📄 অতিকথনে লিপ্ত হওয়া
১. অতিকথনে লিপ্ত হওয়া মানুষের মন্দ স্বভাবগুলোর একটি। দুইটি বিষয় থেকে এর উৎপত্তি হয়ে থাকে।
২. নেতৃত্বের অভিলাষ। সে চায় মানুষ দেখুক সে কতো বেশি ইলমের অধিকারী এবং বিশুদ্ধ-কথনে পারদর্শী।
সে সামান্য ইলমের অধিকারী। ফলে তাকে অতিকথনের আশ্রয় নিয়ে তা ঢাকতে হয়। এর প্রতিষেধক হলো, এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, প্রতিটি কথার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তার অতিকথনের সবটুকু লিখে রাখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন,
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ كِرَامًا كَاتِبِينَ
“নিশ্চয়ই তোমাদের উপর হিসাবরক্ষণকারী নিয়োজিত আছেন। (তারা হলেন) সম্মানীত লেখকবৃন্দ।”[২৮]
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”[২৯]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সে যেন ভালো কথা বলে নয়তো চুপ থাকে।”[৩০]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—আরও বলেছেন,
إِنَّ البَلَاءَ مُوَكَّلٌ بِالْمَنْطِقِ
“নিশ্চয়ই বিপদাপদ কথনের সাথে সম্পৃক্ত।”[৩১]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-অন্য আরেক হাদীসে বলেছেন,
وَهَلْ يُكِبُّ النَّاسَ عَلَى وُجُوهِهِمْ فِي النَّارِ، إِلَّا حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ
“মানুষকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে কেবল তাদের জিহ্বার কামাই।”[৩২]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- (অতিকথন প্রসঙ্গে আরও) বলেছেন,
كَلَامُ ابْنِ آدَمَ عَلَيْهِ لَا لَهُ، إِلَّا الْأَمْرَ بِالْمَعْرُوفِ، وَالنَّهْيَ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَذِكْرَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“আদম সন্তানের সকল কথাই তার পক্ষে নয়, বিপক্ষে যাবে। তবে ব্যতিক্রম হলো: সৎকাজের প্রতি আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ, আল্লাহর যিকির।”[৩৩]
এই হাদীসের কথাগুলো গ্রহণ করা হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াত থেকে,
لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
“তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ভাল নয়; কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধিস্থাপন কল্পে করতো, তা স্বতন্ত্র। যে এক কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে, আমি তাকে বিরাট সওয়াব দান করবো।” [৩৪]
টিকাঃ
[২৮] সূরা ইনফিতার: ১০-১১
[২৯] সূরা কাফ: ১৮
[৩০] সহীহ বুখারি: ৬১৩৫; সহীহ মুসলিম: ৪৮
[৩১] মুসনাদ শিহাব : ২২৮। এই হাদীসের সনদ দুর্বল। নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী-রাহিমাহুল্লাহ-একে মওযু বলছেন। (সিলসিলা যঈফা: ৩৩৮৪) কিন্তু ইবনুল জাওযি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মাকাসিদে হাসানাহ-তে এই হাদীসটির সবগুলো সনদ উল্লেখ করে বিস্তারিত পর্যালোচনা করার পর মন্তব্য করেছেন, 'আমরা যা (সনদ) উল্লেখ করলাম সেগুলোর সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে এর উপর মওযু হবার সিদ্ধান্ত দেওয়া ভালো বলে মনে হয় না।' এরপর তিনি এই হাদীসের অর্থের সমর্থনে অন্য একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেন। (বিস্তারিত দেখুন: আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, ১/২৪২) এটি বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বক্তব্য হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে (যাইলাঈ, তাখরীজু আহাদীসিল কাশশাফ, ৩/৩৩৭)।
এই কথার দ্বারা বুঝানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বিপদাপদ কথাবার্তার কারণে ঘটে থাকে। কারণ মানুষ মুখ ফসকে কখন কী বলে ফেলে ঠিক নেই। তাই তো হাদীসে এসেছে, "যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।" (মুসনাদ আহমাদ: ৬৪৮১)
[৩২] সুনান তিরমিযি : ২৬১৬; সুনান ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৩; মুসনাদ আহমাদ: ২২০৬৮, হাদীসের মান সহীহ।
[৩৩] সুনান তিরমিযি: ২৪১২, সুনান ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৪।
[৩৪] সূরা আন নিসা : ১১৪
📄 সুনাম ও বদনামে সীমাহাড়া হওয়া
মানুষের একটি বদ স্বভাব হলো, কারও প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে তার সীমাতিরিক্ত সুনাম করবে। এর বিপরীতে যদি কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হয় তখন আবার সীমাছাড়া বদনাম করবে। এই বদ স্বভাবের প্রতিকার হলো, মনকে সত্য ও বাস্তবতায় অভ্যস্ত করে ফেলা। যাতে করে কারও প্রতি সন্তুষ্টি জন্মালে অতিমাত্রায় তার প্রশংসাতে লিপ্ত না হয়। এমনিভাবে কারও প্রতি রাগ জন্মালে যাতে সীমাছাড়া নিন্দা না করা হয়। এসব স্বভাবের অধিকাংশই জন্মায় মূলত আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করার কারণে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তাতে লিপ্ত হোয়ো না। নিশ্চয়ই কান, চক্ষু ও অন্তকরণ-এ সবগুলোই জিজ্ঞাসিত হবে।”[৩৫]
এমনিভাবে আল্লাহর রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
احتوا فِي وُجُوهِ الْمَدَّاحِينَ التَّرَابَ
“অতিমাত্রায় প্রশংসাকারীর মুখে ধুলোবালি নিক্ষেপ কোরো।”[৩৬]
📄 আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হওয়া
মানুষ কাজকর্মে নামার আগে ইস্তিখারা করে নেয়। তারপর একটা কিছু বেছে নেওয়ার পর (তৎক্ষনাৎ উপকার না দেখতে পেলে) রাগান্বিত হয়ে পড়ে। এর প্রতিষেধক হলো, অন্তরে এই বিশ্বাসকে পোক্ত করা যে, মানুষের জ্ঞান কেবল বস্তু-বিষয়ের বাহ্যিক অবস্থার উপরই আবদ্ধ। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি জিনিসের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল অবস্থা সম্পর্কে অবগত। সুতরাং আল্লাহর নির্বাচন তার নিজের নির্বাচন থেকে অবশ্যই শ্রেয় হবে।
বান্দা নিজ বুদ্ধিতে যা নির্বাচন করে তা শঙ্কামুক্ত থাকে না। কারণ সে নিজেই অন্যের দ্বারা (অর্থাৎ আল্লাহর দ্বারা) পরিচালিত হয়। কাউকে পরিচালনা করে না। এবং যা কিছু ঘটার সিদ্ধান্ত হয়ে আছে তার ক্রোধ সেটা পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই তার কর্তব্য হচ্ছে নিজের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সর্বদা সন্তুষ্ট থাকাকে আবশ্যক করে নেওয়া। এতেই সে সুখী হবে। [৩৭]
টিকাঃ
[৩৫] আল ইসরা: ৩৬
[৩৬] মুসনাদ আহমাদ: ২৩৮২৪, হাদীসের মান সহীহ।
[৩৭] দারুস শুরুক থেকে প্রকাশিত নুসখায় এই জায়গাতে আরও অতিরিক্ত কিছু কথা আছে। তা হলো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বলেছেন,
مَا مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَلَهِ رِزْقٌ يَأْتِيهِ فَمَنْ رَضِيَ بِرِزْقِهِ بُوْرِكَ لَهُ فِيهِ وَوَسِعَه، وَمَنْ لَمْ يَرْضَهُ لَمْ يُبَارِكْ لَهُ فِيْهِ وَلَمْ يَسَعْهُ
"প্রত্যেকের কাছেই তার জন্য বরাদ্দকৃত রিযিক পৌঁছবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আপন রিযিকের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকবে তার রিযিকে বরকত হবে এবং তাতে প্রশস্তি আসবে। আর যে ব্যক্তি আপন রিযিকের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকবে না তার রিযিকে বরকত হবে না এবং তাতে প্রশস্তি আসবে না।"
দাউদ-আলাইহিস সালাম-বা অন্য কোনো নবি জিজ্ঞেস করেছেন, 'হে প্রভু, তোমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট বান্দা কে?' আল্লাহ তাআলা উত্তরে বললেন, 'যে ব্যক্তি আমার কাছে ইস্তিখারা করলো অর্থাৎ পরামর্শ চাইলো অতঃপর আমি তার জন্য (একটা কিছু) নির্বাচন করলাম, তখন সে আমাকে দোষ দিলো ও আমার সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো।'
প্রথম বর্ণনাটি খুবই দুর্বল। মওযু পর্যায়ের। (যঈফুল জা'মি: ৪৭১৪; ইলালু ইবনি আবী হাতিম: ১৮৪৬) আর দ্বিতীয়টির কোনো সূত্র আমি খুঁজে পাইনি, যথাসম্ভব তা ইসরাঈলী বর্ণনা। এসব কারণেই মূল অনুবাদে এই অংশটুকু আর রাখা হলো না।
📄 অতিমাত্রায় আকাঙ্ক্ষা করা
অতিমাত্রায় আকাঙ্ক্ষা করাও একটি মন্দ স্বভাব। আকাঙ্ক্ষার আধিক্যতা মানে হলো, আল্লাহর নির্ধারিত সিদ্ধান্তে ও বিচারে আপত্তি তোলা। এর প্রতিকারের পদ্ধতি হলো, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা যে, অতি আকাঙ্ক্ষার পরিণতি ফল ভালো হবে না মন্দ, পছন্দনীয় হবে না অপছন্দনীয় সেটা তার জানা নেই। তো অতি আকাঙ্ক্ষার পরিণতি ফল তার অজানা-এ কথা বোঝার পর এমনিতেই সে একে পরিহার করবে এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তা মেনে নেওয়ার প্রতি ধাবিত হবে। দেখা যাবে এর কারণে সে একসময় আত্মিক প্রশান্তি লাভ করবে।
এই কারণেই আল্লাহর নবি-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
إِذَا تَمَنَّى أَحَدُكُمْ، فَلْيَنْظُرْ مَا يَتَمَنَّى ، فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي مَا يُكْتَبُ لَهُ مِنْ أُمْنِيَّتِهِ
“যখন তোমাদের কেউ কোনো আকাঙ্ক্ষা করবে, সে যেন ভালো করে দেখে নেয় যে কীসের আকাঙ্ক্ষা করছে। কারণ তোমাদের কেউ জানে না তার কোন আশাটি ভাগ্যে লেখা আছে।”[৩৮]
অন্য আরেক হাদীসে তিনি ইরশাদ করেছেন,
لَا يَتَمَنَّيْنَّ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ لِضُرٍّ نَزَلَ بِهِ، فَإِنْ كَانَ لَا بُدَّ مُتَمَنِّيًا فَلْيَقُلْ : اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتِ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي، وَتَوَفَّنِي إِذَا كَانَتِ الْوَفَاةُ خَيْرًا لِي
“ক্ষতিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তোমাদের কেউ যাতে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা না করে। যদি তাকে আকাঙ্ক্ষা করতেই হয় তবে যেন বলে-হে আল্লাহ, আমাকে ততোদিন বাঁচিয়ে রাখো যতোদিন বেঁচে থাকা আমার জন্য কল্যাণকর। এবং আমাকে তখন মৃত্যু দাও যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর।”[৩৯]
টিকাঃ
[৩৮] মুসনাদ আহমাদ: ৮৬৮৯; হাদীসের মান যঈফ। কারণ এটি উমার বিন আবু সালামাহ এর একক বর্ণনা। আর তিনি যখন এককভাবে কোনো কিছু বর্ণনা করেন তখন তা যঈফ বলে গণ্য হয়। (দেখুন: শুয়াইব আল-আরনাউত এর তাহকীককৃত মুসনাদ আহমাদ, ১৪/৩১৬)।
[৩৯] সহীহ মুসলিম: ২৬৮০; মুসনাদ আহমাদ: ১১৯৭৯