📄 সৃষ্টিজীবের কাছে ধর্ণা দেওয়া
মানুষ অনেক সময় এমন ব্যক্তির কাছে ধর্ণা দেয়, যে বিপদ-মুসিবত দূরকরণের ক্ষমতা রাখে না এবং এমন ব্যক্তির কাছে প্রত্যাশা করে, যে উপকারসাধনে সক্ষম নয়। রিযিক নিয়ে সে খুব বেশি দুশ্চিন্তায় ভোগে। অথচ তার জন্য রিযিকের দায়িত্ব (স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই) গ্রহণ করেছেন।
এই ব্যাধির প্রতিকার সাধনে সর্বপ্রথম নিজের ঈমানকে বিশুদ্ধ করে নিতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে বলেছেন,
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ
"যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো বিপদে আক্রান্ত করেন তবে তিনি ছাড়া তা দূরীভূত করার আর কেউ নাই। আর যদি তিনি তোমার কোনো কল্যাণ চান তবে তাহলে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করবে এমন কেউ নাই। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করেন।" [৯]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
مَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا
“ভূপৃষ্ঠে যতো প্রাণী রয়েছে সকলের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর ন্যস্ত। এবং তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল।”[১০]
আহনাফ বিন কায়েস-রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'কীভাবে আপনি নিজ কওমের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন অথচ আপনি বয়সে তাদের চেয়ে বড় নন?' তিনি উত্তরে জানালেন, 'আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাতে আমি কখনো অবহেলা করি না। আর সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব আমি নিই না।'[১১]
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ
“তুমি তাঁর ইবাদাত করো এবং তাঁর উপর ভরসা করো।”[১২]
মানুষ যখন সৃষ্টিজীবের দুর্বলতা ও অক্ষমতার দিকে লক্ষ করবে তখন সে এই বিষয়টি বুঝতে পারবে—যে ব্যক্তি নিজেই হাজারও প্রয়োজনের মুখাপেক্ষী সে অন্যের প্রয়োজন দূর করবে কীভাবে? যে নিজেই অক্ষম সে তো অন্যের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে সক্ষম নয়। ফলে একসময় এমন ভুলের সীমানা থেকে বেরিয়ে সে পুরোপুরি আল্লাহমুখী হয়ে পড়বে।
টিকাঃ
[৯] সূরা ইউনুস: ১০৭
[১০] সূরা হুদ : ৬
[১১] মাকতাবাতুস সাহাবাহ থেকে প্রকাশিত মাজদি সাইয়িদের তাহকিককৃত নুসখাতে এই ঘটনাটি নেই। কিন্তু দারুস শুরুক থেকে প্রকাশিত ডক্টর আবদুল মুনঈম খফাজি ও ডক্টর আবদুল আযীয শারফ-এর তাহকিককৃত নুসখাতে আছে।
[১২] সূরা হুদ: ১২৩
📄 আমলের তাওফীক থেকে বঞ্চিত হওয়া
অনেক মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয় যে আমলগুলো সে আগে করতো এখন তা করা বাদ দিয়েছে। এটি একটি নিন্দনীয় বিষয়। তবে তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় বিষয় হলো এই অধঃপতন ও অবনতি নিয়ে চিন্তিত না হওয়া। তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় হলো এই বিষয়গুলোকে অবনতি বা অধঃপতন বলে মনে না করা। তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় হলো এমন অধঃপতন ও অবনতিতে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও মনে করা যে তার সব কিছু ঠিকঠাকই আছে। আল্লাহ তাআলা তাকে যখন সেই আমলগুলো করার তাওফীক দান করেছিলেন তখন বেশি বেশি তাঁর শুকরিয়া আদায় না করার কারণেই এমনটি হয়ে থাকে। যখন আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করা হয় না তখন বান্দাকে আমলের জায়গা থেকে সরিয়ে অবনতি আর অক্ষমতা ও নিষ্ক্রিয়তার স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। তার দোষ-ত্রুটির সামনে আড়াল তৈরি করে দেওয়া হয়। ফলে মন্দ বিষয়গুলোই তার কাছে চমৎকার বলে প্রতিভাত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَمَنْ زُيَّنَ لَهُ سُوءُ عَمَلِهِ فَرَآهُ حَسَنًا
“কাউকে যদি তার অসৎ কাজ সুশোভিত করে দেখানো হয় অতপর সে ওটাকে ভালো মনে করে, (সে কি ওই ব্যক্তির মতো, যে ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ মনে করে?)”[১৩]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
“এবং তারা ধারণা করে যে তারা ভালো কাজ করছে। (অথচ তাদের ধারণা সঠিক নয়।) [১৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
كَذَلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ
“এভাবেই প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের কর্মকে আমি সজ্জিত করেছি।”[১৫]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
"প্রত্যেক দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।”[১৬]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ
“আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করবো যে তারা জানতে পারবে না।" [১৭]
এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, সদাসর্বদা আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহণ করা। সবসময় তাঁর যিকর করা, কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করা, এর অর্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, মুসলিমদের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করা, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাছে দুআ চাওয়া। যাতে তারা তার জন্য পূর্বের অবস্থা ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করে। আশা করা যায় (এসবের মাধ্যমে) আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে নেক আমল ও ইবাদাত-বন্দেগি করার দরজা তার জন্য অবমুক্ত দিবেন।
টিকাঃ
[১৩] সূরা ফাতির : ৮
[১৪] সূরা কাহাফ: ১০৪
[১৫] সূরা আনআম: ১০৮
[১৬] সূরা রুম: ৩২
[১৭] সূরা কলম: ৪৪; মাকতাবাতুস সাহাবা থেকে প্রকাশিত নুসখায় শুধু প্রথম আয়াতটি আছে। বাকিগুলো নেই। সেগুলো আছে দারুস শুরুক থেকে প্রকাশিত নুসখায়।
📄 ইবাদত-বন্দেগিতে অতৃপ্তি
মানুষ ইবাদাত-বন্দেগি করে কিন্তু তাতে কোনো তৃপ্তি পায় না। এর কারণ হলো ইবাদাতের সাথে লৌকিকতার সংমিশ্রণ ঘটা এবং ইখলাসের কমতি থাকা। অথবা ইবাদাতের মধ্যে কোনো সুন্নাহকে পরিহার করা।
এর প্রতিকার হলো, নিজের মধ্যে ইখলাস সৃষ্টি করা। কাজেকর্মে সর্বদা সুন্নাহের অনুকরণ করা। প্রত্যেকটা কাজের শুরুটা সুন্দর ও সুচারুরূপে শুরু করা। যাতে করে শেষটাও সুন্দর হয়।
📄 কুপ্রবৃত্তির বশে আটকা পড়া
অন্তরকে আখিরাতের জন্য সতেজ-সজীব রাখা ততোক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতোক্ষণ না দুনিয়া থেকে তাকে বিমুখ করে তোলা হয়। অন্যদের থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্তও অন্তরের আল্লাহ-প্রাপ্তি ঘটে না।
ইয়াহইয়া বিন মুয়ায রাযি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজেকে ক্ষয়ে দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে ব্রতী হয় আল্লাহ তাআলা তাকে রক্ষা করেন।' অর্থাৎ তিনি তাকে কুপ্রবৃত্তির হাত থেকে হিফাজত করেন এবং মনের অনিচ্ছুক কাজ করতে মানসিক শক্তি প্রদান করেন। কারণ মানুষের মন সত্যের সঙ্গী হতে কখনো পছন্দ করে না।
রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন,
حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ، وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ
“জান্নাত দুঃখ-কষ্ট ও শ্রমসাধ্য বিষয় দ্বারা ঘেরা এবং জাহান্নাম কুপ্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা দ্বারা ঘেরা।”[১৮]
এই বিষয়ে মনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে রাত্রিজাগরণ ও ক্ষুৎপিপাসার দ্বারস্থ হতে হবে। আপন স্বভাব-প্রকৃতির বিরোধিতা করার অবস্থান নিতে হবে। কুপ্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা থেকে মনকে বারণ করতে হবে।
মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বিন ফযলকে আমি বলতে শুনেছি, আমি মুহাম্মাদ বিন রূমীকে বলতে শুনেছি, ইয়াহইয়া বিন মুয়ায রাযি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, 'ক্ষুধা এমন এক খাদ্য, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা সত্যবাদীদের দেহকে শক্তিশালী করে থাকেন।'
টিকাঃ
[১৮] সহীহ মুসলিম: ২৮২২