📄 উমর ইবনু আব্দুল আযিয রহ.-এর ক্রন্দন
৯৪. আতা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর ইবনে আব্দুল আযিয রহ. মৃত্যুবরণ করার পর আমি একবার তার স্ত্রী ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালেকের কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম, হে আব্দুল মালেকের কন্যা! আপনি আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে আব্দুল আযিয রহ. সম্পর্কে কিছু বলুন।
তিনি বললেন, হ্যাঁ। এটা তার সম্পর্কে কিছু বলার উপযুক্ত সময়। কারণ তিনি যদি জীবিত থাকতেন তাহলে কিছু বলতে পারতাম না।
এরপর তিনি বললেন, উমর ইবনে আব্দুল আযিয রহ. তার সময় ও দেহকে জনগণের জন্য ফারেগ করে নিয়েছিলেন। দিনের সারা দিন তিনি লোকদের জন্য ব্যয় করতেন। সন্ধ্যা নাগাদ রাষ্ট্রীয় সব কাজ শেষ না হলে রাতের বেলায় নিজের উপার্জনে ক্রয়কৃত তেলের বাতি চেয়ে নিয়ে তিনি সেই কাজ শেষ করতেন। এরপর রাতের দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতেন। এরপর হাঁটু গেড়ে বসতেন, দুই হাতের মাঝে মাথা ধরে বসতেন। তখন তার দুই চোখ বেয়ে গালে অবিরাম ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হতো। আর তিনি ভীষণ শব্দে চিৎকার করতেন। মাঝেমধ্যে আমি এত ভয় পেয়ে যেতাম যে, মনে হতে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন অথবা তার কলিজা ছিঁড়ে গেছে। এভাবে সারারাত করতে থাকতেন এবং সুবহে সাদিক হয়ে যেত।
এভাবে সারা রাত ক্রন্দন করতেন আর দিন শুরু করতেন রোজা দ্বারা। তখন আমি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতাম, হে আমিরুল মুমিনিন! গত রাতে আপনি এমন করেছেন কেন?
তিনি জবাবে বলতেন, তোমার জেনে কী হবে? তুমি তোমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকো আর আমাকে আমার মতো ব্যস্ত থাকতে দাও।
আমি বললাম, হয়তো জানতে পেরে আমিও উপদেশ গ্রহণ করতে পারতাম।
তিনি বললেন, তাহলে শোনো। আল্লাহ তাআলা আমাকে গোটা বিশ্বের মুসলমানদের দায়িত্ব দিয়েছেন। নারী-পুরুষ, সাদা-কালো, ছেলে-মেয়ে, শিশু-বৃদ্ধ, যুবক-যুবতী, ধনী-গরিব, সকলের দায়িত্ব দান করেছেন। কেউ আমার দায়িত্বের অধীন থেকে বাইরে নয়। আমি এসব নাগরিকের অভাবী ব্যক্তিদের কথা মনে করি, ক্ষুধায় কাতর ফকির-মিসকিনের কথা মনে করি, স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন কারাবন্দি লোকগুলোর কথা মনে করি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের হরেক কিসিমের অভাবী ও বিপদে পতিত লোকদের কথা স্মরণ করি, তখন নিশ্চিত হই যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে এদের প্রত্যেকের হক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাদের পক্ষ হয়ে আমার কাছে এসবের জবাব চাইবেন। তখন আমার ভীষণ ভয় হয় যে, হয়তো সেদিন আল্লাহ তাআলার কাছে আমার কোনো ওজর গ্রহণযোগ্য হবে না এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আমার কোনো জবাবে সন্তুষ্ট হবেন না।
যখন এসব কথা ভাবি, তখন আমার খুবই ভয় হয়, নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে, অন্তর ভয়ে কাঁপতে থাকে। আর আমি যতই এসব নিয়ে ভাবি, ততই ভয় ও আতঙ্ক বৃদ্ধি পায়। সুতরাং তুমি এবার এসব কথা থেকে ইচ্ছা করলে উপদেশ গ্রহণ করো অথবা আমাকে আমার মতো ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করো।
📄 নিজেকে হত্যা করা
৯৫. ফুজায়েল ইবনে ইয়াজ রাহিমাহুল্লাহ কুরআনের নিম্নের আয়াত: وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ. 'তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না।'-এর ব্যাখ্যায় বলতেন, তোমরা নিজেদেরকে গাফেল রেখো না। এরপর তিনি বলতেন: 'যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে গাফেল হয়, সে নিজেকেই ধ্বংস ও হত্যা করে।' বস্তুত আমরা প্রতিনিয়ত নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করে চলেছি, অথচ দোষারোপ করছি অন্যদেরকে। তাই নিজের ইহকালীন ও পরকালীন ক্ষতি থেকে বাঁচতে সর্বপ্রথম মূল ও প্রকৃত শত্রু নির্ণয় করতে হবে। আর বুদ্ধিমান মাত্রই বুঝতে পারেন, নিজের কুপ্রবৃত্তিই হলো মানুষের প্রথম ও প্রধান শত্রু। তাই ঘরের শত্রু ঘরে রেখে বাইরের দুর্বল শত্রুর পিছু ধাওয়া না করে, ঘরের শত্রুকে আগে শায়েস্তা করতে হবে।
📄 জিয়াজুনের ক্ষতি করা থেকে বাঁচুন
৯৬. সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সালফে সালেহিনদের কোনো একজন তার বন্ধুবান্ধবদের কারও সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করে বললেন, হে ভাই! আল্লাহকে ভয় করো এবং যাকে তুমি মহব্বত করো যদি তার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে চাও, তবে বিরত থাকো।
একজন ব্যক্তি তাকে বললেন, কেউ কি নিজের মহব্বতের মানুষের ক্ষতি করে? এটা তো কল্পনাতীত ব্যাপার!
তিনি জবাবে বললেন, হ্যাঁ। তোমার প্রাণ হলো তোমার সবচেয়ে প্রিয় সত্তা। তুমি যদি আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করো, তবে তুমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিরই সর্বনাশ ও ক্ষতি করলে। সুতরাং এভাবে মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তির ক্ষতিসাধন করে থাকে।
📄 সম্মানিত ও নিকৃষ্ট আত্মা
৯৭. ইয়াহইয়া ইবনে আবু কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আগের যুগে লোকদের মধ্যে এরূপ একটি কথার প্রচলন ছিল : 'আল্লাহর আনুগত্যকারী আত্মার চেয়ে সম্মানিত প্রিয় আর কোনো আত্মা নেই এবং আল্লাহর নাফরমানি করার মতো নিকৃষ্ট আত্মার চেয়ে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট আর কোনো আত্মা নেই।'