📄 অভ্যন্তরীণ দোষত্রুটির ব্যাপারে ভ্রূক্ষেপ না করা
লোক দেখানোর জন্য নিজের বাহ্যিক বিষয়গুলো সংশোধনে ব্রতী হওয়া এবং আল্লাহর কাছে লক্ষণীয় ও সংশোধনের অধিক উপযুক্ত অভ্যন্তরীণ দোষত্রুটির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করাটা হলো মনের অন্যতম ব্যাধি। এই ব্যাধি দূর করার জন্য দৃঢ়ভাবে একথা বিশ্বাস করতে হবে যে, মানুষজন তাকে ঠিক ততোটুকুই সম্মান করবে যতোটুকু সম্মান করার কথা আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে গেঁথে দিয়েছেন। পাশাপাশি এ কথাও জেনে নিতে হবে যে, অভ্যন্তরীণ অবস্থাটাই হলো আল্লাহর কাছে মূল বিবেচ্য বিষয়। সুতরাং বাহ্যিক অবস্থা, যা কি-না মানুষের কাছে বিবেচ্য বিষয়, তার তুলনায় অভ্যন্তরীণ সংশোধনটাই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর নজরদারি করেন।” [৪৭]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ، وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ إِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَى أَعْمَالِكُمْ، وَقُلُوبِكُمْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা-সুরত ও ধন-সম্পদের প্রতি লক্ষ করেন না। তিনি লক্ষ করেন তোমাদের আমল ও অন্তরের প্রতি।[৪৮]
টিকাঃ
[৪৭] সূরা নিসা: ০১
[৪৮] সুনান ইবনু মাজাহ: ৪১৪৩, হাদীসের মান সহীহ।
📄 রিযিক নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগা
রিযিক নিয়ে মানুষ খুব বেশি দুশ্চিন্তায় ভোগে। একটাও একটা মনোরোগ। অথচ আল্লাহ তাআলা তার জন্য রিযিকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অপর দিকে সে আমলের ব্যাপারে উদাসীন। অথচ আল্লাহ এর দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত করেছেন। অন্য কেউ সেটা তার জন্য করে দিলেও হবে না। এই বিষয়টি সংশোধনের জন্য এই কথা জেনে নিতে হবে যে, যেই আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তার রিযিকের দায়িত্বভারও গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন,
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ
“তিনি সেই আল্লাহ, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন অতপর তোমাদের রিযিক দান করেছেন। "[৪৯]
সুতরাং আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে মানুষ যেমন কোনো সন্দেহ করে না তেমনি (আল্লাহ প্রদত্ত) রিযিকের ব্যাপারেও তার কোনোরূপ সন্দেহ না থাকা উচিত。
আমি মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহকে হাতেম আল-আসম্ম এর সূত্রে বলতে শুনেছি, প্রতিদিন সকালে শয়তান আমাকে জিজ্ঞেস করে, 'আজকে তুমি কী খাবে, কী পরবে আর কোথায় থাকবে?' আমি উত্তরে বলি, 'আমি মরণ খাবো, কাফন পরবো আর কবরে থাকবো।'
টিকাঃ
[৪৯] সূরা রুম: ৪০
📄 অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়া
অনেকেই অধিকহারে পাপাচার ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। যার ফলে তাদের অন্তর শক্ত হয়ে যায়। এটি দূর করার জন্য বেশি বেশি ইস্তিগফার তথা আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। প্রতিটি মুহূর্তে তাওবা করতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক সাওম রাখা, রাতের বেলায় তাহাজ্জুদ আদায় করা, ভালো মানুষদের সম্মান করা, সৎলোকদের সংস্পর্শ গ্রহণ করা, যিকিরের মজলিসে গমন করার কাজগুলোও করতে হবে।
এক ব্যক্তি হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছিলো। তিনি তাকে বললেন, 'যিকিরের মাধ্যমে তাকে বিগলিত করো।[৫০]
এক হাদীসে রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ سَبْعِينَ مَرَّةً
“নিশ্চয়ই আমি দিনে সত্তর বারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করি।”[৫১]
অন্য আরেক হাদীসে তিনি বলেছেন,
إِنَّ العَبْدَ إِذَا أَخْطَأً خَطِيئَةٌ نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ، وَهُوَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُ {كَلَا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ}
“বান্দা যখন একটি গুনাহ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। অতপর যখন সে গুনাহের কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাওবা করে তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং একসময় পুরো অন্তর তাতে ছেয়ে যায়। এটাই সেই মরিচিকা যার কথা আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন-কখনো নয়, তাদের কৃতকর্মই তাদের মনে জং ধরিয়ছে। (সূরা মুতাফফিফীন : ১৪)”[৫২]
টিকাঃ
[৫০] কিতাবুয যুহদ লি আহমাদ: ১৫১০। লেখক এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা সঠিক নয়। বরং এটি হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-এর ঘটনা। তবে হ্যাঁ, রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-থেকেও অনুরূপ ঘটনা বর্ণিত আছে। সেখানে অন্তর শক্ত হয়ে যাবার অভিযোগকারীকে তিনি বলেছিলেন, 'তুমি যদি অন্তরকে নরম করতে চাও তবে মিসকিনদের খানা খাওয়াও এবং এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। (বাইহাকি, শুআবুল ঈমান: ১০৫২৩)
[৫১] সুনান তিরমিযি: ৩২৫৯, সুনান ইবনু মাজাহ: ৩৮১৬; হাদীসের মান সহীহ।
[৫২] সুনান তিরমিযি: ৩৩৩৪; হাদীসের মান হাসান।
📄 লোকজনের দৃষ্টি নিজের দিকে আকৃষ্ট করা
স্কুল চিন্তার লোকদের শিকার করার জন্য কিছু মানুষ আছে যারা অনেক সময় প্রচুর কথাবার্তা বলে এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানগত বিষয়ে আলাপচারিতার অবতারণা করে। সুন্দর সুন্দর কথামালা ও বাকপটুতার মাধ্যমে লোকজনের দৃষ্টি নিজের দিকে আকৃষ্ট করে। এই মন্দ স্বভাব সংশোধন করার জন্য যা করতে হবে তা হলো, অন্যদের যে উপদেশ দেওয়া হয় তার উপর প্রথমে নিজে আমল করা। মানুষজনকে কথার পরিবর্তে কর্মের মাধ্যমে উপদেশ দেওয়া।
বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা ঈসা বিন মারইয়াম- আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম-এর কাছে ওহি প্রেরণ করেছিলেন এই মর্মে যে, 'যখন তুমি মানুষকে উপদেশ দিতে চাইবে তো প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করবে। যদি নিজে সে উপদেশ গ্রহণ করে নিতে পারো তখন অন্যদের তা প্রদান করবে। অন্যথায় আমাকে লজ্জা কোরো।[৫৩]
আল্লাহর নবি-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي رِجَالًا تُقْرَضُ شِفَاهُهُمْ بِمَقَارِيضَ مِنْ نَارٍ، فَقُلْتُ: يَا جِبْرِيلُ مَنْ هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ خُطَبَاءُ مِنْ أُمَّتِكَ، يَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ، وَيَنْسَوْنَ أَنْفُسَهُمْ، وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ ، أَفَلَا يَعْقِلُونَ
মিরাজের রাতে আমি এমন কিছু লোককে দেখলাম, আগুনের কাঁচি দিয়ে যাদের ঠোট কর্তন করা হচ্ছিলো। আমি জানতে চাইলাম, 'এরা কারা হে জিবরীল?' তিনি জানালেন, 'এরা আপনার উম্মতের সেসব বক্তা, যারা লোকদেরকে ভালো কাজের আদেশ করতো কিন্তু নিজেদের কথা ভুলে থাকতো। তারা কুরআনও তিলাওয়াত করতো। তারা কী তা বুঝতো না?'[৫৪]
টিকাঃ
[৫৩] ইবনু আবিদ দুনয়া, আল-আমরু বিল মারুফ ওয়ান নাহয় আনিল মুনকার: ৭৯
[৫৪] মুসনাদ আহমাদ: ১৩৫১৫, হাদীসের মান সহীহ