📘 আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি > 📄 কুরআনে আত্মশাসনের নির্দেশ এসেছে

📄 কুরআনে আত্মশাসনের নির্দেশ এসেছে


ইরশাদ হয়েছে: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ.
'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক, আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে? আর তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।'
আল্লামা ইবনু কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে আত্মশাসন ও আত্মবিচারের নির্দেশ করেছেন যে, তোমরা ভেবে দেখো, তোমার প্রাণ যা উপার্জন করছে, তা কি তোমাকে কেয়ামত দিবসে রক্ষা করবে, না তোমাকে ধ্বংস করবে?

টিকাঃ
৩. ইগাছাতুল লিহফান: ১/৮৪, নাদরাতুন নাইম: ৮/৩৩২৪।

📘 আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি > 📄 মুহাসাবাহ (আত্মবিচার)-এর প্রকার

📄 মুহাসাবাহ (আত্মবিচার)-এর প্রকার


আত্মবিচার ও আত্মশাসন দুই প্রকার। যথা:
১. আমলের আগে আত্মবিচার তথা কর্মের হিসাব গ্রহণ।
২. আমলের পরে আত্মবিচার তথা কর্মের হিসাব গ্রহণ।

প্রথম প্রকার হলো : কোনো কাজ শুরু করার আগে খুব মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করা যে, আমি যে কাজটি করতে যাচ্ছি তা কি আল্লাহর কিতাব ও নবীজির সুন্নাহর অনুকূলে সংঘটিত হচ্ছে? কিতাব ও সুন্নাহ কি আমার এই কাজের অনুমতি দেয়? যদি অনুকূল হয়, উক্ত কাজটিকে কুরআন-সুন্নাহ সায় দেয়, তবে সামনে অগ্রসর হওয়া। আর যদি সায় না দেয় তবে নিবৃত্ত হওয়া, আদৌ সেই কাজের দিকে অগ্রসর না হওয়া। আবার বৈধ কাজটির দিকে অগ্রসর হতে গিয়েও এরূপ চিন্তা করা যে, আমি এই বৈধ কাজটি যে করব, তা করাটাই উত্তম, নাকি না করাটাই উত্তম? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তবে সামনে অগ্রসর না হওয়া, কাজটি এড়িয়ে যাওয়া।

এরপর আবার এরূপ ভাবা যে, কাজটি কি আল্লাহর জন্য হচ্ছে, নাকি যশ-খ্যাতি ও নিজের বীরত্ব-কর্তৃত্বের জন্য হচ্ছে? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তবে এ ক্ষেত্রেও পরিহার করবে, সামনে অগ্রসর হবে না।

আর দ্বিতীয় প্রকার : অর্থাৎ কাজ সংঘটিত হওয়ার পর মুহাসাবাহ বা আত্মবিচার আবার তিন প্রকার। যথা:
এক. আল্লাহর যেসব হক রয়েছে, ইবাদতের যেসব শর্ত ও অনুষঙ্গ রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা যে, কাজগুলো কি যথাযথভাবে আদায় করা হয়েছে, না তাতে কসুর হয়েছে? যেভাবে আদায় করার কথা ছিল সেভাবে আদায় করা হয়েছে তো?

ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার হক ছয়টি। যথা :
১. ইখলাসের সাথে আমল করা।
২. আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি কল্যাণকামিতা বজায় রাখা।
৩. নবীজির নির্দেশ অনুযায়ী আমল করা।
৪. আমলের সময় আল্লাহ এই কাজটি দেখছেন বলে বিশ্বাস রাখা।
৫. আল্লাহর অনুগ্রহের কথা মনে পোষণ করা।
৬. নিজের ত্রুটির কথা বার বার স্মরণ করা।

কোনো আমল সম্পন্ন করার পর আমলের সময় এই ছয়টি বিষয় যথাযথভাবে লক্ষ রাখা হয়েছিল কি-না, তার হিসাব নেয়া একান্ত জরুরি।

দুই. আমলের পর মুহাসাবাহর দ্বিতীয় প্রকার হলো, পাপের ব্যাপারে হিসাব নেয়া। অর্থাৎ দুর্ভাগ্যক্রমে কোনো অন্যায় ও পাপ হয়ে গেলে সে জন্য অনুশোচনা করা এবং তাওবার মাধ্যমে ত্বরিত সেই পাপ মোচন করা। এরপর ইস্তেগফার করা এবং পাপের মোকাবিলায় কিছু নেক আমল করা। কেননা কুরআন-হাদিসের স্বীকৃত মূলনীতি হলো, পুণ্যের দ্বারা পাপ মোচন হয়। তাই কোনো পাপ সংঘটিত হয়ে গেলেই মোকাবিলায় একটি পুণ্যের কাজ করে পাপের দায়ভার মোচনের চেষ্টা করা।

তিন. কোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার পর এ কথা চিন্তা করা যে, কাজ করাটা উত্তম ছিল, না পরিহার করাই উত্তম ছিল? এভাবে প্রতিটি কাজের হিসাব গ্রহণ ও আত্মশাসনের ধারা জারি রাখলে আশা করা যায় মানুষ বহু পাপ থেকে বেঁচে থাকতে পারবে এবং নেক আমলে অগ্রগামী হওয়া সহজ হবে।

📘 আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি > 📄 আত্মশাসনের অপরিহার্যতা

📄 আত্মশাসনের অপরিহার্যতা


ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ মুহাসাবাহ বা আত্মশাসনের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা উল্লেখ করে বলেন, বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই জানেন, আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতিটি কাজে অতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। তিনি তাদের প্রতিটি কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেবেন। বিন্দুমাত্র ভুল ও অন্যায়েরও হিসাব নেবেন। তাই তারা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর এই পাকড়াও থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো নিজের প্রতিটি কাজের মুহাসাবাহ করা। সঠিক ও যথার্থ মুরাকাবা করা। প্রতিটি চালচলনে নফস ও আত্মাকে জবাবদিহির অধীন রাখা।
যে ব্যক্তি এভাবে নিজের প্রতিটি কাজের হিসাব গ্রহণ করবে, কেয়ামতের দিন তার আমলের হিসাব সহজ হবে। পার্থিব জীবনের সওয়াল-জওয়াব সহজ হবে। তার পরিণতি ও পরিণام সুন্দর ও সুখময় হবে। আর যে ব্যক্তি হিসাব করবে না, তার আফসোস দীর্ঘ হবে, কেয়ামত দিবসে তার হিসাব ও আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মেয়াদ প্রলম্বিত হবে। তার লাঞ্ছনা দীর্ঘ হবে।

টিকাঃ
৪. ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৭/৩২।

📘 আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি > 📄 আত্মবিচার না করার পরিণতি

📄 আত্মবিচার না করার পরিণতি


ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একজন মুসলমানের সবচেয়ে বড়ো ক্ষতিকর দিক হলো, মুহাসাবাহ ও আত্মবিচার না করা, নিজের জীবনকে অবাধ ও উন্মুক্ত অবস্থায় ছেড়ে দেয়া এবং কুপ্রবৃত্তির হাতে ইচ্ছার রশি তুলে দেয়া। এগুলো মানুষকে তার চূড়ান্ত ধ্বংস ও চরম অশুভ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। আর এটা মূলত অহংকারী, দাম্ভিক ও পরকালের ভাবনাহীন লোকদের বৈশিষ্ট্য। তারা পরকালের পরিণতি দেখা থেকে তাদের দুই চোখকে বন্ধ রাখে, নিজেদের গতিতে চলে এবং বিনা আমলে আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও মাগফিরাতের আশায় বসে থাকে। ফলে এরাই মুহাসাবাহ ছেড়ে দেয় এবং পরকালের পরিণতি থেকে উদাসীন থাকে।"

ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী মুমিনের একান্ত কর্তব্য হলো, মুহাসাবাহ ও আত্মবিচার থেকে কখনই গাফেল না হওয়া, নিজের আত্মার প্রতি কঠোরতা করার ব্যাপারে উদাসীন না থাকা। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের ওপর শরিয়ত আরোপিত বাধ্যবাধকতা ও বিধি-নিষেধ আরোপ করা। একজন মুসলমানকে জীবনের প্রতিটি নিশ্বাসই মহামূল্যবান হীরা-জাওহার মনে করতে হবে। এগুলো এত মূল্যবান সম্পদ যে, পরকালের চিরস্থায়ী সুখের জীবন কেবল এই সম্পদ দ্বারাই ক্রয় করা সম্ভব। সুতরাং এই মহামূল্যবান সম্পদ অপচয় ও নষ্ট করা কিংবা এর দ্বারা এমন বস্তু ক্রয় করা, যা ক্ষণস্থায়ী কিংবা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে, সেটা হবে চরম মূর্খতা। এমন মূর্খতা যে, একমাত্র সীমাহীন নির্বোধ, চরম মূর্খ ও অপরিণامদর্শী ব্যক্তি ছাড়া আর কারও দ্বারা এরূপ কাজ সংঘটিত হতেই পারে না। এই সীমাহীন মূর্খতার দুঃখবহ ক্ষতির বহিঃপ্রকাশ ঘটবে সেই দিবসে, যেই দিবসকে يَوْمَ التَّغَابُنِ বা আফসোস ও আক্ষেপের দিন বলে অভিহিত করা হয়। আল্লাহ তাআলা এই দিন সম্পর্কে বলেছেন:
يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُحْضَرًا وَمَا عَمِلَتْ مِنْ سُوءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَبَيْنَهُ أَمَدًا بَعِيدًا وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ.
'এই দিন প্রত্যেকে সে যে ভালো কাজ করেছে এবং যে মন্দ কাজ করেছে তা বিদ্যমান পাবে। সেদিন সে তার ও তার খারাপ কর্মফলের মাঝে দূরবর্তী ব্যবধান কামনা করবে। আল্লাহ তাঁর নিজের সম্বন্ধে তোমাদেরকে সাবধান করছেন। আল্লাহ বান্দার প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র।'

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
هُنَالِكَ تَبْلُو كُلُّ نَفْسٍ مَا أَسْلَفَتْ وَرُدُّوا إِلَى اللَّهِ مَوْلَاهُمُ الْحَقَّ وَضَلَّ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ.
'সেখানে তাদের প্রত্যেকে তার পূর্ব কৃতকর্ম পরীক্ষা করে নেবে এবং তাদেরকে তাদের প্রকৃত অভিভাবক আল্লাহ তাআলার নিকট ফিরিয়ে আনা হবে এবং তাদের উদ্ভাবিত মিথ্যা তাদের নিকট থেকে হারিয়ে যাবে।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন:
يَوْمَ تَأْتِي كُلُّ نَفْسٍ تُجَادِلُ عَنْ نَفْسِهَا وَتُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا عَمِلَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ.
'(স্মরণ করো সে দিনের কথা) যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের পক্ষে যুক্তি-তর্ক নিয়ে উপস্থিত হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে সে যা আমল করেছে তা পরিপূর্ণরূপে দেয়া হবে এবং তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।'
এই আয়াতেও মুমিনগণকে নিজ নিজ আত্মার সংশোধন ও আত্মাকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখে জীবনযাপন করার আদেশ করা হয়েছে। কেননা সেদিন মানুষ নিজের আত্মার পক্ষে সমর্থন ও যুক্তি পেশ করতে যাবে বটে, কিন্তু যদি দুনিয়ায় মুহাসাবাহ ব্যতীত জীবনযাপন করা হয়, তবে সেদিন আত্মার সমর্থনে পেশকৃত যুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে না এবং ওজর পেশ করেও কোনো ফলাফল পাওয়া যাবে না।

আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন:
إِنَّا أَنْذَرْنَاكُمْ عَذَابًا قَرِيبًا يَوْمَ يَنْظُرُ الْمَرْءُ مَا قَدَّمَتْ يَدَاهُ وَيَقُولُ الْكَافِرُ يَا لَيْتَنِي كُنْتُ تُرَابًا.
'আমি তোমাদেরকে আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করলাম, সেই দিন মানুষ তার কৃতকর্ম প্রত্যক্ষ করবে এবং কাফের বলবে, হায়, আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!'

টিকাঃ
৫. ইহসানু সুলুকিল আব্দিল মামলুকল ইলা মালিকিল মুলুক ১/৭৩, ইগাছাতুল লিহফান: ১/৮৩।
৬. সুরা আলে-ইমরান: ৩০।
৭. সুরা ইউনুস: ৩০।
৮. সুরা নাহল: ১১১।
৯. সুরা নাবা: ৪০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00