📄 সুলতান মাহমুদ গজনবী রহ.
সুলতান মাহমুদ গজনবী রহ.। তৎকালীন বুজুর্গ আবুল হাসান খিরকানি রহ. এর মুরিদ ছিলেন। একদিনের ঘটনা। রাজ দরবারের সমস্ত কাজকর্ম শেষ করে তিনি সেদিন বড়ই ক্লান্ত বোধ করছিলেন। তাই তাড়াতাড়ি বিশ্রাম লাভের জন্য মন উদগ্রীব হয়ে উঠে। তিনি বিশ্রামের জন্য গৃহে প্রবেশ করলেন। নরম বিছানায় গা এলিয়ে দেবার জন্য এগিয়ে যান। হঠাৎ গৃহমধ্যে একটি তাকের দিকে তাঁর নজর পরে। সেখানে একটি কুরআন শরীফ রাখা ছিল। কুরআন শরীফ আল্লাহর কিতাব। পবিত্র কিতাব। বিছানার উপর শয়ন করলে কুরআনের দিকে পা চলে যায়। কুরআনের দিকে পা ছড়িয়ে শয়ন করার চাইতে বড় বেয়াদবি আর কি হতে পারে! এই চিন্তায় সুলতান অস্থির হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন বিছানার খাটটি অন্যদিকে ফিরিয়ে দেই, তাহলে কুরআনের দিকে মাথা হয়ে যাবে। এ চিন্তা করে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই খাটটি ঘুরিয়ে দেন।
এবার সুলতান ঘুমোতে গেলেন। কিন্তু হঠাৎ আবার মনে হল, আল্লাহর কিতাব আমার ঘরে থাকবে আর আমি তা পড়বো না? আমি শুয়ে আরাম করবো? আল্লাহর কিতাবে যা লেখা আছে আমি তা পালন করবো না? আল্লাহর কিতাবে তো আমাদের কথা লেখা আছে। অথচ আমি তা জানবো না? ঘুমিয়ে রাত কাটাবো, আমি এত বড় গাফেল? সুলতানের আবার মনে হল, কুরআন শরিফটা পাশের ঘরে রেখে এলেই তো হয়। তাহলে আমি আরাম করে ঘুমোতে পারবো।
এ চিন্তা মনে আসার সাথে সাথেই সুলতানের মন কেঁপে ওঠে। সুলতান মনে মনে বললেন, হায়, আমি কত বড় পাষন্ড হয়ে গেছি। নিজের আরামের জন্য আল্লাহর পবিত্র কিতাবকে এ ঘর থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছি। আল্লাহর সঙ্গে আমি কত বড় গোস্তাখী করছি। ঝর ঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে সুলতানের চোখ দিয়ে। সে রাতে আর সুলতান বিছানায় ঘুমোতে পারেন নি। কুরআন তেলাওয়াত করতে করতে সারা রাত পার করে দেন।
📄 অন্তরকে পাক করার মাজুনি হল আল্লাহর জিকির
মূলত কুরআনের নূর এমন এক নূর এর মোকাবেলায় জগতের আর কিছু নেই। কারণ এটা আল্লাহর কালাম। একেকটি আয়াত, একেকটি হরফ আপনার দিলে পড়বে আপনার দিলের জং দূর হতে থাকবে। এটা আমার কথা না। বরং নবীজী এক হাদীসে সকল জিকির সম্পর্কে বলেছেন لِكُلِّ شَيْءٍ صِقَالَةٌ وصِقَالُ القلوبِ ذَكْرُ اللهِ নিশ্চয় প্রত্যেক জিনিসকে পাকসাফ করার একটা মাজুনি আছে। আর অন্তরকে পাক করার মাজুনি হল আল্লাহর জিকির। ৩৮
আর জিকিরের মধ্যে কুরআন তেলাওয়াত হল সর্বোত্তম। তাই নবীজী কুরআন তেলাওয়াত সম্পর্কে বিশেষভাবে বলেছেন যে, এটি অন্তরের মরিচা দূর করে। আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজী বলেন إِنَّ هَذِهِ الْقُلُوبَ تَصْدَأُ كَمَا يَصْدَأُ الْحَدِيدُ إِذَا أَصَابَهُ الْمَاءُ . قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا جِلَاؤُهَا؟ قَالَ : كَثْرَةُ ذِكْرِ الْمَوْতِ وَتِلَاوَةُ الْقُرْآنِ
নিশ্চয় অন্তরে মরিচা ধরে, যেভাবে পানি লাগলে লোহায় মরিচা ধরে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রসূল! এ মরিচা দূর করার উপায় কী? তিনি ﷺ বললেন বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা ও কুরআন তেলাওয়াত করা। ৩৯
টিকাঃ
৩৮ কানযুল উম্মাল: ১৮৪৮
৩৯ শুআবুল ঈমান: ১৮৫৯
📄 জিকরে-কালবি অন্তর পরিষ্কার করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম
জিকিরের মধ্যে অন্তর পাক করার দ্বিতীয় শক্তিশালী আমল হল জিকরে-কালবি। কারণ সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা হল কলবে। কলবে বা অন্তরে নানা চিন্তার উদ্রেক হয়। মনে হচ্ছে গুগল সার্চ মারি, মনে হচ্ছে এবারের জন্য হারাম টাকাটা নিয়ে নেই। মনে হচ্ছে গেম্স খেলি। এভাবে কলবে নানা চিন্তার উদ্রেক হয়। কলব সব সময় একটা না একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই কলবের খাদ্য পরিবর্তন করতে হবে। হয়ত তাকে নেক আমলের চিন্তা দিতে হবে অন্যথায় সে গুনাহের চিন্তা করবে।
এখন অন্তরকে এত নেক আমলের চিন্তা কীভাবে দিবেন। হজ করব, হজ করব এটা দশ বার না হয় বললেন, এগারবার বলতে মনে চাইবে না। ইলম শিখব, ইলম শিখব বিশবার না হয় বললেন, এরপর আর মনে চাইবে না। এজন্য বলা হয়, অন্তরকে একটা সহজ জিকির দিয়ে দাও যেন সে সব সময় করতে পারে। এই সহজ জিকিরটি হল, আল্লাহ আল্লাহ। অন্তর যখন আল্লাহ আল্লাহ বলাতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে তখন বাহ্যিক দৃষ্টিতে হয়তো সে কাজে ব্যস্ত থাকবে কিন্তু তার অন্তর থাকবে আল্লাহর সঙ্গে। কবির ভাষায়—
দুনিয়ার শত ব্যস্ততার মাঝেও সে আল্লাহ্র সঙ্গে থাকে।
সকলের সঙ্গে থেকেও সে সকল থেকে আলাদা থাকে।
📄 হাত কাজে ব্যস্ত অন্তর বন্ধুর সঙ্গে
এটাকে বলা হয়, দাস্ত ব-কার দিল ব-য়ার। হাত কাজে ব্যস্ত, অন্তর বন্ধুর সঙ্গে।
হযরত রাবেয়া বসরি রহ. বলতেন, আমার জবান যখন মানুষের সঙ্গে কথা বলে তখন আমার দিল কথা বলে আল্লাহর সঙ্গে।