📄 অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়া
অনেকেই অধিকহারে পাপাচার ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। যার ফলে তাদের অন্তর শক্ত হয়ে যায়। এটি দূর করার জন্য বেশি বেশি ইস্তিগফার তথা আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। প্রতিটি মুহূর্তে তাওবা করতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক সাওম রাখা, রাতের বেলায় তাহাজ্জুদ আদায় করা, ভালো মানুষদের সম্মান করা, সৎলোকদের সংস্পর্শ গ্রহণ করা, যিকিরের মজলিসে গমন করার কাজগুলোও করতে হবে।
এক ব্যক্তি হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছিলো। তিনি তাকে বললেন, 'যিকিরের মাধ্যমে তাকে বিগলিত করো।[৫০]
এক হাদীসে রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ سَبْعِينَ مَرَّةً
“নিশ্চয়ই আমি দিনে সত্তর বারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করি।”[৫১]
অন্য আরেক হাদীসে তিনি বলেছেন,
إِنَّ العَبْدَ إِذَا أَخْطَأً خَطِيئَةٌ نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ، وَهُوَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُ {كَلَا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ}
“বান্দা যখন একটি গুনাহ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। অতপর যখন সে গুনাহের কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাওবা করে তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং একসময় পুরো অন্তর তাতে ছেয়ে যায়। এটাই সেই মরিচিকা যার কথা আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন-কখনো নয়, তাদের কৃতকর্মই তাদের মনে জং ধরিয়ছে। (সূরা মুতাফফিফীন : ১৪)”[৫২]
টিকাঃ
[৫০] কিতাবুয যুহদ লি আহমাদ: ১৫১০। লেখক এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা সঠিক নয়। বরং এটি হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-এর ঘটনা। তবে হ্যাঁ, রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-থেকেও অনুরূপ ঘটনা বর্ণিত আছে। সেখানে অন্তর শক্ত হয়ে যাবার অভিযোগকারীকে তিনি বলেছিলেন, 'তুমি যদি অন্তরকে নরম করতে চাও তবে মিসকিনদের খানা খাওয়াও এবং এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। (বাইহাকি, শুআবুল ঈমান: ১০৫২৩)
[৫১] সুনান তিরমিযি: ৩২৫৯, সুনান ইবনু মাজাহ: ৩৮১৬; হাদীসের মান সহীহ।
[৫২] সুনান তিরমিযি: ৩৩৩৪; হাদীসের মান হাসান।
📄 লোকজনের দৃষ্টি নিজের দিকে আকৃষ্ট করা
স্কুল চিন্তার লোকদের শিকার করার জন্য কিছু মানুষ আছে যারা অনেক সময় প্রচুর কথাবার্তা বলে এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানগত বিষয়ে আলাপচারিতার অবতারণা করে। সুন্দর সুন্দর কথামালা ও বাকপটুতার মাধ্যমে লোকজনের দৃষ্টি নিজের দিকে আকৃষ্ট করে। এই মন্দ স্বভাব সংশোধন করার জন্য যা করতে হবে তা হলো, অন্যদের যে উপদেশ দেওয়া হয় তার উপর প্রথমে নিজে আমল করা। মানুষজনকে কথার পরিবর্তে কর্মের মাধ্যমে উপদেশ দেওয়া।
বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা ঈসা বিন মারইয়াম- আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম-এর কাছে ওহি প্রেরণ করেছিলেন এই মর্মে যে, 'যখন তুমি মানুষকে উপদেশ দিতে চাইবে তো প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করবে। যদি নিজে সে উপদেশ গ্রহণ করে নিতে পারো তখন অন্যদের তা প্রদান করবে। অন্যথায় আমাকে লজ্জা কোরো।[৫৩]
আল্লাহর নবি-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي رِجَالًا تُقْرَضُ شِفَاهُهُمْ بِمَقَارِيضَ مِنْ نَارٍ، فَقُلْتُ: يَا جِبْرِيلُ مَنْ هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ خُطَبَاءُ مِنْ أُمَّتِكَ، يَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ، وَيَنْسَوْنَ أَنْفُسَهُمْ، وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ ، أَفَلَا يَعْقِلُونَ
মিরাজের রাতে আমি এমন কিছু লোককে দেখলাম, আগুনের কাঁচি দিয়ে যাদের ঠোট কর্তন করা হচ্ছিলো। আমি জানতে চাইলাম, 'এরা কারা হে জিবরীল?' তিনি জানালেন, 'এরা আপনার উম্মতের সেসব বক্তা, যারা লোকদেরকে ভালো কাজের আদেশ করতো কিন্তু নিজেদের কথা ভুলে থাকতো। তারা কুরআনও তিলাওয়াত করতো। তারা কী তা বুঝতো না?'[৫৪]
টিকাঃ
[৫৩] ইবনু আবিদ দুনয়া, আল-আমরু বিল মারুফ ওয়ান নাহয় আনিল মুনকার: ৭৯
[৫৪] মুসনাদ আহমাদ: ১৩৫১৫, হাদীসের মান সহীহ
📄 সর্বদা অতিমাত্রায় আনন্দিত ও খুশি থাকা
মানুষের স্বভাবের একটি মন্দ দিক হলো (সর্বদা অতিমাত্রায়) আনন্দিত ও খুশি থাকা এবং আরাম-আয়েশ অন্বেষণ করা। এটি গাফলতি থেকে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এর প্রতিষেধক হলো, আপন অবস্থার ব্যাপারে সচেতন থাকা। আদিষ্ট বিষয় পালন না করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ার কথা স্মরণ করা। সেই সাথে এই কথাও মাথায় রাখা যে, এই দুনিয়া হলো তার জন্য কারাগার সদৃশ। আর কারাগারে কখনো আনন্দ-বিনোদন থাকে না।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الكَافِرِ
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার আর কাফিরের জন্য জান্নাত।”[৫৫]
এই কারণে দুনিয়ার যাপিত জীবন হওয়া উচিত কারাবাসী মানুষদের জীবনের মতো। ফুর্তিবাজ মানুষদের মতো নয়।
দাঊদ আত-তাঈ বলেছেন, 'আল্লাহ-প্রেমী বান্দাদের অন্তর জাহান্নামের স্মরণ ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে।'
এক ব্যক্তি বিশর আলহাফি-রাহিমাহুল্লাহ-কে বললেন, কী ব্যাপার আপনাকে চিন্তিত দেখছি যে!' তিনি উত্তরে বললেন, 'কারণ আমাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।' [৫৬]
টিকাঃ
[৫৫] সুনান তিরমিযি : ২৩২৪, হাদীসের মান সহীহ
[৫৬] অর্থাৎ ফেরেশতা যেহেতু সর্বদা আমাদের পর্যবেক্ষণে রাখছে এবং ভালোমন্দ কাজের হিসাব রাখছে তখন এতো আনন্দ করার সুযোগ কই!
📄 কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করা
কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করা, তার সন্তুষ্টি অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া এবং তার চাওয়া-পাওয়ার বাস্তবায়ন করা হলো মানুষের অন্যতম মনোরোগ। এটি দূর করার তরীকা হলো সেটা, যা আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন যে,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
“যে ব্যক্তি স্বীয় রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করবে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বারণ করবে জান্নাতই হবে তার বাসস্থান।”[৫৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةُ بِالسُّوءِ
“নিশ্চয়ই প্রবৃত্তি মন্দ বিষয়ের আদেশদাতা।” [৫৮]
মুদর আল-ক্বারি বলেছেন, 'প্রবৃত্তি যখন অন্তরের ভেতর শেকড় গেঁড়ে বসে তখন তার বিরোধিতা করা নখ দিয়ে পাহাড় খোদাই করার চেয়েও কঠিন হয়ে যায়।'
টিকাঃ
[৫৭] সূরা নাযিআত: ৪০-৪১
[৫৮] সূরা ইউসুফ: ৫৩