📄 আমলের চেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি
৭৪. সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমের ইবনে আব্দুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আল্লাহর কসম, আমরা আমলের চেষ্টা অব্যাহত রেখেই যাব। যদি নাজাত পেয়ে যাই, তবে তো তা আল্লাহ তাআলার রহমতেই পাব। আর যদি (আল্লাহ না করুন) এর ব্যতিক্রম হয়, তথাপি নফসের শাসন থেকে আমি পিছপা হব না।
۷۵. আহমদ ইবনে আব্বাস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বসরার আবদে কায়সের জনৈক ব্যক্তির প্রশংসা করতেন এ কারণে যে, তিনি কবিতার মাধ্যমে বলতেন:
'আমি আমার আত্মার বিনিময়ে আমার প্রভুর সঙ্গে সওদা করি।
সৃষ্টিজগতে আত্মার বিনিময়ে আল্লাহ ছাড়া মূল্য দেয়ার কেউ নেই।
আমি যদি আত্মাকে দুনিয়ার কোনো বস্তুর মোকাবিলায় সওদা করি তা হবে এমন নির্বুদ্ধিতা, যার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।
যদি দুনিয়ার কোনো বস্তু অর্জনের জন্য আমার প্রাণ চলে যায় তবে তো আমার প্রাণও যায়, আর মূল্যও হাতছাড়া হয়ে যায়।'
📄 জীবনের পাই পাই হিসাব
৭۶. তাওবা ইবনে সামতাহ নামক বুজুর্গ রিক্কা নগরীতে বসবাস করতেন। তিনি নফসের প্রতি কঠোর একজন ব্যক্তি ছিলেন। জীবনের পাই পাই হিসাব করতেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ষাট বছর। তিনি ষাট বছরকে দিন দ্বারা ভাগ করে দেখলেন, বয়স হয়েছে ২১৯১৫ দিন! তিনি এই হিসাব করে চিৎকার দিয়ে উঠলেন এবং বললেন, হায় আফসোস! এতগুলো দিন অতিবাহিত হলো, তুমি তোমার রবের সঙ্গে ২১৯১৫টি পাপ নিয়ে সাক্ষাৎ করলে! প্রতিদিন তুমি দশটি করে পাপে লিপ্ত হলে!
এভাবে পাপের কথাগুলো স্মরণ করে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। এরপর আর জ্ঞান ফিরে পেলেন না, মৃত্যুবরণ করলেন। তখন অদৃশ্য থেকে একটি আওয়াজ ভেসে এলো, হে জান্নাতুল ফিরদাউসের দিকে যাত্রাকারী! তোমার যাত্রা শুভ হোক।
ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ এই ঘটনা উল্লেখ করার পর লেখেন, এভাবেই প্রতিটি মানুষের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব করা প্রয়োজন। পাপের জন্য প্রতি মুহূর্ত অন্তর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হিসাব করা উচিত। যদি মানুষের প্রতিটি পাপের মোকাবিলায় তার ঘরে একটি করে ক্ষুদে কণা নিক্ষেপ করা হতো, তাহলে তার ঘর অতি অল্প সময়েই ভরাট হয়ে যেত। কিন্তু মানুষ এভাবে নিজেদের পাপের হিসাব করে না। পাপ সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন। অথচ মানুষ তার নিজের পাপের হিসাব না করলেও সঙ্গে থাকা দুই ফেরেশতা ঠিকই হিসাব করে রাখছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَحْصَاهُ اللَّهُ وَنَسُوهُ.
'আল্লাহ তাআলা বান্দাদের পাপ সংরক্ষণ করে রাখেন। কিন্তু তারা নিজেরা ভুলে যায়।'
টিকাঃ
২৯. সুরা মুজাদালাহ: ৬।
📄 জাহান্নামের কথা স্মরণে মরণ
৭۷. বুখতারি ইবনে হারেসা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি একবার জনৈক আবেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তার সামনে তখন আগুন প্রজ্জ্বলিত হচ্ছিল। আগুনের লেলিহান শিখা দেখে তিনি নিজের আত্মাকে তিরস্কার করতে লাগলেন এবং অবিরাম তিরস্কার করতে লাগলেন। এরূপ করতে করতে তিনি জাহান্নামের ভয়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করলেন।
এটাই প্রকৃত মুমিনের আলামত। কেননা আল্লাহ তাআলার আজাবের বিষয় দেখে ভয় করা, নেয়ামত দেখে প্রফুল্ল হওয়া এবং ভালো কাজে উৎসাহবোধ করা ঈমান তরতাজা থাকার আলামত। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করার আদেশ করেছেন। গবেষণা করার অর্থই তো হলো আল্লাহর কুদরত সম্পর্কে অবগত হয়ে তাঁর কুদরতের কদমে লুটে পড়া, অতীতের ত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা এবং ইবাদতের দিকে মনোনিবেশ করা। এই বুজুর্গ সঠিক পথেই পরিচালিত হয়েছেন। দুনিয়ার সাধারণ আগুনের মধ্যেও কোনো মানুষের সামান্য সময় অতিবাহিত করাই যেখানে অসম্ভব, সেখানে জাহান্নামের আগুনে মানুষ বাস করবে কীভাবে? দুনিয়ার আগুনকে তিন হাজার বছর প্রজ্জ্বলিত করার পর যে ভয়ংকর রূপ ও ভয়াবহ দাহ্য ক্ষমতা অর্জন করেছে, সেটাই হলো জাহান্নামের আগুন! সেটা কত শত কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপমাত্রাযুক্ত হতে পারে তা কোনো মানুষের পক্ষে অনুমান করা অসম্ভব। তাই বুজুর্গানে কেরাম যখন দুনিয়ার আগুনের সামনে দাঁড়াতেন তখন পরকালের জাহান্নামের আগুনের ভয়াবহ চিত্র তাদের সামনে ভেসে উঠত। এতে তারা প্রকম্পিত হয়ে উঠতেন, নিজের কসুর ও পাপের কথা মনে করে শিউরে উঠতেন। পরিণামে কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করতেন। এই ভয় নিয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেন, তাদের আর জাহান্নামের ভয় কীসে?
📄 মুমিন জাগতিক সম্মান বা লাঞ্ছনা কোনটার পরোয়া করে না
৭৮. হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুমিন ব্যক্তি দুনিয়ায় একজন অস্থায়ী মুসাফিরের মতো। সে দুনিয়ার সম্মান অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতাও করবে না, আবার অসম্মানিত হলে তাতেও কোনো পরোয়াও করবে না। মানুষের অবস্থা এক রকম হবে। আর তার নিজের আরেক অবস্থা থাকবে। মানুষ তার থেকে নিরাপদ থাকবে আর তার আত্মাকে সে ইবাদতে ব্যস্ত রাখবে।