📄 মুহাসাবাহ (আত্মবিচার) কাকে বলে?
'মুহাসাবা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গণনা করা, হিসাব-নিকাশ করা। আল্লামা মাওয়ারদি রাহিমাহুল্লাহ 'মুহাসাবাতুন নাফস'-এর সংজ্ঞা উল্লেখ করে বলেন, মুহাসাবা বা আত্মবিচার হলো, মানুষ দিনের বেলায় যা করেছে রাতের বেলায় তা পর্যবেক্ষণ করা এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ করা। বিশ্লেষণ করার পর যদি দেখা যায়, ভালো কাজগুলোই সংঘটিত হয়েছে, তবে পরবর্তী দিনে সেই ভালো কাজগুলোর ওপর অবিচল থাকার প্রতিজ্ঞা করা। সেই সঙ্গে অনুরূপ আরও ভালো ভালো কাজ আঞ্জাম দেয়ারও সংকল্প করা। আর যদি দেখা যায় যে, খারাপ কাজ সংঘটিত হয়েছে, তবে অনুশোচনা করা, লজ্জিত হওয়া এবং আগামীতে আর কোনোভাবেই এসব কাজ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করা। আর এসব কাজ কেন হয়েছে, এ জন্য নিজেকে তিরস্কার করা।'
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, নিম্নের কয়েকটি পদক্ষেপের নাম হলো মুহাসাবাহ বা আত্মবিচার। যথা: ১. আত্মাকে ওয়াজিব বিধানসমূহ পালনের ওপর বাধ্য করা। ২. নিজের জীবনে উন্নত আখলাক ও শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠা করা। ৩. সকল প্রকার হারাম কাজ ত্যাগ করা। ৪. মাকরুহ, নিষ্প্রয়োজনীয় ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলা।
টিকাঃ
১. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দীন: ৩৬০-৩৬১।
📄 মুহাসাবাহ সম্পর্কে চমৎকার সুসংবাদ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ. 'আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দান করবেন হিসাব ছাড়া।' 'নাদরাতুন নাইম' গ্রন্থকার এই আয়াত প্রসঙ্গে বলেন, যারা মুহাসাবা করে তাদের জন্য আয়াতে একটি চমৎকার সুসংবাদ রয়েছে। কেননা আয়াতের মর্ম হলো, এরা যেহেতু দুনিয়ায় তাদের প্রয়োজনীয় বস্তু হিসাব করে নিত, হিসাব করে প্রয়োজন পরিমাণ উপার্জন করত, হিসাব করে যখন প্রয়োজন হতো তখন খরচ করত এবং যখন যেখানে দ্বীনি প্রয়োজন হতো তখন ততটুকু খরচ করত, মোটকথা, যাবতীয় ক্ষেত্রে সে হিসাব করে করে কাজ করত, তাই আল্লাহ তাআলা বিনিময়ে পরকাল ও জান্নাতে তাদেরকে বেহিসাব দান করবেন। কেননা তার হিসাব তো সে নিজেই দুনিয়াতে করেছে। তাই আখেরাতে তাকে দান করার ক্ষেত্রে এবং সে নিজে ভোগের বিষয়ে হিসাবের সম্মুখীন হবে না।
📄 আত্মবিচারের ব্যবহারিক রূপ
বিখ্যাত তাবেয়ি ও তাসাউফ সংস্কারক হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ মুহাসাবা বা আত্মহিসাবের সংজ্ঞায় বলেছেন, আত্মবিচার হলো, মুমিন ব্যক্তি মাত্রই নিজের আমলের হিসাব করবে, সর্বদা শৃঙ্খল জীবনযাপন করবে এবং দায়বদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখবে। নিজেকেই প্রশ্ন করবে, তুমি কেন ইলম শিক্ষা করতে চাও? তোমার উদ্দেশ্য কী? তুমি পানাহার করতে চাও কোন উদ্দেশ্যে? ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে, না জৈবিক চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে? এভাবে প্রতিটি কাজ করার সময় নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করা, নিজেকে শরিয়তের বেষ্টনীর মধ্যে আবেষ্টিত রাখার জন্য হিসাব-নিকাশ করাকে আত্মবিচার বলে। এটা মুমিনের অপরিহার্য গুণ। পক্ষান্তরে ফাজের ও ফাসেক ব্যক্তি আত্মবিচার ও আত্মশাসনের কোনো পরোয়া করে না। সে তার ইচ্ছাধীন জীবন পরিচালনা করে। তার দুই পা তাকে যেদিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই সে হেঁটে যায়। দুই হাত যা ধরতে বলে, হাত দিয়ে সে তা-ই ধরে এবং মনে যা কিছু উদয় হয়, সেটাই বাস্তবায়ন করে চলে।
টিকাঃ
২. ফসলুল খিতাব ফিয যুহদি ওয়ার রিকাক ওয়াল আদাব: ৪/৫৯।
📄 কুরআনে আত্মশাসনের নির্দেশ এসেছে
ইরশাদ হয়েছে: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ.
'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক, আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে? আর তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।'
আল্লামা ইবনু কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে আত্মশাসন ও আত্মবিচারের নির্দেশ করেছেন যে, তোমরা ভেবে দেখো, তোমার প্রাণ যা উপার্জন করছে, তা কি তোমাকে কেয়ামত দিবসে রক্ষা করবে, না তোমাকে ধ্বংস করবে?
টিকাঃ
৩. ইগাছাতুল লিহফান: ১/৮৪, নাদরাতুন নাইম: ৮/৩৩২৪।