📄 নফসের ওপর কঠোরতাই সবচেয়ে বড়ো ইবাদত
১৩০. আবু আইয়ুব হাজারি বলেন, আমাকে আবু সালেহ নামের একজন বলেছেন, আমি আমার কয়েকটি বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করলাম। আমি আমার নফসের প্রতি অত্যন্ত কঠোরতা আরোপ করলাম। আমার জীবনের অবনতির কথা চিন্তা করে আমার কান্না এলো। তখন আমি রাতের কিছু অংশ জাগরণ করলাম। আমি ওজু করলাম এবং রাতের নামাজ আদায় করলাম। এরপর নামাজের জায়গাতেই সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হলাম। হঠাৎ স্বপ্নে দেখলাম একজন অতিশয় সুদর্শন যুবতী হাজির। তার গায়ে সবুজ কাপড় আর হাতে একটি পেয়ালায় সাদা পানীয় জাতীয় কিছু। সে আমাকে পেয়ালাটি হাতে দিয়ে বলল, এগুলো পান করো। আমি পান করলাম। পান করে দেখলাম, মধুর মতো স্বাদযুক্ত। এটা আমার কাছে খুবই সুস্বাদু মনে হলো। আমার আগ্রহ দেখে সে আমাকে আরও পান করাচ্ছিল।
পান করার পর আমি বললাম, আমি কখনো এত সুস্বাদু বস্তুর স্বাদ আস্বাদন করিনি। সে বলত, এটা তোমারই বস্তু, তাই তুমি যদি তা বৃদ্ধি করো তবে তোমার পাথেয় বৃদ্ধি পাবে।
তখন সে বলল, স্বীয় নফসের ওপর তোমার কঠোরতা আরোপ হলো সবচেয়ে বড়ো ইবাদত। পরকাল নিয়ে ফিকির করা হলো উত্তম কাজ। আজকে তোমার চোখের অশ্রু পরকালে তোমার জন্য আনন্দের কারণ হবে। আর নামাজ তোমার জন্য ঢাল হবে।
সে আরও বলল, তুমি সম্ভ্রান্ত ও দাতা সত্তার ইবাদত করো। আর তুমি দুআয় বলো, হে প্রশস্ততা দানকারী! আপনার অনুগ্রহে আমাকে প্রশস্ততা দিন। যে কাজে আমাদের যোগ্যতা নেই, সেই কাজে আমাদেরকে যোগ্যতা দান করুন। আমরা যদিও মাগফিরাত লাভের যোগ্য নই, কিন্তু আপনি তো মাগফিরাতকারী ও ক্ষমাশীল, আপনার ক্ষমার গুণ দ্বারাই আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আমাদের জীবনকে সুন্দর করে দিন। আমাদের কাছে যা আছে তা অতিদ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে আপনার কাছে যা আছে তা কখনো নিঃশেষ হবে না। আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে কিন্তু আপনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর।
এরপর সেই যুবতী বলল, এবার তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
আমি তখন ঘুমিয়ে পড়লাম। এরপর যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন হাতে রেশমের একটি টুকরা দেখতে পেলাম। তাতে লিপিবদ্ধ ছিল, সেই মহান সত্তার পবিত্রতা, যিনি নেয়ামত দান করেন এবং যাঁর কৃতজ্ঞতা পোষণ করা হয়। আর তাদেরকেও তিনি দান করেন, যারা তাঁর অকৃতজ্ঞতা করে। হে বনি আদম! তোমরা কতই নির্বোধ! তোমরা শত্রুর আনুগত্য করো আর তোমার রিজিকদাতার নাফরমানি করো! হে নির্বোধ! গাফলতের নিদ্রা ত্যাগ করে উঠে পড়ো। হে বোকা! দুনিয়ার সবচেয়ে বড়ো ব্যবসায়ী মূলধন হলো তাকওয়া।
আবু সালেহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। আর অবাক ব্যাপার হলো, তখনও আমার হাতে সেই কাগজটি মুষ্টিবদ্ধ ছিল।
📄 হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহকে স্বপ্নে দর্শন ও জিজ্ঞাসা
১৩১. আবু আব্দুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ তার পিতার সূত্রে বলেন, আমি হাম্মাদ ইবনে সালামা রাহিমাহুল্লাহকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহ তাআলা আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন?
তিনি জবাবে বললেন, দয়ার আচরণ করেছেন। আর আল্লাহ বলেছেন, দুনিয়ায় তুমি তোমার আত্মাকে সংকুচিত করেছ। সুতরাং আজ তোমাকে সুদীর্ঘ আরাম দান করা হলো। দুনিয়ায় ইবাদতে ক্লান্তদের জন্য কতই-না সুন্দর আরামদায়ক ব্যবস্থা!
📄 নফসকে অনুগত করলে শাহাদত অর্জনের সুযোগ
১৩২. সাফওয়ান ইবনে মুহরিজ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমার নফস যদি আমার আনুগত্য করত, তবে আমি আমার শাহাদতের স্থান দেখতে সক্ষম হতাম।
অর্থাৎ মানুষের পরকালীন উন্নতির পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হলো তার কুপ্রবৃত্তি। আমরা দুনিয়ার সাফল্য অর্জনের জন্য নানা পরিকল্পনা করে থাকি, সাফল্য অর্জনের সহায়ক বিষয়গুলো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরি আর বাধা ও প্রতিবন্ধক বিষয়গুলো যত্নের সঙ্গে এড়িয়ে চলি এবং এভাবেই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছার চেষ্টা করি। ঠিক তদ্রূপ আমাদের পরকালীন সাফল্য অর্জনের জন্যও আমাদের পথের সবচেয়ে বড়ো বাধা কী—তা নিরূপণ করতে হবে এবং তা দমন করতে হবে। আর কুরআন- হাদিস ও সালফে সালেহিনের বিবরণ অনুযায়ী মানুষের পরকালীন উন্নতির পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হলো শয়তান ও তার কুপ্রবৃত্তি। তাই এই দুটি অপশক্তিকে দমন করতে পারলেই মানুষ তার চিরকালীন শান্তির ঠিকানায় সহজে পৌঁছতে সক্ষম হবে। সাফওয়ান ইবনে মুহরিজ রাহিমাহুল্লাহ আলোচ্য বক্তব্যে এ কথাই তুলে ধরেছেন।
📄 আবেদা নারীকে নিজ আত্মার প্রতি রহম করার পরামর্শ
১৩৩. হজরত জানজুলা রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন একজন বিখ্যাত মহীয়সী নারী। ইবাদত-বন্দেগি ও তাকওয়া-পরহেজগারিতে তিনি ছিলেন অনন্য সমৃদ্ধ। ইবাদত-বন্দেগিতে এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে, অন্যরা পর্যন্ত এসে তাকে নিজের ওপর করুণা করার পরামর্শ দিতেন। আহমাদ ইবনে সাহল উরদুনি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার কিছু আলেম এই বিখ্যাত আবেদা নারী হজরত জানজুলা রাহিমাহুল্লাহর কাছে গমন করে তাকে তার আত্মার প্রতি কিছুটা রহম করার পরামর্শ দিলেন। তিনি তাদের কথা শুনে বললেন, আমি আবার আমার আত্মাকে কষ্ট দিলাম কোথায়? জীবন তো কিছু ইবাদতে প্রতিযোগিতার সময়ের সমষ্টির নাম। যদি এই প্রতিযোগিতার সময়ের কিছু অংশ কেউ হারিয়ে ফেলে, তবে আগামীকাল সে এই সময় আর ফিরে পাবে না। হে আমার ভাইয়েরা! আমি আল্লাহ তাআলার জন্য নামাজ আদায় করি, যা আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সামর্থ্যের তুলনায় কম। আমি তাঁর জন্য রোজা রাখি সারা জীবন, সেটাও আমার সাধ্যানুযায়ী। আর আমি ক্রন্দন করি সেই পরিমাণ, চোখ যে পরিমাণ অশ্রু প্রবাহিত করার সাধ্য রাখে। এরপর তিনি বললেন, আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যিনি তার গোলামকে কোনো কাজের আদেশ করে মনে মনে সে কাজে কসুর করুক—তা কামনা করবে?
নিশ্চয় নয়। সুতরাং আল্লাহ তাআলা আমাকে ইবাদতের আদেশ করেছেন, নিজের নফসকে দমন করার আদেশ করেছেন, অতএব আমার মুনিব আমাক যে কাজের আদেশ করেছেন আমি সেই কাজে কসুর ও ত্রুটি করব কেন?