📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া তালাশ করা

📄 ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া তালাশ করা


মানুষের আত্মিক আরেকটি রোগ হলো, ইলমকে মাধ্যম বানিয়ে নেতৃত্ব তালাশ করা, অহংকার ও বড়াইয়ের পথে হাঁটা এবং উদ্ধত হওয়া। এর প্রতিকার হলো, এই বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যে, আল্লাহ তাআলা তাকে ইলম প্রদান করে স্বীয় হুকুম-আহকামের আধার বানানোর মাধ্যমে অনুগ্রহ করেছেন। ইলম ও হিকমত প্রদানের যে নিআমত তিনি তাকে দান করেছেন তার কৃতজ্ঞতা যথাযথভাবে সে আদায় করতে পারছে না। বিনয় অবলম্বন করা ও নিজেকে ছোট মনে করা তার অন্যতম কর্তব্য। সৃষ্টিজীবের প্রতি দয়া এবং তাদের প্রতি কল্যাণকামী হওয়া তার দায়িত্ব। কারণ আল্লাহর রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-থেকে বর্ণিত আছে,
مَنْ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ لِيُبَاهِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ، وَيُجَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ، وَيَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ، أَدْخَلَهُ اللَّهُ جَهَنَّمَ
“যে ব্যক্তি আলেমদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে কিংবা মুর্খদের সাথে তর্ক করতে অথবা মানুষের দৃষ্টিকে নিজের দিকে নিবদ্ধ করতে ইলম অন্বেষণ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।”[২৭]
এই কারণেই কোন এক সালাফ বলেছেন, 'যার ইলম বেশি (আল্লাহর প্রতি তার) ভয়ভীতিও বেশি।' কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
“বান্দাদের মধ্য থেকে আলেমরাই কেবল আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে।”
এক ব্যক্তি শাবি-রাহিমাহুল্লাহ-কে সম্বোধন করলো, 'হে আলেম!' তিনি তখন তাকে বললেন, 'আলেম (প্রকৃতপক্ষে) সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে ভয় করে।'

টিকাঃ
[২৭] সুনান ইবনু মাজাহ: ২৬০; শুয়াবুল ঈমান: ১৬৩৬; সুনান দারেমি: ৩৮৬ হাদীসের মান হাসান।

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 অতিকথনে লিপ্ত হওয়া

📄 অতিকথনে লিপ্ত হওয়া


১. অতিকথনে লিপ্ত হওয়া মানুষের মন্দ স্বভাবগুলোর একটি। দুইটি বিষয় থেকে এর উৎপত্তি হয়ে থাকে।
২. নেতৃত্বের অভিলাষ। সে চায় মানুষ দেখুক সে কতো বেশি ইলমের অধিকারী এবং বিশুদ্ধ-কথনে পারদর্শী।
সে সামান্য ইলমের অধিকারী। ফলে তাকে অতিকথনের আশ্রয় নিয়ে তা ঢাকতে হয়। এর প্রতিষেধক হলো, এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, প্রতিটি কথার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তার অতিকথনের সবটুকু লিখে রাখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন,
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ كِرَامًا كَاتِبِينَ
“নিশ্চয়ই তোমাদের উপর হিসাবরক্ষণকারী নিয়োজিত আছেন। (তারা হলেন) সম্মানীত লেখকবৃন্দ।”[২৮]
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”[২৯]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সে যেন ভালো কথা বলে নয়তো চুপ থাকে।”[৩০]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—আরও বলেছেন,
إِنَّ البَلَاءَ مُوَكَّلٌ بِالْمَنْطِقِ
“নিশ্চয়ই বিপদাপদ কথনের সাথে সম্পৃক্ত।”[৩১]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-অন্য আরেক হাদীসে বলেছেন,
وَهَلْ يُكِبُّ النَّاسَ عَلَى وُجُوهِهِمْ فِي النَّارِ، إِلَّا حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ
“মানুষকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে কেবল তাদের জিহ্বার কামাই।”[৩২]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- (অতিকথন প্রসঙ্গে আরও) বলেছেন,
كَلَامُ ابْنِ آدَمَ عَلَيْهِ لَا لَهُ، إِلَّا الْأَمْرَ بِالْمَعْرُوفِ، وَالنَّهْيَ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَذِكْرَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“আদম সন্তানের সকল কথাই তার পক্ষে নয়, বিপক্ষে যাবে। তবে ব্যতিক্রম হলো: সৎকাজের প্রতি আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ, আল্লাহর যিকির।”[৩৩]
এই হাদীসের কথাগুলো গ্রহণ করা হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াত থেকে,
لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
“তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ভাল নয়; কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধিস্থাপন কল্পে করতো, তা স্বতন্ত্র। যে এক কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে, আমি তাকে বিরাট সওয়াব দান করবো।” [৩৪]

টিকাঃ
[২৮] সূরা ইনফিতার: ১০-১১
[২৯] সূরা কাফ: ১৮
[৩০] সহীহ বুখারি: ৬১৩৫; সহীহ মুসলিম: ৪৮
[৩১] মুসনাদ শিহাব : ২২৮। এই হাদীসের সনদ দুর্বল। নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী-রাহিমাহুল্লাহ-একে মওযু বলছেন। (সিলসিলা যঈফা: ৩৩৮৪) কিন্তু ইবনুল জাওযি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মাকাসিদে হাসানাহ-তে এই হাদীসটির সবগুলো সনদ উল্লেখ করে বিস্তারিত পর্যালোচনা করার পর মন্তব্য করেছেন, 'আমরা যা (সনদ) উল্লেখ করলাম সেগুলোর সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে এর উপর মওযু হবার সিদ্ধান্ত দেওয়া ভালো বলে মনে হয় না।' এরপর তিনি এই হাদীসের অর্থের সমর্থনে অন্য একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেন। (বিস্তারিত দেখুন: আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, ১/২৪২) এটি বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বক্তব্য হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে (যাইলাঈ, তাখরীজু আহাদীসিল কাশশাফ, ৩/৩৩৭)।
এই কথার দ্বারা বুঝানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বিপদাপদ কথাবার্তার কারণে ঘটে থাকে। কারণ মানুষ মুখ ফসকে কখন কী বলে ফেলে ঠিক নেই। তাই তো হাদীসে এসেছে, "যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।" (মুসনাদ আহমাদ: ৬৪৮১)
[৩২] সুনান তিরমিযি : ২৬১৬; সুনান ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৩; মুসনাদ আহমাদ: ২২০৬৮, হাদীসের মান সহীহ।
[৩৩] সুনান তিরমিযি: ২৪১২, সুনান ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৪।
[৩৪] সূরা আন নিসা : ১১৪

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 সুনাম ও বদনামে সীমাহাড়া হওয়া

📄 সুনাম ও বদনামে সীমাহাড়া হওয়া


মানুষের একটি বদ স্বভাব হলো, কারও প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে তার সীমাতিরিক্ত সুনাম করবে। এর বিপরীতে যদি কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হয় তখন আবার সীমাছাড়া বদনাম করবে। এই বদ স্বভাবের প্রতিকার হলো, মনকে সত্য ও বাস্তবতায় অভ্যস্ত করে ফেলা। যাতে করে কারও প্রতি সন্তুষ্টি জন্মালে অতিমাত্রায় তার প্রশংসাতে লিপ্ত না হয়। এমনিভাবে কারও প্রতি রাগ জন্মালে যাতে সীমাছাড়া নিন্দা না করা হয়। এসব স্বভাবের অধিকাংশই জন্মায় মূলত আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করার কারণে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তাতে লিপ্ত হোয়ো না। নিশ্চয়ই কান, চক্ষু ও অন্তকরণ-এ সবগুলোই জিজ্ঞাসিত হবে।”[৩৫]
এমনিভাবে আল্লাহর রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
احتوا فِي وُجُوهِ الْمَدَّاحِينَ التَّرَابَ
“অতিমাত্রায় প্রশংসাকারীর মুখে ধুলোবালি নিক্ষেপ কোরো।”[৩৬]

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হওয়া

📄 আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হওয়া


মানুষ কাজকর্মে নামার আগে ইস্তিখারা করে নেয়। তারপর একটা কিছু বেছে নেওয়ার পর (তৎক্ষনাৎ উপকার না দেখতে পেলে) রাগান্বিত হয়ে পড়ে। এর প্রতিষেধক হলো, অন্তরে এই বিশ্বাসকে পোক্ত করা যে, মানুষের জ্ঞান কেবল বস্তু-বিষয়ের বাহ্যিক অবস্থার উপরই আবদ্ধ। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি জিনিসের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল অবস্থা সম্পর্কে অবগত। সুতরাং আল্লাহর নির্বাচন তার নিজের নির্বাচন থেকে অবশ্যই শ্রেয় হবে।
বান্দা নিজ বুদ্ধিতে যা নির্বাচন করে তা শঙ্কামুক্ত থাকে না। কারণ সে নিজেই অন্যের দ্বারা (অর্থাৎ আল্লাহর দ্বারা) পরিচালিত হয়। কাউকে পরিচালনা করে না। এবং যা কিছু ঘটার সিদ্ধান্ত হয়ে আছে তার ক্রোধ সেটা পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই তার কর্তব্য হচ্ছে নিজের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সর্বদা সন্তুষ্ট থাকাকে আবশ্যক করে নেওয়া। এতেই সে সুখী হবে। [৩৭]

টিকাঃ
[৩৫] আল ইসরা: ৩৬
[৩৬] মুসনাদ আহমাদ: ২৩৮২৪, হাদীসের মান সহীহ।
[৩৭] দারুস শুরুক থেকে প্রকাশিত নুসখায় এই জায়গাতে আরও অতিরিক্ত কিছু কথা আছে। তা হলো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বলেছেন,
مَا مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَلَهِ رِزْقٌ يَأْتِيهِ فَمَنْ رَضِيَ بِرِزْقِهِ بُوْرِكَ لَهُ فِيهِ وَوَسِعَه، وَمَنْ لَمْ يَرْضَهُ لَمْ يُبَارِكْ لَهُ فِيْهِ وَلَمْ يَسَعْهُ
"প্রত্যেকের কাছেই তার জন্য বরাদ্দকৃত রিযিক পৌঁছবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আপন রিযিকের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকবে তার রিযিকে বরকত হবে এবং তাতে প্রশস্তি আসবে। আর যে ব্যক্তি আপন রিযিকের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকবে না তার রিযিকে বরকত হবে না এবং তাতে প্রশস্তি আসবে না।"
দাউদ-আলাইহিস সালাম-বা অন্য কোনো নবি জিজ্ঞেস করেছেন, 'হে প্রভু, তোমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট বান্দা কে?' আল্লাহ তাআলা উত্তরে বললেন, 'যে ব্যক্তি আমার কাছে ইস্তিখারা করলো অর্থাৎ পরামর্শ চাইলো অতঃপর আমি তার জন্য (একটা কিছু) নির্বাচন করলাম, তখন সে আমাকে দোষ দিলো ও আমার সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো।'
প্রথম বর্ণনাটি খুবই দুর্বল। মওযু পর্যায়ের। (যঈফুল জা'মি: ৪৭১৪; ইলালু ইবনি আবী হাতিম: ১৮৪৬) আর দ্বিতীয়টির কোনো সূত্র আমি খুঁজে পাইনি, যথাসম্ভব তা ইসরাঈলী বর্ণনা। এসব কারণেই মূল অনুবাদে এই অংশটুকু আর রাখা হলো না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00