📄 ইবাদত-বন্দেগিতে অতৃপ্তি
মানুষ ইবাদাত-বন্দেগি করে কিন্তু তাতে কোনো তৃপ্তি পায় না। এর কারণ হলো ইবাদাতের সাথে লৌকিকতার সংমিশ্রণ ঘটা এবং ইখলাসের কমতি থাকা। অথবা ইবাদাতের মধ্যে কোনো সুন্নাহকে পরিহার করা।
এর প্রতিকার হলো, নিজের মধ্যে ইখলাস সৃষ্টি করা। কাজেকর্মে সর্বদা সুন্নাহের অনুকরণ করা। প্রত্যেকটা কাজের শুরুটা সুন্দর ও সুচারুরূপে শুরু করা। যাতে করে শেষটাও সুন্দর হয়।
📄 কুপ্রবৃত্তির বশে আটকা পড়া
অন্তরকে আখিরাতের জন্য সতেজ-সজীব রাখা ততোক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতোক্ষণ না দুনিয়া থেকে তাকে বিমুখ করে তোলা হয়। অন্যদের থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্তও অন্তরের আল্লাহ-প্রাপ্তি ঘটে না।
ইয়াহইয়া বিন মুয়ায রাযি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজেকে ক্ষয়ে দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে ব্রতী হয় আল্লাহ তাআলা তাকে রক্ষা করেন।' অর্থাৎ তিনি তাকে কুপ্রবৃত্তির হাত থেকে হিফাজত করেন এবং মনের অনিচ্ছুক কাজ করতে মানসিক শক্তি প্রদান করেন। কারণ মানুষের মন সত্যের সঙ্গী হতে কখনো পছন্দ করে না।
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ، وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ
“জান্নাত দুঃখ-কষ্ট ও শ্রমসাধ্য বিষয় দ্বারা ঘেরা এবং জাহান্নাম কুপ্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা দ্বারা ঘেরা।”[১৮]
এই বিষয়ে মনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে রাত্রিজাগরণ ও ক্ষুৎপিপাসার দ্বারস্থ হতে হবে। আপন স্বভাব-প্রকৃতির বিরোধিতা করার অবস্থান নিতে হবে। কুপ্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা থেকে মনকে বারণ করতে হবে।
মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বিন ফযলকে আমি বলতে শুনেছি, আমি মুহাম্মাদ বিন রূমীকে বলতে শুনেছি, ইয়াহইয়া বিন মুয়ায রাযি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, 'ক্ষুধা এমন এক খাদ্য, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা সত্যবাদীদের দেহকে শক্তিশালী করে থাকেন।'
টিকাঃ
[১৮] সহীহ মুসলিম: ২৮২২
📄 সত্যকে অপছন্দ করা
মনের একটা ব্যাধি হলো সে সত্যকে পছন্দ করতে চায় না। আনুগত্য তার স্বভাব-প্রকৃতি বিরুদ্ধ বিষয়। এসবের কারণে অধিকাংশ সময় স্বেচ্ছাচার ও প্রবৃত্তির অনুসরণের জন্ম হয়। যতোক্ষণ না এর গলায় মেহনত-মুজাহাদার ছুরি চালিয়ে একে হত্যা করা হয় ততোক্ষণ সে বশে আসে না।
আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বলেছেন,
فَتُوبُوا إِلَى بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ
“তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুতপ্ত হও এবং নিজেদের প্রবৃত্তিকে দমন করো।"[১৯]
এই ব্যাধির প্রতিকার হলো, সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়া। মূলত এই কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম-আলাইহিস সালাম-কে স্বীয় সন্তান যবাই করার হুকুম করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ
“যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল”[২০]
তখন তাকে বলা হলো,
قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا
“তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে।”[২১]
তারপর আল্লাহ তাআলা তাকে যবাই করার জন্য এক মহান জন্তু দান করলেন।
এর থেকে উত্তরণের উপায় হলো, পুরোপুরিভাবে মহান রবের প্রতি মনোনিবেশ স্থাপন করা।
আমি মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ রাযিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি কাসিম মিসরিকে বাগদাদে বলতে শুনেছি, ইবনু ইয়াযদায়িআর-রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো বান্দা আল্লাহর রাস্তায় বের হলে, কোন নীতির ভিত্তিতে বের হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে ইবনু ইয়াযদায়িআর বলেন: এ নীতির ভিত্তিতে (বের হবে যে,) যে অবস্থা থেকে সে বেরিয়ে গিয়েছে, ওই অবস্থায় সে আর ফিরে আসবে না এবং যেসব বিষয় থেকে সে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে সে আর চিন্তাভাবনা করবে না। তাকে বলা হলো, এ নিয়ম তো তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, যে (আয়েশি অবস্থায় কিছুদিন) থাকার পর বের হয়েছে; কিন্তু যে ব্যক্তি কোনো কালে (আয়েশি অবস্থায়) না থেকেই (আল্লাহর রাস্তায়) বেরিয়েছে, তার ক্ষেত্রে বিধান কী? তিনি বলেন, 'ভবিষ্যতের কাজে মিষ্টতা অনুভব করলে, ধরে নেওয়া হবে-তার অতীতও কেটেছে তিক্ততায়, (বিলাসিতায় নয়)।'
টিকাঃ
[১৯] সূরা বাকারা : ৫৪
[২০] সূরা সাফফাত: ১০৩
[২১] সূরা সাফফাত: ১০৫
📄 মন্দ ভাবনা-চিন্তাকে অন্তরে প্রশ্রয় দেওয়া
অন্তরে উদিত হওয়া বিভিন্ন কুচিন্তাকে প্রশ্রয় দেওয়া মানুষের একটি মনোরোগ। এর কারণে পাপাচারে লিপ্ত হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। একে প্রতিহত করতে হলে শুরু থেকেই বাজে চিন্তা-ভাবনা বর্জন করতে হবে। যাতে করে তা পাকাপোক্ত না হয়ে যায়। এর জন্য সহায়ক কাজগুলো হলো, সর্বদা আল্লাহ তাআলার যিকর করা। যেখানেই থাকেন, যেভাবেই থাকেন আল্লাহ তাআলার ভয়কে অন্তরে লালন করা। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলের গোপন খবরাখবর জানেন, যেভাবে অন্যরা আমাদের বাহ্যিক অবস্থা সম্পর্কে জানে। এমনটা করতে পারলে অন্যদের দেখানোর জন্য বাহ্যিক অবস্থাকে পরিপাটি করে নিজের ভেতরটাকে নোংরা করে রাখতে এমনিতেই লজ্জাবোধ হবে।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা-সুরত ও ধন-সম্পদ দেখেন না। বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমলসমূহ।”[২২]
আমি আবু বকর রাযিকে বলতে শুনেছি, ইবরাহীম খওয়াসের ছাত্র আবুল হাসান আলাবি বলেছেন, আমি ইবরাহীম খওয়াস-রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'অন্তরের কুভাবনা পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার প্রথম ধাপ। যদি কুভাবনায় আক্রান্ত ব্যক্তি কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও শুরু থেকেই এর লাগাম টেনে ধরতে পারে তবে একে শায়েস্তা করা সম্ভব। অন্যথায় এটি প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে এবং এক সময়ে কুমন্ত্রণায় রূপান্তরিত হবে। যদি মেহনত-মুজাহাদার মাধ্যমে একে দমিয়ে রাখা না হয় তাহলে তা কুপ্রবৃত্তির আকার ধারণ করে কামনা চরিতার্থ করার দিকে ঠেলে দেয় এবং বিবেক-বুদ্ধি, জ্ঞান ও বক্তব্য সবকিছুকেই আচ্ছাদিত করে ফেলে।' এমনটিই বর্ণিত হয়েছে যে, কুপ্রবৃত্তি ও মন্দ ভাবনা জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধিকে পরাভূত করে ফেলে।
টিকাঃ
[২২] সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪, মুসনাদ আহমাদ: ৭৮২৭