📄 আত্মবিচারের ব্যবহারিক রূপ
বিখ্যাত তাবেয়ি ও তাসাউফ সংস্কারক হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ মুহাসাবা বা আত্মহিসাবের সংজ্ঞায় বলেছেন, আত্মবিচার হলো, মুমিন ব্যক্তি মাত্রই নিজের আমলের হিসাব করবে, সর্বদা শৃঙ্খল জীবনযাপন করবে এবং দায়বদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখবে। নিজেকেই প্রশ্ন করবে, তুমি কেন ইলম শিক্ষা করতে চাও? তোমার উদ্দেশ্য কী? তুমি পানাহার করতে চাও কোন উদ্দেশ্যে? ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে, না জৈবিক চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে? এভাবে প্রতিটি কাজ করার সময় নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করা, নিজেকে শরিয়তের বেষ্টনীর মধ্যে আবেষ্টিত রাখার জন্য হিসাব-নিকাশ করাকে আত্মবিচার বলে। এটা মুমিনের অপরিহার্য গুণ। পক্ষান্তরে ফাজের ও ফাসেক ব্যক্তি আত্মবিচার ও আত্মশাসনের কোনো পরোয়া করে না। সে তার ইচ্ছাধীন জীবন পরিচালনা করে। তার দুই পা তাকে যেদিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই সে হেঁটে যায়। দুই হাত যা ধরতে বলে, হাত দিয়ে সে তা-ই ধরে এবং মনে যা কিছু উদয় হয়, সেটাই বাস্তবায়ন করে চলে।
টিকাঃ
২. ফসলুল খিতাব ফিয যুহদি ওয়ার রিকাক ওয়াল আদাব: ৪/৫৯।
📄 কুরআনে আত্মশাসনের নির্দেশ এসেছে
ইরশাদ হয়েছে: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ.
'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক, আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে? আর তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।'
আল্লামা ইবনু কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে আত্মশাসন ও আত্মবিচারের নির্দেশ করেছেন যে, তোমরা ভেবে দেখো, তোমার প্রাণ যা উপার্জন করছে, তা কি তোমাকে কেয়ামত দিবসে রক্ষা করবে, না তোমাকে ধ্বংস করবে?
টিকাঃ
৩. ইগাছাতুল লিহফান: ১/৮৪, নাদরাতুন নাইম: ৮/৩৩২৪।
📄 মুহাসাবাহ (আত্মবিচার)-এর প্রকার
আত্মবিচার ও আত্মশাসন দুই প্রকার। যথা:
১. আমলের আগে আত্মবিচার তথা কর্মের হিসাব গ্রহণ।
২. আমলের পরে আত্মবিচার তথা কর্মের হিসাব গ্রহণ।
প্রথম প্রকার হলো : কোনো কাজ শুরু করার আগে খুব মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করা যে, আমি যে কাজটি করতে যাচ্ছি তা কি আল্লাহর কিতাব ও নবীজির সুন্নাহর অনুকূলে সংঘটিত হচ্ছে? কিতাব ও সুন্নাহ কি আমার এই কাজের অনুমতি দেয়? যদি অনুকূল হয়, উক্ত কাজটিকে কুরআন-সুন্নাহ সায় দেয়, তবে সামনে অগ্রসর হওয়া। আর যদি সায় না দেয় তবে নিবৃত্ত হওয়া, আদৌ সেই কাজের দিকে অগ্রসর না হওয়া। আবার বৈধ কাজটির দিকে অগ্রসর হতে গিয়েও এরূপ চিন্তা করা যে, আমি এই বৈধ কাজটি যে করব, তা করাটাই উত্তম, নাকি না করাটাই উত্তম? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তবে সামনে অগ্রসর না হওয়া, কাজটি এড়িয়ে যাওয়া।
এরপর আবার এরূপ ভাবা যে, কাজটি কি আল্লাহর জন্য হচ্ছে, নাকি যশ-খ্যাতি ও নিজের বীরত্ব-কর্তৃত্বের জন্য হচ্ছে? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তবে এ ক্ষেত্রেও পরিহার করবে, সামনে অগ্রসর হবে না।
আর দ্বিতীয় প্রকার : অর্থাৎ কাজ সংঘটিত হওয়ার পর মুহাসাবাহ বা আত্মবিচার আবার তিন প্রকার। যথা:
এক. আল্লাহর যেসব হক রয়েছে, ইবাদতের যেসব শর্ত ও অনুষঙ্গ রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা যে, কাজগুলো কি যথাযথভাবে আদায় করা হয়েছে, না তাতে কসুর হয়েছে? যেভাবে আদায় করার কথা ছিল সেভাবে আদায় করা হয়েছে তো?
ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার হক ছয়টি। যথা :
১. ইখলাসের সাথে আমল করা।
২. আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি কল্যাণকামিতা বজায় রাখা।
৩. নবীজির নির্দেশ অনুযায়ী আমল করা।
৪. আমলের সময় আল্লাহ এই কাজটি দেখছেন বলে বিশ্বাস রাখা।
৫. আল্লাহর অনুগ্রহের কথা মনে পোষণ করা।
৬. নিজের ত্রুটির কথা বার বার স্মরণ করা।
কোনো আমল সম্পন্ন করার পর আমলের সময় এই ছয়টি বিষয় যথাযথভাবে লক্ষ রাখা হয়েছিল কি-না, তার হিসাব নেয়া একান্ত জরুরি।
দুই. আমলের পর মুহাসাবাহর দ্বিতীয় প্রকার হলো, পাপের ব্যাপারে হিসাব নেয়া। অর্থাৎ দুর্ভাগ্যক্রমে কোনো অন্যায় ও পাপ হয়ে গেলে সে জন্য অনুশোচনা করা এবং তাওবার মাধ্যমে ত্বরিত সেই পাপ মোচন করা। এরপর ইস্তেগফার করা এবং পাপের মোকাবিলায় কিছু নেক আমল করা। কেননা কুরআন-হাদিসের স্বীকৃত মূলনীতি হলো, পুণ্যের দ্বারা পাপ মোচন হয়। তাই কোনো পাপ সংঘটিত হয়ে গেলেই মোকাবিলায় একটি পুণ্যের কাজ করে পাপের দায়ভার মোচনের চেষ্টা করা।
তিন. কোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার পর এ কথা চিন্তা করা যে, কাজ করাটা উত্তম ছিল, না পরিহার করাই উত্তম ছিল? এভাবে প্রতিটি কাজের হিসাব গ্রহণ ও আত্মশাসনের ধারা জারি রাখলে আশা করা যায় মানুষ বহু পাপ থেকে বেঁচে থাকতে পারবে এবং নেক আমলে অগ্রগামী হওয়া সহজ হবে।
📄 আত্মশাসনের অপরিহার্যতা
ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ মুহাসাবাহ বা আত্মশাসনের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা উল্লেখ করে বলেন, বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই জানেন, আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতিটি কাজে অতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। তিনি তাদের প্রতিটি কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেবেন। বিন্দুমাত্র ভুল ও অন্যায়েরও হিসাব নেবেন। তাই তারা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর এই পাকড়াও থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো নিজের প্রতিটি কাজের মুহাসাবাহ করা। সঠিক ও যথার্থ মুরাকাবা করা। প্রতিটি চালচলনে নফস ও আত্মাকে জবাবদিহির অধীন রাখা।
যে ব্যক্তি এভাবে নিজের প্রতিটি কাজের হিসাব গ্রহণ করবে, কেয়ামতের দিন তার আমলের হিসাব সহজ হবে। পার্থিব জীবনের সওয়াল-জওয়াব সহজ হবে। তার পরিণতি ও পরিণام সুন্দর ও সুখময় হবে। আর যে ব্যক্তি হিসাব করবে না, তার আফসোস দীর্ঘ হবে, কেয়ামত দিবসে তার হিসাব ও আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মেয়াদ প্রলম্বিত হবে। তার লাঞ্ছনা দীর্ঘ হবে।
টিকাঃ
৪. ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৭/৩২।