📄 ইবাদাতের স্বাদ হারিয়ে ফেলা
মানুষ অনেক সময় ইবাদাতের স্বাদ হারিয়ে ফেলে। এটা হয় অন্তরের ব্যাধি আর মনের অসুখের কারণে। এটি ফিরে পাওয়ার উপায় হচ্ছে, হালাল খাদ্য ভক্ষণ করা। সর্বদা যিকির করা। নেককার লোকদের খিদমত করা এবং তাদের সংস্পর্শে যাওয়া। ইবাদাতের স্বাদ ফিরে পাওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করা। যাতে করে তিনি অন্তরের অন্ধকার ব্যাধি দূর করে এই রোগের নিরাময় করেন। এর দ্বারা বান্দা ইবাদাতের স্বাদ পুনরায় ফিরে পাবে।
📄 অলসতায় আক্রান্ত হওয়া
অলসতায় আক্রান্ত হওয়াও মানুষের একটি বড় মনোরোগ। এর উৎপত্তি পরিতৃপ্তি থেকে হয়ে থাকে। কারণ মানুষ যখন পরিতৃপ্তি (সহযোগে আহার করে) তখন শক্তিশালী হয়। আর যখন সে শক্তিশালী হয় তখন তার নফসেরও জোর বেড়ে যায়। নফসের জোর বেড়ে গেলে অন্তর নফসের ইচ্ছাশক্তি বাস্তবায়নে তৎপর হয়। এর প্রতিকার হলো নিজেকে ক্ষুধার্ত রাখা। কারণ যখন কেউ ক্ষুধার্ত থাকে তখন নফস দুর্বল হয়ে পড়ে। আর নফস দুর্বল হয়ে পড়লে অন্তর তার উপর প্রতিপত্তি লাভ করে। নফসের উপর অন্তরের প্রতিপত্তি লাভ হলে সে তাকে ইবাদাত-বন্দেগিতে লিপ্ত করতে পারে এবং তার থেকে অলসতার চাদরকে সরিয়ে দিতে পারে। এই কারণেই রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ. بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلاَتٌ يُقِمْنَ صُلْبَهُ، فَإِنْ كَانَ لَا مَحَالَةَ فَثُلُثُ لِطَعَامِهِ وَثُلُثُ لِشَرَابِهِ وَثُلُثُ لِنَفَسِهِ.
“মানুষ পেট থেকে অধিক নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে এমন কয়েক লোকমাই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। তারচেয়েও বেশি প্রয়োজন হলে পাকস্থলীর এক তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।”[২৬]
টিকাঃ
[২৬] তিরমিযি : ২৩৮০, হাদীসের মান সহীহ; মুসনাদ আহমাদ: ১৭১৮৬। ক্ষুধা যে নফসকে ঠিক করে এবং মন্দ প্রবণতা থেকে অন্তরকে রক্ষা করে হাদীসের ভাষ্য থেকেও তা বুঝে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বলেছেন,
مَنِ اسْتَطَاعَ البَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ، فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءُ
“যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে। আর যার সামর্থ্য নেই সে যেন রোজা রাখে। কারণ তা কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে।” (সহীহ বুখারি: ১৯০৫)
📄 ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া তালাশ করা
মানুষের আত্মিক আরেকটি রোগ হলো, ইলমকে মাধ্যম বানিয়ে নেতৃত্ব তালাশ করা, অহংকার ও বড়াইয়ের পথে হাঁটা এবং উদ্ধত হওয়া। এর প্রতিকার হলো, এই বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যে, আল্লাহ তাআলা তাকে ইলম প্রদান করে স্বীয় হুকুম-আহকামের আধার বানানোর মাধ্যমে অনুগ্রহ করেছেন। ইলম ও হিকমত প্রদানের যে নিআমত তিনি তাকে দান করেছেন তার কৃতজ্ঞতা যথাযথভাবে সে আদায় করতে পারছে না। বিনয় অবলম্বন করা ও নিজেকে ছোট মনে করা তার অন্যতম কর্তব্য। সৃষ্টিজীবের প্রতি দয়া এবং তাদের প্রতি কল্যাণকামী হওয়া তার দায়িত্ব। কারণ আল্লাহর রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-থেকে বর্ণিত আছে,
مَنْ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ لِيُبَاهِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ، وَيُجَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ، وَيَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ، أَدْخَلَهُ اللَّهُ جَهَنَّمَ
“যে ব্যক্তি আলেমদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে কিংবা মুর্খদের সাথে তর্ক করতে অথবা মানুষের দৃষ্টিকে নিজের দিকে নিবদ্ধ করতে ইলম অন্বেষণ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।”[২৭]
এই কারণেই কোন এক সালাফ বলেছেন, 'যার ইলম বেশি (আল্লাহর প্রতি তার) ভয়ভীতিও বেশি।' কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
“বান্দাদের মধ্য থেকে আলেমরাই কেবল আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে।”
এক ব্যক্তি শাবি-রাহিমাহুল্লাহ-কে সম্বোধন করলো, 'হে আলেম!' তিনি তখন তাকে বললেন, 'আলেম (প্রকৃতপক্ষে) সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে ভয় করে।'
টিকাঃ
[২৭] সুনান ইবনু মাজাহ: ২৬০; শুয়াবুল ঈমান: ১৬৩৬; সুনান দারেমি: ৩৮৬ হাদীসের মান হাসান।
📄 অতিকথনে লিপ্ত হওয়া
১. অতিকথনে লিপ্ত হওয়া মানুষের মন্দ স্বভাবগুলোর একটি। দুইটি বিষয় থেকে এর উৎপত্তি হয়ে থাকে।
২. নেতৃত্বের অভিলাষ। সে চায় মানুষ দেখুক সে কতো বেশি ইলমের অধিকারী এবং বিশুদ্ধ-কথনে পারদর্শী।
সে সামান্য ইলমের অধিকারী। ফলে তাকে অতিকথনের আশ্রয় নিয়ে তা ঢাকতে হয়। এর প্রতিষেধক হলো, এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, প্রতিটি কথার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তার অতিকথনের সবটুকু লিখে রাখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন,
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ كِرَامًا كَاتِبِينَ
“নিশ্চয়ই তোমাদের উপর হিসাবরক্ষণকারী নিয়োজিত আছেন। (তারা হলেন) সম্মানীত লেখকবৃন্দ।”[২৮]
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”[২৯]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সে যেন ভালো কথা বলে নয়তো চুপ থাকে।”[৩০]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—আরও বলেছেন,
إِنَّ البَلَاءَ مُوَكَّلٌ بِالْمَنْطِقِ
“নিশ্চয়ই বিপদাপদ কথনের সাথে সম্পৃক্ত।”[৩১]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-অন্য আরেক হাদীসে বলেছেন,
وَهَلْ يُكِبُّ النَّاسَ عَلَى وُجُوهِهِمْ فِي النَّارِ، إِلَّا حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ
“মানুষকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে কেবল তাদের জিহ্বার কামাই।”[৩২]
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- (অতিকথন প্রসঙ্গে আরও) বলেছেন,
كَلَامُ ابْنِ آدَمَ عَلَيْهِ لَا لَهُ، إِلَّا الْأَمْرَ بِالْمَعْرُوفِ، وَالنَّهْيَ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَذِكْرَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“আদম সন্তানের সকল কথাই তার পক্ষে নয়, বিপক্ষে যাবে। তবে ব্যতিক্রম হলো: সৎকাজের প্রতি আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ, আল্লাহর যিকির।”[৩৩]
এই হাদীসের কথাগুলো গ্রহণ করা হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াত থেকে,
لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
“তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ভাল নয়; কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধিস্থাপন কল্পে করতো, তা স্বতন্ত্র। যে এক কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে, আমি তাকে বিরাট সওয়াব দান করবো।” [৩৪]
টিকাঃ
[২৮] সূরা ইনফিতার: ১০-১১
[২৯] সূরা কাফ: ১৮
[৩০] সহীহ বুখারি: ৬১৩৫; সহীহ মুসলিম: ৪৮
[৩১] মুসনাদ শিহাব : ২২৮। এই হাদীসের সনদ দুর্বল। নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী-রাহিমাহুল্লাহ-একে মওযু বলছেন। (সিলসিলা যঈফা: ৩৩৮৪) কিন্তু ইবনুল জাওযি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মাকাসিদে হাসানাহ-তে এই হাদীসটির সবগুলো সনদ উল্লেখ করে বিস্তারিত পর্যালোচনা করার পর মন্তব্য করেছেন, 'আমরা যা (সনদ) উল্লেখ করলাম সেগুলোর সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে এর উপর মওযু হবার সিদ্ধান্ত দেওয়া ভালো বলে মনে হয় না।' এরপর তিনি এই হাদীসের অর্থের সমর্থনে অন্য একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেন। (বিস্তারিত দেখুন: আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, ১/২৪২) এটি বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বক্তব্য হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে (যাইলাঈ, তাখরীজু আহাদীসিল কাশশাফ, ৩/৩৩৭)।
এই কথার দ্বারা বুঝানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বিপদাপদ কথাবার্তার কারণে ঘটে থাকে। কারণ মানুষ মুখ ফসকে কখন কী বলে ফেলে ঠিক নেই। তাই তো হাদীসে এসেছে, "যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।" (মুসনাদ আহমাদ: ৬৪৮১)
[৩২] সুনান তিরমিযি : ২৬১৬; সুনান ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৩; মুসনাদ আহমাদ: ২২০৬৮, হাদীসের মান সহীহ।
[৩৩] সুনান তিরমিযি: ২৪১২, সুনান ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৪।
[৩৪] সূরা আন নিসা : ১১৪