📄 নিজেকে নিয়ে ক্রন্দন করা উচিত
১০৪. জাকারিয়া ইবনে আবু খালেদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জনৈক ব্যক্তি বলেন, আমি জনৈক বুজুর্গকে তার ইবাদতগাহে এই কবিতা আবৃত্তি করতে শুনলাম :
لِنَفْسِي أَبْكِي لَسْتُ أَبْكِي لِغَيْرِهَا لِنَفْسِي فِي نَفْسِي عَنِ النَّاسِ شَاغِلُ
'আমি নিজের নফসের জন্য ক্রন্দন করি, আমি অন্যের নফসের জন্য ক্রন্দন করি না।'
আমি মানুষকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেয়ে নিজেকে নিয়েই সদা ব্যস্ত থাকি।
জীবনে সাফল্য লাভের প্রধান চাবিকাঠিই হলো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, নিজের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করা ও অন্যের দোষত্রুটির ব্যাপারে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যে যত নিজের দোষত্রুটির অনুসন্ধানী হবে, তার জীবন তত স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও বিশুদ্ধ হবে। এর বিপরীত যারা অন্যের দোষ নিয়ে পড়ে থাকবে, সে নিজের দোষ দেখা ও তা থেকে মুক্তি লাভের পথই খুঁজে পাবে না। ফলে না পারবে অন্যকে সংশোধন করতে, না পারবে নিজের জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে। ফলে সে এক অন্ধকার জীবনে নিক্ষিপ্ত হবে। আর যখন দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করবে তখন চোখের সামনে পাহাড় পরিমাণ পাপরাশি দেখতে পাবে। তখন নিজেকে শোধরানোর জন্য আল্লাহর নিকট সময় প্রার্থনা করবে, কিন্তু সেই সময় আল্লাহ তাআলা কাউকেই দেন না। তাই জীবনের সন্ধ্যাবেলায় ভালো কিছু করার প্রত্যাশা না করে, জীবনের ভরদুপুরে ভালো কাজ করা চাই। আর ভালো কাজের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের দোষ-ত্রুটি ও অপূর্ণতা নিরূপণ করে আত্মশুদ্ধিতে নিমগ্ন হওয়া ও পরের দোষত্রুটি অনুসন্ধান থেকে নিবৃত্ত হওয়া।
📄 নিজের নফসকে সন্তুষ্ট করাতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি
১০৫. ইবনে আবু শুমায়লা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জনৈক ব্যক্তি খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান রাহিমাহুল্লাহর দরবারে উপস্থিত হলেন, যিনি তুখোর মেধাবী ও আরবি সাহিত্যের পণ্ডিত বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। খলিফা তাকে বললেন, কিছু বলো।
জবাবে তিনি বললেন, কোন বিষয়ে কথা বলব? আমি জানি, বক্তা যে বিষয়েই কথা বলুক না কেন, এর দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে, প্রতিটি কথার হিসাব দিতে হবে। একমাত্র সেই কথা ব্যতীত, যা আল্লাহ তাআলার জন্য বলা হয়েছে।
তার কথা শুনে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান কাঁদলেন এবং বললেন, আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন। লোকেরা তো কেবল অপরকে উপদেশই দিতে জানে।
লোকটি বললেন: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، إِنَّ لِلنَّاسِ فِي الْقِيَامَةِ جَوْلَةً لَا يَنْجُو مِنْ غُصَصِ مَرَارَتِهَا وَمُعَايَنَةِ الرَّدَى فِيهَا إِلَّا مَنْ أَرْضَى اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِسَخَطِ نَفْسِهِ.
'হে আমিরুল মুমিনিন! কেয়ামত দিবসে মানুষের ভীষণ ছোটাছুটি করতে থাকবে। সেদিনের ভয়াবহ দুশ্চিন্তা ও ক্ষতি থেকে একমাত্র তারাই রক্ষা পাবেন, যারা নিজেদের নফসকে অসন্তুষ্ট করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করে দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন।'
কথাগুলো শুনে খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান রাহিমাহুল্লাহ আবার ক্রন্দন করলেন এবং বললেন: لَا جَرَمَ لَأَجْعَلَنَّ هَذِهِ الْكَلِمَاتِ مِثَالًا نُصْبَ عَيْنَيَّ مَا عِشْتُ أَبَدًا. 'তোমার এই কথাগুলো আমি আমার জীবদ্দশা পর্যন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে চোখের মণিকোঠায় লিখে রাখব।'
📄 মুমিনের জীবন বন্দির মতো
১০৬. হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুমিন-মাত্রই দুনিয়াতে কয়েদি ব্যক্তির মতো, যে নিজেকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার জন্য সদা সচেষ্ট। তাই সে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে ভালোভাবে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারে না।
১০৭. মুসা ইবনে জুহানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আউন ইবনে আব্দুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমাকে আমার বন্ধকের জন্য বন্দি করার আগে আমি কীভাবে নিজেকে তা থেকে ছাড়ানোর জন্য প্রচেষ্টায় নিয়োজিত না হয়ে থাকতে পারি?
অর্থাৎ মানুষ-মাত্রই আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনের আমানতের জিম্মাদারি নিয়ে দুনিয়ায় আগমন করেছে। আর জিম্মাদারি পালন না করলে সেভাবে ধৃত হতে হবে, যেভাবে কেউ ঋণ আদায় না করলে ধৃত হয়ে থাকে। তাই তিনি বলেছেন, জিম্মাদারি পালনে ত্রুটি করলে যেহেতু জাহান্নামের কয়েদি হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাই সেই কয়েদখানা থেকে মুক্তি লাভের চেষ্টা না করে আমরা কীভাবে থাকতে পারি?
📄 যৌবনকালের একটি উপদেশ
১০৮. আবু বকর ইবনে আইয়াশ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি যখন যুবক ছিলাম, তখন জনৈক ব্যক্তি আমাকে বললেন:
خَلَّصْ رَقَبَتَكَ مَا اسْتَطَعْتَ فِي الدُّنْيَا مِنْ رِقَّ الْآخِرَةِ فَإِنَّ أَسِيرَ الْآخِرَةِ غَيْرُ مَفْكُوكَ أَبَدًا.
'হে যুবক! দুনিয়ায় থাকতেই তুমি আখেরাতে বন্দি হওয়া থেকে বাঁচতে যথাসম্ভব চেষ্টা করে যাও। কেননা আখেরাতের বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করা খুব কঠিন।'
আবু বকর ইবনে আইয়াশ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আমার যৌবনকালে শ্রবণ করা এই অমূল্য উপদেশ-বাণী কখনই ভুলিনি। তাই নিজের নফসকে পরকালের বন্দিদশা থেকে মুক্ত রাখতে আজ আমি নিজেই তাকে বন্দি করে রেখেছি।