📘 আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি > 📄 ইউসুফ আলাইহিস সালামকে জিবরিল আলাইহিস সালামের সতর্কীকরণ

📄 ইউসুফ আলাইহিস সালামকে জিবরিল আলাইহিস সালামের সতর্কীকরণ


১৮. আবু সালেহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইউসুফ আলাইহিস সালামকে জেলখানা থেকে মুক্তি লাভের সুসংবাদ দেয়া হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা করলেন না। বরং যেসব নারী তাঁকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলেন তিনি তাদের সকলকে আগে সমবেত করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করার আবেদন জানালেন। সে অনুযায়ী জুলায়খা ও তার সঙ্গে যেসব নারী ইউসুফ আলাইহিস সালামকে খারাপ কাজে প্ররোচিত করেছিল, তাদেরকে সমবেত করা হলো। তখন তারা তাদের দোষ স্বীকার করল এবং ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে নির্দোষ, তাও অকপটে স্বীকার করে নিল। এটা প্রমাণিত হওয়ার পর ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন:
ذَلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ.
'এটি (নির্দেশ প্রমাণ করার এই ব্যবস্থা) এ জন্য যে, যাতে সে জানতে পারে, আমি তার অনুপস্থিতিতে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি।'
বস্তুত এ কথাটি বলে তিনি নিজের নির্দোষ হওয়ার দাবি করলেন এবং তা প্রকাশ করতে থাকলেন। যদিও তার এই পদক্ষেপটি বৈধ কাজ ছিল এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার প্রয়োজনও ছিল, কিন্তু এতে যেন নিজের নফসের পরিশুদ্ধির বিষয়টিই প্রবল হিসেবে প্রকাশ না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য জিবরিল আলাইহিস সালাম তাঁকে সতর্ক করেছিলেন।

টিকাঃ
২৫. সুরা ইউসুফ: ৫২।

📘 আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি > 📄 রণাঙ্গণে আবু তালহা রাযি.-এর নফসকে সম্বোধন

📄 রণাঙ্গণে আবু তালহা রাযি.-এর নফসকে সম্বোধন


১৯. হাকাম ইবনে আব্দুস সালাম আনসারি বলেন, যখন জাফর ইবনে আবু তালেব রাযি. শহিদ হচ্ছিলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাযি. ছিলেন বাহিনীর অপর প্রান্তরে। লোকেরা তখন তাঁকে হে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বলে ডাকতে শুরু করল। তাঁর হাতে সে সময় একটি পাঁজরের হাড় এবং সঙ্গে দুর্বল একটি উট ছিল। এর আগে তিনি তিনদিন ধরে খাবারের স্বাদও চেখে দেখেননি। লোকদের ডাক শুনে তিনি হাত থেকে পাঁজরের হাড্ডিটা ফেলে দিলেন এবং বলতে লাগলেন, হে আত্মা! তুমি এখনো দুনিয়ার সঙ্গেই রয়েছ? এরপর তিনি রনাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং যুদ্ধ করতে করতে একটি আঙুল জখম হয়ে গেল। তখন তিনি কাব্যের আকারে বললেন:
'হে আঙুল! তুমি তো একটা আঙুলই মাত্র, যা আল্লাহর রাস্তায় আহত হয়ে রক্তপাত করেছে।
হে আত্মা! তুমি কি শাহাদতের মৃত্যুর বাসনা করো না? এটা হলো মৃত্যুর ঝরনাধারার প্রবহমান সময়।
যা তুমি আগে কামনা করতে তার সম্মুখীন হয়েছ। যদি শাহাদতের মৃত্যু কামনা করো তবেই তুমি সুপথপ্রাপ্ত হবে। আর যদি তুমি এই সুযোগ থেকে পিছপা হও, তবে তুমি দুর্ভাগা হয়ে যাবে।

এরপর তিনি নিজের নফসকে সম্বোধন করে বললেন, হে নফস! তুমি এখনো কীসের বাসনা করো? তুমি কি এখনো অমুক নারীর আগ্রহ নিয়ে আছ? তাহলে যাও, সে তিন তালাক। আর যদি তুমি অমুক অমুক গোলাম এবং বাগানের প্রতি আগ্রহী থাকার কারণে মৃত্যুকে ভয় করে থাকো, তবে শুনে রাখো, এসব সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিলাম। হে নফস! কেন তুমি জান্নাতকে অপছন্দ করছ! আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, তোমাকে অবশ্যই জান্নাতে যেতে হবে। চাই খুশিমনে জান্নাতে যাবে, অথবা জোরপূর্বক ‘তোমাকে সেখানে নেয়া হবে।'

এভাবে তিনি নফসকে সংশোধন করেছেন, তাকে অনুগত ও বাধ্য করেছেন এবং আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করেছেন।

📘 আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি > 📄 বিপদের সময় আত্মার পরীক্ষা

📄 বিপদের সময় আত্মার পরীক্ষা


২০. আসওয়াদ ইবনে কুলসুম রাহিমাহুল্লাহ একজন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। রাস্তায় চলার সময় ডানেবামে তাকাতেন না, কোনো নারী হঠাৎ সামনে পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোজা পায়ের আগার দিকে তাকিয়ে পথ চলতেন। আর নারীরা রাস্তায় চলার সময় তাকে দেখতে পেলে একে অপরকে বলতেন, আরে ভয় নেই। ইনি হলেন আসওয়াদ ইবনে কুলসুম, তিনি কখনো নারীদের দিকে তাকান না।
তিনি একবার এক জিহাদে অংশগ্রহণ করলেন। জিহাদের তুমুল মুহূর্ত এগিয়ে এলে তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমার এই নফস স্বাভাবিক সময় বলে, তোমার সাক্ষাৎ চাই, সাক্ষাৎ চাই। তার দাবি যদি সত্য হয় তবে তার বাসনা পূরণ করে দাও। তোমার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দাও। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তবে তার অপ্রিয়তার মধ্যেই জোর করে হলেও তার বাসনা পূরণ করে দাও। সুতরাং উভয় অবস্থাতেই তাকে তোমার রাস্তায় কতল হওয়ার তাওফিক দাও। আর আমার দেহের গোশতকে হিংস্র প্রাণী ও পক্ষীকুলকে দান করে দাও।
এই প্রতিজ্ঞা করে তিনি ওই মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে রওনা হলেন। মুজাহিদ বাহিনী চলতে চলতে একটি ভঙ্গুর দেয়ালের পাশে উপনীত হলেন। এদিকে শত্রুবাহিনীও এসে হাজির হলো এবং দেয়ালের ভঙ্গুর অংশে তার অবস্থান গ্রহণ করল। তখন আসওয়াদ ইবনে কুলসুম রাহিমাহুল্লাহ নিজের অশ্ব থেকে নেমে পড়লেন এবং তার পিঠে আঘাত করলেন। ফলে অশ্বটি ছুটে দূরে চলে গেল। এরপর তিনি বাগানের একটি নালাতে নেমে ওজু করলেন। ওজু করে নামাজ আদায় করলেন। শত্রুবাহিনীর লোকেরা তার নামাজ পড়া দেখে বলল, এটা হলো মুসলমানদের ইবাদত।
যাইহোক, তিনি নামাজ থেকে ফারেগ হয়ে শত্রুর মুখোমুখি হলেন এবং অবিরাম যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়ে গেলেন। তার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। শত্রুবাহিনীর অসংখ্য ঘোড়া তার দেহকে পিষ্ট ও পদদলিত করল। তিনি যেভাবে দুআ করেছিলেন, সেভাবেই শহিদ হয়ে গেলেন। তার ভাইকে বলা হলো, আপনি আপনার ভাইয়ের লাশ দেখবেন না যে তার কী অবস্থা হয়েছে?
জবাবে তিনি বললেন, আমার ভাই নিজের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে যে ধরনের শাহাদত কামনা করেছিলেন, তিনি তা কবুল করিয়ে নিয়েছেন, সুতরাং তাতে আমি ব্যঘাত ঘটাতে চাই না।

📘 আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি > 📄 পলায়নপর আত্মাকে আটকে রাখা

📄 পলায়নপর আত্মাকে আটকে রাখা


২১. আবু উমাইয়া গিফারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি এক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। শত্রুবাহিনী সম্মুখে চলে এলে বাহিনীর মধ্যে চিৎকার ও চ্যাঁচামেচি শুরু হলো এবং মুসলিম বাহিনী নিজ বাহিনীর মধ্যে দৌড়ে ফিরে আসতে লাগল। আর সেদিন প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসও ছিল। আমার সামনে একজন ব্যক্তিকে দেখলাম তিনি অনঢ় রয়েছেন। আমার অশ্বের মাথা তার অশ্বের একেবারে লেজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যখন অন্যদের মধ্যে প্রচণ্ড ছোটাছুটি চলছিল তিনি তখন তার নিজের আত্মাকে সম্বোধন করে বলছিলেন : হে নফস! এ রকম আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধে তুমি অংশ নিয়েছিলে না? সেদিন যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তুমি আমাকে বলেছিলে, বাড়িতে আমার স্ত্রী-সন্তান ও মা-বাবা রয়েছে? চলো ফিরে যাই। সেদিন আমি তোমার কথা মেনে নিয়েছিলাম, তোমার আনুগত্য করে ঘরে ফিরে গিয়েছিলাম। এরপর আরেকটি যুদ্ধে এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। সেদিনও তুমি আমাকে আমার পরিবারের কথা বলে ময়দান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলে। আমি সেদিনও তোমার আনুগত্য করেছিলাম। পূর্বের দুইদিন আমি তোমার আনুগত্য করেছি। কিন্তু আজ তোমাকে আমার অনুগত করব। আজ তোমাকে আমি পালাতে দেব না। আর আমি আজ সম্মুখে থেকে শত্রুর ওপর প্রচণ্ড হামলা করব। তোমাকে পিছপা হতে দেব না।

আবু উমাইয়া গিফারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি এভাবে প্রতিজ্ঞা করলে আমি নিয়ত করলাম, আমি তার অনুসরণ করব। তিনি কী করেন এবং তার প্রতিজ্ঞা কীভাবে বাস্তবায়ন করেন, তা দেখার আগ্রহ সৃষ্টি হলো আমার মধ্যে। তাই আমি তার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখলাম।

এরপর প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু হলো। শত্রুবাহিনী মুসলিমবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি লক্ষ করে দেখলাম, এই লোকটি সম্মুখ বাহিনীতে রয়েছেন এবং শত্রুর ওপর বীরবিক্রমে আক্রমণ করে চলেছেন। এভাবে যতবার মুসলিম বাহিনীর ওপর শত্রুপক্ষের আক্রমণ হলো, ততবার তিনি সম্মুখে থেকে শত্রুর মোকাবিলা করে বীরবিক্রমে শত্রুকে প্রতিহত করতে থাকলেন। এভাবে লড়তে লড়তে শেষ পর্যন্ত তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং শহিদ হয়ে গেলেন। আমি তার ও তার বাহন গুনে দেখলাম, ষাটটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00