📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার 📄 এক. ইউসুফ আ. এর ঘটনা

📄 এক. ইউসুফ আ. এর ঘটনা


পৃথিবীর ইতিহাসে নারি ও পুরুষের মাঝে সবচেয়ে বড় ফিতনা সংঘটিত হয় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সম্মানিত নবি ইউসুফ আ.-কে কেন্দ্র করে। ইউসুফ আ.-কে বাদশাহ তার রাজপ্রাসাদে আশ্রয় দেয়। সেখানে ইউসুফ আ. অগ্নি পরিক্ষার সম্মুখীন হন। বাদশাহর স্ত্রী ইউসুফ আ.-এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে পড়ে যায়। তার সাথে অপকর্ম করতে ইউসুফ আ.-কে বাধ্য করে এবং তার জন্য যাবতীয় উপকরণগুলো একত্র করে। যেমন-মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার মহান কিতাব কুরআনে কারিমে তা উল্লেখ করে বলেন-
وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَن نَّفْسِهِ وَغَلَّقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ.
"আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল, আর বলল—'এসো'। সে বলল, আল্লাহর আশ্রয় (চাই)। নিশ্চয় তিনি আমার মনিব, তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমগণ সফল হয় না"। ৭৭
বিষয়টি এখানেই শেষ হয়নি। বরং এ কথা বলার পরও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। তার সাথে কামভাব পূরণ করার লক্ষে মহিলাটি তাকে তার দিকে আহ্বান করে। ইউসুফ আ. নিরুপায় হয়ে তার থেকে পালিয়ে দৌড়ে দরজার সামনে চলে আসে। তখন মহিলাটি পিছন থেকে তার জামা টেনে ধরে পিছন দিক থেকে তার জামাটি ছিঁড়ে ফেলে। মহিলার স্বামি আজিজে মিসর তাদের দেখে ফেললে মহিলাটি ইউসুফ আ.-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়। মহিলাটি তার সাথে অপকর্ম করতে জোর জবরদস্তি করতে থাকে। কিন্তু ইউসুফ আ. এতে রাজি না হলে তাকে বিনিময়ে জেলখানায় যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইউসুফ আ. তার সাথে অশ্লীল কাজ করতে অস্বীকার করেন এবং জেলখানায় যেতে সম্মত হন। সে হারাম কাজ করার চেয়ে জেলখানায় জুলুম, নির্যাতন ও বিভিন্ন ধরনের কষ্ট সহ্য করতে সম্মত হন।
এ ঘটনা বিষয়ে চিন্তা করলে অবশ্যই স্পষ্ট হবে যে, আল্লাহর নবি ইউসুফ আ.-এর জন্য অপকর্মের যাবতীয় সব ধরনের উপকরণ হাজির ছিল। ইচ্ছা করলে সে তা করতে পারত। কারণ, তিনি ছিলেন একজন অবিবাহিত যুবক, স্বীয় আসক্তিকে ব্যয় করার মত কোন ক্ষেত্র ছিল না। আর সে ছিল একজন গোলাম তার আত্মমর্যাদা বা সম্মানহানির তেমন কোন ভয় ছিল না, যেমনটি একজন স্বাধীন বা মুনিবের ভয় থাকে।
আর অপরদিকে যে নারি তাকে অপকর্মের প্রতি আহ্বান করছে, সে ছিল একজন সুন্দরী রমণী ও ক্ষমতাধর নারি। সে ইউসুফ আ.-এর মনিব আর ইউসুফ আ. হলো তার হুকুমের গোলাম বা চাকর। তিনি যা আদেশ দেবেন বা নিষেধ করবেন তা পালন করতে সে বাধ্য। খাদেম হওয়ার কারণে তার ঘরে প্রবেশ করা ইউসুফ আ.-এর জন্য কোন বাধা ছিল না। যখন ইচ্ছা সে ঘরে প্রবেশ করতে পারত। তার স্বামি বাড়ি থাকত না। মহিলার স্বামির আত্ম-মর্যাদাবোধ ছিল খুবই কম। যখন সে ঘটনা জানতে পারল সে আশানুরূপ কোন ব্যবস্থা ইউসুফ আ. ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে নেয়নি। বরং সে ইউসুফ আ.-কে বলল, হে ইউসুফ তুমি বিরত থাক, আর তার স্ত্রীকে বলল, তুমি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাকে যেভাবে ব্যভিচারের দাওয়াত দেয়া হয়েছে, তাতে তাদের মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল না। এমনকি ক্ষমতাধর নারিটি তার সাথে অপকর্ম না করলে তাকে জেলখানায় পাঠানোর হুমকি দেয়। এত কিছুর পরও তিনি ধৈর্য ধারণ করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মজবুত রশিকে আঁকড়ে ধরেন এবং স্বীয় প্রভু ও মাওলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেন।
চিন্তা করে দেখ, তিনি তার নফসকে কিভাবে দমিয়ে রাখলেন? মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর বিনিময় তাকে উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারি করেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে তার খালেস বান্দা হিসেবে নির্বাচন করেন এবং মুহসীন ও মুখলিসদের অন্তর্ভুক্ত করেন।

টিকাঃ
৭৭ সুরা ইউসুফ: ২৩।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার 📄 ইউসুফ আ.-এর ধৈর্য ধারণ করার কারণ

📄 ইউসুফ আ.-এর ধৈর্য ধারণ করার কারণ


প্রথমত: আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভয়। ইউসুফ আ.-এর অন্তরে ছিল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভয়। তাই তিনি নফসের পূজা থেকে বেঁচে যান।
দ্বিতীয়ত: তার প্রতি আল্লাহ রাব্বুল 아লামিনের সাহায্য ও তাওফিক। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ.
“আর সে মহিলা তার প্রতি আসক্ত হল, আর সেও তার প্রতি আসক্ত হত, যদি না তার রবের স্পষ্ট প্রমাণ প্রত্যক্ষ করত। এভাবেই, যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দেই। নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।”৭৮
তৃতীয়ত: আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাফরমানির কারণ হতে পলায়ন করা।
ইউসুফ আ. বলেন, 'আমি আল্লাহকে ভয় করি' এ কথা বলে ঘরে বসে থাকেন নি। বরং তিনি এ কথা বলে সাথে সাথে দৌড় দিয়ে পালাতে এবং ঘর থেকে বের হতে চেষ্টা করেন।
গুনাহের স্থান ত্যাগ করা মানুষকে গুনাহ হতে নাজাত দেয় এবং কুআসক্তি থেকে হেফাজত করে। আর গুনাহের স্থানে অবস্থান করা মানুষকে গুনাহের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং গুনাহের উৎসাহ প্রধান করে। সুতরাং তোমরা যদি নাজাত পেতে চাও তবে তোমরা গুনাহের স্থান ত্যাগ কর।
চতুর্থত: আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা:
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ.
"সে (ইউসুফ) বলল-'হে আমার রব, তারা আমাকে যে কাজের প্রতি আহ্বান করছে তা থেকে কারাগারই আমার নিকট অধিক প্রিয়। আর যদি আপনি আমার থেকে তাদের চক্রান্ত প্রতিহত না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হব”। ৭৯
পঞ্চমত: ইউসুফ আ. দ্বীনদার ও মুত্তাকি হওয়া
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ.
"নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত"।৮০
ষষ্ঠ: কুপ্রবৃত্তি ও খারাপ কামনার উপর দুনিয়ার শাস্তিকে প্রাধান্য দেয়া
قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ.
"তিনি বলেছিলেন, হে আমার রব! তারা যে দিকে আমাকে আহ্বান করছে তা থেকে জেল আমার কাছে অধিক প্রিয়"।৮১
এ ঘটনার মধ্যে বিভিন্ন উপদেশ ও নসিহত রয়েছে যেগুলো একজন মুসলিমের জন্য পালন করা খুবই জরুরি। বিশেষ করে যুবকদের জন্য এ ঘটনা থেকে উপদেশ গ্রহণ করা ও এ ঘটনার শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হতে উপকৃত হওয়া অত্যন্ত জরুরী। একজন যুবক যখন এ ঘটনাটি পড়বে তখন যেন শুধু তা জানা ও আবিষ্কার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষালাভ ও উপকৃত হওয়ার মানসিকতা নিয়ে পাঠ করে।

টিকাঃ
৭৮ সুরা ইউসুফ: ২৪।
৭৯ সুরা ইউসুফ: ৩৩।
৮০ সুরা ইউসুফ: ২৪।
৮১ সুরা ইউসুফ: ৩৩।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার 📄 বিশিষ্ট আবেদ জুরাইজের ঘটনা

📄 বিশিষ্ট আবেদ জুরাইজের ঘটনা


আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
كَانَ جُرَيْجُ فِي صَوْمَعَتِهِ، فَقَالَتِ امْرَأَةٌ: لَأَفْتِنَنَّ جُرَيْجاً. فَتَعَرَّضَتْ لَهُ فَكَلَّمَتْهُ، فَأَبَى، فَأَتَتْ رَاعِيا فَأَمْكَنَتْهُ مِنْ نَفْسِهَا، فَوَلَدَتْ غُلَامًا فَقَالَتْ: هُوَ مِنْ جُرَيْجٍ، فَأَتَوْهُ وَكَسَرُوا صَوْمَعَتَهُ، فَأَنْزَلُوهُ وَسَبُّوهُ، فَتَوضَّأَ وَصَلَّى، ثُمَّ أَتَى الغُلَامَ فَقَالَ: مَنْ أَبُوكَ يَا غُلَامُ؟ قَالَ الرَّاعِي.
"যুরাইয তার স্বীয় গির্জায় সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন ছিল। তখন একজন মহিলা বলল, আমি যুরাইযকে ফিতনায় ফেলব। তারপর সে তার সাথে গিয়ে কথা বলতে চাইলে সে তার সাথে কথা বলতে অস্বীকার করে। তারপর সে একজন রাখালের নিকট গেলে মহিলাটি তাকে তার সাথে অপকর্ম করার সুযোগ দেয়। তারপর মহিলাটি একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে বলল, এ জুরাইজের সন্তান। এ কথা শোনে লোকেরা তার উপর চড়াও হল এবং তার গির্জাকে ভেঙে চুরমার করে ফেলল। তারা তাকে তার ইবাদতগাহ হতে বের করে দিল এবং গালিগালাজ করল। নিরুপায় হয়ে জুরাইজ ওযু করল এবং সালাত আদায় করল। তারপর সে বাচ্চাটিকে জিজ্ঞাসা করল তোমার পিতা কে? উত্তরে সে বলল, রাখাল"। ৮২
এখানে লক্ষ্য করে দেখ, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জুরাইজের সম্মান ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে কিভাবে গোলামটিকে কথা বলার শক্তি দান করেন! কারণ সব ধরনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভয়ে সে ঐ মহিলাকে ছেড়ে দেয়।

টিকাঃ
৮২ সহিহ বুখারি: ৩৪৩২; সহিহ মুসলিম: ২৫৫০।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার 📄 রবী ইবনু খুসাইমের ঘটনা

📄 রবী ইবনু খুসাইমের ঘটনা


রবী ইবনু খুসাইমের গোত্রের লোকেরা এক অতি সুন্দরী নারিকে রবীর নিকট গিয়ে নিজেকে পেশ করতে বাধ্য করে; যাতে সে তাকে ফিতনার মধ্যে ফেলে। আর তারা বলল, যদি তুমি এ কাজে সফল হও, আমরা তোমাকে এক হাজার দিরহাম দেব।
এ ঘটনা থেকে আমরা একটি গুরুত্বপর্ণ বিষয় শিখতে পারি, তা হল- মানুষের মধ্য থেকে কতক শয়তান মানুষ আছে, যারা সৎ লোকের সততাকে নষ্ট করার জন্য টাকা পয়সা ব্যয় করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকে। তাদের উদ্দেশ্য হল দ্বীনের বিরোধিতা করা এবং ইসলামের দাওয়াতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী মহিলাটি তার সাধ্যানুযায়ী নতুন ও সুন্দর কাপড় পরিধান করল এবং খুব সাজসজ্জা ও সুগন্ধি মাখল। তারপর যখন লোকটি মসজিদ থেকে সালাত আদায় করে বের হল, তখন মহিলাটি তার সামনে এসে দাঁড়াল। রবী তার দিকে তাকাল এবং মহিলার অবস্থাটি তাকে আতঙ্কে ফেলল। তারপর মহিলাটি তার সামনে দিয়ে হাঁটছিল।
রবী তাকে ডেকে বলল, যদি তোমার শরীরে জ্বরা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং তোমার এ সৌন্দর্য ও রূপ বিকৃত করে দেয়া হয়, তখন কেমন হবে?
অথবা এ মুহুর্তে মালাকুল মাওত এসে তোমার প্রাণটি নিয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?
অথবা যদি মুনকার নাকির ফেরেশতা এসে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে তখন তোমার উত্তর কি হবে?
এ সব কথা শুনে সে মহিলাটি একটি বিকট আওয়াজ করল, তারপর বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
তারপর সে তার পুরো জীবনকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদত বন্দেগিতে কাটিয়ে দেয়। আর যে দিন সে মারা যায় সে একটি অগ্নিদগ্ধ ছাগলের মত হয়ে যায়।

টিকাঃ
৮৩ সফওয়াতুস সফওয়া: ৩/১৯১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px