📄 নিজের আত্মার কাছে জিজ্ঞাসার বিষয়সমূহ
আসুন নিজের আত্মার কাছে নিজেরাই জিজ্ঞাসা করি নিম্নের এই কয়টি বিষয়ে:
১. অন্তর কি বিগলিত হয়? আল্লাহর জন্য চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে? হে নফস! তুমি কি লোকদের থেকে দূরে?
২. তুমি কি তোমার যৌবনকালকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করার কাজে নিয়োজিত করেছিলে?
৩. তুমি কি তোমার সময়কে অপচয় থেকে রক্ষা করেছ? ইলম অর্জনে ব্যয় করেছ এবং নবীজির হাদিসভান্ডার সংগ্রহ করেছ?
৪. তুমি কি যাকে চেনো এবং যাকে চেনো না-উভয়কে সালাম দেয়ার ইসলামি শিষ্টাচার যথাযথভাবে পালন করো?
৫. তুমি কি পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার দায়িত্ব পালন করো?
৬. ভালো ও আনন্দদায়ক কোনো সংবাদ শুনলে কি সেজদায় লুটিয়ে পড়ে শোকর আদায় করা হয়?
৭. দুশ্চিন্তার কোনো সংবাদ এলে কিংবা উৎকণ্ঠামূলক কোনো কিছু ঘটলে, তোমার নফস কীভাবে এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে চায়? নামাজ-কালাম ও আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়ার মাধ্যমে, না অন্য কিছুর মাধ্যমে?
৮. দুইজনের মধ্যে ঝগড়া সৃষ্টি হলে তোমার ভূমিকা কী হয়? তুমি কি তাদের মধ্যে মীমাংসা করার চেষ্টা করো? যখন কেউ তোমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, অথবা দূরে সরে যেতে চায়, তখন ইসলামের দাবি অনুযায়ী তুমি কি তিনদিনের মধ্যেই তার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করো?
৯. তুমি কি ফকির-মিসকিনকে দান করো? কল্যাণকর কাজে অগ্রসর হও? বিশেষ করে সদকায়ে জারিয়ার ক্ষেত্রে তোমার অবস্থান কী?
১০. নেফাক ও কপটতার মতো মহামারিকে ভয় করতেন সাহাবা, তাবেয়ি, সালফে সালেহিনসহ সকল বুজুর্গানে কেরام। হে নফস! তোমার অবস্থান কী? তুমিও কি তাদের মতো নেফাকি ভয় পাও, না ভয়-ভীতিহীন জীবনযাপন করে যাচ্ছ?
১১. তুমি কি সৎকাজে আদেশ করতে এবং অসৎকাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখতে স্বতঃস্ফূর্ত? এসব কাজে তোমার আগ্রহ আছে, না বিরক্তি, অনীহা ও উদাসীনতায় ডুবে রয়েছ?
১২. নফসকে জিজ্ঞাসা করুন, সে কি আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে বড়ো উপায় রোজা পালনে ব্রতী? বিশেষ করে সপ্তাহের দুইদিন, বৃহস্পতি ও সোমবারে?
১৩. বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যখন মিলিত হয়, গল্প হয়, আড্ডা হয়, তখন নফসকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন। তখন কি তাদের সঙ্গে শুধুই খোশগল্পে মেতে থাকে, না তাদেরকে ভালো কাজের শিক্ষা দেয় এবং যে ইলম নিজে অর্জন করেছে তা তাদের মাঝেও বিস্তার করতে সচেষ্ট হয়?
১৪. কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া, খোঁজখবর নেয়া এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা ও দুআ করা সুন্নত। নফসকে জিজ্ঞাসা করুন, সে এসব কাজে আগ্রহী কি-না?
১৫. অর্থবিত্তের অধিকারী নফসকে জিজ্ঞাসা করুন, সে এই সম্পদগুলো শুধু ভোগবিলাস ও সন্তানদের সুখের জন্য গচ্ছিত রেখে যেতে ইচ্ছুক, না মৃত্যুর পূর্বেই এই সম্পদ থেকে কিছু ব্যয় করে হজ-উমরা পালনেরও আগ্রহ পোষণ করে?
১৬. মুসলমানের অন্তর আনন্দিত যাতে হয়, যা দ্বারা তার দুশ্চিন্তা ও পেরেশান দূর হয়—এ ধরনের কোনো কাজে নফসের আগ্রহ কতটুকু, এও জিজ্ঞাসা করুন।
১৭. পাপী ও খারাপ লোকের সংস্রব ত্যাগ করতে সে কতটুকু আগ্রহী, না এদের নিয়েও মৌজে থাকতে সে ভালোবাসে?
১৮. ওজুর সময় মেসওয়াক করতে তার তৎপরতা কতটুকু? মেসওয়াক হলো মুখের পবিত্রতা আর মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। সুতরাং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সে কতটুকু অগ্রগামী?
১৯. ঘুমের আগে সারাদিনের কাজের হিসাব করা হলো কি-না, করা হলে ভালো কাজের সংখ্যা বেশি না মন্দ কাজের সংখ্যা বেশি? সংখ্যা অনুযায়ী করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় কি-না? ঘুমানোর আগে অন্তর থেকে সকল প্রকার হিংসা ও বিদ্বেষ বের হয়ে গেছে কি-না—সে কথাও তাকে জিজ্ঞাসা করুন।
২০. প্রকাশ্য ও গোপন সকল অবস্থায় অন্তর আল্লাহকে ভয় করে কি-না এবং সকল কাজ একমাত্র তাঁর জন্যই সম্পাদন করে কি-না, তা জিজ্ঞাসা করুন।
২১. নবীজির সুপারিশ পাওয়ার আশায় মুয়াজ্জিন যখন আজান দেয় তখন তার জবাব দেয়ার প্রতি আগ্রহ থাকে কি-না, তা জিজ্ঞাসা করুন।
২২. অহেতুক কথা, অহেতুক কাজ, অপ্রয়োজনীয় পানাহার, কুদৃষ্টি, হাসাহাসি থেকে বিরত থাকে কি-না, জিজ্ঞাসা করুন।
২৩. জবানকে সকল প্রকার পাপকাজ, বিশেষ করে গিবত থেকে বিরত রাখতে পছন্দ হয় কি-না?
২৪. দৃষ্টিকে অবনত রাখা ও কর্ণদ্বয়কে হারাম শ্রবণ থেকে বিরত রাখে কি-না, এটাও জিজ্ঞাসা করুন।
২৫. দীনের ওপর অটল-অবিচল থাকা, জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নام থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা হয় কি-না?
২৬. ইসলামের দৌলত লাভ এবং ধন-দৌলত, স্ত্রী-পরিবার, সুস্থতা ইত্যাদি নেয়ামত লাভের পর এর জন্য আল্লাহর হামদ আদায় করা হয় কি- না এবং সর্বদা হামদ আদায় করার গুরুত্ব অন্তরে অনুভূত হয় কি-না?
২৭. নিজের প্রতিটি কাজে আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা ও তাওয়াক্কুল করা হয় কি-না?
২৮. অন্যের অনুপস্থিতিতে দুআ করলে দুআ কবুল হয়। সুতরাং মুসলমানের কল্যাণকামিতা হিসেবে তার জন্য এভাবে দুআ করা হয় কি-না?
২৯. বিপদে পতিত হলে একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য ও আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় কি-না এবং মানুষের কাছে কোনো শেকায়েত, অভিযোগ পেশ কিংবা তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা থেকে নিবৃত্ত থাকা হয় কি-না?
৩০. আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা ও তাঁর অসীম কুদরত নিয়ে গবেষণা ও ফিকির করার সুযোগ হয় কি-না?
নিজের নফসের কাছে আমরা এই ত্রিশটি প্রশ্নের উত্তর চাই। যদি প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাই, ইসলামের অনুকূলে উত্তর পাই এবং বাস্তব জীবনে উত্তরের সঙ্গে মিল খুঁজে পাই, তাহলে খুবই ভালো কথা। বুঝতে হবে নফস আমার অনুগত হয়েছে। নফসের লাগাম এখন আমার হাতে। আমি তাকে পরিচালিত করছি, আমি তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি না। কিন্তু যদি এর বিপরীত উত্তর পাই, তাহলে বুঝতে হবে, আমি নিজেই নফসের গোলাম হয়ে গেছি। আমার নাকে রশি লাগিয়ে নফস আমাকে তার খেয়াল-খুশিমতো ব্যবহার করছে। তাই এই শোচনীয় অবস্থায় সতর্ক হই। দ্রুত সংশোধন করে ফেলি নিজের নফসকে।