📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 মনের অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা

📄 মনের অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা


মনের একটি রোগ হলো, সে নিজেকে মুক্তির দ্বারপ্রান্তে উপনীত মনে করে। সে ভাবে, বিভিন্ন যিকর-আযকার ও ইবাদাত-বন্দেগী দিয়ে মুক্তির দরজায় কড়া নাড়বে আর দরজা তার জন্য সুন্দরভাবে খুলে যাবে। অথচ বাস্তবে দেখা যায় অবাধ্যতা আর পাপাচারের মাধ্যমে সে নিজেই মুক্তির দরজাকে বন্ধ করে ফেলার সকল আয়োজন সম্পন্ন করে রাখে।
হুসাইন বিন ইয়াহয়া আমাকে জাফর বিন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি মাসরূক-রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, রাবিয়া আদাওয়ীয়াহ-রাহিমাহাল্লাহ-একবার সালিহ মিররির মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। সে সময় সালিহ বলছিলেন, 'যে ব্যক্তি দরজার কড়া অনবরত নাড়াতেই থাকবে, আশা করা যায় তার জন্য দরজা খোলা হবে।' এই কথা শুনে রাবিয়া বললেন, 'দরজা খোলাই থাকে। কিন্তু বান্দা নিজেই তো সেই দরজা থেকে পলায়ন করে।[৮]
ভুল পথে পা বাড়িয়ে উদ্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার আশা করা যায় না। সুতরাং একজন বান্দা নিজের জন্য কুপ্রবৃত্তির দরজা উন্মুক্ত করে কীভাবে মুক্তির আশা করতে পারে? যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বারণ করতে পারে না তার মুক্তি তো সুদূরপরাহত।
ইবনু আবিদ দুনয়া-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, কোনো এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, 'তোমার ভেতর পঙ্কিলতা থাকলে তুমি মুক্তি পাবে বলে আশা কোরো না।'
এই সমস্যার সমাধান বিষয়ে বিশিষ্ট আবেদ সিররি সাকতি- রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, এর থেকে প্রতিকারের উপায় হলো, হিদায়াতের পথে চলা, হালাল খাদ্য ভক্ষণ করা এবং পরিপূর্ণ আল্লাহভীতি অর্জন করা।

টিকাঃ
[৮] অর্থাৎ আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার দরজা বান্দাদের জন্য সবসময়ই খোলা থাকে। কিন্তু দেখা যায় বান্দা নিজেই তা থেকে দূরে সরে থাকে। আল্লাহর দরবারে নিজের কৃত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে না। বরং উল্টো আরও নতুন নতুন পাপাচারে লিপ্ত হয়।

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 কান্নাকাটি করে বেদনামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা

📄 কান্নাকাটি করে বেদনামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা


মানবীয় সত্তার আরেকটি ত্রুটি হলো, সে কান্নাকাটি করে বেদনামুক্ত হয় এবং প্রশান্তি লাভ করে। এ ত্রুটি সারানোর উপায় হলো, কান্নার সাথে সাথে কষ্টকেও জারি রাখা, যাতে দুঃখ-বেদনা পুরোপুরি ভুলে গিয়ে প্রশান্তিতে নিমজ্জিত না হয়। সে দুঃখের মধ্যে পড়ে গেলে কাঁদবে, কিন্তু, দুঃখ কেন তাকে স্পর্শ করল-এ চিন্তায় সে কাঁদবে না। কারণ, দুঃখ কেন তাকে স্পর্শ করল-এ চিন্তায় যে কাঁদে, সে কান্নাকাটি করার মাধ্যমে প্রশান্ত হয়ে যায়; আর যে দুঃখের মধ্যে পড়ে গেলে কাঁদে, তার কান্না দুঃখ ও দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 সৃষ্টিজীবের কাছে ধর্ণা দেওয়া

📄 সৃষ্টিজীবের কাছে ধর্ণা দেওয়া


মানুষ অনেক সময় এমন ব্যক্তির কাছে ধর্ণা দেয়, যে বিপদ-মুসিবত দূরকরণের ক্ষমতা রাখে না এবং এমন ব্যক্তির কাছে প্রত্যাশা করে, যে উপকারসাধনে সক্ষম নয়। রিযিক নিয়ে সে খুব বেশি দুশ্চিন্তায় ভোগে। অথচ তার জন্য রিযিকের দায়িত্ব (স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই) গ্রহণ করেছেন।
এই ব্যাধির প্রতিকার সাধনে সর্বপ্রথম নিজের ঈমানকে বিশুদ্ধ করে নিতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে বলেছেন,
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ
"যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো বিপদে আক্রান্ত করেন তবে তিনি ছাড়া তা দূরীভূত করার আর কেউ নাই। আর যদি তিনি তোমার কোনো কল্যাণ চান তবে তাহলে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করবে এমন কেউ নাই। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করেন।" [৯]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
مَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا
“ভূপৃষ্ঠে যতো প্রাণী রয়েছে সকলের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর ন্যস্ত। এবং তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল।”[১০]
আহনাফ বিন কায়েস-রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'কীভাবে আপনি নিজ কওমের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন অথচ আপনি বয়সে তাদের চেয়ে বড় নন?' তিনি উত্তরে জানালেন, 'আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাতে আমি কখনো অবহেলা করি না। আর সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব আমি নিই না।'[১১]
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ
“তুমি তাঁর ইবাদাত করো এবং তাঁর উপর ভরসা করো।”[১২]
মানুষ যখন সৃষ্টিজীবের দুর্বলতা ও অক্ষমতার দিকে লক্ষ করবে তখন সে এই বিষয়টি বুঝতে পারবে—যে ব্যক্তি নিজেই হাজারও প্রয়োজনের মুখাপেক্ষী সে অন্যের প্রয়োজন দূর করবে কীভাবে? যে নিজেই অক্ষম সে তো অন্যের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে সক্ষম নয়। ফলে একসময় এমন ভুলের সীমানা থেকে বেরিয়ে সে পুরোপুরি আল্লাহমুখী হয়ে পড়বে।

টিকাঃ
[৯] সূরা ইউনুস: ১০৭
[১০] সূরা হুদ : ৬
[১১] মাকতাবাতুস সাহাবাহ থেকে প্রকাশিত মাজদি সাইয়িদের তাহকিককৃত নুসখাতে এই ঘটনাটি নেই। কিন্তু দারুস শুরুক থেকে প্রকাশিত ডক্টর আবদুল মুনঈম খফাজি ও ডক্টর আবদুল আযীয শারফ-এর তাহকিককৃত নুসখাতে আছে।
[১২] সূরা হুদ: ১২৩

📘 আত্মার ত্রুটি ও তার চিকিৎসা > 📄 আমলের তাওফীক থেকে বঞ্চিত হওয়া

📄 আমলের তাওফীক থেকে বঞ্চিত হওয়া


অনেক মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয় যে আমলগুলো সে আগে করতো এখন তা করা বাদ দিয়েছে। এটি একটি নিন্দনীয় বিষয়। তবে তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় বিষয় হলো এই অধঃপতন ও অবনতি নিয়ে চিন্তিত না হওয়া। তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় হলো এই বিষয়গুলোকে অবনতি বা অধঃপতন বলে মনে না করা। তারচেয়ে আরও বেশি নিন্দনীয় হলো এমন অধঃপতন ও অবনতিতে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও মনে করা যে তার সব কিছু ঠিকঠাকই আছে। আল্লাহ তাআলা তাকে যখন সেই আমলগুলো করার তাওফীক দান করেছিলেন তখন বেশি বেশি তাঁর শুকরিয়া আদায় না করার কারণেই এমনটি হয়ে থাকে। যখন আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করা হয় না তখন বান্দাকে আমলের জায়গা থেকে সরিয়ে অবনতি আর অক্ষমতা ও নিষ্ক্রিয়তার স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। তার দোষ-ত্রুটির সামনে আড়াল তৈরি করে দেওয়া হয়। ফলে মন্দ বিষয়গুলোই তার কাছে চমৎকার বলে প্রতিভাত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَمَنْ زُيَّنَ لَهُ سُوءُ عَمَلِهِ فَرَآهُ حَسَنًا
“কাউকে যদি তার অসৎ কাজ সুশোভিত করে দেখানো হয় অতপর সে ওটাকে ভালো মনে করে, (সে কি ওই ব্যক্তির মতো, যে ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ মনে করে?)”[১৩]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
“এবং তারা ধারণা করে যে তারা ভালো কাজ করছে। (অথচ তাদের ধারণা সঠিক নয়।) [১৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
كَذَلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ
“এভাবেই প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের কর্মকে আমি সজ্জিত করেছি।”[১৫]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
"প্রত্যেক দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।”[১৬]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ
“আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করবো যে তারা জানতে পারবে না।" [১৭]
এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, সদাসর্বদা আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহণ করা। সবসময় তাঁর যিকর করা, কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করা, এর অর্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, মুসলিমদের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করা, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাছে দুআ চাওয়া। যাতে তারা তার জন্য পূর্বের অবস্থা ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করে। আশা করা যায় (এসবের মাধ্যমে) আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে নেক আমল ও ইবাদাত-বন্দেগি করার দরজা তার জন্য অবমুক্ত দিবেন।

টিকাঃ
[১৩] সূরা ফাতির : ৮
[১৪] সূরা কাহাফ: ১০৪
[১৫] সূরা আনআম: ১০৮
[১৬] সূরা রুম: ৩২
[১৭] সূরা কলম: ৪৪; মাকতাবাতুস সাহাবা থেকে প্রকাশিত নুসখায় শুধু প্রথম আয়াতটি আছে। বাকিগুলো নেই। সেগুলো আছে দারুস শুরুক থেকে প্রকাশিত নুসখায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00