📄 অন্যের পাপ নয় নিজের পাপ অনুসন্ধান করা অত্যাবশ্যক
'হায়, আমাদের দুর্ভাগ্য! এটা কেমন গ্রন্থ! এটা তো ছোটো-বড়ো কোনো কিছুই বাদ দেয়নি!'
আয়াতে ঘোষণা রয়েছে যে, কেয়ামত দিবসে প্রতিটি মানুষের ছোটো-বড়ো সকল আমল লিপিবদ্ধ আকারে হাজির করা হবে। এমনকি অপ্রয়োজনীয় একটি হাসির কথাও আমলনামায় লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। তবে মুমিনদের অন্যান্য নেক আমলের কারণে ছোটো ছোটো গোনাহগুলোকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেন। ইখলাসপূর্ণ ভালো ভালো আমলের কারণে ছোটো পাপ মুছে দিয়ে সেই স্থান নেক দ্বারা পূর্ণ করে দেন। আর কেয়ামত দিবসে কোনো কোনো মুমিনের বেলায় এমন হবে যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলবেন, তুমি কি এমন এমন কাজ করেছিলে?
সেদিন তো বান্দার সামনে সব খোলাসা হয়ে যাবে। সে বুঝতে পারবে আল্লাহ তাআলার ইলমে কোনো একটা বিষয়ও গোপন নেই। তাই সে খুবই ভয়ে ভয়ে থাকবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা বলবেন, যাও, আমি তোমার এই পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। তখন সে চিৎকার করে বলবে, হে আল্লাহ! আমার তো আরও অনেক পাপ ছিল, সেগুলো আমলনামায় দেখতে পাচ্ছি না কেন?
অর্থাৎ যখন সে দেখতে পাবে যে, আল্লাহ তাআলা পাপগুলোকে নেক আমল দ্বারা পূর্ণ করে দিয়েছেন, তখন তো আরও পাপ থাকলে সেগুলোর স্থানেও নেকি লেখা হতো। তাই সে নিজেই নিজের পাপের সন্ধান দেবে।
পক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফেকদের আল্লাহ তাআলা গোটা হাশরবাসীর সামনে হাজির করবেন। তাদের আমলনামার প্রতিটি বিষয় তাদের সামনে পেশ করবেন। কাফেরদের যেহেতু কোনো নেক আমল নেই, তাই তাদের আমলনামায় কোনো পাপই মার্জনাযোগ্য থাকবে না, ছোটো-বড়ো সবই আমলনামায় হাজির দেখতে পাবে। তখন তারা তাদের পাপের জন্য আফসোস করবে এবং বলবে, এটা কেমন আমলনামা, যাতে ছোটো-বড়ো সকল পাপ লিপিবদ্ধ রয়েছে!
যাইহোক, মুমিন ও কাফের সকলের আমলনামায় সব ধরনের পাপের কথাই লিপিবদ্ধ থাকবে। এমন নয় যে, আমলনামা লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাগণ কোনো পাপকে হাল্কা মনে করে তা লেখা থেকে বিরত থাকবেন। আয়াতে সে কথাই ঘোষণা করা হয়েছে এবং আমলনামার এই নিখুঁত লিপিকরণ দেখে কেয়ামত দিবসে মানুষ আফসোস করতে বাধ্য হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
টিকাঃ
৩১. সুরা কাহাফ: ৪৯।
📄 জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে নফসের প্রতি সুধারণা পোষণ করা নির্বুদ্ধিতা
আবুল আব্বাস মুসিলি রাহিমাহুল্লাহ নিজের নফসকে সম্বোধন করে বলতেন, হে নফস! আমার আত্মা! তুমি তো দুনিয়াদারদের মতো ভোগ-বিলাসেও লিপ্ত নও, আবার আবেদগণের সঙ্গে ইবাদত পালনেও কঠোর সাধনাতেও লিপ্ত নও। আমার আশঙ্কা, তুমি আমাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে আটকে রাখবে। হে নফস! তোমার কি লজ্জা হয় না?
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, অবাধ্য জন্তুকে নিয়ন্ত্রণের জন্য লাগাম যতটুকু না প্রয়োজন, নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শাসনের লাগام তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদিসে ইরশাদ হয়েছে: وَاعْلَمْ أَنَّ النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ. ‘মনে রেখো, সাহায্য হলো সবরের সঙ্গে।
আল্লাহ তাআলার সাহায্য আসে দুটি জিহাদের মাধ্যমে। প্রকাশ্য শত্রুর সঙ্গে জিহাদ করার মাধ্যমে এবং নফসের বিরুদ্ধে অপ্রকাশ্য জিহাদের মাধ্যমে। বস্তুত গোপন যুদ্ধের শত্রু হলো তার নফস। যে ব্যক্তি উভয় জিহাদের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করবে, সে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে। আর যে ধৈর্যধারণ করবে না, সে পরাজিত হবে এবং শত্রুর হাতে বন্দি হয়ে ধিকৃত ও নিহত হবে।
**নফসের প্রতি সুধারণা পোষণ করা নির্বুদ্ধিতা**
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ভালো ধারণা পোষণ করার আদেশ করেছেন। কিন্তু এটা অন্যদের ব্যাপারে। নিজের নফসের ব্যাপারে নয়। কেননা নফসের ব্যাপারে তো বলেছেনই, নফস মানুষকে সর্বদা পাপের দিকে আহ্বান করে।
অতএব, নিজেদের নফসের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। সুধারণার সুযোগে নফস আমাদেরকে নিয়ে এমন এমন কাজ করাবে, যা বাহ্যত ভালো মনে হলেও পরিণামে অনেক অশুভ ফল বয়ে আনবে। এ কারণেই ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আরেফ অর্থাৎ নিজেকে ভালোমতো জানে, সে অবশ্যই নিজের নফসের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করে। আর কেবল মূর্খ ব্যক্তিরাই নিজেদের নফসের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করে।
ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ النَّفْسَ عَدُوٌّ مُنَازِعُ، يَجِبُ عَلَيْنَا مُجَاهَدَتَهَا.
'মানুষের নফস হলো প্রবল শত্রু ও ঝগড়াটে। সুতরাং তার বিরুদ্ধে কঠোর জিহাদ করা আবশ্যক।'
টিকাঃ
৩২. ইহইয়াউ উলুমিদদীন: ৩/৬৬, নাদরাতুন নাইম: ৮/৩৩১৪।
৩৩. মুসনাদে আহমাদ: ২৮০৩, আদ-দুআ লিত-তাবারানি: ৪১
৩৪. নাদরাতুন নাইম: ৮/৩৩১৪
📄 কুপ্রবৃত্তি যখন ভালো কাজ করতে চায়
আমাদের আকাবিরগণ নফসের কূটচাল থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ সজাগ ও সতর্ক থাকতেন। নফসকে কোনোভাবেই তার ইচ্ছার অধীন করে দিতেন না। আহমদ ইবনে আরকাম বালখি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার আমার নফস আমাকে জিহাদে বের হওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করল! আমি তো হতবাক। বিস্ময়ে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, জিহাদ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায় প্রতিটি প্রাণ, অথচ আমার নফস আমাকে সেই জিহাদে শামিল হতেই অনুপ্রাণিত করছে! অথচ নফসরে স্বরূপ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ.
'মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্মের প্রতি অধিক মাত্রায় আদেশ করে।
সুতরাং আমার নফসও তো আমাকে মন্দ কর্মে উৎসাহিত করার কথা, কিন্তু সে কেন আমাকে জিহাদের মতো এত উন্নত আমলের দিকে উৎসাহিত করছে? এটা তো কখনই হতে পারে না?
তখন আমি ভাবলাম, আমার নফস দীর্ঘদিন একাকীত্ব ভোগ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, একঘেয়েমিতে ভীষণ বিরক্ত হয়ে পড়েছে। তাই মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ ও তাদের সান্নিধ্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে জিহাদে বের হতে চাচ্ছে। ফলে তার এই একঘেয়েমিও কেটে গেল, মানুষের মধ্যে নিজের বীরত্বও প্রকাশ পেল।
আমি মনের এই অবস্থা আঁচ করতে পেরে আমার নফসকে সম্বোধন করে বললাম, আমি তোমাকে জনসম্মুখে আসতে দেব না এবং মানুষের মধ্যে পরিচিতও করাব না। তখন আমার নফস এতেও সায় দিল। তখন আমার নফসের আবার খারাপ ধারণা হলো এবং আমি বললাম, আল্লাহ হলেন সর্বাধিক সত্যবাদী। আর তিনি তো বলেছেন, 'মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্মপ্রবণ।' তাহলে আমার নফস আমাকে এই ভালো কাজও সায় দিচ্ছে কেন?
তখন আমি আমার নফসকে বললাম, তাহলে আমি তোমাকে নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব খালি গায়ে, বর্ম, ঢাল ও শিরস্ত্রাণবিহীন অবস্থায়; যাতে তুমিই হও জিহাদের প্রথম শহিদ।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আমার নফস এ ক্ষেত্রেও আমাকে সায় দিল! আমি যা করতে চাচ্ছিলাম তা-ই করতে বলল।
তখন আমি আবারও আমার নফসের প্রতি পূর্বের ন্যায় সন্দিহান হলাম। আর আমি বিভিন্ন নেك আমলের কথা স্মরণ করলাম, যার প্রত্যেকটিতে নফস সায় দিয়েছে। যা নিতান্তই অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
আহমদ ইবনে আরকাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তখন আমি ভীষণ পেরেশান হলাম। বার বার ভাবতে লাগলাম, এমন তো হওয়ার কথা নয়! তাই আমি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করলাম, হে প্রভু! আমার নফসের এই ভালো মানুষির রহস্য আমার সামনে উদঘাটন করে দিন। কেননা আমি আমার নফসকেই অভিযুক্ত করি এবং আপনার কথাই নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি।
এরপর দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পর আমার অন্তরে কাশফ হলো, আমার সামনে রহস্য উদ্ঘাটিত হলো। আমার নফস যেন আমাকে এ কথা বলছিল যে, হে আহমদ! তুমি আমাকে কামনা-বাসনার প্রতিটি বস্তু থেকে বঞ্চিত করে এবং আমার প্রতিটি চাওয়ার বিরোধিতা করে প্রতিদিনই তো হত্যা করে চলেছ, যে সম্পর্কে কেউ জানে না। সুতরাং জিহাদে অংশগ্রহণ করে যদি নিহত হও, তবে আমাকে একবারেই হত্যা করে ফেললে। তখন আমি তোমার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেলাম। এভাবে আমি তোমার হাত থেকে মুক্তিও পেলাম, আবার জিহাদে অংশগ্রহণ করে শহিদ হওয়ার কারণে আমার সুনাম-সুখ্যাতি ও বীরত্বের কথাও মানুষের মধ্যে প্রচার হলো। লোকেরা তখন বলবে, আহমদ ইবনে বালখি শহিদ হয়েছেন! এভাবে আমার স্মরণ ও সম্মান জীবিত থাকবে।
আহমদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার কাছে আমার নফসের এই চরিত্র প্রকাশ পাওয়ার পর আমি বসে গেলাম এবং সেই বছর জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকলাম।
পাঠক! দেখুন, মানুষের আত্মা মানুষকে কতভাবে বিভ্রান্ত করে। কতভাবে ধোঁকা দেয়। কখনো খারাপ কাজ করে বিপথগামী করে, আর কখনো ভালো কাজের ছুরতে মানুষকে বিপথগামী করে। তাই নফসের বিরুদ্ধে মানুষের শাসন ও কঠোরতাও হতে হবে নানামুখী। নিজেকে শাসন না করার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে কখনই নিজেকে নফসের ক্ষতি ও ধোঁকা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। এ কারনেই জনৈক বুজুর্গ বলেছেন:
تَوَقَّ نَفْسَكَ لَا تَأْمَنْ غَوَائِلَهَا فَالنَّفْسُ أَخْبَثُ مِنْ سَبْعِينَ شَيْطَانًا
'তুমি তোমার নফসকে বাঁচাও, নফসের কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করো না। কেননা একটা নফস সত্তরটি শয়তান থেকেও নিকৃষ্ট ও ভয়ানক ক্ষতিকর।'
টিকাঃ
৩৫. সুরা ইউসুফ: ৫৩।
৩৬. সিরাজুত তালিবিন: ১৩-১৪।
📄 আদায়কৃত নামাজের কাজা আদায়!
মাঝেমধ্যেই নিজের নফসের জায়েজা নিতে হয়। অর্থাৎ খোঁজ-খবর নিতে হয়। কোন পর্যায়ে আছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। অন্যথায় নফস কোন দিক দিয়ে যে মুমিন বান্দাকে পথহারা করে ফেলবে তা টেরও পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে একজন বুজুর্গের ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। এই বুজুর্গ দীর্ঘদিন যাবৎ নিজ মহল্লার মসজিদে প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করতেন। কোনো ওয়াক্তেই তিনি দ্বিতীয় কাতারে নামাজ পড়তেন না। অনেক বছর পর হঠাৎ একটি বিশেষ ব্যস্ততার কারণে তিনি প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করতে পারলেন না। সেদিন একেবারে শেষ কাতারে নামাজ আদায় করলেন।
কিন্তু দেখা গেল, এই ওয়াক্ত নামাজের পর থেকে তাকে বেশ কিছুদিন আর মসজিদেই দেখা গেল না। লোকেরা এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি আমার অনেকদিনের আদায়কৃত নামাজের কাজা করছি! লোকেরা অবাক হয়ে বলল, কাজা নামাজ আদায় করছেন? তাও আবার আদায়কৃত নামাজের কাজা? আদায়কৃত নামাজের কাজা হয় কি?
তিনি জবাবে বললেন, আমি অনেকদিন যাবৎ সামনের কাতারে নামাজ আদায় করেছি। একদিন কোনো এক কারণে পেছনে নামাজ আদায় করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, আমার লজ্জা ও সংকোচ হচ্ছে। তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলাম, আমার সামনের কাতারে নামাজ আদায়ের আগ্রহ ও উদ্দীপনা কেবল মানুষকে দেখানোর জন্য! তাহলে তো সেই নামাজগুলো আদায়ই হয়নি! তাই আমি সেসব নামাজের কাজা করছি।
এই ঘটনা থেকেও আমাদের বিরাট শিক্ষা নেয়ার ব্যাপার রয়েছে। আমরা এই ঘটনা থেকে এই শিক্ষা নিতে পারি যে, আমরা নিজেদের আত্মার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকব না। বরং আমল করার মাঝে মাঝে নিজের আত্মাকে পর্যবেক্ষণ করে দেখব, আমার ইবাদতগুলো কি সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর জন্য করা হচ্ছে, নাকি নফসকে খুশি করার জন্য, সুনাম-সুখ্যাতি ও লোক দেখানোর জন্য হচ্ছে। আমার কষ্টসাধ্য ইবাদতগুলোকে আমার নফস ও প্রবৃত্তি খারাপ উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছে না? এসব প্রশ্ন নিজের নফসের কাছে রাখতে হবে এবং নফসকে শাসনের মাধ্যমে ইবাদতকে যথাযথ খাতে প্রবাহিত করতে হবে। অবশ্য নফসের এসব কুমন্ত্রণা ও কূটচাল ধরতে কামেল ও হক্কানি রাহবারের সান্নিধ্য অধিক ফলদায়ক। তাই তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে。
টিকাঃ
৩৭. সিরাজুত তালিবিন: ১৬।