📄 আসক্তির গহ্বরে পড়ে যারা নিজেদের পতনকে নিশ্চিত করেছে তাদের কিছু ঘটনা
উপরে আমরা কতক ধৈর্যশীলদের কথা উল্লেখ করি, যারা তাদের আসক্তির চাহিদার উপর ধৈর্যধারণ করে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শ ও অনুকরণীয় হয়ে থাকে। কিন্তু তাদের বিপরীতে এমন কতক লোক আছে যারা তাদের আসক্তির চাহিদার কাছে হার মানে এবং আল্লাহ আযাব ও গজবের অংশীদার হয়।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহিম (আল্লাহ লোকটির দুর্নাম জিইয়ে রাখুন) ২৭৮ হিজরিতে মারা যায়। এ কমবখত লোকটি একজন মুসলিম মুজাহিদ ছিল, মুসলিমদের পক্ষ নিয়ে রোমানদের সাথে একাধিক যুদ্ধে সে অংশগ্রহণ করে। কোন এক যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যরা রুমের একটি শহরকে ঘেরাও করে ফেললে তখন লোকটি ঐ দুর্গে রোমানদের একজন সুন্দরী মহিলা দেখতে পেল। তাকে দেখে সে তার প্রেমে পড়ল। তার নিকট সে বার্তা পাঠাল যে, তোমার নিকট পৌছার উপায় কি? তখন সে তাকে বলল, তুমি নাসারা বা খ্রিষ্টান হয়ে যাও-আমার নিকট চলে আস।
লোকটি তার প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করল এবং মুসলিমদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করল। সে ঐ মহিলার নিকট অবস্থান করল। এ ঘটনার ফলে মুসলিমরা খুব চিন্তিত হল এবং তারা খুব কষ্ট পেল। অনেক দিন পর মুসলিমরা ঐ দুর্গ দিয়ে অতিক্রম করলে তারা দেখতে পেল লোকটি ঐ মহিলার সাথেই আছে। তখন তারা জিজ্ঞাসা করল, তোমার কুরআনের কি অবস্থা? তোমার ইলমের কি অবস্থা? তোমার সালাতের অবস্থা কি? তোমার জিহাদের কি অবস্থা? এবং তোমার সিয়ামের কি অবস্থা?
তখন সে বলল, আমি সমগ্র কুরআন ভুলে গেছি কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এ বাণী ছাড়া; মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ. ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ.
"যারা কুফরি করেছে, তারা একসময় কামনা করবে যদি তারা মুসলমান হত! তাদেরকে ছেড়ে দাও, আহারে ও ভোগে তারা মত্ত থাকুক এবং আশা তাদেরকে গাফেল করে রাখুক, আর অচিরেই তারা জানতে পারবে।"৮৬
বর্ণিত আছে মিসরের একজন লোক সে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আযান দিত এবং সব সময় মসজিদে অবস্থান করত। সে সর্বদা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আদেশের আনুগত্য করত এবং তার চেহারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদতের কারণে নূরের আলোতে ছিল পরিপূর্ণ। একদিন সে তার রুটিন মোতাবেক আযান দেয়ার জন্য মিনারে উঠল। মিনারের নিচে খ্রিষ্টানদের একটি বাড়ি ছিল। লোকটি বাড়িটির দিকে তাকিয়ে বাড়িওয়ালার মেয়েকে দেখতে পেল। তাকে দেখে লোকটির মনে তার প্রতি ভালোবাসা জন্মিল। তারপর সে আযান না দিয়ে মিনার থেকে নেমে তার ঘরে প্রবেশ করল। তাকে দেখে মেয়েটি বলল, তোমার কি হয়েছে? তুমি কি চাও? সে বলল, আমি তোমাকে চাই! সে বলল, কেন? বলল, তুমি আমার ভালোবাসা কেড়ে নিলে এবং আমার অন্তর ভালোবাসার আগুন জ্বালিয়ে দিলে। মেয়েটি বলল, আমি কখনোই তোমার আহ্বানে সাড়া দিব না। সে বলল, আমি তোমাকে বিবাহ করব। মেয়েটি বলল, তুমি একজন মুসলিম আর আমি খ্রিষ্টান। আমার পিতা আমাকে তোমার নিকট বিবাহ দেবে না। তখন সে বলল, আমি তাহলে খ্রিষ্টান হয়ে যাব। সে বলল, যদি তুমি তা কর তবে আমি তোমার সাথে বিবাহ করতে রাজি আছি। তারপর লোকটি ঐ মেয়েকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান হয়ে গেল এবং তাদের সাথে তাদের ঘরেই অবস্থান করল। পরদিন লোকটি ঐ বাড়ির ছাদের উপর উঠলে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল। তারপর সে ঐ মেয়েকেও পেল না, আর নিজের দ্বীনকেও বরবাদ করল।
আমরা আল্লাহ রাব্বুল নিকট তাঁর দ্বীনের উপর অবিচল থাকা কামনা করি।
টিকাঃ
৮৬ সুরা আল হিজর: ২-৩।
📄 পরিশিষ্ট
কুআসক্তি বিষয়ে যে আলোচনা তুলে ধরা হল, তাতে শুধু যুবক-যুবতি কিংবা খারাপ প্রকৃতির লোকেরা আক্রান্ত হয় তা ঠিক নয়। বরং অনেক সময় দেখা যায়, যারা ভালো ও সৎলোক বলে পরিচিত এবং যারা উন্নত ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করে তারাও আসক্তির বেড়াজালে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এছাড়াও যারা মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিকে আহ্বান করে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দ্বীনের সত্যিকার ইলম অর্জনে সর্বদা নিয়োজিত থাকে, মানুষকে দীনি ইলম ও শরীয়তের মাসআলা-মাসায়েল শিক্ষা দেয়-জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এবং তারা মানুষকে কুআসক্তি হতে দূরে থাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের ওয়াজ নছিহত করে থাকে, তারাও দেখা যায় তাদের নফস বা কুআসক্তির ধোঁকায় পড়ে যায়। বরং অনেক সময় দেখা যায় তাদের কুআসক্তি ও নফসের চাহিদা অন্য খারাপ লোকদের তুলনায় আরও বেশি মারাত্মক আকার ধারণ করে। কিন্তু তারা তাদের কুআসক্তি ও নফসের চাহিদাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভয়ে এবং আখিরাতের বিনিময় ও ছাওয়াব লাভের আশায় নিয়ন্ত্রণ করে এবং দমিয়ে রাখে।
সুতরাং এ দুনিয়ার অবস্থার প্রতি সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে চিন্তা করলে একজন ব্যক্তি এর কল্যাণ গ্রহণ করতে পারবে এবং দুনিয়ার অকল্যাণ হতে মুক্ত থাকতে পারবে। পক্ষান্তরে যে এর খারাপ পরিণতি দেখতে পাবে না ও এ সম্পর্কে সাবধান হবে না, তার উপর তার ইন্দ্রিয় প্রাধান্য পাবে, ফলে তা তার জন্য কষ্টের কারণ হবে এবং তাকে অজস্র জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে আমাদের পরম চাওয়া হল-তিনি যেন আমাদেরকে হারাম হতে বিরত রাখেন এবং আমাদের মাঝে ও হারামের মাঝে নির্মাণ করেন বরযখ বা পর্দা, সুদৃঢ় প্রাচীর ও মজবুত প্রতিবন্ধক। আর আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা যখন কোন ভুল বা অপরাধ করে, সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর যখন তারা কোন ভালো কাজ করেন, তখন তারা খুশি হন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আমাদের আরও প্রার্থনা হল-তিনি যেন আমাদের আসক্তিকে তিনি যা পছন্দ করেন এবং যে সব কাজে সন্তুষ্ট হন সে কাজে ব্যবহার করতে পারি, সে তাওফিক দেন। আমিন।
وصلى الله وسلم على نبينا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين.