📄 আদায়কৃত নামাজের কাজা আদায়!
মাঝেমধ্যেই নিজের নফসের জায়েজা নিতে হয়। অর্থাৎ খোঁজ-খবর নিতে হয়। কোন পর্যায়ে আছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। অন্যথায় নফস কোন দিক দিয়ে যে মুমিন বান্দাকে পথহারা করে ফেলবে তা টেরও পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে একজন বুজুর্গের ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। এই বুজুর্গ দীর্ঘদিন যাবৎ নিজ মহল্লার মসজিদে প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করতেন। কোনো ওয়াক্তেই তিনি দ্বিতীয় কাতারে নামাজ পড়তেন না। অনেক বছর পর হঠাৎ একটি বিশেষ ব্যস্ততার কারণে তিনি প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করতে পারলেন না। সেদিন একেবারে শেষ কাতারে নামাজ আদায় করলেন।
কিন্তু দেখা গেল, এই ওয়াক্ত নামাজের পর থেকে তাকে বেশ কিছুদিন আর মসজিদেই দেখা গেল না। লোকেরা এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি আমার অনেকদিনের আদায়কৃত নামাজের কাজা করছি! লোকেরা অবাক হয়ে বলল, কাজা নামাজ আদায় করছেন? তাও আবার আদায়কৃত নামাজের কাজা? আদায়কৃত নামাজের কাজা হয় কি?
তিনি জবাবে বললেন, আমি অনেকদিন যাবৎ সামনের কাতারে নামাজ আদায় করেছি। একদিন কোনো এক কারণে পেছনে নামাজ আদায় করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, আমার লজ্জা ও সংকোচ হচ্ছে। তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলাম, আমার সামনের কাতারে নামাজ আদায়ের আগ্রহ ও উদ্দীপনা কেবল মানুষকে দেখানোর জন্য! তাহলে তো সেই নামাজগুলো আদায়ই হয়নি! তাই আমি সেসব নামাজের কাজা করছি।
এই ঘটনা থেকেও আমাদের বিরাট শিক্ষা নেয়ার ব্যাপার রয়েছে। আমরা এই ঘটনা থেকে এই শিক্ষা নিতে পারি যে, আমরা নিজেদের আত্মার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকব না। বরং আমল করার মাঝে মাঝে নিজের আত্মাকে পর্যবেক্ষণ করে দেখব, আমার ইবাদতগুলো কি সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর জন্য করা হচ্ছে, নাকি নফসকে খুশি করার জন্য, সুনাম-সুখ্যাতি ও লোক দেখানোর জন্য হচ্ছে। আমার কষ্টসাধ্য ইবাদতগুলোকে আমার নফস ও প্রবৃত্তি খারাপ উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছে না? এসব প্রশ্ন নিজের নফসের কাছে রাখতে হবে এবং নফসকে শাসনের মাধ্যমে ইবাদতকে যথাযথ খাতে প্রবাহিত করতে হবে। অবশ্য নফসের এসব কুমন্ত্রণা ও কূটচাল ধরতে কামেল ও হক্কানি রাহবারের সান্নিধ্য অধিক ফলদায়ক। তাই তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে。
টিকাঃ
৩৭. সিরাজুত তালিবিন: ১৬।
📄 আসমানে আর কোনোদিন দৃষ্টি তোলেননি!
মুজাম্মি রাহিমাহুল্লাহ একবার ছাদের দিকে মাথা তুললেন। এতে হঠাৎ একজন বেগানা নারীর প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে গেল। এতে তিনি ভীষণ ব্যথিত হলেন। নিজের নফসকে কঠোরভাবে তিরস্কার করতে লাগলেন। আর নফসকে শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রতিজ্ঞা করলেন, দুনিয়ায় যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন আর কখনো আসমানের দিকে মাথা তুলে তাকাবেন না। এভাবে এই মহান সাধক নিজের নফসকে শায়েস্তা করলেন। একদিনের সামান্য অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য নিজের আত্মাকে যে শাসনের অধীনে আনলেন, তা ইতিহাসে অমর হয়ে থাকল। আমাদের মতো দুর্বলচিত্তের লোকদের জন্য তা অম্লান পাথেয় হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে রইল।
📄 সামনের দিনগুলোর হিসাব নাও, অতীত দিনগুলোর জন্য ক্ষমা পাবে
একজন ব্যক্তি একবার ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রাহিমাহুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বয়স কত? লোকটি জবাবে বললেন, ৬০ বছর।
ফুজাইল রাহিমাহুল্লাহ বললেন, তাহলে তো অতিসত্বর তুমি আল্লাহ তাআলার কাছে উপনীত হতে যাচ্ছ।
লোকটি বলল, ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ফুজাইল রাহিমাহুল্লাহ বললেন, তুমি কি কথাটির অর্থ জানো?
লোকটি জবাবে বললেন, এর অর্থ আমরা হলাম আল্লাহ তাআলার বান্দা এবং আমাদেরকে অতিসত্বর তাঁর নিকট ফিরে যেতে হবে।
ফুজাইল রাহিমাহুল্লাহ বললেন, যদি এটাই বিশ্বাস করো যে, তুমি আল্লাহর বান্দা এবং আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, তাহলে এটাও জেনে নাও যে, তোমাকে তোমার জীবনের পাপ-পুণ্য সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হবে। সুতরাং তুমি জবাবের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।
লোকটি বলল, হিসাব সহজ হওয়ার উপায় কী?
ফুজাইল রাহিমাহুল্লাহ বললেন, এর উপায় হলো অতীত জীবনের হিসাব গ্রহণ করা আর অবশিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা।
📄 দিনার আইয়ার রাহিমাহুল্লাহর বিস্ময়কর পরিবর্তন
দিনার আইয়ার নামের একজন যুবক ছিলেন খুব উচ্ছৃঙ্খল। মা তাকে সর্বদা ভালো হয়ে চলার, নেক আমল করার আদেশ-উপদেশ দিতেন। কিন্তু তিনি তা পরোয়া করতেন না। নিজের মতো করে চলতেন। হঠাৎ একদিন তিনি একটি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতে লাগলেন। কবরটি ছিল প্রাচীন। অনেক হাড়-গোড় জড়ো হয়ে আছে। অনেক পুরাতন হাড্ডি মাটির ওপর দিয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তিনি হঠাৎ থমকে গেলেন। স্তব্ধ হয়ে গেল তার চলার গতি। তিনি কয়েকটি পুরাতন হাড্ডি হাতে তুলে নিলেন এবং অনেকক্ষণ খুব চিন্তা করলেন।
এরপর নিজের নফসকে সম্বোধন করে বললেন, হে আমার প্রাণ! আত্মা! আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি, আগামীকাল তোমার হাড্ডিও এমন জীর্ণশীর্ণ হয়ে যাবে। কবরের ওপরে ভেসে উঠবে। বাতাসে এদিক-সেদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। হাড্ডির সঙ্গে রক্ত-মাংসের কোনো অস্তিত্ব না থাকায় কোনো প্রাণীও তোমার হাড্ডির দিকে তাকাবে না। তোমার হাড্ডি নিশ্চিহ্ন হওয়ার মতো তোমার এই সুঠাম দেহও অকেজো হয়ে যাবে।
হে আমার নফস! আজ তুমি সোৎসাহে পাপকাজে লিপ্ত হচ্ছ। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গ পাচ্ছ! কিন্তু এই হাড্ডিগুলোর বন্ধুরা আজ কোথায়? আনন্দ-ফূর্তির সময়কার অন্তরঙ্গ বন্ধুগুলো আজ এদেরকে একা ফেলে রেখেছে কেন?
নিজের নফসের কাছে প্রশ্নগুলো করে গেলেন এই যুবক। কিন্তু নফসের কাছে কোনো জবাব ছিল না। কেননা নফস মানুষকে কেবল পাপকাজেই জড়াতে পারে, পাপকাজে জড়ানোর পক্ষে তার কাছে কোনো যুক্তি থাকে না। তাই তিনিও নিজের নফসের কাছে প্রশ্ন করে কোনো সদুত্তর পেলেন না।
তখনই প্রতিজ্ঞা করলেন, যে নফস তাকে এই পাপে ডুবিয়েছে, সেই নফসকে শাসন করেই তিনি আল্লাহ তাআলার মর্জিতে নিজেকে সমর্পিত করবেন। তাই সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলার দরবারে হাত উত্তোলন করলেন এবং দুআ করলেন, হে আল্লাহ! আমি আমার নফসের হাত থেকে আমার লাগام কেড়ে নিয়ে আপনার হাতে সোপর্দ করে দিলাম। আমাকে আপনি কবুল করুন এবং অতীত হালের জন্য আমার প্রতি রহম করুন।
এরপর তিনি তার মায়ের কাছে বিবর্ণ অবস্থায় ফিরে গেলেন। মায়ের সামনে অত্যন্ত লজ্জিত ও নত মস্তকে দাঁড়ালেন এবং বললেন, আম্মাজান! কোনো মুনিব যখন তার পলাতক দাসকে হাতের নাগাল পেয়ে যান, তখন তিনি তার সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেন?
মা বললেন, তার খাবার-পানীয় হ্রাস করে দেন এবং তার হাত-পা বেঁধে ফেলেন।
যুবক বললেন, তাহলে আমাকে একটি পশমের জুব্বা দিন আর ভুট্টার কয়েক টুকরো রুটি দিন। আমার সঙ্গে তেমন ব্যবহারই করুন, যা একজন পলাতক ভৃত্যের সঙ্গে করা হয়। যাতে আমার মুনিব আমার এই দুর্দশা দেখে আমার প্রতি রহম করেন।
যুবকের কথা শুনে তার মা তা-ই করলেন। এরপর যুবক রাতের বেলায় চিৎকার করে কাঁদতেন আর নিজেকে তিরস্কার করে বলতেন, হে দিনার! তোমার কি আগুনের তাপ সহ্য করার ক্ষমতা আছে? যখন তোমাকে আজাবের সামনে পেশ করা হবে, তখন তুমি কীভাবে তা বরদাশত করবে? এভাবে প্রতিদিন নিজেকে ও নিজের নফসকে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করে রাত কাটাতেন।
একদিন রাতে তার মা তাকে বললেন, হে বৎস! তুমি তোমার নফসের প্রতি কিছুটা রহম করো!
জবাবে দিনার রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আম্মাজান! কিছু সময় নিজেকে ক্লান্ত হতে দিন, যাতে অনন্তকালের জন্য শান্তি পাই। হে আম্মাজান! রবের সামনে আমাদেরকে দীর্ঘ সময় দণ্ডায়মান হতে হবে। আমি জানি না, সেদিন আমাকে দীর্ঘ ছায়াদার জান্নাতে স্থান দেবেন, না নিকৃষ্ট স্থানে আশ্রয় দেবেন।
মা বললেন, তবু রাতের কিছু অংশে আরাম ও বিশ্রাম করো।
জবাবে দিনার বললেন, আম্মাজান! আরাম ও বিশ্রাম করব! তাহলে আপনি কি আমার মুক্তির জিম্মাদারি নেবেন?
মা বললেন, আমি কীভাবে জিম্মাদারি নিতে পারি?
দিনার রাহিমাহুল্লাহ বললেন, তাহলে আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আমার মুক্তির পথ আমাকেই বের করার সুযোগ দিন। আম্মাজান! আমার সামনে যেন এই দৃশ্য উদ্ভাসিত হচ্ছে যে, অনেক লোককে জান্নাতের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে। আর আমাকে একা জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে!
একদিন তিনি রাতের নামাজে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
'আপনার রবের শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সকলকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করব।'
এই আয়াত দুটি পাঠ করার পর তিনি নিজেকে সম্বোধন করে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, সেদিনের জিজ্ঞাসার জবাব তোমার কাছে প্রস্তুত আছে কি? নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নফসের কাছে কোনো সদুত্তর পেলেন না। তাই ভীষণ ক্রন্দন জুড়ে দিলেন। আর সাপের মতো মোড়াতে থাকলেন। একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
ভূপতিত হওয়ার শব্দ শুনে মা ছুটে এলেন এবং সন্তানের নাম ধরে ডাক দিতে লাগলেন। কিন্তু কোনো জবাব পেলেন না। তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, হে আমার কলিজার টুকরো! তুমি কোথায়?
দিনার রাহিমাহুল্লাহ খুব ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, আম্মাজান! আমাকে যদি কেয়ামতের মাঠে খুঁজে না পান, তবে আমার অবস্থান সম্পর্কে মালেক ফেরেশতাকে জিজ্ঞাসা করবেন।
এ কথা বলে তিনি ভীষণ চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং মারা গেলেন।
তখন মা সন্তানকে গোসল ও কাফন পরিধান করালেন এবং চিৎকার করে ঘরের বাইরে গেলেন। আর লোকদেরকে এই বলে জানাজার নামাজে হাজির হওয়ার আবেদন জানালেন যে, হে লোক সকল! তোমরা জাহান্নামের ভয়ে নিহত যুবকের জানাজায় অংশগ্রহণ করতে এসো।
মায়ের ঘোষণা শুনে বিভিন্ন প্রান্তর থেকে দলে দলে লোক ছুটে এলো। সেদিন জানাজায় এত পরিমাণ লোকের সমাগম হলো এবং সকলের মধ্যে এত কান্নার রোল পড়ল যে, এর আগে কখনো ওই এলাকায় এরূপ দৃশ্য দেখা যায়নি।
সম্মানিত পাঠক! চিন্তা করুন, যে যুবক নিজেকে পাপের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, সেই যুবক যখন নিজের নফসের হিসাব নেয়া শুরু করলেন তখন তিনি কোথা থেকে কোথায় গিয়ে উপনীত হলেন? হাজার হাজার মানুষ জানাজায় শরিক হলেন, তার শোকে কান্নার রোল পড়ল। যে মা তাকে নিয়ে ভয় করতেন, সেই মা তাকে নিশ্চিন্ত মনে কবরের মাটিতে সমাহিত করে প্রশান্তি অনুভব করলেন। তাই তো বলা যায়:
এমন জীবন তুমি করেছ গঠন
কবরে শায়িত জেনেও প্রশান্ত মায়ের মন。
টিকাঃ
৩৮. সুরা হিজর: ৯২-৯৩।