📄 আনাস ইবনে নজর রাযি.
আরেক বিখ্যাত সাহাবি ও উহুদের শহিদ হজরত আনাস ইবনে নজর রাযি.-এর ঘটনা দেখুন:
আনাস ইবনে মালেক রাযি. বলেন, আমার চাচা আনাস ইবনু নজর রাযি. বদরের যুদ্ধে শরিক হতে পারেননি, অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! মুশরিকদের সঙ্গে আপনি প্রথম যে যুদ্ধ করেছেন, আমি সে সময় অনুপস্থিত ছিলাম। আল্লাহ যদি আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে শরিক হবার সুযোগ দেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ দেখতে পাবেন যে, আমি কী করি। অতঃপর উহুদের যুদ্ধে মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আনাস ইবনু নজর রাযি. বলেছিলেন, আল্লাহ! এঁরা অর্থাৎ তাঁর সাহাবিরা যা করেছেন, তার সম্বন্ধে আপনার নিকট ওজর পেশ করছি এবং এরা অর্থাৎ মুশরিকরা যা করেছে তা থেকে আমি নিজেকে সম্পর্কহীন বলে ঘোষণা করছি। অতঃপর তিনি এগিয়ে গেলেন এবং সাদ ইবনু মুআজের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, হে সাদ ইবনু মুআজ! নজরের রবের কসম, উহুদের দিক থেকে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি। সাদ রাযি. বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি যা করেছেন, আমি তা করতে পারিনি। আনাস রাযি. বলেন, আমরা তাঁকে এমতাবস্থায় পেয়েছি যে, তাঁর দেহে আশিটিরও অধিক তলোয়ার, বর্শা ও তিরের জখম রয়েছে। আমরা তাঁকে নিহত অবস্থায় পেলাম। মুশরিকরা তাঁর দেহ বিকৃত করে দিয়েছিল। তাঁর বোন ব্যতীত কেউ তাঁকে চিনতে পারেনি এবং বোন তাঁর আঙুলের ডগা দেখে চিনতে পেরেছিল।
দেখুন, সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমলের ত্রুটি মোচন করতেন? কোনো আমল ছুটে গেলে তার চেয়ে বড়ো আমল করে সেটা পুষিয়ে নিতেন। ছোটো আমলের কাফফারা আদায় করতেন বড়ো আমল দ্বারা। নিজের জীবনের চেয়ে মূল্যবান ও প্রিয় বস্তু মানুষের কাছে আর কী থাকতে পারে? সেই মহামূল্যবান জীবনই বিলিয়ে দিয়েছেন আগের একটি জিহাদে অংশগ্রহণ না করার ক্ষতিপূরণ হিসেবে! এটাকেই বলে আত্মবিচার। আত্মশাসন। এটাকেই বলে মুহাসাবাতুন নাফস।
এই কঠোর আত্মশাসনের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রশংসায় আয়াত নাজিল করেছিলেন। আনাস ইবন মালেক রাযি. বলেন, আমাদের ধারণা, কুরআনের এই আয়াতটি তাঁর এবং তাঁর মতো মুমিনদের সম্পর্কে নাজিল হয়েছে- 'মুমিনদের মধ্যে হতে কিছুসংখ্যক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে।'
টিকাঃ
২০. সহিহ বুখারি: ২৮০৫।
২১. সুরা আল-আহজাব: ২৩।
📄 আবু তালহা রাযি.
আবু তালহা রাযি.-এর কথা আমরা জানি। তিনি মহান সাহাবিগণের একজন। তিনি নবীজির অত্যন্ত প্রিয় একজন সাহাবি ছিলেন। একদিন নিজের বাগানে নামাজ আদায় করছিলেন তিনি। আর বাগানে হরেক রকমের গাছ থাকে। গাছে গাছে পাখি নাচানাচি করে, উড়াউড়ি করে। এই ডাল থেকে ওই ডালে যায়। বর্ণিল ও মনোরম পরিবেশে বাগানে বিচরণকারী ব্যক্তিদেরকে মুগ্ধ করে। আনন্দ দেয়। দূর করে ক্লান্তি। মনে স্বতঃস্ফূর্ততা আনে। বাগানে নামাজ আদায় করা অবস্থায় এমন একটি পাখির দিকে নজর পড়ল হজরত তালহা রাযি.-এর। সামান্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। দৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবারও নামাজে মনোনিবেশ করলেন। সম্পূর্ণ মনোযোগ বিনিয়োগ করলেন নামাজের মধ্যে। কিন্তু তবু তাঁর আফসোস যায় না। নামাজে দাঁড়িয়ে যেখানে প্রভুর সঙ্গে কথোপকথন হবে, মুনাজাত হবে, সেখানে একটি সামান্য পাখি এসে বাধা সৃষ্টি করল! নিজের নফসের ওপর ভেঙে পড়লেন তিনি। ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাকে শায়েস্তা করতে। বললেন, হে নফস! নামাজে দাঁড়িয়ে প্রভুর সঙ্গে মুনাজাতের এই প্রেমপূর্ণ সময়েও তুমি সামান্য একটি কলকাকলি দ্বারা প্রভাবিত হলে! হে নফস! এই তোমার প্রভু-সাধনা! ধ্যানমগ্নতা!
নিজেকে এভাবে শাসন করে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন, এই বাগানই আর রাখা যাবে না। যে বাগান আল্লাহ ও বান্দার ধ্যানমগ্নতার মধ্যে ব্যাঘাত ঘটায় সেটা রাখা ঠিকও হবে না। এ কথা বলে তিনি বাগানটি আল্লাহ তাআলার রাস্তায় দান করে দিলেন।
এই হলো আমাদের গৌরব, আমাদের হেদায়াতের বাতিঘর, আমাদের রাহবার সাহাবায়ে কেরাম, যাদের একটি ঘটনা আমাদের সারা জীবনের পাথেয়, তাদের একেকটি আত্মশুদ্ধির পদক্ষেপ, একেকজন আব্দুল কাদির জিলানি, জুনায়েদ বাগদাদির চেয়েও উপকারী। সুতরাং আবু তালহা রাযি.-এর মতো মহান ব্যক্তি যদি নিজেদের আত্মাকে এভাবে শাসন করার প্রয়োজন মনে করেন, তবে আমাদের মতো ব্যক্তিদের কীরূপ শাসন করা উচিত? আমাদের পাপী আত্মাগুলোকে কীভাবে কঠোর শাসন করে এদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা উচিত? এর জবাব যার যার কাছে। কারণ, মানুষ নিজে নিজের খবর বেশি জানে।