📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 সত্যকে অপছন্দ করা

📄 সত্যকে অপছন্দ করা


মনের একটা ব্যাধি হলো সে সত্যকে পছন্দ করতে চায় না। আনুগত্য তার স্বভাব-প্রকৃতি বিরুদ্ধ বিষয়। এসবের কারণে অধিকাংশ সময় স্বেচ্ছাচার ও প্রবৃত্তির অনুসরণের জন্ম হয়। যতোক্ষণ না এর গলায় মেহনত-মুজাহাদার ছুরি চালিয়ে একে হত্যা করা হয় ততোক্ষণ সে বশে আসে না।
আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বলেছেন,
فَتُوبُوا إِلَى بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ
“তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুতপ্ত হও এবং নিজেদের প্রবৃত্তিকে দমন করো।"[১৯]
এই ব্যাধির প্রতিকার হলো, সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়া। মূলত এই কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম-আলাইহিস সালাম-কে স্বীয় সন্তান যবাই করার হুকুম করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ
“যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল”[২০]
তখন তাকে বলা হলো,
قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا
“তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে।”[২১]
তারপর আল্লাহ তাআলা তাকে যবাই করার জন্য এক মহান জন্তু দান করলেন।
এর থেকে উত্তরণের উপায় হলো, পুরোপুরিভাবে মহান রবের প্রতি মনোনিবেশ স্থাপন করা।
আমি মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ রাযিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি কাসিম মিসরিকে বাগদাদে বলতে শুনেছি, ইবনু ইয়াযদায়িআর-রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো বান্দা আল্লাহর রাস্তায় বের হলে, কোন নীতির ভিত্তিতে বের হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে ইবনু ইয়াযদায়িআর বলেন: এ নীতির ভিত্তিতে (বের হবে যে,) যে অবস্থা থেকে সে বেরিয়ে গিয়েছে, ওই অবস্থায় সে আর ফিরে আসবে না এবং যেসব বিষয় থেকে সে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে সে আর চিন্তাভাবনা করবে না। তাকে বলা হলো, এ নিয়ম তো তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, যে (আয়েশি অবস্থায় কিছুদিন) থাকার পর বের হয়েছে; কিন্তু যে ব্যক্তি কোনো কালে (আয়েশি অবস্থায়) না থেকেই (আল্লাহর রাস্তায়) বেরিয়েছে, তার ক্ষেত্রে বিধান কী? তিনি বলেন, 'ভবিষ্যতের কাজে মিষ্টতা অনুভব করলে, ধরে নেওয়া হবে-তার অতীতও কেটেছে তিক্ততায়, (বিলাসিতায় নয়)।'

টিকাঃ
[১৯] সূরা বাকারা : ৫৪
[২০] সূরা সাফফাত: ১০৩
[২১] সূরা সাফফাত: ১০৫

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 মন্দ ভাবনা-চিন্তাকে অন্তরে প্রশ্রয় দেওয়া

📄 মন্দ ভাবনা-চিন্তাকে অন্তরে প্রশ্রয় দেওয়া


অন্তরে উদিত হওয়া বিভিন্ন কুচিন্তাকে প্রশ্রয় দেওয়া মানুষের একটি মনোরোগ। এর কারণে পাপাচারে লিপ্ত হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। একে প্রতিহত করতে হলে শুরু থেকেই বাজে চিন্তা-ভাবনা বর্জন করতে হবে। যাতে করে তা পাকাপোক্ত না হয়ে যায়। এর জন্য সহায়ক কাজগুলো হলো, সর্বদা আল্লাহ তাআলার যিকর করা। যেখানেই থাকেন, যেভাবেই থাকেন আল্লাহ তাআলার ভয়কে অন্তরে লালন করা। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলের গোপন খবরাখবর জানেন, যেভাবে অন্যরা আমাদের বাহ্যিক অবস্থা সম্পর্কে জানে। এমনটা করতে পারলে অন্যদের দেখানোর জন্য বাহ্যিক অবস্থাকে পরিপাটি করে নিজের ভেতরটাকে নোংরা করে রাখতে এমনিতেই লজ্জাবোধ হবে।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা-সুরত ও ধন-সম্পদ দেখেন না। বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমলসমূহ।”[২২]
আমি আবু বকর রাযিকে বলতে শুনেছি, ইবরাহীম খওয়াসের ছাত্র আবুল হাসান আলাবি বলেছেন, আমি ইবরাহীম খওয়াস-রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'অন্তরের কুভাবনা পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার প্রথম ধাপ। যদি কুভাবনায় আক্রান্ত ব্যক্তি কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও শুরু থেকেই এর লাগাম টেনে ধরতে পারে তবে একে শায়েস্তা করা সম্ভব। অন্যথায় এটি প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে এবং এক সময়ে কুমন্ত্রণায় রূপান্তরিত হবে। যদি মেহনত-মুজাহাদার মাধ্যমে একে দমিয়ে রাখা না হয় তাহলে তা কুপ্রবৃত্তির আকার ধারণ করে কামনা চরিতার্থ করার দিকে ঠেলে দেয় এবং বিবেক-বুদ্ধি, জ্ঞান ও বক্তব্য সবকিছুকেই আচ্ছাদিত করে ফেলে।' এমনটিই বর্ণিত হয়েছে যে, কুপ্রবৃত্তি ও মন্দ ভাবনা জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধিকে পরাভূত করে ফেলে।

টিকাঃ
[২২] সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪, মুসনাদ আহমাদ: ৭৮২৭

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 অন্যের দোষ তালাশ করা

📄 অন্যের দোষ তালাশ করা


মানুষের একটি বদ স্বভাব হলো, সে নিজের দোষ দেখে না। কেবল অন্যের দোষই তার নজরে পড়ে। এর প্রতিকারের জন্য নিজের দোষ-ত্রুটির প্রতি লক্ষ করতে হবে। সে সম্পর্কে জানতে হবে। প্রবৃত্তির কুট-কৌশলের ব্যাপারে অবগত হতে হবে। ভ্রমণ এবং পর্যটন করা, নেককার লোকদের সংস্পর্শ গ্রহণ করা ও তাদের আদেশ মাথা পেতে মেনে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিজেকে সংশোধনের জন্য এসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে যদি না-ও পারে, অন্তত অন্যের দোষ-ত্রুটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। দোষী ব্যক্তিকে মায়ুর ও অক্ষম মনে করে তার দোষটা ঢেকে রাখতে হবে। আশা করা যায় এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো সংশোধন করে দিবেন।
আল্লাহর নবি-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বলেছেন,
مَنْ سَتَرَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُসْلِمِ، سَتَرَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ
“যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষত্রুটি গোপন রাখবে আল্লাহ তাআলা তার দোষ-ত্রুটি আড়াল করে রাখবেন।” [২৩]
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—আরও বলেছেন,
مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ، وَمَنْ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي جَوْفِ بَيْتِهِ
“যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ খুঁজেখুঁজে বের করে, আল্লাহ তাআলা-ও তার দোষ খুঁজেখুঁজে বের করবেন এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে তাকে অপদস্থ করবেন। যদিও সে আপন ঘরের মধ্যস্থলে অবস্থান করে।”[২৪]
আমি মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন সাযানকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি ইবনু ইয়াযদান মাদাঈনিকে বলতে শুনেছি, 'আমি এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যাদের বহু দোষ-ত্রুটি ও মন্দ স্বভাব ছিলো। কিন্তু তারা অন্যদের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার ফলে আল্লাহও তাদের দোষ-ত্রুটি গোপন রেখেছেন। অবশেষে এক সময়ে তাদের সেসব দোষ-ত্রুটি ও মন্দ স্বভাব বিদূরিত হয়ে যায়। আবার এমন লোকদেরকেও দেখেছি, যাদের তেমন দোষ-ত্রুটি ও মন্দ স্বভাব ছিলো না। কিন্তু তারা অন্যদের দোষচর্চায় লিপ্ত হবার দরুন নিজেরাও সেসবে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।'

টিকাঃ
[২৩] সুনান ইবনু মাজাহ: ২৫৪৬; হাদীসের মান সহীহ।
[২৪] মুসনাদ আবু ইয়ালা আল-মুওসিলি: ১৬৭৫, হাদীসের মান হাসান; তাছাড়া ইমাম তিরমিযি-রাহিমাহুল্লাহ-ও স্বীয় হাদীস গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন। তবে সেই বর্ণনাতে ঘরের পরিবর্তে উটের হাওদার কথা বলা হয়েছে (হাদীস নং: ২০৩২)।

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 অলসতা ও ঢিলেমিতে আক্রান্ত হওয়া

📄 অলসতা ও ঢিলেমিতে আক্রান্ত হওয়া


মানুষের মন্দ স্বভাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অলসতায় আক্রান্ত হওয়া, ঢিলেমি করা, সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হওয়া, টালবাহানার পথ বেছে নেওয়া, দীর্ঘ-আশা পোষণ করা ও মৃত্যুকে সুদূরপরাহত ভাবা।
এসবের প্রতিকার বিষয়ে আমি হুসাইন বিন ইয়াহয়াকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি জাফর খলদিকে বলতে শুনেছি যে, জুনাইদ বাগদাদি-রাহিমাহুল্লাহ-কে প্রশ্ন করা হলো, 'আল্লাহর কাছে একান্তে পৌঁছার উপায় কী?' তিনি জবাব দিলেন, 'এমনভাবে তাওবা করা, যা গুনাহের পুনরাবৃত্তিকে বিনাশ করে দেয়। আল্লাহকে এমনভাবে ভয় করা, যা টালবাহানা করার মানসিকতাকে খতম করে দেয়। এমনভাবে আমল করায় মনোযোগী হওয়া, যা দীর্ঘ-আশা পোষণ করাকে স্বল্পতায় নামিয়ে দেয়। সময়ে সময়ে আল্লাহর যিকির করা ও তার কথা স্মরণ করা। দীর্ঘ-আশা থেকে নিজেকে দূরে রাখা ও মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছার (কথা স্মরণ করিয়ে) স্বীয় খাহেশাতকে অবদমিত করে রাখা।'
পুনরায় তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'কীভাবে একজন মানুষ নিজেকে এসব গুণাবলিতে উন্নীত করতে পারবে?' তিনি বললেন, 'একাগ্রচিত্ত ও একনিষ্ঠ হৃদয়ের সহায়তায়।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00