📄 নিজের নফসের সঙ্গে বিস্বাদ খাবার নিয়ে ঝগড়া
১৪৬. সাহল ইবনে গালিজ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি একবার আমের ইবনে সাব্বাহ রাহিমাহুল্লাহর সঙ্গে বিখ্যাত আবেদ ও বুজুর্গ বকর রাহিমাহুল্লাহর বাড়িতে গেলাম। তিনি সে সময় বাড়িতে একাই ছিলেন। অথচ আমরা তাকে কার সঙ্গে যেন কথোপকথন অবস্থায় পেলাম। আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি বাড়িতে একা, অথচ কার সঙ্গে যেন কথা বলছিলেন? তিনি বললেন, আমি আমার আত্মার সঙ্গে কথোপকথন করছিলাম। প্রথমে তাকে ক্ষুধার্ত রাখলাম আর সে আমার কাছে খাবার চাইল। এক টুকরো রুটির ব্যবস্থা করে দিলাম। তখন সে সুস্বাদু লবণ চাইল। তখন আমি নফসকে বললাম, বকরিকে খাওয়ানোর মতো লবণ ছাড়া আমার কাছে ভিন্ন কোনো লবণ নেই। যদি চাও এটাই খেতে পারো, অন্যথায় আমার কাছে এর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, আমার নফস এটা খেতে অস্বীকৃতি জানায় এবং তিনদিন না খেয়ে থাকে।
📄 দুনিয়ায় হিসাব না নিলে আমলনামায় ছাড় নেই
১৪৭. হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কেয়ামত দিবসে সেই সব লোকের হিসাব সহজ হবে, যারা দুনিয়াতে তাদের নিজেদের হিসাব গ্রহণ করত। আর কেয়ামত দিবসে তাদের বিষয়টি অতি কঠিন হবে, যারা নিজেদের নফসকে উন্মুক্ত ছেড়ে রেখেছিল। ফলে দুনিয়ার প্রতিটি কাজকর্মে তারা নফসকে স্বাধীন করে দিয়েছিল। কেয়ামত দিবসে এরা আল্লাহ তাআলাকে অত্যন্ত কঠোর অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা দেখতে পাবে, আল্লাহ তাআলা তাদের আমলনামায় এক যাররা (অণু পরিমাণ) বস্তুর হিসেবেও তুলে রেখেছেন। এরপর তিনি আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
مَا لِهَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا.
📄 অন্যের পাপ নয় নিজের পাপ অনুসন্ধান করা অত্যাবশ্যক
'হায়, আমাদের দুর্ভাগ্য! এটা কেমন গ্রন্থ! এটা তো ছোটো-বড়ো কোনো কিছুই বাদ দেয়নি!'
আয়াতে ঘোষণা রয়েছে যে, কেয়ামত দিবসে প্রতিটি মানুষের ছোটো-বড়ো সকল আমল লিপিবদ্ধ আকারে হাজির করা হবে। এমনকি অপ্রয়োজনীয় একটি হাসির কথাও আমলনামায় লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। তবে মুমিনদের অন্যান্য নেক আমলের কারণে ছোটো ছোটো গোনাহগুলোকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেন। ইখলাসপূর্ণ ভালো ভালো আমলের কারণে ছোটো পাপ মুছে দিয়ে সেই স্থান নেক দ্বারা পূর্ণ করে দেন। আর কেয়ামত দিবসে কোনো কোনো মুমিনের বেলায় এমন হবে যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলবেন, তুমি কি এমন এমন কাজ করেছিলে?
সেদিন তো বান্দার সামনে সব খোলাসা হয়ে যাবে। সে বুঝতে পারবে আল্লাহ তাআলার ইলমে কোনো একটা বিষয়ও গোপন নেই। তাই সে খুবই ভয়ে ভয়ে থাকবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা বলবেন, যাও, আমি তোমার এই পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। তখন সে চিৎকার করে বলবে, হে আল্লাহ! আমার তো আরও অনেক পাপ ছিল, সেগুলো আমলনামায় দেখতে পাচ্ছি না কেন?
অর্থাৎ যখন সে দেখতে পাবে যে, আল্লাহ তাআলা পাপগুলোকে নেক আমল দ্বারা পূর্ণ করে দিয়েছেন, তখন তো আরও পাপ থাকলে সেগুলোর স্থানেও নেকি লেখা হতো। তাই সে নিজেই নিজের পাপের সন্ধান দেবে।
পক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফেকদের আল্লাহ তাআলা গোটা হাশরবাসীর সামনে হাজির করবেন। তাদের আমলনামার প্রতিটি বিষয় তাদের সামনে পেশ করবেন। কাফেরদের যেহেতু কোনো নেক আমল নেই, তাই তাদের আমলনামায় কোনো পাপই মার্জনাযোগ্য থাকবে না, ছোটো-বড়ো সবই আমলনামায় হাজির দেখতে পাবে। তখন তারা তাদের পাপের জন্য আফসোস করবে এবং বলবে, এটা কেমন আমলনামা, যাতে ছোটো-বড়ো সকল পাপ লিপিবদ্ধ রয়েছে!
যাইহোক, মুমিন ও কাফের সকলের আমলনামায় সব ধরনের পাপের কথাই লিপিবদ্ধ থাকবে। এমন নয় যে, আমলনামা লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাগণ কোনো পাপকে হাল্কা মনে করে তা লেখা থেকে বিরত থাকবেন। আয়াতে সে কথাই ঘোষণা করা হয়েছে এবং আমলনামার এই নিখুঁত লিপিকরণ দেখে কেয়ামত দিবসে মানুষ আফসোস করতে বাধ্য হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
টিকাঃ
৩১. সুরা কাহাফ: ৪৯।
📄 জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে নফসের প্রতি সুধারণা পোষণ করা নির্বুদ্ধিতা
আবুল আব্বাস মুসিলি রাহিমাহুল্লাহ নিজের নফসকে সম্বোধন করে বলতেন, হে নফস! আমার আত্মা! তুমি তো দুনিয়াদারদের মতো ভোগ-বিলাসেও লিপ্ত নও, আবার আবেদগণের সঙ্গে ইবাদত পালনেও কঠোর সাধনাতেও লিপ্ত নও। আমার আশঙ্কা, তুমি আমাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে আটকে রাখবে। হে নফস! তোমার কি লজ্জা হয় না?
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, অবাধ্য জন্তুকে নিয়ন্ত্রণের জন্য লাগাম যতটুকু না প্রয়োজন, নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শাসনের লাগام তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদিসে ইরশাদ হয়েছে: وَاعْلَمْ أَنَّ النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ. ‘মনে রেখো, সাহায্য হলো সবরের সঙ্গে।
আল্লাহ তাআলার সাহায্য আসে দুটি জিহাদের মাধ্যমে। প্রকাশ্য শত্রুর সঙ্গে জিহাদ করার মাধ্যমে এবং নফসের বিরুদ্ধে অপ্রকাশ্য জিহাদের মাধ্যমে। বস্তুত গোপন যুদ্ধের শত্রু হলো তার নফস। যে ব্যক্তি উভয় জিহাদের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করবে, সে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে। আর যে ধৈর্যধারণ করবে না, সে পরাজিত হবে এবং শত্রুর হাতে বন্দি হয়ে ধিকৃত ও নিহত হবে।
**নফসের প্রতি সুধারণা পোষণ করা নির্বুদ্ধিতা**
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ভালো ধারণা পোষণ করার আদেশ করেছেন। কিন্তু এটা অন্যদের ব্যাপারে। নিজের নফসের ব্যাপারে নয়। কেননা নফসের ব্যাপারে তো বলেছেনই, নফস মানুষকে সর্বদা পাপের দিকে আহ্বান করে।
অতএব, নিজেদের নফসের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। সুধারণার সুযোগে নফস আমাদেরকে নিয়ে এমন এমন কাজ করাবে, যা বাহ্যত ভালো মনে হলেও পরিণামে অনেক অশুভ ফল বয়ে আনবে। এ কারণেই ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আরেফ অর্থাৎ নিজেকে ভালোমতো জানে, সে অবশ্যই নিজের নফসের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করে। আর কেবল মূর্খ ব্যক্তিরাই নিজেদের নফসের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করে।
ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ النَّفْسَ عَدُوٌّ مُنَازِعُ، يَجِبُ عَلَيْنَا مُجَاهَدَتَهَا.
'মানুষের নফস হলো প্রবল শত্রু ও ঝগড়াটে। সুতরাং তার বিরুদ্ধে কঠোর জিহাদ করা আবশ্যক।'
টিকাঃ
৩২. ইহইয়াউ উলুমিদদীন: ৩/৬৬, নাদরাতুন নাইম: ৮/৩৩১৪।
৩৩. মুসনাদে আহমাদ: ২৮০৩, আদ-দুআ লিত-তাবারানি: ৪১
৩৪. নাদরাতুন নাইম: ৮/৩৩১৪