📄 আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হওয়া
মানুষ কাজকর্মে নামার আগে ইস্তিখারা করে নেয়। তারপর একটা কিছু বেছে নেওয়ার পর (তৎক্ষনাৎ উপকার না দেখতে পেলে) রাগান্বিত হয়ে পড়ে। এর প্রতিষেধক হলো, অন্তরে এই বিশ্বাসকে পোক্ত করা যে, মানুষের জ্ঞান কেবল বস্তু-বিষয়ের বাহ্যিক অবস্থার উপরই আবদ্ধ। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি জিনিসের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল অবস্থা সম্পর্কে অবগত। সুতরাং আল্লাহর নির্বাচন তার নিজের নির্বাচন থেকে অবশ্যই শ্রেয় হবে।
বান্দা নিজ বুদ্ধিতে যা নির্বাচন করে তা শঙ্কামুক্ত থাকে না। কারণ সে নিজেই অন্যের দ্বারা (অর্থাৎ আল্লাহর দ্বারা) পরিচালিত হয়। কাউকে পরিচালনা করে না। এবং যা কিছু ঘটার সিদ্ধান্ত হয়ে আছে তার ক্রোধ সেটা পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই তার কর্তব্য হচ্ছে নিজের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সর্বদা সন্তুষ্ট থাকাকে আবশ্যক করে নেওয়া। এতেই সে সুখী হবে। [৩৭]
টিকাঃ
[৩৫] আল ইসরা: ৩৬
[৩৬] মুসনাদ আহমাদ: ২৩৮২৪, হাদীসের মান সহীহ।
[৩৭] দারুস শুরুক থেকে প্রকাশিত নুসখায় এই জায়গাতে আরও অতিরিক্ত কিছু কথা আছে। তা হলো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বলেছেন,
مَا مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَلَهِ رِزْقٌ يَأْتِيهِ فَمَنْ رَضِيَ بِرِزْقِهِ بُوْرِكَ لَهُ فِيهِ وَوَسِعَه، وَمَنْ لَمْ يَرْضَهُ لَمْ يُبَارِكْ لَهُ فِيْهِ وَلَمْ يَسَعْهُ
"প্রত্যেকের কাছেই তার জন্য বরাদ্দকৃত রিযিক পৌঁছবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আপন রিযিকের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকবে তার রিযিকে বরকত হবে এবং তাতে প্রশস্তি আসবে। আর যে ব্যক্তি আপন রিযিকের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকবে না তার রিযিকে বরকত হবে না এবং তাতে প্রশস্তি আসবে না।"
দাউদ-আলাইহিস সালাম-বা অন্য কোনো নবি জিজ্ঞেস করেছেন, 'হে প্রভু, তোমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট বান্দা কে?' আল্লাহ তাআলা উত্তরে বললেন, 'যে ব্যক্তি আমার কাছে ইস্তিখারা করলো অর্থাৎ পরামর্শ চাইলো অতঃপর আমি তার জন্য (একটা কিছু) নির্বাচন করলাম, তখন সে আমাকে দোষ দিলো ও আমার সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো।'
প্রথম বর্ণনাটি খুবই দুর্বল। মওযু পর্যায়ের। (যঈফুল জা'মি: ৪৭১৪; ইলালু ইবনি আবী হাতিম: ১৮৪৬) আর দ্বিতীয়টির কোনো সূত্র আমি খুঁজে পাইনি, যথাসম্ভব তা ইসরাঈলী বর্ণনা। এসব কারণেই মূল অনুবাদে এই অংশটুকু আর রাখা হলো না।
📄 অতিমাত্রায় আকাঙ্ক্ষা করা
অতিমাত্রায় আকাঙ্ক্ষা করাও একটি মন্দ স্বভাব। আকাঙ্ক্ষার আধিক্যতা মানে হলো, আল্লাহর নির্ধারিত সিদ্ধান্তে ও বিচারে আপত্তি তোলা। এর প্রতিকারের পদ্ধতি হলো, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা যে, অতি আকাঙ্ক্ষার পরিণতি ফল ভালো হবে না মন্দ, পছন্দনীয় হবে না অপছন্দনীয় সেটা তার জানা নেই। তো অতি আকাঙ্ক্ষার পরিণতি ফল তার অজানা-এ কথা বোঝার পর এমনিতেই সে একে পরিহার করবে এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তা মেনে নেওয়ার প্রতি ধাবিত হবে। দেখা যাবে এর কারণে সে একসময় আত্মিক প্রশান্তি লাভ করবে।
এই কারণেই আল্লাহর নবি-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
إِذَا تَمَنَّى أَحَدُكُمْ، فَلْيَنْظُرْ مَا يَتَمَنَّى ، فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي مَا يُكْتَبُ لَهُ مِنْ أُمْنِيَّتِهِ
“যখন তোমাদের কেউ কোনো আকাঙ্ক্ষা করবে, সে যেন ভালো করে দেখে নেয় যে কীসের আকাঙ্ক্ষা করছে। কারণ তোমাদের কেউ জানে না তার কোন আশাটি ভাগ্যে লেখা আছে।”[৩৮]
অন্য আরেক হাদীসে তিনি ইরশাদ করেছেন,
لَا يَتَمَنَّيْنَّ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ لِضُرٍّ نَزَلَ بِهِ، فَإِنْ كَانَ لَا بُدَّ مُتَمَنِّيًا فَلْيَقُلْ : اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتِ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي، وَتَوَفَّنِي إِذَا كَانَتِ الْوَفَاةُ خَيْرًا لِي
“ক্ষতিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তোমাদের কেউ যাতে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা না করে। যদি তাকে আকাঙ্ক্ষা করতেই হয় তবে যেন বলে-হে আল্লাহ, আমাকে ততোদিন বাঁচিয়ে রাখো যতোদিন বেঁচে থাকা আমার জন্য কল্যাণকর। এবং আমাকে তখন মৃত্যু দাও যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর।”[৩৯]
টিকাঃ
[৩৮] মুসনাদ আহমাদ: ৮৬৮৯; হাদীসের মান যঈফ। কারণ এটি উমার বিন আবু সালামাহ এর একক বর্ণনা। আর তিনি যখন এককভাবে কোনো কিছু বর্ণনা করেন তখন তা যঈফ বলে গণ্য হয়। (দেখুন: শুয়াইব আল-আরনাউত এর তাহকীককৃত মুসনাদ আহমাদ, ১৪/৩১৬)।
[৩৯] সহীহ মুসলিম: ২৬৮০; মুসনাদ আহমাদ: ১১৯৭৯
📄 অনর্থক বিষয়ে লিপ্ত হওয়া
মানুষের একটি মন্দ অভ্যাস হলো, দুনিয়াবি বিষয়ে এবং মানুষের সাথে অতি কথনে নিমগ্ন হওয়া। এর প্রতিকার হলো, সবসময়ই আল্লাহর যিকিরে নিমগ্ন থাকা। যাতে করে দুনিয়া, দুনিয়ার মানুষজন ও দুনিয়াবি ব্যস্ততার কথা তার তেমন স্মরণে না আসে। সেই সাথে এটাও মনে রাখা যে, এসবই হলো অনর্থক ও ফায়দাহীন কাজ। সুতরাং তা পরিহার করাই উচিত। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বলেছেন,
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
'ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে সে অনর্থক বিষয় পরিহার করবে।' [৪০]
টিকাঃ
[৪০] সুনান তিরমিযি: ২৩১৭; সুনান ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৬; মুসনাদ আহমাদ: ১৭৩৭। হাদীসের মান সহীহ
📄 লৌকিকতা প্রদর্শন করা
ইবাদাত-বন্দেগিতে লৌকিকতা প্রদর্শন করা হলো মানুষের আরেকটি রোগ। এমনটা করার কারণ হলো যাতে করে অন্যরা তার ইবাদাত-বন্দেগির কথা জানতে পারে এবং তার কাজকর্মগুলো প্রত্যক্ষ করে। ফলে মানুষের কাছে তার আলাদা একটা অবস্থান তৈরি হবে। এটি দূর করতে হলে এই কথা মনে গেঁথে নিতে হবে যে, তার লাভ-ক্ষতির কোনো বিষয়ই সৃষ্টিজীবের কাছে অর্পিত হয়নি। সুতরাং এই ত্রুটি দূর করতে তার উচিত নিজের ইবাদাত-আমলে ইখলাস বা আল্লাহ-নিষ্ঠতা আনয়নের চেষ্টা করা। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ
“তাদেরকে কেবল এই বিষয়েরই আদেশ করা হয়েছে যে, তারা দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে আল্লাহর ইবাদাত করবে।”[৪১]
নবি-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-হাদীসে কুদসিতে স্বীয় রব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন,
مَنْ عَمِلَ لِي عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ غَيْرِي، فَأَنَا مِنْهُ بَرِيءٌ، وَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ
"যে ব্যক্তি আমার জন্য এমন কোনো আমল করলো, যাতে সে অন্য কাউকে আমার সাথে শরীক করলো তাহলে আমি তার থেকে মুক্ত। সে কাজ তার জন্য যাকে সে শরীক করেছে।”[৪২]
টিকাঃ
[৪১] সূরা বাইয়িনাহ: ০৫
[৪২] সুনান ইবনু মাজাহ: ৪২০২, হাদীসের মান সহীহ