📄 প্রতাপশালী খলিফার পাশে আজ কেউ নেই
১২৯. মুহাম্মাদ ইবনে সাইদ দারেমি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, খলিফা সুলায়মান ইবনে আব্দুল মালিক মাঝে-মধ্যেই আয়নায় নিজের মুখ দেখতেন এবং বলতেন, আমি তো এখনো যুবক বাদশাহ!
এভাবে তিনি নিজের যৌবন ও রাজত্বের মোহে বিভোর থাকতেন। একদিন হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হলেন এবং সেই জ্বরেই তিনি মারা গিয়েছিলেন।
জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর এই জ্বর তার গোটা পরিবারে ছড়িয়ে পড়ল। তার সভাসদবর্গও একে একে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাসঙ্গী হয়ে পড়ল।
এই অবস্থায় তিনি একদিন তার দাসীকে ডেকে ওজু করিয়ে দিতে বললেন। দাসী এসে তাকে ওজু করিয়ে দিতে লাগলেন। ওজু করাতে গিয়ে হঠাৎ তার হাত থেকে পানির পাত্রটা পড়ে গেল।
খলিফা অবাক হয়ে বললেন, কী হলো তোমার?
দাসী বলল, আমি জ্বরে আক্রান্ত। শরীর খুব দুর্বল।
খলিফা আরেকজন দাসীর নাম ধরে বললেন, তাহলে সে কোথায়?
'সেও জ্বরে পড়ে আছে।' দাসী বলল।
খলিফা আরেকজন দাসের নাম ধরে বললেন, সে কোথায়?
'সেও জ্বরে পড়ে আছে।' দাসী আবার জানাল।
এভাবে খলিফা বিভিন্নজনের নাম নিচ্ছিলেন আর দাসী একে একে সকলেই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী বলে তথ্য দিচ্ছিল।
তখন খলিফা বললেন, সমস্ত প্রশংসা সেই মহান সত্তার জন্য, যিনি তার ভূমিতে এমন খলিফা দান করেছেন, যাকে ওজু করানোর মতোও আশেপাশে কেউ নেই।
এরপর পাশে থাকা মামা খালেদ ইবনে কাকাকে লক্ষ্য করে বললেন: হে ওয়ালিদ! নিজের ওজুর পানি নিজেই কাছে নিয়ে নাও। কেননা এই জীবন কেবলই নিজেকে নিয়ে ভাবার স্থান এবং ক্ষণিকের উপভোগ মাত্র।
জবাবে ওয়ালিদ বললেন, তুমি তোমার নিজের জন্য জীবদ্দশায় সৎকর্ম করো। কেননা যুগ এমন, যা কখনো মানুষকে একত্রিত করে (আর স্বার্থ ফুরালে) বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
এই ঘটনায় আলোচ্য ঘটনায় মানবজাতির এক চরম অসহায় অবস্থার দৃশ্য ফুটে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, দুনিয়াতেই এমন অবস্থা যে, সবাই অসুস্থ হওয়ার কারণে প্রতাপশালী একজন খলিফার সেবা করার মতো কাছে কেউ নেই। প্রতাপশালী একজন খলিফা অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন, অথচ তাকে ওজুর সামান্য পানি এগিয়ে দেয়ার মতো কেউ নেই! দুনিয়াতেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে পরকালে যখন মহাবিপদ ঘনিয়ে আসবে, প্রত্যেক ব্যক্তি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ভয়ে ভীষণ আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় নিমজ্জিত থাকবে, তখন কী ভয়াবহ অবস্থা হবে? তখন কে কাকে সাহায্য করবে? এটা স্পষ্ট এবং কুরআনেরও ঘোষণা যে, কেউ কাউকে সাহায্য করবে না। তাই খলিফা নিজের জন্য আফসোস করছেন যে, আজ আমার মতো খলিফার পাশেও কেউ নেই! সবাই স্বার্থের জন্য একত্রিত হয়, স্বার্থ শেষ হয়ে গেলে এবং বিপদ টের পেলে একে একে কেটে পড়ে। তাই একমাত্র উপায় হলো নিজের আমল নিজে করে আল্লাহ তাআলার সামনে হাজির হওয়া। আর এর জন্য প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি, আত্মবিচার এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যথাযথভাবে কাজে লাগানো ও মূল্যায়ন করার।
📄 নফসের ওপর কঠোরতাই সবচেয়ে বড়ো ইবাদত
১৩০. আবু আইয়ুব হাজারি বলেন, আমাকে আবু সালেহ নামের একজন বলেছেন, আমি আমার কয়েকটি বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করলাম। আমি আমার নফসের প্রতি অত্যন্ত কঠোরতা আরোপ করলাম। আমার জীবনের অবনতির কথা চিন্তা করে আমার কান্না এলো। তখন আমি রাতের কিছু অংশ জাগরণ করলাম। আমি ওজু করলাম এবং রাতের নামাজ আদায় করলাম। এরপর নামাজের জায়গাতেই সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হলাম। হঠাৎ স্বপ্নে দেখলাম একজন অতিশয় সুদর্শন যুবতী হাজির। তার গায়ে সবুজ কাপড় আর হাতে একটি পেয়ালায় সাদা পানীয় জাতীয় কিছু। সে আমাকে পেয়ালাটি হাতে দিয়ে বলল, এগুলো পান করো। আমি পান করলাম। পান করে দেখলাম, মধুর মতো স্বাদযুক্ত। এটা আমার কাছে খুবই সুস্বাদু মনে হলো। আমার আগ্রহ দেখে সে আমাকে আরও পান করাচ্ছিল।
পান করার পর আমি বললাম, আমি কখনো এত সুস্বাদু বস্তুর স্বাদ আস্বাদন করিনি। সে বলত, এটা তোমারই বস্তু, তাই তুমি যদি তা বৃদ্ধি করো তবে তোমার পাথেয় বৃদ্ধি পাবে।
তখন সে বলল, স্বীয় নফসের ওপর তোমার কঠোরতা আরোপ হলো সবচেয়ে বড়ো ইবাদত। পরকাল নিয়ে ফিকির করা হলো উত্তম কাজ। আজকে তোমার চোখের অশ্রু পরকালে তোমার জন্য আনন্দের কারণ হবে। আর নামাজ তোমার জন্য ঢাল হবে।
সে আরও বলল, তুমি সম্ভ্রান্ত ও দাতা সত্তার ইবাদত করো। আর তুমি দুআয় বলো, হে প্রশস্ততা দানকারী! আপনার অনুগ্রহে আমাকে প্রশস্ততা দিন। যে কাজে আমাদের যোগ্যতা নেই, সেই কাজে আমাদেরকে যোগ্যতা দান করুন। আমরা যদিও মাগফিরাত লাভের যোগ্য নই, কিন্তু আপনি তো মাগফিরাতকারী ও ক্ষমাশীল, আপনার ক্ষমার গুণ দ্বারাই আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আমাদের জীবনকে সুন্দর করে দিন। আমাদের কাছে যা আছে তা অতিদ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে আপনার কাছে যা আছে তা কখনো নিঃশেষ হবে না। আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে কিন্তু আপনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর।
এরপর সেই যুবতী বলল, এবার তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
আমি তখন ঘুমিয়ে পড়লাম। এরপর যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন হাতে রেশমের একটি টুকরা দেখতে পেলাম। তাতে লিপিবদ্ধ ছিল, সেই মহান সত্তার পবিত্রতা, যিনি নেয়ামত দান করেন এবং যাঁর কৃতজ্ঞতা পোষণ করা হয়। আর তাদেরকেও তিনি দান করেন, যারা তাঁর অকৃতজ্ঞতা করে। হে বনি আদম! তোমরা কতই নির্বোধ! তোমরা শত্রুর আনুগত্য করো আর তোমার রিজিকদাতার নাফরমানি করো! হে নির্বোধ! গাফলতের নিদ্রা ত্যাগ করে উঠে পড়ো। হে বোকা! দুনিয়ার সবচেয়ে বড়ো ব্যবসায়ী মূলধন হলো তাকওয়া।
আবু সালেহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। আর অবাক ব্যাপার হলো, তখনও আমার হাতে সেই কাগজটি মুষ্টিবদ্ধ ছিল।
📄 হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহকে স্বপ্নে দর্শন ও জিজ্ঞাসা
১৩১. আবু আব্দুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ তার পিতার সূত্রে বলেন, আমি হাম্মাদ ইবনে সালামা রাহিমাহুল্লাহকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহ তাআলা আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন?
তিনি জবাবে বললেন, দয়ার আচরণ করেছেন। আর আল্লাহ বলেছেন, দুনিয়ায় তুমি তোমার আত্মাকে সংকুচিত করেছ। সুতরাং আজ তোমাকে সুদীর্ঘ আরাম দান করা হলো। দুনিয়ায় ইবাদতে ক্লান্তদের জন্য কতই-না সুন্দর আরামদায়ক ব্যবস্থা!
📄 নফসকে অনুগত করলে শাহাদত অর্জনের সুযোগ
১৩২. সাফওয়ান ইবনে মুহরিজ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমার নফস যদি আমার আনুগত্য করত, তবে আমি আমার শাহাদতের স্থান দেখতে সক্ষম হতাম।
অর্থাৎ মানুষের পরকালীন উন্নতির পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হলো তার কুপ্রবৃত্তি। আমরা দুনিয়ার সাফল্য অর্জনের জন্য নানা পরিকল্পনা করে থাকি, সাফল্য অর্জনের সহায়ক বিষয়গুলো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরি আর বাধা ও প্রতিবন্ধক বিষয়গুলো যত্নের সঙ্গে এড়িয়ে চলি এবং এভাবেই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছার চেষ্টা করি। ঠিক তদ্রূপ আমাদের পরকালীন সাফল্য অর্জনের জন্যও আমাদের পথের সবচেয়ে বড়ো বাধা কী—তা নিরূপণ করতে হবে এবং তা দমন করতে হবে। আর কুরআন- হাদিস ও সালফে সালেহিনের বিবরণ অনুযায়ী মানুষের পরকালীন উন্নতির পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হলো শয়তান ও তার কুপ্রবৃত্তি। তাই এই দুটি অপশক্তিকে দমন করতে পারলেই মানুষ তার চিরকালীন শান্তির ঠিকানায় সহজে পৌঁছতে সক্ষম হবে। সাফওয়ান ইবনে মুহরিজ রাহিমাহুল্লাহ আলোচ্য বক্তব্যে এ কথাই তুলে ধরেছেন।