এটা করলেন না, কারণ জোর করে ভয় দেখিয়ে কাউকে ইসলাম গ্রহণ করানো আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন :
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
‘দীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত (সত-সঠিক পথ) ভ্রষ্টতা থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যে পথভ্রষ্ট তাগুতকে না মেনে আল্লাহতে বিশ্বাস করবে সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ়-মজবুত হাতল বা ভাঙ্গবার নয়। আল্লাহ্ সবাই শুনেন এবং জানেন।’¹
অন্য আয়াতে এসেছে, আল্লাহ্ তাআলা বলেন :
فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
‘অতএব, যার ইচ্ছা বিশ্বাস স্থাপন করুন এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক।’²
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কারো উপর চাপ সৃষ্টি করেন নি এবং ইসলাম গ্রহণ ক্ষেত্রে কাউকে বাধ্যও করেননি। তিনি বলেন :
যে মানুষ! তোমরা ‘লা-ইলাহ ই’ল্লাল্লাহ্’ বলো, সকল হবে, নাজাত পাবে।
এমনকি তিনি মক্কার মানুষদেরও ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেননি, যারা তাকে নির্যাতন করে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যখন দুমাযা ইসলাম গ্রহণ করছে না এবং তার ইসলাম গ্রহণের কোনো সম্ভাবনাও নেই; সে ইসলাম গ্রহণের সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছে, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তার সাথে কী ধরনের আচরণ করলেন?
দুমাযা ইবনে উসাল ছিলেন সম্মানিত মানুষ। তাই তার সাথে তিনি সেই ব্যবহারই করলেন যা তার জন্য উপযুক্ত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যখন তৃতীয়বার তার কাছে আসলেন এবং তার সিদ্ধান্ত জানতে চাইলেন এবং সে আগের মতই তার উত্তর দিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তখন সাহাবায়ে কেরাম রা.-কে বললেন, তোমরা দুমাযাকে ছেড়ে দাও। সাহাবায়ে কেরাম রা. বললেন, আমরা তার কাছ থেকে কোনোধরনের মুক্তিপণ আদায় না করেই তাকে ছেড়ে দিব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম বললেন, হ্যাঁ তাকে ছেড়ে দাও।
অথচ দুমাযা ছিলো এমন এক কওমের সর্দার যে কওমের কাছে রয়েছে প্রচুর সম্পদ, গম-খয়ের ভান্ডার। তা সত্ত্বেও তিনি বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও। আর দুমাযা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম ও মুসলমানদের এই আচরণ ও কোমল ব্যবহার দেখে সেখান থেকে বের হলেন।
দুমাযা ইবনে উসাল মসজিদ থেকে বের হয়ে নিকটস্থ একটি পানির স্থানে গেলেন এবং গোসল করে দ্বিতীয়বার ইহরাম পরিধান করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের নিকট এসে বললেন : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহ্র রাসূল। এরপর দুমাযা ইবনে উসাল রা. বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আপনার চেহারাটি চেয়ে ঘৃণিত চেহারা আমার কাছে আর একটিও ছিলো না। আর এখন আপনার চেহারা আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় চেহারা। আল্লাহ্র শপথ আপনার শহরের চেয়ে ঘৃণিত শহর আমার কাছে আর একটিও ছিলো না, আর এখন আপনার শহরই আমার কাছে সব চেয়ে প্রিয় শহর। আল্লাহ্র ধর্মের চেয়ে ঘৃণিত আর কোনো ধর্ম আমার কাছে ছিলো না, আর এখন আপনার ধর্মই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ধর্ম। হে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম! আমাকে কিছুর নির্দেশ দিন। আমি এখন মুহরিম (ইহরাম পরিহিত) অবস্থায় আছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তাঁকে বললেন, তুমি তোমার ওমরাহ্ পূরণ করো।
দুমাযা ইবনে উসাল রা. মক্কার দিকে যাত্রা করলেন, তিনি যখন মক্কায় গেলেন তখন তাঁর তালবিয়া পাল্টে গেল। তিনি-
لبيك اللهم لبيك لبيك لا شريك لك لبيك إن الحمد و النعمة لك والملك لا شريك لك
এই তালবিয়ার পরিবর্তে বললেন :
لبيك لا شريك لك الحمد و النعمة لك لا شريك لك
তখন কুরাইশরা তার নিকট জড়ো হয়ে তাকে বলল, নতুন তালবিয়া!! তিনি বললেন হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম আল্লাহ্র রাসূল। তখন মক্কার লোকেরা তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাঁকে প্রহার করতে শুরু করলো, যাতে করে তারা তাঁকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে আবার অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইাা এটাই হচ্ছে ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের সাথে পার্থক্য, ইসলাম কাউকে তরবারি উচিয়ে জোরপূর্বক ইসলামে প্রবেশের কথা বলে না বরং কাফফেরাাই মানুষকে ইসলাম থেকে বের করার জন্য শক্তি ও তরবারি উভয়টাই ব্যবহার করে। আমরা দেখেছি এবং একথা আমরা কখনো ভুলতে পারবো যে, ক্রুসেডাররা বাইতুল মাসজিদ দখলের পর সেখানকার মুসলমানদের সাথে তারা কীধরণের আচরণ করেছিলো, তারা সেখানে নির্বিচারে নিরস্ত্র মুসলমানদের হত্যা করেছে, এমনকি শিশুরাও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি, মুসলমানদের রক্তের স্রোত ঘোড়ার গোড়ালী পর্যন্তও ভরিয়ে দিয়েছিলো। মুসলমানদের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন একটি ঘটনাও নেই। যাই হোক পুকুর ঘাটের ফিয়ে আসি, দুমাযা রা.কে প্রহার করতে দেখে আব্বাস রা. চিৎকার করে বললেন, হে লোকেরা! তোমরা কাকে মারছো? এ তো বনি হানিফার সরদার! এ-তো দুমাযা ইবনে উসাল। আল্লাহ্র শপথ তোমরা যদি দুমাযাকে প্রহার করো তাহলে তোমাদের নিকট বনি হানিফা থেকে গমের একটি দানাও আসবে না। তোমরা তো নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করতে চাচ্ছো। সে তো তোমাদের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে, তোমাদের নিকট খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিবে। আব্বাস রা.-এর কথা শুনে লোকেরা তাঁকে প্রহার করা বন্ধ করলো। দুমাযা রা.তখন বললেন, আল্লাহ্র শপথ! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম আমাকে অনুমতি না দিলে তোমাদের নিকট গমের একটি দানাও আসবে না।
অতঃপর কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের নিকট একজন দূত পাঠিয়ে তাঁকে অনুরোধ করে বললেন, হে মুহাম্মাদ! এই লোকটি আমাদের খাদ্যের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁকে কুরাইশদের নিকট খাদ্য রপ্তানি করতে বললেন।
হ্যাঁ, এভাবেই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। এভাবেই উত্তম আখলাকের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম ইসলাম প্রচার করেছেন। মানুষ তাঁর উত্তম চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আর যুদ্ধ ও জিহাদের মাধ্যমে ঐসকল অপশক্তিকে দমন দেওয়া হয়েছে যারা মানুষকে সত্য দীন ইসলাম গ্রহণ করাকে বাধা দিচ্ছিলো। যারা মানুষের মাঝে ও ইসলামের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িযেছে।
এখন এখানে আমি আপনাদের সামনে একটি পরিখাংশুখ্য পেশ করছি যা আমি ড. রাগেব আস-সিরজানির একটি বইয়ে পড়েছি, ইন তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে এবং তাতে মুসলমানদের থেকে যত জন শহীদ হয়েছেন তার সংখ্যা এবং কাফেরদের থেকে যারা নিহত হয়েছে তার একটা তালিকা উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় সর্বমোট যুদ্ধ হয়েছে ৬৩ টি। এর মধ্যে গাজওয়া হচ্ছে ২৭ টি। আর সারিয়্যা হচ্ছে ৩৬ টি। আর সবগুলো যুদ্ধ মিলিয়ে মুসলমানের থেকে সর্বমোট শহীদের সংখ্যা হল ২৫২ জন। আর কাফেরদের থেকে নিহতদের সংখ্যা হল সর্বমোট ১০২২ জন। এবার তুমি যদি অনুসন্ধান করো দেখতে পাবে যে, যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মুসলিম মুজাহিদদের মোট সৈন্যের মাত্র ১% যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আর কাফেরদের থেকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মোট সৈন্যের মাত্র ৯.৫% যুদ্ধে নিহত হয়েছে। এর অর্থ কী? এর অর্থ কি এটা দাঁড়ায় না যে, ইসলাম ও মুসলমানরা কখনো কারো রক্ত চায় না, অথবা অনর্থভাবে কাউকে হত্যা করতে চায় না।
এবার এসো কাফেরদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি যুদ্ধের পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মোট নিহতদের সংখ্যা হল ৫৪.৮ মিলিয়ন। কি অবাক লাগছে? তুমি এর চেয়েও বেশি অবাক হবে যদি তুমি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের সংখ্যা দেখো। ইঁ সেটি অবাক হওয়ারই বিষয়, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মোট সৈন্যের সংখ্যা ১৫.৬ মিলিয়ন। অর্থাৎ যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী সৈন্যদের চেয়ে নিহতদের সংখ্যা প্রায় ৪ গুণ বেশি। সুতরাং বুঝায় যায় যে, নিহতদের বেশিরভাগ মানুষই হল নিরপরাধ সাধারণ জনগণ। সৈন্যরা বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করে নির্বিচারে সেখানকার সাধারণ মানুষদেরকে হত্যা করেছে। সেখানকার নারী, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ সকলকে হত্যা করেছে। তারা বিভিন্ন জনবসতিতে প্রবেশ করে সেখানে নির্বিচারে গুলি করে, বোম্বিং করে, পারমাণবিক বোমা ফেলে মানুষ হত্যা করেছে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের আমিদের কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন, তারা যেনো কোনো আহতকে হত্যা না করে। কোনো নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি এমন সাধারণ মানুষদের হত্যা না করে। এমনকি তিনি গির্জার পাদ্রিদেরও হত্যা করতে নিধন করবেন।। আর একারণেই আমরা দেখতে পাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে ঘটে যাওয়া যুদ্ধে শহীদ ও নিহতদের সংখ্যা মোট যোগের ১% বা ২% অথবা এর চেয়েও কম।
বর্বর বর্বন্দের একত্র করা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দেন। তিনি সাহাবাদের বলে দেন যে, তারা যেনো যুদ্ধবন্দিদের সাথে ভাল ব্যবহার করে, তাদের সামনে ভাল খাবার পরিবেশন করে। মুসআব ইবনে উমাইয়ের রা. বলেন, আমার এক ভাই বন্দি ছিলো। আমরা ছিলাম পাহারাদারির দায়িত্বে। বন্দিদের জন্যে রুটি আর পানি দেওয়া হলে, আমরা তাদের খেজুর আর পানি দিয়ে আমরা নিজেরা শুকনো রুটি খেয়েছি। এই আচরণ দেখে কাফের বন্দিরা পর্যন্ত লজ্জিত হয়ে বলেছে, তোমরাও খেজুর নাও। তখন আমরা বলেছি, না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তোমাদের প্রতি সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এ কারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ
'তাঁরা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম-অনাথ ও বন্দিকে আহার্য দান করে।'
ইসলাম যদি শুধু মাত্র তরবারির মাধ্যমেই বিজয় অর্জন করতো তাহলে যখন তাঁদের উপর থেকে তরবারি উঠে যেতো তখন তাঁরা আবার তাঁদের কুফরিতে ফিরে যেতো। বর্তমান রাশিয়াতে কি এটাই ঘটেনি? রাশিয়াতে ৭০ বছর সমাজতন্ত্রের শাসন চলেছে। সমাজতন্ত্রিরা মানুষকে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক কমিউনিস্ট বানিয়েছে। এরপর যখনই সমাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়েছে তখন মানুষ আবার তাদের আগের ধর্মে ফিরে গেছে, খৃষ্টানরা খৃষ্টধর্মে ফিরে গেছে আর মুসলমানগণ ইসলাম ধর্মে ফিরে এসেছে। সুতরাং কোমলতা ছাড়া শুধু অস্ত্র তোমার কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।
কিন্তু একবার ইসলাম গ্রহণের পর মানুষ আর তাঁদের আগের কুফরি ধর্মে ফিরে যায়নি। বরং ইসলাম তাঁদের অন্তরে চিরদিনের জন্যে গেঁথে গেছে, সকল ঝড়ঝাপটা ও বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তাঁরা ইসলামকে আঁকড়ে ধরেছে। আর একারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ
'আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও সদুপদেশ শুনিয়ে এবং (যদি কখনো বিতর্কের প্রয়োজন পড়ে তাহলে) তাঁদের সাথে বিতর্ক করুন উৎকৃষ্ট পন্থায়।'
ইন্দোনেশিয়া, যেখানে বর্তমান মুসলমানের সংখ্যা ২১০ মিলিয়ন। সেখানে ইসলাম প্রচারের জন্যে কোনো তরবারি ব্যবহার হয়নি। মুসলিম ব্যবসায়ীরা সেখানে গিয়েছেন স্থানীয় লোকেরা মুসলমানদের ব্যবসার দেখে মুসলমান হয়েছেন। ব্যবসায়ীরা প্রথমে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন, অতঃপর মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তখন তাঁরা এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় আরো একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন, এভাবে পুরো ইন্দোনেশিয়াতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে। এবং বর্তমানে যাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন তাঁদের কেউ তরবারির মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করতে বাধ্য করছে না। বরং তাঁরা ইসলামের মূল সৌন্দর্য দেখে স্বেচ্ছায় ইসলামে প্রবেশ করছেন। উদাহরণস্বরূপ জার্মানির কথাই বলা যাক, সেখানকার সরকার বলছে, জার্মানিতে দিন দিন ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জার্মান সরকার বলছে, বর্তমানে জার্মানিতে প্রতি দুই ঘন্টায় একজন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। এই পরিসংখ্যানটা হল ২০০৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত। এরা কি তরবারির ভয়ে মুসলমান হয়েছেন? এ-তো তোমার সামনে জার্মান সরকারের হিসেব। আমার যেসকল বন্ধু জার্মানিতে থাকে, আমি তাদের বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁদের বলেছি সত্যিই কি এই সংখ্যক মানুষ মুসলমান হচ্ছে? তখন তারা আমাকে বলেছে, না এটা ঠিক সংখ্যা নয়; বরং সঠিক সংখ্যাটা আরো বেশি। এটা সরকারি হিসেব, সরকার সঠিক সংখ্যাটা প্রকাশ করতে চাচ্ছে না।
ইসলাম নেতা ও কোমলতার মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। অনুরূপভাবে ইসলাম জিহাদের মাধ্যমেও প্রসারিত হয়েছে। একথা বলা ভুল যে, ইসলাম তরবারির মাধ্যমে প্রসারিত হয়নি। আবার একথা বলাও ভুল যে, ইসলাম শুধু মাত্র তরবারির মাধ্যমেই প্রসারিত হয়েছে। বরং ইসলাম এই দুইটার সমন্বয় প্রসারণিত হয়েছে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মাধ্যমে জবরদস্তিকারীদের জুলুম নির্যাতন দূর হয়েছে এবং মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পেয়েছে, ফলে তাঁরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। অনুরূপভাবে উত্তম কথা ও কোমল ব্যবহারের মাধ্যমেও ইসলাম প্রসারিত হয়েছে। (সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, ইসলাম প্রসারিত হয়েছে তরবারি বিশিষ্ট আখলাকের মাধ্যমে)
মহান আল্লাহ তাআলা নিকট প্রার্থনা করি, তিনি আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে পরিপূর্ণ কল্যাণ দান করুন। আমি এবং আপনারা যে যেখানেই থাকি, তিনি আমাদের কল্যাণ ও বরকতের সাথে রাখুন এবং আমাদের সকলকে তাঁর আনুগত্যে লেগে রাখুন। আমিন।
টিকাঃ
¹ সূরা বাকারা, আয়াত : ২৫৬
² সূরা কাহাফ, আয়াত : ২৯
১. সূরা ইনসান, আয়াত: ৮
১. সূরা নাহল, আয়াত: ১২৫