📄 উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.
এই উম্মতের দ্বিতীয় সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি হলেন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার পর যদি কেউ নবী হতেন তবে নিশ্চিতভাবে উমর রাযি.-ই নবী হতেন। উমর রাযি.-এর ইচ্ছা ও বাসনার অনুকূলে প্রায় ছয়টি আয়াত নাজিল হয়েছে। তিনি যে রাস্তায় হাঁটতেন শয়তান ভয়ে সেই রাস্তায় হাঁটত না। তিনিও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবাগণের একজন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার স্বপ্নে জান্নাত দেখলেন। আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণনা করেন:
'আমরা একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে বসা ছিলাম। হঠাৎ তিনি বললেন, আমি ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, আমি জান্নাতে অবস্থান করছি। আর একজন নারী একটি বালাখানার পাশে বসে ওজু করছে। আমি ফেরেশতাগণকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই বালাখানাটি কার? তারা বললেন, এটা উমর রাযি.-এর বালাখানা। তখন উমর রাযি.-এর আত্মমর্যাদার কথা আমার স্মরণ হলো, তাই বালাখানায় প্রবেশ না করেই চলে এলাম। এই কথা শুনে উমর রাযি. ক্রন্দন করতে লাগলেন এবং বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার ব্যাপারেও আমি গায়রত (আত্মমর্যাদা) দেখাতে পারি?!'
যে উমর রাযি.-কে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, যাঁর জন্য জান্নাতে বালাখানা প্রস্তুত অবস্থায় দেখেও এসেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সেই উমর রাযি. কিন্তু কখনো নিজের নফসের লাগাম নফসের হাতে ছেড়ে দেননি। নিজেকে কঠোরভাবে শাসনে রেখেছেন। নিজের নফসকে সম্বোধন করে মুনাফেক হয়ে যাওয়ার ভয় করেছেন। সাহাবাগণের মধ্যে হুযায়ফা রাযি.-কে নবীজি বিশেষ কিছু গোপন তথ্য দিয়ে রেখেছিলেন। এ জন্য তাঁকে 'সাহেবে সির' বা গোপন তথ্যের ভান্ডার বলা হতো। উমর রাযি. প্রায় সময় এই হুযায়ফা রাযি.-এর সঙ্গে খাতির করতেন এবং অনুনয় করে তাঁকে বলতেন, হে হুযায়ফা! আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, বলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমার কাছে আমার নাম মুনাফেকদের কাতারে উল্লেখ করেছেন? হুযায়ফা রাযি. বললেন, না।
আনাস ইবনে মালেক রাযি. বলেন, আমি একদিন একটি বাগানে প্রবেশ করলাম। উমর রাযি.-ও সেই বাগানে প্রবেশ করলেন। এরপর তিনি আড়ালে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, হে উমর! আমিরুল মুমিনিন! বাহ বাহ, হে ইবনুল খাত্তাব! তুমি হয় আল্লাহকে ভয় করো, নতুবা আল্লাহ তোমাকে আজাব দিবেন।
আরেকটি ঘটনা শুনুন, একবার উমর রাযি. ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। একজন লোক সে সময় কোনো এক বিষয়ে তাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। উমর রাযি. তাকে বললেন, খলিফা যখন মুক্ত থাকেন, তখন কি তোমরা আসতে পারো না? একথা বলে তিনি তাকে দোররা দিয়ে আঘাত করলেন। তখন লোকটি ভীষণ ব্যথিত ও চিন্তিত হয়ে চলে গেলেন।
লোকটি চলে যাওয়ার পর উমর রাযি.-এর মনে হলো, তিনি তার প্রতি জুলুম করেছেন। তাই তিনি তাকে ডাকালেন এবং তার হাতে দোররাটি তুলে দিয়ে বললেন, আমি তোমাকে যেভাবে প্রহার করেছি তুমিও আমাকে সেভাবে প্রহার করো। লোকটি প্রহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, আমি আল্লাহর ও আপনার জন্য আমার হক ছেড়ে দিয়েছি। উমর রাযি. বললেন, আমার জন্য নয়; বরং একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য হক ছেড়ে দিয়েছ কি-না সেটা বলো। লোকটি বললেন, ঠিক আছে, আমি একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য হক ছেড়ে দিলাম।
এরপর উমর রাযি. ঘরে ফিরে গেলেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর নিজের নফসকে সম্বোধন করে তিরস্কার করতে লাগলেন। নিজেকে সম্বোধন করে তিনি বললেন, হে উমর! তুমি অধম ও নিকৃষ্ট ছিলে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে মর্যাদা দান করেছেন। তুমি পথহারা ছিলে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। তুমি মর্যাদাহীন ছিলে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে মর্যাদা দান করেছেন। তোমাকে খলিফা বানিয়েছেন। আর এই সময় একজন ব্যক্তি জুলুম থেকে বাঁচার জন্য তোমার কাছে সাহায্য চাইল অথচ তুমি নিজেই তার ওপর জুলুম করলে! আগামীকাল যখন তোমার রবের সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হবে, তখন তুমি কী জবাব দেবে? তিনি এই ঘটনার পর নিজের নফসকে এভাবে শাসন ও তিরস্কার করতে লাগলেন যে, লোকেরা তাঁর খারাপ কিছু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করতে লাগলেন।
উমর রাযি.-এর আরও ঘটনা শুনুন। তিনি সারা দিন নবীজির দরবারে থাকতেন। নবীজির সাহচর্য ও সান্নিধ্য দ্বারা নিজের আমলনামাকে স্ফীত করতেন। নবীজির এক মুহূর্তে সাহচর্যের মূল্য তো জানেন? পৃথিবীর সমস্ত আমল একদিকে রাখুন, আর নবীজির সান্নিধ্য ও সোহবত একদিকে রাখুন। নবীজির ইন্তেকালের পর কত মানুষ কত আমল করেছেন, দিনরাত নফল ইবাদত-বন্দেগিতে কাটিয়েছেন। সাহাবাগণের মতোই অনেকে আমল করেছেন। বহু মানুষ আছেন, যাদের জীবনে ইচ্ছাকৃত কোনো কবিরা গোনাহ হয়েছে কি-না সেটা জানা যায় না। কিন্তু তারা কেউ কি সাহাবির মর্যাদা লাভ করেছেন! নবীজিকে যে ব্যক্তি মাত্র একটিবার দেখেছেন, তার মর্যাদার সমকক্ষ হতে পেরেছেন? পারেননি। এটাই হলো সাহাবির মর্যাদা। আর সাহাবিদের মধ্যে দ্বিতীয় শীর্ষে থাকা উমর রাযি. নিজেকে কীভাবে শাসন করতেন? সারা দিন ইবাদত-বন্দেগি তো করতেনই, রাতের বেলায় একটি দোররা নিয়ে বসতেন। পায়ের পাতায় তা দিয়ে আঘাত করতেন আর বলতেন, হে নফস! বলো, আজ সারা দিন কী কী আমল করেছ?
প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই করতে পারি। হে মিসকিন! তোমার নফস কি উমর রাযি.-এর নফসের চেয়ে শক্তিশালী? তোমার ঈমান কি উমর রাযি.-এর ঈমানের চেয়ে মজবুত? যদি তা না হয়, যদি তোমার ঈমান উমর রাযি.-এর ঈমানের হাজার ভাগের এক ভাগের সমানও শক্তিশালী না হয়ে থাকে, তবে উমর রাযি. যখন নিজেকে এভাবে শাসিয়েছেন, নিজের নফসের ওপর শাসনের ভার চাপিয়ে দিয়েছেন, নফসের গলায় শাসনের লাগাম ঝুলিয়ে দিয়েছেন, তাহলে আমরা কেন তা করছি না? আমরা কেন আমাদের নফসের ব্যাপারে এত উদাসীন? কেন আমরা নিজেদের নফসকে শাসন করছি না? কেননা তার মতো জীবনের হিসাব করে ভীত-প্রকম্পিত হচ্ছি না?
টিকাঃ
১৭. সহিহ বুখারি: ৩২৪২।
১৮. মুআত্তায়ে মালেক : ৩৬৩৮।
১৯. মানাকিবু উমল ইবনুল খাত্তাব লিল-জাওযি।
📄 আনাস ইবনে নজর রাযি.
আরেক বিখ্যাত সাহাবি ও উহুদের শহিদ হজরত আনাস ইবনে নজর রাযি.-এর ঘটনা দেখুন:
আনাস ইবনে মালেক রাযি. বলেন, আমার চাচা আনাস ইবনু নজর রাযি. বদরের যুদ্ধে শরিক হতে পারেননি, অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! মুশরিকদের সঙ্গে আপনি প্রথম যে যুদ্ধ করেছেন, আমি সে সময় অনুপস্থিত ছিলাম। আল্লাহ যদি আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে শরিক হবার সুযোগ দেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ দেখতে পাবেন যে, আমি কী করি। অতঃপর উহুদের যুদ্ধে মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আনাস ইবনু নজর রাযি. বলেছিলেন, আল্লাহ! এঁরা অর্থাৎ তাঁর সাহাবিরা যা করেছেন, তার সম্বন্ধে আপনার নিকট ওজর পেশ করছি এবং এরা অর্থাৎ মুশরিকরা যা করেছে তা থেকে আমি নিজেকে সম্পর্কহীন বলে ঘোষণা করছি। অতঃপর তিনি এগিয়ে গেলেন এবং সাদ ইবনু মুআজের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, হে সাদ ইবনু মুআজ! নজরের রবের কসম, উহুদের দিক থেকে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি। সাদ রাযি. বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি যা করেছেন, আমি তা করতে পারিনি। আনাস রাযি. বলেন, আমরা তাঁকে এমতাবস্থায় পেয়েছি যে, তাঁর দেহে আশিটিরও অধিক তলোয়ার, বর্শা ও তিরের জখম রয়েছে। আমরা তাঁকে নিহত অবস্থায় পেলাম। মুশরিকরা তাঁর দেহ বিকৃত করে দিয়েছিল। তাঁর বোন ব্যতীত কেউ তাঁকে চিনতে পারেনি এবং বোন তাঁর আঙুলের ডগা দেখে চিনতে পেরেছিল।
দেখুন, সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমলের ত্রুটি মোচন করতেন? কোনো আমল ছুটে গেলে তার চেয়ে বড়ো আমল করে সেটা পুষিয়ে নিতেন। ছোটো আমলের কাফফারা আদায় করতেন বড়ো আমল দ্বারা। নিজের জীবনের চেয়ে মূল্যবান ও প্রিয় বস্তু মানুষের কাছে আর কী থাকতে পারে? সেই মহামূল্যবান জীবনই বিলিয়ে দিয়েছেন আগের একটি জিহাদে অংশগ্রহণ না করার ক্ষতিপূরণ হিসেবে! এটাকেই বলে আত্মবিচার। আত্মশাসন। এটাকেই বলে মুহাসাবাতুন নাফস।
এই কঠোর আত্মশাসনের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রশংসায় আয়াত নাজিল করেছিলেন। আনাস ইবন মালেক রাযি. বলেন, আমাদের ধারণা, কুরআনের এই আয়াতটি তাঁর এবং তাঁর মতো মুমিনদের সম্পর্কে নাজিল হয়েছে- 'মুমিনদের মধ্যে হতে কিছুসংখ্যক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে।'
টিকাঃ
২০. সহিহ বুখারি: ২৮০৫।
২১. সুরা আল-আহজাব: ২৩।
📄 আবু তালহা রাযি.
আবু তালহা রাযি.-এর কথা আমরা জানি। তিনি মহান সাহাবিগণের একজন। তিনি নবীজির অত্যন্ত প্রিয় একজন সাহাবি ছিলেন। একদিন নিজের বাগানে নামাজ আদায় করছিলেন তিনি। আর বাগানে হরেক রকমের গাছ থাকে। গাছে গাছে পাখি নাচানাচি করে, উড়াউড়ি করে। এই ডাল থেকে ওই ডালে যায়। বর্ণিল ও মনোরম পরিবেশে বাগানে বিচরণকারী ব্যক্তিদেরকে মুগ্ধ করে। আনন্দ দেয়। দূর করে ক্লান্তি। মনে স্বতঃস্ফূর্ততা আনে। বাগানে নামাজ আদায় করা অবস্থায় এমন একটি পাখির দিকে নজর পড়ল হজরত তালহা রাযি.-এর। সামান্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। দৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবারও নামাজে মনোনিবেশ করলেন। সম্পূর্ণ মনোযোগ বিনিয়োগ করলেন নামাজের মধ্যে। কিন্তু তবু তাঁর আফসোস যায় না। নামাজে দাঁড়িয়ে যেখানে প্রভুর সঙ্গে কথোপকথন হবে, মুনাজাত হবে, সেখানে একটি সামান্য পাখি এসে বাধা সৃষ্টি করল! নিজের নফসের ওপর ভেঙে পড়লেন তিনি। ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাকে শায়েস্তা করতে। বললেন, হে নফস! নামাজে দাঁড়িয়ে প্রভুর সঙ্গে মুনাজাতের এই প্রেমপূর্ণ সময়েও তুমি সামান্য একটি কলকাকলি দ্বারা প্রভাবিত হলে! হে নফস! এই তোমার প্রভু-সাধনা! ধ্যানমগ্নতা!
নিজেকে এভাবে শাসন করে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন, এই বাগানই আর রাখা যাবে না। যে বাগান আল্লাহ ও বান্দার ধ্যানমগ্নতার মধ্যে ব্যাঘাত ঘটায় সেটা রাখা ঠিকও হবে না। এ কথা বলে তিনি বাগানটি আল্লাহ তাআলার রাস্তায় দান করে দিলেন।
এই হলো আমাদের গৌরব, আমাদের হেদায়াতের বাতিঘর, আমাদের রাহবার সাহাবায়ে কেরাম, যাদের একটি ঘটনা আমাদের সারা জীবনের পাথেয়, তাদের একেকটি আত্মশুদ্ধির পদক্ষেপ, একেকজন আব্দুল কাদির জিলানি, জুনায়েদ বাগদাদির চেয়েও উপকারী। সুতরাং আবু তালহা রাযি.-এর মতো মহান ব্যক্তি যদি নিজেদের আত্মাকে এভাবে শাসন করার প্রয়োজন মনে করেন, তবে আমাদের মতো ব্যক্তিদের কীরূপ শাসন করা উচিত? আমাদের পাপী আত্মাগুলোকে কীভাবে কঠোর শাসন করে এদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা উচিত? এর জবাব যার যার কাছে। কারণ, মানুষ নিজে নিজের খবর বেশি জানে।