📄 আমলের তাওফীক থেকে বঞ্চিত হওয়া
অনেক মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয় যে আমলগুলো সে আগে করতো এখন তা করা বাদ দিয়েছে। এটি একটি নিন্দনীয় বিষয়। তবে তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় বিষয় হলো এই অধঃপতন ও অবনতি নিয়ে চিন্তিত না হওয়া। তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় হলো এই বিষয়গুলোকে অবনতি বা অধঃপতন বলে মনে না করা। তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় হলো এমন অধঃপতন ও অবনতিতে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও মনে করা যে তার সব কিছু ঠিকঠাকই আছে। আল্লাহ তাআলা তাকে যখন সেই আমলগুলো করার তাওফীক দান করেছিলেন তখন বেশি বেশি তাঁর শুকরিয়া আদায় না করার কারণেই এমনটি হয়ে থাকে। যখন আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করা হয় না তখন বান্দাকে আমলের জায়গা থেকে সরিয়ে অবনতি আর অক্ষমতা ও নিষ্ক্রিয়তার স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। তার দোষ-ত্রুটির সামনে আড়াল তৈরি করে দেওয়া হয়। ফলে মন্দ বিষয়গুলোই তার কাছে চমৎকার বলে প্রতিভাত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَمَنْ زُيَّنَ لَهُ سُوءُ عَمَلِهِ فَرَآهُ حَسَنًا
“কাউকে যদি তার অসৎ কাজ সুশোভিত করে দেখানো হয় অতপর সে ওটাকে ভালো মনে করে, (সে কি ওই ব্যক্তির মতো, যে ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ মনে করে?)”[১৩]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
“এবং তারা ধারণা করে যে তারা ভালো কাজ করছে। (অথচ তাদের ধারণা সঠিক নয়।) [১৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
كَذَلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ
“এভাবেই প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের কর্মকে আমি সজ্জিত করেছি।”[১৫]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
"প্রত্যেক দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।”[১৬]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ
“আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করবো যে তারা জানতে পারবে না।" [১৭]
এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, সদাসর্বদা আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহণ করা। সবসময় তাঁর যিকর করা, কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করা, এর অর্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, মুসলিমদের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করা, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাছে দুআ চাওয়া। যাতে তারা তার জন্য পূর্বের অবস্থা ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করে। আশা করা যায় (এসবের মাধ্যমে) আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে নেক আমল ও ইবাদাত-বন্দেগি করার দরজা তার জন্য অবমুক্ত দিবেন।
টিকাঃ
[১৩] সূরা ফাতির : ৮
[১৪] সূরা কাহাফ: ১০৪
[১৫] সূরা আনআম: ১০৮
[১৬] সূরা রুম: ৩২
[১৭] সূরা কলম: ৪৪; মাকতাবাতুস সাহাবা থেকে প্রকাশিত নুসখায় শুধু প্রথম আয়াতটি আছে। বাকিগুলো নেই। সেগুলো আছে দারুস শুরুক থেকে প্রকাশিত নুসখায়।
📄 ইবাদত-বন্দেগিতে অতৃপ্তি
মানুষ ইবাদাত-বন্দেগি করে কিন্তু তাতে কোনো তৃপ্তি পায় না। এর কারণ হলো ইবাদাতের সাথে লৌকিকতার সংমিশ্রণ ঘটা এবং ইখলাসের কমতি থাকা। অথবা ইবাদাতের মধ্যে কোনো সুন্নাহকে পরিহার করা।
এর প্রতিকার হলো, নিজের মধ্যে ইখলাস সৃষ্টি করা। কাজেকর্মে সর্বদা সুন্নাহের অনুকরণ করা। প্রত্যেকটা কাজের শুরুটা সুন্দর ও সুচারুরূপে শুরু করা। যাতে করে শেষটাও সুন্দর হয়।
📄 কুপ্রবৃত্তির বশে আটকা পড়া
অন্তরকে আখিরাতের জন্য সতেজ-সজীব রাখা ততোক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতোক্ষণ না দুনিয়া থেকে তাকে বিমুখ করে তোলা হয়। অন্যদের থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্তও অন্তরের আল্লাহ-প্রাপ্তি ঘটে না।
ইয়াহইয়া বিন মুয়ায রাযি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজেকে ক্ষয়ে দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে ব্রতী হয় আল্লাহ তাআলা তাকে রক্ষা করেন।' অর্থাৎ তিনি তাকে কুপ্রবৃত্তির হাত থেকে হিফাজত করেন এবং মনের অনিচ্ছুক কাজ করতে মানসিক শক্তি প্রদান করেন। কারণ মানুষের মন সত্যের সঙ্গী হতে কখনো পছন্দ করে না।
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ، وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ
“জান্নাত দুঃখ-কষ্ট ও শ্রমসাধ্য বিষয় দ্বারা ঘেরা এবং জাহান্নাম কুপ্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা দ্বারা ঘেরা।”[১৮]
এই বিষয়ে মনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে রাত্রিজাগরণ ও ক্ষুৎপিপাসার দ্বারস্থ হতে হবে। আপন স্বভাব-প্রকৃতির বিরোধিতা করার অবস্থান নিতে হবে। কুপ্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা থেকে মনকে বারণ করতে হবে।
মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বিন ফযলকে আমি বলতে শুনেছি, আমি মুহাম্মাদ বিন রূমীকে বলতে শুনেছি, ইয়াহইয়া বিন মুয়ায রাযি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, 'ক্ষুধা এমন এক খাদ্য, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা সত্যবাদীদের দেহকে শক্তিশালী করে থাকেন।'
টিকাঃ
[১৮] সহীহ মুসলিম: ২৮২২
📄 সত্যকে অপছন্দ করা
মনের একটা ব্যাধি হলো সে সত্যকে পছন্দ করতে চায় না। আনুগত্য তার স্বভাব-প্রকৃতি বিরুদ্ধ বিষয়। এসবের কারণে অধিকাংশ সময় স্বেচ্ছাচার ও প্রবৃত্তির অনুসরণের জন্ম হয়। যতোক্ষণ না এর গলায় মেহনত-মুজাহাদার ছুরি চালিয়ে একে হত্যা করা হয় ততোক্ষণ সে বশে আসে না।
আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বলেছেন,
فَتُوبُوا إِلَى بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ
“তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুতপ্ত হও এবং নিজেদের প্রবৃত্তিকে দমন করো।"[১৯]
এই ব্যাধির প্রতিকার হলো, সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়া। মূলত এই কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম-আলাইহিস সালাম-কে স্বীয় সন্তান যবাই করার হুকুম করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ
“যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল”[২০]
তখন তাকে বলা হলো,
قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا
“তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে।”[২১]
তারপর আল্লাহ তাআলা তাকে যবাই করার জন্য এক মহান জন্তু দান করলেন।
এর থেকে উত্তরণের উপায় হলো, পুরোপুরিভাবে মহান রবের প্রতি মনোনিবেশ স্থাপন করা।
আমি মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ রাযিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি কাসিম মিসরিকে বাগদাদে বলতে শুনেছি, ইবনু ইয়াযদায়িআর-রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো বান্দা আল্লাহর রাস্তায় বের হলে, কোন নীতির ভিত্তিতে বের হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে ইবনু ইয়াযদায়িআর বলেন: এ নীতির ভিত্তিতে (বের হবে যে,) যে অবস্থা থেকে সে বেরিয়ে গিয়েছে, ওই অবস্থায় সে আর ফিরে আসবে না এবং যেসব বিষয় থেকে সে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে সে আর চিন্তাভাবনা করবে না। তাকে বলা হলো, এ নিয়ম তো তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, যে (আয়েশি অবস্থায় কিছুদিন) থাকার পর বের হয়েছে; কিন্তু যে ব্যক্তি কোনো কালে (আয়েশি অবস্থায়) না থেকেই (আল্লাহর রাস্তায়) বেরিয়েছে, তার ক্ষেত্রে বিধান কী? তিনি বলেন, 'ভবিষ্যতের কাজে মিষ্টতা অনুভব করলে, ধরে নেওয়া হবে-তার অতীতও কেটেছে তিক্ততায়, (বিলাসিতায় নয়)।'
টিকাঃ
[১৯] সূরা বাকারা : ৫৪
[২০] সূরা সাফফাত: ১০৩
[২১] সূরা সাফফাত: ১০৫