📄 আবেদা নারীকে নিজ আত্মার প্রতি রহম করার পরামর্শ
১৩৩. হজরত জানজুলা রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন একজন বিখ্যাত মহীয়সী নারী। ইবাদত-বন্দেগি ও তাকওয়া-পরহেজগারিতে তিনি ছিলেন অনন্য সমৃদ্ধ। ইবাদত-বন্দেগিতে এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে, অন্যরা পর্যন্ত এসে তাকে নিজের ওপর করুণা করার পরামর্শ দিতেন। আহমাদ ইবনে সাহল উরদুনি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার কিছু আলেম এই বিখ্যাত আবেদা নারী হজরত জানজুলা রাহিমাহুল্লাহর কাছে গমন করে তাকে তার আত্মার প্রতি কিছুটা রহম করার পরামর্শ দিলেন। তিনি তাদের কথা শুনে বললেন, আমি আবার আমার আত্মাকে কষ্ট দিলাম কোথায়? জীবন তো কিছু ইবাদতে প্রতিযোগিতার সময়ের সমষ্টির নাম। যদি এই প্রতিযোগিতার সময়ের কিছু অংশ কেউ হারিয়ে ফেলে, তবে আগামীকাল সে এই সময় আর ফিরে পাবে না। হে আমার ভাইয়েরা! আমি আল্লাহ তাআলার জন্য নামাজ আদায় করি, যা আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সামর্থ্যের তুলনায় কম। আমি তাঁর জন্য রোজা রাখি সারা জীবন, সেটাও আমার সাধ্যানুযায়ী। আর আমি ক্রন্দন করি সেই পরিমাণ, চোখ যে পরিমাণ অশ্রু প্রবাহিত করার সাধ্য রাখে। এরপর তিনি বললেন, আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যিনি তার গোলামকে কোনো কাজের আদেশ করে মনে মনে সে কাজে কসুর করুক—তা কামনা করবে?
নিশ্চয় নয়। সুতরাং আল্লাহ তাআলা আমাকে ইবাদতের আদেশ করেছেন, নিজের নফসকে দমন করার আদেশ করেছেন, অতএব আমার মুনিব আমাক যে কাজের আদেশ করেছেন আমি সেই কাজে কসুর ও ত্রুটি করব কেন?
📄 অধিক কান্নার কারণে স্ত্রীর অভিযোগ
১৩৪. আবু উবায়দা সাররার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আতা সালিমি রাহিমাহুল্লাহ অত্যধিক পরিমাণ ক্রন্দন করতেন। তার ক্রন্দনে পরিবারের লোকেরাও তার প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে উঠত। একদিন তার স্ত্রী আমাকে বললেন, আপনি আতা রাহিমাহুল্লাহকে অধিক কান্নার ব্যাপারে কিছু একটা বলুন।
তার কথায় আমি আতা সালিমি রাহিমাহুল্লাহকে এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাইলে তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, হে সাররার! আমাকে সেই কাজের জন্য কেন তিরস্কার করছ, যে কাজের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে নেই? আমি জাহান্নামিদের কথা স্মরণ করি, জাহান্নামিদের ওপর যে মহা আজাব নাজিল হবে সে কথাও স্মরণ করি। ফলে কখনো কখনো নিজেকে জাহান্নামিদের কাতারে শামিল করে তাদের যে আজাব হবে সেই আজাব আমার ওপর হওয়ার কল্পনা করি। আর এতেই আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। আমি আজাবের ভয়ে ক্রন্দন করি।
কখনো কখনো নিজেকে জাহান্নামিদের কাতারে রেখে এভাবে কল্পনা করি যে, আমার হাত কাঁধের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা হয়েছে। অতঃপর তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হে সাররার! এমন ব্যক্তির কথা মনে পড়লে কি তোমার কান্না আসত না? তুমি চিৎকার করতে না? যে ব্যক্তি এমন ভয়াবহ আজাবের সম্মুখীন হয়েছে, সে ব্যক্তি কি ক্রন্দন করবে না, চুপ করে বসে থাকবে? তাহলে আমাকে তিরস্কার করছ কেন, আমি তো নিজের পাপের কারণে নিজেকে এমন অপরাধী বলেই মনে করি! হে সাররার! হে সাররার! আল্লাহ যদি কারও প্রতি রহম না করেন, তবে অল্প ক্রন্দনকারী ব্যক্তির পরিবার তার কোনোই কাজে আসবে না।
📄 জাহান্নামের সেতু
১৩৫. আবু সালমান দারানি রাহimahu Allah বলেন, আমি একবার আমার বোন আবদা রাহimahu Allahর সামনে জাহান্নামের পুলের কথা উল্লেখ করলাম। আমার বর্ণনা শুনে তিনি একদিন এক রাত লাগাতার ক্রন্দন করতেই থাকলেন। এই সময়ের একটি মুহূর্তও তার ক্রন্দন থামল না। এরপর কোনো এক সময় তার ক্রন্দন থামল। কিন্তু যখনই আমি তার সামনে জাহান্নামের ওই পুলের কথা উল্লেখ করতাম তখনই তিনি জাহান্নামের ভয়ে চিৎকার করে উঠতেন।
আমি তার এই চিৎকারের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমাকে জানানো হলো, তিনি নিজেকে জাহান্নামের সেই সেতুর ওপর দণ্ডায়মান একজন ব্যক্তি মনে করতেন আর তিনি কাফনের কাপড় পরিধান করে থাকতেন।
এটাই আসলে জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন। এভাবেই পরকালের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হয়। তবে পরকালীন জীবনে সমৃদ্ধি ও সফলতা আসে। অন্যথায় দুনিয়া থেকে খালি হাতে বিদায় নিতে হয়।
📄 সুযোগে জীবনে একবারই পাওয়া যায়
১৩৬. আবুল আবইয়াজ রাহিমাহুল্লাহ নামের একজন ব্যক্তি অতিশয় আবেদ ও নেককার ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তার একজন বন্ধুর নিকট চিঠি লিখলেন এভাবে:
'হামদ-সালাতের পর কথা এই যে, তুমি পার্থিব জীবনে একটিমাত্রই প্রাণের অধিকারী হয়েছ। সুতরাং যদি পরিশ্রম ও কঠোরতার মাধ্যমে একে পরিশুদ্ধ করে নাও, তবে তোমার আশেপাশের লোকেরা খারাপ হলেও তোমার ঈমান ও আমলে কোনো ক্ষতি হবে না। পক্ষান্তরে যদি তুমি তোমার নফসকে কলুষিত করে নাও, তবে তোমার আশেপাশের সবাই ফেরেশতার মতো ভালো হলেও তোমার কোনো উপকারে আসবে না। আর মনে রেখো, তুমি দুনিয়ায় ততক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ নও, যতক্ষণ পর্যন্ত না ভালো-মন্দ বা সামান্য যা কিছু তোমার রিজিকে জোটে, তাতে অভ্যস্থ হও।'
এই ঘটনায় আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা রয়েছে। সেটা হলো, মানুষকে আল্লাহ তাআলা একটিমাত্রই জীবন দিয়েছেন এবং একবারই মৃত্যু হবে। একবারের জীবনে যত ইচ্ছা ভালো কাজ করা যাবে, ভুল হলে, পাপ হলে, অন্যায় হলে যতবার ইচ্ছা মাফ করিয়ে নেয়া যাবে, তাওবা করা যাবে। কিন্তু একবার মৃত্যু হয়ে গেলে, হাজারবার অনুরোধ, আবেদন করলেও আল্লাহ তাআলা বান্দাকে পুনরায় সুযোগ দেবেন না। এটা কুরআনেরই ভাষ্য। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُو رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّnā أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ.
'হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম। এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় প্রেরণ করুন, আমরা নেك আমল করব, আমরা এখন দৃঢ়বিশ্বাসী হয়েছি।" ৩০
অর্থাৎ মৃত্যুর পর অপরাধীরা হাজারবার অনুরোধ করবে, কিন্তু সেই সুযোগ আর তাদেরকে দেয়া হবে না। দুনিয়ায় আবার পাঠিয়ে তাওবা করে আমল করার সুযোগ আর কাউকেই দেয়া হবে না। তাই ওই বুজুর্গ বলেছেন, তোমার জীবন মাত্র একটি। সুতরাং নেك আমল করার সুযোগও এই একটি জীবনে করার সুযোগ হবে। অতএব, হেলায় এই সুযোগ নষ্ট করে চিরস্থায়ী আফসোসে নিজেকে নিমজ্জিত করো না। সেদিনের হাজার আফসোস কোনো কাজে আসবে না।
টিকাঃ
৩০. সুরা সাজদাহ: ১২।