📄 বিপদের সময় আত্মার পরীক্ষা
২০. আসওয়াদ ইবনে কুলসুম রাহিমাহুল্লাহ একজন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। রাস্তায় চলার সময় ডানেবামে তাকাতেন না, কোনো নারী হঠাৎ সামনে পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোজা পায়ের আগার দিকে তাকিয়ে পথ চলতেন। আর নারীরা রাস্তায় চলার সময় তাকে দেখতে পেলে একে অপরকে বলতেন, আরে ভয় নেই। ইনি হলেন আসওয়াদ ইবনে কুলসুম, তিনি কখনো নারীদের দিকে তাকান না।
তিনি একবার এক জিহাদে অংশগ্রহণ করলেন। জিহাদের তুমুল মুহূর্ত এগিয়ে এলে তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমার এই নফস স্বাভাবিক সময় বলে, তোমার সাক্ষাৎ চাই, সাক্ষাৎ চাই। তার দাবি যদি সত্য হয় তবে তার বাসনা পূরণ করে দাও। তোমার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দাও। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তবে তার অপ্রিয়তার মধ্যেই জোর করে হলেও তার বাসনা পূরণ করে দাও। সুতরাং উভয় অবস্থাতেই তাকে তোমার রাস্তায় কতল হওয়ার তাওফিক দাও। আর আমার দেহের গোশতকে হিংস্র প্রাণী ও পক্ষীকুলকে দান করে দাও।
এই প্রতিজ্ঞা করে তিনি ওই মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে রওনা হলেন। মুজাহিদ বাহিনী চলতে চলতে একটি ভঙ্গুর দেয়ালের পাশে উপনীত হলেন। এদিকে শত্রুবাহিনীও এসে হাজির হলো এবং দেয়ালের ভঙ্গুর অংশে তার অবস্থান গ্রহণ করল। তখন আসওয়াদ ইবনে কুলসুম রাহিমাহুল্লাহ নিজের অশ্ব থেকে নেমে পড়লেন এবং তার পিঠে আঘাত করলেন। ফলে অশ্বটি ছুটে দূরে চলে গেল। এরপর তিনি বাগানের একটি নালাতে নেমে ওজু করলেন। ওজু করে নামাজ আদায় করলেন। শত্রুবাহিনীর লোকেরা তার নামাজ পড়া দেখে বলল, এটা হলো মুসলমানদের ইবাদত।
যাইহোক, তিনি নামাজ থেকে ফারেগ হয়ে শত্রুর মুখোমুখি হলেন এবং অবিরাম যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়ে গেলেন। তার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। শত্রুবাহিনীর অসংখ্য ঘোড়া তার দেহকে পিষ্ট ও পদদলিত করল। তিনি যেভাবে দুআ করেছিলেন, সেভাবেই শহিদ হয়ে গেলেন। তার ভাইকে বলা হলো, আপনি আপনার ভাইয়ের লাশ দেখবেন না যে তার কী অবস্থা হয়েছে?
জবাবে তিনি বললেন, আমার ভাই নিজের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে যে ধরনের শাহাদত কামনা করেছিলেন, তিনি তা কবুল করিয়ে নিয়েছেন, সুতরাং তাতে আমি ব্যঘাত ঘটাতে চাই না।
📄 পলায়নপর আত্মাকে আটকে রাখা
২১. আবু উমাইয়া গিফারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি এক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। শত্রুবাহিনী সম্মুখে চলে এলে বাহিনীর মধ্যে চিৎকার ও চ্যাঁচামেচি শুরু হলো এবং মুসলিম বাহিনী নিজ বাহিনীর মধ্যে দৌড়ে ফিরে আসতে লাগল। আর সেদিন প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসও ছিল। আমার সামনে একজন ব্যক্তিকে দেখলাম তিনি অনঢ় রয়েছেন। আমার অশ্বের মাথা তার অশ্বের একেবারে লেজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যখন অন্যদের মধ্যে প্রচণ্ড ছোটাছুটি চলছিল তিনি তখন তার নিজের আত্মাকে সম্বোধন করে বলছিলেন : হে নফস! এ রকম আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধে তুমি অংশ নিয়েছিলে না? সেদিন যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তুমি আমাকে বলেছিলে, বাড়িতে আমার স্ত্রী-সন্তান ও মা-বাবা রয়েছে? চলো ফিরে যাই। সেদিন আমি তোমার কথা মেনে নিয়েছিলাম, তোমার আনুগত্য করে ঘরে ফিরে গিয়েছিলাম। এরপর আরেকটি যুদ্ধে এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। সেদিনও তুমি আমাকে আমার পরিবারের কথা বলে ময়দান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলে। আমি সেদিনও তোমার আনুগত্য করেছিলাম। পূর্বের দুইদিন আমি তোমার আনুগত্য করেছি। কিন্তু আজ তোমাকে আমার অনুগত করব। আজ তোমাকে আমি পালাতে দেব না। আর আমি আজ সম্মুখে থেকে শত্রুর ওপর প্রচণ্ড হামলা করব। তোমাকে পিছপা হতে দেব না।
আবু উমাইয়া গিফারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি এভাবে প্রতিজ্ঞা করলে আমি নিয়ত করলাম, আমি তার অনুসরণ করব। তিনি কী করেন এবং তার প্রতিজ্ঞা কীভাবে বাস্তবায়ন করেন, তা দেখার আগ্রহ সৃষ্টি হলো আমার মধ্যে। তাই আমি তার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখলাম।
এরপর প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু হলো। শত্রুবাহিনী মুসলিমবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি লক্ষ করে দেখলাম, এই লোকটি সম্মুখ বাহিনীতে রয়েছেন এবং শত্রুর ওপর বীরবিক্রমে আক্রমণ করে চলেছেন। এভাবে যতবার মুসলিম বাহিনীর ওপর শত্রুপক্ষের আক্রমণ হলো, ততবার তিনি সম্মুখে থেকে শত্রুর মোকাবিলা করে বীরবিক্রমে শত্রুকে প্রতিহত করতে থাকলেন। এভাবে লড়তে লড়তে শেষ পর্যন্ত তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং শহিদ হয়ে গেলেন। আমি তার ও তার বাহন গুনে দেখলাম, ষাটটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।