📄 প্রায়শ্চিত্ত
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। যিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের মনের রোগ-বালাই সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন। তাদেরকে এর সমস্যা সম্পর্কে অবগত হওয়ার সুযোগ দিয়ে সম্মানিত করেছেন। মনের উপর আপতিত বিভিন্ন অবস্থার ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন বানিয়েছেন। সাধারণ্যে অজানা প্রতিষেধকের সহায়তায় মনের বিভিন্ন দোষ-ত্রুটির ও গুপ্ত অনিষ্টতার প্রতিকার করার তাওফীক দিয়েছেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে ও উত্তম তাওফীকে এসব বিষয়ে বিবরণী প্রদান করা তাদের জন্য অনেক সহজ হয়েছে।
একজন শায়েখ আমার কাছে আবেদন জানিয়েছেন-আল্লাহ তাআলা স্বীয় সন্তুষ্টিতে তাকে মর্যাদাবান করুন-যাতে আমি মানুষের অন্তরের মন্দ স্বভাব নিয়ে কিছু পরিচ্ছেদ রচনা করি। যার মাধ্যমে এর চিকিৎসাবিধান করা সম্ভব হবে। আমি তাঁর সেই আবেদনে সাড়া দিয়েছি এবং এই কথাগুলো লিপিবদ্ধ করেছি। আশা করি আল্লাহ তাআলা তাঁর বরকত থেকে আমাদের মাহরুম করবেন না। আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করার ও তাওফীক চাওয়ার পরই এই কাজটি আমি করেছি। তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট ও উত্তম অভিভাবক।
শান্তি বর্ষিত হোক প্রিয় নবি মুহাম্মাদ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কিরামের উপর।
📄 কুরআনের আলোকে মনের মন্দপ্রবণতা
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةُ بِالسُّوءِ
“নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দকাজে প্ররোচনা দিয়ে থাকে।”[৩]
অন্যত্র তিনি বলেছেন,
وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى
“তিনি মনকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বারণ করেছেন।”[৪]
অন্য আরেক জায়গায় বলেছেন,
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ
“আপনি কি তাকে দেখেননি, যে তার প্রবৃত্তিকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে?”[৫]
পবিত্র কুরআনুল কারীমের এই জাতীয় আয়াতগুলো মনের মন্দপ্রবণতা এবং ভালো কাজে এর নিরুৎসাহের কথাই প্রমাণিত করে।[৬]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ
“তোমরা আল্লাহর পথে যথাযথ প্রচেষ্টা চালাও।”[৭]
এর দ্বারা বোঝানো হচ্ছে নফসের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা চালানো এবং তাকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বারণ করা।
টিকাঃ
[৩] সূরা ইউসুফ: ৫৩
[৪] সূরা নাযিআত: ৪০
[৫] সূরা জাসিয়াহ : ৪৫
[৬] এরপর লেখক নিজ সনদে একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন, যাকে মুহাদ্দিসগণ মওযু বলে চিহ্নিত করেছেন। তাই হাদীসটি আর মূল অনুবাদে রাখা হলো না। এর আরবিপাঠ নিম্নরূপ :
عن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلي الله عليه وسلم قال: البلاء والهواء والشهوة معجونة بطينة آدم
বিস্তারিত জানতে দেখুন, ইবনুল জাওযি-রাহিমাহুল্লাহ-রচিত 'আল-ইলালুল মুতানাহিয়াহ'; বর্ণনা নং : ১২৯৩
[৭] সূরা হাজ্জ : ৭৮
📄 মনের অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা
মনের একটি রোগ হলো, সে নিজেকে মুক্তির দ্বারপ্রান্তে উপনীত মনে করে। সে ভাবে, বিভিন্ন যিকর-আযকার ও ইবাদাত-বন্দেগী দিয়ে মুক্তির দরজায় কড়া নাড়বে আর দরজা তার জন্য সুন্দরভাবে খুলে যাবে। অথচ বাস্তবে দেখা যায় অবাধ্যতা আর পাপাচারের মাধ্যমে সে নিজেই মুক্তির দরজাকে বন্ধ করে ফেলার সকল আয়োজন সম্পন্ন করে রাখে।
হুসাইন বিন ইয়াহয়া আমাকে জাফর বিন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি মাসরূক-রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, রাবিয়া আদাওয়ীয়াহ-রাহিমাহাল্লাহ-একবার সালিহ মিররির মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। সে সময় সালিহ বলছিলেন, 'যে ব্যক্তি দরজার কড়া অনবরত নাড়াতেই থাকবে, আশা করা যায় তার জন্য দরজা খোলা হবে।' এই কথা শুনে রাবিয়া বললেন, 'দরজা খোলাই থাকে। কিন্তু বান্দা নিজেই তো সেই দরজা থেকে পলায়ন করে।[৮]
ভুল পথে পা বাড়িয়ে উদ্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার আশা করা যায় না। সুতরাং একজন বান্দা নিজের জন্য কুপ্রবৃত্তির দরজা উন্মুক্ত করে কীভাবে মুক্তির আশা করতে পারে? যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বারণ করতে পারে না তার মুক্তি তো সুদূরপরাহত।
ইবনু আবিদ দুনয়া-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, কোনো এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, 'তোমার ভেতর পঙ্কিলতা থাকলে তুমি মুক্তি পাবে বলে আশা কোরো না।'
এই সমস্যার সমাধান বিষয়ে বিশিষ্ট আবেদ সিররি সাকতি- রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, এর থেকে প্রতিকারের উপায় হলো, হিদায়াতের পথে চলা, হালাল খাদ্য ভক্ষণ করা এবং পরিপূর্ণ আল্লাহভীতি অর্জন করা।
টিকাঃ
[৮] অর্থাৎ আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার দরজা বান্দাদের জন্য সবসময়ই খোলা থাকে। কিন্তু দেখা যায় বান্দা নিজেই তা থেকে দূরে সরে থাকে। আল্লাহর দরবারে নিজের কৃত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে না। বরং উল্টো আরও নতুন নতুন পাপাচারে লিপ্ত হয়।
📄 কান্নাকাটি করে বেদনামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা
মানবীয় সত্তার আরেকটি ত্রুটি হলো, সে কান্নাকাটি করে বেদনামুক্ত হয় এবং প্রশান্তি লাভ করে। এ ত্রুটি সারানোর উপায় হলো, কান্নার সাথে সাথে কষ্টকেও জারি রাখা, যাতে দুঃখ-বেদনা পুরোপুরি ভুলে গিয়ে প্রশান্তিতে নিমজ্জিত না হয়। সে দুঃখের মধ্যে পড়ে গেলে কাঁদবে, কিন্তু, দুঃখ কেন তাকে স্পর্শ করল-এ চিন্তায় সে কাঁদবে না। কারণ, দুঃখ কেন তাকে স্পর্শ করল-এ চিন্তায় যে কাঁদে, সে কান্নাকাটি করার মাধ্যমে প্রশান্ত হয়ে যায়; আর যে দুঃখের মধ্যে পড়ে গেলে কাঁদে, তার কান্না দুঃখ ও দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।